📄 ঐশ্বরিক রাজা
শুল্ক যজুর্বেদ ৩য় অধ্যায় ৩৫ সুক্তে বলা হইয়াছে: “আইস, আমরা ঐশ্বরিক রাজা সবিতু দেবের রাজ্যশাসন দৃশ্যকে ধ্যান করি, উহা আমাদের বুদ্ধিকে পরিচালিত করুক” (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৮৩)।
শুল্ক যজুর্বেদ ৪র্থ অধ্যায় ২৫ মন্ত্রে সবিতু দেবের অন্যান্য পরিচয় এইরূপ প্রদত্ত হইয়াছে: আমরা বিশ্বব্যাপক, মেধাবী, সত্যস্বরূপ, বিবিধ রত্নের ধারক, প্রেমাস্পদ, মননশীল, স্বর্ণদর্শী সবিতু দেবের অর্চনা করি। তাহার কিরণ নিখিল কর্মপ্রকাশের জন্য ঊর্ধ্বগগনে সকল বস্তু তুলিয়া
১১৮ ধরে না। হিরণ পাণি শোভন কর্ম সম্পন্ন সেই সবিতু দেব এখন জনগণের কল্পনার অতীতে বর্তমান। হে দেব! আমরা তোমাকে সকলের জন্য অর্চনা করি। বিশ্বব্যাপী সকলে তোমাকে হৃদয়ে ধারণ করুক। বিশ্বব্যাপী সকলকে তুমি সঞ্জীবিত কর (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৮৩)।
এইসব সুক্ত বা মন্ত্রে দেখা যাইতেছে যে, সেই মহান ঋষিকে নরাশংস, অগ্নি ও সবিতু নামে আহবান করা হইতেছে এবং যিনি এখনও কল্পনার অতীতে বিদ্যমান, তিনি শুধু ভারতের হইবেন এবং শুধু আর্যদের জন্য হইবেন না, বরং সমগ্র পৃথিবীর আর্য-অনার্য সকল মানবের ঋষি হইবেন। তেমনি বেদ পাঠ ও শ্রবণে যেমন কেবল ব্রাহ্মণ ছাড়া কোন মানুষের অধিকার নাই, কিন্তু তিনি দেশকাল পাত্রভেদে সকল মানুষকে ঐশীজ্ঞানে সঞ্জীবিত করিবেন।
বস্তুত আমরা দেখিতে পাই, হযরত মুহাম্মাদ (স) রাজা ছিলেন ও বিশ্বে ঐশী রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বিশ্বনবী অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বের জন্য নবী ছিলেন। বিশ্বের সকল স্তরের মানুষের জন্য তাঁহার প্রাপ্ত কুরআন পাঠ ও ইসলাম ধর্ম অবারিত রহিয়াছে।
মোটকথা, মন্ত্রগুলিতে উল্লিখিত প্রতিটি গুণ একমাত্র তাঁহার মধ্যে পাওয়া যাইতেছে, অন্য কোন ঋষি বা নবীর মধ্যে পাওয়া যায় না। কারণ হয় তাহারা আর্যাবর্তের আর্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নতুবা মধ্যপ্রাচ্যের বানু ইসরাঈলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
📄 মুণ্ডিত কেশ রুদ্র নেড়ে
শুক্ল যজুর্বেদের ষোড়শ অধ্যায়ে জনৈক রুদ্র নেড়ের প্রতি শতান্ত্রিক বার নমস্কার জ্ঞাপন করা হইয়াছে। এইভাবে বিভিন্ন গুণে গুণান্বিত করিয়া তাহাকে নমস্কার জ্ঞাপন করা হইয়াছে। যেমন, "হে দুঃখনাশক জ্ঞানপ্রদ রুদ্র! তোমার ক্রোধের উদ্দেশ্যে নমস্কার। তোমার কান ও বাহুযুগলকে নমস্কার। হে রুদ্র! তোমার যে মঙ্গলময়, সৌম্য, পূন্যপদ শরীর আছে, হে গিরিশ! সেই সুখতম শরীরের দ্বারা আমাদের দিকে সুদৃষ্টি দাও। চির তরুণ সহজ সহস্রা নীলকণ্ঠের প্রতি আমার নমস্কার। তাঁহার যাহারা ভৃত্য, তাহাগিকেও আমি নমস্কার করিতেছি” (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৮৪-৮৫)।
এইসব বিশেষণ ও স্তুতি হইতে তিনটি লক্ষণ সুস্পষ্ট হইয়া ধরা দেয়। (১) তিনি দুঃখনাশক, জ্ঞানপ্রদ ও মঙ্গলময় হইবেন; (২) তাঁহার ভৃত্য তথা শিষ্য হইবে; (৩) তিনি হইবেন গিরিশ অর্থাৎ পর্বতে সিদ্ধিলাভ করিবেন।
আমরা দেখিতে পাই যে, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর মধ্যে এই তিনটি লক্ষণই পাওয়া যায়। কারণ, তিনি সারা বিশ্বের জন্য রহমত বা করুণারূপে আগমন করিয়াছেন বলিয়া কুরআনে উল্লিখিত হইয়াছে। তেমনি তাঁহার শিষ্য-সহচরগণ ইতিহাসখ্যাত। তাহা ছাড়া তিনি হেরা পর্বতে ধ্যানমগ্ন থাকিয়া সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন।
📄 যিনি মাতৃদুগ্ধ পান করেন নাই
সামবেদ, আগ্নেয় কাণ্ড, ৬৪ মন্ত্রে বলা হইয়াছে, "এই শিশুর ও এই তরুণের কাজ বড়ই বিচিত্র। সে স্তন্য পানের জন্য মায়ের কাছে যায় না। তাঁহার মাতার স্তন শূন্য। তবুও সে জন্মমাত্রই এই মহান দেবদূতের কার্যভার গ্রহণ করিল" (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৭৮-৭৯)।
বলা বাহুল্য, ঋষি বা পয়গাম্বরগণের ভিতর একমাত্র মুহাম্মাদ (স)-ই মাতৃস্তন্য পান করেন নাই, বরং তিনি ধাত্রীর স্তন্য পান করিয়াছেন। কারণ তিনি আরব সন্তান ছিলেন। আরবে তখন ধাত্রীপ্রথা চালু ছিল। কুলীন ঘরের মাতারা সন্তানগণকে নিজের স্তন্য পান না করাইয়া ধাত্রীস্তন্য পান করাইত। তাঁহার ধাত্রীমাতা ছিলেন বিবি হালীমা (রা)। অবস্থা এই হইয়াছিল যে, হযরত মুহাম্মদ (স) ইয়াতীম বলিয়া তাঁহাকে কোন ধাত্রীমাতা গ্রহণ করিতেছিল না। পক্ষান্তরে বিবি হালীমার নিজের শিশু থাকায় স্তনে দুধ কম থাকিত বলিয়া তাহাকে কেহ সন্তান দিল না। অগত্যা বিবি হালীমা মুহাম্মদ (স)-কেই গ্রহণ করিলেন। বিবি হালীমা বলেন, "আমি মুহাম্মাদ (স)-কে ঘরে নিয়া আসিলাম। তাঁহাকে দুধ পান করাইতে বসিয়াই বরকত, মঙ্গল ও কল্যাণের আগমন দেখিতে পাইলাম। আমার বুকে দুধের জোয়ার আসিয়া গেল।"
বস্তুত সামবেদের এই মন্ত্রটি দ্বারা একাধারে উক্ত ঋষি বা পয়গাম্বরের দেশ ও পরিচয় নির্ণীত হয়। পৃথিবীর ভিতর একমাত্র আরবদেশেই ধাত্রীপ্রথা চালু ছিল এবং সেখানকার অভিজাত ঘরের সন্তানেরা মাতৃস্তন্য পান না করিয়া ধাত্রীস্তন্য পান করিত। তাহাছাড়া একমাত্র মুহাম্মাদ (স)-কেই শৈশবে ও কৈশোরে "বক্ষবিদারণ" (শাক্ সাদর) করিয়া ঐশীদৌত্য পালনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। এমনকি শিশু মুহাম্মাদ (স) তাঁহার ধাত্রীভ্রাতার জন্য একটি স্তন্য নির্ধারিত রাখিয়া অপর স্তন্য হইতেই শুধু দুধ পান করিতেন। বিবি হালীমা (রা) এইসব ঘটনায় অত্যধিক বিস্মিত হইয়া বলিতেন, এই শিশু ভবিষ্যতে বিরাট কিছু হইবে।
সুতরাং একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, উক্ত মন্ত্রে নির্দেশিত ঋষি বা পয়গাম্বর আরবের হযরত মুহাম্মাদ (স) ভিন্ন অন্য কেহ নহেন।
📄 ঋগ্বেদে হযরত মুহাম্মদ (স)
ঋগ্বেদের অন্যূন ষোলটি মন্ত্রে নরাশংসের উল্লেখ রহিয়াছে। তাহা ছাড়া উহার বিভিন্ন স্থানে ঈলিত ঋষির উল্লেখ দেখা যায়। ঋগ্বেদের ১ম খণ্ড চতুর্দশ পৃষ্ঠার টীকায় ঈলিত-এর অর্থ বলা হইয়াছে স্তুত বা প্রশংসিত। অতএব নরাশংস ও দ্রুত ঈলিত সমার্থবোধক শব্দ। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা গিয়াছে যে, যেখানে নরাশংসের উল্লেখ করা হইয়াছে, উহার পরেই ঈলিত, কোথাও বা ঈলিত নাম ব্যবহৃত হইয়াছে। এই তিন শব্দের অর্থই স্তুত ও প্রশংসিত (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৯৪-৯৫)।
বস্তুত আরবী মুহাম্মাদ ও সংস্কৃত নরাশংস বা ঈলিত সমার্থক। তাই দেখা যায় যায়, বৈদিক শাস্ত্র ভবিষ্য পুরাণে নামবাচক শব্দ মুহাম্মাদ উল্লেখ করিয়া তাঁহার আগমন ও আবির্ভাবের
১২২ ভবিষ্যদ্বাণী করা হইয়াছে। ভবিষ্য পুরাণ প্রতিসর্গ পর্ব, ৩য় অধ্যায়, ৪১৯ পৃষ্ঠায় আছে : “এতসিন্নন্তরে ম্লেচ্ছ আচার্যে সমন্বিত। 'মহামদ' ইতিখ্যাত শিষ্যশাখ সমন্বিত” (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৯৮)। অর্থাৎ ইতিবাসরে ম্লেচ্ছ আচার্য যিনি মুহাম্মাদ নামে খ্যাত, তিনি বহু শিষ্যশাখা দ্বারা সমন্বিত হইলেন।
অল্লোপনিষদে উল্লিখিত আছে, “অল্লা জ্যৈষ্ঠং শ্রেষ্ঠং পরমং পূণঃ ব্রহ্মণ অল্লাম" হ্রাং অল্লাহ্র রসুল মহমদরকং বরস্য অল্লো অল্লাম" (কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৯৯)। আশ্চর্য যে, অল্লোপনিষদে মুহাম্মাদকে আল্লাহ্র রাসূল বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে।