📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নাজাশী কর্তৃক আবরাহার স্বীকৃতি লাভ

📄 নাজাশী কর্তৃক আবরাহার স্বীকৃতি লাভ


৫২৪ খৃ. মতান্তরে ৫৪৩ খৃ. আবরাহা ইয়ামানের শাসন ক্ষমতা দখল করে। নাজাশীর নিকট এই সংবাদ পৌঁছিলে তিনি ভীষণভাবে রাগান্বিত হইয়া বলেন, সে আমার শাসনকর্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়াছে এবং আমার অনুমোদন ছাড়াই তাহাকে হত্যা করিয়াছে। অতঃপর তিনি শপথ করেন যে, আবরাহাকে শিরশ্ছেদ করত তাহার রাজধানী পদদলিত করিবেন (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabiyyah, ১খ, পৃ. ৫৭)। মূলত ইহা ছিল তাহার পক্ষ হইতে আবরাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি। আর নাজাশীর ন্যায় ক্ষমতাধর বাদশাহর সম্মুখে আবরাহার যে এক মুহূর্তও দাঁড়াইবার শক্তি নাই আবরাহা তাহা ভালো করিয়াই জানিত। তাই এই হুমকি শুনিয়া আবরাহা দারুণভাবে ঘাবড়াইয়া গেল এবং স্বীয় মস্তক মুণ্ডন করিয়া ফেলিল এবং একটি থলেতে ইয়ামানের মাটি ও উক্ত মুণ্ডিত চুল ভরিয়া নাজাশীর দরবারে প্রেরণ করিল (ইব্‌ন কাছীর, আস-সীরাতুন নাবabiyyah, ১খ, পৃ. ২৯; আল-আযরাকী, আখবারু মাক্কা, ১খ, পৃ. ১৩৭)। এক বর্ণনামতে আবراহা নিজের শরীর হইতে রক্ত বাহির করিয়া একটি শিশিতে পুরিয়া তাহা নাজاشীর নিকট প্রেরণ করিয়াছিল (সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৩৬২)। অতঃপর একজন দূত মারফত আবরাহা উক্ত থলে ও একখানি পত্র লিখিয়া নাজাশীর নিকট প্রেরণ করিল। পত্রে সে লিখিল, হে রাজন! আরইয়াত যেমন আপনার অনুগত দাস ছিল তেমনিভাবে এই বান্দাও আপনার দাস। আমরা আপনার নির্দেশের ব্যাপারে মতানৈক্য করিয়াছি সত্য, তবে সকল প্রকার আনুগত্য আপনার জন্যই। তবে হাবশার ব্যাপারে আমিই ছিলাম তদপেক্ষা শক্তিশালী। আমি অঙ্গীকার করিতেছি যে, সর্বদা আপনার বাধ্য ও অনুগত থাকিব। যখনই আমি শুনিয়াছি যে, মহাত্মن আমার প্রতি ক্ষুব্ধ হইয়াছেন তখন হইতেই আমি খুবই পেরেশানীর মধ্যে রহিয়াছি। আর আমি আপনার শপথ পূর্ণ করার জন্য আমার পূর্ণ মস্তক মুণ্ডন করিয়াছি। তাহা ও ইয়ামানের মাটি (এক বর্ণনায় নিজের রক্ত) প্রেরণ করিতেছি। আপনি উহা মাটিতে ফেলিয়া পদতলে মাড়াইবেন এবং নিজের শপথ পূর্ণ করিবেন। নাজاشী আবরাহার এই অনুতাপ ও ক্ষমা প্রার্থনা যথোপযুক্ত মনে করিয়া তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন এবং লিখিয়া পাঠাইলেন, আমার পুনরাদেশ না যাওয়া পর্যন্ত ইয়ামান ভূমিতে তুমিই শাসনকার্য চালাইতে থাক। এইভাবে বাদশাহ তাহাকে ইয়ামানের শাসক হিসাবে অনুমোদন করিলেন। অতঃপর আবরাহা নিশ্চিন্তে ও নিরুদ্রবে ইয়ামানের শাসনকার্য পরিচালনা করিতে লাগিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবরাহার পরিচয়

📄 আবরাহার পরিচয়


ইতিহাসবিদগণের মতে আবরাহা ছিল রাজ বংশেরই লোক। সে ছিল আকৃতিতে মোটা ও খাটো। প্রতিপক্ষ আরইয়াতের যুদ্ধাস্ত্রের আঘাতে তাহার চোখ, ঠোট, নাক ও ভ্রু কাটিয়া যায়। এইজন্য আরবগণ তাহাকে আবরাহা আল-আশরাম বলিত (ইবন হিশাম, আস-সীরাঃ, ১খ, ৫৭)। আরবীতে আশরাম শব্দের অর্থ নাক কাটা। আবরাহা খৃস্ট ধর্মের প্রতি অত্যন্ত অনুগত ছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সুরম্য গীর্জা নির্মাণ

📄 সুরম্য গীর্জা নির্মাণ


আবরাহা খৃষ্ট ধর্মের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত থাকায় সে রাষ্ট্রের পক্ষ হইতে বহু ধর্ম প্রচারক নিযুক্ত করে এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গীর্জা নির্মাণ করে। রাজধানী সানআয় নির্মাণ করে সর্ববৃহৎ গীর্জা, আরবগণ যাহাকে 'আল-কুলায়স' বা 'আল-কুল্লায়স' বলিয়া আখ্যায়িত করে। আরবীতে 'আল-কালানসুওয়া' অর্থ টুপি। উক্ত প্রাসাদ এত উঁচু ছিল যে, উহার শীর্ষদেশের প্রতি তাকাইলে মাথার টুপি পড়িয়া যাইত। এইজন্য তাহারা উহার এইরূপ নামকরণ করিয়াছিল (আস-সালিহী আশ-শামী, সুবুলুল-হুদা ওয়ার- রাশাদ ফী সীরাতি খায়রিল 'ইবাদ, ১খ, পৃ. ২১৫)।
ইন জারীর ও ইন্ন কাছীর-এর বর্ণনামতে ইহা ছিল নির্মাণ শিল্পের দিক দিয়া অতুলনীয় এক প্রাসাদ যাহার সমতুল্য প্রাসাদ পূর্বে আর কখনও দেখা যায় নাই। আস-সুহায়লী বলেন, এই প্রাসাদ নির্মাণে আবরাহা অনেক অমানুষিক অত্যাচার করে। ইয়ামানবাসীদিগকে জোর-যবরদস্তিমূলকভাবে সে ইহার জন্য শ্রম দিতে বাধ্য করে। সে আইন করিয়াছিল যে, কেহ সূর্যোদয়ের পূর্বে আসিতে না পারিলে তাহার হস্ত কর্তন করা হইবে। একদিন এক শ্রমিকের ঘুম হইতে জাগ্রত হইতে সূর্য উদিত হইয়া গেল। তাহাকে লইয়া তাহার মাতা আবরাহার দরবারে আগমন করিল এবং তাহার হস্ত কর্তন না করিবার জন্য অনুরোধ করিল। কিন্তু আবরাহা তাহার অনুরোধ রক্ষা করিতে রাজি হইল না। অবশেষে নিরাশ হইয়া মহিলা বলিল, আচ্ছা কর, যাহা তোমার ইচ্ছা। আজিকার দিন তোমার এবং আগামী কল্য অন্যের। বাদশাহ বলিল, তোমার অনিষ্ট হউক, কি বলিলে! মহিলাটি বলিল, হাঁ, এই রাজত্ব এক সময় অন্যের ছিল, অন্যের নিকট হইতে তোমার নিকট আসিয়াছে। এমনিভাবে ইহা আবার অন্যের নিকট চলিয়া যাইবে। মহিলার এই উপদেশ তাহার মনে গভীর রেখাপাত করিল। তাই সে ইহার পর হইতে উক্ত আইন বাতিল করিয়া দিল (সালিহী আশ-শামী, সুবুলুল হুদ-ওয়ার-রাশাদ, ১খ, পৃ. ২১৫-১৬)।
উক্ত গীর্জা নির্মাণে আবরাহা ইয়ামানের অঢেল সম্পদ ও হীরা-জহরত, মণি-মানিক্য অকাতরে ব্যয় করে। আবার রাণী বিলকীসের প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ হইতে মহামূল্যবান প্রস্তর ও মণি-মুক্তা আনিয়া উহাকে সুসজ্জিত করে এবং হাতির দাঁত ও আবলুসের দ্বারা মনোরম নকশা তৈরি করে। উহাতে স্বর্ণ-রৌপ্যের ক্রুশ অংকন করিয়া উহাকে আরও সুসজ্জিত করে (প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নাজাশীর নিকট আবরাহার পত্র

📄 নাজাশীর নিকট আবরাহার পত্র


উক্ত গীর্জার নির্মাণ কর্ম সমাপ্ত হইলে আবরাহা নাজাশীর নিকট এক পত্র লিখিয়া জানাইল, আমি আপনার জন্য সান'আয় এমন একটি গীর্জা নির্মাণ করাইয়াছি যে, পূর্বেকার ইতিহাসে কোনও বাদশাহর জন্য ইহার সমকক্ষ কোনও গীর্জা নির্মাণ করা হইয়াছে বলিয়া জানা যায় না। ইহাতেই আমি ক্ষান্ত নই। এখন আমার আকাঙ্ক্ষা হইল, শহর-নগর চারিদিকের যে সকল লোক মক্কায় কা'বা শরীফের হজ্জ করিবার জন্য গমন করিত তাহারা এই গীর্জায় আগমন করত ইহারই তাওয়াফ ও হজ্জ সমাপন করুক। ইহাই সমগ্র আরববাসীর হজ্জকেন্দ্র হউক (সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন, ৩খ, ৩৬৩; ইন্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, ১খ, পৃ. ৫৮)।
আবরাহার পত্রের প্রতিক্রিয়া : কা'বা শরীফ ছিল ধর্মগোত্র নির্বিশেষে সকলের নিকট সম্মান ও ভক্তির প্রতীক। সকলেই নিজ নিজ আকীদা-বিশ্বাস অনুযায়ী উহার হজ্জ আদায় করা ফরয বলিয়া মনে করিত। আর এই কারণেই খোদ কা'বা শরীফেই বিভিন্ন গোত্রের ৩৬০টি মূর্তি ছিল। এমনকি হযরত ইবরাহীম (আ); ইসমাঈল, ঈসা ও মারয়াম (আ)-এর প্রতিকৃতিও সেখানে স্থাপিত ছিল, যাহা মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (স)-এর নির্দেশে অপসারণ করা হয় (আল-বুখারী, আস-সাহীহ, বাব ফাতহ মাক্কা, হাদীছ নং ৪২৮৮; সিউহারবী, কাসাস, ৩খ, ৩৬৪)।
নাজাশীর নিকট লিখিত আবরাহার উক্ত পত্রের ভীষণ প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। বলিতে গেলে গোটা আরব ভিতরে ভিতরে ফুঁসিয়া উঠিল। কিন্তু আবরাহার ভয়ে সরাসরি প্রকাশ্যে তাহারা কিছুই বলিতে পারিল না। তখন কিনানা গোত্রের শাখা বনূ ফুকায়স ইবন আদিয়্যি-এর এক লোক ইহা শুনিয়া ভীষণ রাগান্বিত হইল। সে তথায় উপস্থিত হইল (এক বর্ণনামতে সে তখন সান'আয় অবস্থান করিতেছিল) এবং চুপিসারে উক্ত গীর্জায় প্রবেশ করিল। অতঃপর সেখানে মলত্যাগ করিয়া স্বদেশে চলিয়া আসিল (ইন্ন হিশাম, আস-সীরাঃ, ১খ., ৬১; সিউহারবী, কাসাস, ৩খ, ৩১৪)। ইবন সা'দ-এর বর্ণনামতে নুফায়ল ইব্‌ন্ন হাবীব আল-খাছ'আমী নামক এক লোক এক রাত্রে যখন লোকজনের কোন সাড়াশব্দ ছিল না তখন বিষ্ঠা লইয়া উহার কিবলায় লেপন করিয়া দিল এবং কিছু মরা জন্তুর দেহ একত্র করিয়া উহার মধ্যে ফেলিয়া আসিল (আস্-সালিহী আশ-শামী, সুবুলুল-হুদা ওয়ার-রাশাদ, ১খ, পৃ. ২১৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00