📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল্লাহ্ পক্ষ হইতে শাস্তি অবতরণ

📄 আল্লাহ্ পক্ষ হইতে শাস্তি অবতরণ


হাতীগুলির বিশেষ সতর্ক সংকেতে তাহারা মোটেও সতর্ক হইল না; বরং বায়তুল্লাহ শরীফকে ধ্বংস সাধনের সংকল্পে অবিচল ও অটল রহিল। তাই বারবার তাহারা হাতীকে বায়তুল্লাহর দিকে ধাবিত করার চেষ্টা করিতেছিল। এমনিভাবে দিবস গড়াইয়া রাত্রি আসিল। ইব্‌ন ইসহাক হইতে ইউনুসের বর্ণনায় আরো উল্লিখিত হইয়াছে যে, উক্ত রাত্রে তাহারা আযাবের কথা আঁচ করিতে পারিল। কারণ তাহারা তারকারাজির দিকে তাকাইয়া আযাব নিকটবর্তী হওয়ার চিহ্ন দেখিতে পাইল। অতঃপর শেষ রজনীতে আল্লাহ তা'আলা সমুদ্র হইতে ঝাঁকে ঝাঁকে হলুদ রংয়ের ক্ষুদ্র এক প্রকারের পাখী প্রেরণ করিলেন। প্রতিটি পাখী তিনটি করিয়া কংকর বহন করিতেছিল। চঞ্চুতে একটি এবং দুই পায়ের পাঞ্জায় দুইটি। কংকরগুলি ছিল বুটদানা হইতে ক্ষুদ্র এবং ডাল হইতে একটু বড় আকারের। পাখিগুলি আসিয়া আবরাহার সেনাদলের মাথার উপর শূন্যে সারি বাঁধিয়া স্থির হইয়া অবস্থান করিতে লাগিল। আবরাহা ও তাহার সেনাবাহিনী ইহা দেখিয়া শংকিত হইয়া পড়িল এবং তাহাদের হাতের অস্ত্র মাটিতে পড়িয়া গেল। অতঃপর পাখীগুলি চীৎকার করিতে করিতে তাহাদের পায়ের পাঞ্জা ও চঞ্চুর কংকরগুলি নিক্ষেপ করিতে লাগিল। এক একটি কংকর সেনাদলের যাহার যে স্থানে পতিত হইতেছিল তাহা অপর পার্শ্ব ভেদ করিয়া বাহির হইয়া যাইতেছিল। তাহা মস্তকে পতিত হইলে মলদ্বার দিয়া বাহির হইয়া যাইতেছিল। আবার যে অঙ্গেই উহা পতিত হইতেছিল সেই অঙ্গ খসিয়া পড়িতেছিল। অনেকে ঘটনাস্থলেই ধ্বংস হইল। তাহাদের কল্পনাতীত এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হইয়া তাহারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া দ্রুত পলায়ন করিতে লাগিল। যে রাস্তা দিয়া তাহারা আগমন করিয়াছিল সেই রাস্তায় ছুটিতে লাগিল এবং পথপ্রদর্শনকারী নুফায়ল ইব্‌ন হাবীবকে খুঁজিতে লাগিল। নুফায়ল তখন কুরায়শ ও হিজাযের অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সহিত পর্বত শীর্ষে ছিলেন। আল্লাহ তা'আলা আসহাবুল ফীলের প্রতি কি শাস্তি অবতরণ করেন তাহা অবলোকন করিবার জন্য তাহারা সেখানে অপেক্ষা করিতেছিলেন। আল্লাহর প্রেরিত এই আযাব দেখিয়া নুফায়ল বলিয়া উঠিলেনঃ
أين المفر والإله الطالب + والأشرم المغلوب ليس الغالب
"কোথায় আজ পলায়ন করিবার জায়গা? আল্লাহই ইহার পাকড়াওকারী আর আল-আশরাম (আবরাহা) পরাজিত, বিজয়ী নহে।"
ইবন ইসহাক-এর বর্ণনামতে এই সময় নুফায়ল আরও বলেনঃ
ألا حييت عنا يا ردينا + نعمناكم مع الإصباح عينا ردينة لو رأيت - ولا تريه + لدى جنب المحصب ما رأينا إذا لعذرتني وحمدت أمرى + ولم تأسى على ما فات بينا حمدت الله إذ أبصرت طيرا + وخفت حجارة تلقى علينا وكل القوم يسأل عن نفيل + كأن على للحبشان دينا
"হে রুদায়না। আমাদের পক্ষ হইতে তোমাকে অভিবাদন জানানো হইল। সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট। রুদায়না! মুহাস্রাব উপত্যকার পার্শ্বে আমরা যাহা দেখিয়াছি, তাহা যদি তুমি দেখিতে। আর তোমাকে তো তাহা দেখানো হয় নাই। তাহা হইলে অবশ্যই তুমি আমার ওযর গ্রহণ করিতে এবং আমার ভূমিকার প্রশংসা করিতে। আর যাহা বিনষ্ট হইয়াছে তাহার জন্য আক্ষেপ করিতে না। আমি আল্লাহর প্রশংসা করিলাম যখন আমি পাখি দেখিলাম। আর সেই পাথরের ভয়ে ভীত হইয়া পড়িলাম যাহা আমাদের উপর নিক্ষেপ করা হইতেছিল। কওমের সকলেই নুফায়লকে খুঁজিতেছে যেন হাবশীদের জন্য আমি দায়বদ্ধ।"
অতঃপর তাহারা ছুটাছুটি করিয়া রাস্তায় পড়িয়া মরিতে লাগিল। এক বর্ণনামতে এই সময় প্রবল বেগে বায়ুও প্রবাহিত হইতেছিল, যাহা তাহাদের জন্য শাস্তি ও বিড়ম্বনায় নূতন এক মাত্রা যোগ করিয়াছিল এবং ইহার ফলে কংকরগুলি জোরে নিক্ষিপ্ত হইতেছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবরাহার পরিণতি

📄 আবরাহার পরিণতি


আবরাহা ও তাহার কিছু অনুসারী সেখান হইতে পিছন ফিরিয়া পলায়ন করত স্বদেশের দিকে ছুটিল। যখনই সে কোন স্থানে পৌঁছিতেছিল তখনই তাহার শরীর হইতে একটি অঙ্গ খসিয়া পড়িতেছিল। এমনিভাবে সে খাছ'আম গোত্রের এলাকায় আসিয়া পৌঁছিলে তখন তাহার মস্তক ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এখানেই সে মৃত্যুবরণ করিল। আবরাহার উযীর সাময়িকভাবে তখন নিষ্কৃতি পাইল, তবে তাহার জন্য নির্ধারিত পাখিটি তাহার অনুসরণ করিতেছিল। উযীর নাজাশীর নিকট পৌঁছিয়া আদ্যোপান্ত ঘটনা বর্ণনা করিল। তাহার বলা শেষ হইতেই পাখিটি শূন্যে তাহার মাথার উপর আসিয়া কংকর নিক্ষেপ করিল এবং সে বাদশাহর সম্মুখেই মৃত্যুবরণ করিল। সম্ভবত আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত এই ভয়াবহ শাস্তির প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ জনসমক্ষে প্রচারের জন্যই আল্লাহ তাহাকে সাময়িক অবকাশ দিয়াছিলেন, যাহাতে অন্যরা আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণের ব্যাপারে সতর্ক হয়।
অপর এক বর্ণনামতে, আবরাহার শরীরে উক্ত প্রস্তর খণ্ড পতিত হইলে অন্যরা তাহাকে সঙ্গে লইয়া পলায়ন করিতে লাগিল। তাহার একটি একটি করিয়া অঙ্গ খসিয়া পড়িতে লাগিল। যখনই তাহার একটি অঙ্গ খসিয়া পড়িতেছিল তখনই সেই স্থান দিয়া রক্ত-পূজ প্রবাহিত হইতেছিল। এইভাবে সঙ্গীরা তাহাকে লইয়া ইয়ামানের রাজধানী সানআয় পৌঁছিল। এই সময় আবরাহা একটি পাখীর ছানার ন্যায় হইয়া গিয়াছিল। অত:পর এখানে সে মুত্যুবরণ করিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অন্যদের পরিণতি

📄 অন্যদের পরিণতি


আবরাহার সেনাদলে যাহারা আসিয়াছিল তাহারা সকলেই এদিন একসঙ্গে মরে নাই, বরং কিছু লোক যন্ত্রণা ভোগ করিয়া পরে মারা যায় এবং দুই-একজন অভিশপ্ত জীবন লইয়া আরো বহুদিন জীবিত ছিল বলিয়া রিওয়ায়াত পাওয়া যায়। আতা ইব্‌ন ইয়াসার প্রমুখ বর্ণনা করেন, তাহাদের সকলে একই সময়ে ঘটনাস্থলে মরে নাই এবং তাহাদের কতক দ্রুত ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করে আর কতকের অঙ্গ খসিয়া পড়া অবস্থায় পলায়ন করে। আবরাহা ছিল এই দলভুক্ত। তাহার অঙ্গ খসিয়া পড়িতে পড়িতে সে খাছ'আম গোত্রের বাসস্থানে গিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয়।
আবরাহার সেনাদলের দুই একজন সদস্য অন্ধ ভিক্ষুক হইয়া বাঁচিয়া ছিল বলিয়াও রিওয়ায়াত পাওয়া যায়। তাহারা পরবর্তীতে মানুষের করুণার পাত্র হইয়া অভিশপ্ত ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করে। মূলত ইহাও ছিল তাহাদের শাস্তির অন্তর্ভুক্ত। ইন্ন ইসহাক হযরত আইশা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলিয়াছেন, আমি সেই দলের মক্কায় দুইজন অন্ধ, অচল মাহুতকে দেখিয়াছি, যাহারা মানুষের নিকট খাদ্য চাহিত। আল-ওয়াকিদীও আইশা (রা) হইতে অনুরূপ বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি আসমা বিন্ত আবী বাক্স (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তাহারা দুইজন ছিল চলিতে অক্ষম। ইসাফ ও নায়েলার নিকট যেখানে মুশরিকগণ তাহাদের জন্তু-জানোয়ার যবেহ করিত সেইখানে তাহারা মানুষের নিকট আহার যাজ্ঞা করিত। হাফিজ ইব্‌ন কাছীর (র) বলেন, উক্ত মাহুতের নাম ছিল উনায়স।
এক বর্ণনামতে আবরাহার সেনাদলে ১৩টি হাতী ছিল। তন্মধ্যে বাদশাহ নাজাশী প্রদত্ত 'মাহমূদ' নামক হাতীটি ব্যতীত আর সবগুলিই নিহত হয়। মাহমূদ যেহেতু কা'বা গৃহের দিকে অগ্রসর হইতে অস্বীকৃতি জানাইয়াছিল সেই হেতু তাহা শাস্তি হইতে রক্ষা পায়। কথিত আছে যে, তাহাদের দেহের ক্ষতস্থানে বসন্ত রোগের জীবানু ছড়াইয়া পড়ে এবং এই রোগেই তাহারা ধ্বংস হইয়া যায়। আরবভূমিতে এই সর্বপ্রথম বসন্ত রোগ দেখা দেয়।
মোটকথা, আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক প্রেরিত এই ভয়াবহ শাস্তি আবরাহা ও তাহার সৈন্যদিগকে ভক্ষিত ভূষির ন্যায় করিয়া দেয়। এইরূপে আসহাবুলফীল-এর সকল কৌশল ও প্রচেষ্টা বানচাল হইয়া গেল। তাহাদের উক্ত ব্যর্থতার বিষয় কুরআন কারীমে সূরা ফীলে (১০৫: ১-৫) সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত হইয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঘটনা পরবর্তী অবস্থা

📄 ঘটনা পরবর্তী অবস্থা


আসহাবুল ফীলের উক্ত ঘটনা ঘটিয়া যাওয়ার পর প্রত্যুষে আবদুল মুত্তালিব ও আবূ মাসউদ হারাম শরীফের দিকে ভালো করিয়া দৃষ্টিপাত করিলেন। আবূ মাসউদ তাঁহাকে বলিলেন, সমুদ্রের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখুন তো! আবদুল মুত্তালিব বলিলেন, আমি সাদা বর্ণের পাখি দেখিতে পাইতেছি। আবূ মাসউদ বলিলেন, গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করিয়া দেখুন তো উহাদের অবস্থান কোথায়! আবদুল মুত্তালib বলিলেন, উহারা আমাদের মাথার উপর চক্কর দিতেছে। আবূ মাসউদ বলিলেন, আপনি কি পাখিগুলি চিনেন? আবদুল মুত্তালিব বলিলেন, না; ইহা নাজদের পাখিও নহে, তিহামার, ইয়ামানের বা শামেরও নহে। ইহা আমাদের ভূমিতে সম্পূর্ণ অপরিচিত। আবূ মাসউদ বলিলেন, উহাদের পরিমাণ কত হইবে? আবদুল মুত্তালিব বলিলেন, উহারা মৌমাছির ঝাঁকের ন্যায়....।
অত:পর আব্দুল মুত্তালিব তাঁহার এক পুত্রকে দ্রুতগামী ঘোড়াসহ কি ঘটিয়াছে তাহা দেখিবার জন্য পাঠাইলেন। সে আসিয়া দেখিল, আবরাহা বাহিনীর সকলেই ছিন্নভিন্ন হইয়া ভক্ষিত ভূষির ন্যায় পড়িয়া রহিয়াছে। অত:পর সে মাথা উঁচু করিয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়া ফেরত আসিল। সে দূরে থাকিতেই আবদুল মুত্তালিব তাহার এই অবস্থা দেখিতে পাইয়া বলিলেন, আমার পুত্র আরবদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী। কোনও সুসংবাদ বা দুঃসংবাদের কারণেই সে এরূপ আসিতেছে। সে তাহাদের নিকটবর্তী হইলে তাহারা বলিলেন, কী ঘটিয়াছে? সে বলিল, সকলেই ধ্বংস হইয়া গিয়াছে। অত:পর তাহারা পর্বত হইতে নামিয়া আসিলেন এবং লাশগুলি পড়িয়া থাকিতে দেখিলেন। তখন আবদুল মুত্তালিব কোদাল লইয়া মাটিতে গভীর একটি গর্ত খুঁড়িলেন এবং উহাতে তাহাদের স্বর্ণ ও অন্যান্য অলংকার প্রোথিত করিলেন। অত:পর আবদুল মুত্তালিব মক্কার অন্যান্য লোককে আহবান করিলেন। তাহারা ফিরিয়া আসিল। আবদুল মুত্তালিব মক্কা হইতে বাহির না হওয়ায় তাঁহার সম্মান আরও বাড়িয়া গেল। অত:পর আল্লাহ তা'আলা এক মহাপ্লাবন দিলেন। উক্ত প্লাবন তাহাদের লাশগুলি ভাসাইয়া সাগরে লইয়া গেল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00