📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মা আমিনার কষ্ট-ক্লেশহীন সহজ গর্ভধারণ

📄 মা আমিনার কষ্ট-ক্লেশহীন সহজ গর্ভধারণ


রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাতৃগর্ভে অবস্থানকালে আমিনা কোন দিনই সামান্যতম বেদনাও অনুভব করেন নাই। ইব্‌নুল জাওযী এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করিয়াছেন, ইয়াযীদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন যামআ তাঁহার খালা হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, তিনি বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর গর্ভধারণকালীন আমরা সায়্যিদা আমিনাকে বলিতে শুনিয়াছি যে, আমি তাঁহাকে গর্ভধারণ করিয়াছি অথচ কোন দিন সামান্যতম বেদনাও অনুভব করি নাই এবং কোন কষ্টও পাই নাই, যেমন অন্যান্য গর্ভবতী মহিলারা অনুভব করিয়া থাকেন। আমার রজঃস্রাব বন্ধ হইলে আমি বুঝিতে পারিয়াছি যে, আমার গর্ভে সন্তান আসিয়াছে। তন্দ্রাবস্থায় আমার কাছে একজন আগমনকারী আসিয়া বলিলেন, তুমি একজন পুণ্যবতী গর্ভধারিণী মহিলা, ইহা কি তুমি অনুভব করিয়াছ? উত্তরে আমি যেন ইহাই বলিলাম, "মা আদ্রী" (আমি কিছুই অনুভব করি না)। অতঃপর তিনি বলিলেন, তুমি এই বিশ্বমানবের সরদার ও তাহাদের নবীকে গর্ভে ধারণ করিয়াছ।
এই প্রসঙ্গে ইন্ন 'আব্বাস (রা)-এর রিওয়ায়াত ইবন সা'দ উল্লেখ করেন যে, আমিনা বিন্ত ওয়াহ্ বলেন, আমি তাঁহাকে অর্থাৎ মুহাম্মাদ (স)-কে গর্ভে ধারণ করিয়াছি। তিনি ভূমিষ্ট হওয়া পর্যন্ত আমি কখনও' সামান্যতম বেদনাও অনুভব করি নাই। কষ্টক্লেশহীন অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (স) ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন। আমার উদর হইতে বিচ্ছিন্ন হওয়া মাত্রই এমন এক নূর বা জ্যোতি প্রকাশ পাইয়াছিল যাহা প্রাচ্য-প্রতীচ্যের মধ্যবর্তী সকল কিছুকে আলোকিত করিয়াছিল। এই সময় তিনি উভয় হাতের উপর ভর দিয়াছিলেন। অতঃপর উভয় হাতের সাহায্যে এক মুষ্টি মাটি গ্রহণ করিলেন এবং আসমানের দিকে মাথা উত্তোলন করিলেন।
কোন কোন ঐতিহাসিক বলিয়াছেন, ভূমিষ্ঠকালীন তিনি উভয় হাঁটুর উপর ভর দিয়াছিলেন এবং আসমানের দিকে মাথা উত্তোলন করিয়াছিলেন। সেই সময় এমন এক জ্যোতি প্রকাশ পাইয়াছিল যাহারা আলোকে সিরিয়ার সকল প্রাসাদ ও বাজার আলোকিত হইয়াছিল। ফলে আমি বুসরা নগরীর উটগুলির গর্দান দেখিতে পাইয় ছিলাম। ইবন আব্বাস (রা)-এর এই বর্ণনায় উৎসের উল্লেখ না করায় রিওয়ায়াতটি দুর্বল।
ভূমিষ্ঠকালীন মুহূর্তে তিনি ছিলেন অতি পূতঃপবিত্র। এই প্রসঙ্গ ইবন সা'দ ইসহাক ইব্‌ আবদুল্লাহ-এর বর্ণনা উল্লেখ করিয়াছেন যে, 'আমি তাঁহাকে পূত-পবিত্র অবস্থায় প্রসব করিলাম। এই সময় তাঁহার শরীরে কোন প্রকার ময়লা বা মলমূত্র ছিল না'।
এই মুহূর্তে তিনি উভয় হাতের উপর ভর দিয়া ভূপৃষ্ঠে বসিয়াছিলেন। বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মিটি ছিল যেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই প্রসঙ্গে তিনি ইবনুল-কিবতিয়্যার বর্ণনাটিও উল্লেখ করিয়াছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর আম্মা বলিয়াছেন, তাঁহার জনগ্রহণের সময় আমি দেখিলাম যে, আমার উদর হইতে যেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র বাহির হইল, অতঃপর সমগ্র পৃথিবী আলোকিত করিয়া তুলিল। মুহাম্মাদ ইবন 'আবদুল ওয়াহ্হাব তাঁহার সীরাত গ্রন্থ' 'মুখতাসারু সীরাতুর রাসূল'-এ 'আব্বাস ইব্‌ন 'আবদুল মুত্তালিব (রা)-এর একটি স্বরচিত কবিতা উল্লেখ করিয়াছেন, যাহাতে এই বিচ্ছুরিত আলোকরশ্মির এক চমৎকার বর্ণনা সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত হইয়াছে:
وَضَاعَتْ بِنُورِكَ الْأُفُقُ وَانت لما ولدت اشرقت الارض وَنَحْنُ فِي ذَالك الضياء وفي الانور - قبل الرشاد تخترق
“(হে মহান)! যখন তুমি ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলে তখন তোমারই জ্যোতিতে সারা ভুবন জ্যোতির্ময় হইয়া উঠিয়াছিল, এমনকি তোমার আলোতে দিগন্ত জুড়িয়া আলোকিত হইয়া উঠিল। আমরা সকলেই ঐ উজ্জ্বল নূর বা জ্যোতির্ময় আলোতে অবগাহন করিলাম। অতঃপর সত্য-ন্যায়ের পথগুলি উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল।"
এই উজ্জ্বল-জ্যোতির্ময় আলো প্রকাশিত হওয়ার সূক্ষ্ম কারণ প্রসঙ্গে গ্রন্থকার আরো উল্লেখ করিয়াছেন যে, "মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভূমিষ্ঠকালীন সময়ে জ্যোতির্ময় আলোর প্রকাশ নিঃসন্দেহে এই দিকে ইঙ্গিত বহন করে যে, উহা দ্বারা সমগ্র জগতবাসী হিদায়াত লাভ করিবে এবং শিক্-এর অন্ধকার হইতে মুক্তি লাভ করিবে।" এই দিকেই ইঙ্গিত করিয়াই মহান আল্লাহ ইরশাদ করিয়াছেন:
قَدْ جَاءَكُمْ مِنَ اللهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُّبِينٌ يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ وَيُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ.
"অবশ্যই তোমাদের কাছে মহান আল্লাহর পক্ষ হইতে জ্যোতি এবং স্পষ্ট কিতাব আসিয়াছে। যাহারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করিতে চাহে, ইহা দ্বারা তিনি তাহাদিগকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন এবং নিজ অনুমতিক্রমে অন্ধকার হইতে বাহির করিয়া আলোর দিকে লইয়া যান এবং উহাদিগকে সরল পথে পরিচালিত করেন” (৫ঃ ১৫-১৬)।
আর বুসরা সিরিয়ার একটি প্রসিদ্ধ শহর। সমগ্র বুসরা শহর জ্যোতির্ময় হইয়া উঠা নিঃসন্দেহে এই দিকে ইঙ্গিত বহন করে যে, ঐ নূরের জ্যোতিতে সিরিয়া উদ্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছিল। কেননা শাম এলাকার বুস্রা শহর সর্বপ্রথম মুসলমানগণ কর্তৃক বিজিত হয়। যেমন কা'ব (রা) বলিয়াছেন, "অবশ্যই পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবে বর্ণিত আছে যে, মুহাম্মাদ (স)-এর জন্মভূমি হইবে মক্কা নগরী, হিজরতের আবাসস্থল হইবেই য়াছরিব এবং তাঁহার শাসন প্রতিষ্ঠিত হইবে সমগ্র সিরিয়া জুড়িয়া।"
এইজন্য তিনি মি'রাজের রাত্রিতে ভ্রমণকালে সিরিয়ার বায়তুল মাকদিস-এ- সফর করিয়াছিলেন। সায়্যিদিনা ইব্রাহীম (আ)-ও সিরিয়াতে হিজরত করিয়াছিলেন এবং হযরত 'ঈসা (আ) সিরিয়ার মাটিতেই নাযিল হইবেন। আর ইহাই হইবে হাশরের ময়দান। সায়্যিদিনা ইব্রাহীম (আ)-ও সিরিয়াতে হিজরত করিয়াছিলেন এবং হযরত 'ঈসা (আ) সিরিয়ার মাটিতেই নাযিল হইবেন। আর ইহাই হইবে হাশরের ময়দান। রাসূলুল্লাহ (স.)-এর ভূমিষ্ঠকালীন সময়ের বিচ্ছুরিত আলোক রশ্মিতে সিরিয়ার রাজমহল দৃষ্ট হওয়ার আরো একটি সূক্ষ্ম কারণ ইদ্রীস কান্ধলাবী তাঁহার গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, সিরিয়ার রাজপ্রাসাদ জ্যোতির্ময় হওয়ার ইহাও একটি কারণ যে, চল্লিশজন আবদাল (কামেল ওলী)-এর মধ্যে যে একজন আবদাল মিল্লাতি ইব্রাহীমের অনুসরণ-অনুকরণ করিয়াছিলেন, তাঁহাদের সকলেরই বাসস্থান ছিল সিরিয়া অঞ্চলে। সুতরাং অন্যান্য অঞ্চল হইতে সিরিয়াতেই বেশী নূর উদ্ভাসিত হইয়াছিল। ইহা ছাড়াও আরো একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রহিয়াছে যে, এই স্থানটি ছিল নবুওয়াতের জ্যোতিতে উদ্ভাসিত একটি বিশেষ স্থান। এই কারণে মি'রাজের রাত্রে রাসূলুল্লাহ (স)-কে মহান আল্লাহ সিরিয়া অর্থাৎ মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করাইয়াছিলেন। আল্লাহ পাক বলিয়াছেন:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَرَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ أَيْتِنَا .
"পবিত্র ও মহিমময় তিনি, যিনি তাঁহার বান্দাকে এক রজনীতে মসজিদুল হারাম হইতে মসজিদুল আক্সাতে পরিভ্রমণ করাইয়াছেন, যাহার চারিপার্শ্ব আমি বরকতে পরিপূর্ণ করিয়া দিয়াছি, যেন আমার কুদরতের নিদর্শনসমূহ হইতে কিছু তাহাকে দেখাইতে পারি" (১৭: ১)।
আস্-সীরাতুল-হালাবিয়্যা গ্রন্থে মুহাম্মাদ (স)-এর সিজদারত অবস্থায় জন্মগ্রহণের এক তাৎপর্য এইভাবে উল্লেখিত হইয়াছে, সিজদারত অবস্থায় জন্মগ্রহণ অবশ্যই এই দিকে ইঙ্গিত বহন করে যে, তাঁহার জীবনের প্রথম আমলের বহিঃপ্রকাশ এমন এক অনুপম ইবাদতের মাধ্যমে, যাহার দ্বারা রব্বুল আলামীনের অধিক নৈকট্য লাভ করা যায়।
তন্দ্রাবস্থায় সায়্যিদা আমিনার কাছে আগমনকারীদের সংখ্যা ছিল অসংখ্য-অগণিত, এই মর্মে আস্-সুয়ূতী আল-ওয়াকিদী-র সনদ-পরম্পরায় ইবন সা'দ-এর উদ্ধৃতিতে আরো উল্লেখ করিয়াছেন যে, "অসংখ্য আগমনকারী তন্দ্রাকালীন সময়ে আমার নিকট প্রায়ই আসিত এবং জিজ্ঞাসা করিত, তুমি কি নিজেকে একজন গর্ভবতী অনুভব করিতেছ? উত্তরে বলিতাম, না, মোটেই না"। এই সম্পর্কে আরো দ্র.।
ভূমিষ্ঠকালীন প্রকাশিত অলৌকিক ঘটনাবলীর প্রতক্ষকারী আশ-শিফা বিন্ত 'আমর ইব্‌ 'আওফ হইতে আরো কিছু বর্ণনা সীরাত গ্রন্থাবলীতে পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে সুয়ূতী (র) উল্লেখ করিয়াছেন, আবূ নু'আয়ম 'আবদুর রহমান ইবন 'আওফ হইতে, তিনি তাঁহার মাতা আশ্-শিফা বিন্ত 'আমর ইবন 'আওফ হইতে বর্ণনা করেন: সায়্যিদা আমিনার গর্ভ হইতে রাসূলুল্লাহ (স) উভয় হাতের উপর ভর দিয়া ভূমিষ্ঠ হইলেন এবং কিছুটা শব্দ করিলেন। অতঃপর আমি এক ব্যক্তিকে বলিতে শুনিলাম, "মহান আল্লাহ আপনার উপর অনুগ্রহ করুন। নিশ্চয় আপনার প্রতিপালক আপনার উপর অনুগ্রহ করিয়াছেন।" আশ্-শিফা বলেন, অতঃপর প্রাচ্য-প্রতীচ্যের মধ্যবর্তী সকল স্থান জ্যোতির্ময় হইয়া উঠিল। ফলে আমি রোম নগরীর সকল অট্টালিকা স্পষ্ট দেখিতে পাইলাম। তিনি বলেন, ইহার পর আমি তাঁহাকে কাপড় পরিধান করাইলাম এবং কাৎ করিয়া শোয়াইলাম। হঠাৎ দেখিতে পাইলাম, আমার ডান দিক হইতে একটা অন্ধকার আমাকে ঘিরিয়া ফেলিল। ফলে দেহ-মন কাঁপিয়া উঠিল এবং ভয়ের সঞ্চার হইল। তারপর আমি একজনকে বলিতে শুনিলাম, "তুমি তাঁহাকে কোথায় লইয়া যাইতেছ?” উত্তরে অন্যজন বলিল, আমি তাঁহাকে প্রতীচ্যে ভ্রমণে লইয়া যাইতেছি। তারপর সে আমার নিকট হইতে তাঁহাকে লইয়া গেল। কিছুক্ষণ পর আমার বাম দিক হইতে অনুরূপ অন্ধকার ও ভীতিজনক পরিস্থিতি আসিল, অতঃপর অনুরূপ প্রশ্নোত্তর শুনিতে পাইলাম। এইবার তিনি বলিলেন, আমি তাঁহাকে প্রাচ্যে ভ্রমণে লইয়া যাইতেছি। আশ্-শিফা বলেন, আমি এই ঘটনা প্রায়ই আলোচনা করিতাম। অবশেষে মহান আল্লাহ তাঁহাকে নবুওয়াত দান করিলেন। আর আমি তাঁহাদের মধ্যকারই একজন ছিলাম যাঁহারা প্রথমে ইসলাম গ্রহণ, করিয়াছিলেন।
আবূ নু'আয়ম রাসূলুল্লাহ (স.)-এর শুভ জন্মের মুহূর্তে ফেরেস্তাদের আগমন ও পারস্পরিক মুবারকবাদ জ্ঞাপন, শয়তান বন্দী, মূর্তির অধঃগতি ও বায়তুল্লাহ-র মৃদু কম্পন ইত্যাদি বিষয় প্রসঙ্গে 'আমর ইব্‌ন কুতায়বা-এর রিওয়ায়াত বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আমার বিজ্ঞ পিতাকে বলিতে শুনিয়াছি যে, যখন সায়্যিদা আমিনার গর্ভের সন্তান ভূমিষ্ঠ হইবার সময় নিকটবর্তী হইল তখন মহান আল্লাহ্ ফেরেস্তাদের বলিলেন, তোমরা আসমানের সকল দরজা খুলিয়া দাও, এমনকি জান্নাতের দ্বারগুলিও উন্মুক্ত করিয়া দাও। মহান আল্লাহ সকল ফেরেশতাকে তথায় উপস্থিত হইতে আদেশ করিলেন। ফলে ফেরেস্তারা পরস্পর মুবারকবাদ জ্ঞাপন করিতে করিতে অবতীর্ণ হইল।
ফেরেস্তাদের আগমন এত বেশী ছিল যে, সারা দুনিয়ার পাহাড়-পবর্তে দীর্ঘ সারির সৃষ্টি হইল, এমনকি উহা সমুদ্রগুলিতে পৌঁছাইয়া গেল এবং পারস্পরিক মুবারكবাদ জ্ঞাপন অব্যাহত রহিল। শয়তানকে ৭০টি শিকল দ্বারা বন্দী করা হইল এবং তাহাকে উপুড় করিয়া শ্বেত সাগরের গভীরে নিক্ষেপ করা হইল। সূর্যকে সেদিন অত্যুজ্জ্বল জ্যোতির্ময় আলোর বাহারী পোশাক পরিধান করানো হইল এবং উহাকে সায়্যিদা আমিনার শিয়রে স্থাপন করা হইল। সন্তরজন ফেরেস্তা মুহাম্মাদ (স)-এর শুভ জন্মগ্রহণের মুবারক মুহূর্তের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান ছিলেন। মহান আল্লাহ্র নির্দেশে মুহাম্মাদ (স)-এর সম্মানার্থে এই বৎসর প্রত্যেক মহিলার উদরে পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হইয়াছিল। মরুভূমির প্রতিটি বৃক্ষ ফলবতী হইয়াছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) ভূমিষ্ঠ হইলেন। ফেরেস্তারা মহানন্দে মুবারকবাদ জ্ঞাপন করিতে লাগিলেন। প্রত্যেক আসমানের যবরজদ ও য়াকৃত-এর খুঁটিসমূহ মুহূর্তে কম্পমান হইয়া উঠিল এবং জ্যোতির স্তম্ভে পরিণত হইল। মি'রাজের রাত্রে রাসূলে কারীম (স) ঐগুলিকে স্বচক্ষে দর্শন করিয়া চিনিতে পারিয়াছিলেন। কম্পিত হইবার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে উত্তর আসিল, আপনার শুভ জন্মগ্রহণের সুসংবাদ শ্রবণে ইহারা প্রকম্পিত হইয়াছিল। এই রাত্রে হাওযে ‘কাওছার’-এর প্রশস্ত তীরে ৭০ হাজার সুগন্ধিময় বৃক্ষ জন্মলাভ করিয়াছিল যাহার ফলগুলি মহান আল্লাহ জান্নাতবাসীদের সুগন্ধি গ্রহণের নিমিত্তেই সৃষ্টি করিয়াছেন।
ঐ মুহূর্তে প্রত্যেক আসমানবাসী মহান আল্লাহ্র কাছে অনাবিল শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য প্রার্থনা করিয়াছিলেন। মূর্তিগুলি উপুড় হইয়া পড়িয়াছিল। লাত-উয্যা হইতে আক্ষেপের আওয়াজ আসিতেছিল : আক্ষেপ! কুরায়শদের জন্য! তাহাদের কাছে আজ আল্-আমীন বা বিশ্বস্তজন পৌঁছিয়াছে, ‘আস্-সাদিক' বা সত্যবাদীর শুভাগমন হইয়াছে। অথচ সেদিন কুরায়শরা বুঝিতে পারে নাই লাত-উয্যার কি হইয়াছে?
বায়তুল্লাহ-র অভ্যন্তর হইতে এমন আওয়াজ হইতেছিল, যাহা প্রত্যেক শ্রবণকারী শ্রবণ করিয়াছিল। বায়তুল্লাহ যেন বলিতেছিল, "আজ আমার ‘নূর’ বা জ্যোতিকে যোগ্যতম ব্যক্তির খেদমতে প্রত্যর্পণ করা হইয়াছে। আমার প্রতিবেশীর আগমন হইয়াছে। জাহিলিয়্যাতের পঙ্কিলতা হইতে আমি মুক্ত হইলাম। ওহে লাত-উয্যা! তোমাদের ধ্বংস অনিবার্য।” ঐ মুহূর্ত হইতে বায়তুল্লাহ তিন দিন তিন রাত পর্যন্ত মৃদু কম্পমান অবস্থায় ছিল, যাহা মুহূর্তের জন্যও বন্ধ হয় নাই। রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ জন্মের মুহূর্তে ইহাই ছিল প্রথম 'আলামত বা নিদর্শন, যাহা কুরায়শগণ স্বচক্ষে দর্শন করিয়াছিল।
কোন কোন বর্ণনায় সমগ্র জগত আলোকিত হওয়ার উল্লেখ রহিয়াছে। এই মর্মে 'ইক্রিক্রমা (র)-এর রিওয়ায়াত ইব্‌ন আবী হাতিম বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) যখন ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন তখন সমগ্র জগত আলোকিত হইয়াছিল।
রাসূলে কারীম (স)-এর শুভ জন্মগ্রহণের মুহূর্ত হইতে মারদূদ শয়তান-এর অবাধ চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে সাত আসমানেই বাধার প্রাচীর সৃষ্টি করা হয়। এই প্রসঙ্গে মা'রূফ ইবন খাররাব্য- এর রিওয়ায়াত আয-যুবায়র ইব্‌ন বাক্কার ও ইবন 'আসাকির উল্লেখ করেন, তিনি বলেন, ইল্লীস সাত আসমান বিদীর্ণ করিয়া অবাধ চলাফেরা করিত। হযরত 'ঈসা (আ)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাহার অবাধ চলাফেরা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে তিনটি আসমানে বাধার প্রাচীর সৃষ্টি করা হয়। ইহার পর সে বাকী চার আসমানে অবাধে চলাফেরা করিত। অতঃপর রাসূলে কারীম (স) ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সাত আসমানেই বাধার প্রাচীর সৃষ্টি করা হয়।
রাসূলুল্লাহ (স) যে রাত্রিতে ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন ঐ রাত্রিতে যায়দ ইবন 'আমর ইব্‌ নুফায়ল, ওয়ারাকা ইবন নাওফাল এবং বাদশা নাজাশী তাঁহার শাহী বালাখানায় অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন। এই প্রসঙ্গে আস্-সুয়ূতী 'আল-খারাইতী (الخرائطی)-র বর্ণনা পূর্ণ সনদসহ এইভাবে উল্লেখ করেন যে, যায়দ ইবন 'আমার ইব্‌ নুফায়ল এবং ওয়ারাকা ইব্‌ নাওফাল উভয়ে বিভিন্ন সময়ে আমাদের কাছে এই মর্মে আলোচনা করিতেন যে, মক্কা হইতে বাদশাহ আব্রাহার প্রত্যাবর্তনের পর একবার আমরা বাদশাহ নাজাশীর দরবারে উপস্থিত হইলাম। তিনি আমাদেরকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ওহে কুরায়শ সম্প্রদায়ের লোকেরা! আমার কাছে সত্য করিয়া বল, তোমাদের মাঝে এমন কোন শিশু জন্মগ্রহণ করিয়াছে কি, যাহার বাবাকে যবেহ করিবার ইচ্ছা করা হইয়াছিল, অবশেষে লটারীর মাধ্যমে সে মুক্তি লাভ করিয়াছিল এবং তাঁহার পরিবর্তে অসংখ্য উট কুরবানী করা হইয়াছিল? আমাদের হাঁ-সূচক জবাবে তিনি বলেন, আচ্ছা! তাঁহার সম্পর্কে তোমাদের কি জানা আছে? আমরা বলিলাম, তিনি এক গুণবতী মহিলাকে বিবাহ করিয়াছিলেন, যাহার নাম 'আমিনা'। তিনি তাঁহাকে গর্ভাবস্থায় রাখিয়া চলিয়া যান। ইহা শ্রবণে নাজাশী জিজ্ঞাসা করেন, তাঁহার কোন সন্তান ভূমিষ্ঠ হইয়াছে কিনা। ওয়ারাকা বলিলেন, ওহে সম্রাট! এই ব্যাপারে আমি আপনাকে এক অলৌকিক ঘটনার সংবাদ জানাইতেছি যে, ঐ রাত্রে আমি আমার মূর্তির কাছে উপস্থিত ছিলাম। এতমতাবস্থায় উহার ভিতর হইতে আওয়াজ শুনিতে পাইলাম:
ولد النبى فذلت الاملاك ونأى الضلال وأدبر الاشراك 'নবীকুল শিরোমণি ভূমিষ্ঠ হইয়াছেন, সমগ্র রাজ-রাজ্য ভূলুণ্ঠিত হইয়াছে ও গোমরাহী দূরীভূত হইয়াছে এবং সমস্ত শিরকের অবসান ঘটিয়াছে।"
অতঃপর যায়দ বলিলেন, ওহে সম্রাট। আমারও কাছে ওয়ারাকা-এর অনুরূপ একটি আশ্চর্যজনক অলৌকিক সংবাদ আছে। ঐ রাত্রিতে আমি আবূ কুবায়س পাহাড়ের নিকটেই উপস্থিত ছিলাম। সবুজ ডানার উপর ভর করিয়া হঠাৎ এক ব্যক্তিকে আমি আবূ কুবায়س পাহাড়ের চূড়ায় অবতরণ করিতে দেখিলাম। মক্কার অভিমুখে কিছু দূর অগ্রসর হইয়া তিনি বলিলেন 'শয়তান অপদস্থ হইয়াছে, মূর্তিসমূহ ধ্বংস হইয়াছে এবং 'আল-আমীন' ভূমিষ্ঠ হইয়াছেন'। অতঃপর একখানা কাপড় প্রসারিত করিলেন, যাহা পূর্ব-পশ্চিম দিগন্ত ঢাকিয়া ফেলিল। অবশেষে যাহা কিছু আসমানের নীচে ছিল উহা আমার কাছে উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল এবং এমন জ্যোতির বিচ্ছুরণ হইল, যাহা আমার দৃষ্টিশক্তি যেন কাড়িয়া লইল এবং আমাকে ভীত ও বিহ্বল করিয়া তুলিল। অবশেষে উভয় ডানা আঘাত করিতে লাগিল এবং উহা কা'বা গৃহে অবতীর্ণ হইল। ইহার পর উহা হইতে এমন আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হইল যাহাতে সমগ্র "তিহামা” আলোকিত হইয়া উঠিল। সমগ্র পৃথিবী পবিত্রতা লাভ করিল, পর্বতসমূহ ঝুঁকিয়া পড়িল। মূর্তিগুলিতে এমন এক বিশেষ কম্পন সৃষ্টি হইয়াছিল যাহার প্রতিক্রিয়ায় সেইগুলি ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছিল।
অবশেষে নাজাশী তাঁহার শাহী বালাখানার নির্জন কক্ষে প্রত্যক্ষ করা বিভীষিকাময় ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়া বলেন, আরে তোমাদের সর্বনাশ হউক! তোমাদের উভয়কে এমন এক বিভীষিকাময় ঘটনার সংবাদ জানাইব যাহা আমাকে বড় বিপদে ফেলিয়াছিল। তোমরা উভয়ে যে রাত্রের বিবরণ প্রদান করিয়াছ, ঐ রাত্রেই আমি আমার শাহী বালাখানায় নিদ্রিত ছিলাম। এই নির্জন মুহূর্তে মাটির অভ্যন্তর হইতে এক বিশালকায় গ্রীবা ও মাথা বাহির হইয়া আসিল এবং বলিতে লাগিল, 'আসহাবুল ফীল'-এর মাধ্যমে ধ্বংসের আশু সমাধান নিশ্চিত হইল, আবাবীল পাখির দ্বারা নুড়িপাথর নিক্ষেপ করা হইল, সীমালংঘনকারী ও পাপিষ্ঠদের মূলোৎপাটন করা হইল, নবীকুল শিরোমণি ভূমিষ্ঠ হইয়াছেন, যিনি 'আল-উম্মী' (অক্ষর জ্ঞানহীন), 'আল-হারামী' (মহিমান্বিত হারামের বাসিন্দা) ও 'আল-মাক্কী' (মক্কাবাসী)। তাঁহার আহ্বানে যাহারাই সাড়া দিবে, তাহারাই প্রকৃত সৌভাগ্যশালী হইবে এবং যাহারা অস্বীকার করিবে তাহারাই শত্রুতায় পতিত হইয়া দুর্ভাগ্যশীল হইবে। অতঃপর সেই বিশালাকারের মাথাসহ দীর্ঘকায় গ্রীবাটি মাটির অভ্যন্তরে প্রবেশ করিল এবং হঠাৎ অদৃশ্য হইয়া গেল। অবশেষে আমি প্রাণপণে চিৎকার দিতে চেষ্টা করিলাম, কিন্তু কোনরূপ কথা বাহির হইতেছিল না। সোজা হইয়া দাঁড়াইবার শক্তিটুকু ও হারাইয়া ফেলিয়াছিলাম। এমতাবস্থায় আমার স্ত্রী আমার নিকট আসিল এবং আমি তাহাকে বলিলাম, আমার এবং হাবশার এই শাহী বালাখানার মধ্যবর্তী স্থান পর্দা দ্বারা ঢাকিয়া দাও। ইহার পর আমাকে ঢাকিয়া দেওয়া হইল। অবশেষে আমি কথা বলিতে পারিলাম এবং আমার পা সঞ্চালিত হইল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণের তারিখ ও জন্মস্থান

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণের তারিখ ও জন্মস্থান


হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর জন্মগ্রহণের বৎসর ছিল হস্তী বৎসর (আমুল ফীল)। এই প্রসঙ্গে ইব্‌নুল-আছীর (র) তাঁহার সীরাত-এ উল্লেখ করিয়াছেন: কায়س ইব্‌ন মাখ্রামা, কুবাছ ইব্‌ন আশয়াম ও ইব্‌ন ইস্হাক বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) হস্তী বৎসরে জন্মগ্রহণ করেন। আয-যাহাবী কায়স ইব্‌ন মাখামা ইবনুল মুত্তালিব-এর বর্ণনা এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন, আমি এবং রাসূলুল্লাহ (স) হস্তী বৎসরে জন্মগ্রহণ করিয়াছি এবং আমরা উভয়ে দুই ভাই ছিলাম।
হস্তী বৎসর প্রসঙ্গে ইবন সা'দ উল্লেখ করিয়াছেন যে, "আসহাবুল ফীল" বা হস্তীবাহিনীর আগমন ছিল মুহাররম মাসের মাঝামাঝি সময়ে এবং রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম এবং সংঘটিত হস্তী বাহিনীর ঘটনার মাঝে ব্যবধান ছিল মাত্র ৫৫ দিন। যাদুল-মা'আদ-এ বর্ণিত আছে, হযরত মুহাম্মাদ (স) "আমুল-ফীল'-এ জন্মগ্রহণ করেন, এই ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য নাই এবং হস্তী বাহিনীর ঘটনাটি ছিল রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ জন্মের নিদর্শনস্বরূপ।
'সীরাতুল্-মুস্তাফা' গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স) হস্তীবাহিনীর ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ৫০ অথবা ৫৫ দিন পর জন্মগ্রহণ করেন।
হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর জন্মগ্রহণের মাস ও দিন সম্পর্কে সর্বসম্মত মত হইল, তিনি রাবী'উল আওয়াল মাসের সোমবার সুবহে সাদিকের সময় জন্মগ্রহণ করেন। সোমবার দিনটি ছিল রাসূলে কারীম (স) -এর জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রসঙ্গে ইন্ন কাছীর ইন্ন আব্বাস (রা)-এর রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সোমবার জন্মগ্রহণ করেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুয়াত প্রাপ্তির দিনটিও ছিল সোমবার, তিনি মক্কা হইতে মদীনার উদ্দেশ্যে সোমবার দিনই রওয়ানা করিয়াছিলেন এবং মদীনা মুনাওয়ারাতে সোমবার দিনই পৌছিয়াছিলেন। ইহা ছাড়া সোমবার দিনই তিনি ইইজগত হইতে বিদায় গ্রহণ করেন, এমনকি এই দিনই 'হাজরে আসওয়াদ' বায়তুল্লাহতে স্থাপন করা হইয়াছিল। ইমাম যাহাবী তাঁহার সীরাতগ্রন্থে ইমাম আহমাদ-এর "মুস্লাদ"-এ বর্ণিত একটি রিওয়ায়াত এই প্রসঙ্গে উদ্ধৃত করিয়াছেন যাহাতে বর্ণিত হইয়াছে যে, সোমবার দিনই মক্কা বিজয় হইয়াছিল এবং সোমবারই সূরা আল-মাইদা অবতীর্ণ হইয়াছিল। ইব্‌ন হিশাম-এর 'সীরাত'-এর পাদটীকায় যুবায়র-এর উদ্ধৃতি বর্ণনাপূর্বক রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণের মাস রাবীউল্-আওয়াল-এর পরিবর্তে 'রামাদান' উল্লিখিত হইয়াছে। এই মতের প্রবক্তাগণ দাবি করেন যে, সায়্যিদা আমিনা বিন্তে ওয়াহ্ 'আয়‍্যামে তাশ্রীক' অর্থাৎ যিলহাজ্জ মাসের মাঝামাঝি সময়ে গর্ভবতী হইয়াছিলেন। 'সীরাতুল্-মুস্তাফা'-এর পাদটীকায় বর্ণিত হইয়াছে যে, প্রায় অধিকাংশ 'উলামা-ই-কিরাম-এর অভিমত হইল যে, রাসূলে কারীম (স) রাবী'উল্ আওয়াল মাসেই জন্মগ্রহণ করেন। 'আল্লামা ইবনুল-জাওযী উল্লেখ করিয়াছেন, এই অভিমতের উপর সমস্ত আলিম-এর ইজমা হইয়াছে। তবে কেহ কেহ রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মমাস রাবীউহ্ ছানীকেই গ্রহণ করিয়াছেন। আবার কেহ কেহ 'সফর' মাসে রাসূলে কারীম (স) জন্মগ্রহণ করেন বলিয়াও অভিমত ব্যক্ত করিয়াছেন। আল্লামা যুরকানী বলিয়াছেন যে, এই সকল বর্ণনায় যথেষ্ট দুর্বলতা রহিয়াছে।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম চান্দ্র বৎসরের রাবীউল্ আওয়াল মাসের কোন্ তারিখে হইয়াছিল এই প্রসঙ্গে প্রামাণ্য ও প্রাচীন সীরাত গ্রন্থসমূহে বিভিন্ন মত উল্লিখিত হইয়াছে। ইব্‌ন কাছীর ও ইবনুল-আছীর উল্লেখ করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) ১২ রবীউল আওয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। ইহাই অধিকাংশের মত।
ড. আকরাম যিয়াউল-উমরী তাঁহার গবেষণায় তিনটি মত ব্যক্ত করিয়াছেন। তন্মধ্যে ১২ রবীউল্-আওয়ালকে নির্ভরযোগ্য বলিয়াছেন। ইহাই ইব্‌ন ইসহাকের মত। নাদ্রাতুন্-না'ঈম-এর পাদটীকায় বর্ণিত হইয়াছে, 'আমাদের বিবেচনায় ইব্‌ন ইসহাকের বর্ণনাটি অধিক নির্ভরযোগ্য'। আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-এর এক বর্ণনায় উল্লিখিত হইয়াছে, ইব্‌ন ইসহাক জোরালোভাবে এই মতকে সমর্থন করিয়াছেন।
মহানবী (স)-এর জন্ম প্রসঙ্গে অন্যান্য সীরাত গ্রন্থসমূহে ভিন্ন তারিখও উল্লিখিত হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে শিবলী নু'মানী মিসরের খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাহমূদ পাশা ফালাকীর মতামতের আলোকে ৯ রাবীউল আওয়াল/২০ এপ্রিল, ৫৭১ খৃ.-কে প্রাধান্য দিয়াছেন। কাযী সুলায়মান মানসূরপুরী, "রাহমাতুল্লিল আলামীন” নামক গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করিয়াছেন যে, ৯ রব্বীউল-আওয়াল, 'আমুল্-ফীল' মুতাবিক ২২ এপ্রিল, ৫৭১ খৃ., ১ জ্যৈষ্ঠ/৬২৮ বিক্রমিতে মক্কা মু'আজ্জামাতে রাসূলুল্লাহ (স) জন্মগ্রহণ করেন। আয-যাহাবী উপরিউক্ত মতকে সহীহ্ বলিয়াছেন।
হিফজুর রহমান সীওয়াহারবী উল্লেখ করিয়াছেন যে, "মাহমূদ পাশা ফালাকী কনস্টানটিনোপল-এর একজন প্রসিদ্ধ ও খ্যাতনামা জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তিনি তাঁহার গবেষণার আলোকে এই কথা প্রমাণে সচেষ্ট হইয়াছেন যে, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সময় হইতে তাহার সময় পর্যন্ত সংঘটিত সবগুলি সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের নিখুঁত হিসাব করিলে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলে কারীম (স)-এর শুভ জন্মতারিখ ১২ রাবীউল আওয়াল হইতেই পারে না, বরং উহা ৯ রাবীউল আওয়াল হইবে। কাসাসুল-কুরআন-এ উল্লিখিত মতকে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য বলিয়া ব্যক্ত করা হইয়াছে। প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ এবং ঐতিহাসিকগণ তাঁহাদের সীরাত গ্রন্থসমূহে উল্লিখিত তারিখের প্রামাণ্য বুঝাইতে আরবী 'সাহীহ' صحيح এবং 'আছবাত' (اثبت) শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন, যাহার অর্থ 'বিশুদ্ধ এবং 'নির্ভরযোগ্য'। ইহা ছাড়া হুমায়দী, 'আকীল, য়ূনুস ইব্‌ন ইয়াযীদ, ইব্‌ন 'আবদুল্লাহ, মুহাম্মাদ ইব্‌ন মূসা, আবুল্-খাত্তাব, খাওয়ারিযমী, ইব্‌ন দাহয়া, ইব্‌ন তায়মিয়া, ইবনুল কায়্যিম, ইব্‌ন হাজার 'আসকালানী, শায়খ বদরুদ্দীন 'আয়নী প্রমুখ 'উলামার ইহাই অভিমত।
আল্-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া গ্রন্থে ইব্‌ন কাছীর (র) রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম সম্পর্কিত সূদীর্ঘ আলোচনার পর উপসংহারে বর্ণনা করিয়াছেন যে, এই প্রসঙ্গে বিশুদ্ধতম ও সঠিক হইল ৮ রাবীউল-আওয়াল। আল-হুমায়দীও ইব্‌ন হাযম (র) হইতে উপরিউক্ত মতটি উল্লেখ করিয়াছেন। ইমাম মালিক (র) 'আকীল (র), য়ূনুস ইব্‌ন ইয়াযীদ (র) এবং অন্যান্য বিজ্ঞজন ইমাম যুহরী (র) হইতে উহা বর্ণনা করিয়াছেন। ইবন 'আবদুল্-বার (র) প্রখ্যাত ঐতিহাসিকদের উদ্ধৃতি উল্লেখ করিয়া বলিয়াছেন, তাঁহারা এই মতকে বিশুদ্ধ মনে করিয়াছেন।
ইবনুল্-জাওযী রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম ৮ রবীউল-আওয়াল উল্লেখ করিয়াছেন। সীরাতুল্- মুস্তাফা-তে উল্লিখিত হইয়াছে যে, "মূলত ৮ তারিখ বা ৯ তারিখ-এর পার্থক্যটাই মূল পার্থক্য নহে বরং এই পার্থক্যের মূল ভিত্তি হইতেছে আরবী মাস ২৯ অথবা ৩০ দিনে হওয়া বা না হওয়া। অতএব ইহা যখন প্রমাণিত হইল যে, ঐ তারিখটি ২১ এপ্রিল ছিল, সুতরাং ৮ তারিখের বর্ণনাগুলি মূলত ৯ তারিখের পক্ষেই প্রমাণিত হয়।"
কোন কোন ঐতিহাসিক রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্ম ১০ রাবীউল-আওয়াল উল্লেখ করিয়াছেন। ইব্‌ন সা'দ এই প্রসঙ্গে আবূ জা'ফার মুহাম্মাদ ইব্‌ন আলী (র)-এর বর্ণনা এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে, "রাসূলুল্লাহ (স) ১০ রবীউল্-আওয়াল জন্মগ্রহণ করিয়াছেন"। ইব্‌ন কাছীর উল্লেখ করিয়াছেন, এই মতটি ইব্‌ন দাহয়া এবং ইব্‌ন 'আসাকির আবূ জা'ফার আল্-বাকির হইতে বর্ণনা করিয়াছেন।
আল্-ওয়াকিদী উল্লিখিত মতকে গ্রহণ করিয়াছেন। ইব্‌ন আবদুল বাবুর আল্-ইস্স্তী'আব-এ বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) রাবী'উল-আওয়াল মাসের ২ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। আবূ মা'শার আস্-সানাদী উল্লিখিত মতকে গ্রহণ করিয়াছেন।
ইব্‌ন আব্বাস (র) ও জাবির (রা)-এর রিওয়ায়াত ইব্‌ন আবূ শায়বা তাঁহার 'আল-মুসান্নাফ' গ্রন্থে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) ১৮ রাবী'উল-আওয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। তবে কোন কোন ঐতিহাসিক ১৭ এবং ২২ রাবী 'উল-আওয়াল উল্লেখ করিয়াছেন।
রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার শুভ মুহূর্ত সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও মুহাদ্দিছীন-এর বিভিন্ন মত রহিয়াছে। তবে প্রসিদ্ধতম মত হইল রাসূলুল্লাহ (স) সুবহে সাদিক-এর সময় জন্মগ্রহণ করেন। এই প্রসঙ্গে আয-যুবায়র ইন্ন বাক্কার এবং ইবন 'আসাকির মা'রূফ ইবন হায্যাবৃয (معروف بن حزبوذ)-এর বর্ণনা উল্লেখ করেন: রাসূলুল্লাহ (স) সোমবার ফজর তথা সুবহে সাদিক-এর সময়ে ভূমিষ্ঠ হন। মুহাম্মাদ ইদ্রীস কান্ধালাবী, সীরাতুল্-মুস্তাফা, পৃ. ৫১, পাদটীকা ৩; দা. মা. ই., ১৯ খ., পৃ. ১২; মুহাম্মাদ ইদ্রীস কান্ধলাবী (র) উল্লেখ করিয়াছেন, "যদিও এই রিওয়ায়াতটি সনদের দিক দিয়া দুর্বল, তবুও ইহা দ্বারা অন্যান্য সকল বর্ণনার মধ্যে অসামঞ্জস্যতা দূর করা সম্ভব। কেননা কোন কোন রিওয়ায়াত দ্বারা বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (স)-এর শুভ-জন্ম দিনের বেলায় হইয়াছিল। অপরাপর বর্ণনা হইতে জানা যায়, তিনি (স) রাত্রি বেলায় ভূমিষ্ঠ হন। যদি কেহ এই দাবি করেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সুবহে সাদিক-এর সময় জন্মগ্রহণ করেন তবে ইহা অত্যুক্তি হইবে না। সুতরাং যে সমস্ত রিওয়ায়াত-এ সোমবার দিন অথবা সোমবার রাত-এ ভূমিষ্ঠ হওয়ার বর্ণনা উল্লিখিত হইয়াছে, উভয় রিওয়ায়াত-ই সহীহ। আর যে সমস্ত বর্ণনায় সুব্‌হ সাদিক-এর উল্লেখ রহিয়াছে উহার মর্মার্থ ইহাও হইতে পারে যে, রাত্রেই জন্মগ্রহণের সকল লক্ষণ ও চিহ্ন প্রকাশ পাইয়াছিল। ইব্‌ন হিব্বান মা'রূফ ইন হায্যাবুয সম্পর্কে বলিয়াছেন, "তিনি একজন নির্ভরযোগ্য রাবী।" এই প্রসঙ্গে আবূ হাতেম বলিয়াছেন, "ইবন হায্যাবুষ-এর হাদীছ গ্রহণ করা যায়"।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার মুবারক স্থান কোনটি ছিল, এই প্রসঙ্গে "যাদুল-মা'আদ-"-এ উল্লিখিত হইয়াছে যে, "মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) যে মক্কা মুকাররামা নগরীতেই জন্মগ্রহণ করেন এই ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য নাই"। ইবনুল-আছীর তাঁহার সীরাত-এ ইবন ইসহাক-এর রিওয়ায়াত এইভাবে উল্লেখ করিয়াছেন, "রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণের মুবারক স্থানটি মুহাম্মাদ ইব্‌ন যুসুফ-এর ঘরে। জন্মগ্রহণের ঐ মুবারক স্থান সম্পর্কে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (স)-ঐ জায়গাটুকু 'আকিল ইব্‌ন আবী তালিবকে দান করিয়াছিলেন। তাহার মৃত্যু পর্যন্ত উহা তাঁহার অধিকারে ছিল। তাহার মৃত্যুর পরে হাজ্জাজ ইব্‌ন য়ূসুফ-এর ভাই মুহাম্মাদ ইবন য়ূসুফ-এর কাছে উহা বিক্রি করিয়া দিয়াছিলেন এবং সেখানেই তিনি একটি সুন্দর ঘর তৈরি করিয়াছিলেন যাহা “দারু ইব্‌ন য়ূসুফ” বা ইবন য়ূসুফ-এর ঘর নামে প্রসিদ্ধ।
মুহাম্মাদ আল-খিদরী উল্লেখ করিয়াছেন, "মুহাম্মাদ (স)-এর ভূমিষ্ঠ হওয়ার বরকতময় স্থানটি ছিল বানু হাশিম উপত্যকার আবূ তালিব-এর ঘর। জন্মগ্রহণকালে আবদুর রহমান ইবন 'আওফ-এর আম্মা শিফা তথায় উপস্থিত ছিলেন। ইবন হিশাম-এর সীরাত-এর পাদটীকায় এই প্রসঙ্গে উল্লেখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স) মক্কা মুকাররমার পাহাড়ে অবস্থিত কোন এক মুবারক ঘরে ভূমিষ্ঠ হন। তবে কেহ কেহ উল্লেখ করিয়াছেন যে, সাফা পর্বতের নিকটে অবস্থিত কোন বাড়ীতে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
নবী (স) সুবহে সাদিক-এর মুবারক মুহূর্তে বায়তুল্লাহ শরীফের অনতিপূর্বে মাওলিদুন নাবী নামে পরিচিত স্থানে জন্মগ্রহণ করেন, যেখানে বর্তমানে একটি গ্রন্থাগার স্থাপিত হইয়াছে। আবদুর রউফ দানাপূরীর আসাহহুস-সিয়ার গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, তিনি বায়তুল্লাহ্র অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু ইহা প্রমাণিত নহে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর খত্না

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর খত্না


রাসূলুল্লাহ (স) খতনাকৃত অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। ইবন কাছীর বায়হাকীর রিওয়ায়াত উল্লেখপূর্বক আব্বাস ইব্‌ন আবদিল মুত্তালিব হইতে এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) মাখতুন অর্থাৎ খতনাকৃত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হন। ইবনুল জাওযী সীরাত-এ এই প্রসঙ্গে আনাস (রা)-এর রিওয়ায়াত এইভাবে বর্ণনা করিয়াছেন, তিনি বলিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করিয়াছেন, আমার জীবনের প্রদত্ত মর্যাদাসমূহের অন্যতম মর্যাদা হইল, আমি খত্নাকৃত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হইয়াছি যাহা সাধারণত দেখা যায় না। ইব্ন কাছীর সীরাত গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে আরো বর্ণনা করিয়াছেন যে, কতক রাবী এই বর্ণনাটিকে মুতাওয়াতির” হাদীছের মর্যাদা দান করিয়াছেন।
যাদুল মা'আদ -এ উল্লিখিত হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর খতনা প্রসঙ্গে তিনটি মত পাওয়া যায় : (১) তিনি (স) খতনাকৃত অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন, (২) হযরত হালীমা সা'দিয়া-এর ঘরে থাকাকালে যখন জিব্রাঈল (আ) তাঁহার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়াছিলেন তখন তিনি খতনাও করাইয়াছিলেন এবং (৩) তাঁহার পিতামহ 'আবদুল মুত্তালিব নিজেই তাঁহার খতনা করাইয়াছিলেন, যাহা আরবদের সাধারণ নিযম ছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ইব্‌ল্লীসের কান্নাকাটি

📄 ইব্‌ল্লীসের কান্নাকাটি


রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মগ্রহণকালে অভিশপ্ত ইবলীস ভীষণভাবে ক্রন্দন করিয়াছিল। আস্-সুহায়লী বাকী ইব্‌ন মাল্লাদ হইতে এই প্রসঙ্গে বর্ণনা করিয়াছেন যে, “নিঃসন্দেহে ইবলীস চারবার ভীষণভাবে কান্নাকাটি করিয়াছিলঃ (১) যখন সে অভিশপ্ত হইয়াছিল, (২) জান্নাত হইতে তাহাকে চিরতরে নামাইয়া দেওয়া হইয়াছিল, (৩) রাসূলুল্লাহ (স) যখন জন্মগ্রহণ করেন এবং (৪) যখন সূরা আল-ফাতিহা অবতীর্ণ হইয়াছিল” (ইব্‌ন কাছীর, আস্-সীরাতুন্- নাবাবিয়্যা, ১খ. পৃ. ২১২)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00