📄 মুহাম্মাদ (স) ও আত্মাদ (আ) নাম ইলহাম সূত্রে প্রাপ্ত
'মুহাম্মাদ' নামটি ঐশী ইঙ্গিতেই রাখা হইয়াছিল। এই প্রসঙ্গে উর্দু দাইরা মা'আরিফ ইসলামিয়্যা-এ উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র নাম “মুহাম্মাদ” ইলহামী সূত্রে রাখা হইয়াছে। সায়্যিদা আমিনা 'মুহাম্মাদ' নামটি ইলহাম সূত্রে আদিষ্ট হইয়া রাখিয়াছিলেন। এই মর্মে ইন্ন সায়্যিদিন্-নাস তাঁহার 'উয়ূনুল্-আছার গ্রন্থে ইন্ন ইসহাক-এর উদ্ধৃতিতে সায়্যিদা আমিনার বর্ণনা এইভাবে উল্লেখ করেন: আমি যখন তাঁহাকে গর্ভে ধারণ করি তখন কেহ আমাকে বলিল, নিঃসন্দেহে তুমি এই উম্মতের সরদার গর্ভে ধারণ করিয়াছ। সুতরাং তাঁহার নাম 'মুহাম্মাদ' (مُحَمَّد) রাখিও।
কোন কোন বর্ণনায় সায়্যিদা আমিনার পরিবর্তে 'আবদুল মুত্তালিব-এর কথা উল্লিখিত হইয়াছে এবং তিনিই 'মুহাম্মাদ' নাম রাখিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে ইব্ন সায়্যিদিন্ নাস তাঁহার সীরাত গ্রন্থে আবূর-রাবী ইবন সালিম-এর উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন: 'আব্দুল মুত্তালিবই তাঁহার নাম 'মুহাম্মাদ' রাখিয়াছিলেন, যেহেতু তিনি এই প্রসঙ্গে একটি স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন। স্বপ্নটি ছিল এইরূপ: 'আব্দুল্ মুত্তালিবের পৃষ্ঠদেশ হইতে এমন একটি উজ্জ্বল শিকল প্রকাশিত হইয়াছিল, যাহার এক প্রান্ত আকাশে এবং অন্য পান্ত ছিল ভূপৃষ্ঠে। ইহা ছাড়া আরেক প্রান্ত ছিল পূর্ব দিগন্তে এবং অন্যটি ছিল পশ্চিম দিগন্তে। কিছুক্ষণের মধ্যে ঐ আলোকোজ্জ্বল শিকলটি একটি সুবিশাল বৃক্ষে রূপান্তরিত হইয়াছিল, যাহার প্রতিটি পাতা-পল্লবে এমন এক নূর বা জ্যোতি শোভা পাইতেছিল যাহা সূর্যের জ্যোতি হইতেও সত্তর গুণ তেজোদ্দীপ্ত ছিল। প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সকল মানবজাতি উহার ডালপালাকে আকড়াইয়া ধরিয়াছিল, এমনকি কুরায়শ সম্প্রদায়ের কিছু সংখ্যক লোক ব্যতীত সকলেই উহা অনুরূপভাবে ধরিয়া রাখিয়াছিল। কিন্তু কিছু সংখ্যক মানুষ উহাকে বারবার কাটিয়া ফেলিবার চেষ্টা করিতেছিল। যখনই তাহারা উক্ত বৃক্ষ কাটিবার উদ্দেশে অগ্রসর হইতেছিল তখনই একজন সুদর্শন শক্তিশালী যুবক তাহাদিগকে প্রবলভাবে বাধা দিতেছিল। স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারিগণ 'আব্দুল মুত্তালিবকে ইহার ব্যাখ্যা এইভাবে দিয়াছিলেন যে, আপনার বংশে এমন এক মহান সন্তানের শুভাগমন হইবে, প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সকলেই তাঁহার অনুকরণ-অনুসরণ করিবে, এমনকি আসমান ও যমীনবাসীরা তাঁহার প্রশংসা ও গুণ বর্ণনা করিবে। এই কারণেই 'আব্দুল মুত্তালিব তাঁহার এই শিশু সন্তানের নাম 'মুহাম্মাদ' রাখিয়াছিলেন। নামকরণ প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ ইদরীস কান্ধলবী তাঁহার সীরাত-এ আর-রাওদুল্ উনুফ-এর উদ্ধৃতিতে আরো উল্লেখ করেন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মের পূর্বেই দাদা 'আবদুল মুত্তালিব একটি স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন, যাহাতে 'মুহাম্মাদ' নাম রাখার ব্যাপারে প্রেরণা ছিল।
'আকীকার ভোজন উৎসবে উপস্থিত কুরায়শ সম্প্রদায় কর্তৃক সদ্য নবজাতক শিশুর নামকরণ সম্পর্কীয় প্রশ্নের জবাবে 'আব্দুল মুত্তালিবের যবানীতে জানা যায় যে, তিনিই তাঁহার নাম 'মুহাম্মাদ' রাখিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে ইব্ন কাছীর (র) তাঁহার সীরাত-এ উল্লেখ করেন, জন্মের সপ্তম দিবসে 'আবদুল মুত্তালিব 'মুহাম্মাদ' (স)-এর 'আকীকা উপলক্ষ্যে কুরায়শদের সকলকে দাওয়াত করিয়াছিলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর তাহারা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে 'আবদুল মুত্তালিব! যে সন্তানের বদৌলতে আপনি আমাদিগকে সম্মানিত করিয়াছেন তাঁহার কি নাম রাখিয়াছেন? উত্তরে 'আবদুল মুত্তালিব বলেন, আমি তাঁহার নাম 'মুহাম্মাদ' রাখিয়াছি। অতঃপর তাহারা বলিলেন, তাঁহার বংশের প্রচলিত নামগুলির পরিবর্তে আপনি কেন এই নাম রাখিয়াছেন? তিনি বলেন, আমি আশা করিতেছি যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানেও তাঁহার প্রশংসা প্রতিষ্ঠিত করিবেন, এমনকি সমগ্র ভূপৃষ্ঠে তাঁহার অনুপম আখলাকের প্রসার ঘটাইবেন।
কোন কোন বর্ণনায় 'আব্দুল মুত্তালিব এবং সায়্যিদা আমিনার পরিবর্তে 'আব্দুল মুত্তালিব পরিবারকে মুহাম্মাদ নাম রাখার ব্যাপারে ইলহাম-এর মাধ্যমে অবহিত করানো হইয়াছিল। এই প্রসঙ্গে ইব্ন কাছীর (র) উল্লেখ করেন, কোন কোন 'আলিম বলিয়াছেন, মহান রব্বুল 'আলামীন 'আবদুল মুত্তালিব পরিবারকে ইলহামের মাধ্যমে অবগত করাইয়াছিলেন তাঁহার নাম মুহাম্মাদ রাখিতে। কেননা তাঁহার মধ্যে সকল প্রশংসনীয় গুণরাজির সমাবেশ ঘটিয়াছে।
'আহমাদ' (احمد) নামটিও ঐশী ইঙ্গিতেই রাখা হইয়াছিল। এই প্রসঙ্গে ইব্ন সা'দ (র) তাহার তাবাকাত-এ আবূ জাফর মুহাম্মاد ইবন 'আলীর রিওয়ায়াতটি এইভাবে উল্লেখ করেন, সায়্যিদা আমিনা যিনি মহামহিমান্বিত রব্বুল আলামীন-এর মহান রাসূলের গর্ভধারিণী ছিলেন, তিনি তাঁহার নাম 'আহমাদ' রাখিতে আদিষ্ট হইয়াছিলেন।
কোন কোন রিওয়ায়াত অনুযায়ী উভয় নামই ঐশী ইঙ্গিতে রাখা হইয়াছিল। এই প্রসঙ্গে আস্-সুয়ূতী তাঁহার আল্-খাসাইসুল্ কুরা-এ হযরত বুরায়দা (রা) ও ইবন 'আব্বাস (রা)-এর রিওয়ায়াত আবূ নু'আয়ম-এর সনদ-পরম্পরায় উল্লেখ করেন। সায়্যিদা আমিনা স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন যে, কেহ যেন তাঁহাকে উপদেশ দিতেছেন, আপনি সৃষ্টিজগতের সর্বোত্তম মহামানব এবং জগতকুল শিরোমণিকে গর্ভে ধারণ করিয়াছেন। অতঃপর তিনি যখন ভূমিষ্ট হইবেন তখন তাঁহার নাম 'আহমাদ' ও 'মুহাম্মাদ' রাখিবেন।
📄 মুহাম্মাদ (স) ও আহমাদ (আ) নামের তাৎপর্য বিশ্লেষণ
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর মুবারক নাম 'মুহাম্মাদ' ও 'আহমাদ' 'হাম্দ' (حمد) ধাতুমূল হইতে উৎপত্তি হইয়াছে। ইহার ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হইল: কাহারো আখলাকে হাসানা, প্রশংসনীয় গুণাবলী, পূর্ণাঙ্গ সৌন্দর্যাবলী, শ্রেষ্ঠ মর্যাদাবলী এবং পুণ্যময় কর্মকে গভীর ভালবাসা, নিখুঁত বিশ্বাস ও মাহাত্মের সহিত বর্ণনা করা।
'মুহাম্মাদ' (محمد) শব্দের উৎপত্তি ও ইহার অর্থ প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে, 'মুহাম্মাদ' তাহমীদ (تحميد) শব্দমূল হইতে উৎপত্তি হইয়াছে। এই বাবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হইতেছে, অর্থের আধিক্য প্রকাশ করা এবং পুনপুন ব্যবহার। محمد শব্দটি ইস্ম মাফ্ফ'উল বা কর্মবাচক বিশেষ্য। ইহার উদ্দেশ্য হইতেছে, মুহাম্মাদ 'প্রশংসিত' এমন এক মর্যাদাবান সত্তা, যাঁহার পূর্ণাঙ্গতা, সত্তাগত বৈশিষ্ট্য এবং মৌলিক প্রশংসাবলীকে বিশুদ্ধ আকীদা ও ভালবাসার সহিত বেশী বেশী এবং বারবার বর্ণনা করা। মুহাম্মাদ নামের অন্য একটি অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এই রকম যে, তিনি এমন এক গৌরবান্বিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী সত্তা যাঁহার মধ্যে প্রশংসনীয় সকল অভ্যাস এবং অনুপম গুণাবলী ও আদর্শসমূহ পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান থাকে।
নাদরাতুন নাঈম-এ উল্লিখিত হইয়াছে, যদি বাবে তা'ঈল-এর মাসদার হইতে اسم فاعل বা কর্তৃবাচক বিশেষ্য পদ গঠিত হয়, তখন তাহার অর্থ ইহবে, এমন ব্যক্তি যিনি কাজটি বারবার করেন। যেমন معلم শিক্ষক, مبین বর্ণনাকারী ইত্যাদি। পক্ষান্তরে যদি এই মাসদার হইতে اسم مفعول বা কর্মবাচক বিশেষ্য পদ গঠিত হয়, তখন অর্থ হইবে, যে ব্যক্তির দ্বারা কাজটি বারবার কৃত হয়। সুতরাং মুহাম্মাদ (স) শব্দের অর্থ দাঁড়ায় এমন সত্তা, প্রশংসাকারীরা বারবার যাঁহার প্রশংসা করেন অথবা যিনি বারবার প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। রাসূলুল্লাহ (স)-এর ব্যক্তিসত্তায় এই দুইটি অর্থই যথার্থভাবে বিদ্যমান। তিনি বারবার প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য এবং প্রংসাকারীরাও বারবার তাঁহার প্রশংসা করে।
'আহ্মাদ' (أحمد) শব্দটি ইসমে তাফযীল বা গুণের আধিক্য প্রকাশক বিশেষ্য পদ। অধিকাংশ অভিধানবিদের মতে ইহা ইম্মে ফা'ঈল বা কৃর্তবাচক বিশেষ্যরূপে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। তবে কোন কোন অভিধানবিদের মতে ইহা ইম্মে মাফ'উল বা কর্মবাচক বিশেষ্য অর্থেও ব্যবহৃত হয়। যদি ইহা 'ইম্মে ফা'ঈল' বা কৃর্তবাচক বিশেষ্য পদ-এর শব্দরূপে ব্যবহৃত হয়, তখন অর্থ হইবে: তিনি সৃষ্টিজগতের সমগ্র সৃষ্টজীবের মধ্যে মহান আল্লাহ্র সর্বাধিক প্রশংসাকারী। আর ইহা যদি কর্মবাচক বিশেষ্য পদরূপে ব্যবহৃত হয়, তখন ইহার অর্থ হইবে যাঁহার সর্বাধিক প্রশংসা করা হইয়াছে।
মুহাম্মাদ ও আহমাদ এই উভয় নামের এক বিশেষ তাৎপর্য রহিয়াছে। এই প্রসঙ্গে ইন্ন সায়্যিদিন-নাস কাযী আবুল-ফল 'ইয়াদ (عياض)-এর উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন, "রাসূলুল্লাহ (স)-এর প্রসিদ্ধ নামদ্বয় 'মু মুহাম্মাদ' 'আহ্মাদ'-এর এক বিশেষ তাৎপর্য ও বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে। মহান আল্লাহ এই পবিত্র নাম দুইটিকে যুগ যুগ হইতে সংরক্ষণ করিয়া আসিতেছিলেন। যেমন আহমاد (احمد) এই পবিত্র নামটি মহান আল্লাহ পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে আলোচনা করিয়াছেন এবং সকল নবীকে এই নামে আগত একজন নবীর সুসংবাদ জানাইয়াছিলেন। ইহা ছাড়া মহান আল্লাহ সুকৌশলে উভয় নামে নামকরণ করা হইতে বিরত রাখিয়াছিলেন। এমনকি তাঁহার পূর্বে এই নামে অন্য কাহাকেও ডাকা হইত না। অনুরূপভাবে সমগ্র আরব জাহানে 'মু মুহাম্মাদ' নামেও কাহারো নামকরণ করা হইত না।
ইবনুল জাওযী তাঁহার সীরাত গ্রন্থে 'মু মুহাম্মাদ' নামকরণের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) যে নবীকুল শিরোমণি হইবেন, ইহার প্রাক-বৈশিষ্ট্যাবলীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে, তাঁহার পূর্বে কাহারো নাম 'মু মুহাম্মাদ' রাখা নাই। নিঃসন্দেহে ইহা মহান রব্বুল আলামীনের পছন্দনীয় ও সুসংরক্ষিত একটি নাম। ইয়াহ্ইয়া ইব্ যাকারিয়্যা (আ)-এর নামটি যেমনভাবে তিনি সংরক্ষিত করিয়া রাখিয়াছিলেন, তেমনি তাঁহার নামটিও বিশেষভাবে সংরক্ষিত করিয়াছিলেন।
আহমাদ (احمد) ও মুহাম্মাদ (محمد) নামের মধ্যে রহিয়াছে এক অনুপম সাদৃশ্য চমৎকার মিল। এই প্রসঙ্গে ইন্ন কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাঃ যাদুল-মা'আদ-এ উল্লেখ করেন:
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর 'আহমাদ' ও 'মু মুহাম্মাদ' নামের মধ্যে রহিয়াছে এক চমৎকার মিল ও অনুপম সাদৃশ্য। মুহাম্মাদ (محمد) নামে সকল প্রশংসিত গুণাবলীর আধিক্যের ব্যাপক সমাবেশ ঘটিয়াছে। আর 'আহমاد' নামের মধ্যে নিহিত আছে অন্যান্য সকল গুণাবলীর উপরে একক মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের একচ্ছত্র প্রভাব। ফলে উল্লিখিত নাম দুইটি একটি অন্যটির সহিত একাকার হইয়া গিয়াছে, যেমনটি ঘটিয়া থাকে দেহের সহিত প্রাণের।
📄 আল-কুরআনে মুহাম্মাদ ও আহমাদ নামের ব্যবহার
উপরিউক্ত আলোচনা ও পর্যালোচনায় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, সায়্যিদা আমিনা ও দাদা 'আব্দুল মুত্তালিব তাঁহাদের নবজাতক শিশু সন্তানের নাম অদৃশ্য ইঙ্গিতে আদিষ্ট হইয়া 'মু মুহাম্মাদ' ও 'আহমাদ' রাখেন। যদিও এই মুবারক নাম দুইটি উভয়েই রাখিয়াছিলেন তবুও পরবর্তীতে আল্লাহ রব্বুল 'আলামীন আল-কুরআনুল কারীমে কখনো আহমاد, কখনো মুহাম্মاد নামে উল্লেখ করিয়াছেন। আল-কুরআনুল কারীমে আহমাদ (احمد) নামে তাঁহাকে একবার উল্লেখ করা হইয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يُبَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَى مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي إِسْمُهُ أَحْمَدُ .
"স্মরণ কর, ইসা ইব্ন মারয়াম বলিয়াছিল: হে বনী ইসরাঈল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহ্র রাসূল এবং আমার পূর্ব হইতে তোমাদের নিকট যে তাওরাত রহিয়াছে, আমি-তাহার সমর্থক এবং আমার পরে 'আহমাদ' নামে যে রাসূল আসিবে, আমি তাহার সুসংবাদদাতা" (৬১:৬)।
অন্যদিকে মুহাম্মاد (محمد) নামে তাঁহাকে চার বার উল্লেখ করা হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে সূরা আল-আহযাবে ইরশাদ হইয়াছে:
مَا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِنْ رِجَالِكُمْ وَلَكِنْ رَّسُولُ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا .
"মুহাম্মاد তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নহেন, বরং তিনি আল্লাহ্র রাসূল এবং শেষনবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ" (৩৩: ৪০)।
ইহা ছাড়া সূরা আল-ইমরান (৩: ১৪৪), সূরা মুহাম্মاد (৪৭: ২) ও সূরা আল্-ফাতহ (৪৮: ২৯)-এ মুহাম্মাদ নাম উল্লেখিত হইয়াছে।
📄 মহানবী (স)-এর বিভিন্ন গুণবাচক নাম
রাসূলুল্লাহ (স)-এর অনেক গুণবাচক নাম রহিয়াছে। 'উলামা-ই কিরাম সেইগুলিকে তাঁহাদের গ্রন্থে বিভিন্নভাবে উল্লেখ করিয়াছেন এবং সেইসব নামের অর্থ ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিশ্লেষণ করিয়াছেন। ইমাম মুহাম্মاد ইব্ন ধূসুফ আস্-সালিহী আশ-শামী তাঁহার সীরাত গ্রন্থে উল্লেখ করেন : উলামা-ই কিরাম বলিয়াছেন, নামের আধিক্য নিঃসন্দেহে ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব, সুউচ্চ সম্মান ও তাঁহার সুমহান মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। এইজন্য আরব সমাজে একাধিক নামকরণ ও উহার সংরক্ষণের প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হইয়া থাকে। ইমাম নববী (র) বলেন, 'আলেমগণ রাসূলে কারীম (স)-এর অগণিত নামসমূহের মধ্যে যেগুলির আলোচনা করিয়াছেন, উহার অধিকাংশই গুণবাচক নাম। যেমন: আল-'আকিব, আল-হাশির ইত্যাদি। সুতরাং এই নামগুলি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয় অর্থাৎ এইগুলি গুণবাচক নাম। রাসূলে কারীম (স)-এর নামসমূহ দুই প্রকার। এক, এমন সকল নাম, যাহা তাঁহারই জন্য খাস, অন্য কোন নবীর ক্ষেত্রে এই নাম প্রযোজ্য নহে। যেমন হাদীছে বর্ণিত পাঁচটি নাম মুহাম্মাদ, আহমাদ, মাহী (নিশ্চিহ্নকারী), হাশির (সমবেতকারী), 'আকিব (শেষ আগমনকারী)। দুই, এমন সকল নাম যাহার অর্থ ও মর্মে অন্যান্য নবী-রাসূলগণও শরীক। যেমন রাসূলুল্লাহ, শাহিদ, নাবিয়্যু ইত্যাদি।
আল-কুরআনে উল্লিখিত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর বিভিন্ন গুণবাচক নাম প্রসঙ্গ : মুহাম্মাদুর-রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াত লাভের পরবর্তীতে মহান রব্বুল আলামীন আল-কুরআনুল কারীমে তাঁহাকে বিভিন্ন গুণবাচক নামে অভিহিত করিয়াছেন। প্রয়োজনানুযায়ী নানা স্থানে বিভিন্নভাবে তাঁহার প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হইয়াছে। কখনো ইশারা-ইঙ্গিতে, কখনো ঘটনা পরম্পরায়, কখনো পরিচয় জ্ঞাপক গুণবাচক নামে তাঁহার নাম উল্লেখিত হইয়াছে। যেমন: ১. বাশীর ও নাযীর
وَمَا أَرْسَلْتُكَ إِلا بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ .
"আমি তো আপনাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করিয়াছি, কিন্তু অনেক মানুষ উহা জানে না" (৩৪: ২৮)। ২. হারীস, রাউফ, রাহীম
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ مَا عَنِتُمْ حَرِيْصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رحيم .
“তোমাদের কাছে আসিয়াছেন তোমাদের মধ্য হইতে একজন রাসূল। তোমাদেরকে যাহা কিছু বিপন্ন করে, সেসব বিষয় তাঁহার জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও দয়ার্দ্র” (৯: ১২৮)।
৩. নবী, দা'ঈ, শাহিদ, মুবাশশির, সিরাম-মুনীরা:
يُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْتُكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا ، وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا يا
منيراً .
"হে নবী! আমি তো আপনাকে পাঠিয়াইছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে এবং মহান আল্লাহ্র আদেশে তাঁহার দিকে আহবানকারীরূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে” (৩৩: ৪৫-৪৬)।
৪. রহমাতুল্লিল্-'আলামীন
وَمَا أَرْسَلْتُكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَلَمِينَ .
"আমি তো আপনাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করিয়াছি" (২১:১০৭)।
৫. আল-মুদ্দাছছির
يأَيُّهَا الْمُدَّثَرَ قُمْ فَانْذِرْ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ .
“হে বস্ত্রাবৃত! আপনি উঠুন, সতর্ক করুন এবং আপন প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন। আপনার পোশাক পুতঃপবিত্র রাখুন এবং সকল প্রকার অপবিত্রতা হইতে দূরে থাকুন" (৭৪:১-৫)।
৬. আল-মুযযাম্মিল
يَأَيُّهَا الْمُزَّمِّلُ قُمِ اللَّيْلَ إِلَّا قَلِيلًا نِصْفَهُ أَوِ انْقُصْ مِنْهُ قَلِيلًا أَوْ زِدْ عَلَيْهِ وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ ترتيلاً .
"হে বস্ত্রাবৃত! রাত্রি জাগরণ করুন কিছু অংশ ব্যতীত। অর্ধরাত্রি কিংবা তদপেক্ষা অল্প অথবা তাহার চেয়ে বেশী এবং আল-কুরআন আবৃত্তি করুন ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে” (৭৩: ১-৪)।
অনুরূপ বিভিন্ন গুণবাচক নামে রাসূলে কারীম (স)-কে আল-কুরআনে সম্বোধন করা হইয়াছে।