📄 বংশীয় পুত-পবিত্রতা
ইবন আব্বাস ও আইশা (রা) সূত্রেও অনুরূপ দুইটি হাদীছ বর্ণিত রহিয়াছে (ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ, পৃ. ৬০-৬১)। ইদরীস কানধালাবী বলেন, নবীগণের পত্নীগণ ছিলেন অতি সতীসাধ্বী। হাদীছে আছে : مَا بَغَتْ امْرَأَةُ نَبِيَّ قَطُّ "কখনও কোন নবীর স্ত্রী পাপাচারে লিপ্ত হন নাই"। কপট মুনাফিকগণ যখন উম্মত জননী আইশা (রা)-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে তখন মুসলমানগণের তাহা শ্রবণমাত্র মিথ্যা বলিয়া প্রত্যাখ্যান করাই ছিল তাহাদের কর্তব্য। ইরশাদ হইয়াছে : وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هُذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ.
"এবং তোমরা যখন ইহা শ্রবণ করিলে তখন কেন বলিলে না, এ বিষয়ে বলাবলি করা আমাদের উচিত নহে। আল্লাহ পবিত্র মহান। ইহা তো এক গুরুতর অপবাদ" (২৪ : ১৬)।
নবীগণের পত্নীগণ যেখানে ব্যভিচারী হওয়া নবুওয়াতের মর্যাদার বিরোধী সেখানে তাঁহাদের জননী ও মাতামহীগণের অপবিত্র হওয়া নবুওয়াতের মর্যাদার চরম পরিপন্থী। দাম্পত্য সম্পর্ক হইতে মাতৃ সম্পর্ক হাজার গুণ শক্তিশালী (ইদরীস কান্ধলাবী, সীরাতুল মুসতাফা, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ১৪)।
আল্লাহ তা'আলা যেই সকল পুণ্যাত্মা বান্দাগণকে নবুওয়াত ও রিসালাত দ্বারা মর্যাদাবান করেন তাঁহাদের বংশপরম্পরা অত্যন্ত পবিত্র রাখেন। হযরত আদম (আ) হইতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) পর্যন্ত যত নবী-রাসূলের আবির্ভাব হইয়াছে তাঁহাদের বংশতালিকায় কোন দোষ-ত্রুটি নাই। অভিশপ্ত ইয়াহুদীগণ হযরত ঈসা (আ) জননী মারয়াম (আ) সম্পর্কে যেই অপবাদ রটাইয়াছিল তাহা আল-কুরআনে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় খণ্ডন করা হইয়াছে এবং অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাঁহার জন্মকাহিনীর বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর বংশতালিকা জগতের সকল বংশ-তালিকা হইতে শ্রেষ্ঠ ও উন্নত। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত:
قَالَ قَرَأَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ بِفَتْحِ الْفَاءِ وَقَالَ أَنَا أَنْفُسُكُمْ نَسَبًا وَصَهْرًا وَحَسَبًا لَيْسَ فِي أَبَائِي مِنْ لَدُنْ أَدَمَ سَفَاحٌ كُلَّنَا نَكَاحُ .
"তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আয়াত : لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ -এর ৬ বর্ণে যবর দিয়া পাঠ করিলেন, যাহার অর্থ হইল নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল তোমাদের নিকট আসিয়াছেন তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক উচ্চতর নসব ও বংশে। আয়াতটি তিলাওয়াত করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি বংশের দিক দিয়া তোমাদের সকল হইতে উত্তম। হযরত আদম (আ) হইতে শুরু করিয়া আমার পূর্বপুরুষদের কেহই ব্যভিচার জাত নহেন (যুরকানী, শারহু মাওয়াহিবুল লাদুনিয়্যা, বৈরূত তা.বি., ১খ, ৬৭)।
ইবন আব্বাস (রা) ও যুহরী (র) أَنْفُسَكُمْ -এর ৬ অক্ষরে যবর দিয়া পাঠ করিতেন এবং উহার অর্থ করিতেন সর্বোত্তম ও বংশমর্যাদায়। হযরত আদম (আ) হইতে শুরু করিয়া রাসূলল্লাহ (স)-এর পিতা-মাতা পর্যন্ত তাঁহার বংশের সহিত সম্পৃক্ত নারী-পুরুষ সকলেই ব্যভিচারীর দোষ হইতে মুক্ত ছিলেন। তদানীন্তন রোম সম্রাট কায়সার মক্কায় কাফিরদের নেতা আবূ সুফ্যানকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নসব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন : তোমাদের মধ্যে তাঁহার বংশ কীরূপ? আবু সুফ্যান নির্দ্বিধায় উত্তর দিয়াছিলেন : هُوَ فَيْنَا ذُونَسَبُ “তিনি আমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশের অধিকারী” (বুখারী, আল-জামি, আস-সাহীহ, কলিকাতা তা.বি., ১খ, পৃ. ৪)। ইবন হাজার আল-'আসকালানী বলেন, বাযযারের একটি বর্ণনা রহিয়াছে, রোম সম্রাটের এক প্রশ্নের জবাবে আবূ সুফ্যান রাসূলুল্লাহ (স)-এর নসব সম্পর্কে বলিয়াছিলেন: هُوَ فَيْنَا ذُو نَسَب مَالَا يَفْضِلُ عَلَيْهِ أَحَدٌ “বংশীয় আভিজাত্যে তিনি এমন পর্যায়ের লোক যাহার উপর অন্য কাহারও কোন শ্রেষ্ঠত্ব নাই”। সম্রাট ইহা শুনিয়া বলিয়াছিলেন, ইহাও নবুওয়াতের একটি প্রমাণ (ফাতহুল বারী, কিতাবু'ত তাফসীর, মিসর ১৩০১ হি., ৮খ, পৃ. ১৬৩)। বুখারীর বর্ণনামতে রোম সম্রাটের মন্তব্য ছিল এইরূপ : وَكَذَلِكَ الرُّسُلُ تُبْعَثُ فِي أَحْسَابِ قَوْمِهَا “এইভাবে রাসূলগণকে তাঁহাদের স্বগোত্রের অভিজাতদের মধ্য হইতে প্রেরণ করা হয়” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।