📄 জন্ম সম্পর্কিত অলৌকিক ঘটনাবলী
আম্বিয়া আলায়হিমুস্ সালাম-এর জন্মগ্রহণকালীন মুহূর্ত হইতে প্রাক নবুওয়াত সময়ে কিছু কিছু বিস্ময়কর ও আশ্চর্যজনক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়, যেইগুলি মুহাদ্দিছগণের পরিভাষায় ইরহাসাত (إرهاصات) বলা হয়। সায়্যিদুল মুরসালীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণের মুবারক মুহূর্তে এই সম্পর্কীয় কিছু অলৌকিক ঘটনাবলীর বর্ণনা প্রামাণ্য ও প্রাচীন ঐতিহাসিক গ্রন্থাবলীতে পাওয়া যায়। হাফিজ ইবন হাজার 'আসকালানীর ফাতহুল বারীতে এই প্রসঙ্গে উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণকালীন সময়ে পারস্যের রাজপ্রাসাদে ফাটল দেখা দেয় ও উহার গম্বুজ ভূমিতে ধ্বসিয়া পড়ে, পারসিকদের মন্দিরের অগ্নি নির্বাপিত হইয়া যায় যাহা ইহার পূর্বে হাজার বৎসরে নির্বাপিত হয় নাই এবং সাওয়া নদী শুকাইয়া যায়।
মু মুহাম্মাদ ইদরীস কান্ধলাবী তাঁহার 'সীরাতুল-মুস্তাফা'-এ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করিয়াছেন, যে, ভোর বেলাতে পারস্য-সম্রাট ভীত-সন্ত্রস্থ হইয়া পড়িলেন। কিন্তু তাহার এই ভয়-বিহ্বল অবস্থা প্রকাশ না করিয়াই রাজপ্রাসাদের সভাসদদিগকে একত্র করিয়া আলাপ-আলাচনায় মগ্ন ছিলেন। ইতোমধ্যে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিসমূহ নির্বাপিত হওয়ার সংবাদ পৌঁছাইলে সম্রাট ইহাতে আরো চিন্তাগ্রস্ত হইয়া পড়িলেন। এইদিকে অগ্নিপূজারীদের প্রসিদ্ধ পুরোহিত মূবিযান (مویذان) বলিল, সেও এই রাত্রে একটি স্বপ্ন দেখিয়াছে, কিছু শক্তিশালী উট আরবের ঘোড়াগুলিকে টানিয়া লইয়া যাইতেছে। এমনকি ঐগুলি দিজলা নদী অতিক্রম করিয়া বিভিন্ন শহরে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। তারপর পারস্য সম্রাট মূবিযানের নিকটে ইহার ব্যাখ্যা জানিতে চাহিলে তিনি বলিলেন, হয়ত-বা আরবভূমি হইতে কোন প্রকার বিপদ আসিতে পারে। কিন্তু পারস্য সম্রাট কিছুতেই এতটুকু ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হইতে পারিলেন না। তাই তিনি নু'মান ইবনুল মুনযির-এর কাছে বার্তা পাঠাইলেন যে, সে যেন সম্রাটের কাছে এমন একজন বিজ্ঞ ব্যক্তিকে প্রেরণ করে যে সম্রাটের সকল প্রশ্নের জবাব দিতে সক্ষম হয়।
অতঃপর তিনি আবদুল মাসীহ আল-গাস্সানী নামীয় এক প্রবীণ ও খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিকে সম্রাটের নিকট প্রেরণ করিলেন। তিনি রাজদরবারে উপস্থিত হইলে সম্রাট তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি যে সকল বিষয় জিজ্ঞাসা করিব সে সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান আছে কি? উত্তরে 'আবদুল মাসীহ বলিলেন, জাঁহাপনা! আপনি প্রশ্ন করুন। যদি আমি ঐ বিষয়ে অবগত থাকি তাহা হইলে অবশ্যই উহার উত্তর দিব। অন্যথায় আমি এমন কোন বিজ্ঞ পণ্ডিতের সন্ধান দিব যিনি আপনার কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের জওয়াব দিতে সক্ষম হইবেন। সম্রাট কর্তৃক বিষয়টি জানিবার পরে আবদুল মাসীহ বলিলেন, আমার মামা 'সাতীহ' সম্ভবত এই সম্পর্কে আরো ভালভাবে উত্তর দিতে পারিবেন। তিনি শামদেশে বসবাস করেন।
অতঃপর সম্রাট 'আবদুল মাসীহকে ইহার সঠিক ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য জানিবার জন্য তাহার মামার নিকট পাঠাইলেন। তিনি তাহার মামার কাছে এমন সময় পৌছিলেন যখন তিনি অন্তিম শয্যায় শায়িত। 'আবদুল মাসীহ তাহাকে সালাম দিলেন এবং কবিতার কয়েকটি পংক্তি পাঠ করিয়া শুনাইলেন। 'আবদুল মাসীহ-এর কবিতা আবৃত্তি শুনিয়া "সাতীহ” তাহার দিকে ফিরিয়া তাকাইলেন এবং বলিলেন, 'হে আবদুল মাসীহ! তোমাকে বনূ সাসানের বাদশাহ আমার নিকট এইজন্য প্রেরণ করিয়াছেন যে, তাহার রাজপ্রাসাদ প্রকম্পিত হইয়াছে, প্রজ্বলিত অগ্নি নির্বাপিত হইয়াছে। আর পুরোহিত স্বপ্ন দেখিয়াছে যে, কিছু শক্তিশালী উট আরবীয় ঘোড়াগুলিকে দ্রুতবেগে তাড়াইয়া লইয়া যাইতেছে। হে আবদুল মাসীহ! তুমি ভালভাবে স্মরণ রাখ। যখন মহান আল্লাহর কালামের তিলাওয়াত অধিক হইতে থাকিবে, যষ্ঠিধারীর আবির্ভাব ঘটিবে এবং মাসাওয়া উপত্যকা প্রবাহিত হইবে, সাওয়া নদী শুকাইয়া যাইবে, আর পারসিকদের অগ্নিকুণ্ড নির্বাপিত হইয়া যাইবে তখন সাতীহের জন্য এই শাম অঞ্চল আর শাম থাকিবে না। পারস্য রাজপ্রাসাদ হইতে যতগুলি প্রাচীরের চূড়া ধ্বসিয়া পড়িয়াছে, বনী সাসান-এর অনুরূপ সংখ্যক নারী-পুরুষ পারস্য শাসন করিবে। আর যাহা কিছু সংঘটিত হইবার ছিল তাহা সংঘটিত হইয়া গিয়াছে। এই পর্যন্ত বলিয়াই সাতীহ মারা যায়।
ইহার পর 'আবদুল মাসীহ পারস্যে ফিরিয়া আসিলেন এবং সমস্ত ঘটনা সবিস্তারে খুলিয়া বলিলেন। বর্ণনা শুনিয়া সম্রাট কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, চৌদ্দজন শাসকের শাসনকাল কত বৎসর যাবত স্থায়ী হইবে? উত্তরে 'আবদুল মাসীহ বলিলেন, ইতোমধ্যে মাত্র ৪ বৎসরে দশজনের শাসনকাল শেষ হইয়া গিয়াছে। আর মাত্র ৪ জনের শাসনকাল অবশিষ্ট রহিয়াছে। সায়্যিদিনা 'উছমান (রা)-এর খিলাফাতকালে বাকীদের শাসনকালের চিরসমাপ্তি ঘটে। মুহাম্মাদ ইদরীস কান্ধলাবী, (সীরাতুল মুস্তাফা, রব্বানী বুক ডিপো দিল্লী, ১৯৮১ খৃ., ১খ, পৃ. ৫৫-৫৭; আরো বিস্তারিত বর্ণনার জন্য দ্র. ইব্ন সায়্যিদিন নাস, উয়ূনুল আছার, ১খ., পৃ. ২৯; ইবন কাছীর, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ২১৫-২১৮)।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণের সময়ের আরও কিছু অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে ইবন হাজার 'আসকালানী ফাতহুল বারীতে তাবারানীর উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক উছমান ইবন আবিল-আস (রা)-এর রিওয়ায়াত এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, আমার মা আমার কাছে উল্লেখ করিয়াছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণকালীন মুহূর্তে সায়্যিদা আমিনা-এর কাছে উপস্থিত ছিলেন এবং ঘরের প্রতিটি জিনিসে নূর আর নূর দেখিতে পাইয়াছিলেন। আকাশের নক্ষত্রগুলির প্রতি দৃষ্টিপাত করিতেই মনে হইতেছিল, ঐগুলি যেন আমার কোলেই ঝুঁকিয়া পড়িতেছে। সায়্যিদা আমিনা তাঁহাকে প্রসব করিতেই তাঁহার উদর হইতে এমন এক নূর বা জ্যোতি বিচ্ছুরিত হইয়াছিল, যাহাতে সম্পূর্ণ ঘর আলোকিত হইয়াছিল। ফলে চতুর্দিকে আমি নূর আর নূর দেখিতে পাইলাম।
এই প্রসঙ্গে 'ইরবাদ ইবন সারিয়া (রা) এবং আবূ উমামা (রা)-এর রিওয়ায়াত-এ এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে যে, আমি সায়্যিদিনা ইবরাহীম (আ)-এর দু'আর ফসল, 'ঈসা রূহুল্লাহ (আ)-এর সুসংবাদ এবং আমার মাতার উদর হইতে এমন এক নূর বা জ্যোতি প্রকাশ হইয়াছিল যাহার আলোতে সিরিয়ার সকল মহল আলোকিত হইয়াছিল। ইবন কাছীর সীরাত গ্রন্থে আবদুর রহমান ইবন 'আওফ (রা)-এর মাতা শিফা বিনত 'আমর ইবন 'আওফ (রা) হইতে উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট এমন নূর বা জ্যোতি প্রকাশিত হয় যাহা দ্বারা রোম সাম্রাজ্যের প্রাসাদসমূহ আলোকিত হইয়াছিল।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম ও তৎসম্পর্কিত ঘটনাবলী প্রসঙ্গে মক্কা ও ইয়াছরিবের ইয়াহুদী পণ্ডিতদের উক্তিসমূহ
ইবন কাছীর ও ইবন হিশাম উভয়ে তাঁহাদের সীরাত গ্রন্থে মুহাম্মাদ ইবন ইসহাকের উদ্ধৃতিতে হাসান ইবন ছাবিত-এর রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, তিনি বলিয়াছেন, আমি সাত অথবা আট বৎসরের বালক ছিলাম, যাহা কিছুই শুনিতাম এবং দেখিতাম ভালভাবেই বুঝিতাম। একদিন সকালে একজন ইয়াহূদী পণ্ডিত খুব জোরে চিৎকার দিয়া বলিলেন, হে কুরায়শ সম্প্রদায়। ফলে সকলেই তাহার কাছে সমবেত হইয়া বলিলেন, তোমার কি হইয়াছে আর তুমি কেনই বা আমাদেরকে ডাকিয়াছ? রাবী বলিয়াছেন, এই কথা আমি তাহাকে বলিতে শুনিয়াছি যে, “এইমাত্র 'আহমাদ' নামীয় তারকা উদিত হইয়াছে যিনি আজ রাত্রেই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন"। আবু নুআয়ম "দালাইলুন-নুবুওওয়া”—এর উদ্ধৃতি উল্লেখপূর্বক এবং ইবন কাছীর তাঁহার সীরাত-এ 'আবদুর রহমান ইব্ন আবী সা'ঈদ-এর পিতা হইতে একটি রিওয়ায়াত এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলিয়াছেন, আমি আবূ মালিক ইবন সিনান-কে বলিতে শুনিয়াছি, একদিন আমি বনূ 'আবদুল আশহাল-এর কাছে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনার জন্য আগমন করিলাম। কেননা আমাদের মাঝে ঐ দিনগুলিতে যুদ্ধ না হওয়ার সন্ধি ছিল। সেখানে ইয়াহুদী পণ্ডিত ইয়ূশা'-কে বলিতে শুনিয়াছি যে, "আল-হারাম" (মক্কা) হইতে একজন নবীর প্রকাশ হইয়াছে।” অতঃপর আশহাল গোত্রের খলীফা ইব্ন ছা'লাবা তাহাকে ঠাট্টার ছলে জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, তাঁহার "সিফাত" বা বৈশিষ্ট্যগুলি কি কি? তিনি উত্তর করিলেন, তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি খুবই খাট বা লম্বা নহেন, উভয় নয়ন কিছুটা লালবর্ণ, তিনি পাগড়ী পরিধান করিবেন, গাধায় চড়িবেন, তাঁহার তরবারি থাকিবে উন্মুক্ত এবং এই শহর (ইয়াছরিব) হইবে তাঁহার হিজরতের স্থান। রাবী আবূ মালিক ইব্ন সিনান বলিয়াছেন, আমি ইয়াহূদী পণ্ডিতের কথায় খুবই আশ্চর্যন্বিত হইয়া আমার কওম বনী খুদ্রা-এর নিকট হাজির হইয়া তাহাদের একজনকে বলিতে শুনিলাম, শুধু ইয়াহূদী পণ্ডিত ইয়ূশা'-ই অনুরূপ কথা বলিয়াছেন? বরং ইয়াছরিবের সকল ইয়াহূদী পণ্ডিতই এই প্রসঙ্গে বলিয়াছেন।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর নাম করণ
প্রত্যেক নবজাতক শিশুর মাতাপিতা বা অভিভাবকদের একটি বিশেষ দায়িত্ব হইল যে, সন্তান জন্মের পর তাহার একটি সুন্দর, শ্রুতিমধুর, অর্থবোধক ও তাৎপর্যপূর্ণ নাম রাখা যাহার প্রভাব পরবর্তীকালে তাহার জীবনে ফুটিয়া উঠে। রাসূলুল্লাহ (স)-এর সুরভিত জীবন-চরিত পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন সর্বোত্তম আখলাকের অধিকারী। নাম রাখার ব্যাপারে তাঁহার আম্মা ও অভিভাবকদের কোন প্রকার ভূমিকা ছিল না, আল্লাহ্ রব্বুল 'আলামীন তাঁহার হাবীব-এর নাম কি হইবে স্বপ্নে উহা জানাইয়া দিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে প্রাপ্ত তথ্যাবলী সুবিন্যস্তাকারে আলোচনা করা হইল:
📄 মুহাম্মাদ (স) ও আত্মাদ (আ) নাম ইলহাম সূত্রে প্রাপ্ত
'মুহাম্মাদ' নামটি ঐশী ইঙ্গিতেই রাখা হইয়াছিল। এই প্রসঙ্গে উর্দু দাইরা মা'আরিফ ইসলামিয়্যা-এ উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র নাম “মুহাম্মাদ” ইলহামী সূত্রে রাখা হইয়াছে। সায়্যিদা আমিনা 'মুহাম্মাদ' নামটি ইলহাম সূত্রে আদিষ্ট হইয়া রাখিয়াছিলেন। এই মর্মে ইন্ন সায়্যিদিন্-নাস তাঁহার 'উয়ূনুল্-আছার গ্রন্থে ইন্ন ইসহাক-এর উদ্ধৃতিতে সায়্যিদা আমিনার বর্ণনা এইভাবে উল্লেখ করেন: আমি যখন তাঁহাকে গর্ভে ধারণ করি তখন কেহ আমাকে বলিল, নিঃসন্দেহে তুমি এই উম্মতের সরদার গর্ভে ধারণ করিয়াছ। সুতরাং তাঁহার নাম 'মুহাম্মাদ' (مُحَمَّد) রাখিও।
কোন কোন বর্ণনায় সায়্যিদা আমিনার পরিবর্তে 'আবদুল মুত্তালিব-এর কথা উল্লিখিত হইয়াছে এবং তিনিই 'মুহাম্মাদ' নাম রাখিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে ইব্ন সায়্যিদিন্ নাস তাঁহার সীরাত গ্রন্থে আবূর-রাবী ইবন সালিম-এর উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন: 'আব্দুল মুত্তালিবই তাঁহার নাম 'মুহাম্মাদ' রাখিয়াছিলেন, যেহেতু তিনি এই প্রসঙ্গে একটি স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন। স্বপ্নটি ছিল এইরূপ: 'আব্দুল্ মুত্তালিবের পৃষ্ঠদেশ হইতে এমন একটি উজ্জ্বল শিকল প্রকাশিত হইয়াছিল, যাহার এক প্রান্ত আকাশে এবং অন্য পান্ত ছিল ভূপৃষ্ঠে। ইহা ছাড়া আরেক প্রান্ত ছিল পূর্ব দিগন্তে এবং অন্যটি ছিল পশ্চিম দিগন্তে। কিছুক্ষণের মধ্যে ঐ আলোকোজ্জ্বল শিকলটি একটি সুবিশাল বৃক্ষে রূপান্তরিত হইয়াছিল, যাহার প্রতিটি পাতা-পল্লবে এমন এক নূর বা জ্যোতি শোভা পাইতেছিল যাহা সূর্যের জ্যোতি হইতেও সত্তর গুণ তেজোদ্দীপ্ত ছিল। প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সকল মানবজাতি উহার ডালপালাকে আকড়াইয়া ধরিয়াছিল, এমনকি কুরায়শ সম্প্রদায়ের কিছু সংখ্যক লোক ব্যতীত সকলেই উহা অনুরূপভাবে ধরিয়া রাখিয়াছিল। কিন্তু কিছু সংখ্যক মানুষ উহাকে বারবার কাটিয়া ফেলিবার চেষ্টা করিতেছিল। যখনই তাহারা উক্ত বৃক্ষ কাটিবার উদ্দেশে অগ্রসর হইতেছিল তখনই একজন সুদর্শন শক্তিশালী যুবক তাহাদিগকে প্রবলভাবে বাধা দিতেছিল। স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারিগণ 'আব্দুল মুত্তালিবকে ইহার ব্যাখ্যা এইভাবে দিয়াছিলেন যে, আপনার বংশে এমন এক মহান সন্তানের শুভাগমন হইবে, প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সকলেই তাঁহার অনুকরণ-অনুসরণ করিবে, এমনকি আসমান ও যমীনবাসীরা তাঁহার প্রশংসা ও গুণ বর্ণনা করিবে। এই কারণেই 'আব্দুল মুত্তালিব তাঁহার এই শিশু সন্তানের নাম 'মুহাম্মাদ' রাখিয়াছিলেন। নামকরণ প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ ইদরীস কান্ধলবী তাঁহার সীরাত-এ আর-রাওদুল্ উনুফ-এর উদ্ধৃতিতে আরো উল্লেখ করেন, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মের পূর্বেই দাদা 'আবদুল মুত্তালিব একটি স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন, যাহাতে 'মুহাম্মাদ' নাম রাখার ব্যাপারে প্রেরণা ছিল।
'আকীকার ভোজন উৎসবে উপস্থিত কুরায়শ সম্প্রদায় কর্তৃক সদ্য নবজাতক শিশুর নামকরণ সম্পর্কীয় প্রশ্নের জবাবে 'আব্দুল মুত্তালিবের যবানীতে জানা যায় যে, তিনিই তাঁহার নাম 'মুহাম্মাদ' রাখিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে ইব্ন কাছীর (র) তাঁহার সীরাত-এ উল্লেখ করেন, জন্মের সপ্তম দিবসে 'আবদুল মুত্তালিব 'মুহাম্মাদ' (স)-এর 'আকীকা উপলক্ষ্যে কুরায়শদের সকলকে দাওয়াত করিয়াছিলেন। খাওয়া-দাওয়ার পর তাহারা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, হে 'আবদুল মুত্তালিব! যে সন্তানের বদৌলতে আপনি আমাদিগকে সম্মানিত করিয়াছেন তাঁহার কি নাম রাখিয়াছেন? উত্তরে 'আবদুল মুত্তালিব বলেন, আমি তাঁহার নাম 'মুহাম্মাদ' রাখিয়াছি। অতঃপর তাহারা বলিলেন, তাঁহার বংশের প্রচলিত নামগুলির পরিবর্তে আপনি কেন এই নাম রাখিয়াছেন? তিনি বলেন, আমি আশা করিতেছি যে, আল্লাহ তা'আলা আসমানেও তাঁহার প্রশংসা প্রতিষ্ঠিত করিবেন, এমনকি সমগ্র ভূপৃষ্ঠে তাঁহার অনুপম আখলাকের প্রসার ঘটাইবেন।
কোন কোন বর্ণনায় 'আব্দুল মুত্তালিব এবং সায়্যিদা আমিনার পরিবর্তে 'আব্দুল মুত্তালিব পরিবারকে মুহাম্মাদ নাম রাখার ব্যাপারে ইলহাম-এর মাধ্যমে অবহিত করানো হইয়াছিল। এই প্রসঙ্গে ইব্ন কাছীর (র) উল্লেখ করেন, কোন কোন 'আলিম বলিয়াছেন, মহান রব্বুল 'আলামীন 'আবদুল মুত্তালিব পরিবারকে ইলহামের মাধ্যমে অবগত করাইয়াছিলেন তাঁহার নাম মুহাম্মাদ রাখিতে। কেননা তাঁহার মধ্যে সকল প্রশংসনীয় গুণরাজির সমাবেশ ঘটিয়াছে।
'আহমাদ' (احمد) নামটিও ঐশী ইঙ্গিতেই রাখা হইয়াছিল। এই প্রসঙ্গে ইব্ন সা'দ (র) তাহার তাবাকাত-এ আবূ জাফর মুহাম্মاد ইবন 'আলীর রিওয়ায়াতটি এইভাবে উল্লেখ করেন, সায়্যিদা আমিনা যিনি মহামহিমান্বিত রব্বুল আলামীন-এর মহান রাসূলের গর্ভধারিণী ছিলেন, তিনি তাঁহার নাম 'আহমাদ' রাখিতে আদিষ্ট হইয়াছিলেন।
কোন কোন রিওয়ায়াত অনুযায়ী উভয় নামই ঐশী ইঙ্গিতে রাখা হইয়াছিল। এই প্রসঙ্গে আস্-সুয়ূতী তাঁহার আল্-খাসাইসুল্ কুরা-এ হযরত বুরায়দা (রা) ও ইবন 'আব্বাস (রা)-এর রিওয়ায়াত আবূ নু'আয়ম-এর সনদ-পরম্পরায় উল্লেখ করেন। সায়্যিদা আমিনা স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন যে, কেহ যেন তাঁহাকে উপদেশ দিতেছেন, আপনি সৃষ্টিজগতের সর্বোত্তম মহামানব এবং জগতকুল শিরোমণিকে গর্ভে ধারণ করিয়াছেন। অতঃপর তিনি যখন ভূমিষ্ট হইবেন তখন তাঁহার নাম 'আহমাদ' ও 'মুহাম্মাদ' রাখিবেন।