📄 মুণ্ডিত কেশ রুদ্র নেড়ে
শুক্ল যজুর্বেদের ষোড়শ অধ্যায়ে জনৈক রুদ্র নেড়ের প্রতি শতান্ত্রিক বার নমস্কার জ্ঞাপন করা হইয়াছে। এইভাবে বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত করিয়া তাহাকে নমস্কার জ্ঞাপন করা হইয়াছে। যেমন, "হে দুঃখনাশক জ্ঞানপ্রদ রুদ্র! তোমার ক্রোধের উদ্দেশ্যে নমস্কার। তোমার কান ও বাহুযুগলকে নমস্কার। হে রুদ্র! তোমার যে মঙ্গলময়, সৌম্য, পূন্যপদ শরীর আছে, হে গিরিশ! সেই সুখতম শরীরের দ্বারা আমাদের দিকে সুদৃষ্টি দাও। চির তরুণ সহজ সহস্রা নীলকণ্ঠের প্রতি আমার নমস্কার। তাঁহার যাহারা ভৃত্য, তাহাগিকেও আমি নমস্কার করিতেছি” (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৮৪-৮৫)।
এইসব বিশেষণ ও স্তুতি হইতে তিনটি লক্ষণ সুস্পষ্ট হইয়া ধরা দেয়। (১) তিনি দুঃখনাশক, জ্ঞানপ্রদ ও মঙ্গলময় হইবেন; (২) তাঁহার ভৃত্য তথা শিষ্য হইবে; (৩) তিনি হইবেন গিরিশ অর্থাৎ পর্বতে সিদ্ধিলাভ করিবেন।
আমরা দেখিতে পাই যে, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর মধ্যে এই তিনটি লক্ষণই পাওয়া যায়। কারণ, তিনি সারা বিশ্বের জন্য রহমত বা করুণারূপে আগমন করিয়াছেন বলিয়া কুরআনে উল্লিখিত হইয়াছে। তেমনি তাঁহার শিষ্য-সহচরগণ ইতিহাসখ্যাত। তাহা ছাড়া তিনি হেরা পর্বতে ধ্যানমগ্ন থাকিয়া সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন।
📄 যিনি মাতৃদুগ্ধ পান করেন নাই
সামবেদ, আগ্নেয় কাণ্ড, ৬৪ মন্ত্রে বলা হইয়াছে, "এই শিশুর ও এই তরুণের কাজ বড়ই বিচিত্র। সে স্তন্য পানের জন্য মায়ের কাছে যায় না। তাঁহার মাতার স্তন শূন্য। তবুও সে জন্মমাত্রই এই মহান দেবদূতের কার্যভার গ্রহণ করিল" (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৭৮-৭৯)।
বলা বাহুল্য, ঋষি বা পয়গাম্বরগণের ভিতর একমাত্র মুহাম্মাদ (স)-ই মাতৃস্তন্য পান করেন নাই, বরং তিনি ধাত্রীর স্তন্য পান করিয়াছেন। কারণ তিনি আরব সন্তান ছিলেন। আরবে তখন ধাত্রীপ্রথা চালু ছিল। কুলীন ঘরের মাতারা সন্তানগণকে নিজের স্তন্য পান না করাইয়া ধাত্রীস্তন্য পান করাইত। তাঁহার ধাত্রীমাতা ছিলেন বিবি হালীমা (রা)। অবস্থা এই হইয়াছিল যে, হযরত মুহাম্মদ (স) ইয়াতীম বলিয়া তাঁহাকে কোন ধাত্রীমাতা গ্রহণ করিতেছিল না। পক্ষান্তরে বিবি হালীমার নিজের শিশু থাকায় স্তনে দুধ কম থাকিত বলিয়া তাহাকে কেহ সন্তান দিল না। অগত্যা বিবি হালীমা মুহাম্মদ (স)-কেই গ্রহণ করিলেন। বিবি হালীমা বলেন, "আমি মুহাম্মাদ (স)-কে ঘরে নিয়া আসিলাম। তাঁহাকে দুধ পান করাইতে বসিয়াই বরকত, মঙ্গল ও কল্যাণের আগমন দেখিতে পাইলাম। আমার বুকে দুধের জোয়ার আসিয়া গেল।"
বস্তুত সামবেদের এই মন্ত্রটি দ্বারা একাধারে উক্ত ঋষি বা পয়গাম্বরের দেশ ও পরিচয় নির্ণীত হয়। পৃথিবীর ভিতর একমাত্র আরবদেশেই ধাত্রীপ্রথা চালু ছিল এবং সেখানকার অভিজাত ঘরের সন্তানেরা মাতৃস্তন্য পান না করিয়া ধাত্রীস্তন্য পান করিত। তাহাছাড়া একমাত্র মুহাম্মাদ (স)-কেই শৈশবে ও কৈশোরে "বক্ষবিদারণ" (শাক্ সাদর) করিয়া ঐশীদৌত্য পালনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। এমনকি শিশু মুহাম্মাদ (স) তাঁহার ধাত্রীভ্রাতার জন্য একটি স্তন্য নির্ধারিত রাখিয়া অপর স্তন্য হইতেই শুধু দুধ পান করিতেন। বিবি হালীমা (রা) এইসব ঘটনায় অত্যধিক বিস্মিত হইয়া বলিতেন, এই শিশু ভবিষ্যতে বিরাট কিছু হইবে।
সুতরাং একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, উক্ত মন্ত্রে নির্দেশিত ঋষি বা পয়গাম্বর আরবের হযরত মুহাম্মাদ (স) ভিন্ন অন্য কেহ নহেন।
📄 ঋগ্বেদে হযরত মুহাম্মদ (স)
ঋগ্বেদের অন্যূন ষোলটি মন্ত্রে নরাশংসের উল্লেখ রহিয়াছে। তাহা ছাড়া উহার বিভিন্ন স্থানে ঈলিত ঋষির উল্লেখ দেখা যায়। ঋগ্বেদের ১ম খণ্ড চতুর্দশ পৃষ্ঠার টীকায় ঈলিত-এর অর্থ বলা হইয়াছে স্তুত বা প্রশংসিত। অতএব নরাশংস ও দ্রুত ঈলিত সমার্থবোধক শব্দ। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা গিয়াছে যে, যেখানে নরাশংসের উল্লেখ করা হইয়াছে, উহার পরেই ঈলিত, কোথাও বা ঈলিত নাম ব্যবহৃত হইয়াছে। এই তিন শব্দের অর্থই স্তুত ও প্রশংসিত (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৯৪-৯৫)।
বস্তুত আরবী মুহাম্মাদ ও সংস্কৃত নরাশংস বা ঈলিত সমার্থক। তাই দেখা যায় যায়, বৈদিক শাস্ত্র ভবিষ্য পুরাণে নামবাচক শব্দ মুহাম্মাদ উল্লেখ করিয়া তাঁহার আগমন ও আবির্ভাবের
১২২ ভবিষ্যদ্বাণী করা হইয়াছে। ভবিষ্য পুরাণ প্রতিসর্গ পর্ব, ৩য় অধ্যায়, ৪১৯ পৃষ্ঠায় আছে : “এতসিন্নন্তরে ম্লেচ্ছ আচার্যে সমন্বিত। 'মহামদ' ইতিখ্যাত শিষ্যশাখ সমন্বিত” (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৯৮)। অর্থাৎ ইতিবাসরে ম্লেচ্ছ আচার্য যিনি মুহাম্মাদ নামে খ্যাত, তিনি বহু শিষ্যশাখা দ্বারা সমন্বিত হইলেন।
অল্লোপনিষদে উল্লিখিত আছে, “অল্লা জ্যৈষ্ঠং শ্রেষ্ঠং পরমং পূণঃ ব্রহ্মণ অল্লাম" হ্রাং অল্লাহ্র রসুল মহমদরকং বরস্য অল্লো অল্লাম" (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৯৯)। আশ্চর্য যে, অল্লোপনিষদে মুহাম্মাদকে আল্লাহ্র রাসূল বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে।
📄 দশ সহস্র শত্রুসেনা বেষ্টিত পরিখার যুদ্ধ
ঋগ্বেদে প্রথম মণ্ডল ৫৩ সুক্ত ৬৯ মন্ত্রে বলা হইয়াছে, "হে সজ্জন পালক ইন্দ্র! শত্রু হননের সময় তোমার আনন্দদায়ী সহায় মরুৎগণ তোমাকে হৃষ্ট করিয়াছিল। হে বর্ষণকারী ইন্দ্র! সে হব্য ও সোমরস সমুদয় দিয়া তোমাকে হৃষ্ট করিয়াছিল। যখন তুমি শত্রুদের দ্বারা অপ্রতিহত হইয়া স্তুতিকারক ও হব্যদাতা যজমানের জন্য দশ সহস্র শত্রুগণের উপদ্রব বিনাশ করিয়াছিলে" (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৯৯)।
এখানে দেখা যাইতেছে যে, স্তুতিকারক ও হব্যদাতা যজমানের জন্য ইন্দ্র শত্রু বিনাশ করেন। তখন শত্রু সংখ্যা ছিল দশ হাজার। এই যুদ্ধে ইন্দ্র বর্ষণকারী মূর্তি ধারণ করেন এবং মরুৎ তথা ঝড়-ঝঞ্ঝা তাঁহার সহায়ক ছিল।
আমরা ইতিহাসের পাতায় দেখিতে পাই যে, হযরত মুহাম্মাদ (স) কুরায়শদের অত্যাচারে মক্কা হইতে মদীনায় হিজরতের পর পৌত্তলিক কুরায়শেরা মদীনায় বারংবার হামলা চালাইয়াছিল। তাহার মধ্যে বদরের যুদ্ধ, উহুদের যুদ্ধ, পরিখার যুদ্ধ ইত্যাদি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ৬২৭ খৃস্টাব্দে কাফির কুরায়শরা দশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী লইয়া মদীনা আক্রমণ করে। তাহারা চতুর্দিক দিয়া মদীনা অবরোধ করিলে মুসলিমগণ আত্মরক্ষার্থে মদীনার চতুর্দিকে পরিখা খনন করেন। এই সময় হঠাৎ প্রচণ্ড ঝড় এবং বৃষ্টি আরম্ভ হয়। ফলে ছাউনী ছিন্ন ভিন্ন হইয়া যায়। অগত্যা তাহারা পলায়ন করিতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধ ইতিহাসে আহযাবের যুদ্ধ বা পরিখার যুদ্ধ নামে খ্যাত। কুরআন পাকের তেত্রিশতম সূরার নবম আয়াতে এই যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্র অনুগ্রহকে স্মরণ কর, যখন তোমাদের উপর শত্রুবাহিনী আক্রমণ করিতে আসিল, তখন আমি তাহাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু প্রবল করিয়াছিলাম এবং এক বাহিনী যাহা তোমরা দেখ নাই। তোমরা যাহা কর আল্লাহ তাহার সম্যক দ্রষ্টা" (৩৩:৯)।
বস্তুত আলোচ্য মন্ত্রের সহিত ইহার অপূর্ব মিল দেখা যাইতেছে। উক্ত অথর্ব বেদে ২০ কাণ্ড ৩ অনুবাক ৪র্থ সুক্তে ৬ষ্ঠ মন্ত্রেও উল্লিখিত হইয়াছে।