📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর আকীকা

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর আকীকা


রাসূলুল্লাহ (স)-এর 'আকীকাতে কুরায়শদের মাঝে ইহার ব্যাপক প্রচলন ছিল। তবে উহার প্রকৃতি ও স্বরূপ ছিল বিভিন্ন রকমের। ইসলাম-পূর্ব যুগে আকীকা উৎসব ছিল অন্যান্য উৎসবসমূহের অন্যতম। আকীকা উপলক্ষ্যে তৎকালীন আরব সমাজে বিভিন্ন কুসংস্কার প্রচলিত ছিল। তবে ইহার প্রকৃতি ও স্বরূপ ছিল বিভিন্ন রকমের। রাসূলুল্লাহ (স)-এর আকীকা প্রসঙ্গে প্রামাণ্য ও প্রাচীন ঐতিহাসিক সীরাত গ্রন্থসমূহে বিস্তারিত কোন মতামত পাওয়া যায় না। তবে আকীকা ও তৎসংশ্লিষ্ট যাবতীয় প্রাপ্ত তথ্যাবলী ধারাবাহিকভাবে লিপিবদ্ধ হইল:
'আকীকা ইবরাহীম (আ)-এর সুন্নাত। তৎকালীন আরব সমাজে ইহার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এই প্রসঙ্গে দাইরা মা'আরিফ ইসলামিয়্যা-এ উল্লেখিত হইয়াছে যে, আকীকা ইব্রাহীম (আ)-এর সুন্নাত মুতাবিক সমগ্র আরব জাহানে বিশেষ করিয়া মক্কার কুরায়শদের মধ্যে ইহার ব্যাপক প্রচলন ছিল। এই প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ-এ বর্ণিত হইয়াছে যে, "প্রকৃত প্রস্তাবে খতনা, যবেহ (কুরবানী) প্রভৃতি ইবরাহীমী প্রথার ন্যায় 'আকীকাও একটি প্রাচীন প্রথা। ইহা ছিল প্রাচীন আরবের একটি প্রসিদ্ধ উৎসব। এই প্রসঙ্গে আরো বর্ণিত হইয়ছে: Doughty-র মতে (Travels in Arabian deserta, ১খ., ৪৫২) আকীক আরব ভূমিতে সর্বাধিক অনুষ্ঠিত উৎসবসমূহের অন্যতম।
'আকীকার পরিচয় প্রসঙ্গে দাইরা মা'আরিক ইস্লামিয়্যা-এ বর্ণিত হইয়াছে, 'আকীকা এমন এক কুরবানীর নাম যাহা সন্তান জন্মের সপ্তম দিবসে করা হইয়া থাকে। ইহা বিভিন্ন অর্থেও ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যেমন, "সন্তান ভূমিষ্ঠ হইবার সময় তাহার মাথায় যে চুল থাকে, সেইগুলিকেও আকীকা (কর্তনযোগ্য) বলা হইয়া থাকে। কেননা উহা কাটিয়া ফেলা হয় অর্থাৎ ঐ চুলগুল কাটার যোগ্য বিধায় উহাকে আকীকা বলা যায়। আবার কখনো সন্তান জন্মের ধারাবাহিকতায় যবেহকৃত পশুকেও আকীকা বলা হয়।
তবে শরীআতের পরিভাষায়: আকীকা এমন সুন্নাত কুরবানীকে বলা হইয়া থাকে, যাহা সাধারণত সন্তান ভূমিষ্ঠ হইবার সপ্তম দিবসে করা হইয়া থাকে। নবজাতকের নামকরণ ও কেশমুণ্ডন উপলক্ষে পশু কুরবানীর নাম 'আকীকা।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর আকীকা প্রসঙ্গে কাযী মুহাম্মাদ সুলায়মান তাঁহার সীরাত গ্রন্থে উল্লেখ করেন: “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিব নিজেই দীর্ঘকাল যাবত অনাথ জীবনের মুখামুখি হইয়াছিলেন। তাঁহার ৪৪ বৎসর বয়সের প্রিয়তম সন্তান আবদুল্লাহ্ ঔরসে ভূমিষ্ঠ নবজাতকের আগমনী সংবাদ শ্রবণ করিবা মাত্রই ঘরে আসিলেন এবং নবজাতক শিশুকে খানায়ে কা'বাতে নিয়া যান। তথায় এই ইয়াতীম-অনাথ শিশুর জন্য প্রাণ খুলিয়া দু'আ করিয়াছিলেন। জন্মের সপ্তম দিবসেই দাদা 'আব্দুল মুত্তালিব কুরবানী দিয়াছিলেন এবং এই সময় সকল কুরায়শকে দাওয়াত করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভজন্মের সপ্তম দিবসেই 'আব্দুল মুত্তালিব তাঁহার নামে আকীকা দিয়াছিলেন এবং কুরায়শ গোত্রের সকলকে দাওয়াত করিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে ইদ্রীস কান্ধলবী তাঁহার সীরাত গ্রন্থে আরো উল্লেখ করেন, "হাফিজ ইব্‌ন 'আব্দুল বার লিখিত 'ইসতীআব'-এর উদ্ধৃতিতে যুরকানী এই সকল বর্ণনা ইমাম মালিক-এর ব্যাখ্যায় ইবন 'আব্বাসের রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু ইব্‌ন 'আব্বাসের বর্ণনায় শুধুমাত্র 'আকীকার কথা উল্লেখ রহিয়াছে। উহাতে "সপ্তম দিবস" এবং "দাওয়াত"-এর বর্ণনা উল্লেখ নাই। তবে এই প্রসঙ্গে ইমাম সুয়ূতী ইমাম বায়হাকী ও ইব্‌ন 'আসাকির-এর উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক বিষয় দুইটি আল্- খাসাইসুল কুবরা-এ উল্লেখ করিয়াছেন।
কোন কোন বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (স)-এর আকীকা নবুওয়াতের পরে তিনি নিজে করিয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়। এই প্রসঙ্গে হাফিজ ইব্‌ন কায়্যিম উল্লেখ করেন, "ইব্‌ন আয়মান হযরত আনাস (রা) হইতে রিওয়ায়াত করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) নবুওয়াত লাভ করিবার পর স্বয়ং তাঁহার পক্ষ হইতে আকীকা করিয়াছিলেন।" এই প্রসঙ্গে ইমাম আবূ দাউদ (র) ভিন্ন বর্ণনা সূত্রে অনুরূপ একটি হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। তবে ইমাম আহমাদ বলেন, উহা মুনকার পর্যায়ের বর্ণনা। বর্ণনাকারী 'আব্দুল্লাহ ইবন মুহাররম দুর্বল গুণসম্পন্ন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আকীকার পশু

📄 আকীকার পশু


রাসূলুল্লাহ (স)-এর 'আকীকাতে কোন ধরনের পশু যবেহ করা হইয়াছিল এবং ইহার সংখ্যা সম্পর্কে প্রামাণ্য ও প্রাচীন ঐতিহাসিক এবং সীরাতগ্রন্থসমূহে সুস্পষ্ট কোন আলোচনা পাওয়া যায় না। তবে রাসূলুল্লাহ (স)-এর 'আকীকা ও তৎসম্পর্কীয় যাবতীয় বর্ণনা হইতে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর আকীকায় অনেকগুলি উট কুরবানী করা হইয়াছিল এবং এই পশুগুলিকে আব্দুল মুত্তালিবই যবেহ করিয়াছিলেন।
সন্তান জন্মগ্রহণের পর মাতা-পিতা বা অভিভাবকদের একটি বিশেষ কর্তব্য হইতেছে, জন্মের ৭ম, ১৪তম বা ২১তম দিবসে আকীকা করা যাহাতে শিশুর শারীরিক, মানসিক প্রভৃতি প্রবৃদ্ধি কল্যাণের সাথে অব্যাহত থাকে এবং বিভিন্ন প্রকার অশুভ প্রভাব হইতে মুক্ত থাকে। ইসলামী সমাজে ইহা শুধুমাত্র স্বীকৃত নয়, বরং মিল্লাতে ইব্রাহীম-এর সুন্নাত। কালের আবর্তে বিভিন্ন ইবাদাতের মধ্যে নির্ভেজাল তাওহীদের পরিবর্তে অনেক শিরক-কুফর-বিদআত প্রভৃতি অনুপ্রবেশ ঘটে। আকীকার মত খালিস ইবাদতের মধ্যেও যবেহকৃত পশুর তাজা রক্ত নবজাতকের মাথার তালুতে মাখা হইত। এই প্রসঙ্গে হযরত কাতাদা (রা)-এর রিওয়ায়াত পাওয়া যায়। ইব্‌ন কায়্যিম আল্-জাওযিয়্যা তাঁহার যাদুল-মা'আদ-এ উল্লেখ করেন, হাম্মাম বলিয়াছেন যে, কাতাদা (রা)-কে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল যে, তিনি কিভাবে রক্ত মাখাইতেন? তিনি বলেন, পশু যবেহ করা মাত্রই উহা হইতে তাজা রক্ত সংগ্রহ করা হইত। তারপর উহা নবজাতকের মাথার তালুতে ভালভাবে মাখানো হইত, এমনকি ঐ তাজা রক্ত চিকন সুতার ন্যায় সূক্ষ্ম ধারায় গড়াইয়া পড়িত। অবশেষে নবজাতকের মস্তক ভালভাবে ধৌত করা হইত এবং উহার কেশ মুণ্ডন করা হইত।
বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রাপ্ত তথ্য হইতে জানা যায় যে, তাদ্‌মিয়া (تدمية) অর্থাৎ 'তাজা রক্ত মাখানো" নিঃসন্দেহে জাহিলী যুগের সামাজিক রীতি। ইসলাম ইহাকে চিরদিনের জন্য নিষিদ্ধ করিয়াছে। কোন কোন সাহাবী উক্ত রক্তের পরিবর্তে জাফরান মাখাইতেন। এই প্রসঙ্গে ইব্‌নুল কায়্যিম উল্লেখ করেন, এই প্রসঙ্গে আবূ দাউদ-এ উল্লিখিত বুরায়দা ইবনুল হুসায়ব-এর রিওয়ায়াতটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, জাহিলী যুগে আমাদের কাহারো সন্তান জন্মগ্রহণ করিলে আমরা বকরী যবেহ করিতাম এবং উহার রক্ত শিশুর মাথায় মাখাইয়া দিতাম। অতঃপর আল্লাহ তা'আলা আমাদের ইসলাম দান করিলেন। আমরা বকরী যবেহ করিতাম, নবজাতকের মাথার কেশ মুণ্ডন করিতাম এবং রক্তের পরিবর্তে জাফরান মাখাইয়া দিতাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00