📄 'আব্দ মানাফ
'আব্দ মানাফ: প্রকৃত নাম আল-মুগীরা, তাঁহার সুন্দর গঠন ও চমৎকার চেহারার জন্য তাঁহাকে আল-কামারও বলা হইত। কামার অর্থ চাঁদ, সৌন্দর্যে তাঁহাকে চাঁদের সহিত উপমা দিয়া এই নামে অভিহিত করা হয়। তাঁহার পিতা হইলেন কুসাই (তাবারী, প্রাগুক্ত, ১/২খ, পৃ. ১৮১)।
কুসাইর চার পুত্র ও দুই কন্যা ছিল। তাঁহারা হইলেন যথাক্রমে 'আবদুদ্ দার )عبد الدار( 'আবদ মানাফ, 'আবদু'ল উযযা, 'আবদ কুসাই ইব্ন কুসাই, তাখাম্মুর, বাররাহ। কুসাই ইনতিকালের সময় তাঁহার হারাম শরীফ সম্পর্কিত সকল দায়দায়িত্ব তদীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র 'আবদুল্ দারকে অর্পণ করিয়াছিলেন যদিও তিনি অন্যান্য ভ্রাতৃবর্গের তুলনায় অযোগ্য ছিলেন। তবে কুসাইর পর কুরায়শ গোত্রকে নেতৃত্ব দানের দায়িত্ব 'আবদ মানাফ লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার বংশই ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বংশ। 'আবদ মানাফের ছয়জন পুত্র সন্তান ছিল। উহাদের মধ্যে হাশিম ছিলেন সর্বাধিক গণ্যমান্য। হাশিম তদীয় ভ্রাতৃবর্গকে এই কথা বুঝাইতে সক্ষম হইয়াছিলেন যে, হারাম শরীফের যেই সকল দায়িত্ব 'আবদুদ্ দারকে দেওয়া হইয়াছিল তাহা পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। কারণ উহারা সেই মহান দায়িত্ব পালনের সম্পূর্ণ অযোগ্য। কিন্তু 'আবদু'দ দার গোত্র উহা মানিতে রাজি হয় নাই। ফলে তাহাদের মধ্যে যুদ্ধ বাধিবার উপক্রম হইল। অবশেষে হাশিমের অনুকূলে হাজ্জীদের পানি পান ও সেবা করিবার দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে যুদ্ধের আশংকা তিরোহিত হয়।
📄 কুসাই
কুসাই : নাম যায়দ, তাঁহার পিতা কিলাব ইব্ন মুররাহ এবং মাতা ফাতিমা বিন্ত সা'দ ইবন সায়ল। ফাতিমার গর্ভে দুইটি সন্তান জন্মলাভ করিয়াছিল: যথাক্রমে যুহরা ও যায়দ। যায়দ ও যুহরাকে রাখিয়া কিলাব মারা যান। যায়দ ছিলেন তখন ছোট এবং যুহরা ছিলেন যুবক। বিধবা ফাতিমা বিন্ত সা'দ তখন রাবী'আ ইবন হারামের সহিত দ্বিতীয়বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইলেন। দুগ্ধপোষ্য বা কিশোর যায়দ (কুসাই)-কে লইয়া তাহার মাতা স্বীয় স্বামীর দেশ সিরিয়ার বই 'আযরায় গমন করিলেন। মুহরা নিজ গোত্রে থাকিয়া গেলেন। ফাতিমা বিন্ত সা'দের দ্বিতীয় স্বামী যায়দকে এখানে লালন-পালন করিলেন। নিজ গোত্র হইতে যায়দকে তাহার মাতা অনেক দূর অন্য দেশে লইয়া যাওয়ার কারণে তাহার নাম কুসাই পড়িয়া গেল। শব্দটির অর্থ দূরবর্তী।
কুসাই বড় হইলেন। বনু কুযা'আর এক লোকের সহিত তাঁহার সম্পর্ক গড়িয়া উঠিল। লোকটি একদিন তাঁহাকে বলিল: কুসাই। তুমি তো আমাদের এখানকার লোক নহ। তুমি কি তোমার পিতৃদেশে ফিরিয়া যাইবে না? এ কথা শুনিয়া কুসাই তাঁহার মাতার নিকট আসিয়া এই ব্যাপারের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হইলেন। অতঃপর পিত্রালয়ে ফিরিয়া যাওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করিলেন। মাতার নির্দেশমত তিনি হজ্জ কাফেলার সহিত মক্কায় ফিরিয়া আসিলেন এবং হজ্জ সম্পন্ন করিলেন। অভিজাত বংশের কুসাই হুলাইল আল-খুযাঈর নিকট তাহার মেয়ে হুযায়কে বিবাহ করিবার প্রস্তাব পাঠাইলেন। হুলাইল তাহার প্রস্তাব গ্রহণ করিয়া স্বীয় মেয়েকে তাঁহার সহিত বিবাহ দেন (তাবারী, প্রাগুক্ত, ১/২খ, পৃ. ১৮১)। সেই কালে হারাম শরীফের পৃষ্ঠপোষক (متولی) ছিলেন হুলাইল খুযাঈ। মৃত্যুকালে তিনি ওসিয়াত করিয়া গিয়াছিলেন যে, তাঁহার অবর্তমানে হারাম শরীফের পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত যেন কুসাইর হাতে ন্যস্ত করা হয়। এইভাবে কুসাইর হাতে হারামের নেতৃত্ব চলিয়া আসিয়াছিল। কুসাই দায়িত্ব পাইয়া দারুন নাদওয়া নামে একটি সভাগৃহ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। এখান হইতে কুরায়শ গোত্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ কার্য আনজাম দেওয়া হইত। তিনি সকল গোত্রকে আহবান করিয়া এক বক্তৃতা দিয়াছিলেন। ইহার সারাংশ হইলঃ শত শত মাইল অতিক্রম করিয়া লোকজন হজ্জের উদ্দেশ্যে হারাম শরীফে আগমন করে। তাহাদের মেহমানদারি করা কুরায়শ গোত্রের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। তাঁহার আহবানে সাড়া দিয়া কুরায়শ গোত্র নির্ধারিত হারে বার্ষিক একটি চাঁদার ব্যবস্থা করিল। ইহার দ্বারা মক্কা ও মিনাতে হাজ্জীদেরকে বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হইত। চামড়ার হাওয তৈরী করিয়া উহাতে পানি ভর্তি করিয়া রাখা হইত, যাহা হইতে হাজীগণ পানি পান করিতেন। কুসাই যে সকল মহৎ কার্য সম্পাদন করিয়াছিলেন তাহার মধ্যে এই কাজটি ছিল তাঁহার উল্লেখযোগ্য অবদান। 'মাশ'আরুল হারাম'-ও তাঁহার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। কুসাই এত বিপুল হারে সেবামূলক কাজ করিয়াছিলেন যে, অনেকে বলিয়াছেন, তাঁহাকেই কুরায়শ উপাধিতে প্রথমে ভূষিত করা উচিত (শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ১০৫)।
ইবন সা'দ তদীয় সূত্রে ইন্ন 'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন: كَانَ قَصَى يَقُولُ وَلِدَ لِي أَرْبَعَةُ رِجَالٍ فَسَمَّيْتُ اثْنَيْنِ بِالهِي وَوَاحِداً بِدَارِي وَوَاحِداً بِنَفْسِي فَكَانَ يُقَالُ لَعَبْدِ بْنِ قُصَى وَاللَّذَانِ سَمَّاهُمَا بِالهِم عَبْدِ مَنَافٍ وَعَبْدِ الْعُزَّى وَبَدَارِهِ عَبْدُ الدار .
"কুসাই বলিতেন, আমার চারটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করিয়াছে। আমি তাহাদের দুইজনের নাম রাখিয়াছি আমার ইলাহের নামে, একজনের নাম আমার গৃহের সহিত সম্পৃক্ত করিয়া আর অন্য জনের নাম আমার নিজের সহিত সম্বন্ধ রাখিয়া। সুতরাং 'আবদ ইব্ন কুসাইকে 'আবদ কুসাই বলা হইত। তাঁহার ইলাহের সহিত সম্পৃক্ত দুইজনের নাম হইল 'আবদ মানাফ ও আবদুল 'উয্যা। নিজ গৃহের সহিত সম্পর্ক করিয়া যাহার নাম রাখা হইয়াছিল তাহাকে 'আবদুদ্ দার বলা হইত। ইবন সা'দ আরও বলেন, হুলাইলের ইনতিকালের পর কুসাইর সন্তানাদি সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িল। ধনে-মানে তাহারা প্রসিদ্ধি লাভ করিল। তখন তাহারা মনে করিল মক্কা এবং বায়তুল্লাহ্র খিদমত করার জন্য তাহারাই সর্বাধিক হকদার। কারণ কুরায়শ হইল ইসমা'ঈল ইবন ইবরাহীম (আ)-এর বংশধর। সুতরাং তাহারা কুরায়শ ও বনূ কিনানার লোকদের ডাকিয়া এই ব্যাপারে পরামর্শ করিল। খুযাআ ও বনূ বাক্স গোত্রকে মক্কা হইতে বহিষ্কার করিবার মতামত গ্রহণ করিল। সকলেই ইহাতে সম্মতি প্রদান করিল। কুসাই তখন তদীয় বৈমাত্রেয় ভাই রিযাহ (رزاح) ইবন রাবী'আর নিকট এই ব্যাপারে সাহায্য চাহিয়া পত্র পাঠাইলেন। রিযাহ তাহার সহোদর ভাই হুন্ন (هن), মাহমূদ ও জুলহুমাহ (جلهمه)-সহ মক্কায় আগমন করিলেন।
আল-গাওছ ইন্ন মুরর-এর বংশ সূফাহ (صوفه) হাজ্জীদের উপর আধিপত্য বিস্তার করিয়া তাহারা এই নিয়ম করিয়া দিল যে, সূফাহ গোত্রীয় কোন লোক শয়তানের উপর কংকর মারিবার পূর্বে অন্য কেহ কংকর মারিতে পরিবে না। পরবর্তী বৎসর এইরূপ আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধে কুসাই রুখিয়া দাঁড়াইলেন। তিনি বলিলেন, তোমাদের এই অবিচারের দরুন তোমরা মক্কা ও বায়তুল্লাহ্র শাসনকার্য পরিচালনা করিবার অধিকার হারাইয়া ফেলিয়াছ। আমরাই ইহার সর্বাধিক হকদার। তাহারা এই দাবি অমান্য করিল। ফলে উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হইল। যুদ্ধে সূফাহ গোত্র পরাজিত হইল। লোকজন যথারীতি শয়তানের উপর কংকর মারিবার অধিকার ফিরিয়া পাইল। কুসাই ইহার নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হইলেন। তাঁহাকে প্রতিরোধ করিবার জন্য খুযা'আ ও বনূ বাক্স গোত্র প্রস্তুতি গ্রহণ করিল। কুসাইও বসিয়া থাকেন নাই। ফলে উভয়ের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটিল। বহু লোক মারা গেল। অতঃপর উভয় দল আপোস-মীমাংসায় সম্মত হইল। ইয়া'মুর ইবন 'আওফ সালিশ সাব্যস্ত হইলেন। তিনি রায় দিলেন, খুযা'আ গোত্রের তুলনায় কুসাই ইব্ন কিলাব বায়তুল্লাহ্ ও মক্কায় নেতৃত্ব দানের জন্য অধিকতর যোগ্য (ইবন সা'দ, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ৬৮, পৃ. ৭০)।
📄 কিলাব
কিলাব: কিলাব শব্দটি মাসদার (ক্রিয়ামূল) অর্থেও হইতে পারে আবার বহুবচন অর্থেও হইতে পারে। ইহার অর্থ হইল কুকুর বা আঘাত করা। আবুর রাকীশ আল-আরাবীকে জিজ্ঞাসা করা হইয়াছিল, আপনারা আপনাদের পুত্রদের মন্দ নামে কেন ডাকেন? যেমন কুকুর চিতা বাঘ ইত্যাদি এবং ক্রীতদাসদেরকে উত্তম নামে ডাকেন। যেমন, মারযূক (রিযিকপ্রাপ্ত) ও রিবাহ নামে (মুনাফা) নামে। ইহার কারণ কি? উত্তরে সে বলিয়াছিল, আমরা আমাদের পুত্রদের নাম আমাদের শত্রুদের নামে নামকরণ করি এবং আমাদের ক্রীতদাসদের নাম নিজেদের নামের সহিত মিলাইয়া রাখি। কারণ উহারা মাথার বোঝা হিসাবে শত্রুদের কাতারভুক্ত হইয়া থাকে। এই কারণেই এই সকল নামে নামকরণ করা হইয়া থাকে (আস-সুহায়লী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ৮)।
কিলাবের মাতা ছিলেন হিন্দ (هند) বিন্ত সুরায়র। দুই পিতৃপক্ষের ভাই হইলেন: তায়ম ও ইয়াকযাহ (يقظه)
📄 মুররাঃ
মুররা: مرّ শব্দ হইতে নির্গত, অর্থ তিতা, কষা। শব্দটিকে মাকাল ফলের (حنظلة) অর্থ হইতে গ্রহণ করা হইয়াছে। কারণ 'আরবরা অধিক পরিমাণে حنظلة ও 'আলকামা নামকরণ করিয়া থাকে (আস-সুহায়লী, প্রাগুক্ত)। মুররার মাতা হইলেন ওয়াহশিয়্যা (وحشيته) বিন্ত শায়বান ইন মুহারিব ইন্ন ফিত্র ইন্ন মালিক ইবন নাদ্র ইবন কিনানা। তাঁহার সহোদর দুই ভাই হইলেন যথাক্রমে 'আদী (عدی) ও হুসায়স (هصيص)। কেহ কেহ বলিয়াছেন, তাহাদের
মাতা হইলেন মাখশিয়্যা (مخشیته), আবার কেহ কেহ বলিয়াছেন, মুররা ও হুসায়সের মাতা হইলেন মাখশিয়্যাহ বিন্ত শায়বান ইবন মুহারিব ইন্ন ফিত্র। আর 'আদীর মাতা হইলেন রাকাশ বিন্ত রুকবা ইব্ নাইলাহ্ ইব্ন কা'ব (তাবারী, প্রাগুক্ত)।