📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অতর্ব বেদের ভাষ্যে করবানী

📄 অতর্ব বেদের ভাষ্যে করবানী


অথর্ব বেদের ১০ম কাণ্ড ১ম অনুবাক ২য় সুক্ত ২৬ হইতে ৩৩ মন্ত্রে পুরুষ মেধযজ্ঞ বা কুরবানীর বর্ণনা রহিয়াছে। বৈদিক ধর্ম শাস্ত্রের নির্দেশিত পুরুষ মেধযজ্ঞের মূল ভাষ্য এই:
১০৮ "আদিকালে ব্রহ্মার দুই পুত্র ছিল। জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম অথর্ব ও কনিষ্ঠ পুত্রের নাম অঙ্গিরা। ব্রহ্মা ঐশী প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হইয়া জ্যেষ্ঠ পুত্র অথর্বকে বলি দিতে উদ্যত হইলেন। শাস্ত্রে উহাই 'পুরুষ মেধষজ্ঞ' নামে খ্যাত। অদ্যাবধি নরবলির স্থলে পশুবলি দ্বারা উহা পালিত হইতেছে। পশুবলি দেওয়ার সময় উক্ত পুরুষ মেধযজ্ঞের সুক্তগুলি পাঠ করার বিধান রহিয়াছে" (ডঃ বেদ প্রকাশ উপাধ্যায়, কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৭১)।
অথর্ব বেদের ১০ম কাণ্ড ১ম অনুবাক ২য় সুক্তে ২৬ হইতে ৩৩ মন্ত্রের অনুবাদ নিম্নে প্রদত্ত হইল (ডঃ বেদপ্রকাশ উপাধ্যায়, কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৭১):
২৬. অথর্ব তাহার মস্তক ও অন্তর ঐশী আদেশের সঙ্গে একান্ত গ্রথিত করিলেন। তখন ধর্মপরায়ণতা তাহার ললাটে আবর্তিত হইতেছিল।
২৭. অথর্বের মস্তক প্রভুর আবাসস্থল। উহা আত্মা, মস্তক ও আত্মার সর্বদিক দিয়া সংরক্ষিত ছিল।
২৮. উহার নির্মাণ উচ্চ এবং উহার প্রাচীরসমূহ সমান হউক বা না হউক, কিন্তু প্রভুকে উহার সর্বত্র দৃষ্ট হয়। যে ব্যক্তি প্রভুর আবাসস্থলকে চিনে, সে উহা জানে। কারণ সেখানে প্রভুকে স্মরণ করা হয়।
২৯. যে ব্যক্তি প্রচুর আধ্যাত্ম অমৃতে পরিপূর্ণ এই পবিত্র ধরাধামকে চিনে, ব্রহ্ম ও ব্রহ্মা তাহাকে অন্তর্দৃষ্টি, প্রাণ ও সন্তানাদি দান করেন।
৩০. যে ব্যক্তি এই পবিত্র গৃহকে অবহিত হয় এবং যাহার অন্তর্দৃষ্টি ও আত্মিক শক্তি বিদ্যমান, সে কখনও উহাকে ত্যাগ করে না। কারণ সেখানে প্রভুকে স্মরণ করা হয়।
৩১. দেবতাদের এই পবিত্র ধামের আটটি চক্রপরিক্রম ও নয়টি দ্বার আছে। উহা অপরাজেয় এবং উহা হিরন্ময়, অনন্ত জীবন ও স্বর্গীয় জ্যোতিতে সমাবৃত।
৩২. সেখানে হিরন্ময় পবিত্র আত্মা প্রতিষ্ঠিত আছে। উহা তিনটি স্তম্ভ ও তিনটি কড়িকাঠ দ্বারা নির্মিত, কিন্তু উহা ব্রহ্মাত্মার কেন্দ্রবিন্দু।
৩৩. ব্রহ্ম সেখানে অবস্থান করেন, উহা স্বর্গীয় প্রভায় সমুজ্জ্বল ও স্বর্গীয় আশীর্বাদে পরিপূর্ণ। এই ধাম মানুষকে হিরন্ময় পরমাত্মার জীবন দান করে এবং উহা অপরাজেয়।
বস্তুত কুরআন পাকের বর্ণনায় দেখা যায় যে, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর দুই পুত্র ছিলেন। জ্যেষ্ঠ পুত্রের নাম হযরত ইসমাঈল (আ) ও কনিষ্ঠ পুত্রের নাম হযরত ইসহাক (আ)। তিনি ঐশী প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হইয়া তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাঈল (আ)-কে কুরবানী দিতে উদ্যত হইয়াছিলেন। তখন মহাপ্রভু তাঁহাকে একটি স্বর্গীয় দুম্বা প্রদান করেন এবং ইসমাঈল (আ)-এর স্থলে তিনি উহাই কুরবানী করেন। এই প্রথা অদ্যাবধি মুসলমানরা পশু কুরবানীর দ্বারা পালন করিয়া আসিতেছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অথর্ববেদে হিজরত ও মক্কা বিজয়

📄 অথর্ববেদে হিজরত ও মক্কা বিজয়


অথর্ব বেদের ৭ম কাণ্ড, ৬ষ্ঠ অনুবাক, ১স সুক্তের ৩য় হইতে ১০ম শ্লোকে মহানবী (স)-এর হিজরত ও মক্কা বিজয় সম্পর্কে যাহা বলা হইয়াছে তাহা এই :
৩. হে গৃহগুলি! অনুজ্ঞার জন্য প্রার্থিত হইয়া প্রভৃত ধনযুক্ত হও। আমাদের মিত্রভূত হইয়া মধুর পদার্থের দ্বারা হৃষ্ট হও। হে গৃহ! আমরা দেশান্তর হইতে আসিয়াছি। আমাদের হইতে ভীত হইও না।
৪. হে গৃহগুলি! তোমরা প্রিয় ও সত্য বাক্য যুক্ত হও, শোভন ভাগ্য, অন্নযুক্ত ও হাস্যের দ্বারা সন্তোষযুক্ত হও, গৃহে যেন কেহ ক্ষুধার্ত না থাকে।
৫. হে গৃহগুলি! আমরা প্রবাস প্রত্যাগত। আমাদিগকে দেখিয়া ভীত হইও না।
৬. হে গৃহগুলি! এই প্রদেশে সুখে অবস্থান কর, সন্তান-সন্তুতিগণকে পোষণ কর। মঙ্গলজনক মনের সহিত আমি আবার আসিব। দেশান্তর হইতে প্রত্যাগত আমার অর্জিত সম্পদ দ্বারা তোমরা বহু হও।
৭. হে অগ্নি! শরীর শোষণরূপ নিয়ম পালন করিব, তোমার কাছে এইরূপ তপস্যা সাধন করিব।
৮. উক্ত তপস্যার দ্বারা অধীত বেদ শাস্ত্রাদি শ্রবণ করিয়া আমরা দীর্ঘজীবী ও সুমেধা যুক্ত হইব।
৯. সত্য পালক, প্রবৃদ্ধ বলযুক্ত, পুরজনের হিতকারী পুরোহিত এই অগ্নি প্রজাদের জয় করে।
১০. পৃথিবীর নাভিস্থানীয় উত্তর বেদীতে স্থাপিত এই অগ্নি অত্যন্ত দীপ্যমান হইয়া সংগ্রামেচ্ছ শত্রুদিগকে পদতলে স্থাপন করুক (ডঃ বেদপ্রকাশ উপাধ্যায়, কল্কি অবতার ও মোহাম্মদ সাহেব, পৃ. ৭৪)।
এক্ষণে আমরা উপরিউক্ত শ্লোকগুলি বিশ্লেষণ করিলে যেসব সত্য আমাদের সামনে উদঘাটিত হয় তাহা নিম্নরূপ:
(ক) প্রবাস প্রত্যাগত ব্যক্তিরা যখন স্বগৃহে ফিরিয়া আসে তখন গৃহবাসী আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশি সকলেই স্বভাবত আনন্দিত হয়। অথচ এখানে দেখা যাইতেছে যে, প্রবাস প্রত্যাগত ব্যক্তিগণ হইতে গৃহ তথা দেশবাসী ভীত ও সন্ত্রস্ত বিধায় তাহারা গৃহবাসীগণকে অভয় ও সান্ত্বনা দিতেছেন। ফলে ইহাই বুঝা যায় যে, গৃহ তথা দেশবাসিগণ তাহাগিদকে অন্যায়ভাবে দেশ ত্যাগে বাধ্য করিয়াছিল, আজ তাহারা দেশবাসীর উপর বিজয় লাভ করিয়া স্বগৃহে ফিরিয়া আসিয়াছেন। ফলে অন্যায়ভাবে বিতাড়নকারী গৃহবাসিগণ পতিশোধের আশংকায় ভীত ও সন্ত্রস্ত। তাই প্রবাস প্রত্যাগতগণ তাহাদিগকে অভয় ও সান্ত্বনার বাণী শুনাইতেছেন। এই অভয়বাণী পাইয়া গৃহ তথা দেশবাসিগণ তাহাদের প্রবাস প্রত্যাগত নেতার নিকট রোযা-নামাযের নিয়মনীতি পালন করার ও তাঁহার নির্ধারিত যাবতীয় তপস্যা সাধনের অঙ্গীকারপূর্বক আনুগত্য প্রকাশ করিতেছে, এমনকি তাঁহাকে তাহারা সর্বজয়ী অগ্নি বলিয়া সম্বোধনপূর্বক নিজেদের পরাভব ও হীনতা প্রকাশ করিতেছে।
বিশেষত লক্ষণীয় যে, সপ্তম শ্লোক বা সূত্রে বলা হইতেছে, 'হে গৃহগুলি! এই প্রদেশে সুখে অবস্থান কর ও সন্তান-সন্তুতি পোষণ কর। মঙ্গলজনক সম্পদের সহিত আমি আবার আসিব। দেশান্তর হইতে প্রত্যাগত আমার অর্জিত সম্পদ দ্বারা তোমরা সমৃদ্ধ হও।' এই বক্তব্য দ্বারা বুঝা যাইতেছে যে, তিনি আবার প্রবাসেই ফিরিয়া যাইবেন। অত:পর তিনি আরেকবার আসিবেন।
বস্তুত ইতিহাসের আলোকে এই বক্তব্যগুলি বিচার-বিশ্লেষণ করিলে বুঝা যায় যে, এই মহান নেতাটি ছিলেন হযরত মুহাম্মাদ (স)। তাওহীদের একত্ববাদ প্রচার ও অনুসরণের কারণে তাঁহার দেশবাসী তাঁহাকে ও তাঁহার অনুসারিগণকে অমানুষিক নির্যাতন ও নিপীড়ন চালাইয়া দেশত্যাগে বাধ্য করিয়াছিল। অগত্যা তাঁহারা জন্মভূমি মক্কা হইতে তিন শত মাইল দূরবর্তী মদীনা শহরে গিয়া প্রবাস জীবনযাপন করেন। মক্কাবাসিগণ সেখানেও তাহাদিগকে শান্তিতে থাকিতে দেয় নাই। হাজার হাজার সৈন্যসামন্ত নিয়া সেখানে গিয়া তাহাদিগকে কয়েকবার আক্রমণ করিয়াছে ও তাহাদের বিরুদ্ধে বিবিধ ষড়যন্ত্র জাল বিস্তার করিয়াছে। কিন্তু তাহাদের সকল হামলা ও ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হইয়াছে। অবশেষে প্রবাস জীবনের অষ্টম বছরে তিনি দশ হাজার সহচর লইয়া জন্মভূমি জয়ের অভিপ্রায়ে বহির্গত হন এবং অনায়াসে মক্কা বিজয় পর্ব সম্পন্ন করেন। ফলে স্বভাবতই মক্কাবাসী প্রতিশোধ গ্রহণের আশংকায় ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়। তখন তিনি ঘোষণা করেন, আজ আর কোন প্রতিশোধ নয়। আজ আমি সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করিতেছি। এই মহান ও উদার ঘোষণা শুনিয়া তাঁহার দেশবাসী স্বতস্ফুর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করে এবং তাঁহার আনুগত্য স্বীকার করে।
অতঃপর হযরত মুহাম্মাদ (স) মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং দুই বৎসর পর আবার তিনি মক্কায় গিয়া হজব্রত পালন করেন। ইতিহাসে ইহাই বিদায় হজ্জ নামে খ্যাত। এইজন্যই মন্ত্রে উক্ত নেতা বলিয়াছেন, আমি আবার ফিরিয়া আসিব।
১১১ মক্কা হইল পৃথিবীর নাভিস্থানীয় অক্ষে অবস্থিত এবং মদীনা উহার উত্তরদিকে অবস্থিত।
দশম মন্ত্রে বলা হইয়াছে, উক্ত নেতা সত্যের পালক, বলবান পুরোহিত এবং সংগ্রামেই শত্রুগণকে পদতলে আশ্রয়দানকারী। বলা বাহুল্য, হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর হিজরত ও মক্কা বিজয়ের ঘটনার সহিত এই মন্ত্রগুলির পরিপূর্ণ সামঞ্জস্য পরিদৃষ্ট হইতেছে। শ্রীযুত হরিমোহন বন্দোপাধ্যায় 'অল্লোপনিষদ'-এর অনুবাদ গ্রন্থে লিখয়াছেন যে, এই কা'বার উত্তরে মূলত মদীনায় হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর স্থিতির দিকে ইঙ্গিত করা হইতেছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ১. অশ্বারোহণ ও খড়গ ধারণ

📄 ১. অশ্বারোহণ ও খড়গ ধারণ


ভগবত পুরাণের দ্বাদশ স্কন্ধ, দ্বিতীয় অধ্যায়ে উনিশতম শ্লোকে উল্লেখ আছে যে, কল্কি অবতার দেবতা প্রদত্ত অশ্বে আরোহণ করিবেন এবং তরবারি দ্বারা দুষ্টের দমন করিবেন। এই দিক দিয়া দেখা যায় যে, মুহাম্মাদ (স)-ও আল্লাহ্ তরফ হইতে 'বোরাক' নামক একটি ঐশী অশ্ব লাভ করেন এবং উহাতে আরোহণ করিয়া তিনি মি'রাজ গমন করেন। তাহা ছাড়া হযরত মুহাম্মাদ (স) ঘোড়া ভালবাসিতেন। তাঁহার আরও সাতটি ঘোড়া ছিল। হযরত আনাস (রা) বলেন, আমি মহানবী (স)-কে অশ্বে আরোহণ করিয়া গলায় তরবারি ঝুলান অবস্থায় দেখিয়াছি।
হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর মোট নয়টি তরবারি ছিল (ক) বংশ-পরম্পরায় প্রাপ্ত সাতটি তরবারি; (খ) যুলফাকার নামক তলোয়ার; (গ) কলঙ্গ নামক তরবারি।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ২. জগত গুরু

📄 ২. জগত গুরু


ভাগবত পুরাণের উক্ত শ্লোকে কল্কি অবতারকে 'জগৎপতি' বলা হইয়াছে। উপদেশাবলী দ্বারা যিনি নিপতিত পৃথিবীকে উদ্ধার ও রক্ষা করেন, তাঁহাকে জগৎপতি বলা হয়। তিনি নির্দিষ্ট কোন জাতির গুরু নহেন। তিনি হইলেন সমগ্র বিশ্বের গুরু। এই দৃষ্টিকোণ হইতে দেখা যায় যে, কুরআনে হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে বিশ্বগুরুর দায়িত্ব পালনের আহবান জানাইয়া বলা হইয়াছে, হে মুহাম্মাদ! আপনি ঘোষণা করুন যে, আপনি সমগ্র বিশ্বের জন্য নবীস্বরূপ আগমন করিয়াছেন (সূরা আ'রাফঃ ১৫৮ আয়াত দ্র.)। তেমনি সূরা ফুরকানের প্রথম আয়াতে বলা হইয়াছে "মহিমান্বিত সেই প্রভু যিনি স্বীয় বান্দার উপর পবিত্র গ্রন্থ নাযিল করিয়াছেন যাহাতে তিনি সমগ্র বিশ্বের জন্য পাপ হইতে সতর্ককারী হন" (২৫: ১)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00