📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণের তারিখ ও জন্মস্থান
হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর জন্মগ্রহণের বৎসর ছিল হস্তী বৎসর (আমুল ফীল)। এই প্রসঙ্গে ইব্নুল-আছীর (র) তাঁহার সীরাত-এ উল্লেখ করিয়াছেন: কায়س ইব্ন মাখ্রামা, কুবাছ ইব্ন আশয়াম ও ইব্ন ইস্হাক বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) হস্তী বৎসরে জন্মগ্রহণ করেন। আয-যাহাবী কায়স ইব্ন মাখামা ইবনুল মুত্তালিব-এর বর্ণনা এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন, আমি এবং রাসূলুল্লাহ (স) হস্তী বৎসরে জন্মগ্রহণ করিয়াছি এবং আমরা উভয়ে দুই ভাই ছিলাম।
হস্তী বৎসর প্রসঙ্গে ইবন সা'দ উল্লেখ করিয়াছেন যে, "আসহাবুল ফীল" বা হস্তীবাহিনীর আগমন ছিল মুহাররম মাসের মাঝামাঝি সময়ে এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম এবং সংঘটিত হস্তী বাহিনীর ঘটনার মাঝে ব্যবধান ছিল মাত্র ৫৫ দিন। যাদুল-মা'আদ-এ বর্ণিত আছে, হযরত মুহাম্মাদ (স) "আমুল-ফীল'-এ জন্মগ্রহণ করেন, এই ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য নাই এবং হস্তী বাহিনীর ঘটনাটি ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ জন্মের নিদর্শনস্বরূপ।
'সীরাতুল্-মুস্তাফা' গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স) হস্তীবাহিনীর ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ৫০ অথবা ৫৫ দিন পর জন্মগ্রহণ করেন।
হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর জন্মগ্রহণের মাস ও দিন সম্পর্কে সর্বসম্মত মত হইল, তিনি রাবী'উল আওয়াল মাসের সোমবার সুবহে সাদিকের সময় জন্মগ্রহণ করেন। সোমবার দিনটি ছিল রাসূলে কারীম (স) -এর জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রসঙ্গে ইন্ন কাছীর ইন্ন আব্বাস (রা)-এর রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সোমবার জন্মগ্রহণ করেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুয়াত প্রাপ্তির দিনটিও ছিল সোমবার, তিনি মক্কা হইতে মদীনার উদ্দেশ্যে সোমবার দিনই রওয়ানা করিয়াছিলেন এবং মদীনা মুনাওয়ারাতে সোমবার দিনই পৌছিয়াছিলেন। ইহা ছাড়া সোমবার দিনই তিনি ইইজগত হইতে বিদায় গ্রহণ করেন, এমনকি এই দিনই 'হাজরে আসওয়াদ' বায়তুল্লাহতে স্থাপন করা হইয়াছিল। ইমাম যাহাবী তাঁহার সীরাতগ্রন্থে ইমাম আহমাদ-এর "মুস্লাদ"-এ বর্ণিত একটি রিওয়ায়াত এই প্রসঙ্গে উদ্ধৃত করিয়াছেন যাহাতে বর্ণিত হইয়াছে যে, সোমবার দিনই মক্কা বিজয় হইয়াছিল এবং সোমবারই সূরা আল-মাইদা অবতীর্ণ হইয়াছিল। ইব্ন হিশাম-এর 'সীরাত'-এর পাদটীকায় যুবায়র-এর উদ্ধৃতি বর্ণনাপূর্বক রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণের মাস রাবীউল্-আওয়াল-এর পরিবর্তে 'রামাদান' উল্লিখিত হইয়াছে। এই মতের প্রবক্তাগণ দাবি করেন যে, সায়্যিদা আমিনা বিন্তে ওয়াহ্ 'আয়্যামে তাশ্রীক' অর্থাৎ যিলহাজ্জ মাসের মাঝামাঝি সময়ে গর্ভবতী হইয়াছিলেন। 'সীরাতুল্-মুস্তাফা'-এর পাদটীকায় বর্ণিত হইয়াছে যে, প্রায় অধিকাংশ 'উলামা-ই-কিরাম-এর অভিমত হইল যে, রাসূলে কারীম (স) রাবী'উল্ আওয়াল মাসেই জন্মগ্রহণ করেন। 'আল্লামা ইবনুল-জাওযী উল্লেখ করিয়াছেন, এই অভিমতের উপর সমস্ত আলিম-এর ইজমা হইয়াছে। তবে কেহ কেহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মমাস রাবীউহ্ ছানীকেই গ্রহণ করিয়াছেন। আবার কেহ কেহ 'সফর' মাসে রাসূলে কারীম (স) জন্মগ্রহণ করেন বলিয়াও অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। আল্লামা যুরকানী বলিয়াছেন যে, এই সকল বর্ণনায় যথেষ্ট দুর্বলতা রহিয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম চান্দ্র বৎসরের রাবীউল্ আওয়াল মাসের কোন্ তারিখে হইয়াছিল এই প্রসঙ্গে প্রামাণ্য ও প্রাচীন সীরাত গ্রন্থসমূহে বিভিন্ন মত উল্লিখিত হইয়াছে। ইব্ন কাছীর ও ইবনুল-আছীর উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) ১২ রবীউল আওয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। ইহাই অধিকাংশের মত।
ড. আকরাম যিয়াউল-উমরী তাঁহার গবেষণায় তিনটি মত ব্যক্ত করিয়াছেন। তন্মধ্যে ১২ রবীউল্-আওয়ালকে নির্ভরযোগ্য বলিয়াছেন। ইহাই ইব্ন ইসহাকের মত। নাদ্রাতুন্-না'ঈম-এর পাদটীকায় বর্ণিত হইয়াছে, 'আমাদের বিবেচনায় ইব্ন ইসহাকের বর্ণনাটি অধিক নির্ভরযোগ্য'। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-এর এক বর্ণনায় উল্লিখিত হইয়াছে, ইব্ন ইসহাক জোরালোভাবে এই মতকে সমর্থন করিয়াছেন।
মহানবী (স)-এর জন্ম প্রসঙ্গে অন্যান্য সীরাত গ্রন্থসমূহে ভিন্ন তারিখও উল্লিখিত হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে শিবলী নু'মানী মিসরের খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাহমূদ পাশা ফালাকীর মতামতের আলোকে ৯ রাবীউল আওয়াল/২০ এপ্রিল, ৫৭১ খৃ.-কে প্রাধান্য দিয়াছেন। কাযী সুলায়মান মানসূরপুরী, "রাহমাতুল্লিল আলামীন” নামক গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করিয়াছেন যে, ৯ রব্বীউল-আওয়াল, 'আমুল্-ফীল' মুতাবিক ২২ এপ্রিল, ৫৭১ খৃ., ১ জ্যৈষ্ঠ/৬২৮ বিক্রমিতে মক্কা মু'আজ্জামাতে রাসূলুল্লাহ (স) জন্মগ্রহণ করেন। আয-যাহাবী উপরিউক্ত মতকে সহীহ্ বলিয়াছেন।
হিফজুর রহমান সীওয়াহারবী উল্লেখ করিয়াছেন যে, "মাহমূদ পাশা ফালাকী কনস্টানটিনোপল-এর একজন প্রসিদ্ধ ও খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি তাঁহার গবেষণার আলোকে এই কথা প্রমাণে সচেষ্ট হইয়াছেন যে, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সময় হইতে তাহার সময় পর্যন্ত সংঘটিত সবগুলি সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের নিখুঁত হিসাব করিলে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলে কারীম (স)-এর শুভ জন্মতারিখ ১২ রাবীউল আওয়াল হইতেই পারে না, বরং উহা ৯ রাবীউল আওয়াল হইবে। কাসাসুল-কুরআন-এ উল্লিখিত মতকে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য বলিয়া ব্যক্ত করা হইয়াছে। প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ এবং ঐতিহাসিকগণ তাঁহাদের সীরাত গ্রন্থসমূহে উল্লিখিত তারিখের প্রামাণ্য বুঝাইতে আরবী 'সাহীহ' صحيح এবং 'আছবাত' (اثبت) শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন, যাহার অর্থ 'বিশুদ্ধ এবং 'নির্ভরযোগ্য'। ইহা ছাড়া হুমায়দী, 'আকীল, য়ূনুস ইব্ন ইয়াযীদ, ইব্ন 'আবদুল্লাহ, মুহাম্মাদ ইব্ন মূসা, আবুল্-খাত্তাব, খাওয়ারিযমী, ইব্ন দাহয়া, ইব্ন তায়মিয়া, ইবনুল কায়্যিম, ইব্ন হাজার 'আসকালানী, শায়খ বদরুদ্দীন 'আয়নী প্রমুখ 'উলামার ইহাই অভিমত।
আল্-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইব্ন কাছীর (র) রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম সম্পর্কিত সূদীর্ঘ আলোচনার পর উপসংহারে বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই প্রসঙ্গে বিশুদ্ধতম ও সঠিক হইল ৮ রাবীউল-আওয়াল। আল-হুমায়দীও ইব্ন হাযম (র) হইতে উপরিউক্ত মতটি উল্লেখ করিয়াছেন। ইমাম মালিক (র) 'আকীল (র), য়ূনুস ইব্ন ইয়াযীদ (র) এবং অন্যান্য বিজ্ঞজন ইমাম যুহরী (র) হইতে উহা বর্ণনা করিয়াছেন। ইবন 'আবদুল্-বার (র) প্রখ্যাত ঐতিহাসিকদের উদ্ধৃতি উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন, তাঁহারা এই মতকে বিশুদ্ধ মনে করিয়াছেন।
ইবনুল্-জাওযী রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম ৮ রবীউল-আওয়াল উল্লেখ করিয়াছেন। সীরাতুল্- মুস্তাফা-তে উল্লিখিত হইয়াছে যে, "মূলত ৮ তারিখ বা ৯ তারিখ-এর পার্থক্যটাই মূল পার্থক্য নহে বরং এই পার্থক্যের মূল ভিত্তি হইতেছে আরবী মাস ২৯ অথবা ৩০ দিনে হওয়া বা না হওয়া। অতএব ইহা যখন প্রমাণিত হইল যে, ঐ তারিখটি ২১ এপ্রিল ছিল, সুতরাং ৮ তারিখের বর্ণনাগুলি মূলত ৯ তারিখের পক্ষেই প্রমাণিত হয়।"
কোন কোন ঐতিহাসিক রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম ১০ রাবীউল-আওয়াল উল্লেখ করিয়াছেন। ইব্ন সা'দ এই প্রসঙ্গে আবূ জা'ফার মুহাম্মাদ ইব্ন আলী (র)-এর বর্ণনা এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, "রাসূলুল্লাহ (স) ১০ রবীউল্-আওয়াল জন্মগ্রহণ করিয়াছেন"। ইব্ন কাছীর উল্লেখ করিয়াছেন, এই মতটি ইব্ন দাহয়া এবং ইব্ন 'আসাকির আবূ জা'ফার আল্-বাকির হইতে বর্ণনা করিয়াছেন।
আল্-ওয়াকিদী উল্লিখিত মতকে গ্রহণ করিয়াছেন। ইব্ন আবদুল বাবুর আল্-ইস্স্তী'আব-এ বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) রাবী'উল-আওয়াল মাসের ২ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। আবূ মা'শার আস্-সানাদী উল্লিখিত মতকে গ্রহণ করিয়াছেন।
ইব্ন আব্বাস (র) ও জাবির (রা)-এর রিওয়ায়াত ইব্ন আবূ শায়বা তাঁহার 'আল-মুসান্নাফ' গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) ১৮ রাবী'উল-আওয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। তবে কোন কোন ঐতিহাসিক ১৭ এবং ২২ রাবী 'উল-আওয়াল উল্লেখ করিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার শুভ মুহূর্ত সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিছীন-এর বিভিন্ন মত রহিয়াছে। তবে প্রসিদ্ধতম মত হইল রাসূলুল্লাহ (স) সুবহে সাদিক-এর সময় জন্মগ্রহণ করেন। এই প্রসঙ্গে আয-যুবায়র ইন্ন বাক্কার এবং ইবন 'আসাকির মা'রূফ ইবন হায্যাবৃয (معروف بن حزبوذ)-এর বর্ণনা উল্লেখ করেন: রাসূলুল্লাহ (স) সোমবার ফজর তথা সুবহে সাদিক-এর সময়ে ভূমিষ্ঠ হন। মুহাম্মাদ ইদ্রীস কান্ধালাবী, সীরাতুল্-মুস্তাফা, পৃ. ৫১, পাদটীকা ৩; দা. মা. ই., ১৯ খ., পৃ. ১২; মুহাম্মাদ ইদ্রীস কান্ধলাবী (র) উল্লেখ করিয়াছেন, "যদিও এই রিওয়ায়াতটি সনদের দিক দিয়া দুর্বল, তবুও ইহা দ্বারা অন্যান্য সকল বর্ণনার মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দূর করা সম্ভব। কেননা কোন কোন রিওয়ায়াত দ্বারা বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ-জন্ম দিনের বেলায় হইয়াছিল। অপরাপর বর্ণনা হইতে জানা যায়, তিনি (স) রাত্রি বেলায় ভূমিষ্ঠ হন। যদি কেহ এই দাবি করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সুবহে সাদিক-এর সময় জন্মগ্রহণ করেন তবে ইহা অত্যুক্তি হইবে না। সুতরাং যে সমস্ত রিওয়ায়াত-এ সোমবার দিন অথবা সোমবার রাত-এ ভূমিষ্ঠ হওয়ার বর্ণনা উল্লিখিত হইয়াছে, উভয় রিওয়ায়াত-ই সহীহ। আর যে সমস্ত বর্ণনায় সুব্হ সাদিক-এর উল্লেখ রহিয়াছে উহার মর্মার্থ ইহাও হইতে পারে যে, রাত্রেই জন্মগ্রহণের সকল লক্ষণ ও চিহ্ন প্রকাশ পাইয়াছিল। ইব্ন হিব্বান মা'রূফ ইন হায্যাবুয সম্পর্কে বলিয়াছেন, "তিনি একজন নির্ভরযোগ্য রাবী।" এই প্রসঙ্গে আবূ হাতেম বলিয়াছেন, "ইবন হায্যাবুষ-এর হাদীছ গ্রহণ করা যায়"।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুবারক স্থান কোনটি ছিল, এই প্রসঙ্গে "যাদুল-মা'আদ-"-এ উল্লিখিত হইয়াছে যে, "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) যে মক্কা মুকাররামা নগরীতেই জন্মগ্রহণ করেন এই ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য নাই"। ইবনুল-আছীর তাঁহার সীরাত-এ ইবন ইসহাক-এর রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন, "রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণের মুবারক স্থানটি মুহাম্মাদ ইব্ন যুসুফ-এর ঘরে। জন্মগ্রহণের ঐ মুবারক স্থান সম্পর্কে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (স)-ঐ জায়গাটুকু 'আকিল ইব্ন আবী তালিবকে দান করিয়াছিলেন। তাহার মৃত্যু পর্যন্ত উহা তাঁহার অধিকারে ছিল। তাহার মৃত্যুর পরে হাজ্জাজ ইব্ন য়ূসুফ-এর ভাই মুহাম্মাদ ইবন য়ূসুফ-এর কাছে উহা বিক্রি করিয়া দিয়াছিলেন এবং সেখানেই তিনি একটি সুন্দর ঘর তৈরি করিয়াছিলেন যাহা “দারু ইব্ন য়ূসুফ” বা ইবন য়ূসুফ-এর ঘর নামে প্রসিদ্ধ।
মুহাম্মাদ আল-খিদরী উল্লেখ করিয়াছেন, "মুহাম্মাদ (স)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার বরকতময় স্থানটি ছিল বানু হাশিম উপত্যকার আবূ তালিব-এর ঘর। জন্মগ্রহণকালে আবদুর রহমান ইবন 'আওফ-এর আম্মা শিফা তথায় উপস্থিত ছিলেন। ইবন হিশাম-এর সীরাত-এর পাদটীকায় এই প্রসঙ্গে উল্লেখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা মুকাররমার পাহাড়ে অবস্থিত কোন এক মুবারক ঘরে ভূমিষ্ঠ হন। তবে কেহ কেহ উল্লেখ করিয়াছেন যে, সাফা পর্বতের নিকটে অবস্থিত কোন বাড়ীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
নবী (স) সুবহে সাদিক-এর মুবারক মুহূর্তে বায়তুল্লাহ শরীফের অনতিপূর্বে মাওলিদুন নাবী নামে পরিচিত স্থানে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে বর্তমানে একটি গ্রন্থাগার স্থাপিত হইয়াছে। আবদুর রউফ দানাপূরীর আসাহহুস-সিয়ার গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, তিনি বায়তুল্লাহ্র অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু ইহা প্রমাণিত নহে।
📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর খত্না
রাসূলুল্লাহ (স) খতনাকৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। ইবন কাছীর বায়হাকীর রিওয়ায়াত উল্লেখপূর্বক আব্বাস ইব্ন আবদিল মুত্তালিব হইতে এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) মাখতুন অর্থাৎ খতনাকৃত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হন। ইবনুল জাওযী সীরাত-এ এই প্রসঙ্গে আনাস (রা)-এর রিওয়ায়াত এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন, আমার জীবনের প্রদত্ত মর্যাদাসমূহের অন্যতম মর্যাদা হইল, আমি খত্নাকৃত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হইয়াছি যাহা সাধারণত দেখা যায় না। ইব্ন কাছীর সীরাত গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে আরো বর্ণনা করিয়াছেন যে, কতক রাবী এই বর্ণনাটিকে মুতাওয়াতির” হাদীছের মর্যাদা দান করিয়াছেন।
যাদুল মা'আদ -এ উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর খতনা প্রসঙ্গে তিনটি মত পাওয়া যায় : (১) তিনি (স) খতনাকৃত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন, (২) হযরত হালীমা সা'দিয়া-এর ঘরে থাকাকালে যখন জিব্রাঈল (আ) তাঁহার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়াছিলেন তখন তিনি খতনাও করাইয়াছিলেন এবং (৩) তাঁহার পিতামহ 'আবদুল মুত্তালিব নিজেই তাঁহার খতনা করাইয়াছিলেন, যাহা আরবদের সাধারণ নিযম ছিল।
📄 ইব্ল্লীসের কান্নাকাটি
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণকালে অভিশপ্ত ইবলীস ভীষণভাবে ক্রন্দন করিয়াছিল। আস্-সুহায়লী বাকী ইব্ন মাল্লাদ হইতে এই প্রসঙ্গে বর্ণনা করিয়াছেন যে, “নিঃসন্দেহে ইবলীস চারবার ভীষণভাবে কান্নাকাটি করিয়াছিলঃ (১) যখন সে অভিশপ্ত হইয়াছিল, (২) জান্নাত হইতে তাহাকে চিরতরে নামাইয়া দেওয়া হইয়াছিল, (৩) রাসূলুল্লাহ (স) যখন জন্মগ্রহণ করেন এবং (৪) যখন সূরা আল-ফাতিহা অবতীর্ণ হইয়াছিল” (ইব্ন কাছীর, আস্-সীরাতুন্- নাবাবিয়্যা, ১খ. পৃ. ২১২)।
📄 খতমে নবুওয়াতের আলামতসহ জন্মগ্রহণ
হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ জন্মগ্রহণ হইতেই তাঁহার উভয় কাঁধের মধ্যভাগে “খাতামুন্-নুবুওয়াতের” বিশেষ চিহ্ন বিদ্যমান ছিল। এই প্রসঙ্গে ইব্ন কাছীর 'সীরাত-এ ইব্ন ইসহাক' এর রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, হিশাম ইব্ন 'উরওয়া তাঁহার পিতার সূত্রে উম্মুল মু’মিনীন সায়্যিদা আইশা, (রা) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, “মক্কা নগরীতে এক ইয়াহুদী বসবাস করিত, সে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করিত। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) যে রাত্রিতে ভূমিষ্ঠ হন তিনি এ রাত্রে কুরায়শদের এক সমাবেশে বলিলেন, “হে কুরায়শ সম্প্রদায়! অদ্য রাত্রে তোমাদের মাঝে কোন নবজাত মহান শিশু জন্মগ্রহণ করিয়াছে কি? উত্তরে বলিলেন, আল্লাহ্ শপথ! এই ব্যাপারে আমাদের জানা নাই। অতঃপর তিনি তাহাদিগকে বলিলেন, তোমরা ভালভাবে খোঁজখবর লও এবং যাহা কিছু আমি বলিতেছি তাহা ভালভাবে স্মরণ রাখ এবং মনোযোগ দিয়া শ্রবণ কর, “অদ্য রাত্রেই আখেরী উম্মতের আখেরী নবী ভূমিষ্ঠ হইয়াছেন, যাহার উভয় কাঁধের মাঝে খাতামুন্-নুবুওয়াতের চিহ্ন রহিয়াছে। তিনি দুই রাত্রি যাবৎ কোন দুধ পান করিবেন না। জনৈক জিন্ন তাহার হাত তাঁহার মুখের উপর স্থাপন করার কারণে তিনি দুই রাত্র দুধপান হইতে বিরত থাকিবেন।” ইবন কাছীর মন্তব্য করিয়াছেন যে, এই ধরনের আরও কাহিনী রহিয়াছে যেইগুলি ব্যাখ্যাসাপেক্ষ (আল-বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৪৮)।
অতঃপর কওমের লোকেরা তাহার কথায় ও বক্তব্যে আশ্চর্যন্বিত হইয়া সকলেই ঐ মজলিস হইতে পৃথক হইয়া স্বীয় বাড়ীতে গিয়াছিলেন এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ পরিবারের কাছে ইয়াহুদী পণ্ডিতের খবর পৌঁছাইয়াছিলেন। ফলে তাহারা বলিলেন, "আল্লাহর শপথ! এইমাত্র আব্দুল্লাহ ইব্ন আবদুল মুত্তালিব-এর ঘরে এক নবজাত শিশু জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, যাহার নাম রাখা হইয়াছে মুহাম্মাদ (প্রশংসিত)।” অতঃপর তাহারা পরস্পর বলাবলি করিতে লাগিল, তোমরা ইয়াহূদী পণ্ডিতের বাণী শ্রবণ করিয়াছ কি? এক মহান শিশুর জন্মগ্রহণের সংবাদ পাইয়াছ কি? অতঃপর তাহারা সকলে ইয়াহূদী পণ্ডিতের কাছে পৌঁছাইয়া এই সংবাদ প্রদান করিলে তিনি তাহাদিগকে বলিলেন, আমাকে শিশু মুহাম্মাদ-এর কাছে নিয়া চল, আমি তাঁহাকে একনজর দেখিব। তাহারা তাহাকে সায়্যিদা আমিনা-এর কাছে নিয়া গেলেন এবং তিনি বিনয়ের সাথে তাঁহার কাছে বলিলেন, "আপনার শিশুকে আমাদের কাছে একটু দিন।" তিনি শিশু মুহাম্মাদকে তাহাদের কাছে দিলেন এবং তাহারা তাঁহার স্কন্ধের কাপড় উন্মোচন পূর্বক সুন্দর নিদর্শন মোহরে নবুওয়াত দেখিতে পাইলেন। উহা দেখা মাত্রই ইয়াহূদী পণ্ডিত বেহুঁশ হইয়া পড়িয়া গিয়াছিলেন। দীর্ঘক্ষণ পরে হুঁশ ফিরিবা মাত্রই সঙ্গীরা তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনার কি হইয়াছিল? উত্তরে বলিলেন, আল্লাহ্র কসম! আজ বানু ইসরাঈল হইতে নবুওয়াতের ধারা বিদায় নিয়াছে। হে কুরায়শ সম্প্রদায়! তোমরা কতই না খোশনসীব! আল্লাহ্র কসম! তোমরা এমন বিজয় লাভ করিবে যাহার খবর পূর্ব-পশ্চিমে পৌঁছায়া যাইবে।