📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 উপসংহার

📄 উপসংহার


কুরআন মজীদে আল্লাহ তা'আলা পরিষ্কারভাবে জানাইয়া দিয়াছেন যে, তাহারা তাঁহাকে সেইভাবেই চিনিতে পারে যেভাবে তাহারা নিজ সন্তান-সন্তুতিকে চিনিতে পারে। বস্তুত পূর্ববর্তী ধর্মবেত্তাগণ তাঁহাদের ধর্মগ্রন্থে মুহাম্মাদ (স) সম্পর্কে এত বিস্তারিতভাবে জানিতে পারিয়াছেন
১২৯ যে, তাঁহার আবির্ভাবের পর যাহারাই তাঁহাকে দেখিয়াছেন এবং তাঁহার কার্যকলাপ প্রত্যক্ষ করিয়াছেন, তাহারা অবশ্যই তাঁহাকে সর্বশেষ পয়গাম্বর হিসাবে চিনিতে পারিয়াছেন। এমনকি যাহারা বিশ্বস্ত সূত্রে তাঁহার ও তাঁহার সহচরদের প্রভাবচরিত্র ও কার্যকলাপ সম্পর্কে অবহিত হইয়াছেন, তাহাদের পক্ষেও তাঁহাকে চিনিতে কষ্ট হয় নাই।
ইতিহাসে দেখা যায় যে, এই কারনেই প্রাচীন পূর্বতন ধর্মগ্রন্থানুসারীগণের যাহারা সত্যনিষ্ঠ ছিলেন তাহারা নির্দ্বিধায় তাঁহাকে মানিয়া লইয়া ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন। যেমন ভারতের ভোজ রাজা, আবিসিনিয়া সম্রাট নাজাশী ও ইয়াহুদী গোত্রের হযরত 'আবদুল্লাহ ইব্‌ন সালাম (রা) তাঁহাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। প্রথমজন শুনিয়া ও দেখিয়া, দ্বিতীয়জন শুধু শুনিয়া এবং তৃতীয়জন দেখিয়া ও জানিয়া ইসলাম গ্রহণ করেন।
পক্ষান্তরে যেসব ধর্মবেত্তা সত্যনিষ্ঠ ছিলেন না, বরং ধর্মীয় কর্তৃত্ব নিয়া যাহারা পসরা জমাইয়া বসিয়াছিলেন এবং অন্তিম ঋষি তথা আখেরী পয়গাম্বরকে মানিয়া লইলে তাহাদের এত দিনের জমজমাট ধর্মব্যবসা বিলুপ্ত হইবে, তাহারাই দেখিয়াও না চেনার ভান করিল এবং জানিয়াও না জানার ভান দেখাইল। ফলে যে শুধু সেইসব ভণ্ড ধর্মবেত্তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হইল তাহা নহে, পরন্তু তাহাদের অনুসারী লক্ষ কোটি ধর্মান্ধ মানুষেরও সর্বনাশ করিল।
আমরা আজ প্রাচীন ধর্মগ্রন্থরাজির কতখানাই বা হাতে পাইতেছি? যাহাও পাইতেছি তাহার কতটুকুই বা বিকৃতিমুক্ত পাইতেছি? তাওরাত, ইনজীল, যাবুর, বেদ, ধর্মপদ নামে যাহা কিছু আমরা পাইতেছি তাহার সত্যাসত্য নির্ণয় খুবই দুরূহ ব্যাপার। ধর্মান্ধ ধর্মবেত্তাদের খেয়ালখুশীর মাশুল দিয়া আজও উহার যতটুকু আমরা পাইতেছি তাহাতেই আমরা আখেরী নবীর এত পরিচয় পাইতেছি যে, নূন্যতম বিবেক-বুদ্ধি ও সত্যনিষ্ঠা থাকিলে তাহাকে মানিয়া লুইয়া ইসলাম গ্রহণ করিতে কাহারও দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকার কথা নহে। তবে যদি কোন হতভাগা আরবের পৌত্তলিক সর্দারদের মত সত্যকে সত্য জানিয়াও শুধুমাত্র বাপদাদার ধর্মের মায়ায় অন্ধ থাকিয়া মুখ ফিরাইয়া নেয় তাহার কথা ভিন্ন। দুর্ভাগ্য যে, সেই ধরনের হতভাগার সংখ্যা আজও আদৌ নগণ্য নহে। আসল কথা হইল, যাহার পথ প্রাপ্তি আল্লাহ তা'আলার আদি জ্ঞানে ধরা পড়ে নাই তাহার পথ প্রাপ্তির আশা করাটাই সম্পূর্ণ অবান্তর।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেন, وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً. "আমি কখনও কোন জনগোষ্ঠীকে শাস্তি দিব না যতক্ষণ না তাহাদের নিকট একজন রাসূল পাঠাই।"
আহকামুল হাকেমীনের তরফ হইতে এইরূপ ঘোষণা স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। আদিকালে যেহেতু ভৌগোলিক অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন জনপদে ভিন্ন ভিন্ন গোত্রের মানুষ বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করিত এবং তখন যোগাযোগ ব্যবস্থারও তেমন উন্নতি ঘটে নাই, ফলে
১৩০ বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন নবী, এমনকি সমসাময়িক কালেই পাঠান হইত। এই কারণেই এক লাখ চব্বিশ হাজার, মতান্তরে দুই লাখ চব্বিশ হাজার পয়গাম্বর পাঠানো হইয়াছে। তাওরাত, ইনজীল, যাবুর ও কুরআনে আমরা তাঁহাদের কতজনেরই বা নাম-পরিচয় পাই? হয়তো বড়জোর সিকি শতকের নাম-পরিচয় জানিতে পারি। বাকী এক লাখ তেইশ হাজার নয় শত পঁচাত্তর জনের নাম পরিচয় কোথায় পাইব? বিশেষত এই উপমহাদেশে যেখানে বলা হয়, অন্ততপক্ষে পাঁচ হাজার বৎসর আগে হইতেই জনবসতি ছিল তাহাদের কাছে কোন্ কোন্ নবী আসিয়াছিলেন এবং তাঁহাদের ধর্মগ্রন্থের নাম কি কি ছিল, আজ আমাদের এইসব প্রশ্নের জন্য জবাব দিতে হইবে। অন্যথায় কুরআন কারীমে আল্লাহ তা'আলার ঘোষণার অবমূল্যায়ন করা হইবে।
এই প্রেক্ষিতেই নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, উপমহাদেশের প্রাক-ইসলামী যুগের বৈদিক ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম ও উহার প্রবর্তকদের নিয়া গবেষণা করা অপরিহার্য। আরবে হযরত ইবরাহীম (আ) ও হযরত ইসমাঈল (আ)-এর দীনে হানীফের অনুসারীরা যখন পৌত্তলিক হইতে পারিয়াছে, তখন উপমহাদেশের পৌত্তলিকরাও যে কোন পয়গম্বরের দীনে হানীফের পথবিচ্যুত অনুসারী নহে, তাহা কে বলিবে? তাহাদের অধুনাপ্রাপ্ত বিকৃত বেদ, পুরাণ, ধর্মপদ ইত্যাকার গ্রন্থে আখেরী নবীর যেসব ভবিষ্যদ্বাণী পাওয়া যায় তাহা কি সেইগুলির সত্যতার দিকেও ইঙ্গিত দেয় না? আল্লাহ সর্বজ্ঞ।
গ্রন্থপঞ্জীঃ (১) আল্লামা শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, বাংলা অনু, এ কে এম ফজলুর রহমান মুনশী, দি তাজ পাবলিশিং হাউজ, ঢাকা ১৯৯৮ খৃ, ৪খ.; (২) ডঃ মরিস বুকাইলী, বাইবেল কোরআন ও বিজ্ঞান, বাংলা অনু. আখতার-উল-আলম, জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, ঢাকা ১৯৯৬ খৃ.; (৩) ডঃ বেদ প্রকাশ উপাধ্যায়, কল্কি অবতার এবং মোহাম্মদ সাহেব, বাংলা অনু, অধ্যাপক অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায় ও ডঃ গৌরী ভট্টাচার্য, ইসলামী সাহিত্য প্রকাশনালয়, ঢাকা ১৯৯৭ খৃ.; (৪) ঐ লেখক, বেদ ও পুরাণে আল্লাহ ও হযরত মোহাম্মদ, বাংলা অনু, অধ্যাপক অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায় ও ডঃ গৌরী ভট্টাচার্য, ইসলামী সাহিত্য প্রকাশনালয়, ঢাকা ১৯৯৭ খৃ.।
আখতার ফারুক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00