📄 স্বামীর ইনতিকালে আমিনার শোক
স্বামীর ইনতিকালের সংবাদে আমিনা শোকে মুহ্যমান হইয়া পড়েন। অতঃপর তাঁহার স্মরণে শোকগাঁথা রচনা করেন।
عَفَا جَانِبُ الْبَطْحَاءِ مِنْ ابْنِ هَاشِمٍ - وَجَاوَرَ لَحَداً خَارِجًا فِي الْغَمَاعَمِ دَعَتْهُ الْمَنَايَا دَعْوَةً فَأَجَابَهَا - وَمَا تَرَكَتْ فِي النَّاسِ مِثْلَ ابْنِ هَاشِمٍ عَشِيَّةً أَحوا يحملون سرير . تُعَاوِرُهُ أَصْحَابُهُ فِي التَّزَاحُمِ فَإِنْ يَكُ غَالَتْهُ الْمَنَايَا وَرَيْبُهَا - فَقَدْ كَانَ مِعْطَاءٌ كَثِيرًا التَّرَاحُمِ
"মক্কার একটি কোণ ইবন হাশিম (অর্থাৎ আবদুল্লাহ্) হইতে খালি হইয়া গেল, কাফনে পরিবেষ্টিত অবস্থায় স্বজনদের হইতে বহু দূরে তিনি করবস্থ হইলেন। মৃত্যু তাঁহাকে আকস্মিকভাবে আহবান করিলে তিনি তাহার ডাকে সাড়া দিলেন, মৃত্যু কিন্তু মানব সমাজে হাশিমের এই ছেলেন মত কাহাকেও রাখিয়া গেল না।
বিদায় সম্ভাষণকারিগণ তাঁহাকে খাটিয়ায় বহন করিয়া বৈকাল লগ্নে রওয়ানা করিল। সঙ্গী-সাথীরা অতি সমাদরে ভিড় করিয়া পালাক্রমে তাঁহাকে বহন করিয়া লইল। যদিও অসাবধান অবস্থায় মৃত্যু ও উহার কারণসমূহ তাঁহাকে গ্রাস করিয়া ফেলিয়াছে, তবুও তিনি ছিলেন সমাজের এক মহান দাতা ও দয়াদ্র ব্যক্তি" (যুরকানী, ১খ, পৃ. ১১০)।
📄 আবদুল্লাহ্ ত্যাজ্য সম্পত্তি
ইনতিকালের সময় আবদুল্লাহর ত্যাজ্য সম্পত্তি ছিল সাধারণ মানের। পরবর্তী কালে উত্তরাধিকার সূত্রে হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) এই সম্পত্তির অধিকারী হন। উহা ছিল নিম্নরূপঃ একটি দাসী, তাহার কুনিয়াত ছিল উম্মু আয়মান, অপর নাম ছিল বারাকা। পাঁচটি উট এবং এক পাল ছাগল। এই সূত্রে উন্মু আয়মান শিশুকালে রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে লালন-পালন করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহাকে অত্যন্ত সমাদর করিতেন, তাঁহার গৃহে যাতায়াত করিতেন, তাঁহাকে মাতার মত সম্মান করিতেন। উম্মু আয়মানের প্রথম বিবাহ হয় 'উবায়দ আল-হুবাশীর সহিত। এই পক্ষেরই সন্তান ছিলেন আয়মানা। তাঁহার দ্বিতীয় বিবাহ হইয়াছিল যায়দ ইব্ন হারিছা (রা)-এর সহিত। যায়দের ঔরসজাত সন্তান ছিলেন উছামা (রা)। আবু বাক্স ও 'উমার (রা) নিজ নিজ খিলাফত কালে তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিবার জন্য তাঁহার গৃহে গমন করিতেন। আয়মান ঐতিহাসিক হুনায়ন যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন। হযরত 'আব্বাস (রা) ঐ দিন তাঁহার অতি বীরত্বের প্রশংসা করিয়াছিলেন। উসামা ইবন যায়দ (রা)-কে রসূলুল্লাহ্ (স) মনে-প্রাণে ভালবাসিতেন। হিজরী ৪৫ সনে উসামা ইনতিকাল করেন। উম্মু আয়মান ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করিবার পর হাবশা ও মদীনা উভয় স্থানে হিজরতে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর মৃত্যুর পর কেহ তাঁহার কান্না দেখিয়া উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলে তিনি বলিয়াছিলেন:
إِنِّي عَلِمْتُ أَنَّ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَيْمُوتُ وَلَكِنْ أَبْكِي عَلَى الْوَحْيِ الَّذِي دُفِعَ عَنَّا .
“আমি জানিতাম যে, নবী (স) অচিরেই ইনতিকাল করিবেন। তবে আমি এইজন্য কাঁদিতেছি যে, আমাদের প্রতি যে ওহী অবতীর্ণ হইত তাহা বন্ধ হইয়া গেল”।
📄 আমিনার ইনতিকাল
ত্রিশ বৎসর বয়সে আমিনা ইনতিকাল করেন। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর বয়স ছিল তখন ছয় বৎসর। যাহাবীর মতে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর বয়স তখন ছয় বৎসর এক শত দিন। কেহ কেহ বলেন, তখন তাঁহার বয়স হইয়াছিল চার বৎসর। দুধমাতা হালীমা সা'দিয়া (রা) রাসূলুল্লাহ (স)-কে আমিনার নিকট প্রত্যর্পণ করিলেন। আমিনা পুত্রকে লইয়া তাঁহার দাদা আবদুল মুত্তালিবের মাতুলালয় পবিত্র মদীনার বানু নাজ্জার গোত্রে গমন করিলেন। তখন ছিল খৃস্টীয় সনের ৫৭৫-৭৬ সাল। তথা হইতে ফিরিবার প্রাককালে আমিনা অসুস্থ হইয়া পড়েন এবং উহার ফলে তাঁহার জীবনাবসান হয়। 'আল-আবওয়া' নামক স্থানে তাঁহাকে দাফন করা হয়। ইহা মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত, তবে তাহা মদীনার নিকটতম স্থান। মাতার ইনতিকালের পর রাসূলুল্লাহ (স)-কে লইয়া তাঁহার সফরসঙ্গীনি দাসী উম্মু আয়মান (রা) মক্কায় ফিরিয়া আসেন। অতঃপর তাঁহাকে পিতামহ আবদুল মুত্তালিবের নিকট সোপর্দ করেন। পিতামহের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি তাঁহার তত্ত্বাবধানে ছিলেন।
আবূ নু'আয়ম ইমাম যুহরী সূত্রে উম্মু সিমা'আ বিন্ত আবী রাহমের মাতার একটি উক্তির বর্ণনা এইরূপে দিয়াছেনঃ রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাতা আমিনা যখন রোগাক্রান্ত হইয়াছিলেন তখন আমি তাঁহার শয্যাপাশে ছিলাম। পাঁচ বৎসরের শিশু মুহাম্মাদ তখন তাঁহার মাথার পার্শ্বে উপবিষ্ট ছিলেন। আমিনা তাঁহার দিকে তাকাইয়া নিম্নোক্ত শ্লোকগুলি আবৃত্তি করিত ছিলেন:
بَارَكَ اللَّهُ فِيكَ مِنْ غُلَامٍ - يَا ابْنَ الَّذِي مِنْ حَوْمَتِهِ الْحُمَامِ نَجَا بِعَوْنِ الْمَلِكِ الْمِنْعَامِ - فَوُدَى غَدَاةَ الضَّرْبِ بِالسَّهَامِ بمأة من الابل سوام - ان صَحَ مَا أَبْصَرْتُ فِي الْمَنَامِ فَأَنْتَ مَبْعُوثُ إِلَى الأَنَامِ - مِنْ عِنْدِ ذِي الجلال والاكرام تُبْعَثُ فِي الْحَرَامِ - تُبْعَثُ بِالتَّحْقِيقِ وَالإِسْلامِ دِينُ أَبِيكَ التَبْرِ أَبْراهام - فَاللَّهُ أَنْهَاكَ عَنِ الْأَصْنَامِ . أَنْ لَا تُوَ اليْهَا مَعَ الْأَقْوَامِ
"হে পুত্র! আল্লাহ তোমাকে বরকত দান করুন। হে অভিজাত পিতার আকাঙ্ক্ষিত পুত্র! যেই পিতা মুক্তি লাভ করিয়াছিলেন অনুগ্রহকারী আল্লাহ্ অনুকম্পায়, যখন তীর টানায় তাহার নাম বাহির হইয়াছিল। অতঃপর বিচরণশীল এক শত উট মুক্তিপণ হিসাবে কুরবানী করা হইয়াছিল। সেই স্বপ্নে আমি যাহা দেখিয়াছিলাম তাহা যদি সঠিক হয়। তাহা হইলে তুমি মানবজাতির প্রতি অবশ্যই প্রেরিত, মহান মর্যাদা সম্পন্ন আল্লাহর পক্ষ হইতে। তুমি হারাম শরীফ ও উহার বাহিরের জগতে প্রেরিত হইবে। তুমি সত্য ইসলাম ধর্ম লইয়া আবির্ভূত হইবে, যাহা তোমার পুণ্যময় পিতা ইবরাহীম ('আ)-এর ধর্ম। আল্লাহ তোমাকে প্রতিমা পূজা হইতে বিরত রাখিবেন, অন্যান্য জাতির সহিত তুমি প্রতিমার অনুসরণ করিবে না।"
এই শ্লোকগুলি আবৃত্তি করিবার পর আমিনা বলেন, প্রতিটি জীবিতকেই মরিতে হইবে, প্রতিটি নূতনকেই পুরাতন হইতে হইবে এবং সকল বৃদ্ধই ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। আমি এখন মৃত্যু পথের যাত্রী, কিন্তু আমি স্মরণীয় হইয়া থাকিব। আমি তোমাকে উত্তম (পুত্র) রাখিয়া যাইতেছি এবং অত্যন্ত পুত ও পবিত্র অবস্থায় জন্ম দিয়াছি। এই কথা বলিবার পর তাঁহার ইনতিকাল ইয়া যায়। তাঁহার মৃত্যুতে জিন জাতি বিলাপ শুরু করে। কান্নাকালে তাহারা যাহা বলিয়াছিল তাহার মধ্য হইতে আমি কিছু স্মরণ রাখিয়াছি। তাহা হইল নিম্নরূপ:
نَبْلِي الْفَتَاةَ الابرة المينَةَ أَذَاتَ الْجَمَالِ العِفَّةِ الرَّزِينَة زَوْجَةٌ عَبْدِ اللهِ وَالْقَرِينَه - أم نبي الله ذي السكينة وَصَاحِبُ الْمِنْبَرِ بِالْمَدِينَةِ - صَادَتْ لِذِي حُفْرَتِهَا رَهِينَةٌ
"আমরা সেই যুবতীর জন্য কাঁদিতেছি যিনি ছিলেন পুণ্যবতী ও বিশ্বস্ত, আরও ছিলেন তিনি রূপবতী, সতীসাধ্বী ও মর্যাদার অধিকারী। তিনি ছিলেন আবদুল্লাহ্র সহধর্মিণী ও জীবনসঙ্গীনী, আল্লাহর নবীর মাতা স্বস্তির অধিকারিনী। সেই নবী মদীনার মিম্বরের অধিকারী হইবেন। তাঁহার মাতা স্বীয় কবরে সমাহিত হইয়াছেন”।
📄 আমিনার কবর যিয়ারতে রাসূলুল্লাহ্ (স)
নবৃওয়াত লাভের পর রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার মাতা আমিনার কবর যিয়ারত করিয়াছিলেন। যিয়ারতকালে তাঁহার সঙ্গে সাহাবায়ে কিরামের বিরাট একটি দলও ছিল বলিয়া বর্ণনা পাওয়া যায়। বর্ণিত আছেঃ
إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَارَ قَبْرَ أُمِّهِ بِالْأَبْوَاءِ فِي أَلْفِ مُقَنَّعَ فَبَكَى وابكي.
"রাসূলুল্লাহ (স) এক হাজার শিরস্ত্রাণ পরিহিত লোককে লইয়া আল-আবওয়ায় তাঁহার মাতার কবর যিয়ারত করিয়াছিলেন। সে সময় তিনি নিজেও কাঁদিয়াছিলেন এবং অন্যদেরকেও কাঁদাইয়াছিলেন"।
এই হাদীছটি বিশুদ্ধ বলিয়া সুহায়লী আখ্যায়িত করিয়াছেন। এই ক্রন্দনের কারণ সম্পর্কে একটি দুর্বল হাদীছে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (স)-কে তাহার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইলে তিনি উত্তরে বলিয়াছিলেনঃ আমি তাঁহার (মাতার) শাস্তির কথা স্মরণ করিয়া কাঁদিতেছি। সুহায়লী বলেন, অপর একটি সহীহ হাদীছে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ আমি আমার মাতার কবর যিয়ারতের জন্য আল্লাহ্র দরবারে অনুমতি চাহিয়াছিলাম। আমাকে তিনি উহার অনুমতি দান করিয়াছেন। অতঃপর তাঁহার মাগফিরাতের জন্য দু'আ করিবার অনুমতি চাহিয়াছিলাম, আমাকে উহার অনুমতি দেওয়া হয় নাই।