📄 গর্ভধারণের পর আমিনার অবস্থা
পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)। তাঁহাকে গর্ভে ধারণের পর মাতা আমিনা গর্ভজনিত কোন ধরনের কষ্ট অনুভব করেন নাই (ইবন সা'দ, প্রাগুক্ত)। ওয়াহ্হ্ ইব্ রাবী'আর ফুফু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা শুনিয়াছি রাসূলুল্লাহ (স)-কে গর্ভ ধারণের পর আমিনা বলিতেন, আমি যে গর্ভধারিণী তাহা আমি অনুভবই করিতে পারি না। অন্যান্য মহিলারা গর্ভ ধারণের পর যেইভাবে গর্ভজনিত যাতনা ভোগ করে আমি তাহা ভোগ করি নাই। আমার ঋতুস্রাব সম্পূর্ণ বন্ধ হয় নাই। কোন সময় তাহা দেখা যাইত আর কোন সময় বন্ধ থাকিত। ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থায় একদা আমার নিকট একজন আগন্তুকের আগমন ঘটিল। তিনি আমার নিকট আসিয়া আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি যে গর্ভধারিণী তাহা কি আপনি অনুভব করিতেছেন? আমি তাহার উত্তরে বলিলাম, আমি কিছুই অনুভব করিতেছি না। তিনি আমাকে বলিলেন, আপনি এই উম্মতের সরদার ও নবীকে গর্ভে ধারণ করিয়াছেন। সেই দিন ছিল সোমবার। এমতাবস্থায় আমার বহুদিন অতিক্রান্ত হইল। সন্তান প্রসবের সময় ঘনাইয়া আসিলে আমার নিকট আবার সেই আগন্তুকের আবির্ভাব ঘটিল। তিনি আমাকে বলিলেন, "أُعِيْذُهُ بِالْوَاحِدِ . مِنْ شَرِّكُلِّ حَاسِد" “আমি তাঁহাকে সকল পরশ্রীকাতরতের অমঙ্গল হইতে একক আল্লাহ্র আশ্রয়ে সোপর্দ করিলাম"।
আমিনা বলেন, আমি তাহা বলিয়া ঘটনাটি অপরাপর মহিলাদের নিকট ব্যক্ত করিলাম। তাহারা শুনিয়া আমাকে পরামর্শ দিল, তুমি দুই বাহু ও স্কন্ধে লোহা ঝুলাইয়া দাও। আমি তাহাই করিলাম। কয়েক দিন উহা ধারণ করিবার পর দেখিতে পাইলাম, লৌহ খণ্ডটি অপসারিত হইয়া গিয়াছে। উহার পর আমি তাহা আর কোন দিন ধারণ করি নাই। আমিনা বলেন, আমি মুহাম্মাদকে গর্ভ ধারণ হইতে লইয়া প্রসবকালীন সময় পর্যন্ত কোন ধরনের কষ্ট অনুভব করি নাই। তিনি বলেন, আমি আদিষ্ট হইয়াছিলাম যে, ভূমিষ্ট হইবার পর তাঁহার নাম যেন আহমাদ রাখি (ইনুল-জাওযী, আল- ওয়াফা বি-আহওয়ালিল মুসতাফা, মিসর ১৯৬৬)।
📄 আবদুল্লাহ্র ইনতিকাল
আবদুল্লাহ পুত্র মুহাম্মাদ (স)-কে কোন অবস্থায় রাখিয়া ইনতিকাল করিয়াছিলেন সেই সম্পর্কে কিছুটা মতভেদ রহিয়াছে। প্রসিদ্ধ অভিমত হইল রসূলুল্লাহ (স) মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় তিনি ইনতিকাল করেন। আল্লামা সুহায়লী বলেন, অধিকাংশ আলিমের অভিমত হইল, রসূলুল্লাহ্ (স) যখন মাতৃক্রোড়ে তখন 'আবদুল্লাহ্ ইনতিকাল করেন (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৮৪)। আল-জাওযী বলেন, পারস্যের সম্রাট নওশেরওয়া সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হইবার চব্বিশতম বৎসরে আবদুল্লাহ্ জন্মগ্রহণ করেন। অতঃপর আমিনাকে তিনি বিবাহ করেন (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮৯)। 'আল্লামা যাহাবী বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিতা 'আবদুল্লাহ ইনতিাকাল করেন যখন রাসূলের বয়স আঠাইশ (২৮) মাস। কেহ কেহ বলিয়াছেন, পিতার ইনতিকালের সময় তাঁহার বয়স আরও কম ছিল। আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন তখন তিনি মাতৃগর্ভে ছিলেন (যাহাবী, আস-সীরাতুন নাবabiyyah, বৈরূত ১৪০১ হি, পৃ. ২২)। 'আল্লামা যুরকানী বলেন, কেহ কেহ মনে করেন যে, পিতার মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ (স)-এর বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। আবার কেহ কেহ বলেন, তাঁহার বয়স তখন ছিল সাত মাস। তাঁহার বয়স তখন নয় মাস হইবারও একটি উক্তি রহিয়াছে। এই সকল মতামতের ভিত্তি হইল এই কথার উপর যে, রাসূলুল্লাহ (স) মাতৃক্রোড়ে থাকা অবস্থায় পিতা আবদুল্লাহ্ ইনতিকাল করেন। কিন্তু ওয়াকিদী, ইবন সা'দ, ইব্ন কাছীর, বালাযুরী ও যাহাবী প্রমুখ সীরাতবিদগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় পিতার মৃত্যুর অভিমতকে গ্রহণ করিয়াছেন। উহাই সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য অভিমত। কারণ আল-মুসতাদরাকে কায়স ইব্ন মাখরামী হইতে বর্ণিত আছে: تُوُفِّيَ أَبُو النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَأُمُّهُ حُبْلى “নবীর (স)-এর মাতার গর্ভকালে নবীর পিতা ইনতিকাল করেন”।
এই রিওয়ায়াতটি মুসলিম শরীফের শর্তানুযায়ী সহীহ বলিয়া হাকেম বর্ণনা করিয়াছেন। যাহাবী উহা সমর্থন করিয়াছেন (যুরকানী, শারহু মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা, বৈরূত ১৯৭৩ খৃ., ১খ, পৃ. ১০৯)।
📄 ইনতিকালের সময় আবদুল্লাহ্ বয়স
কত বৎসর বয়সে আবদুল্লাহ ইনতিকাল করেন সেই সম্পর্কে কোন সুনির্দিষ্ট অভিমত নাই। তাঁহার ইন্তিকাল হয় পঁচিশ বৎসর, আঠাইশ বৎসর অথবা ত্রিশ বৎসর বয়সে। আঠার বৎসর বয়সে আবদুল্লাহ্র ইনতিকাল হইয়াছে বলিয়া একটি অভিমত রহিয়াছে। এই অভিমত হাফিজ 'আলাঈ ও হাফিজ ইব্ন হাজার সহীহ বলিয়াও উল্লেখ করিয়াছেন। ইমাম সুয়ূতীও তাহা গ্রহণ করিয়াছেন (যুরকানী, ১খ, পৃ. ১০৯)। পঁচিশ বৎসরের অভিমতকে ইমাম ওয়াকিদী সর্বাধিক প্রামাণ্য বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তাঁহার মতে, وذلكَ أَثْبَتُ الْأَقَاوِيلَ فِي سَنِّه وَوَفَاتِه “বয়স ও ইনতিকাল সম্পর্কিত মতামতসমূহের মধ্যে এই অভিমত সর্বাধিক সুদৃঢ়” (যাহাবী, পৃ. ২২)।
মদীনায় পিতার মাতুলালয়ে আবদুল্লাহ ইনতিকাল করেন। সিরিয়ার গাজা নামক স্থানের দিকে আবদুল্লাহ্র বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে একটি কাফেলার সহিত যাত্রা করেন। সেখানে কার্য সম্পন্ন করিয়া কাফেলা ফিরিতেছিল। যাত্রাপথে তাহারা মদীনায় উপনীত হন। আবদুল্লাহ পথিমধ্যে অসুস্থ হইয় পড়েন। ফলে তিনি তাঁহার পিতার মামার বাড়ী মদীনায় অবস্থান করিবার কথা ঘোষণা করেন। পিতার মামার বাড়ী এই হিসাবে যে, তাঁহার দাদা হাশিম বানু 'আদী গোত্রে বিবাহ করেন। 'আবদুল মুত্তালিব সেই গোত্রীয় মাতৃপক্ষেই জন্মগ্রহণ করেন। আবদুল্লাহ্ মামার গোত্র হইল কুরায়শ বংশের বানু মাখযূম গোত্র। উহাদের আবাস হইল মক্কায়। সুতরাং আবদুল্লাহ তাঁহার পিতার মামার বাড়ী মদীনায় ইনতিকাল করেন, তাঁহার নিজের মামার বাড়ীতে নয়।
আবদুল্লাহ এখানে এক মাস অসুস্থ থাকিয়া ইনতিকাল করেন। বাণিজ্য কাফেলা মক্কায় ফিরিয়া আসিবার পর পিতা আবদুল মুত্তালিব আবদুল্লাহ কোথায় জিজ্ঞাসা করেন। কাফেলার লোকজন বলিল, অসুস্থ অবস্থায় আমরা তাঁহাকে মদীনায় রাখিয়া আসিয়াছি। সংবাদ শুনিয়া আবদুল মুত্তালিব তাৎক্ষণিকভাবে স্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র আল-হারিছকে মদীনায় প্রেরণ করেন। ইদুল আছীরের বর্ণনায় রহিয়াছে, যুবায়রকে প্রেরণ করা হয়। হারিছ সেখানে পৌছিয়া আবদুল্লাহ্ মৃত্যুর দুঃসংবাদ সম্পর্কে অবহিত হন। মদীনাতেই তাঁহাকে দারুত তাবিয়ায় (ভিন্নমতে দারুল নাবিগান, ইবন সা'দ) দাফন করা হয়। পিতার মাতুলালয়ের লোকেরা হারিছকে আবদুল্লাহ্ অসুস্থতা সময় তাহাদের মাঝে তাঁহার অবস্থান ও তাহাদের সেবা-শুশ্রূষা ইত্যাকার বিষয়ের বিবরণ দিলেন। এই সংবাদ লইয়া হারিছ মক্কায় প্রত্যাবর্তন করিলে আবদুল মুত্তালিবের গৃহে শোকের ছায়া নামিয়া আসে। ভাই-ভগ্নি সকলেই নিদারুন মর্মাহত হন। যুরকানী বলেন, কেহ কেহ বলিয়াছেন, আবদুল্লাহকে আল-আবওয়া নামক স্থানে দাফন করা হয়। উহা মদীনার আল জুহফা নামক স্থান হইতে তেইশ মাইল দূরে অবস্থিত (ইবন সা'দ, ১খ, পৃ. ৯৯; যুরকানী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ১১০)।
ইবন সা'দ বলেন, আমার কাছে বর্ণিত হইয়াছে যে, আবদুল মুত্তালিব আবদুল্লাহকে মদীনায় প্রেরণ করিয়াছিলেন তাহার জন্য সেখানে হইতে খেজুর লইয়া আসার জন্য। অতঃপর সেখানেই 'আবদুল্লাহ্ ইনতিকাল করেন। তবে ইবন সা'দ মুহাম্মাদ ইবন 'উমারের সূত্রে বলেনঃ প্রথমোক্ত বিবরণ অর্থাৎ বাণিজ্যের উদ্দেশে সিরিয়া গমনের ঘটনাটি সর্বাধিক প্রামাণ্য (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ, পৃ. ৯৯)।
📄 স্বামীর ইনতিকালে আমিনার শোক
স্বামীর ইনতিকালের সংবাদে আমিনা শোকে মুহ্যমান হইয়া পড়েন। অতঃপর তাঁহার স্মরণে শোকগাঁথা রচনা করেন।
عَفَا جَانِبُ الْبَطْحَاءِ مِنْ ابْنِ هَاشِمٍ - وَجَاوَرَ لَحَداً خَارِجًا فِي الْغَمَاعَمِ دَعَتْهُ الْمَنَايَا دَعْوَةً فَأَجَابَهَا - وَمَا تَرَكَتْ فِي النَّاسِ مِثْلَ ابْنِ هَاشِمٍ عَشِيَّةً أَحوا يحملون سرير . تُعَاوِرُهُ أَصْحَابُهُ فِي التَّزَاحُمِ فَإِنْ يَكُ غَالَتْهُ الْمَنَايَا وَرَيْبُهَا - فَقَدْ كَانَ مِعْطَاءٌ كَثِيرًا التَّرَاحُمِ
"মক্কার একটি কোণ ইবন হাশিম (অর্থাৎ আবদুল্লাহ্) হইতে খালি হইয়া গেল, কাফনে পরিবেষ্টিত অবস্থায় স্বজনদের হইতে বহু দূরে তিনি করবস্থ হইলেন। মৃত্যু তাঁহাকে আকস্মিকভাবে আহবান করিলে তিনি তাহার ডাকে সাড়া দিলেন, মৃত্যু কিন্তু মানব সমাজে হাশিমের এই ছেলেন মত কাহাকেও রাখিয়া গেল না।
বিদায় সম্ভাষণকারিগণ তাঁহাকে খাটিয়ায় বহন করিয়া বৈকাল লগ্নে রওয়ানা করিল। সঙ্গী-সাথীরা অতি সমাদরে ভিড় করিয়া পালাক্রমে তাঁহাকে বহন করিয়া লইল। যদিও অসাবধান অবস্থায় মৃত্যু ও উহার কারণসমূহ তাঁহাকে গ্রাস করিয়া ফেলিয়াছে, তবুও তিনি ছিলেন সমাজের এক মহান দাতা ও দয়াদ্র ব্যক্তি" (যুরকানী, ১খ, পৃ. ১১০)।