📄 ঋগ্বেদে হযরত মুহাম্মদ (স)
ঋগ্বেদের অন্যূন ষোলটি মন্ত্রে নরাশংসের উল্লেখ রহিয়াছে। তাহা ছাড়া উহার বিভিন্ন স্থানে ঈলিত ঋষির উল্লেখ দেখা যায়। ঋগ্বেদের ১ম খণ্ড চতুর্দশ পৃষ্ঠার টীকায় ঈলিত-এর অর্থ বলা হইয়াছে স্তুত বা প্রশংসিত। অতএব নরাশংস ও দ্রুত ঈলিত সমার্থবোধক শব্দ। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা গিয়াছে যে, যেখানে নরাশংসের উল্লেখ করা হইয়াছে, উহার পরেই ঈলিত, কোথাও বা ঈলিত নাম ব্যবহৃত হইয়াছে। এই তিন শব্দের অর্থই স্তুত ও প্রশংসিত (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৯৪-৯৫)।
বস্তুত আরবী মুহাম্মাদ ও সংস্কৃত নরাশংস বা ঈলিত সমার্থক। তাই দেখা যায় যায়, বৈদিক শাস্ত্র ভবিষ্য পুরাণে নামবাচক শব্দ মুহাম্মাদ উল্লেখ করিয়া তাঁহার আগমন ও আবির্ভাবের
১২২ ভবিষ্যদ্বাণী করা হইয়াছে। ভবিষ্য পুরাণ প্রতিসর্গ পর্ব, ৩য় অধ্যায়, ৪১৯ পৃষ্ঠায় আছে : “এতসিন্নন্তরে ম্লেচ্ছ আচার্যে সমন্বিত। 'মহামদ' ইতিখ্যাত শিষ্যশাখ সমন্বিত” (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৯৮)। অর্থাৎ ইতিবাসরে ম্লেচ্ছ আচার্য যিনি মুহাম্মাদ নামে খ্যাত, তিনি বহু শিষ্যশাখা দ্বারা সমন্বিত হইলেন।
অল্লোপনিষদে উল্লিখিত আছে, “অল্লা জ্যৈষ্ঠং শ্রেষ্ঠং পরমং পূণঃ ব্রহ্মণ অল্লাম" হ্রাং অল্লাহ্র রসুল মহমদরকং বরস্য অল্লো অল্লাম" (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৯৯)। আশ্চর্য যে, অল্লোপনিষদে মুহাম্মাদকে আল্লাহ্র রাসূল বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে।
📄 দশ সহস্র শত্রুসেনা বেষ্টিত পরিখার যুদ্ধ
ঋগ্বেদে প্রথম মণ্ডল ৫৩ সুক্ত ৬৯ মন্ত্রে বলা হইয়াছে, "হে সজ্জন পালক ইন্দ্র! শত্রু হননের সময় তোমার আনন্দদায়ী সহায় মরুৎগণ তোমাকে হৃষ্ট করিয়াছিল। হে বর্ষণকারী ইন্দ্র! সে হব্য ও সোমরস সমুদয় দিয়া তোমাকে হৃষ্ট করিয়াছিল। যখন তুমি শত্রুদের দ্বারা অপ্রতিহত হইয়া স্তুতিকারক ও হব্যদাতা যজমানের জন্য দশ সহস্র শত্রুগণের উপদ্রব বিনাশ করিয়াছিলে" (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৯৯)।
এখানে দেখা যাইতেছে যে, স্তুতিকারক ও হব্যদাতা যজমানের জন্য ইন্দ্র শত্রু বিনাশ করেন। তখন শত্রু সংখ্যা ছিল দশ হাজার। এই যুদ্ধে ইন্দ্র বর্ষণকারী মূর্তি ধারণ করেন এবং মরুৎ তথা ঝড়-ঝঞ্ঝা তাঁহার সহায়ক ছিল।
আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখিতে পাই যে, হযরত মুহাম্মাদ (স) কুরায়শদের অত্যাচারে মক্কা হইতে মদীনায় হিজরতের পর পৌত্তলিক কুরায়শেরা মদীনায় বারংবার হামলা চালাইয়াছিল। তাহার মধ্যে বদরের যুদ্ধ, উহুদের যুদ্ধ, পরিখার যুদ্ধ ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ৬২৭ খৃস্টাব্দে কাফির কুরায়শরা দশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী লইয়া মদীনা আক্রমণ করে। তাহারা চতুর্দিক দিয়া মদীনা অবরোধ করিলে মুসলিমগণ আত্মরক্ষার্থে মদীনার চতুর্দিকে পরিখা খনন করেন। এই সময় হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড় এবং বৃষ্টি আরম্ভ হয়। ফলে ছাউনী ছিন্ন ভিন্ন হইয়া যায়। অগত্যা তাহারা পলায়ন করিতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধ ইতিহাসে আহযাবের যুদ্ধ বা পরিখার যুদ্ধ নামে খ্যাত। কুরআন পাকের তেত্রিশতম সূরার নবম আয়াতে এই যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহকে স্মরণ কর, যখন তোমাদের উপর শত্রুবাহিনী আক্রমণ করিতে আসিল, তখন আমি তাহাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু প্রবল করিয়াছিলাম এবং এক বাহিনী যাহা তোমরা দেখ নাই। তোমরা যাহা কর আল্লাহ তাহার সম্যক দ্রষ্টা" (৩৩:৯)।
বস্তুত আলোচ্য মন্ত্রের সহিত ইহার অপূর্ব মিল দেখা যাইতেছে। উক্ত অথর্ব বেদে ২০ কাণ্ড ৩ অনুবাক ৪র্থ সুক্তে ৬ষ্ঠ মন্ত্রেও উল্লিখিত হইয়াছে।
📄 বিভিন্ন যুদ্ধ অভিযান
ঋগ্বেদ ১ম মণ্ডল ৫৩ সুক্ত, ৮৮ মন্ত্রে বলা হইয়াছে, "হে ঐশ্বর্যবান সেনাপতি! তুমি যুদ্ধ হইতে যুদ্ধান্তরে গমন কর এবং বল প্রয়োগে দুর্গের পর দুর্গ ধ্বংস কর। তুমি নমনীয় মিত্রের সঙ্গে, দূরদেশস্থ ক্ষমার অযোগ্য প্রসিদ্ধ কপট ব্যক্তিকে হত্যা কর" (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ১০১)।
"হে রাজন! তুমি অতিথিগণকে আশ্রয়দানকারী, পুরুষের তেজস্বিতার দ্বারা হিংসুক ও আত্মসাৎকারীকে বধ কর। তুমি মার্গ তদন্তকারী প্রতিকূল দুষ্টগণ কর্তৃক সরল স্বভাব পুরুষগণ বেষ্টনকারী শত দুর্গকে চূর্ণ কর" (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ১০১; বেদ-পুরানে, ১১৩)।
উপরিউক্ত মন্ত্রে আলোচ্য ঋষির তিনটি পরিচয় পাই। এক, তিনি যুদ্ধ হইতে যুদ্ধে গমন করিবেন। দুই, দুর্গের অধিকারী চুক্তি ভংগকারী কপট ব্যক্তিগণের সহিত তাঁহার যুদ্ধ হইবে এবং তাহাদিগকে পর্যুদস্ত করিবেন। তিন, তাঁহার সেনাবাহিনীতে অতিথিগণকে আশ্রয়দানকারীরা থাকিবেন।
বস্তুত ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, হযরত মুহাম্মাদ (স) জীবনে যতবার ধর্মশত্রুগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছেন, তাহা পৃথিবীর আর কোন ঋষি বা পয়গাম্বর করেন নাই। তিনি স্বয়ং বদর, উহুদ, খন্দক, খায়বার, হুনায়ন, তায়েফ, তাবুক, বনু মুসতালিক, বনূ নাযীর, বন্ কুরায়যা, মক্কা বিজয় ইত্যাকার যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তাহা ছাড়া তাঁহার নির্দেশে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
তেমনি তিনি মদীনায় হিজরত করার পর মদীনার পৌত্তলিক, ইয়াহুদী, খৃস্টান প্রভৃতি সকল সম্প্রদায়ের লোকদের সহিত একটি চুক্তি সম্পাদন করেন। কিন্তু এক বৎসরের মধ্যেই ইয়াহুদীগণ বিশ্বাসঘাতকতা ও কপটতা করিয়া উক্ত চুক্তি ভঙ্গ করে। মদীনা ও খায়বরের ইয়াহুদীগণ বহু দুর্গের অধিকারী ছিল। তাহারা হযরত মুহাম্মদ (স)-এর বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্র ও সমরায়োজন চালাইতে থাকে। ফলে বনূ নাযীর, বনু কুরায়জা, বনু কায়নুকা ও খায়বারের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হযরত মুহাম্মাদ (স) কপট ও ষড়যন্ত্রকারী ইয়াহুদীদের সকল দুর্গ চূর্ণ করেন এবং তাহাদিগকে অপদস্ত করেন।
তেমনি মক্কা হইতে আগত হযরত মুহাম্মাদ (স) ও তাঁহার সহচরবৃন্দকে মদীনার মুসলমানগণ আশ্রয় দেন এবং সর্বোতভাবে সাহায্য করেন। তাই ইতিহাসে তাঁহারা 'আনসার' তথা সাহায্যকারী ও আশ্রয়দাতা হিসাবে খ্যাত। অতিথিগণকে আশ্রয়দাতা ও সাহায্যকারী আনসার বাহিনী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সঙ্গে সকল যুদ্ধে যোগদান করেন।
অতএব মন্ত্রে উল্লিখিত ঋষির তিনটি পরিচয়ই মুহাম্মাদ (স)-এর ভিতর পরিদৃষ্ট হইতেছে। তিনি ছাড়া দুনিয়ার অন্য কোন ঋষি বা নবীর ভিতর ইহা পাওয়া যায় না।
📄 মক্কা বিজয়ের সুসংবাদ
ঋগ্বেদ ২য় মণ্ডল ৫ম সুক্ত ৯ম মন্ত্রে বলা হইয়াছে:
"সহায় রহিত সুশ্রবা নামক রাজার সহিত যুদ্ধ করার জন্য যে বিংশ নরপতি ও ষাট হাজার অনুচর আসিয়াছিল, হে প্রসিদ্ধ ইন্দ্র! তুমি শত্রুদের অলক্ষ্যে রথচক্র দ্বারা তাহাদিগকে পরাজিত করিয়াছ” (কল্কি অবতার, পৃ. ১০২)।
এখানে লক্ষণীয় যে, ইন্দ্র যাঁহার সাহাযার্থে শত্রুগণকে পরাজিত করেন, তিনি সহায় রহিত অর্থাৎ অনাথ হইবেন। তাঁহার নাম সুশ্রুবা অর্থাৎ প্রশংসিত অর্থবোধক হইবে। তিনি রাজাও হইবেন। তাঁহার শত্রুসংখ্যা বিংশ নরপতিসহ ষাট হাজার নিরানব্বইজন হইবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দিতেছে যে, হযরত মুহাম্মাদ (স) অনাথ ছিলেন। মক্কায় তিনি সহায় রহিত ছিলেন। ফলে তিনি মাতৃভূমি ত্যাগ করিতে বাধ্য হন। ইতিহাস ইহাও বলিতেছে যে, তিনি একাধারে পয়গাম্বর ও রাজা ছিলেন। ইতিহাস আরও সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি যখন ইসলাম প্রচার শুরু করেন, তখন সমগ্র আরববাসীর সংখ্যা ষাট হাজার ছিল এবং বিশ গোত্রের বিশ গোত্রপতি ছিল। তাহারা প্রারম্ভে সকলেই ছিল হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর শত্রু।
অথর্ব বেদের ২০ কাণ্ড ৯ম অনুবাক ৩২ সুক্তের ১ম মন্ত্রে বলা হইয়াছে: "নরাশংস ষাট হাজার নব্বুইজন শত্রুর মধ্যে দৃষ্ট হইতেছে” (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ১০২-১০৩)। সুতরাং চতুর্বেদে উল্লিখিত নরাশংস ও সুশ্রবা যে একই ব্যক্তি এবং তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স) তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।
উল্লেখ্য, এই মন্ত্রে সুশ্রবা রাজর্ষি মুহাম্মাদ (স)-এর স্বর্গরাজ্য ইন্দ্র তথা আল্লাহ তা'আলার গায়বী মদদে ষাট হাজার নিরানব্বইজন শত্রুর উপর বিজয় লাভের সুসংবাদ দান করা হইয়াছে।