📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর যবানীতে উচ্চারিত প্রথম কাব্য

📄 শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর যবানীতে উচ্চারিত প্রথম কাব্য


` এই প্রসঙ্গে আস্-সুয়ূতী উল্লেখ করেন, ইমাম বায়হাকী ও ইব্‌ন আসাকির ইব্‌ন আব্বাস সূত্রে বর্ণনা করেন, হালীমা সা'দিয়া প্রায়ই আলোচনা করিতেন যে, যখন রাসূলে কারীম (স) দুধ পান ছাড়িয়া কথাবার্তা বলিতে আরম্ভ করিলেন তখন শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর যবান মুবারক হইতে প্রথম এই কাব্যটি উচ্চারিত হয়: اللَّهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا - وَسُبْحَانَ اللَّهِ بُكْرَةً وَأَصِيْلاً. "আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ মহিমান্বিত, অজস্র প্রশংসা শুধুমাত্র তাঁহারই জন্য। তিনি কতইনা পাক-পবিত্র, যাঁহার পবিত্রতা-গুণকীর্তন সকাল-সন্ধ্যায় সব সময় করা হয়।"
এটাই ছিল মুহাম্মাদ (স)-এর সর্বপ্রথম বাক্য।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হালীমার গৃহে অবস্থানকালে তাঁহার কার্যক্রম

📄 হালীমার গৃহে অবস্থানকালে তাঁহার কার্যক্রম


মুহাম্মাদ ইবন সা'দ উল্লেখ করিয়াছেন যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) হালীমা সা'দিয়ার গৃহে সুদীর্ঘ ৪ বৎসর লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। এই সময় মেষ চরাইতে তিনি তাঁহার দুধভাই-বোনের সহিত গ্রাম-পল্লীর অনতিদূরে আসা-যাওয়া করিতেন। রাসূলে কারীম (স) পরবর্তীকালে অনেক সময় শিশুকালের পশুচারণের কথা আনন্দের সহিত আলোচনা করিতেন। এই প্রসঙ্গে ইবন সা'দ হযরত জাবির ইব্‌ন 'আব্দুল্লাহ (রা) বরাতে উল্লেখ করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, একবার আমরা নবী কারীম (স)-এর সহিত মাঠে গিয়াছিলাম। আমরা জঙ্গল হইতে কিবাছ (কাবাছ) নামীয় এক প্রকার ফল ছিড়িয়া খাইতে আরম্ভ করিলাম। তখন তিনি আমাদিগকে বলিলেন: তোমরা সর্বাধিক কালো ফলগুলি আহরণ কর। কেননা ঐ ফলগুলিই বেশী সুস্বাদু। আমি শিশুকালে যখন মেষ চরাইতাম তখন কালো ফলগুলি গ্রহণ করিতাম। আমরা বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি মেষ চরাইয়াছেন? তিনি বলিলেনঃ হাঁ, প্রত্যেক নবীই মেষ চরাইয়াছেন।
হযরত মুহাম্মাদ (স) শিশুকাল হইতে খেলাধূলার প্রতি বিমুখ ছিলেন, এমনকি তিনি ক্রীড়ামোদীদের নিকট হইতে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখিতেন। এই প্রসঙ্গে আস্-সুয়ূতী ইমাম বায়হাকী ও ইবন 'আসাকির-এর সুদীর্ঘ উদ্ধৃতি উল্লেখ পূর্বক বলেন, যখন তিনি (স) কিছু চলাফেলা করিতে আরম্ভ করেন তখন মাঝে মাঝে বাহিরে যাইতেন এবং ঐ সমস্ত বাচ্চাদের প্রতি লক্ষ করিতেন যাহারা খেলাধূলা করিত। কিন্তু তিনি তাহাদের সংশ্রব হইতে দূরে থাকিতেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হালীমার গৃহে শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর শারীরিক প্রবৃদ্ধি

📄 হালীমার গৃহে শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর শারীরিক প্রবৃদ্ধি


হালীমা সা'দিয়ার গৃহে অবস্থানকালে শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর শারীরিক প্রবৃদ্ধি ছিল খুবই বেশী। এই প্রসঙ্গে 'আল্লামা শিবলী নু'মানী উল্লেখ করেন যে, স্যার উইলিয়াম মূর' তাঁহার 'লাইফ অফ মুহাম্মাদ' গ্রন্থে লিখিয়াছেন, মুহাম্মাদ (স)-এর শারীরিক প্রবৃদ্ধি ছিল খুবই দ্রুত। তিনি ছিলেন বর্ধিষ্ণু দেহ-মন ও সুন্দর স্বাস্থ্যের অধিকারী। তিনি পূত-পবিত্র ও নির্মল আখলাকের অধিকারী ছিলেন। স্বাধীনতাপ্রিয় ও অন্যের অমুখাপেক্ষী হওয়ার গুণে গুণান্বিত ছিলেন। ইমাম যাহাবী তাঁহার সীরাত-এ উল্লেখ করেন, শিশু মুহাম্মাদ (স) হালীমা সা'দিয়া-র ঘরে লালনপালনকালে এক এক দিনে এক মাসের শিশুর ন্যায় স্বাস্থ্যবান ও নাদুস-নুদুস হইতেছিলেন এমনকি তিনি এক মাসে এক বছরের শিশুর মত বাড়িয়া উঠিতেছিলেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হালীমার গৃহে শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর অন্তরঙ্গ সঙ্গী-সাথী

📄 হালীমার গৃহে শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর অন্তরঙ্গ সঙ্গী-সাথী


হালীমা সা'দিয়ার গৃহে অবস্থানকালে শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর অন্তরঙ্গ সঙ্গী-সাথীরা ছিলেন তাঁহারই সন্তানাদি তথা মুহাম্মাদ (স)-এর দুধভাই-বোনেরা। মুহাম্মাদ (স)-এর দুধ ভাই-বোনদের প্রসঙ্গে ইবন হিশাম তাঁহার সীরাত-এ ইবন ইসহাকের উদ্ধৃতি এইভাবে উল্লেখ করেন, রাসূল কারীম (স)-এর দুইভাই-বোনেরা হইলেন 'আব্দুল্লাহ ইবনুল হারিছ, আনীসা বিল্-হারীছ এবং খুযামা বিল্-হারীছ, যিনি শায়মা নামে সর্বাধিক পরিচিত, এমনকি স্বগোত্রীয় লোকেরা তাহাকে এই নামে ছাড়া অন্য নামে চিনিত না। আর ইহারা সকলেই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর দুধমা হালীমা বিন্ত আবী যুওয়ায়ب-এর সন্তানাদি ছিলেন। কোন কোন বর্ণনায় খুযামা-এর পরিবর্তে খিদামা, জুযামা, হুযাফা ইত্যাদি উল্লিখিত হইয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর লালন-পালন কার্যে হযরত শায়মাও তাহার মা হালীমা সা'দিয়াকে সর্বতোভাবে সাহায্য করিতেন। এই প্রসঙ্গে আসাহহুস্ সিয়ার' গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, তিনি ছিলেন সকলের বড় এবং অধিকাংশ সময় রাসূলে কারীম (স)-এর খেদমতে নিয়োজিত থাকিতেন। হুনায়ন যুদ্ধের পর তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে হাজির হইয়াছিলেন। তখন তিনি তাঁহার সম্মানে স্বীয় চাদর মুবারক বিছাইয়া দিয়াছিলেন। ইবনুল্ জাওযী উল্লেখ করেন, হুনায়ন যুদ্ধে শায়মা বন্দী হইয়া আসিয়াছিলেন। অতঃপর তিনি বলেন, "হে মুসলমানগণ! তোমরা জানিয়া রাখ যে, আমি তোমাদের নবী মুহাম্মাদ (স)-এর বোন।" অতঃপর রাসূলে কারীম (স) যখন তাঁহার নিকট আসিলেন, তিনি তাঁহাকে চিনিতে পারিলেন এবং প্রচুর ধন-সম্পদ দান করিলেন।
রাসূলে কারীম (স)-এর লালন-পালনে হযরত শায়মার ভূমিকা ছিল অনন্য। এই প্রসঙ্গে "যাদুল মা'আদ"-এ আরো বর্ণিত আছে, যাঁহারা মুহাম্মাদ (স)-কে নিজ কোলে আদর-যত্ন-সোহাগে লালন-পালন করিয়াছিলেন তাঁহাদের অন্যতম হইলেন ছুওয়ায়বিয়া, হালীমা আস্-সা'দিয়্যা এবং তাঁহার কন্যা শায়মা (রা)। তিনি মুহাম্মাদ (স)-এর দুধবোন ছিলেন। তিনি মুহাম্মাদ (স)-কে অত্যন্ত আদর-যত্ন ও সোহাগ করিতেন, এমনকি তাঁহাকে কোলে নিতেন।
মওলানা মুহাম্মাদ তফাজ্জল হোছাইন ইবন হিশাম-এর বরাতে উল্লেখ করেন, "হযরত হালীমা এবং তাঁহার কন্যা শায়মা রাসূলুল্লাহ (স)-কে প্রাণ দিয়া ভালবাসিতেন। অতি যত্ন সহকারে তাঁহার লালন-পালন কার্য সমাধা করিতে লাগিলেন। যখন তাঁহার বয়স দুই বৎসর তখন হযরত হালীমা তাঁহাকে তাঁহার জননী হযরত আমিনার নিকট লইয়া গেলেন। আমিনা প্রিয় পুত্রের সোনালী দেহ এবং উজ্জ্বল চেহারা মুবারক দেখিয়া যারপরনাই মুগ্ধ হইলেন। তিনি হালীমার প্রতি অতি সন্তুষ্ট হইলেন এবং আল্লাহ্র হাজার হাজার শোকর গুযারী করিলেন। এই সময়ে মক্কা নগরীতে সংক্রামক রোগের ভয়ানক প্রাদুর্ভাব ছিল। এইজন্য আমিনা পুত্রকে আরও কতক দিন হালীমার তত্ত্বাবধানে রাখিয়া দেওয়াই সমীচীন মনে করিলেন। সুতরাং হালীমা আমিনার আদেশে পুনরায় তাঁহাকে লইয়া স্বগৃহে ফিরিলেন"।
"হযরত দুই বৎসর বয়স পর্যন্ত হালীমার স্তন্য পান করিয়াছিলেন। তৎপর জননীর দর্শন লাভ করিয়া পুনরায় হালীমার সাথে ফিরিয়া আসিলেন। আবার তিনি প্রকৃতির কোলে লালিত-পালিত হইতে লাগিলেন। শায়মা, আবদুল্লাহ ইত্যাদি ভ্রাতা-ভগ্নিগণ তাঁহাকে পুনরায় পাইয়া অত্যন্ত আনন্দিত হইলেন। হযরতের চরিত্র-মাধুর্যে তাহারা সকলেই তাঁহার প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত হইয়া পড়িলেন। উপরে সুনীল স্বচ্ছ আকাশ, নিম্নে বিস্তৃত মুক্ত প্রান্তর, অদূরে স্তব্ধ মৌন নগ্ন পর্বতমালা, মাঝে মাঝে উপত্যকা ও অধিত্যকার বিচিত্র সমাবেশ। প্রকৃতির এই বিচিত্র লীলাভূমিতে ভাই-বোনদের সাথে আমোদ-প্রমোদের ভিতর দিয়া হযরতের শৈশব জীবন অতিবাহিত হইতে লাগিল। তিনি ক্রমশ বর্ধিত হইতে লাগিলেন"।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00