📄 প্রস্তর নিক্ষেপকারী পাখির বিবরণ
আল্লাহ তা'আলা আসহাবুল ফীলের প্রতি যে পাখী প্রেরণ করিয়াছিলেন কুরআন কারীমে তাহার বর্ণনা এইভাবে আসিয়াছে: وَأَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْراً أَبَابِيلَ “উহাদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পক্ষী প্রেরণ করেন।"
কিন্তু পাখিগুলি কিরূপ আকৃতির ছিল তাহার বর্ণনা করা হয় নাই। তাই মুফাসসির ও ঐতিহাসিকগণ এই সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা দিয়াছেন। এক বর্ণনামতে পাখিগুলি ছিল ক্ষুদ্রাকৃতির। ইবন কাছীরের বর্ণনামতে তাহা ছিল হলুদ রংয়ের পাখি, যাহা কবুতর হইতে ক্ষুদ্র, উহাদের পা ছিল লাল রংয়ের। ছানাউল্লাহ পানিপতী বর্ণনা করেন যে, উহাদের চঞ্চু ছিল লাল রংয়ের, মস্তক ছিল কাল বর্ণের এবং গলা ছিল লম্বা। উবায়দ ইবন উমায়রের বর্ণনামতে উহা ছিল কালো রংয়ের পাখি। 'ইকরিমার বর্ণনামতে তাহা ছিল সবুজ রংয়ের। উহাদের মস্তক ছিল হিংস্র জন্তুর মস্তকের ন্যায়। সাঈদ ইবন জুবায়রের বর্ণনামতে পাখিগুলি ছিল সবুজ বর্ণের, আর উহাদের চক্ষু ছিল হলুদ বর্ণের।
📄 আবরাহা নির্মিত গীর্জার পরিণতি
আবরাহার ধ্বংসের পর কেহ আর উক্ত গীর্জার সংস্কার করে নাই। ফলে উহা বিরান প্রাসাদে পরিণত হয়। উহার চতুর্দিকে হিংস্র প্রাণী, সাপ-বিচ্ছুর উৎপাত দেখা দেয়। ইহা ছাড়াও কথিত আছে যে, সেখানে দুষ্ট জিনদের আড্ডা এবং উহাকে ঘিরিয়া নানা ভীতিকর কল্পকাহিনী লোকমুখে ছড়াইয়া পড়ে। ফলে ভয়ে কেহ সেখানকার কোনও সম্পদে হাত দিত না। আব্বাসী আমলের প্রথম খলীফা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ (৭৪৯ খৃ.)-এর সময়কাল পর্যন্ত উহার নিদর্শন ও মালামাল বিদ্যমান ছিল। আবুল আব্বাস তাহার ইয়ামানের গভর্ণর ইবনুর রাবী'কে উহা ভাঙ্গিয়া সেল্লিবার জন্য সেখানে প্রেরণ করেন। তিনি নির্ভয়ে সেখানে গমন করেন এবং উহা ভাঙ্গিয়া ফেলেন, অত:পর উহার সমুদয় মালামাল লইয়া আসেন (আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ২৪৫-৪৬)।
আসহাবুল ফীল-এর এই ঘটনা আরবদের বর্ণনা-পরম্পরায় ও ইতিহাসে এতই প্রসিদ্ধ ও পরিচিত ছিল যে, সূরা ফীল (১০৫ নং সূরা) মক্কায় অবতীর্ণ হওয়ার পর ইয়াহুদী, খৃস্টান ও মুশরিকদের রাসূলুল্লাহ (স)-এর সহিত প্রচণ্ড শত্রুতা থাকা সত্ত্বেও কোন পক্ষ হইতেই ইশারা-ইঙ্গিতেও এই কথা বলা হয় নাই যে, ইহা বা ইহার কোন অংশ অমূলক বা ভিত্তিহীন। অনুরূপভাবে হিজরতের পর নাজরানের খৃস্টান প্রতিনিধি দল যখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে আগমন করিল তখন তাহারা ইসলামের বিরুদ্ধে কোনরূপ দোষারোপ করিতে সর্বতোভাবে প্রচেষ্টা চালাইয়াছিল রাসূলুল্লাহ (স) ও কুরআনকে কোন না কোনভাবে মিথ্যা সাব্যস্ত করিতে। কিন্তু তাহারাও এই ঘটনাকে আশ্রয় করিয়া কিছু বলিতে পারে নাই বা উহাকে মিথ্যা বলিতে পারে নাই।
সূরা ফীল নাযিল হইয়াছিল উক্ত ঘটনা সংঘটিত হইবার প্রায় ৪২/৪৩ বৎসর পর। কাজেই তখন উক্ত ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীই জীবিত ছিল প্রায় এক হাজারেরও অধিক লোক। আর পিতামাতা বা অন্যান্য সূত্রে শোনা লোকের সংখ্যা ছিল প্রায় লক্ষাধিক। তাই এই ঘটনাকে বা উহার কোনও অংশকে অস্বীকার করার তখন কোনও উপায় ছিল না।
কিন্তু শত শত বৎসর পর পাশ্চাত্যের কোন কোন ঐতিহাসিক কোন দলীল-প্রমাণ ছাড়াই ঘটনার বিরাট একটি অংশ অস্বীকার করিয়া বলিয়াছে যে, আবরাহার সেনাবাহিনী পাখীর প্রস্তর নিক্ষেপে নহে, বরং বসন্তের প্রকোপে ধ্বংস হইয়াছিল। তাহারা ইবন ইসহাকের রিওয়ায়াতের একটি অংশকে পুঁজি করিয়া এই দাবি করে। তিনি বলেন, এই বৎসর হইতেই আরবে বসন্তের প্রাদুর্ভাব ঘটে। কথিত আছে যে, তাহাদের দেহের ক্ষতস্থানে বসন্ত রোগের জীবানু ছড়াইয়া পড়ে এবং এই রোগেই তাহারা ধ্বংস হইয়া যায় (ইসলামী বিশ্বকোষ, ৩ খ., পৃ. ১৫৪)।
মূলত তাহাদের এই দাবিতে প্রভাবিত হইয়া কোন কোন আধুনিক মুফাস্সিরও কুরআনের আয়াত দ্বারা উহা প্রমাণিত করার চেষ্টা করিয়াছেন এবং উক্ত ঘটনা যে আল্লাহর পক্ষ হইতে অলৌকিকরূপে সংঘটিত হইয়াছিল তাহা অস্বীকার করিয়া উহাকে প্রাকৃতিক ঘটনারূপে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। তন্মধ্যে স্যার সায়্যিদ আহমাদ খান অন্যতম। তিনি বলেন, وَأَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْراً أَبابيل -এ 'আবাবীল' শব্দটির অর্থ পাখী নহে, বরং উহার অর্থ হইল 'অশুভ' বিষয়। আর উহা দ্বারা রূপকার্থে বালা-মুসীবত বুঝানো হইয়াছে। তাই আয়াতের অর্থ হইল, "আল্লাহ তাহাদের প্রতি অসংখ্য বালা-মুসীবত প্রেরণ করিয়াছিলেন"।
কিন্তু আরবী ভাষা ও বাকরীতি অনুযায়ী এই দাবি নিতান্তই ভিত্তিহীন। কারণ 'অশুভ' বুঝাইতে কখনও طَيْر শব্দ ব্যবহার করা হয় না, বরং شَرّ শব্দ ব্যবহার করা হয়। আর উহাতে নিমজ্জিত করা বুঝাইবার জন্য ক্রিয়াপদে أَرْسَلَ ব্যবহার করা হয় না, বরং أَلْقَىٰ أَلْ শব্দের ব্যবহৃত হয়। কাজেই স্যার সায়্যিদ আহমাদ খান প্রমুখের উক্ত ব্যাখ্যা কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য নহে (সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৩৬৯-৩৭৫)।