📄 কা'বা শরীফ ধ্বংসের জন্য আবরাহার প্রস্তুতি
সকাল বেলায় এই সংবাদ শুনিয়া আবরাহা ক্রোধে অস্থির হইয়া পড়িল। সে জিজ্ঞাসা করিল, কে এই কর্ম করিয়াছে? তখন লোকজন তাহাকে জানাইল যে, সমগ্র আরববাসী মক্কায় অবস্থিত যে ঘরের হজ্জ করে সেই ঘরের অনুরক্ত এক লোক যখন আপনার এই কথা শুনিয়াছে যে, আপনি আরববাসীর হজ্জ ও তাওয়াফ এই ঘর কেন্দ্রিক করার নির্দেশ দিয়াছেন তখন রাগান্বিত হইয়া সে আসিয়া এই কর্ম করিয়াছে। আবরাহা ইহা শুনিয়া তেলেবেগুনে জ্বলিয়া উঠিল এবং শপথ করিল, সে অবশ্যই কা'বা গৃহাভিমুখে রওয়ানা হইবে, অতঃপর উহা ধ্বংস করিয়া ফিরিবে (প্রাগুক্ত, পৃ. ১৪১; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, পৃ. ১৭০)। সে আরও শপথ করিল যে, কা'বা গৃহের প্রতিটি প্রস্তর চূর্ণ-বিচূর্ণ করিবে। সে নাজাশীকে পত্র লিখিল এবং এই কাজে তাহার সাহায্যে সে হাতী পাঠাইয়া দিতে অনুরোধ জানাইল। বাদশাহ নাজাশীর মাহমূদ নামে বিরাট একটি হাতী ছিল। এত বিশালকায় ও শক্তিশালী হাতী তখন সারা বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি ছিল না। নাজাশী উহা আবরাহার নিকট পাঠাইয়া দিলেন। অতঃপর ষাট হাজারের সুসজ্জিত বাহিনী লইয়া আবরাহা মক্কাভিমুখে রওয়ানা হইল (আস-সালিহী আশা-শামী, সুবুলুল-হুদা ওয়ার-রাশাদ, ১খ, পৃ. ২১৬)।
আরবগণ যখন শুনিল যে, আবরাহা বায়তুল্লাহ ধ্বংস করিতে রওয়ানা হইয়াছে তখন তাহারা বিষয়টিকে খুবই গুরুতর মনে করিল এবং তাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া তাহাকে প্রতিরোধ করা অবশ্য করণীয় বলিয়া মনে করিল। অতঃপর যূনাফর নামক ইয়ামান-এর এক সম্ভ্রান্ত নেতা তাহার গোত্রের লোকজন সমবেত করিল এবং সমগ্র আরবের বিভিন্ন গোত্রে এই বলিয়া দূত প্রেরণ করিল যে, আমি আবরাহার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করিব। এই সৎকাজে আপনারা আমাকে সহায়তা করুন। এইভাবে তিনি বেশ কিছু লোক লইয়া আবরাহার বাহিনীকে প্রতিরোধ করিলেন। কিন্তু তিনি ও তাহার সঙ্গিগণ পরাজিত হইলেন। যূনাফরকে বন্দী করিয়া আবরাহার নিকট উপস্থিত করা হইল। আবraহা তাহাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলে যূনাফর বলিলেন, হে রাজন! আমাকে হত্যা করিবেন না। কারণ হয়ত বা আপনার সহিত আমার জীবিত থাকা আপনার জন্য উত্তম হইবে। ইহা শুনিয়া আবরাহা তাহাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করিয়া বন্দী করিয়া রাখিল (আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল-উনুফ, ১খ, পৃ. ২৫৭)।
অতঃপর আবরাহা স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের জন্য মক্কাভিমুখে তাহার যাত্রা অব্যাহত রাখিল। সে যখন খাছ'আম গোত্রের নিকটবর্তী হইল তখন খাছ'আম গোত্রপতি নুফায়ল ইব্ন হাবীৰ খাছ'আম গোত্রের দুইটি শাখা শাহরান ও নাহিস-এর লোকদিগকে লইয়া এবং অন্যান্য আরব গোত্রের লোকজনসহ আবরাহার প্রতিরোধে যুদ্ধে লিপ্ত হইল। কিন্তু এই বিশাল বাহিনীর সঙ্গে আটিয়া উঠিতে পারিল না। পরাজয় বরণের পর নুফায়লকে বন্দী করিয়া আবরাহার সম্মুখে হাজির করা হইল। আবরাহা তাহাকে হত্যা করিতে উদ্যত হইলে নুফায়ল বলিল, হে বাদশাহ! আমাকে হত্যা করিবেন না। এই আরব ভূমিতে আমি আপনার পথপ্রদর্শকরূপে থাকিব এবং খাছ'আম গোত্রের এই শাহরান ও নাহিস শাখাদ্বয় আপনার অনুগত থাকিবে। আবরাহা তাহাকে হত্যা করিল না (প্রাগুক্ত; আল-আযরাকী, আখবার মাক্কা, ১খ, পৃ. ১৪২)।
অতঃপর তাহাকে লইয়া আবরাহা সম্মুখে অগ্রসর হইল। উক্ত নুফায়লই পথ দেখাইয়া লইয়া যাইতেছিল। তাহারা তায়েফ পৌছিলে মাস'উদ ইব্ন মু'আত্তাব ছাকীফ গোত্রের কিছু লোকসহ আগমন করিয়া নিবেদন করিল, হে রাজন! আমরা আপনার দাস। আপনার কথা শুনিব ও আপনার আনুগত্য করিব। আপনার সহিত আমাদের কোনও বিরোধ নাই। আপনি যে গৃহ ধ্বংসের উদ্দেশে রওয়ানা হইয়াছেন তাহা আমাদের উপাসনা গৃহ নহে। উল্লেখ্য যে, তাহাদের উপাসনা গৃহ ছিল লাত কেন্দ্রিক যাহা তায়েফ অবস্থিত ছিল। তাহারা উহাকে কা'বা গৃহের ন্যায়ই সম্মান করিত। মাসউদ আরও বলিল, আপনি তো সেই গৃহের উদ্দেশেই রওয়ানা হইয়াছেন যাহা মক্কায় অবস্থিত। আমরা আপনার সহিত এমন এক লোককে পাঠাইতেছি যে আপনাকে পথ দেখাইয়া সেখানে লইয়া যাইবে। অতঃপর আবরাহা তাহাদিগকে ক্ষমা করিয়া দিল। তাহারা প্রতিশ্রুতি মুতাবিক মক্কায় পথ দেখাইয়া লইয়া যাইবার জন্য 'আবু রিগাল' নামক এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করিল। আবরাহা আবূ রিগালকে সঙ্গে লইয়া সেখান হইতে রওয়ানা হইল। 'আল-মুগামিস' নামক স্থানে পৌছিলে আবূ রিগালের মৃত্যু হইল। সে আবরাহার পথপ্রদর্শক হওয়ায় আরববাসী তাহার প্রতিও প্রচণ্ডরূপে ক্ষুব্ধ হয়। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাহার কবরে পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে। আরববাসী বংশ-পরম্পরায় তাহার কবরে পাথর নিক্ষেপ করে (আস-সালিহী আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ২১৭)। ইহার কথা আরব কবিগণ তাহাদের কবিতায়ও উল্লেখ করিয়াছেন। যেমন উমায়্যা যুগের খ্যাতিমান কবি জারীর এই সম্পর্কে বলেনঃ
ইযা মাতা আল-ফারাযদাকু ফারজুমূহু কামা তারমূনাক্বাবরা আবী রিগāl।
"ফারাযদাক যখন মৃত্যুবরণ করিবে তখন তোমরা তাহার কবরে প্রস্তর নিক্ষেপ করিও যেমনিভাবে তোমরা প্রস্তর নিক্ষেপ করিয়া থাক আবূ রিগালের কবরে" (আল-আযরাকী, আখবার মাক্কা, ১খ, ১৪২-৪৩; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া, ওয়ান-নিহায়া)।
📄 মক্কায় আবরাহার দূত প্রেরণ
আল-মুগাম্মিস পৌছিলে আবরাহা বাস্তব অবস্থা জানিবার জন্য একদল সৈন্যসহ আল-আসওয়াদ ইব্ন্ন মাকসূদ নামক এক অশ্বারোহীকে মক্কায় প্রেরণ করিল। সে মক্কায় পৌঁছিয়া কুরায়শ ও অন্যান্য গোত্রের সম্পদ লুট করিয়া লইয়া আসিল যাহার মধ্যে আবদুল মুত্তালিবের দুই শত উটও ছিল। আবদুল মুত্তালিব ছিলেন কুরায়শ গোত্রের সরদার। কুরায়শ, হুযায়ল ও হারাম শরীফের অধিবাসিগণ প্রথমে আবরাহার সহিত যুদ্ধ করার সংকল্প করিল। কিন্তু তাহারা খোঁজখবর লইয়া আবরাহার সুশিক্ষিত বিশাল বাহিনীর সংবাদ জানিতে পারিয়া অনুধাবন করিল যে, তাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শক্তি-সামর্থ্য তাহাদের নাই। সুতরাং তাহারা উক্ত সংকল্প ত্যাগ করিল (আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ২৫৯)।
আবরাহা হুনাতা আল-হিময়ারীকে এই বলিয়া মক্কায় প্রেরণ করিল যে, এই শহরের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি ও নেতা কে তাহা অনুসন্ধান করিয়া বাহির করিবে এবং তাহাকে বলিবে, বাদশাহ সুস্পষ্টরূপে বলিয়াছেন যে, আমি তোমাদের সহিত যুদ্ধ করিতে আসি নাই; আমি কেবল এই কা'বা ঘর ভাঙ্গিতে আসিয়াছি। তোমরা যদি উহা রক্ষা করিবার নিমিত্তে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না কর তবে রক্তপাতের আমার কোন ইচ্ছা নাই। সেই নেতা যদি আমার সহিত যুদ্ধ করার সংকল্প না করেন তবে তাঁহাকে আমার নিকট লইয়া আসিও (ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ১৭১-৭২)।
📄 আবরাহার দরবারে আবদুল মুত্তালিব
অতঃপর হুনাতার প্রস্তাব মত তাহার সহিত আবদুল মুত্তালিব কয়েকজন পুত্রসহ আবরাহার নিকট গমন করিলেন এবং যূনাফ্র-এর সন্ধান করিয়া বন্দীখানায় তাহার সহিত সাক্ষাত করিলেন। যূনাফ্র ছিলেন তাঁহার পুরাতন বন্ধু। আবদুল মুত্তালিব তাহাকে বলিলেন, হে যূনাফ্র! আমরা যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হইয়াছি সে সম্পর্কে কি আপনার কিছু করণীয় আছে? যুনাফ্র বলিলেন, বাদশাহর হাতে বন্দী এক ব্যক্তি, যে প্রতীক্ষায় প্রহর গুনিতেছে যে, সকালে বা সন্ধ্যায় তাহাকে হত্যা করা হইবে, তাহার আর কিইবা করণীয় থাকিতে পারে। আপনাদের ব্যাপারে আমার কিছুই করণীয় নাই। তবে উনায়স নামে আমার এক বন্ধু আছে যে আবরাহার হস্তীচালক। আমি আপনাকে তাহার নিকট পাঠাইতেছি। আমি আপনার সম্পর্কে তাহাকে অনুরোধ করিব। আপনার মর্যাদা সম্পর্কে তাহাকে অবহিত করিব। বাদশাহর সহিত আপনার সাক্ষাৎ লাভের ব্যবস্থা করিয়া দিতে আনুরোধ করিব যাহাতে আপনি তাহার সাক্ষাতে আপনার যাহা ইচ্ছা বলিতে পারেন। আবদুল মুত্তালিব বলিলেন, ইহাই আমার জন্য যথেষ্ট। অতঃপর যূনাফ্র আবদুল মুত্তালিবকে উনায়সের নিকট প্রেরণ করিলেন এবং তাহাকে বলিয়া পাঠাইলেন যে, আবদুল মুত্তালিব কুরায়শ গোত্রের সরদার এবং মক্কার কূপ (যমযম)-এর তত্ত্বাবধায়ক। এক বর্ণনামতে কূপ-এর স্থলে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রধান বলা হইয়াছে (দ্র. আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ২৬১)। তিনি মানুষকে এমনকি বন্য জন্তুকেও আহার-করান।
বাদশাহের সৈন্যরা তাঁহার দুই শত উট লইয়া আসিয়াছে। তাই আপনি বাদশাহর নিকট তাঁহার জন্য অনুমতি প্রার্থনা করুন এবং আপনার সাধ্যমত তাঁহার উপকার সাধন করুন। হস্তীচালক যূনাফ্রকে প্রতিশ্রুতি দিয়া বলিল, আমি ঐরূপ করিব।
অতঃপর উনায়স এই ব্যাপারে আবরাহাকে বলিল, হে রাজন! কুরায়শ সরদার আপনার দ্বারে আপনার অনুমতি প্রার্থনা করিতেছেন। তিনি মক্কার যমযম কূপেরও তত্ত্বাবধায়ক। অনুগ্রহ করিয়া তাঁহাকে আপনার সহিত সাক্ষাতের অনুমতি দান করুন। তিনি আপনার সহিত' তাঁহার কিছু প্রয়োজনীয় বিষয়ে আলাপ করিবেন। ইহা শুনিয়া আবরাহা তাঁহাকে অনুমতি প্রদান করিল (আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ২১৭-১৮; ইব্ন কাছীর, আস-সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ. ৩৩-৩৪; আল-আযরাকী, আখাবারু মাক্কা, ১খ., পৃ. ১৪৩-৪৪)।
আবদুল মুত্তালিব ছিলেন খুবই সুন্দর ও সুঠাম দেহের অধিকারী এক সুদর্শন ও সুমহান ব্যক্তি। তাঁহার ব্যক্তিত্ব অন্যকে আকৃষ্ট করিত। আবরাহা তাঁহাকে দেখিয়া খুবই সম্মান করিল। সে তখন শাহী আসনে উপবিষ্ট ছিল। এমতাবস্থায় আবদুল মুত্তালibকে নিচে বসাইতে তাহার বিবেকে বাধিল। আবার নিজের শাহী আসনের পার্শ্বে হাবশাবাসিগণ আবদুল মুত্তালিবকে আসনে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখুক তাহাও সে অপছন্দ করিল। তাই আবরাহা নিজে আসন হইতে অবতরণ করিয়া গালিচায় বসিল এবং আবদুল মুত্তালibকে তাহার পার্শ্বে বসাইল (প্রাগুক্ত)।
অতঃপর দোভাষীর মাধ্যমে আবরাহা তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিল, আপনার প্রয়োজন কি? তিনি বলিলেন, আপনার লোকজন আমার দুই শত উট লইয়া আসিয়াছে, আমাকে তাহা ফেরত দেওয়া হউক। ইহা শুনিয়া আবরাহা দোভাষীর মাধ্যমে বলিল, আপনাকে দেখিয়া প্রথমে আমি খুবই জ্ঞানী-গুণী ও বুদ্ধিমান বলিয়া মনে করিয়াছিলাম। কিন্তু আপনার দুই শত উট ফেরত পাওয়ার আবেদনে আমি হতবাক হইয়াছি। আপনি জানেন যে, আমি কা'বা গৃহ ধ্বংস করিতে আসিয়াছি, যাহা আপনাদের দৃষ্টিতে সর্বাধিক সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ পবিত্র গৃহ। আপনি সে সম্পর্কে কিছুই বলিলেন না; বরং একটি অতি সামান্য ও ক্ষুদ্র বিষয় লইয়া আমার সহিত আলাপ করিলেন (সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন, ৩খ, ৩৬৬)। আবদুল মুত্তালিব বলিলেন, বাদশাহ! আমি হইলাম এই উটের মালিক (তাই আমি সে সম্পর্কে আপনার নিকট আবেদন করিয়াছি)। আর কা'বা গৃহেরও একজন মালিক আছেন, তিনিই উহা রক্ষা করিবেন। আবরাহা বলিল, কেহই আমা হইতে উহা রক্ষা করিতে পারিবে না। আবদুল মুত্তালিব বলিলেন, উহা আপনার ও তাঁহার ব্যাপার (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন-নাবabিয়্যা, ১খ, পৃ. ৬৫)।-
কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, আবদুল মুত্তালিবের সহিত বাক্স গোত্রের নেতা ইয়া'মুর ইন নুফাছা এবং হুযায়ল গোত্রের নেতা খুওয়ায়লিদ ইব্ন ওয়াছিলা আবরাহার নিকট গমন করিয়াছিলেন। তাঁহারা কা'বা শরীফ ধ্বংস না করিয়া ফিরিয়া যাওয়ার শর্তে আবরাহাকে তিহামার এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ প্রদান করিতে প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু আবরাহা ইহাতে রাজী হইল না (আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল-উনুফ, ১খ, পৃ. ২৬; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ, পৃ. ১৭২)। অতঃপর আবরাহা আবদুল মুত্তালিবের অনুরোধ রক্ষা করিয়া তাঁহার উটগুলি ফেরত দিল। আবুল মুত্তালিব সেইগুলির গলায় রশি বাঁধিলেন, মাল্য পরিধান করাইলেন এবং বায়তুল্লাহ্ জন্য হারাম শরীফে ছাড়িয়া দিলেন (আস-সুহায়লী, প্রাগুক্ত, ১খ, ২৬৯)।
📄 আবরাহা ও তাহার বাহিনীর প্রতি আবদুল মুত্তালিবের বদদু'আ
অতঃপর আবদুল মুত্তালিব কুরায়শদের নিকট ফিরিয়া আসিলেন এবং তাহাদিগকে সবকিছু অবহিত করিলেন। তিনি তাহাদিগকে আবরাহা বাহিনীর ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের আশংকায় মক্কা হইতে বাহির হইয়া কোনও গিরিগুহায় বা পাহাড়ের পাদদেশে আশ্রয় লইতে নির্দেশ দিলেন। আবদুল মুত্তালিব কা'বা শরীফের দরজার কড়া ধরিলেন। কুরায়শদের একটি দলও তাঁহার সহিত অত্যন্ত অনুনয়-বিনয় সহকারে আল্লাহ্র নিকট দুআ করিতে লাগিল। কা'বার দরজার কড়া ধরিয়া আবদুল মুত্তালib নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করিলেনঃ
লা হুম্মা ইন্নাল মার'আ ইয়ামনা'উ রহলাহু ফামনা' রহালাক। লা ইয়াগ্লিবান্না সলীবুহুম ওয়া মুখাল্লাফuhum গাদাউন মাহা'লাক। উনসুর আলা আলি সলীব ওয়া আবিদিহিল ইয়াওমা আলিক। বিতনা ফা আমরু মা বি যালিকা ইন কুনতা তারিকাহুম ওয়া কা'ব।
”হে আল্লাহ! প্রত্যেক লোক নিজ গৃহকে শত্রুর আক্রমণ হইতে রক্ষা করিয়া থাকে। অতএব তুমি তোমার গৃহকে রক্ষা কর। তাহাদের ক্রুশ ও শক্তি কোনক্রমেই জয়ী হইতে পারিবে না তোমার ক্ষমতা ও পরাক্রমের বিরুদ্ধে। তাই আজ তুমি তোমার পরবিারবর্গকে সাহায্য কর ক্রুশের পরিবারবর্গ ও উহার উপাসনাকারিগণের বিরুদ্ধে। যদি তুমি তাহাদিগকে ও আমাদের কা'বা গৃহকে এইভাবে ছাড়িয়া দাও (যে, তাহারা কোনরূপ বাধা ব্যতীত কা'বা গৃহ আক্রমণ করে) তবে তাহা তোমার ইচ্ছা” (আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ১খ, পৃ. ২১৯)।
আবদুল মুত্তালিব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করিতেন যে, তাঁহার এই দু'আ কুবল হইবে। এই সীমা লংঘনকারীদিগের প্রতি আল্লাহ্ ভয়ানক শাস্তি অবশ্যই প্রেরণ করিবেন। তাই দু'আ শেষে আবদুল মুত্তালিব কা'বার দরজার কড়া ছাড়িয়া দিলেন এবং কুরায়শ গোত্রের অন্যান্য লোকসহ আত্মরক্ষার্থে নিকটবর্তী পাহাড়ের শীর্ষে গিয়া আরোহণ করিলেন। সেখানে তাহারা ইহা দেখিবার জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন যে, আবরাহা মক্কায় প্রবেশ করিয়া কি করে এবং তাহার কি পরিণতি হয় (ইবন হিশাম, আস-সীরাঃ, ১খ, পৃ. ৬৬)। মুকাতিল (র) বলেন, আবদুল মুত্তালিব তখন উহাদের সহিত মক্কার বাহিরে যান নাই, বরং মক্কায়ই অবস্থান করেন এবং বলেন, আমি এখানেই থাকিব যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁহার ফয়সালা করেন। অতঃপর তিনি ও আবূ মাসউদ আছ-ছাকাফী আবরাহার কীর্তিকলাপ ও তাহার পরিণাম দেখিবার জন্য মক্কার একটি উঁচু স্থানে আরোহণ করিলেন (আশ-শামী, প্রাগুক্ত, ১খ., পৃ. ২১৯)।