📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অন্যদের পরিণতি

📄 অন্যদের পরিণতি


আবরাহার সেনাদলে যাহারা আসিয়াছিল তাহারা সকলেই এদিন একসঙ্গে মরে নাই, বরং কিছু লোক যন্ত্রণা ভোগ করিয়া পরে মারা যায় এবং দুই-একজন অভিশপ্ত জীবন লইয়া আরো বহুদিন জীবিত ছিল বলিয়া রিওয়ায়াত পাওয়া যায়। আতা ইব্‌ন ইয়াসার প্রমুখ বর্ণনা করেন, তাহাদের সকলে একই সময়ে ঘটনাস্থলে মরে নাই এবং তাহাদের কতক দ্রুত ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করে আর কতকের অঙ্গ খসিয়া পড়া অবস্থায় পলায়ন করে। আবরাহা ছিল এই দলভুক্ত। তাহার অঙ্গ খসিয়া পড়িতে পড়িতে সে খাছ'আম গোত্রের বাসস্থানে গিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
আবরাহার সেনাদলের দুই একজন সদস্য অন্ধ ভিক্ষুক হইয়া বাঁচিয়া ছিল বলিয়াও রিওয়ায়াত পাওয়া যায়। তাহারা পরবর্তীতে মানুষের করুণার পাত্র হইয়া অভিশপ্ত ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করে। মূলত ইহাও ছিল তাহাদের শাস্তির অন্তর্ভুক্ত। ইন্ন ইসহাক হযরত আইশা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলিয়াছেন, আমি সেই দলের মক্কায় দুইজন অন্ধ, অচল মাহুতকে দেখিয়াছি, যাহারা মানুষের নিকট খাদ্য চাহিত। আল-ওয়াকিদীও আইশা (রা) হইতে অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি আসমা বিন্ত আবী বাক্স (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তাহারা দুইজন ছিল চলিতে অক্ষম। ইসাফ ও নায়েলার নিকট যেখানে মুশরিকগণ তাহাদের জন্তু-জানোয়ার যবেহ করিত সেইখানে তাহারা মানুষের নিকট আহার যাজ্ঞা করিত। হাফিজ ইব্‌ন কাছীর (র) বলেন, উক্ত মাহুতের নাম ছিল উনায়স।
এক বর্ণনামতে আবরাহার সেনাদলে ১৩টি হাতী ছিল। তন্মধ্যে বাদশাহ নাজাশী প্রদত্ত 'মাহমূদ' নামক হাতীটি ব্যতীত আর সবগুলিই নিহত হয়। মাহমূদ যেহেতু কা'বা গৃহের দিকে অগ্রসর হইতে অস্বীকৃতি জানাইয়াছিল সেই হেতু তাহা শাস্তি হইতে রক্ষা পায়। কথিত আছে যে, তাহাদের দেহের ক্ষতস্থানে বসন্ত রোগের জীবানু ছড়াইয়া পড়ে এবং এই রোগেই তাহারা ধ্বংস হইয়া যায়। আরবভূমিতে এই সর্বপ্রথম বসন্ত রোগ দেখা দেয়।
মোটকথা, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক প্রেরিত এই ভয়াবহ শাস্তি আবরাহা ও তাহার সৈন্যদিগকে ভক্ষিত ভূষির ন্যায় করিয়া দেয়। এইরূপে আসহাবুলফীল-এর সকল কৌশল ও প্রচেষ্টা বানচাল হইয়া গেল। তাহাদের উক্ত ব্যর্থতার বিষয় কুরআন কারীমে সূরা ফীলে (১০৫: ১-৫) সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঘটনা পরবর্তী অবস্থা

📄 ঘটনা পরবর্তী অবস্থা


আসহাবুল ফীলের উক্ত ঘটনা ঘটিয়া যাওয়ার পর প্রত্যুষে আবদুল মুত্তালিব ও আবূ মাসউদ হারাম শরীফের দিকে ভালো করিয়া দৃষ্টিপাত করিলেন। আবূ মাসউদ তাঁহাকে বলিলেন, সমুদ্রের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখুন তো! আবদুল মুত্তালিব বলিলেন, আমি সাদা বর্ণের পাখি দেখিতে পাইতেছি। আবূ মাসউদ বলিলেন, গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখুন তো উহাদের অবস্থান কোথায়! আবদুল মুত্তালib বলিলেন, উহারা আমাদের মাথার উপর চক্কর দিতেছে। আবূ মাসউদ বলিলেন, আপনি কি পাখিগুলি চিনেন? আবদুল মুত্তালিব বলিলেন, না; ইহা নাজদের পাখিও নহে, তিহামার, ইয়ামানের বা শামেরও নহে। ইহা আমাদের ভূমিতে সম্পূর্ণ অপরিচিত। আবূ মাসউদ বলিলেন, উহাদের পরিমাণ কত হইবে? আবদুল মুত্তালিব বলিলেন, উহারা মৌমাছির ঝাঁকের ন্যায়....।
অত:পর আব্দুল মুত্তালিব তাঁহার এক পুত্রকে দ্রুতগামী ঘোড়াসহ কি ঘটিয়াছে তাহা দেখিবার জন্য পাঠাইলেন। সে আসিয়া দেখিল, আবরাহা বাহিনীর সকলেই ছিন্নভিন্ন হইয়া ভক্ষিত ভূষির ন্যায় পড়িয়া রহিয়াছে। অত:পর সে মাথা উঁচু করিয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়া ফেরত আসিল। সে দূরে থাকিতেই আবদুল মুত্তালিব তাহার এই অবস্থা দেখিতে পাইয়া বলিলেন, আমার পুত্র আরবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী। কোনও সুসংবাদ বা দুঃসংবাদের কারণেই সে এরূপ আসিতেছে। সে তাহাদের নিকটবর্তী হইলে তাহারা বলিলেন, কী ঘটিয়াছে? সে বলিল, সকলেই ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। অত:পর তাহারা পর্বত হইতে নামিয়া আসিলেন এবং লাশগুলি পড়িয়া থাকিতে দেখিলেন। তখন আবদুল মুত্তালিব কোদাল লইয়া মাটিতে গভীর একটি গর্ত খুঁড়িলেন এবং উহাতে তাহাদের স্বর্ণ ও অন্যান্য অলংকার প্রোথিত করিলেন। অত:পর আবদুল মুত্তালিব মক্কার অন্যান্য লোককে আহবান করিলেন। তাহারা ফিরিয়া আসিল। আবদুল মুত্তালিব মক্কা হইতে বাহির না হওয়ায় তাঁহার সম্মান আরও বাড়িয়া গেল। অত:পর আল্লাহ তা'আলা এক মহাপ্লাবন দিলেন। উক্ত প্লাবন তাহাদের লাশগুলি ভাসাইয়া সাগরে লইয়া গেল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঘটনার ফলাফল

📄 ঘটনার ফলাফল


এই ঘটনার ফলে আরব বিশ্বের দরবারে কুরায়শদের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাইল। তাহারা বলিতে লাগিল, উহারা আল্লাহ্র পরিবার। তাহাদের পক্ষ হইতে আল্লাহ (আবরাহা বাহিনীকে) প্রতিরোধ করিয়াছেন এবং তাহাদিগকে শত্রু হইতে রক্ষা করিয়াছেন আর শত্রুদিগকে শোচনীয়ভাবে ধ্বংস করিয়াছেন। এই ব্যাপারে আরব কবিগণ প্রচুর কবিতা রচনা করিয়াছে যাহাতে আল্লাহর পক্ষ হইতে হাবশীদের প্রতি শান্তি প্রেরণ, তাহাদের চক্রান্ত হইতে কা'বা গৃহ রক্ষা, আবরাহা আল-আশরাম, হাতী ও হারাম শরীফের দিকে রওয়ানা হওয়ার কথা, কা'বা গৃহ ভাঙ্গার পরিকল্পনা প্রভৃতি বিষয়বস্তু স্থান পাইয়াছে।
আরবদেশসমূহে এই ঘটনা এতই গুরুত্ব ও প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল যে, আরবগণ উহাকে 'আমুল ফীল' (হস্তী বৎসর) নাম রাখেন এবং ইহার পর হইতে ঐতিহাসিক ঘটনাবলী উক্ত সন হিসাবেই গণনা করিতে থাকে, যাহা খৃস্টীয় সনের হিসাবে ৫৭০, মতান্তরে ৫৭১ খৃ. এবং গ্রীক (রোমী) বর্ষ হিসাবে ৮৮৬ (মতান্তরে ৮৮২) সিকান্দারী সন হয়।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 প্রস্তর নিক্ষেপকারী পাখির বিবরণ

📄 প্রস্তর নিক্ষেপকারী পাখির বিবরণ


আল্লাহ তা'আলা আসহাবুল ফীলের প্রতি যে পাখী প্রেরণ করিয়াছিলেন কুরআন কারীমে তাহার বর্ণনা এইভাবে আসিয়াছে: وَأَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْراً أَبَابِيلَ “উহাদের বিরুদ্ধে তিনি ঝাঁকে ঝাঁকে পক্ষী প্রেরণ করেন।"
কিন্তু পাখিগুলি কিরূপ আকৃতির ছিল তাহার বর্ণনা করা হয় নাই। তাই মুফাসসির ও ঐতিহাসিকগণ এই সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা দিয়াছেন। এক বর্ণনামতে পাখিগুলি ছিল ক্ষুদ্রাকৃতির। ইবন কাছীরের বর্ণনামতে তাহা ছিল হলুদ রংয়ের পাখি, যাহা কবুতর হইতে ক্ষুদ্র, উহাদের পা ছিল লাল রংয়ের। ছানাউল্লাহ পানিপতী বর্ণনা করেন যে, উহাদের চঞ্চু ছিল লাল রংয়ের, মস্তক ছিল কাল বর্ণের এবং গলা ছিল লম্বা। উবায়দ ইবন উমায়রের বর্ণনামতে উহা ছিল কালো রংয়ের পাখি। 'ইকরিমার বর্ণনামতে তাহা ছিল সবুজ রংয়ের। উহাদের মস্তক ছিল হিংস্র জন্তুর মস্তকের ন্যায়। সাঈদ ইবন জুবায়রের বর্ণনামতে পাখিগুলি ছিল সবুজ বর্ণের, আর উহাদের চক্ষু ছিল হলুদ বর্ণের।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00