📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবদুল্লাহকে কুরবানী করিতে আবূ তালিবের বাধাদান

📄 আবদুল্লাহকে কুরবানী করিতে আবূ তালিবের বাধাদান


কাজী মুহাম্মাদ সুলায়মান মনসূরপুরী তাঁহার সীরাত গ্রন্থে মৌলবী কেরামত আলী দিহলাবীর উদ্ধৃতি দিয়া বলেন, আবদুল্লাহ্র নামে যখন তীর বাহির হইল তখন তাঁহার ভাই আবু তালিব তাঁহাকে কুরবানী দানে বাধা প্রদান করিলেন এবং নিম্নোক্ত কবিতার মাধ্যমে নিজ দাবি পিতাকে জানাইয়া দিলেন:
كَلَّا وَرَبِّ الْبَيْتِ ذِي الْأَنْصَابَ - مَاذْبَحَ عَبْدُ اللَّهِ بِالتَّلْعَابِ يَا شَيْبُ إِنَّ لِلرِّيحِ ذُو عِقَابِ - إِنَّ لَنَا جَرُّهُ فِي الْخِطَابِ أَحْوَالُ صُدُقَ كَأَسُودِ الْغَابِ
"কখনও নয়, মূর্তি বেষ্টিত কা'বার রবের শপথ! আবদুল্লাহকে খেলনার ছলে যবেহ করা যাইবে না। হে শায়বা! নিশ্চয় বায়ু শাস্তি প্রদানকারী, আমাদের কর্তব্য তাহাকে আহবানের মাধ্যমে আকৃষ্ট করা। তাহাকে আহবান করিবার সময় সত্যবাদীদের অবস্থা বনের ব্যাঘ্রের ন্যায়”।
আবদুল্লাহ্ মাতুলালয়ের পক্ষ হইতেও বাধা আসিল। মুগীরা ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন 'আমর ইব্‌ন মাখযূম নিম্নোক্ত কবিতার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করিলেন:
يَا عَجَبًا من فعل عَبْدِ الْمُطَّلِب - وَذَبْحِهِ ابْنَا كَتَمْثَالَ الذَّهَبِ كَلأَ وَبَيْتِ اللَّهِ مَسْتُورِ الْحَجَبِ - مَا ذُبِحَ عَبْدُ اللَّهِ فِيْنَا بِاللَّعْبِ
"আবদুল মুত্তালিবের কি আশ্চর্যজনক কাণ্ড তাঁহার স্বর্ণতুল্য ছেলেকে যবেহ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। কখনও নয়, গেলাফ আবৃত বায়তুল্লাহ্র শপথ। খেলাচ্ছলে তাঁহাকে আমাদের সম্মুখে যবেহ করা যাইবে না" (রাহমাতুললিল 'আলামীন, লাহোর, তা,বি, ২খ, পৃ. ৮৪)।
আবদুল্লাহ্ এই ঘটনাটি সংঘটিত হইবার পর তিনি 'যাবীহ' হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন। এই কারণে রাসূলুল্লাহ (স)-কে ইব্‌ যাবীহায়ন (দুই কুরবানীর পুত্র) বলিয়া আখ্যায়িত করা হয়।
হযরত মু'আবিয়া (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর কাছে ছিলাম। তখন জনৈক বেদুঈন রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে আসিল এবং তাঁহাকে ইব্‌ন যাবীহায়ন সম্বোধন করিয়া তাঁহার আবেদন পেশ করিল। তাহার আহবান শুনিয়া রাসূলুল্লাহ মুচকি হাসি দিলেন। মু'আবিয়া (রা)-এর এই কথা শুনিয়া তাঁহার মজলিসে বসা এক লোক জিজ্ঞাসা করিল, হে আমীরুল মুমিনীন! দুইজন যাবীহ কাহারা? উত্তরে তিনি তাহাদেরকে আবদুল্লাহর উপরিউক্ত কাহিনীটি শুনাইয়া বলিলেন, দুইজনের একজন হইলেন আবদুল্লাহ, আর অপরজন হইলেন হযরত ইসমাঈল (আ)। এই হাদীছটি আল-হাকিম ও ইব্‌ন জারীর আত-তাবারী বর্ণনা করিয়াছেন, (সুয়ূতী, আল-খাসাইসুল কুবরা, বৈরূত, তা, বি, ১খ, পৃ. ৪৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবদুল্লাহ্র বিবাহ

📄 আবদুল্লাহ্র বিবাহ


কুরবানী হইতে নিষ্কৃতি লাভের পর আবদুল্লাহ্র বিবাহের কথাবার্তা শুরু হয়। মক্কার অভিজাত মহিলারা তাঁহার সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইবার অভিলাষ ব্যক্ত করেন। তাহারা তাঁহাকে উপহার-উপঢৌকন দিয়া আকৃষ্ট করিবার চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুতেই কাজ হয় নাই। অবশেষে ঝানু যুহরা গোত্রের ওয়াহ্হ্ ইব্‌ন 'আবদ মানফের বিদূষী কন্যা আমিনার সহিত আবদুল্লাহ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বানু যুহরা গোত্রটি বংশীয় আভিজাত্যে তৎকালীন আরবে অতুলনীয় ছিল। আমিনার এক চাচার নাম ছিল উহায়ব। তিনি তাঁহার এই চাচার তত্ত্বাবধানে বাস করিতেন। চাচার গৃহেই তাঁহার বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
ইবন সা'দের এক বর্ণনায় রহিয়াছে যে, আবদুল মুত্তালিব পুত্র আবদুল্লাহকে সঙ্গে লইয়া বাঁশ্ যুহরায় গমন করেন এবং আমিনার সহিত বিবাহ দানের প্রস্তাব করিলে সেইখানেই তাঁহাদের 'আব্দ সম্পন্ন হয়। উহায়বের এক কন্যার নাম ছিল হালা। আবদুল মুত্তালিব এই সময় হালাকে বিবাহ করিবার জন্য উহায়বের নিকট প্রস্তাব করেন। উহায়ব ইহাতে সম্মতি জানাইয়া সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার সহিত হালার বিবাহ সম্পন্ন করেন। এই হালার গর্ভে আবদুল মুত্তালিবের পুত্র হামযা (রা) জন্মগ্রহণ করেন। এই হামযা (রা) বংশীয় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চাচা ছিলেন এবং অপর সম্পর্কে ছিলেন দুধ ভাই। আমিনাকে বিবাহ করিবার পর আবদুল্লাহ্ তাঁহার সহিত তিন দিন বাস করেন। বানূ যুহরা গোত্রের ঐতিহ্য ছিল যে, বিবাহের পর নব দম্পতি এক সাথে তিন দিন বাস করিতেন (আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ, পৃ. ৯৫)।
আমিনার সহিত আবদুল্লাহকে বিবাহ দামের কারণ সম্পর্কে আল্লামা সুহায়লী আল-বারকী সূত্রে বলেন, আবদুল মুত্তালিব ইয়ামানে ব্যবসা উপলক্ষে গমন করিতেন। সেখানে তিনি ইয়ামান দেশের অভিজাত শ্রেণীর এক লোকের অতিথি হিসাবে আপ্যায়িত হইতেন। একদা তিনি সেই লোকের নিকট অবস্থান করিতেছিলেন, এমতাবস্থায় পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে বিজ্ঞ এক যাজক আবদুল মুত্তালিবকে বলিল, অনুমতি হইলে আমি আপনার নাসিকাটি মাপিয়া দেখিব। তিনি তাহাকে অনুমতি প্রদান করিলেন। সে তাহার পরীক্ষা চালাইয়া বলিল: আপনার মধ্য হইতে নবৃওয়াত ও রাজত্বের অধিকারী লোকের আবির্ভাব হইবার লক্ষণ আমি দেখিতেছি। উহা দুই মনাফ অর্থাৎ আবদ মনাফ ইন্ন কুসাই ও আবদে মনাফ ইন্ন যুহরার মধ্য হইতে বাহির হইবে। আবদুল মুত্তালিব সেখান হইতে ফিরিয়া নিজেই হালা বিনত উহায়বকে বিবাহ করিলেন এবং পুত্র আবদুল্লাহকে আমিনা বিন্ত ওয়াহবের সহিত বিবাহ দিলেন (সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, বৈরূত, ১৯৭৮ খৃ., ১খ, পৃ. ১৭৮)।
বায়হাকী ও আবূ নু'আয়ম ইব্‌ন শিহাব সূত্রে বর্ণনা করেন যে, আবদুল্লাহ ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন বালক। একদা তিনি কুরায়শ মহিলাদের সম্মুখ দিয়া যাইতেছিলেন। তখন এক মহিলা অপরাপর মহিলাদেরকে ডাকিয়া বলিল, তোমাদের মধ্যে কোন মহিলা এই যুবকটিকে বিবাহ করিতে সক্ষম হইবে। তাঁহার দুই চোখের মধ্যবর্তী স্থলে আমি যেই নূর দেখিতে পাইতেছি তাহা সে ধারণ করিতে সক্ষম হইবে। অতঃপর আমিনা তাঁহার সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইলেন, ফলে তিনিই রাসূলুল্লাহ (স)-কে গর্ভে ধারণ করিলেন (সুয়ূতী, আল-খাসাইসুল কুবরা, বৈরূত, তা, বি, ১খ, পৃ. ৪১-৪২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবদুল্লাহর পাণি গ্রহণে আগ্রহী মহিলা

📄 আবদুল্লাহর পাণি গ্রহণে আগ্রহী মহিলা


ইবন সা'দ বলেন, এই মহিলা কে ছিলেন সেই সম্পর্কে আমাদের মধ্যে বিতর্ক রহিয়াছে। কেহ কেহ বলেন, তিনি ছিলেন ওয়ারাকা ইন্ন নাওফালের বোন কুতায়লা বিন্ত নাওফাল ইব্‌ন আসাদ ইব্‌ন 'আবদিল উযযা ইব্‌ন কুসাই। আবার কেহ কেহ বলেন, তিনি ছিলেন ফাতিমা বিন্ত মুরর আল-খাছ'আমিয়‍্যা। যাহারা বলেন, এই মহিলা ছিলেন কুতায়লা বিন্ত নাওফাল তাহাদের মতে আবদুল্লাহ্ যাত্রাপথে মহিলাটি খুব তীক্ষ দৃষ্টিতে তাঁহার প্রতি তাকাইতেছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি তাঁহার কাপড় ধরিয়া টান দিয়া তাঁহাকে আকৃষ্ট করিতে চাহিলেন। তিনি তাহাতে অস্বীকৃতি জানাইয়া দ্রুত চলিয়া গেলেন। অতঃপর আমিনা বিনত ওয়াহবের সহিত মিলিত হইলেন। এই মিলনের ফলে আমিনার গর্ভে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নূরে নবুওয়াত স্থির হইল। ফিরিবার পথে 'আবদুল্লাহ্ সেই মহিলাটিকে অপেক্ষমান দেখিতে পাইলেন। তিনি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি কি এখনও সেই বাসনা পোষণ কর যাহা ইতোপূর্বে প্রকাশ করিয়াছিলে? মহিলাটি, তখন নেতিবাচক উত্তর দিয়া বলিলেন, সেই সময় তোমার চেহারায় যেই নূর ছিল ফিরিবার পথে তোমার মধ্যে তাঁহার অনুপস্থিতি অনুভব করিতেছি। কেহ কেহ বলেন, মহিলাটি তখন বলিয়াছিলেন, তখন তোমার দুই চোখের মাঝখানে চাঁদ কপালী ঘোড়ার মত যেই উজ্জ্বল শুভ্র বর্ণ প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম এখন তোমার মধ্যে তাহা অবশিষ্ট নাই।
হিশাম ইব্‌ন মুহাম্মাদ সূত্রে ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে এই মর্মে একটি রিওয়ায়াতও রহিয়াছে যে, যেই মহিলাটি আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিবের পাণি গ্রহণ করিবার কামনা প্রকাশ করিয়াছিল সে বানু আসad ইব্‌ন আবদিল 'উযযা গোত্রের এবং সে ওয়ারাকা ইব্‌ন নাওফালের ভগ্নি ছিল (আত-তাবাকাতুল কুবরা, তাহারা বলেনঃ সেই মহিলাটি ছিল ফাতিমা বিনত মুরর আল-খাছ'আমিয়্যা)।
আল্লামা সুয়ূতী তাহার বিবরণ এইরূপ দিয়াছেন, আবদুল মুত্তালিব স্বীয় পুত্রকে বিবাহ দানের উদ্দেশে বাহির হইয়া তুবালা শহরের (ইয়ামানের ক্ষুদ্র একটি শহরের নাম) জনৈক জ্যোতিষ মহিলার পাশ দিয়া অতিক্রম করিলেন। সে পূর্ববর্তী ঐশী গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে বিজ্ঞ ছিল। সে আবদুল্লাহ্ মুখমণ্ডলে নবৃওয়াতের 'নূর দেখিয়া বলিল, হে যুবক! তুমি যদি আমার সহিত মিলিত হও, তাহা হইলে তোমাকে আমি এক শত উট পুরস্কার দিব। আবদুল্লাহ্ এই কথা শুনিয়া কবিতায় উহার জবাব দিলেনঃ
أَمَّا الْحَرَامُ فَالْمَاتُ دُونَهُ - وَالْحِلَّ لَأُحِلَّ فَاسْتَبِينَهُ فَكَيْفَ بِالْأَمْرِ الَّذِي تَبْغِيْنَهُ - يَحْمِي الْكَرِيمُ عِرْضَهُ وَدِيْنَهُ
"অবৈধ কাজে লিপ্ত হইবার চেয়ে মৃত্যু অনেক সহজ। এই কাজ মোটেই বৈধ নয় যে, আমি তাহাতে অংশ নিব। এইটি কেমন করিয়া সম্ভব হইবে যাহা তুমি চাহিতেছ! ভদ্র মানুষ তো তাহার সম্মান ও ধর্মকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে"।
এই কথা বলিয়া আবদুল্লাহ পিতার সহিত রওয়ানা করিলেন। অতঃপর তিনি তাঁহাকে আমিনার সহিত বিবাহ দিলেন। স্ত্রীর সহিত আবদুল্লাহ তিন দিন বাস করিলেন। তিন দিন পর খাছআমিয়্যা গোত্রের সেই মহিলাটির সহিত তাঁহার পুনরায় সাক্ষাত হইল। সে তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, আমার প্রস্তাবের পর আপনি কি কাজে লিপ্ত হইয়াছিলেন? তিনি বলিলেন, "আমাকে আমার পিতা আমিনা বিন্ত ওয়াহবের সহিত বিবাহ দান করিলেন। আমি তাঁহার সহিত তিন দিন বাস করিয়াছি। সে বলিল, আল্লাহ্র শপথ! আমি আপনার মুখমণ্ডলে একটি নূর প্রত্যক্ষ করিয়া প্রত্যাশা করিয়াছিলাম যে, সেই নূরটি আমার মধ্যে বিচ্ছুরিত হউক। কিন্তু আল্লাহ যাহাকে ভালবাসিয়াছেন সেখানেই সেই নূর আমানত রাখিয়াছেন। অতঃপর ফাতিমা নাম্নী সেই মহিলাটি এই কবিতাটি আরয করিল:
إِنِّي رَأَيْتُ مَخِيلَةً لَمَعَتْ - فَتَلالات بِحِنَاتِمِ الْقَطْرِ ظلما بها نور يضئى له - ما حوله كَاضَاءَة البدر وَرَجَوتُهُ فَخْرًا أَبُوءُ بِهِ - مَا كُلُّ قَادِحِ زَنْدِهِ يُؤْرِى لِلَّهِ مَا زُهْرِيَّةٌ سَلَبَتْ - ثَوبَيْكَ مَا اسْتَلْبَتْ وَمَا تَدْرِي
"আমি এক খণ্ড মেঘ দেখিলাম যাহাতে বিদ্যুৎ চমকাইতেছে যাহার জ্যোতি কালো বর্ণের মেঘখণ্ডগুলিকে আলোকিত করিয়া দিল। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন মেঘপুঞ্জে এমন আলো ছিল যাহা আশপাশের সকল এলাকাকে আলোকিত করিয়াছে যেমন আলোকিত করিয়া দেয় পূর্ণিমার চাঁদ। আমি আবদুল্লাহকে বিবাহ করিয়া গৌরব লাভের বাসনা পোষণ করিয়াছিলাম, কিন্তু আমি সফলকাম হইতে পারি নাই। যেমনি সকল তড়িৎ চুম্বকের আঘাতে আগুন প্রজ্জলিত হয় না। আল্লাহই জন্য সকল প্রশংসা, এই যুহরী মহিলাটি কত বড় জিনিস লাভ করিয়াছে, (হে আবদুল্লাহ্!) তাহা হইল, তোমার দুইটি কাপড় (একটি নবুওয়াত আর দ্বিতীয়টি রাজত্ব), আমিনা তাহা লাভ করিয়াছে। অথচ সে এবিষয়ে অবহিত নয়"।
সে আরও বলিল:
بَنِي هَاشِمٍ قَدْ غَادَرَتْ من اخيكم - أَمَيِّنَةُ ازْ لِلنَّاهِ يَعْتَلِجَانِ كَمَا غَادَرَ الْمِصْبَاحُ بَعْدِ خُبُورِهِ - فَتَائِلُ قَدْ مِيْتَتْ لَهُ بِدهَانِ وَمَا كُلُّ مَا يَحْوِي الْفَتَى مِنْ تِلادِهِ - مُجْزِمٍ وَلَا مَا فَاتَهُ التَّوَافِي فَاجْمِلْ إِذَا طَالَبَتْ أَمْرًا فَإِنَّهُ - سَيَكْفِيكَهُ جَدَانِ يَصْطَرِعَانِ سَيَكْفِيكَهُ إِمَّا يَدٌ مُقْفَعِلَةِ - وَأَمَّا يَدٌ مَبْسُوطَةٌ لِبَنَانِ وَلَمَّا قَضَتْ مِنْهُ أُمَيْنَةُ مَا قَضَتْ - نَبَا بَصَرِي عَنْهُ وَكُلُّ لِسَانِي
"হে হাশিমী বংশ! আমিনা তোমাদের ভাইকে এইভাবে খালি করিয়াছে যখন সে নিজ বাসনা চরিতার্থে রত ছিল, যেইভাবে কুপি সলিতা হইতে তৈল চোষার পর সলিতকে শূন্য ও শুষ্ক করিয়া ফেলে। মানুষ পূর্বেকার ও উত্তরাধিকার সূত্রে যেই সম্পদ সঞ্চয় করে তাহা তাহার চেষ্টায় উপার্জিত নয় এবং যেই সম্পদ তাহার নিকট হইতে চলিয়া যায় উহাও তাহার উদাসীনতার ফলে নয়। যখন তুমি কোন জিনিসকে চাহিবে তখন তাহা ভালভাবে চাহিবে, কারণ পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দুইটি প্রচেষ্টা তোমার জন্য যথেষ্ট হইবে। হয়ত সেই হাত যাহা তোমার জন্য রুদ্ধ করা হইয়াছে তোমার জন্য যথেষ্ট হইবে অথবা সেই হাত যাহা উন্মুক্ত আঙ্গুলিসমূহের দ্বারা পূর্ণ তাহা তোমার জন্য যথেষ্ট হইবে। আমিনা যাহা চাহিয়াছিল তাহা আবদুল্লাহ হইতে অর্জন করিয়া লইয়াছে। এখন আমার চোখের দৃষ্টিশক্তি চলিয়া যাইতেছে, বাকশক্তি রুদ্ধ হইয়া গিয়াছে" (সুয়ূতী, খাসাইসুল কুবরা, ১খ, পৃ. ৪০; উরদূ অনুবাদ, মুঈনুদ্দীন নাঈমী, দিল্লী, ১খ, পৃ. ১০৫)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবদুল্লাহ্র অপর স্ত্রী

📄 আবদুল্লাহ্র অপর স্ত্রী


`আবদুল মুত্তালিবের অত্যন্ত প্রিয় সন্তান ছিলেন রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিতা আবদুল্লাহ, তবে তিনি কনিষ্ঠতম পুত্র ছিলেন না। কোন কোন সূত্রে উল্লেখ রহিয়াছে যে, 'আবদুল্লাহ পিতার সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন। ইন্ন হিশামের এক বর্ণনায় বলা হইয়াছেঃ
وَكَانَ عَبْدُ اللهِ بْنُ عَبْدِ الْمُطَّلِبِ أَصْغَرُ بَنِي أَبِيهِ .
"আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবদিল মুত্তালিব পিতার সর্বকনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন"।
কিন্তু এই কথা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত নহে। কারণ নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত যে, আবদুল্লাহ্ ছোট ছিলেন তাঁহার অপর দুই ভাই হামযা ও আব্বাস (রা)। ইব্‌ন হিশাম কর্তৃক বর্ণিত, "আবদুল্লাহ্ পিতার কনিষ্ঠতম পুত্র ছিলেন" এই উক্তির সহিত দ্বিমত পোষণ করিয়া আল্লামা সুহায়লী বলেন, وَهَذَا غَيْرُ مَعْرُوف "এই উক্তি অপ্রসিদ্ধ”। সম্ভবত এখানে এইরূপ উক্তি ছিল, أَصْغَرُ بَنِي أُمِّهِ “মাতৃ পক্ষের সন্তানদের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র”। কারণ হামযা (রা) ছিলেন 'আবদুল্লাহ্ ছোট এবং হামযা (রা) হইতেও বয়সে ছোট ছিলেন আব্বাস (রা)। হযরত 'আব্বাস (রা) হইতে এই মর্মে একটি হাদীছ বর্ণিত আছে। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর জন্মের সময়ের কথা স্মরণ রাখিয়াছি, তখন আমি তিন বৎসর অথবা ইহার কাছাকাছি বয়সের সন্তান ছিলাম। ভূমিষ্ট হইবার পর আমার নিকট তাঁহাকে লইয়া আসা হইলে আমি তঁহার দিকে তাকাইলাম। উপস্থিত মহিলারা তখন আমাকে বলিল, "তোমার ভাইয়ের ছেলেকে চুম্বন কর। অতঃপর আমি তাঁহাকে চুম্বন কলিাম।" এই রিওয়ায়াতটি প্রমাণ করে যে, আবদুল্লাহ্ পুত্র মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর জন্মের সময় তদীয় ভাই আব্বাস (রা) শিশু ছিলেন। কাজেই আবদুল্লাহ্ পিতার যখন তাঁহার পিতা কুরবানী করিতে চাহিয়াছিলেন তখন তিনি তাঁহার পুত্রদের সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন। এই ঘটনার পর হামযা (রা) ও আব্বাস (রা) জন্মগ্রহণ করেন (রাওদুল উনুফ, পদটীকা, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ১৭৬)।
ইবন ইসহাকের মতে আমিনার পাশাপাশি আবদুল্লাহ্র অন্য আরও এক স্ত্রী ছিল। তবে ঐ স্ত্রীর কোন পরিচয় ইতিহাস ও সীরাতে পাওয়া যায়নি। খোদ ইবন ইসহাকও তাহার কোন পরিচয় উদঘাটন করিতে সক্ষম হইয়াছেন বলিয়া জানা যায় নাই। এই স্ত্রীর বিবরণ এমনভাবে দেওয়া হইয়াছে যাহার অনেকটা আবদুল্লাহ্র সহিত মিলিত হইবার আকাংখা পোষণকারী অহিলার বিবরণের সহিত মিলিয়া যায়।
তিনি বলেন, আবদুল্লাহ্ তাহার সেই স্ত্রীর সহিত একদা মিলিত হইবার বাসনা প্রকাশ করিলেন। কিন্তু সেই দিন আবদুল্লাহ কূপ খননের কাজ করিয়াছিলেন যাহাতে তাঁহার শরীরে কাদা মাটি লাগিয়াছিল এবং উহার কিছু চিহ্ন অবশিষ্ট ছিল। ফলে তাহার এই স্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে তাঁহার আহবানে সাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অতঃপর আবদুল্লাহ তাহার নিকট হইতে বাহির হইয়া উযূ ও গোসল সম্পন্ন করেন। উহার পর আমিনার উদ্দেশে রওয়ানা করেন। রাস্তায় সেই স্ত্রী আবদুল্লাহ্র সহিত মিলিত হইবার আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু তিনি তাহাতে অসম্মতি জানান, পরিকল্পনা মত আমিনার কাছে গমন করেন এবং তাঁহার সহিত মিলিত হন। এই মিলনের ফলেই আমিনার গর্ভে হযরত মুহাম্মাদ (স) জন্মগ্রহণ করেন। কিছুক্ষণ পর সেই স্ত্রীর কাছে আসিয়া তাহার সহিত মিলিত হইবার আহবান জানাইলে সে তাহা প্রত্যাখ্যান করিয়া বলিল, আমিনার সহিত মিলিত হইবার পূর্বে তোমার মধ্যে যেই জ্যোতি দেখা যাইতেছিল এখন আর তাহা তোমার মধ্যে নাই (আস-সীরাতুন নাবabiyyah, ১খ, পৃ. ১৬৩)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00