📄 রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ঊর্ধ্বতন পিতা ইসমাঈল (আ)
এই কথা দিবালোকের মত সত্য যে, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ঊর্ধ্বতন পিতা ছিলেন ইসমাঈল (আ)। কিন্তু পাশ্চাত্যের ইয়াহুদী ও খৃস্টান ঐতিহাসিকগণের অধিকাংশ আমাদের প্রিয়নবী (স)-এর পূর্বপুরুষ হিসাবে ইবরাহীম ও ইসমা'ঈল (আ)-কে স্বীকার করিতে নারাজ। তাহাদের অভিমত হইল, ইবরাহীম ও ইসমা'ঈল (আ) কোন দিনই মক্কায় গমন করেন নাই। এই দুই পিতা ও পুত্রের দ্বারা আল্লাহ্র ঘর কা'বাও নির্মিত হয় নাই।
রাসূলুল্লাহ্ (স) ও ইসলামের বিরুদ্ধে ইহা অত্যন্ত মারাত্মক অভিযোগ। এই অভিযোগটি সত্য হইলে ইসলামের ভিত নড়বড়ে হইয়া যাইবে। কারণ মহাসত্য গ্রন্থ আল-কুরআনে এই ব্যাপারে ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَاسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا . "যখন ইবরাহীম ও ইসমা'ঈল কাবা গৃহের প্রাচীর তুলিতেছিল তখন তাহারা বলিয়াছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই কাজ গ্রহণ কর" (২ঃ ১২৭)।
বিভ্রান্তিমূলক এই অভিমত আল্লামা শিবলী নুমানী যুক্তির ভিত্তিতে খণ্ডন করিয়াছেন। তিনি বলেনঃ ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের এই বিভ্রান্তির মূলে দুইটি কারণ উল্লেখ করা যায়। তাহা হইলঃ (এক) হাজেরা ও তদীয় পুত্র ইসমাঈল (আ) আরবে গিয়া বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন, নাকি অন্য কোথাও? (দুই) কুরবানী কাহাকে করার আদেশ দেওয়া হইয়াছিল ইসমাঈল (আ) না ইসহাক (আ)-কে? প্রথম কথা ইসমাঈল (আ)-এর আবাসন ছিল কোথায়? এই ব্যাপারে বাইবেলের বক্তব্য হইল, ইবরাহীম (আ)-এর প্রথম সন্তান ইসমাঈল (আ) বিবি হাজেরার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। অতঃপর সারার গর্ভে ইসহাক (আ) জন্মলাভ করেন।
ইসমা'ঈল (আ) যখন বড় হইলেন তখন সারা ইবরাহীমকে বলিলেন, হাজেরা ও তাহার ছেলেকে এখান হইতে তাড়াইয়া দাও। বাইবেলে বলা হইয়াছে (আদিপুস্তক, অধ্যায়: ২১):
"পরে আব্রাহাম প্রত্যূষে উঠিয়া রুটী ও জলপূর্ণ কুপা লইয়া হাগারের স্কন্ধে দিয়া বালকটীকে সমর্পণ করিয়া তাহাকে বিদায় করিলেন। সে প্রস্থান করিয়া বের শেবা প্রান্তরে ঘুরিয়া বেড়াইল। পরে কুপার জল শেষ হইল, তাহাতে সে এক ঝোপের নীচে বালকটীকে ফেলিয়া রাখিল! আর আপনি তাহার সম্মুখ হইতে অনেকটা দূরে, অনুমান এক তীর দূরে গিয়া বসিল। কারণ সে কহিল: বালকটীর মৃত্যু আমি দেখিব না। আর সে তাহার সম্মুখ হইতে দূরে বসিয়া উচ্চেঃস্বরে রোদন করিতে লাগিল। তখন ঈশ্বর বালকটির রব শুনিলেন; আর ঈশ্বরের দূত আকাশ হইতে ডাকিয়া হাগারকে কহিলেন, হাগার! তোমার কি হইল? ভয় করিও না, বালকটি যেখানে আছে, ঈশ্বর তথা হইতে উহার রব শুনিলেন; তুমি উঠিয়া বালকটীকে তুলিয়া তোমার হাতে ধর; কারণ আমি উহাকে এক মহাজাতি করিব। তখন ঈশ্বর তাহার চক্ষু খুলিয়া দিলেন, তাহাতে সে এক সজল কূপ দেখিতে পাইল, আর তথায় গিয়া কৃপাতে জল পুরিয়া বালকটিকে পান করাইল। পরে ঈশ্বর বালকটীর সহবর্তী হইলেন, আর সে বড় হইয়া উঠিল এবং প্রান্তরে থাকিয়া ধনুর্দ্ধর হইল।
"সে পারন প্রান্তরে বসতি করিল। আর তাহার মাতা তাহার বিবাহার্থে মিসর দেশ হইতে এক কন্যা আনিল" (পবিত্র বাইবেল, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটী, পৃ: ২৬-২৭)।
বাইবেলের উপরিউক্ত ভাষ্য হইতে এই কথা প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে যে, হযরত ইসমা'ঈল (আ)-কে যখন গৃহ হইতে বাহির করিয়া দেওয়া হয় তখন তিনি একেবারে কচি শিশু ছিলেন। ফলে হাজেরা মশক (পানির পাত্র) ও ইসমাঈলকে স্কন্ধের উপর বহন করিলেন। এই সম্পর্কে 'আরবী তাওরাতের পরিষ্কার ভাষ্য হইল এইরূপ: وَاضِعًا إِيَّاهَا عَلَى كَتَفَهَا وَالْوَلَدَ "ইবরাহীম (আ) মশক ও শিশু দুইটিকেই হাজেরার স্কন্ধে উঠাইয়া দিলেন" (শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত)।
বাইবেলে আরও বলা হইয়াছে যে, যখন ইবরাহীম (আ) পুত্র ইসমা'ঈল (আ)-কে খতনা করাইয়াছিলেন তখন ইসমা'ঈলের বয়স ছিল তের (১৩) বৎসর এবং ইবরাহীম (আ)-এর বয়স নিরানব্বই (৯৯) বৎসর (পবিত্র বাইবেল, 'আদিপুস্তক অধ্যায় ১৭ : ২৪-২৫, পৃ. ২১)।
বাইবেলের বর্ণনায় ইহা স্পষ্ট যে, ইসমাঈল (আ)-কে গৃহ হইতে বহিষ্কারের ঘটনা তাঁহার খতনা সম্পাদন করিবার পর ঘটিয়াছিল। বাইবেলের বিবরণও এই কথা সমর্থন করে। সুতরাং বহিষ্কারের সময় তাঁহার বয়স তের বৎসরের অধিক ছিল। এই বয়সের একটি ছেলেকে তাহার মাতা কখনও কাঁধে তুলিয়া নিতে সক্ষম হইবেন না। বাইবেলের এই ঘটনা বর্ণনার উদ্দেশ্য হইল এই কথা প্রমাণ করা যে, ইসমাঈল (আ)-এর বয়স এই সময় এমন পর্যায়ে পৌছিয়াছিল যে, পিতা ইবরাহীম (আ) তাঁহাকে এবং তাঁহার মাতাকে মূল বসতবাটী হইতে বহুদূরে কোন স্থানে লইয়া গিয়া বসতি দান করিয়াছিলেন।
বাইবেলের উল্লিখিত বর্ণনা হইতে জানা যায়, হযরত ইসমা'ঈল (আ) পারন প্রান্তরে বসবাস করিতেন এবং তীর চালনার কাজে করিতেন। খৃস্টানরা মনে করেন, পারন সেই প্রান্তরের নাম যাহা ফিলিস্তীনের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। এইজন্য তাহারা বলে, হযরত ইসমা'ঈল (আ)-এর আরবে আগমন একটি কল্পনাপ্রসূত বর্ণনা। 'আরব ভূগোলবিদগণ অবশ্য এই ব্যাপারে একমত যে, 'পারন' বা পারান এমন একটি পর্বত যাহা হিজাযে অবস্থিত। এমনকি মু'জামু'ল বুলদান গ্রন্থে বলা হইয়াছে : ফারান হিব্রু হইতে আরবীতে রূপান্তরিত শব্দ। ইহা মক্কার অন্যতম নাম। কেহ কেহ বলিয়াছেন, মক্কার একটি পাহাড়ের নাম (মু'জামুল বুলদান, বৈরূত, তা.বি., ৪খ, ২২৫)।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, কোন কালে আরবের উত্তর সীমান্ত খুবই প্রশস্ত ছিল। তামাদ্দুনুল 'আরব গ্রন্থে মোনিয়ে লোবা উল্লেখ করিয়াছেনঃ "এই বদ্বীপের উত্তর সীমান্ত নির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা সহজ নয়। অর্থাৎ এই সীমা ফিলিস্তীনের গাযযা শহর যা ভূমধ্য সাগরের পাড়ে অবস্থিত। তথা হইতে দক্ষিণের সাগর (Dead Sea) পর্যন্ত একটি রেখা টানিয়া দামেশক পর্যন্ত এবং এখান হইতে এই রেখাটি ফুরাত নদীর তীর ধরিয়া পারস্য উপসাগর পর্যন্ত লম্বা করিলে 'আরবের উত্তর সীমা পাওয়া যাইবে।" তাহার এই কথামতে 'আরবের হিজাযী অংশকে পারন বা ফারান গণ্য করা অযৌক্তিত নহে। বাইবেলে হযরত ইসমা'ঈল (আ)-এর বাসস্থান সম্পর্কে বলা হইয়াছেঃ "আর তাঁহার সন্তানগণ হবীলা অবধি অশুরিয়ার দিকে মিসরের সম্মুখস্থ শূর পর্যন্ত বসতি করিল; তিনি তাঁহার সকল ভ্রাতার সম্মুখে বসতি স্থান পাইলেন" (আদি পুস্তক অধ্যায় ২৫, ১৮; পবিত্র বাইবেল, প্রাগুক্ত পৃ. ৩৪-৩৫)। এই বর্ণনা অনুসারে মিসর সম্মুখস্থিত ভূখণ্ড 'আরবের সহিত সংযুক্ত বলিয়া মনে হয়। খৃস্টানগণের ধর্মীয় গ্রন্থাবলীতে ইসহাক (আ) বংশীয় বনূ ইসরাঈলেরই আলোচনার আধিক্য রহিয়াছে। হযরত ইসমা'ঈল (আ)-এর বংশের কথা তাহাদের আলোচনায় কেবল প্রাসঙ্গিকভাবে অল্পই করা হইয়াছে। এই কারণে তাঁহার আরবে বসবাস করার কথা স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না, কিন্তু তাহাদের ধর্মীয় গ্রন্থের বিভিন্ন ইঙ্গিত হইতে এই কথা বুঝা যায় যে, হাজেরা (রা) 'আরবে যে বাস করিতেন তাহা উহাদের নিকট স্বীকৃত। বাইবেলের নূতন নিয়ম করে ইহাতে বলা হইয়াছেঃ "আব্রাহামের দুই পুত্র ছিল, একটি দাসীর পুত্র, একটি স্বাধীনার পুত্র। কিন্তু ঐ দাসীর পুত্র মাংস অনুসারে, স্বাধীনার পুত্র প্রতিজ্ঞার গুণে জন্মিয়াছিল। এ সকল কথার ব্যাপক অর্থ আছে, কারণ ঐ দুই স্ত্রী দুই নিয়ম; একটি সীনয় পর্বত হইতে উৎপন্ন ও দাসত্বের জন্য প্রসবকারিনী; সে হাগর, আর এই হাগর 'আরব দেশস্থ সীনয় পর্ব্বত; এবং সেখানকার যিরুশালেমের সমতুল্য" (পবিত্র বাইবেল, নূতন নিয়ম, গালাতীয়, ৪ঃ ২২, পৃ. ৩৩০)।
আল্লামা শিবলী নু'মানী বলেন, পৌল ছিল হযরত 'ঈসা (আ)-এর একজন প্রভাবশালী উত্তরাধিকারী। তাহার উক্তি হইতে জানা যায় যে, হাজেরা 'আরবদেশস্থ সীনা পর্বতের অধিবাসী ছিলেন। যদি হাজেরা আরবদেশে বসতি স্থাপন না করিয়া থাকিতেন তাহা হইলে তাঁহাকে আরবের সীনা পর্বতের অধিবাসী বলিবার কোন অর্থই হইত না (সীরাতুন নবী, প্রাগুক্ত, ১খ ৮৬)। হাজেরা ও ইসমাঈল (আ)-কে কেন এবং কোথায় নির্বাসন দেওয়া হইয়াছিল এই ব্যাপারে বাইবেলের বিবরণ পরস্পরবিরোধী। একবার বলা হইয়াছে, সারাহ তাঁহাকে (ইসমাঈল) পরিহাস করিতে দেখিলেন এবং অন্যবার বলা হইয়াছে, ইসমা'ঈল (আ) ইসহাকের সহিত ইবরাহীম (আ)-এর উত্তরাধিকারী হইবে এই আশংকায় সারাহ ইসমাঈল ও তাঁহার মাতাকে বিতাড়িত করিবার জন্য বলিয়াছিলেন। বিতাড়িত করার স্থান সম্পর্কেও নূতন ও পুরাতন নিয়মের বর্ণনার মধ্যে অসঙ্গতি রহিয়াছে। সুতরাং এই সম্পর্কিত বাইবেলের কোন বিবরণই গ্রহণযোগ্য নহে। বাইবেলের অনুসারীরা ইচ্ছামত পরিবর্তন ও সংযোজন এই ক্ষেত্রেও করিয়াছেন বলিয়া প্রত্যক্ষ প্রমাণ আজও মক্কার আশেপাশে দিবালোকের মত উদ্ভাসিত রহিয়াছে। যমযম কূপ ও মাকামে ইবরাহীমে সংরক্ষিত পদচিহ্ন কিসের প্রমাণ বহন করে? সহীহ বুখারীর ৩৩৫১ নম্বর হাদীছে ইরশাদ হইয়াছে:
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ دَخَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْبَيْتَ فَوَجَدَ فيه صُورَةَ ابْرَاهِيمَ وَصُورَةَ مَرْيَمَ فَقَالَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَّا هُمْ فَقَدْ سَمِعُوا أَنَّ الْمَلَائِكَةَ لَا تَدْخُلُ بَيْتًا فِيْهِ صُورَةٌ هَذَا إِبْرَاهِيمُ مُصَوَّرُ فَمَا لَهُ يَسْتَقِيمُ.
"ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (স) কা'বা ঘরে প্রবেশ করিলেন। সেখানে তিনি ইবরাহীম (আ) ও মারয়াম (আ)-এর ছরি দেখিতে পাইলেন। তিনি তখন বলিলেন, তাহাদের (কুরায়শদের) কি হইল? অথচ তাহারা তো শুনিয়াছে যে, ঘরে প্রাণীর ছবি থাকিলে সে ঘরে ফেরেশতাগণ প্রবেশ করেন না। এই যে ইবরাহীমের ছবি বানানো হইয়াছে, তাহাও আবার ভাগ্য নির্ধারক জুয়ার তীর নিক্ষেপরত অবস্থায়" (বুখারী, করাচী ১৩৮১ হি., ১খ ৪৭৩; ফাতাহুল বারী, প্রাগুক্ত, ৬খ, ৩৮৭)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে এই ছবি মুছিয়া ফেলা হয়। সুতরাং ইসলামী বর্ণনানুযায়ী হাজেরা ও ইসমা'ঈল (আ)-কে মক্কায় যমযম কূপের পাশে নির্বাসন দেওয়ার বর্ণনাই বাস্তব সম্মত ও ঐতিহাসিক প্রমাণ ভিত্তিক।
📄 হাজেরা (রা) কি দাসী ছিলেন?
হযরত হাজেরা (রা)-কে বাইবেলে ইবরাহীম (আ)-এর প্রথমা স্ত্রী সারাহ (রা)-এর দাসী বলা হইয়াছে। উহা সত্যের অপলাপ মাত্র। ইসহাক (আ) বংশীয় ইয়াহুদীরা এখানে ইসমাঈল (আ) ও তাঁহার বংশধরদেরকে হীন করার ষড়যন্ত্রস্বরূপ বাইবেলে এই কথা সংযোজন করিয়াছে। ইহা বাইবেলের বক্তব্য হইতে পারে না। প্রকৃত সত্য হইল, হযরত হাজেরা (রা) মিসরের কিবতী বাদশাহদের বংশীয় ছিলেন [হযরত রাসূল করীম (সা) জীবন ও শিক্ষা, পৃ. ৮]। তবে এই কথা সত্য যে, হযরত হাজেরা (রা) হযরত সারাহ (রা)-এর নিকট উপহার- স্বরূপ প্রদত্ত ছিলেন। উপহার দানের এই ঘটনাটিকে তলাইয়া দেখিলে বাইবেলের এই বিবরণটি যে অসত্য তাহা দিবালোকের মত প্রতিভাত হইয়া উঠে। সহীহ বুখারীর বিবরণমতে, হযরত ইবরাহীম (আ) তাঁহার স্ত্রী সারাহকে লইয়া যখন কোন এক জালিম শাহীর (আবূ মালিক) অধিকৃত এলাকায় উপনীত হইয়াছিলেন তখন তাঁহাকে বলা হইয়াছিল, "এক ব্যক্তি আপন স্ত্রীকে লইয়া আপনার রাজত্বে প্রবেশ করিয়াছে, স্ত্রীটি সর্বাধিক সুন্দরী মহিলা"। কোন কোন বর্ণনায় রহিয়াছে, বাদশাহকে বলা হইয়াছিলঃ "আপনার রাজত্বে এমন একজন রমণীর প্রবেশ ঘটিয়াছে যাহার যোগ্য একমাত্র আপনি।" বাদশাহ এই খবর পাইয়া সারাহকে লইয়া আসিবার জন্য লোক পাঠাইল। রাজমহলে তাহার কক্ষে তাঁহাকে উপস্থিত করা হইল। বাদশাহ তাঁহার প্রতি হাত বাড়াইতে উদ্যত হইলে তাহার হাত একেবারে অবশ হইয়া গেল। সে সারাহ (রা)-এর নিকট তাঁহার কোন ক্ষতি করিবে না—এই অঙ্গীকার করিয়া আল্লাহ্র কাছে দু'আ করিবার অনুরোধ করিল। তিনি তাহার জন্য দু'আ করিলেন। সে এই অবস্থা হইতে মুক্তি পাইল। অতঃপর আবার হাত বাড়ানোর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিলে সে পূর্বের অবস্থা হইতে আরও শোচনীয় অবস্থার সম্মুখীন হইল। এবারও পূর্বের মত সারাহ (আ)-এর নিকট সে দু'আ চাহিল। তিনি তাহার জন্য আল্লাহ্র দরবারে দু'আ করিলে সে এই অবস্থা হইতে নিষ্কৃতি লাভ করিল। এইবার বাদশাহ তাহার দারোয়ানদেরকে ডাকিয়া বলিলঃ তোমরা এইটা কি দানব লইয়া আসিয়াছ, সে তো মানুষ নয় : অতঃপর বাদশাহ সারাহ-এর নিকট হাজেরা (রা)-কে দান করিলেন (বুখারী, কিতাবুল আমবিয়া, অধ্যায় ৮, হাদীছ নং ৩৩৫৮, করাচী হইতে প্রকাশিত বুখারীর ১খ, পৃ. ৩৭৪)। বুখারীর এই রিওয়ায়াতে হাজেরাকে দান করা বুঝানোর জন্য فَاَخْدَمَهَاهَاجَرُ শব্দটির প্রয়োগ করা হইয়াছে। এই বাক্যের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবন হাজার আসকালানী ও আল্লামা কাসতাল্লানী একই শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। তাহা হইল : وَهَبَهَالَهَا لِتَخْدَمَهَا অর্থাৎ "বাদশাহ হাজেরাকে সারাহর সেবার নিমিত্তে দান করিলেন"।
ইবন হাজার বলেন, সহীহ মুসলিমের রিওয়ায়াতে রহিয়াছে, বাদশাহ তাহার কোন এক প্রহরীকে বলিয়াছিল : فَأَخْرِجْهَا مِنْ أَرْضى وَأَعْطَهَا أَجْرَ "তাহাকে আমার ভূখণ্ড হইতে বাহির করিয়া দাও এবং আজারকে তাহাকে দিয়া দাও"। ইবন হাজার কিছু হালকাভাবে বলেন : বলা হয়, হাজেরার পিতা ছিলেন কিবতীদের জনৈক বাদশাহ। কিন্তু আল্লামা কাসতাল্লানী নিদ্বিধায় বলিয়াছেন: হাজেরার পিতা ছিলেন কিবতীদের বাদশাহ (ইবন হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী, বৈরূত তা,বি, ৬খ, পৃ. ৩৯৩-৩৯৪; আল-কাসতাল্লানী, ইরশাদু'স সারী, বৈরূত তা,বি, ৫খ, পৃ. ৩৪৯)।
মিসরের তদানিন্তন রাজা কর্তৃক সারাহর নিমিত্তে হাজেরাকে দান করা ছিল সারাহর উপর আল্লাহ্র অশেষ করুণার নিদর্শন। সে যখন সারাহর উপর কোনভাবেই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিতে সক্ষম হইল না তখন ভাবিল, নিশ্চয়ই এখানে অদৃশ্য কোন শক্তির হাত রহিয়াছে। এমতাবস্থায় দাসীর মত নগণ্য কোন কিছু উপহার দেওয়া বিবেকেও বাধে। অসামান্য ব্যাপারে অসামান্য উপহারই শোভা পায়। এক্ষেত্রে একজন বাঁদীকে উপহার দেওয়া মোটেই মানায় না। বুখারীর বিবরণে فَأَخْدَمَهَا هَاجَرَ শব্দটি প্রয়োগ করা হইয়াছে। ইহার দ্বারা সাধারণত হাজিরার খাদিমা হওয়া প্রকাশ পায়। ইহাও হইতে পারে যে, বাইবেলের অনুসারীরা মুসলিম বিদ্বেষী হইবার কারণে হাজেরার প্রতি দাসত্বের অভিযোগ আনিয়াছে। তাহারা ইচ্ছামত তাহাদের ধর্মগ্রন্থ পরিবর্তন পরিবর্ধন করিত বলিয়া তো খোদ আল-কুরআনই সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছে। বাইবেলের বিবরণে ইহাও স্বীকার করা হইয়াছে যে, হাজেরা (রা)-কে হযরত ইবরাহীম (আ) বিবাহ করিয়াছিলেন। এই সম্পর্কে বাইবেলের বিবরণ এইরূপ:
"এইরূপে কনান দেশে অব্রাম দশ বৎসর বাস করিলে পর অব্রামের স্ত্রী সারী আপন দাসী মিস্ত্রীয়া হাগারকে লইয়া আপন স্বামী অব্রামের সহিত বিবাহ দিলেন" (আদিপুস্তক, অধ্যায় ১৬: ৩; পবিত্র বাইবেল, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৮)।
হাজেরা যদি আসলেই দাসী হইতেন তাহা হইলে তাঁহাকে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বিবাহ করিবার আদৌ কোন প্রয়োজন ছিল না। বাইবেলও যখন হাজেরাকে ইবরাহীম (আ)-এর পত্নী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়াছে সুতরাং উহার পরিষ্কার অর্থ এই যে, হাজিরা কখনও দাসী ছিলেন না, বরং তিনি হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ঠিক তেমনই স্ত্রী ছিলেন যেমন ছিলেন সারাহ (আ) এবং হয়রত ইসমাঈল (আ) ঠিক তেমনই পুত্র ছিলেন যেমন ছিলেন হযরত ইসহাক (আ)। বন্ ইসরাঈলের সকল নবীর উৎস ছিলেন হযরত ইসহাক (আ) এবং তাঁহার মাতা সারাহ (আ)। এই কারণে ইয়াহুদী-খৃস্টানগণ তাহাদের সম্পর্কে খুবই বাড়াবাড়ি করিয়াছে।
তবে কোন কোন ইয়াহূদী পণ্ডিত পরোক্ষভাবে অবশ্য স্বীকার করিয়াছেন যে, হাজেরা রাজপরিবারের সদস্যা ছিলেন। সলোমন ইবন ইসহাক বাইবেলের একজন ভাষ্যকার ও ইয়াহুদীদের প্রাজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাহার ভাষ্যে লিখিয়াছেন যে, তিনি (হাজেরা) ছিলেন ফিরআওনের কন্যা। পিতা তাঁহাকে বলিয়াছিল, আমার প্রাসাদে প্রভু হইয়া থাকা অপেক্ষা এতদুভয়ের (ইবরাহীম ও সারাহর) পরিবারে সেবিকা হিসাবে থাকাও তোমার জন্য উত্তম [হযরত রাসূলে করীম (সা) জীবন ও শিক্ষা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬]।
📄 মাতৃপক্ষের বংশ তালিকা
উপরে যে বংশতালিকা উল্লেখ করা হইয়াছে তাহা রাসূলুল্লাহ (স)-এর পিতৃপক্ষের বংশ- বৃত্তান্ত। মাতৃপক্ষের বংশ-তালিকা নিম্নরূপ: মুহাম্মদ ইবন আমিনা বিন্ত ওয়াহব ইবন আবদ মানাফ ইবন যুহ্রা ইন্ন কিলাব ইবন মুররা। কিলাবে গিয়া তাঁহার মাতা ও পিতার বংশ তালিকা একত্র হইয়া যায়। এই ব্যাপারে কাহারও কোন দ্বিমত নাই (আস-সীরাতু'ন নাবাবিয়্যা, বৈরূত ১৯৮১ খৃ., পৃ. ৫)।
পুণ্যাত্মা আমিনার মাতা অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (স)-এর নানী ছিলেন বাররাহ বিন্ত আবদু'ল উযযা ইবন উছমান ইবন আবদিদ দার ইন্ন কুসায়্যি ইবন কিলাব। বাররাত্র মাতা ছিলেন উম্মু হাবীব বিন্ত আসাদ ইবন আবদিল 'উযষা ইবন কুসায়্যি ইবন কিলাব। উম্মু হাবীবের মাতা ছিলেন বাররাহ বিন্ত আওফ ইবন আবীদ ইবন আবীজ (عويج) ইবন আ'দী ইবন কা'ব ইবন লুআই। বারবার মাতা ছিলেন, কিলাবাহ বিনতু'ল হারিছ ইবন মালিক ইবন হুবাশা ইবন গানাম ইবন লিহয়ান ইবন 'আদিয়াহ ইবন মা'সা'আহ ইবন কা'ব ইবন হিন্দ ইবন তাবিখাহ ইবন লিহয়ান ইবন হুয়ায়ল ইন্ন মুদরিকাহ ইবন ইলয়াস ইন্ন মুদার। কিলাবার মাতা ছিলেন উমায়মাহ বিন্ত মালিক ইন্ন গানম ইবন লিহয়ান ইবন 'আদিয়া ইবন সা'সা'আহ। উমাইমাহর মাতা ছিলেন দুব্ব বিন্ত ছা'লাবাহ ইবনুল হারিছ ইবন তামীম ইবন সা'দ ইবন হুযায়ল ইবন মুদরিকাহ। দুব্ব-এর মাতা ছিলেন 'আতিকাহ বিন্ত গাদিরাহ ইবন হুতায়ত ইবন জাশাম ইবন ছাকীফ কাসিয়্য ইন্ন মুনাব্বিহ ইবন বাক্স ইন্ন হাওয়াযিন ইন্ন মানছুর ইবন ইকরিয়া ইন্ন খাছাফা ইবন কায়ম ইবন আয়লান বা ইলয়াস ইন্ন মুদার কাসিয়্যি। রাসূলুল্লাহ (স)-এর নানা ওয়াহাব ইবন 'আব্দ মানাফ ইবন যুহরার মাতা ছিলেন কায়লাহ, মতান্তরে হিন্দ বিন্ত ওয়াজী। তিনি খুরাশ গোত্রীয়া ছিলেন, তবে তাহার মা ছিলেন আওস গোত্রীয় কারলাহর। মাতা ছিলেন সালমা বিন্ত লুআই ইবন গালিব ইবন ফিত্র ইবন মালিক ইবনুন নাদূর ইন্ন কিনানাহ। সালমার মাতা ছিলেন মাবিয়া (ماوية) বিন্ত কা'ব ইবনুল কায়ন। ইনি ছিলেন কুয়াসা গোত্রীয়। মারিয়ার মাতা ছিলেন মাযিন গোত্রীয় কায়স ইবন রাবী'আহ্ কন্যা। তাহার মাতা ছিলেন আন-নাজ'আহ বিন্ত উবায়দ ইবনুল হারিছ। ঊর্ধ্বতন নানা আবদে মানদুয়া ইব্রক্স যুহরা ইন কিলাবের মাতা ছিলেন জুমাল বিন্ত মালিক গোত্রীয়। ইবন ফুসায়্যাহ ইবন সা'দ ইন্ন মুলায়হ ইবন আমর। ইনি ছিলেন খুযা'আ গোত্রের লোক। যুহরাহ ইন কিলাবের মাতা ছিলেন ফাতিমা (উন্মু কুসায়্যি) বিন্ত সা'দ ইবন সায়ল। ইনি ছিলেন আয়ছ গোত্রীয়। মুহাম্মাদ ইবনুস সাইব আল-কালবী বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ (স)-এর পাঁচ শত ঊর্ধ্বতনমাতামহীর নাম লিপিবদ্ধ করিয়াছি। উহাদের মধ্যে কাহাকেও ব্যভিচারিণী কিংবা কোন অশ্লীলতা স্পর্শ করে নাই। ইবন সা'দ মুহাম্মাদ ইবন 'আলী ইবন হুসায়ন (রা)-এর বরাতে রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই উক্তিটি বর্ণনা করিয়াছেন:
قَالَ إِنَّمَا خَرَجْتُ مِنْ نِكَاحِ وَلَمْ اَخْرُجْ مِنْ سِفَاحٍ مِنْ لَدُنْ آدَمَ لَمْ يُحْسِبْنِي مِنْ سِفَاحٍ أَهْلِ الجَاهِلِيَّةِ شَيْئً لَمْ أَخْرُجْ إِلا مِنْ طَهْرِه .
"আমি বিবাহ সূত্রে জন্ম লাভ করিয়াছি, ব্যভিচারী সূত্রে নহে। আদম (আ) হইতে শুরু করিয়া আমার বংশধারায় কাহাকেও জাহিলী যুগের ব্যভিচার স্পর্শ করে নাই। পুতঃ পবিত্র পন্থায়ই আমি জন্মলাভ করিয়াছি"।
📄 বংশীয় পুত-পবিত্রতা
ইবন আব্বাস ও আইশা (রা) সূত্রেও অনুরূপ দুইটি হাদীছ বর্ণিত রহিয়াছে (ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১খ, পৃ. ৬০-৬১)। ইদরীস কানধালাবী বলেন, নবীগণের পত্নীগণ ছিলেন অতি সতীসাধ্বী। হাদীছে আছে : مَا بَغَتْ امْرَأَةُ نَبِيَّ قَطُّ "কখনও কোন নবীর স্ত্রী পাপাচারে লিপ্ত হন নাই"। কপট মুনাফিকগণ যখন উম্মত জননী আইশা (রা)-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে তখন মুসলমানগণের তাহা শ্রবণমাত্র মিথ্যা বলিয়া প্রত্যাখ্যান করাই ছিল তাহাদের কর্তব্য। ইরশাদ হইয়াছে : وَلَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ قُلْتُمْ مَا يَكُونُ لَنَا أَنْ نَتَكَلَّمَ بِهَذَا سُبْحَانَكَ هُذَا بُهْتَانٌ عَظِيمٌ.
"এবং তোমরা যখন ইহা শ্রবণ করিলে তখন কেন বলিলে না, এ বিষয়ে বলাবলি করা আমাদের উচিত নহে। আল্লাহ পবিত্র মহান। ইহা তো এক গুরুতর অপবাদ" (২৪ : ১৬)।
নবীগণের পত্নীগণ যেখানে ব্যভিচারী হওয়া নবুওয়াতের মর্যাদার বিরোধী সেখানে তাঁহাদের জননী ও মাতামহীগণের অপবিত্র হওয়া নবুওয়াতের মর্যাদার চরম পরিপন্থী। দাম্পত্য সম্পর্ক হইতে মাতৃ সম্পর্ক হাজার গুণ শক্তিশালী (ইদরীস কান্ধলাবী, সীরাতুল মুসতাফা, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ১৪)।
আল্লাহ তা'আলা যেই সকল পুণ্যাত্মা বান্দাগণকে নবুওয়াত ও রিসালাত দ্বারা মর্যাদাবান করেন তাঁহাদের বংশপরম্পরা অত্যন্ত পবিত্র রাখেন। হযরত আদম (আ) হইতে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স) পর্যন্ত যত নবী-রাসূলের আবির্ভাব হইয়াছে তাঁহাদের বংশতালিকায় কোন দোষ-ত্রুটি নাই। অভিশপ্ত ইয়াহুদীগণ হযরত ঈসা (আ) জননী মারয়াম (আ) সম্পর্কে যেই অপবাদ রটাইয়াছিল তাহা আল-কুরআনে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় খণ্ডন করা হইয়াছে এবং অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তাঁহার জন্মকাহিনীর বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)-এর বংশতালিকা জগতের সকল বংশ-তালিকা হইতে শ্রেষ্ঠ ও উন্নত। বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আনাস (রা) হইতে বর্ণিত:
قَالَ قَرَأَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ بِفَتْحِ الْفَاءِ وَقَالَ أَنَا أَنْفُسُكُمْ نَسَبًا وَصَهْرًا وَحَسَبًا لَيْسَ فِي أَبَائِي مِنْ لَدُنْ أَدَمَ سَفَاحٌ كُلَّنَا نَكَاحُ .
"তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) আয়াত : لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ -এর ৬ বর্ণে যবর দিয়া পাঠ করিলেন, যাহার অর্থ হইল নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল তোমাদের নিকট আসিয়াছেন তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক উচ্চতর নসব ও বংশে। আয়াতটি তিলাওয়াত করিয়া রাসূলুল্লাহ (স) বলিলেন, আমি বংশের দিক দিয়া তোমাদের সকল হইতে উত্তম। হযরত আদম (আ) হইতে শুরু করিয়া আমার পূর্বপুরুষদের কেহই ব্যভিচার জাত নহেন (যুরকানী, শারহু মাওয়াহিবুল লাদুনিয়্যা, বৈরূত তা.বি., ১খ, ৬৭)।
ইবন আব্বাস (রা) ও যুহরী (র) أَنْفُسَكُمْ -এর ৬ অক্ষরে যবর দিয়া পাঠ করিতেন এবং উহার অর্থ করিতেন সর্বোত্তম ও বংশমর্যাদায়। হযরত আদম (আ) হইতে শুরু করিয়া রাসূলল্লাহ (স)-এর পিতা-মাতা পর্যন্ত তাঁহার বংশের সহিত সম্পৃক্ত নারী-পুরুষ সকলেই ব্যভিচারীর দোষ হইতে মুক্ত ছিলেন। তদানীন্তন রোম সম্রাট কায়সার মক্কায় কাফিরদের নেতা আবূ সুফ্যানকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নসব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন : তোমাদের মধ্যে তাঁহার বংশ কীরূপ? আবু সুফ্যান নির্দ্বিধায় উত্তর দিয়াছিলেন : هُوَ فَيْنَا ذُونَسَبُ “তিনি আমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশের অধিকারী” (বুখারী, আল-জামি, আস-সাহীহ, কলিকাতা তা.বি., ১খ, পৃ. ৪)। ইবন হাজার আল-'আসকালানী বলেন, বাযযারের একটি বর্ণনা রহিয়াছে, রোম সম্রাটের এক প্রশ্নের জবাবে আবূ সুফ্যান রাসূলুল্লাহ (স)-এর নসব সম্পর্কে বলিয়াছিলেন: هُوَ فَيْنَا ذُو نَسَب مَالَا يَفْضِلُ عَلَيْهِ أَحَدٌ “বংশীয় আভিজাত্যে তিনি এমন পর্যায়ের লোক যাহার উপর অন্য কাহারও কোন শ্রেষ্ঠত্ব নাই”। সম্রাট ইহা শুনিয়া বলিয়াছিলেন, ইহাও নবুওয়াতের একটি প্রমাণ (ফাতহুল বারী, কিতাবু'ত তাফসীর, মিসর ১৩০১ হি., ৮খ, পৃ. ১৬৩)। বুখারীর বর্ণনামতে রোম সম্রাটের মন্তব্য ছিল এইরূপ : وَكَذَلِكَ الرُّسُلُ تُبْعَثُ فِي أَحْسَابِ قَوْمِهَا “এইভাবে রাসূলগণকে তাঁহাদের স্বগোত্রের অভিজাতদের মধ্য হইতে প্রেরণ করা হয়” (বুখারী, প্রাগুক্ত)।