📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শিশু মুহাম্মাদ (স) উপলক্ষে পরিলক্ষিত বরকতসমূহ

📄 শিশু মুহাম্মাদ (স) উপলক্ষে পরিলক্ষিত বরকতসমূহ


প্রাচীন ইতিহাসের প্রমাণ্য গ্রন্থাবলীতে হালীমা সা'দিয়া কর্তৃক শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে গ্রহণের পর তাঁহার মধ্যে অসংখ্য বরকত তথা হালীমা সা'দিয়া-র বুক দুধে ভরপুর হওয়া, শিশুদের ক্রন্দনহীন রাত যাপন, উটনী ও বকরীর পালান ভর্তি দুধ, স্বামী-স্ত্রী ও অন্যান্যদের নিশ্চিন্ত নিদ্রাগমন, গাধার শক্তিবৃদ্ধি ও ক্ষিপ্র গতিতে চলা, পশুদের তৃপ্তি সহকারে আহার গ্রহণ, গাণিতিক হারে শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর শারীরিক বর্ধিষ্ণুতা ইত্যাদি বর্ণনা পরিলক্ষিত হয়।
এই প্রসঙ্গে ইবন হিশাম ইবন ইসহাকের সুদীর্ঘ উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করেন, হালীমা বলেন: আমি শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে গ্রহণ করিয়া কাফেলার কাছে ফিরিয়া আসিলাম। তাঁহাকে কোলে নিতেই আমার বুক দুধে পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। শিশু মুহাম্মাদ (স) এবং তাঁহার ছোট দুইভাই তৃপ্তির সাথে দুধ পান করিল এবং উভয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাইয়া পড়িল। অথচ ইতোপূর্বে আমরা কখনও এত সহজে বিশ্রাম করিতে পারি নাই। আমার স্বামী আমাদের উটনীর কাছে গিয়া দেখিতে পাইলেন যে, উহার পালানও দুধে ভরপুর হইয়া গিয়াছে। তিনি উহা হইতে প্রচুর পরিমাণে দুধ দোহন করিলেন। আমরা উভয়ে তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করিলাম। ইহার পর নিশ্চিন্ত মনে শান্তিতে রাত্রিযাপন করিলাম। হালীমা বলেন, আমার স্বামী খুব ভোরে জাগ্রত হইয়া বলিলেন, "মহান আল্লাহ্র কসম! ওহে হালীমা, তুমি জানিয়া রাখ, নিশ্চয় আমরা এক বরকতময় মহান শিশুকে গ্রহণ করিয়াছি।" উত্তরে হালীমা বলেনঃ আমিও তো অনুরূপ মনে করিতেছি। অতঃপর তিনি বলেন, আমরা রওয়ানা হইলাম এবং তাঁহাকে কোলে লইয়া গাধার পিঠে আরোহণ করিলাম।
আল্লাহ্র শপথ! আমাদের বাহনটি এতই দ্রুতবেগে চলিতেছিল যে, অন্যান্য বাহনগুলিকে পিছনে ফেলিয়া দিয়াছিল। আমার সহযাত্রী মহিলারা বলিতে লাগিল, "হে আবূ যুওয়ায়ب-এর কন্যা! তোমার কি হইল? আমাদের জন্য একটুখানি অপেক্ষা কর। ইহা কি তোমার সেই গাধাটি নহে যাহার উপর তুমি আরোহণ করিয়া আসিয়াছিলে? আমি বলিলাম, আল্লাহ্র শপথ! ইহা তো সেই গাধাটিই। অতঃপর তাহারাও মহান আল্লাহ্র শপথ উচ্চারণ করিয়া বলিলেন, নিশ্চয় বাহনটির কোন বিশেষ অবস্থা হইয়াছে। হালীমা বলেন, অতঃপর আমরা নিজ নিজ ঘরে পৌছিলাম। শুষ্ক ও অনুর্বরতার দিক হইতে আমাদের এই অঞ্চলের ভূমির মত আল্লাহ্ যমীনে দ্বিতীয় আর কোন ভূমি আছে কিনা তাহা আমাদের জানা ছিল না। কিন্তু ইহার পরও আমাদের পশুগুলি তৃপ্তি সহকারে আহার করিয়া বাসায় ফিরিয়া আসিত। আমরা প্রচুর পরিমাণে দুধ দোহন করিতাম এবং তৃপ্তির সহিত উহা পান করিতাম। অথচ সম্প্রদায়ের লোকেরা তাহাদের পশুগুলির এক ফোটাও দুধ দোহন করিতে পারিত না, এমনকি উহাদের পালানেও দুধ মিলিত না।
সম্প্রদায়ের লোকেরা তাহাদের রাখালদের বলাবলি করিত, "ধিক তোমাদের! আবু যুওয়ায়ب-এর কন্যার রাখাল যেখানে তাহাদের পশুগুলি চরাইয়া থাকে সেখানে তোমাদের পশুগুলি চরাইতে পার না?" অতঃপর তাহারা তাহাদের পশুগুলি আমাদের পালের সহিত চরাইতে আরম্ভ করিল। কিন্তু তাহাদের পশুগুলি ক্ষুধার্ত অবস্থায়ই ফিরিয়া আসিত। এক ফোঁটা দুধও মিলিত না। অথচ আমাদের পশুগুলি পেট পূর্ণ করিয়া ও দুধভরা পালান নিয়া ফিরিয়া আসিত।
এভাবেই আমরা মহামহিমান্বিত রব্বুল 'আলামীনের পক্ষ হইতে উত্তরোত্তর কল্যাণ ও সমৃদ্ধি লাভ করিতে লাগিলাম। দেখিতে দেখিতে দুই বৎসর অতিবাহিত হইয়া গেল এবং আমি শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে দুধ ছাড়াইলাম। তিনি অন্যান্য শিশুদের চেয়ে দ্রুত গতিতে বাড়িয়া উঠিতে লাগিলেন। দুই বৎসরেই তিনি সুস্বাস্থ্য ও সুঠাম দেহের অধিকারী হইয়া উঠিলেন। হালীমা সা'দিয়া-র বুকের দুধের বরকত প্রসঙ্গে সুয়ূতী আরও উল্লেখ করেন যে, দুধে এমন বরকত হইয়াছিল যে, যদি তাহাদের উভয়ের সহিত তৃতীয় কোন দুধপানকারী শিশু থাকিত নিঃসন্দেহে সেও পূর্ণ তৃপ্তি সহকারে দুধ পান করিতে পারিত।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর ইনসাফবোধ

📄 শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর ইনসাফবোধ


'আর-রাওদুল্ উনুফ'- এ উল্লিখিত হইয়াছে যে, হালীমা সা'দিয়া উল্লেখ করেন, যখনই আমি শিশু মুহাম্মাদ (স)-কে দুধ পান করাইবার জন্য কোলে নিতাম এবং তাঁহার কাছে উভয় স্তন পেশ করিতাম যেন তিনি তাঁহার পছন্দমত দুধ পান করিতে পারেন, তিনি তৃপ্তি সহকারে দুধপান করিতেন এবং একই সাথে তাঁহার দুধভাইও পরিতৃপ্তি সহকারে দুধ পান করিতেন। ইবন ইসহাক ব্যতীত সকল ঐতিহাসিক উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলে কারীম (স) কখনও মা হালীমা আস্-সা'দিয়া-র একটি স্তন ছাড়া অন্যটি গ্রহণ করিতেন না। অথচ তিনি তাঁহার জন্য দ্বিতীয় স্তনটিও পেশ করিতেন। কিন্তু মুহাম্মাদ (স) উহা গ্রহণ করিতেন না, যেন তিনি পূর্ণভাবে এই কথা অনুভব করিতেন ও জানিতেন যে, হালীমার দুধ মুবারকে তাঁহার সহিত আরও অংশীদার রহিয়াছে। সত্যিই তিনি ছিলেন সত্য, ন্যায় তথা ইন্সাফ-এর প্রতীক এবং অংশীদারের অংশ প্রদানে আজন্ম ন্যায়বিচার ও সমমর্মিতার তুলনাহীন প্রতীক।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর যবানীতে উচ্চারিত প্রথম কাব্য

📄 শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর যবানীতে উচ্চারিত প্রথম কাব্য


` এই প্রসঙ্গে আস্-সুয়ূতী উল্লেখ করেন, ইমাম বায়হাকী ও ইব্‌ন আসাকির ইব্‌ন আব্বাস সূত্রে বর্ণনা করেন, হালীমা সা'দিয়া প্রায়ই আলোচনা করিতেন যে, যখন রাসূলে কারীম (স) দুধ পান ছাড়িয়া কথাবার্তা বলিতে আরম্ভ করিলেন তখন শিশু মুহাম্মাদ (স)-এর যবান মুবারক হইতে প্রথম এই কাব্যটি উচ্চারিত হয়: اللَّهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا - وَسُبْحَانَ اللَّهِ بُكْرَةً وَأَصِيْلاً. "আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ মহিমান্বিত, অজস্র প্রশংসা শুধুমাত্র তাঁহারই জন্য। তিনি কতইনা পাক-পবিত্র, যাঁহার পবিত্রতা-গুণকীর্তন সকাল-সন্ধ্যায় সব সময় করা হয়।"
এটাই ছিল মুহাম্মাদ (স)-এর সর্বপ্রথম বাক্য।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হালীমার গৃহে অবস্থানকালে তাঁহার কার্যক্রম

📄 হালীমার গৃহে অবস্থানকালে তাঁহার কার্যক্রম


মুহাম্মাদ ইবন সা'দ উল্লেখ করিয়াছেন যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) হালীমা সা'দিয়ার গৃহে সুদীর্ঘ ৪ বৎসর লালিত-পালিত হইয়াছিলেন। এই সময় মেষ চরাইতে তিনি তাঁহার দুধভাই-বোনের সহিত গ্রাম-পল্লীর অনতিদূরে আসা-যাওয়া করিতেন। রাসূলে কারীম (স) পরবর্তীকালে অনেক সময় শিশুকালের পশুচারণের কথা আনন্দের সহিত আলোচনা করিতেন। এই প্রসঙ্গে ইবন সা'দ হযরত জাবির ইব্‌ন 'আব্দুল্লাহ (রা) বরাতে উল্লেখ করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, একবার আমরা নবী কারীম (স)-এর সহিত মাঠে গিয়াছিলাম। আমরা জঙ্গল হইতে কিবাছ (কাবাছ) নামীয় এক প্রকার ফল ছিড়িয়া খাইতে আরম্ভ করিলাম। তখন তিনি আমাদিগকে বলিলেন: তোমরা সর্বাধিক কালো ফলগুলি আহরণ কর। কেননা ঐ ফলগুলিই বেশী সুস্বাদু। আমি শিশুকালে যখন মেষ চরাইতাম তখন কালো ফলগুলি গ্রহণ করিতাম। আমরা বিস্মিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি মেষ চরাইয়াছেন? তিনি বলিলেনঃ হাঁ, প্রত্যেক নবীই মেষ চরাইয়াছেন।
হযরত মুহাম্মাদ (স) শিশুকাল হইতে খেলাধূলার প্রতি বিমুখ ছিলেন, এমনকি তিনি ক্রীড়ামোদীদের নিকট হইতে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখিতেন। এই প্রসঙ্গে আস্-সুয়ূতী ইমাম বায়হাকী ও ইবন 'আসাকির-এর সুদীর্ঘ উদ্ধৃতি উল্লেখ পূর্বক বলেন, যখন তিনি (স) কিছু চলাফেলা করিতে আরম্ভ করেন তখন মাঝে মাঝে বাহিরে যাইতেন এবং ঐ সমস্ত বাচ্চাদের প্রতি লক্ষ করিতেন যাহারা খেলাধূলা করিত। কিন্তু তিনি তাহাদের সংশ্রব হইতে দূরে থাকিতেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00