📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সূচনা

📄 সূচনা


আসহাবুল-ফীলের ঘটনার ঐতিহাসিক পটভূমি ছিল নিম্নরূপ: ইব্‌ن আব্বাস (রা) প্রমুখ সূত্রে বর্ণিত যে, হিময়ারী রাজগোষ্ঠীর সর্বশেষ রাজা ছিলেন যুর'আ যুনুওয়াস। তিনি ছিলেন ইয়াহুদী। নাজরানবাসী ছাড়া হিময়ারী রাজ্যের সকলেই ইয়াহুদী ধর্মে দীক্ষিত হয়। নাজরানবাসী ছিল খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী। তাহাদের নেতা ছিলেন 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন ছামির। বাদশাহ যূনুওয়াস তাঁহাকে ইয়াহুদী ধর্মের দাওয়াত দেন, কিন্তু তিনি ও তাঁহার অধীনস্থ খৃস্টানগণ ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণ করিতে অস্বীকার করেন। ফলে বাদশাহ দারুণভাবে ক্ষিপ্ত হন। তিনি তাহাদের কতককে হত্যা করিয়া এবং কতককে আগুনে পোড়াইয়া বধ করেন। এমনিভাবে প্রায় বিশ হাজার খৃস্টানকে তিনি হত্যা করেন, কুরআন কারীমে যাহাদিগকে 'আসহাবুল উখদূদ' বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। দাওস ইব্‌ন যী ছা'লাবান নামক সাবার জনৈক খৃস্টান তাহাদের চক্ষু ফাঁকি দিয়া আপন ঘোড়া লইয়া মরুভূমিতে অদৃশ্য হইয়া যায়। অতঃপর সে রোম সম্রাট (কায়সার)-এর নিকট গিয়া উক্ত ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেয় এবং তাহার নিকট সাহায্য কামনা করে। বাদশাহ স্বধর্মীদের এহেন করুণ অবস্থা শুনিয়া মর্মাহত হন। তাই তিনি ইহার প্রতিশোধ লওয়ার সংকল্প করিয়া তাহাকে জানাইলেন, তোমার দেশ যেহেতু এখান হইতে বহু দূরে সেহেতু আমি হাবশার রাজাকে লিখিয়া দিতেছি, সে তোমাদিগকে সাহায্য করিবে। কারণ সে আমাদেরই ধর্মের লোক। অতঃপর তিনি নাজাশীকে পত্র মারফত বিপন্ন লোকটিকে সাহায্য করার নির্দেশ দিলেন। লোকটি নাজাশীর নিকট আসিলে নাজাশী তাহাকে সাহায্যার্থে তাহার সহিত হাবশার আরইয়াত ও আবরাহা নামক দুইজন আমীরের নেতৃত্বে বিশাল এক সেনাদল প্রেরণ করেন। তাহারা ইয়ামানে প্রবেশ করিয়া ইচ্ছামত ধ্বংসলীলা চালাইল। হিম্য়ারী বাদশাহ যুনুওয়াস ঘোড়াসহ পলায়ন করিয়া সমুদ্রে ডুবিয়া মৃত্যুবরণ করিল। এইভাবে ইয়ামানে হাবশার উপনিবেশ কায়েম হইল এবং আরইয়াত ও আবরাহা উহার আমীর হিসাবে দায়িত্ব পালন করিতে লাগিলেন। আরইয়াত ছিলেন আবরাহার চেয়ে উর্দ্ধতন পদমর্যাদার অধিকারী। দুই বৎসরকাল আরইয়াত নির্বিঘ্নে শাসন কার্য পরিচালনা করেন। অতঃপর এক সময় উভয় আমীরের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধের উপক্রম হইলে আবراহা প্রস্তাব করিল যে, এইভাবে লোকক্ষয় না করিয়া বরং আমরা দুইজন দ্বৈরথ যুদ্ধে মোকাবিলা করি। যে জয়ী হইবে সেই ইয়ামান শাসন করিবে। আরইয়াত ইহাতে রাজী হইলেন। অতঃপর উভয়ে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হইলেন। উভয়ের পিছনে একজন করিয়া যুবক ছিল। অতঃপর আরইয়াত আবরাহাকে আক্রমণ করিলেন। তাহার তরবারির আঘাতে আবরাহার নাক কাটিয়া গেল। চেহারা ও কপাল কাটিয়া রক্ত প্রবাহিত হইতে লাগিল। অতঃপর আবরাহার পিছনে থাকা 'আতৃদা নামক তাহার দাসটি পিছন দিক হইতে আরইয়াতকে আক্রমণ করিয়া বসিল। ইহাতে আরিয়াত নিহত হইল এবং তাহার পক্ষের সেনাবাহিনী আবরাহার দলে যোগদান করিল। ফলে আবরাহা ইয়ামানের একচ্ছত্র অধিপতি হইয়া গেল (আল-আযরাকী, আখবারু মাক্কা, ১খ., পৃ. ১৩৪-৩৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 নাজাশী কর্তৃক আবরাহার স্বীকৃতি লাভ

📄 নাজাশী কর্তৃক আবরাহার স্বীকৃতি লাভ


৫২৪ খৃ. মতান্তরে ৫৪৩ খৃ. আবরাহা ইয়ামানের শাসন ক্ষমতা দখল করে। নাজাশীর নিকট এই সংবাদ পৌঁছিলে তিনি ভীষণভাবে রাগান্বিত হইয়া বলেন, সে আমার শাসনকর্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিয়াছে এবং আমার অনুমোদন ছাড়াই তাহাকে হত্যা করিয়াছে। অতঃপর তিনি শপথ করেন যে, আবরাহাকে শিরশ্ছেদ করত তাহার রাজধানী পদদলিত করিবেন (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabiyyah, ১খ, পৃ. ৫৭)। মূলত ইহা ছিল তাহার পক্ষ হইতে আবরাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি। আর নাজাশীর ন্যায় ক্ষমতাধর বাদশাহর সম্মুখে আবরাহার যে এক মুহূর্তও দাঁড়াইবার শক্তি নাই আবরাহা তাহা ভালো করিয়াই জানিত। তাই এই হুমকি শুনিয়া আবরাহা দারুণভাবে ঘাবড়াইয়া গেল এবং স্বীয় মস্তক মুণ্ডন করিয়া ফেলিল এবং একটি থলেতে ইয়ামানের মাটি ও উক্ত মুণ্ডিত চুল ভরিয়া নাজাশীর দরবারে প্রেরণ করিল (ইব্‌ন কাছীর, আস-সীরাতুন নাবabiyyah, ১খ, পৃ. ২৯; আল-আযরাকী, আখবারু মাক্কা, ১খ, পৃ. ১৩৭)। এক বর্ণনামতে আবراহা নিজের শরীর হইতে রক্ত বাহির করিয়া একটি শিশিতে পুরিয়া তাহা নাজاشীর নিকট প্রেরণ করিয়াছিল (সিউহারবী, কাসাসুল কুরআন, ৩খ, পৃ. ৩৬২)। অতঃপর একজন দূত মারফত আবরাহা উক্ত থলে ও একখানি পত্র লিখিয়া নাজাশীর নিকট প্রেরণ করিল। পত্রে সে লিখিল, হে রাজন! আরইয়াত যেমন আপনার অনুগত দাস ছিল তেমনিভাবে এই বান্দাও আপনার দাস। আমরা আপনার নির্দেশের ব্যাপারে মতানৈক্য করিয়াছি সত্য, তবে সকল প্রকার আনুগত্য আপনার জন্যই। তবে হাবশার ব্যাপারে আমিই ছিলাম তদপেক্ষা শক্তিশালী। আমি অঙ্গীকার করিতেছি যে, সর্বদা আপনার বাধ্য ও অনুগত থাকিব। যখনই আমি শুনিয়াছি যে, মহাত্মن আমার প্রতি ক্ষুব্ধ হইয়াছেন তখন হইতেই আমি খুবই পেরেশানীর মধ্যে রহিয়াছি। আর আমি আপনার শপথ পূর্ণ করার জন্য আমার পূর্ণ মস্তক মুণ্ডন করিয়াছি। তাহা ও ইয়ামানের মাটি (এক বর্ণনায় নিজের রক্ত) প্রেরণ করিতেছি। আপনি উহা মাটিতে ফেলিয়া পদতলে মাড়াইবেন এবং নিজের শপথ পূর্ণ করিবেন। নাজاشী আবরাহার এই অনুতাপ ও ক্ষমা প্রার্থনা যথোপযুক্ত মনে করিয়া তাহাকে ক্ষমা করিয়া দিলেন এবং লিখিয়া পাঠাইলেন, আমার পুনরাদেশ না যাওয়া পর্যন্ত ইয়ামান ভূমিতে তুমিই শাসনকার্য চালাইতে থাক। এইভাবে বাদশাহ তাহাকে ইয়ামানের শাসক হিসাবে অনুমোদন করিলেন। অতঃপর আবরাহা নিশ্চিন্তে ও নিরুদ্রবে ইয়ামানের শাসনকার্য পরিচালনা করিতে লাগিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আবরাহার পরিচয়

📄 আবরাহার পরিচয়


ইতিহাসবিদগণের মতে আবরাহা ছিল রাজ বংশেরই লোক। সে ছিল আকৃতিতে মোটা ও খাটো। প্রতিপক্ষ আরইয়াতের যুদ্ধাস্ত্রের আঘাতে তাহার চোখ, ঠোট, নাক ও ভ্রু কাটিয়া যায়। এইজন্য আরবগণ তাহাকে আবরাহা আল-আশরাম বলিত (ইবন হিশাম, আস-সীরাঃ, ১খ, ৫৭)। আরবীতে আশরাম শব্দের অর্থ নাক কাটা। আবরাহা খৃস্ট ধর্মের প্রতি অত্যন্ত অনুগত ছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সুরম্য গীর্জা নির্মাণ

📄 সুরম্য গীর্জা নির্মাণ


আবরাহা খৃষ্ট ধর্মের প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত থাকায় সে রাষ্ট্রের পক্ষ হইতে বহু ধর্ম প্রচারক নিযুক্ত করে এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গীর্জা নির্মাণ করে। রাজধানী সানআয় নির্মাণ করে সর্ববৃহৎ গীর্জা, আরবগণ যাহাকে 'আল-কুলায়স' বা 'আল-কুল্লায়স' বলিয়া আখ্যায়িত করে। আরবীতে 'আল-কালানসুওয়া' অর্থ টুপি। উক্ত প্রাসাদ এত উঁচু ছিল যে, উহার শীর্ষদেশের প্রতি তাকাইলে মাথার টুপি পড়িয়া যাইত। এইজন্য তাহারা উহার এইরূপ নামকরণ করিয়াছিল (আস-সালিহী আশ-শামী, সুবুলুল-হুদা ওয়ার- রাশাদ ফী সীরাতি খায়রিল 'ইবাদ, ১খ, পৃ. ২১৫)।
ইন জারীর ও ইন্ন কাছীর-এর বর্ণনামতে ইহা ছিল নির্মাণ শিল্পের দিক দিয়া অতুলনীয় এক প্রাসাদ যাহার সমতুল্য প্রাসাদ পূর্বে আর কখনও দেখা যায় নাই। আস-সুহায়লী বলেন, এই প্রাসাদ নির্মাণে আবরাহা অনেক অমানুষিক অত্যাচার করে। ইয়ামানবাসীদিগকে জোর-যবরদস্তিমূলকভাবে সে ইহার জন্য শ্রম দিতে বাধ্য করে। সে আইন করিয়াছিল যে, কেহ সূর্যোদয়ের পূর্বে আসিতে না পারিলে তাহার হস্ত কর্তন করা হইবে। একদিন এক শ্রমিকের ঘুম হইতে জাগ্রত হইতে সূর্য উদিত হইয়া গেল। তাহাকে লইয়া তাহার মাতা আবরাহার দরবারে আগমন করিল এবং তাহার হস্ত কর্তন না করিবার জন্য অনুরোধ করিল। কিন্তু আবরাহা তাহার অনুরোধ রক্ষা করিতে রাজি হইল না। অবশেষে নিরাশ হইয়া মহিলা বলিল, আচ্ছা কর, যাহা তোমার ইচ্ছা। আজিকার দিন তোমার এবং আগামী কল্য অন্যের। বাদশাহ বলিল, তোমার অনিষ্ট হউক, কি বলিলে! মহিলাটি বলিল, হাঁ, এই রাজত্ব এক সময় অন্যের ছিল, অন্যের নিকট হইতে তোমার নিকট আসিয়াছে। এমনিভাবে ইহা আবার অন্যের নিকট চলিয়া যাইবে। মহিলার এই উপদেশ তাহার মনে গভীর রেখাপাত করিল। তাই সে ইহার পর হইতে উক্ত আইন বাতিল করিয়া দিল (সালিহী আশ-শামী, সুবুলুল হুদ-ওয়ার-রাশাদ, ১খ, পৃ. ২১৫-১৬)।
উক্ত গীর্জা নির্মাণে আবরাহা ইয়ামানের অঢেল সম্পদ ও হীরা-জহরত, মণি-মানিক্য অকাতরে ব্যয় করে। আবার রাণী বিলকীসের প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ হইতে মহামূল্যবান প্রস্তর ও মণি-মুক্তা আনিয়া উহাকে সুসজ্জিত করে এবং হাতির দাঁত ও আবলুসের দ্বারা মনোরম নকশা তৈরি করে। উহাতে স্বর্ণ-রৌপ্যের ক্রুশ অংকন করিয়া উহাকে আরও সুসজ্জিত করে (প্রাগুক্ত)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00