📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবরাহা ও তাহার বাহিনীর প্রতি আবদুল মুত্তালিবের বদদু'আ

📄 আবরাহা ও তাহার বাহিনীর প্রতি আবদুল মুত্তালিবের বদদু'আ


অতঃপর আবদুল মুত্তালিব কুরায়শদের নিকট ফিরিয়া আসিলেন এবং তাহাদিগকে সবকিছু অবহিত করিলেন। তিনি তাহাদিগকে আবরাহা বাহিনীর ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের আশংকায় মক্কা হইতে বাহির হইয়া কোনও গিরিগুহায় বা পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রয় লইতে নির্দেশ দিলেন। আবদুল মুত্তালিব কা'বা শরীফের দরজার কড়া ধরিলেন। কুরায়শদের একটি দলও তাঁহার সহিত অত্যন্ত অনুনয়-বিনয় সহকারে আল্লাহ্র নিকট দুআ করিতে লাগিল। কা'বার দরজার কড়া ধরিয়া আবদুল মুত্তালib নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিলেনঃ
লা হুম্মা ইন্নাল মার'আ ইয়ামনা'উ রহলাহু ফামনা' রহালাক। লা ইয়াগ্লিবান্না সলীবুহুম ওয়া মুখাল্লাফuhum গাদাউন মাহা'লাক। উনসুর আলা আলি সলীব ওয়া আবিদিহিল ইয়াওমা আলিক। বিতনা ফা আমরু মা বি যালিকা ইন কুনতা তারিকাহুম ওয়া কা'ব।
”হে আল্লাহ! প্রত্যেক লোক নিজ গৃহকে শত্রুর আক্রমণ হইতে রক্ষা করিয়া থাকে। অতএব তুমি তোমার গৃহকে রক্ষা কর। তাহাদের ক্রুশ ও শক্তি কোনক্রমেই জয়ী হইতে পারিবে না তোমার ক্ষমতা ও পরাক্রমের বিরুদ্ধে। তাই আজ তুমি তোমার পরবিারবর্গকে সাহায্য কর ক্রুশের পরিবারবর্গ ও উহার উপাসনাকারিগণের বিরুদ্ধে। যদি তুমি তাহাদিগকে ও আমাদের কা'বা গৃহকে এইভাবে ছাড়িয়া দাও (যে, তাহারা কোনরূপ বাধা ব্যতীত কা'বা গৃহ আক্রমণ করে) তবে তাহা তোমার ইচ্ছা” (আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ২১৯)।
আবদুল মুত্তালিব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করিতেন যে, তাঁহার এই দু'আ কুবল হইবে। এই সীমা লংঘনকারীদিগের প্রতি আল্লাহ্ ভয়ানক শাস্তি অবশ্যই প্রেরণ করিবেন। তাই দু'আ শেষে আবদুল মুত্তালিব কা'বার দরজার কড়া ছাড়িয়া দিলেন এবং কুরায়শ গোত্রের অন্যান্য লোকসহ আত্মরক্ষার্থে নিকটবর্তী পাহাড়ের শীর্ষে গিয়া আরোহণ করিলেন। সেখানে তাহারা ইহা দেখিবার জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন যে, আবরাহা মক্কায় প্রবেশ করিয়া কি করে এবং তাহার কি পরিণতি হয় (ইবন হিশাম, আস-সীরাঃ, ১খ, পৃ. ৬৬)। মুকাতিল (র) বলেন, আবদুল মুত্তালিব তখন উহাদের সহিত মক্কার বাহিরে যান নাই, বরং মক্কায়ই অবস্থান করেন এবং বলেন, আমি এখানেই থাকিব যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁহার ফয়সালা করেন। অতঃপর তিনি ও আবূ মাসউদ আছ-ছাকাফী আবরাহার কীর্তিকলাপ ও তাহার পরিণাম দেখিবার জন্য মক্কার একটি উঁচু স্থানে আরোহণ করিলেন (আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ২১৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবরাহার মক্কায় প্রবেশের প্রস্তুতি

📄 আবরাহার মক্কায় প্রবেশের প্রস্তুতি


পরদিন আবরাহা হস্তীবাহিনীসহ মক্কায় প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করিল। তাহার সঙ্গে কয়টি হাতী ছিল সেই ব্যাপারে কয়েকটি মতামত পাওয়া যায়। ইবন জারীর আত-তাবারী বলেন, তাহার সহিত ১৩টি হাতী ছিল। এই বর্ণনাটিই সঠিক বলিয়া মনে হয়। আল-মাওয়ারদী বর্ণনা করেন যে, তাহার সহিত একটিমাত্র হাতী ছিল, যাহার নাম ছিল মাহমুদ। তবে এই বর্ণনাটি কুরআন কারীমের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ নহে। কেননা আল্লাহ তা'আলা সূরা ফীলে (১০৫ নং সূরা) হস্তী অধিপতিদের কথা বলিতে গিয়া বহুবচন ব্যবহার করিয়াছেন (১০৫ : ১)।
আলাম তারা কাইফা ফা'আলা রব্বুকা বি-আসহাবিল ফীল।
যদি হাতী একটিই হইত তবে উহার অধিপতিও একজন হইত, সেই ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা একবচন শব্দ ব্যবহার করিতেন (ইব্‌ন কাছীর, তাফসীর, ৪খ, পৃ. ৫৫১)।
আবরাহা বায়তুল্লাহ ধ্বংস করিয়া ইয়ামান ফিরিয়া যাইবার জন্য কৃৎসংকল্প ছিল। আবরাহা কা'বা ধ্বংসের জন্য হাতী এই উদ্দেশ্যে লইয়া আসিয়াছিল যে, কা'বার স্তম্ভগুলিতে শিকল বাঁধিয়া অপর প্রান্ত হাতীর গলায় বাঁধিয়া তাড়া করিবে যাহাতে উহার দেওয়াল একসঙ্গেই ভাঙ্গিয়া পড়ে (আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ২১৯)।
আল্লাহ্র পক্ষ হইতে আবরাহাকে সতর্ক করার পরদিন সকালে তাহারা হাতীকে যখন নগরীর কা'বা শরীফের দিকে মুখ করাইল তখন নুফায়ল ইব্‌ন হাবীব আসিয়া হাতীর পার্শ্বে দাঁড়াইল এবং উহার কান ধরিয়া বলিল, মাহমুদ! তুমি বসিয়া পড় অথবা যেখান হইতে আসিয়াছিলে ভালয় ভালয় সেখানে ফিরিয়া যাও। কারণ তুমি এখন আল্লাহ্র সম্মানিত শহরে রহিয়াছ। ইহা বলিয়া সে হাতীর কান ছাড়িয়া দিল। তখন হাতীটি বসিয়া পড়িল এবং নুফায়ল একটি পাহাড়ে গিয়া উঠিল। অতঃপর তাহারা হাতীটিকে উঠাইবার জন্য প্রহার করিল কিন্তু হাতী উঠিল না। তাহারা কুঠার দ্বারা উহার মাথায় আঘাত করিল কিন্তু ইহাতেও হাতীটি উঠিল না। তখন তাহারা উহার শুঁড়ে লৌহ শলাকা ঢুকাইয়া দিয়া উহাকে রক্তাক্ত করিল, কিন্তু ইহাতেও হাতীটি উঠিল না। অতঃপর তাহারা ইয়ামানের দিকে উহার মুখ করাইয়া দিল যেন তাহারা ফিরিয়া যাইবে। তখন উহা উঠিয়া দ্রুত চলিতে লাগিল। এইবার তাহারা উহাকে পরীক্ষা করিবার জন্য শাম-এর দিকে ফিরাইয়া দিল। এইবারও হাতীটি দ্রুত চলিতে লাগিল। অতঃপর তাহারা উহাকে পূর্বদিকে ফিরাইয়া দিল, এইবারও সে দ্রুত চলিতে লাগিল। আবার তাহারা উহাকে মক্কার দিকে ফিরাইয়া দিলে হাতীটি আবার বসিয়া পড়িল (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাঃ, ১খ, পৃ. ৬৭)। উহা মাটিতে মস্তক রাখিয়া চীৎকার করিতে লাগিল (আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ২২০)। প্রকৃতপক্ষে ইহা ছিল আল্লাহর পক্ষ হইতে আবরাহা ও তাহার বাহিনীর জন্য সতর্ক সংকেত যে, তাহারা যে কাজ করিতে অগ্রসর হইতেছে তাহা খুবই গর্হিত ও বিপদজনক কাজ। ইহার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। কিন্তু সেদিকে তাহারা নজর না দিয়া বারংবার হাতীটিকে মক্কার দিকে ধাবিত করিবার ব্যর্থ চেষ্টা করিতে লাগিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আল্লাহ্ পক্ষ হইতে শাস্তি অবতরণ

📄 আল্লাহ্ পক্ষ হইতে শাস্তি অবতরণ


হাতীগুলির বিশেষ সতর্ক সংকেতে তাহারা মোটেও সতর্ক হইল না; বরং বায়তুল্লাহ শরীফকে ধ্বংস সাধনের সংকল্পে অবিচল ও অটল রহিল। তাই বারবার তাহারা হাতীকে বায়তুল্লাহর দিকে ধাবিত করার চেষ্টা করিতেছিল। এমনিভাবে দিবস গড়াইয়া রাত্রি আসিল। ইব্‌ন ইসহাক হইতে ইউনুসের বর্ণনায় আরো উল্লিখিত হইয়াছে যে, উক্ত রাত্রে তাহারা আযাবের কথা আঁচ করিতে পারিল। কারণ তাহারা তারকারাজির দিকে তাকাইয়া আযাব নিকটবর্তী হওয়ার চিহ্ন দেখিতে পাইল। অতঃপর শেষ রজনীতে আল্লাহ তা'আলা সমুদ্র হইতে ঝাঁকে ঝাঁকে হলুদ রংয়ের ক্ষুদ্র এক প্রকারের পাখী প্রেরণ করিলেন। প্রতিটি পাখী তিনটি করিয়া কংকর বহন করিতেছিল। চঞ্চুতে একটি এবং দুই পায়ের পাঞ্জায় দুইটি। কংকরগুলি ছিল বুটদানা হইতে ক্ষুদ্র এবং ডাল হইতে একটু বড় আকারের। পাখিগুলি আসিয়া আবরাহার সেনাদলের মাথার উপর শূন্যে সারি বাঁধিয়া স্থির হইয়া অবস্থান করিতে লাগিল। আবরাহা ও তাহার সেনাবাহিনী ইহা দেখিয়া শংকিত হইয়া পড়িল এবং তাহাদের হাতের অস্ত্র মাটিতে পড়িয়া গেল। অতঃপর পাখীগুলি চীৎকার করিতে করিতে তাহাদের পায়ের পাঞ্জা ও চঞ্চুর কংকরগুলি নিক্ষেপ করিতে লাগিল। এক একটি কংকর সেনাদলের যাহার যে স্থানে পতিত হইতেছিল তাহা অপর পার্শ্ব ভেদ করিয়া বাহির হইয়া যাইতেছিল। তাহা মস্তকে পতিত হইলে মলদ্বার দিয়া বাহির হইয়া যাইতেছিল। আবার যে অঙ্গেই উহা পতিত হইতেছিল সেই অঙ্গ খসিয়া পড়িতেছিল। অনেকে ঘটনাস্থলেই ধ্বংস হইল। তাহাদের কল্পনাতীত এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হইয়া তাহারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া দ্রুত পলায়ন করিতে লাগিল। যে রাস্তা দিয়া তাহারা আগমন করিয়াছিল সেই রাস্তায় ছুটিতে লাগিল এবং পথপ্রদর্শনকারী নুফায়ল ইব্‌ন হাবীবকে খুঁজিতে লাগিল। নুফায়ল তখন কুরায়শ ও হিজাযের অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সহিত পর্বত শীর্ষে ছিলেন। আল্লাহ তা'আলা আসহাবুল ফীলের প্রতি কি শাস্তি অবতরণ করেন তাহা অবলোকন করিবার জন্য তাহারা সেখানে অপেক্ষা করিতেছিলেন। আল্লাহর প্রেরিত এই আযাব দেখিয়া নুফায়ল বলিয়া উঠিলেনঃ
أين المفر والإله الطالب + والأشرم المغلوب ليس الغالب
"কোথায় আজ পলায়ন করিবার জায়গা? আল্লাহই ইহার পাকড়াওকারী আর আল-আশরাম (আবরাহা) পরাজিত, বিজয়ী নহে।"
ইবন ইসহাক-এর বর্ণনামতে এই সময় নুফায়ল আরও বলেনঃ
ألا حييت عنا يا ردينا + نعمناكم مع الإصباح عينا ردينة لو رأيت - ولا تريه + لدى جنب المحصب ما رأينا إذا لعذرتني وحمدت أمرى + ولم تأسى على ما فات بينا حمدت الله إذ أبصرت طيرا + وخفت حجارة تلقى علينا وكل القوم يسأل عن نفيل + كأن على للحبشان دينا
"হে রুদায়না। আমাদের পক্ষ হইতে তোমাকে অভিবাদন জানানো হইল। সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট। রুদায়না! মুহাস্রাব উপত্যকার পার্শ্বে আমরা যাহা দেখিয়াছি, তাহা যদি তুমি দেখিতে। আর তোমাকে তো তাহা দেখানো হয় নাই। তাহা হইলে অবশ্যই তুমি আমার ওযর গ্রহণ করিতে এবং আমার ভূমিকার প্রশংসা করিতে। আর যাহা বিনষ্ট হইয়াছে তাহার জন্য আক্ষেপ করিতে না। আমি আল্লাহর প্রশংসা করিলাম যখন আমি পাখি দেখিলাম। আর সেই পাথরের ভয়ে ভীত হইয়া পড়িলাম যাহা আমাদের উপর নিক্ষেপ করা হইতেছিল। কওমের সকলেই নুফায়লকে খুঁজিতেছে যেন হাবশীদের জন্য আমি দায়বদ্ধ।"
অতঃপর তাহারা ছুটাছুটি করিয়া রাস্তায় পড়িয়া মরিতে লাগিল। এক বর্ণনামতে এই সময় প্রবল বেগে বায়ুও প্রবাহিত হইতেছিল, যাহা তাহাদের জন্য শাস্তি ও বিড়ম্বনায় নূতন এক মাত্রা যোগ করিয়াছিল এবং ইহার ফলে কংকরগুলি জোরে নিক্ষিপ্ত হইতেছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবরাহার পরিণতি

📄 আবরাহার পরিণতি


আবরাহা ও তাহার কিছু অনুসারী সেখান হইতে পিছন ফিরিয়া পলায়ন করত স্বদেশের দিকে ছুটিল। যখনই সে কোন স্থানে পৌঁছিতেছিল তখনই তাহার শরীর হইতে একটি অঙ্গ খসিয়া পড়িতেছিল। এমনিভাবে সে খাছ'আম গোত্রের এলাকায় আসিয়া পৌঁছিলে তখন তাহার মস্তক ব্যতীত আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না। এখানেই সে মৃত্যুবরণ করিল। আবরাহার উযীর সাময়িকভাবে তখন নিষ্কৃতি পাইল, তবে তাহার জন্য নির্ধারিত পাখিটি তাহার অনুসরণ করিতেছিল। উযীর নাজাশীর নিকট পৌঁছিয়া আদ্যোপান্ত ঘটনা বর্ণনা করিল। তাহার বলা শেষ হইতেই পাখিটি শূন্যে তাহার মাথার উপর আসিয়া কংকর নিক্ষেপ করিল এবং সে বাদশাহর সম্মুখেই মৃত্যুবরণ করিল। সম্ভবত আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত এই ভয়াবহ শাস্তির প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ জনসমক্ষে প্রচারের জন্যই আল্লাহ তাহাকে সাময়িক অবকাশ দিয়াছিলেন, যাহাতে অন্যরা আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণের ব্যাপারে সতর্ক হয়।
অপর এক বর্ণনামতে, আবরাহার শরীরে উক্ত প্রস্তর খণ্ড পতিত হইলে অন্যরা তাহাকে সঙ্গে লইয়া পলায়ন করিতে লাগিল। তাহার একটি একটি করিয়া অঙ্গ খসিয়া পড়িতে লাগিল। যখনই তাহার একটি অঙ্গ খসিয়া পড়িতেছিল তখনই সেই স্থান দিয়া রক্ত-পূজ প্রবাহিত হইতেছিল। এইভাবে সঙ্গীরা তাহাকে লইয়া ইয়ামানের রাজধানী সানআয় পৌঁছিল। এই সময় আবরাহা একটি পাখীর ছানার ন্যায় হইয়া গিয়াছিল। অত:পর এখানে সে মুত্যুবরণ করিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00