📄 মুদার
মুদারঃ এই নামটি সম্পর্কে আল-কুতুবী বলেন, শব্দটির মূল মুদায়রাহ (দুধ দ্বারা প্রস্তুতকৃত খাদ্যবিশেষ)। এই নামকরণের কারণ তাঁহার উজ্জ্বল শুভ্র গাত্রবর্ণ (বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. আস-সুহায়লী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০)। মুদার সর্বাধিক মধুর কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন বলিয়া কথিত আছে। হাদীছে বর্ণিত আছেঃ
لا تَسُبُّوا مُضَرَ وَلَا رَبِيعَةَ فَإِنَّهُمَا كَانَا مُؤْمِنَيْنِ .
"মুদার ও রবী'আকে গালি দিও না, কারণ তাহারা মুমিন ছিল" (আস-সুহায়লী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ১০)। তাঁহার মায়ের নাম সাওদা বিন্ত 'আক (علك)। তাঁহার সহোদর এক ভাইয়ের নাম আয়াদ (إياد)। তাঁহাদের বৈমাত্রেয় অপর দুই ভাই হইলেন রবী'আ ও আনসার।
📄 নিয়ার
নিযারঃ এই শব্দটি النزرُ ধাতু হইতে উদগত। ইহার অর্থ হইল অল্প। বলা হয়, নিযারের জন্মের পর তাঁহর পিতা তাঁহার দুই চোখের মধ্যবর্তী স্থানে একটি জ্যোতি ঝলমল করিতে দেখিয়াছিলেন। ইহা ছিল নবুওয়াতের সেই নূর যাহা বংশ-পরম্পরায় মুহাম্মাদ (স) পর্যন্ত পৌঁছিয়াছিল। এই নূর প্রত্যক্ষ করিয়া নিযারের পিতা আনন্দের আতিশয্যে উট যবাই করিয়া লোকজনকে আহার করাইয়াছিলেন। অতঃপর বলিয়াছিলেন, এই সকল আয়োজন এই জাতকের জন্য অতি অল্প। এই হইতে তাঁহার নাম নিযার পড়িয়া গেল (আস-সুহায়লী, প্রাগুক্ত)।
বলা হয়, নিযারের উপনাম ছিল আবূ আয়াদ, মতান্তরে আবু রবী'আ। মাতার নাম মু'আনা বিন্ত জাওশাম। তাঁহার সহোদর ভাইগণ হইলেন কানাস, কানাসা, সানাম, হায়দান, হায়দাহ, জুনায়দ, জুনাদাহ, আর ফাৰ্হুম, উবায়দুররামাহ্, আল-'উরফ, 'আওফ শাক, কুযাসাহ প্রমুখ (তাবারী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯০)।
তাঁহার মাতা হইলেন মাহদাদ বিনতুল লাহম। তাঁহার সহোদর এক ভাই হইলেন আদ-দায়ছ। কাহারও মতে আদ-দায়ছ-এর অপর নাম আকর (তাবারী, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯১)।
📄 আদনান
আদনান : এই নামটি عدن (স্থায়ী নিবাস) ধাতু হইতে আগত। 'আদনানের অপর দুইজন ভাই হইলেন নাবত ও 'আমর। 'আদনান পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর বংশতালিকায় কাহারও কোন দ্বিমত নাই। উহার উপরস্থ নসবনামা সম্পর্কে বংশ-বৃত্তান্তবিদগণের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য রহিয়াছে। এই কারণে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (স) ইহার উপরস্থ বংশতালিকার বিবরণ দান হইতে বিরত থাকেন (তাবারী, প্রাগুক্ত)। 'আল্লামা যাহাবী হিশাম ইবন কালবীর বরাতে বলেন: سَمِعْتُ مَنْ يَقُولُ إِنَّ مَعَدَا عَلَى عَهْدِ عِيْسَى بْنِ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ "আমি এক লোককে বলিতে শুনিয়াছি, মা'আদ্দ ঈসা ইবন মারয়াম (আ)-এর সমকালীন ছিলেন" (যাহাবী, আস-সীরাতুন নবী, বৈরূত ১৯৮১ খৃ., পৃ. ২)। হযরত 'আইশা (রা) হইতে বর্ণিত আছে: مَا وَجَدْنَا أَحَدًا يَعْرِفُ مَا وَرَاءَ عَدْنَانَ وَلَا قَحْطَانَ إِلا تَخَرُّصا . "আদনান ও কাহতানের উপরস্থ বংশতালিকা সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করিতে আমরা কাহাকেও পাই নাই। যাহা কিছু রহিয়াছে তাহা সবই অনুমান নির্ভর।” (ইবন সায়্যিদিন নাস, 'উয়ূনু'ল আছার, বৈরূত তা.বি, ১খ, পৃ. ২২)। আদনান পর্যন্ত মোট একুশ ধাপ পূর্বপুরুষ। প্রত্যেক পুরুষের মধ্যে গড়ে ৩৩ বৎসরের ব্যবধান ধরিলে ৬৯৩ বৎসর হয়। রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর জন্ম সন ৫৭০ খৃ. এই হিসাবে পূর্বপুরুষ 'আদনানের জন্ম খৃ. পূর্ব ১২৪ বলিয়া ধরা যায় (বিস্তারিত বিবরণের জন্য দ্র. ইসলামী বিশ্বকোষ; হযরত রাসূলে করীম (সা) জীবন ও শিক্ষা, ১৯৯৭ খৃ., পৃ. ৪)।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ঊর্ধ্বতন পিতা ইসমাঈল (আ)
এই কথা দিবালোকের মত সত্য যে, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ঊর্ধ্বতন পিতা ছিলেন ইসমাঈল (আ)। কিন্তু পাশ্চাত্যের ইয়াহুদী ও খৃস্টান ঐতিহাসিকগণের অধিকাংশ আমাদের প্রিয়নবী (স)-এর পূর্বপুরুষ হিসাবে ইবরাহীম ও ইসমা'ঈল (আ)-কে স্বীকার করিতে নারাজ। তাহাদের অভিমত হইল, ইবরাহীম ও ইসমা'ঈল (আ) কোন দিনই মক্কায় গমন করেন নাই। এই দুই পিতা ও পুত্রের দ্বারা আল্লাহ্র ঘর কা'বাও নির্মিত হয় নাই।
রাসূলুল্লাহ্ (স) ও ইসলামের বিরুদ্ধে ইহা অত্যন্ত মারাত্মক অভিযোগ। এই অভিযোগটি সত্য হইলে ইসলামের ভিত নড়বড়ে হইয়া যাইবে। কারণ মহাসত্য গ্রন্থ আল-কুরআনে এই ব্যাপারে ইরশাদ হইয়াছে:
وَإِذْ يَرْفَعُ إِبْرَاهِيمُ الْقَوَاعِدَ مِنَ الْبَيْتِ وَاسْمَاعِيلُ رَبَّنَا تَقَبَّلْ مِنَّا . "যখন ইবরাহীম ও ইসমা'ঈল কাবা গৃহের প্রাচীর তুলিতেছিল তখন তাহারা বলিয়াছিল, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এই কাজ গ্রহণ কর" (২ঃ ১২৭)।
বিভ্রান্তিমূলক এই অভিমত আল্লামা শিবলী নুমানী যুক্তির ভিত্তিতে খণ্ডন করিয়াছেন। তিনি বলেনঃ ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের এই বিভ্রান্তির মূলে দুইটি কারণ উল্লেখ করা যায়। তাহা হইলঃ (এক) হাজেরা ও তদীয় পুত্র ইসমাঈল (আ) আরবে গিয়া বসতি স্থাপন করিয়াছিলেন, নাকি অন্য কোথাও? (দুই) কুরবানী কাহাকে করার আদেশ দেওয়া হইয়াছিল ইসমাঈল (আ) না ইসহাক (আ)-কে? প্রথম কথা ইসমাঈল (আ)-এর আবাসন ছিল কোথায়? এই ব্যাপারে বাইবেলের বক্তব্য হইল, ইবরাহীম (আ)-এর প্রথম সন্তান ইসমাঈল (আ) বিবি হাজেরার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। অতঃপর সারার গর্ভে ইসহাক (আ) জন্মলাভ করেন।
ইসমা'ঈল (আ) যখন বড় হইলেন তখন সারা ইবরাহীমকে বলিলেন, হাজেরা ও তাহার ছেলেকে এখান হইতে তাড়াইয়া দাও। বাইবেলে বলা হইয়াছে (আদিপুস্তক, অধ্যায়: ২১):
"পরে আব্রাহাম প্রত্যূষে উঠিয়া রুটী ও জলপূর্ণ কুপা লইয়া হাগারের স্কন্ধে দিয়া বালকটীকে সমর্পণ করিয়া তাহাকে বিদায় করিলেন। সে প্রস্থান করিয়া বের শেবা প্রান্তরে ঘুরিয়া বেড়াইল। পরে কুপার জল শেষ হইল, তাহাতে সে এক ঝোপের নীচে বালকটীকে ফেলিয়া রাখিল! আর আপনি তাহার সম্মুখ হইতে অনেকটা দূরে, অনুমান এক তীর দূরে গিয়া বসিল। কারণ সে কহিল: বালকটীর মৃত্যু আমি দেখিব না। আর সে তাহার সম্মুখ হইতে দূরে বসিয়া উচ্চেঃস্বরে রোদন করিতে লাগিল। তখন ঈশ্বর বালকটির রব শুনিলেন; আর ঈশ্বরের দূত আকাশ হইতে ডাকিয়া হাগারকে কহিলেন, হাগার! তোমার কি হইল? ভয় করিও না, বালকটি যেখানে আছে, ঈশ্বর তথা হইতে উহার রব শুনিলেন; তুমি উঠিয়া বালকটীকে তুলিয়া তোমার হাতে ধর; কারণ আমি উহাকে এক মহাজাতি করিব। তখন ঈশ্বর তাহার চক্ষু খুলিয়া দিলেন, তাহাতে সে এক সজল কূপ দেখিতে পাইল, আর তথায় গিয়া কৃপাতে জল পুরিয়া বালকটিকে পান করাইল। পরে ঈশ্বর বালকটীর সহবর্তী হইলেন, আর সে বড় হইয়া উঠিল এবং প্রান্তরে থাকিয়া ধনুর্দ্ধর হইল।
"সে পারন প্রান্তরে বসতি করিল। আর তাহার মাতা তাহার বিবাহার্থে মিসর দেশ হইতে এক কন্যা আনিল" (পবিত্র বাইবেল, বাংলাদেশ বাইবেল সোসাইটী, পৃ: ২৬-২৭)।
বাইবেলের উপরিউক্ত ভাষ্য হইতে এই কথা প্রস্ফুটিত হইয়া উঠে যে, হযরত ইসমা'ঈল (আ)-কে যখন গৃহ হইতে বাহির করিয়া দেওয়া হয় তখন তিনি একেবারে কচি শিশু ছিলেন। ফলে হাজেরা মশক (পানির পাত্র) ও ইসমাঈলকে স্কন্ধের উপর বহন করিলেন। এই সম্পর্কে 'আরবী তাওরাতের পরিষ্কার ভাষ্য হইল এইরূপ: وَاضِعًا إِيَّاهَا عَلَى كَتَفَهَا وَالْوَلَدَ "ইবরাহীম (আ) মশক ও শিশু দুইটিকেই হাজেরার স্কন্ধে উঠাইয়া দিলেন" (শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত)।
বাইবেলে আরও বলা হইয়াছে যে, যখন ইবরাহীম (আ) পুত্র ইসমা'ঈল (আ)-কে খতনা করাইয়াছিলেন তখন ইসমা'ঈলের বয়স ছিল তের (১৩) বৎসর এবং ইবরাহীম (আ)-এর বয়স নিরানব্বই (৯৯) বৎসর (পবিত্র বাইবেল, 'আদিপুস্তক অধ্যায় ১৭ : ২৪-২৫, পৃ. ২১)।
বাইবেলের বর্ণনায় ইহা স্পষ্ট যে, ইসমাঈল (আ)-কে গৃহ হইতে বহিষ্কারের ঘটনা তাঁহার খতনা সম্পাদন করিবার পর ঘটিয়াছিল। বাইবেলের বিবরণও এই কথা সমর্থন করে। সুতরাং বহিষ্কারের সময় তাঁহার বয়স তের বৎসরের অধিক ছিল। এই বয়সের একটি ছেলেকে তাহার মাতা কখনও কাঁধে তুলিয়া নিতে সক্ষম হইবেন না। বাইবেলের এই ঘটনা বর্ণনার উদ্দেশ্য হইল এই কথা প্রমাণ করা যে, ইসমাঈল (আ)-এর বয়স এই সময় এমন পর্যায়ে পৌছিয়াছিল যে, পিতা ইবরাহীম (আ) তাঁহাকে এবং তাঁহার মাতাকে মূল বসতবাটী হইতে বহুদূরে কোন স্থানে লইয়া গিয়া বসতি দান করিয়াছিলেন।
বাইবেলের উল্লিখিত বর্ণনা হইতে জানা যায়, হযরত ইসমা'ঈল (আ) পারন প্রান্তরে বসবাস করিতেন এবং তীর চালনার কাজে করিতেন। খৃস্টানরা মনে করেন, পারন সেই প্রান্তরের নাম যাহা ফিলিস্তীনের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। এইজন্য তাহারা বলে, হযরত ইসমা'ঈল (আ)-এর আরবে আগমন একটি কল্পনাপ্রসূত বর্ণনা। 'আরব ভূগোলবিদগণ অবশ্য এই ব্যাপারে একমত যে, 'পারন' বা পারান এমন একটি পর্বত যাহা হিজাযে অবস্থিত। এমনকি মু'জামু'ল বুলদান গ্রন্থে বলা হইয়াছে : ফারান হিব্রু হইতে আরবীতে রূপান্তরিত শব্দ। ইহা মক্কার অন্যতম নাম। কেহ কেহ বলিয়াছেন, মক্কার একটি পাহাড়ের নাম (মু'জামুল বুলদান, বৈরূত, তা.বি., ৪খ, ২২৫)।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে, কোন কালে আরবের উত্তর সীমান্ত খুবই প্রশস্ত ছিল। তামাদ্দুনুল 'আরব গ্রন্থে মোনিয়ে লোবা উল্লেখ করিয়াছেনঃ "এই বদ্বীপের উত্তর সীমান্ত নির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা সহজ নয়। অর্থাৎ এই সীমা ফিলিস্তীনের গাযযা শহর যা ভূমধ্য সাগরের পাড়ে অবস্থিত। তথা হইতে দক্ষিণের সাগর (Dead Sea) পর্যন্ত একটি রেখা টানিয়া দামেশক পর্যন্ত এবং এখান হইতে এই রেখাটি ফুরাত নদীর তীর ধরিয়া পারস্য উপসাগর পর্যন্ত লম্বা করিলে 'আরবের উত্তর সীমা পাওয়া যাইবে।" তাহার এই কথামতে 'আরবের হিজাযী অংশকে পারন বা ফারান গণ্য করা অযৌক্তিত নহে। বাইবেলে হযরত ইসমা'ঈল (আ)-এর বাসস্থান সম্পর্কে বলা হইয়াছেঃ "আর তাঁহার সন্তানগণ হবীলা অবধি অশুরিয়ার দিকে মিসরের সম্মুখস্থ শূর পর্যন্ত বসতি করিল; তিনি তাঁহার সকল ভ্রাতার সম্মুখে বসতি স্থান পাইলেন" (আদি পুস্তক অধ্যায় ২৫, ১৮; পবিত্র বাইবেল, প্রাগুক্ত পৃ. ৩৪-৩৫)। এই বর্ণনা অনুসারে মিসর সম্মুখস্থিত ভূখণ্ড 'আরবের সহিত সংযুক্ত বলিয়া মনে হয়। খৃস্টানগণের ধর্মীয় গ্রন্থাবলীতে ইসহাক (আ) বংশীয় বনূ ইসরাঈলেরই আলোচনার আধিক্য রহিয়াছে। হযরত ইসমা'ঈল (আ)-এর বংশের কথা তাহাদের আলোচনায় কেবল প্রাসঙ্গিকভাবে অল্পই করা হইয়াছে। এই কারণে তাঁহার আরবে বসবাস করার কথা স্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না, কিন্তু তাহাদের ধর্মীয় গ্রন্থের বিভিন্ন ইঙ্গিত হইতে এই কথা বুঝা যায় যে, হাজেরা (রা) 'আরবে যে বাস করিতেন তাহা উহাদের নিকট স্বীকৃত। বাইবেলের নূতন নিয়ম করে ইহাতে বলা হইয়াছেঃ "আব্রাহামের দুই পুত্র ছিল, একটি দাসীর পুত্র, একটি স্বাধীনার পুত্র। কিন্তু ঐ দাসীর পুত্র মাংস অনুসারে, স্বাধীনার পুত্র প্রতিজ্ঞার গুণে জন্মিয়াছিল। এ সকল কথার ব্যাপক অর্থ আছে, কারণ ঐ দুই স্ত্রী দুই নিয়ম; একটি সীনয় পর্বত হইতে উৎপন্ন ও দাসত্বের জন্য প্রসবকারিনী; সে হাগর, আর এই হাগর 'আরব দেশস্থ সীনয় পর্ব্বত; এবং সেখানকার যিরুশালেমের সমতুল্য" (পবিত্র বাইবেল, নূতন নিয়ম, গালাতীয়, ৪ঃ ২২, পৃ. ৩৩০)।
আল্লামা শিবলী নু'মানী বলেন, পৌল ছিল হযরত 'ঈসা (আ)-এর একজন প্রভাবশালী উত্তরাধিকারী। তাহার উক্তি হইতে জানা যায় যে, হাজেরা 'আরবদেশস্থ সীনা পর্বতের অধিবাসী ছিলেন। যদি হাজেরা আরবদেশে বসতি স্থাপন না করিয়া থাকিতেন তাহা হইলে তাঁহাকে আরবের সীনা পর্বতের অধিবাসী বলিবার কোন অর্থই হইত না (সীরাতুন নবী, প্রাগুক্ত, ১খ ৮৬)। হাজেরা ও ইসমাঈল (আ)-কে কেন এবং কোথায় নির্বাসন দেওয়া হইয়াছিল এই ব্যাপারে বাইবেলের বিবরণ পরস্পরবিরোধী। একবার বলা হইয়াছে, সারাহ তাঁহাকে (ইসমাঈল) পরিহাস করিতে দেখিলেন এবং অন্যবার বলা হইয়াছে, ইসমা'ঈল (আ) ইসহাকের সহিত ইবরাহীম (আ)-এর উত্তরাধিকারী হইবে এই আশংকায় সারাহ ইসমাঈল ও তাঁহার মাতাকে বিতাড়িত করিবার জন্য বলিয়াছিলেন। বিতাড়িত করার স্থান সম্পর্কেও নূতন ও পুরাতন নিয়মের বর্ণনার মধ্যে অসঙ্গতি রহিয়াছে। সুতরাং এই সম্পর্কিত বাইবেলের কোন বিবরণই গ্রহণযোগ্য নহে। বাইবেলের অনুসারীরা ইচ্ছামত পরিবর্তন ও সংযোজন এই ক্ষেত্রেও করিয়াছেন বলিয়া প্রত্যক্ষ প্রমাণ আজও মক্কার আশেপাশে দিবালোকের মত উদ্ভাসিত রহিয়াছে। যমযম কূপ ও মাকামে ইবরাহীমে সংরক্ষিত পদচিহ্ন কিসের প্রমাণ বহন করে? সহীহ বুখারীর ৩৩৫১ নম্বর হাদীছে ইরশাদ হইয়াছে:
عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ دَخَلَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْبَيْتَ فَوَجَدَ فيه صُورَةَ ابْرَاهِيمَ وَصُورَةَ مَرْيَمَ فَقَالَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَّا هُمْ فَقَدْ سَمِعُوا أَنَّ الْمَلَائِكَةَ لَا تَدْخُلُ بَيْتًا فِيْهِ صُورَةٌ هَذَا إِبْرَاهِيمُ مُصَوَّرُ فَمَا لَهُ يَسْتَقِيمُ.
"ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (স) কা'বা ঘরে প্রবেশ করিলেন। সেখানে তিনি ইবরাহীম (আ) ও মারয়াম (আ)-এর ছরি দেখিতে পাইলেন। তিনি তখন বলিলেন, তাহাদের (কুরায়শদের) কি হইল? অথচ তাহারা তো শুনিয়াছে যে, ঘরে প্রাণীর ছবি থাকিলে সে ঘরে ফেরেশতাগণ প্রবেশ করেন না। এই যে ইবরাহীমের ছবি বানানো হইয়াছে, তাহাও আবার ভাগ্য নির্ধারক জুয়ার তীর নিক্ষেপরত অবস্থায়" (বুখারী, করাচী ১৩৮১ হি., ১খ ৪৭৩; ফাতাহুল বারী, প্রাগুক্ত, ৬খ, ৩৮৭)।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে এই ছবি মুছিয়া ফেলা হয়। সুতরাং ইসলামী বর্ণনানুযায়ী হাজেরা ও ইসমা'ঈল (আ)-কে মক্কায় যমযম কূপের পাশে নির্বাসন দেওয়ার বর্ণনাই বাস্তব সম্মত ও ঐতিহাসিক প্রমাণ ভিত্তিক।