📄 আবদুল মুত্তালিবের সন্তানাদি
তাঁহার কতজন সন্তানাদি ছিলেন সেই সম্পর্কে কোন সর্বসম্মত অভিমত নাই। আল্লামা দানাপুরী বলেন, সীরাতবিদগণ বলেন, তাঁহার পুত্র সন্তান ছিল দশজন। কিন্তু যেই সকল নাম উল্লেখ করা হয় তাহাতে দেখা যায় দশের অধিক। ইবন হিশাম রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পিতা আবদুল্লাহ্ আবদুল মুত্তালিবের পুত্র দশজন লিখিয়াছেন। ইবন হিশামের বর্ণনামতে তাঁহারা হইলেন: (১) হামযা, (২) আব্বাস, (৩) আবূ তালিব বা আবদে মানাফ, (৪) আবু লাহাব, (৫) যুবায়র, (৬) মুকাওয়াম, (৭) দিরার, (৮) মুগীরা (উপাধি হাজাল), (৯) আবদুল্লাহ্ ও (১০) আল-হারিছ। ইব্নুল আছীর অতিরিক্ত আরও তিনজনের নাম উল্লেখ করিয়াছেন, তাঁহারা হইলেন: (১১) আবদুল কা'ব, (১২) আল-গীদাক ও (১৩) কাছাম। ইবন হিশামের মতে সম্পদের প্রাচুর্যের দরুণ মুগীরা বা হাজালকে গীদাক বলা হইত। কিন্তু ইবনুল আছীরের বর্ণনামতে তাহারা স্বতন্ত্র দুইজন সন্তান ছিলেন। ইবনুল কায়্যিম বলেনঃ কোন কোন সূত্রমতে আবদুল মুত্তালিবের আরও একজন পুত্রের সন্ধান পাওয়া যায়, তাহার নাম আল- আওয়াম।
📄 কন্যা সন্তান
ইবন হিশামের মতে আবদুল মুত্তালিবের কন্যা সন্তান ছিলেন ছয়জন। তঁহারা হইলেন: (১) সাফিয়্যা, (২) উম্মু হাকীম আল-বায়াদা, (৩) আতিকা, (৪) উমায়মা, (৫) আরওয়া, (৬) বাররাহ। সন্তানাদির মধ্যে আল-হারিছ ছিলেন সবার বড় এবং আব্বাস ছিলেন সবার ছোট। তাহাদের মধ্যে কেবল আব্বাস ও হামযা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন। আবু তালিব, আবদুল্লাহ্, যুবায়র, আবদুল কা'ব, উম্মু হাকীম, আল বায়াদা, আতিকা, বাররা, উমায়মা, আরওয়া প্রমুখের মাতার নাম ছিল ফাতিমা বিনত 'আয়য।
হামযা, মুকাওয়াম, হাজাল ও সাফিয়্যার মাতা ছিলেন হালাহ বিন্ত উহায়ব। এই হালাহ-ই ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (স) জননী আমিনার চাচাত বোন।
আব্বাস ও দিরারের মাতার নাম ছিল নাতীলা বিনত যয়নাব।
হারিছ ও কাছামের মাতা ছিলেন সাফিয়্যা বিন্ত জুনদুব।
পঞ্চমা স্ত্রী ছিলেন লুবনা বিন্ত হাজির। তাহার পক্ষের সন্তান ছিল আবু লাহাব 'আবদুল উযযা।
ষষ্ঠ স্ত্রী ছিলেন মুন্নি'আ বিন্ত আমর। তাহার পক্ষের সন্তান ছিল গীদাক, যাহার নাম নাওফাল অথবা মুস'ঈব ছিল। ইবনুল আছীর বলেন, কেহ কেহ বলিয়াছেন, কাছামও তাহার পক্ষের সন্তান ছিল। ইবন হিশাম লিখিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর ধাত্রী ফাতিমা বিন্ত 'আমর ইবন 'আইযের মাতার নাম ছিল সাখরা বিন্ত 'আবদ ইব্ন 'ইমরান। সাখরার মাতার নাম ছিল তাখাম্মার বিন্ত 'আবদ ইব্ন কুসায়্যি ('আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, দেওবন্দ তা.বি., পৃ. ২)।
আবু লাহাব ও আবদুল উযযার মাতা ছিলেন লাবনা বিনত হাজিব।
আল-গীফাকের মাতার নাম ছিল মুমনি'আ বিন্ত আমর, গীফাকের নাম নাওফাল অথবা মুস'আব ছিল। দানাপুরী ইবনুল আছীরের সূত্রে বলেন, কেহ কেহ মনে করেন, কাছামও মুমনি'আর সন্তান ছিলেন (আসাহহুস সিয়ার, দেওবন্দ তা. বি., পৃ. ২)।
📄 হাশিম
হাশিম: মূল নাম 'আমর; ইমাম মালিক ও ইমাম শাফি'ঈ (র) এই ব্যাপারে একমত (ইদরীস কানধালাবী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ২৯)। এই নামটির উৎস সম্পর্কে আস-সুহায়লী বিশদ আলোচনা করিয়াছেন। কথিত আছে যে, শীত ও গ্রীষ্ম এই দুই ঋতুতে বাণিজ্যের জন্য সফর করার প্রথা হাশিম প্রবর্তন করেন (তাবারী, প্রাগুক্ত, ১/২খ, পৃ. ১৭৯)। হাশিম হজ্জের মৌসুমে হাজ্জীদের সেবা করিতেন। তাহাদের সুপেয় পানির ব্যবস্থা করিতেন। তখন 'আরবদেশ ছিল গোলযোগপূর্ণ। কুরায়শ বংশ যাহাতে নিরাপদে ব্যবসা-বাণিজ্য চালাইতে পারে 'ইহার বিধান নিশ্চিত করিয়াছিলেন হাশিম। এক সময় হাশিম বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়া (শাম) অভিমুখে যাত্রা করিয়াছিলেন। পথিমধ্যে মদীনায় যাত্রাবিরতি করিলেন। এখানে পুরা বৎসর বাজার থাকিত। 'বাজারে একজন বিদূষী মহিলার সহিত তাঁহার সাক্ষাত ঘটিল। মহিলাটির চলনে বলনে আভিজাত্য ফুটিয়া উঠিতেছিল। সে দেখিতেও ছিল সুদর্শনা। হাশিম তাহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া জানিতে পারিলেন, সে বনূ নাজজার গোত্রীয় মহিলা। নাম তাহার সালমা (سلمی)। হাশিম তাহার গুণে বিমুগ্ধ হইয়া উঠিলেন। তিনি তাহাকে বিবাহ করিবার প্রস্তাব পাঠাইলেন। সে তাহাতে সম্মত হইলে তাহারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হইলেন। বিবাহের পর হাশিম তাহার স্ত্রীকে মদীনায় রাখিয়া সিরিয়ায় সফরে যান। গাযা (غزه) নামক স্থানে উপনীত হইবার পর হাশিম ইনতিকাল করেন। সালমা সন্তান সম্ভবা ছিলেন। তাহার কোলে একজন সুসন্তান জন্মগ্রহণ করিল। সেই সন্তান ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর পিতামহ 'আবদুল মুত্তালিব (শিবলী নু'মানী, প্রাগুক্ত, ১খ ১০৬)।
হাশিম অত্যন্ত সুদর্শন ছিলেন। তাঁহার ললাটে নবুওয়াতের নূর ঝকমক করিত। বন্ ইসরাঈলের যাজকগণ তাঁহার চরণে লুটাইয়া পড়িত, হাতে চুম্বন করিত। 'আরব গোত্র ও বনূ ইসরাঈলের যাজকরা নিজেদের মেয়েদেরকে তাঁহার নিকট বিবাহ দানের জন্য পেশ করিত। একদা রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস হাশিমকে উদ্দেশ্য করিয়া এই মর্মে চিঠি দিয়াছিলেন যে, আপনার মহানুভবতা সম্পর্কে আমি অবহিত হইয়াছি। আমার রাজকুমারী কন্যা এই যুগের সর্বাধিক সুন্দরী। আমি তাঁহাকে আপনার নিকট স্ত্রী হিসাবে সোপর্দ করিতে ইচ্ছা পোষণ করি। আপনি এখানে চলিয়া আসুন। হাশিম তাহার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলেন। রোম সম্রাটের আসল উদ্দেশ্য ছিল, হাশিমের ললাটে যেই নবুওয়াতের জ্যোতি আলোকিত হইতে দেখা যাইতেছিল তাহা তাহার বংশে লইয়া আসা (যুরকানী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ৭২)। হজ্জ মৌসুমে হাশিম সকল হজ্জব্রত পালনকারীকে গোশত, রুটি, ছাতু ও খেজুর দ্বারা আপ্যায়ন করিতেন। যমযমের সুপেয় পানি পান করানোর সুব্যবস্থা করিতেন। হাশিমের মহানুভবতায় উমায়্যা ইবন 'আবদ শামসের ঈর্ষা হইল। সেও হাশিমের ন্যায় লোকজনকে আহার দানের ব্যবস্থা করিল। কিন্তু সম্পদের প্রাচুর্যতা সত্ত্বেও সে হাশিমের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকিতে পারিল না। এখান হইতেই বনূ হাশিম ও বনূ উমায়্যার মধ্যে শত্রুতার সুত্রপাত হয় (ইদরীস কানধালাবী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ৩১)।
📄 'আব্দ মানাফ
'আব্দ মানাফ: প্রকৃত নাম আল-মুগীরা, তাঁহার সুন্দর গঠন ও চমৎকার চেহারার জন্য তাঁহাকে আল-কামারও বলা হইত। কামার অর্থ চাঁদ, সৌন্দর্যে তাঁহাকে চাঁদের সহিত উপমা দিয়া এই নামে অভিহিত করা হয়। তাঁহার পিতা হইলেন কুসাই (তাবারী, প্রাগুক্ত, ১/২খ, পৃ. ১৮১)।
কুসাইর চার পুত্র ও দুই কন্যা ছিল। তাঁহারা হইলেন যথাক্রমে 'আবদুদ্ দার )عبد الدار( 'আবদ মানাফ, 'আবদু'ল উযযা, 'আবদ কুসাই ইব্ন কুসাই, তাখাম্মুর, বাররাহ। কুসাই ইনতিকালের সময় তাঁহার হারাম শরীফ সম্পর্কিত সকল দায়দায়িত্ব তদীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র 'আবদুল্ দারকে অর্পণ করিয়াছিলেন যদিও তিনি অন্যান্য ভ্রাতৃবর্গের তুলনায় অযোগ্য ছিলেন। তবে কুসাইর পর কুরায়শ গোত্রকে নেতৃত্ব দানের দায়িত্ব 'আবদ মানাফ লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার বংশই ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বংশ। 'আবদ মানাফের ছয়জন পুত্র সন্তান ছিল। উহাদের মধ্যে হাশিম ছিলেন সর্বাধিক গণ্যমান্য। হাশিম তদীয় ভ্রাতৃবর্গকে এই কথা বুঝাইতে সক্ষম হইয়াছিলেন যে, হারাম শরীফের যেই সকল দায়িত্ব 'আবদুদ্ দারকে দেওয়া হইয়াছিল তাহা পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। কারণ উহারা সেই মহান দায়িত্ব পালনের সম্পূর্ণ অযোগ্য। কিন্তু 'আবদু'দ দার গোত্র উহা মানিতে রাজি হয় নাই। ফলে তাহাদের মধ্যে যুদ্ধ বাধিবার উপক্রম হইল। অবশেষে হাশিমের অনুকূলে হাজ্জীদের পানি পান ও সেবা করিবার দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে যুদ্ধের আশংকা তিরোহিত হয়।