📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তাওরাত ও ইনজীলে মহানবী (স)

📄 তাওরাত ও ইনজীলে মহানবী (স)


আল্লাহ পাক কুরআন পাকে বলেন: الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَةِ وَالْإِنْجِيلِ
"যাহারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নবীর, যাহার উল্লেখ তাওরাত ও ইনজীল, যাহা তাহাদের নিকট আছে তাহাতে লিপিবদ্ধ পায়” (৭ঃ ১৫৭)।
يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ "তাহারা তাহাকে সেইভাবেই চিনে যেভাবে তাহারা নিজেদের সন্তানগণকে চিনে" (২:১৪৬)।
يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ "এবং সেইরূপ চিনে যেইরূপ চিনে তাহাদের সন্তাগণকে" (৬: ২০)।
উপরিউক্ত আয়াতদ্বয় হইতে স্পষ্ট জানা যায় যে, ইয়াহুদী ও নাসারাগণ রাসূলুল্লাহ (স)-এর সম্পর্কে পরিচয় তাহাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত ও ইনজীলে দেখিতে পাইতেছে। ফলে তাহারা তাঁহাকে সেইভাবেই চিনিতে পারিয়াছে যেভাবে তাহারা অনায়াসেই নিজেদের সন্তানদিগকে চিনিতে পারে।
নবী করীম (স)-এর নিকটতম পূর্ববর্তী নবী ছিলেন হযরত ঈসা (আ)। এই সম্পর্কে আল্লাহ তা'আলা কুরআন মজীদে বলেন: وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ لِبَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَى مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ فَلَمَّا جَاءَهُمْ بِالْبَيِّنَتِ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُبِينٌ
"স্মরণ কর, মারয়াম-তনয় 'ঈসা বলিয়াছিল, "হে বনী ইসরাঈল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসূল এবং আমার পূর্ব হইতে তোমাদের নিকট যে তাওরাত রহিয়াছে আমি তাহার সমর্থক এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসূল আসিবে আমি তাহার সুসংবাদদাতা। পরে সে যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ তাহাদের নিকট আসিল তখন তাহারা বলিতে লাগিল, ইহা তো এক স্পষ্ট জাদু” (৬১:৬)
এখানে দেখা যায় যে, হযরত ঈসা (আ) যেভাবে তাঁহার পূর্ববর্তী নবী হযরত মূসা (আ)-এর উপর অবর্তীর্ণ তাওরাত কিতাবকে সত্যায়িত করিলেন, তেমনি তাঁহার পরবর্তী রাসূল সম্পর্কে নাম উল্লেখ পূর্বক সুসংবাদ প্রদান করিলেন। বস্তুত আল্লাহ পাকের সত্য দীনের এককত্ব ও ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য তিনি প্রত্যেক নবীর মাধ্যমেই পূর্ববর্তী নবীর সত্যায়ন ও পরবর্তী সুসংবাদ প্রদানের ব্যবস্থা অনুসরণ করিয়াছেন।
যোহন সংকলিত ইনজীলের চতুর্দশ অধ্যায়ে ভবিষ্যতে আগমনকারী একজন পয়গাম্বরের সুসংবাদ প্রদান করা হইয়াছে। তাহাতে বলা হইয়াছে, "আমি স্বীয় পিতার কাছে দরখাস্ত করিব, তিনি তোমাদিগকে দ্বিতীয় 'ফারাকলিত' বখশিস করিবেন, যিনি সর্বদা তোমাদের সহিত থাকিবেন।.... কিন্তু সেই ফারাকলিত যিনি রুহুল কুদুস বা পবিত্র আত্মা যাহাকে আমার প্রভু প্রেরণ করিবেন। তিনি তোমাদিগকে সকল কিছু শিক্ষা দিবেন এবং যে সকল কথা আমি তোমাদিগকে শিক্ষা দিয়াছি তাহা তোমাদিগকে স্মরণ করাইয়া দিবেন (যোহন সংকলিত ইনজীলের চতুর্দশ অধ্যায় দ্র.)।
অতঃপর ইনজীলের পঞ্চদশ ও ষড়বিংশ অধ্যায়ে বলা হইয়াছে, "সুতরাং সেই 'ফারাকলিত' যাহাকে আমি পিতার নিকট হইতে তোমাদের নিটক প্রেরণ করিব অর্থাৎ-সত্যতার রূহ যাহা পিতার নিকট হইতে বাহির হইয়া আসিবে, সে আমার স্বপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিবে।"
এই সংকলনের ষোড়শ অধ্যায়ে বলা হইয়াছে, "তবে আমি তোমাদিগকে যথার্থই বলিতেছি, আমার চলিয়া যাওয়াই শ্রেয়। কারণ, আমি যদি না যাই, তাহা হইলে ফারাকলিত তোমাদের কাছে আসিবেন না। সুতরাং আমি গমন করিয়া তাহাকে তোমাদের নিকট পাঠাইয়া দিব। তিনি আগমন করিয়া পৃথিবীকে পাপ হইতে পবিত্র করিবেন, সততা ও ইনসাফ দ্বারা পৃথিবী পরিপূর্ণ করিবেন ও ময়লা-আবর্জনা হইতে নিস্তার প্রদান করিবেন। ...... আমি তোমাদের কাছে বহু কথা বলিব যাহা বহুলাংশে তোমরা বরদাশ্বত করিতে পারিবে না। কিন্তু সেই সত্যতার রূহ যখন আগমন করিবেন তিনি তোমাদের কাছে সকল কথা তুলিয়া ধরিবেন। কারণ, তিনি নিজের হইতে কিছুই বলিবেন না, বরং যাহা কিছু শুনিবেন তাহাই বলিবেন এবং তোমাদিগকে ভবিষ্যতের সংবাদাদি প্রদান করিবেন। তিনি আমার মর্যাদা তুলিয়া ধরিবেন। কারণ, তিনি আমার হইতেই সব কিছু পাইবেন এবং উহাই তোমাদিগকে দেখাইবেন" (উক্ত সংকলনের ষোড়শ অধ্যায় দ্র., বঙ্গানুবাদ-সীরাতুন্নবী, ৪খ, শুভ সংবাদ অধ্যায়, পৃ. ১৫৭১-৭২)।
লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, প্রচলিত ইনজীলের এই বাণীসমূহে যেই পয়গাম্বরের সুসংবাদ দান করা হইয়াছে, তাহাকেও ফারাকলিত নামে আখ্যায়িত করা হইয়াছে। এই শব্দটি ইবরানী অথবা সুরিয়ানী ভাষার। উহার আরবী অর্থ দাঁড়ায় মুহাম্মাদ ও আহমাদ। প্রাচীন গ্রীক ভাষায় এই শব্দের তরজমা করা হইয়াছে 'প্রিকিউলিস' শব্দ দ্বারা। ফারাকলিত ও প্রিকিউলিস উভয়ই সমার্থক। ফলে উহা দ্বারা ইসলামের পয়গাম্বরের সত্যতাই প্রমাণিত হয়। এই কারণেই খৃস্টান পণ্ডিতরা প্রিকিউলিটান প্রিকিউলিটাসে রূপান্তরিত করিয়াছেন। উহার অর্থ শান্তিদাতা। কিন্তু মুসলিম মনীষিগণ প্রাচীন দলীল-দস্তাবেয দ্বারা 'প্রিকিউলিস' শব্দটি সপ্রমাণিত করিয়া খৃস্টান পণ্ডিতদের স্তব্ধ করিয়াছেন। মূলত এই শাব্দিক ঝগড়াটাও নিষ্প্রয়োজন। কারণ হযরত ঈসা (আ)-এর ভাষা ছিল ইবরানী অথবা সুরিয়ানী, গ্রীক ভাষা নহে। সুতরাং তাঁহার ভাষায় 'ফারাকলিত' শব্দটি আরবী মুহাম্মাদ ও. আহমাদের সমার্থক। কালামে পাকও সাক্ষ্য দিতেছে যে, ঈসা (আ) তাঁহার উম্মতকে 'আহ্মাদ' নামক পয়গাম্বরের শুভাগমনের সুসংবাদ প্রদান করিয়াছেন।
"বলা বাহুল্য, যোহন সংকলিত ইনজীলে হযরত ঈসা (আ) তাঁহার পরবর্তী 'ফারাকলিত' (আহমাদ) নামক যে পয়গাম্বরের শুভাগমনের সুসংবাদ দিয়াছেন তাহার ইনজীলে বর্ণিত গুণাবলী ও কার্যধারার সহিত মিল দেখা যায়। ইনজীলের চতুর্দশ, পঞ্চদশ, ষোড়শ ও ষড়বিংশ অধ্যায়ে যাহা বলা হইয়াছে তাহা মোটামুটি এই:
১. আমি স্বীয় পিতার (সৃষ্টিকর্তার) নিকট দরখাস্ত করিব যেন তোমাদিগকে তিনি 'ফারাকলিত' বখশিশ করেন।
২. আমার পিতার প্রেরিত ফারাকলিত (আহমাদ) পবিত্র আত্মার অধিকারী হইবেন যিনি তোমাদিগকে সব কিছু শিক্ষা দিবেন এবং আমি তোমাদিগকে যাহা কিছু বলিয়াছি তাহা তোমাদিগকে স্মরণ করাইয়া দিবেন ও আমার স্বপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করিবেন।
৩. আমি তোমাদের নিকট হইতে গমন করিবার পর তিনি আসিবেন, অন্যথায় আসিবেন না।
৪. তিনি আগমন করিয়া পৃথিবীকে পাপমুক্ত করিবেন, সততা ও ইনসাফ দ্বারা পৃথিবী পরিপূর্ণ করিবেন ও পৃথিবীর যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা দূর করিবেন।
৫. আমি যেসব কথা বলিলে তোমরা উহা বহুলাংশে বরদাশত করিতে পারিবে না, তিনি আসিয়া তোমাদিগকে সেইসব কথাও বলিবেন। কারণ তিনি ইহা নিজের হইতে বলিবেন না, বরং তিনি যাহা কিছু শুনিবেন তাহাই বলিবেন এবং তোমাদিগকে ভবিষ্যতের সুসংবাদাদিও শুনাইবেন। তিনি আমার মর্যাদা তুলিয়া ধরিবেন (যোহন সংকলিত ইনজীলের চতুর্দশ, পঞ্চদশ, ষোড়শ ও ষড়বিংশ অধ্যায় দ্র.। বঙ্গানুবাদ, সীরাতুন্নবী, ৪খ, 'শুভ সংবাদ' অধ্যায়, পৃ. ১৫৭৩-৭৪)।
রাসূলে পাক (স)-এর জীবন ও কর্মধারা এবং কুরআন পাকে তদসংশ্লিষ্ট বর্ণনাসমূহের সহিত ইনজীলের উক্ত বর্ণণাগুলির পূর্ণাঙ্গ সাদৃশ্য বিদ্যমান। যেমন:
১. হযরত ঈসা (আ)-এর অন্তর্ধানের পর আল্লাহ পাক পরবর্তী রাসূল হিসাবে ফারাকলিত বা আহমাদ (স)-কে প্রেরণ করেন।
২. তাঁহার জীবন ছিল অত্যন্ত পূত পবিত্র। তিনি মানবজাতিকে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা প্রদান করিয়াছেন। তিনি তাহাদিগকে পাক-পরিশুদ্ধ করিয়াছেন। তিনি হযরত ঈসা (আ)-এর বিলুপ্ত সত্যধর্ম পুনরুদ্ধার করিয়া তাঁহার অনুসারিগণকে তাঁহার আসল শিক্ষা উপহার দিয়াছেন।
৩. হযরত ঈসা (আ)-এর অন্তর্ধানের সাড়ে পাঁচ শতাধিক বর্ষ পরে তাঁহার আবির্ভাব ঘটিয়াছে, অন্তর্ধানের আগে নহে।
৪. রাসূলে পাক (স) আবির্ভূত হইয়া পৃথিবীকে পাপমুক্ত করেন, সততা ও ইনসাফ দ্বারা পৃথিবী পরিপূর্ণ করেন এবং পৃথিবীর যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা হেদায়াতের স্রোতধারায় দূরীভূত করেন।
৫. যেহেতু রাসূলে পাক (স)-এর হাতে দীন পূর্ণত্বপ্রাপ্ত হইয়াছে, তাই হযরত ঈসা (আ)-এর সময়কার অপূর্ণ দীনের কথিত বাণীগুলি তাঁহাকে প্রচার করিতে হইয়াছে। তবে উহার কোন কিছুই তিনি নিজের তরফ হইতে বলেন নাই, বরং ওহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত বাণীগুলিই তিনি প্রচার করিয়াছেন। পরন্তু তিনি হযরত ঈসা (আ) ও তাঁহার মহিমান্বিত জননী হযরত মারয়াম (আ)-এর উপর আরোপিত মিথ্যা অপবাদগুলি খণ্ডন করিয়া তাঁহাকে আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। রাসূলে পাক (স) নিজেও বলিয়াছেন : আমি আমার ভাই হযরত ঈসা (আ)-এর দেওয়া সুসংবাদের মূর্ত প্রতীক।
ইনজীলে 'ফারাকলিত' সংক্রান্ত সুসংবাদ ছাড়াও নিজ অনুসারিগণকে হযরত ঈসা (আ) এই উপদেশ প্রদান করেন, “দেখ আমি স্বীয় পিতা স্রষ্টার তরফ হইতে উক্ত অঙ্গীকারকৃত ব্যক্তিকে তোমাদের নিকট পাঠাইতেছি। তাই যতক্ষণ পর্যন্ত ঊর্ধ্ব জগত হইতে তোমাদিগকে উক্ত শক্তি প্রদান না করা হইবে ততক্ষণ তোমরা জেরুসালেমে অবস্থান কর" (লুক সংকলিত 'ইনজীলের ৪২-৪৯ পৃষ্ঠা দ্র., বঙ্গানুবাদ সীরাতুন্নবী, ৪খ, পৃ. ১৫৭৬)।
লুক যদিও সেই প্রতিশ্রুত ব্যক্তি সম্পর্কে আর কিছু বলেন নাই, তথাপি তিনিই যে রাসূলে পাক (স) তাহাতে কোন সন্দেহের অবকাশ নাই। কারণ হযরত ঈসা (আ)-এর পর একমাত্র আবির্ভূত রাসূল ছিলেন হযরত মুহাম্মাদ (স)।
লুকের ইনজীলে বর্ণিত 'উক্ত আসমানী শক্তি আগমন করার পূর্ব পর্যন্ত জেরুসালেমে অবস্থান কর' বাক্যটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। উহাতে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর আগমনের পূর্ব পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসই কিবলা থাকিবে এবং তিনি আসার পর কিবলার পরিবর্তন ঘটিবে। কুরআন পাকে তাহাই বলা হইয়াছে : وَحَيْثُ مَا كُنْتُمْ فَوَلُّوا وُجُوهَكُمْ شَطْرَهُ وَإِنَّ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ لَيَعْلَمُونَ أَنَّهُ الْحَقُّ مِنْ
“তুমি যেখানেই থাক না কেন, তোমার মুখমণ্ডলকে মসজিদে হারামের দিকে রুজু কর এবং যাহারা আহলে কিতাব তাহারাও জানে যে, তাহাদের প্রতিপালকের নিকট হইতে এই ব্যবস্থা সত্য ও সঠিক” (২: ১৪৪)।
সাহাবায়ে কিরাম ও তাবিয়ীনের মাঝে যাঁহারা তাওরাত সম্পর্কে ভালভাবে অবহিত ছিলেন অথবা যে সকল ইয়াহুদী আলেম ইসলাম গ্রহণ করিয়াছিলেন তাঁহারা ভালভাবেই জানিতেন যে, রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে অতীত আসমানী কিতাবসমূহে বহু সুসংবাদ বিদ্যমান ছিল। হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস (রা) বিভিন্ন কিতাব অধ্যয়নের ব্যাপারে অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন। তিনি তাওরাতও ভালভাবে অধ্যয়ন করিয়াছেন। তিনি বলেন:
কুরআন পাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পরিচয় যেভাবে প্রদান করা হইয়াছে, তাওরাতেও ভাবী রাসূল সম্পর্কে সেই পরিচয়ই তুলিয়া ধরা হইয়াছে। যেমন কুরআন পাকে রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে বলা হইয়াছে :
إِنَّا أَرْسَلْتُكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا ৮৩ "আমি তোমাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও ভীতি প্রদর্শনকারী হিসাবে প্রেরণ করিয়াছি" (৪৮:৮)।
يَأَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْتُكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا ، وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرًا .
"হে নবী! আমি তোমাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা, ভীতি প্রদর্শক এবং আল্লাহ্র নির্দেশে তাঁহারই দিকে আহবানকারী ও সমুজ্জ্বল প্রদীপস্বরূপ প্রেরণ করিয়াছি” (৩৩:৪৫-৪৬)।
তাওরাতেও অনুরূপই বলা হইয়াছে: “হে নবী! আমি তোমাকে সুসংবাদদাতা এবং উম্মীদের আশ্রয়দাতা ও ভরসাস্থল করিয়া প্রেরণ করিয়াছি। তুমি সঠিক অন্তকরণের ও পাষাণ প্রকৃতির হইবে না, এমনকি বাজারে শোরগোল করিবে না। খারাপ আচরণের জবাবে তুমি খারাপ ব্যবহার করিবে না, বরং ক্ষমা ও অনুকম্পা প্রদর্শন করিবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তোমার পবিত্র অন্তকরণ দ্বারা দীনের যাবতীয় আবিলতা দূর না করিবেন এবং লোকদিগকে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' শিক্ষা দিয়া অন্ধ চোখ, বধির কান ও অবুঝ অন্তরকে সতেজ ও সজীব না করিবেন, ততক্ষণ তিনি তোমার প্রাণ হরণ করিবেন না"।
বলা বাহুল্য, কুরআন পাকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর চরিত্র, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বিভিন্নভাবে এই কথাগুলিই বলা হইয়াছে।
হযরত কা'ব আল-আহ্বার (র) ছিলেন একজন বিজ্ঞ ইয়াহূদী আলিম। তাফসীরে তাবারীতে আছে, প্রখ্যাত তাবিঈ হযরত আতা তাঁহাকে প্রশ্ন করিয়াছিলেন যে, তাওরাতে রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে কোন সুসংবাদ রহিয়াছে কি? তিনি তদুত্তরে বলিলেন, হাঁ। অতঃপর তিনি তাওরাতের সেই সুসংবাদের অংশ পাঠ করিয়া উহার অনুবাদ করিয়া শুনাইলেন। তখন তাওরাতের যে সকল কপি বিদ্যমান ছিল, তন্মধ্যে 'ইসাইয়াহ (Isaiah)-এর সংকলিত কিতাবে কিছুটা শাব্দিক পরিবর্তনসহ সেই ভবিষ্যদ্বাণী আজও পাওয়া যায়। উহার উপর নজর বুলাইলে স্পষ্টতই বুঝা যায় যে, হযরত কা'ব (র) ও হযরত আবদুল্লাহ' (রা)-এর বর্ণনায় উক্ত ভবিষ্যদ্বাণী কখনও সংক্ষেপে ও কখনও সবিস্তারে তুলিয়া ধরা হইয়াছে।
হযরত ইয়াসইয়া (আ)-এর কিতাবে এই ভবিষ্যদ্বাণী আছে, "দেখ, আমার যেই বান্দাকে আমি স্মরণ করিতেছি, সে আমার অতি প্রিয়। তাহার প্রতি আমি রাজি। আমি আমার প্রাণ তাহার ভিতর ফুঁকিয়া দিয়াছি। সে জনগণের সহিত ইনসাফ কায়েম করিবে। সে কখনও চীৎকার করিবে না, কখনও কণ্ঠস্বর সমুচ্চ করিবে না, কখনও সমঝোতাপূর্ণ নীরবতা ভঙ্গ করিবে না, কখনও বাজারে শোরগোল করিবে না ও প্রজ্জ্বলিত প্রদীপকে নির্বাপিত করিবে না। সে এমন এক শান্তিময় পরিবেশ ও ইনসাফ জারী করিবে যাহা দীর্ঘদিন স্থায়ী থাকিবে। যতদিন না এই পৃথিবীতে সত্যতার বীজ অংকুরিত হইবে ও সামগ্রিক বিশ্ব তাঁহারই শরীআতের পথ উন্মুক্ত
করিবে, ততদিন পর্যন্ত তাহার অন্তর্ধান ঘটিবে না। যেই মহান কৌশলী জগৎস্রষ্টা আসমান ও যমিন সৃষ্ট করিয়াছেন, যিনি সমগ্র পৃথিবীর বস্তুনিচয়কে প্রতিপালন করেন, যিনি পৃথিবীতে যাহা কিছু উদগত হয় তাহার প্রাণ সঞ্চার করেন, পৃথিবীতে যত কিছু চলাফেরা করে তাহার মাঝে চলৎশক্তি সৃষ্টি করেন, সেই বিশ্বস্রষ্টা আমি স্বয়ং তোমাকে সততা প্রতিষ্ঠার জন্য আহবান করিয়াছি। তাই এই কাজে আমিই তোমার হস্ত ধারণ করিব, আমিই তোমাকে মানুষের জন্য অঙ্গীকারস্থল ও লোকজনের জন্য আলোকময় করিব। ফলে তুমি অন্ধদের চোখে আলো জ্বালাইবে, আবদ্ধ লোকদিগকে বন্দীদশা হইতে মুক্তি প্রদান করিবে এবং যাহারা অজ্ঞতার অন্ধকারে গুমরাইয়া মরিতেছে, তাহাদিগকে মুক্তি দিবে।
"আমিই ইয়াহুদা। ইহাই আমার নাম। আমার শান-শওকতের কথা অন্যকে খুলিয়া বলিব না। সেই মর্যাদা ও ফযিলত আমার জন্য সংরক্ষিত। তাহা প্রস্তরের মূর্তিগুলির জন্য প্রযোজ্য হইতে মোটেই দিব না। আর তোমরা অবশ্যই দেখিবে, এই ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত হইতেছে এবং আমি নূতন নূতন কথা বলিতেছি।
"মোটকথা, আমি আছি ও তোমাদের কাছে বর্ণনা করিতেছি। হে সমুদ্র ভ্রমণকারী দল! তোমরা আল্লাহর জন্য নূতন প্রশস্তি বর্ণনা কর। তোমরা যাহারা সমুদ্রে আধিপত্য বিস্তার করিয়া চলিয়াছ ও সমুদ্রে বসবাস করিতেছ, প্রাণ খুলিয়া তাঁহারই গুণ বর্ণনা কর। মরুভূমি, মরূদ্যান, বন-প্রান্তর, এমনকি সবুজ-শ্যামল গ্রামে এই আওয়াজ বুলন্দ করিবে। দুর্গের অধিবাসীরাও প্রশস্তি গাহিবে, পাহাড়ের চূড়াতেও এই ধ্বনি সমুত্থিত হইবে, তাহারাই আল্লাহ্র ঐশ্বর্য প্রকাশ করিবে, সমুদ্র রাজ্যেও তাঁহারই প্রশংসা সমর্থিত হইবে। আল্লাহ পাক স্বীয় শক্তি বিকাশ করিবেন এবং বিজয়ী হইয়া স্বীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করিবেন। তিনি যুদ্ধের উদাত্ত আহবান জানাইবেন এবং শত্রুর উপর বিজয়ী হইবেন।
"আমি দীর্ঘদিন যাবত নিশ্চুপ আছি যেন নিজকে স্মরণ করিয়া আছি, তাই আমি উগ্র রমণীর মত চীৎকার করিব, প্রকম্পিত হইব, অবশেষে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়িব। আমি পাহাড় ও টিলা বিরাণ করিব, উহার সবুজ-শ্যামলিমা বিশুষ্ক করিব, উহার নদীগুলিকে ভরাট যমিন বানাইব ও পুকুরগুলি শুকাইয়া ফেলিব। অতঃপর অন্ধদিগকে এমন পথে নিয়া যাইব যে পথে তাহারা চলিতে অভ্যস্ত নহে। তাহাদের সম্মুখের অন্ধকারকে সমুজ্জ্বল ও অসমতল ভূমিকে সমতল করিয়া দিব। আমি তাহাদের সহিত এইসব ব্যবহার করিব ও তাহাদিগকে ছাড়িয়া দিব না।
"যাহারা প্রস্তরে খোদাই করা মূর্তির উপর ভরসা করে তাহারা বড়ই পশ্চাদপদ ও ক্ষতিগ্রস্ত। তাহারা স্বহস্তে গড়া মূর্তিকে উদ্দেশ্য করিয়া বলে, তোমরাই আমাদের সব। হে বধির! শোন। হে অন্ধ! চাহিয়া দেখ। দেখ, প্রকৃত অন্ধ কে? পক্ষান্তরে আমার প্রিয় বান্দা। তাহার মত নির্মল অনুগত আর কে আছে? তোমরা অনেক কিছু দেখিয়াও দেখ নাই। তোমাদের কান খোলা থাকা সত্ত্বেও কিছুই শুনিতেছ না। মহান আল্লাহ স্বীয় সত্যতার বিকাশ প্রিয় বান্দার দ্বারা ঘটাইবেন। তাহার শরীআতই হইবে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। আল্লাহ পাক তাঁহাকে ইজ্জত ও মর্যাদায় ভূষিত
করিবেন (হযরত যিশইয়-এর প্রচারিত তাওরাত সংকলনের ৪২তম অধ্যায়ের সুসংবাদ পর্ব দ্র.; সীরাতুন্নবী, পৃ. ১৫৭৯-৮০)।
ইয়াসইয়া (আ)-এর সুসংবাদ পর্বে হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর (রা) ও হযরত কা'ব-এর বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীসমূহও হুবহু মওজুদ রহিয়াছে।
ইয়াসইয়া (আ)-এর কিতাবে ইহাও রহিয়াছে যে, তিনি হইবেন উম্মীদের আশ্রয়দাতা রাসূল এবং যাহারা পথ সম্পর্কে অজ্ঞ ও বিধি-বিধান সম্পর্কে অনবহিত তিনি তাহাদিগকে পথ দেখাইবেন ও বিধিবিধান শিখাইবেন। উক্ত কিতাবে ইহাও বলা হইয়াছে যে, তিনি আল্লাহ্ বান্দা ও রাসূল। উক্ত কিতাবে আরও বলা হইয়াছে, আমার যেই বান্দা ও রাসূল আমি প্রেরণ করিব, আমি তাহার নাম রাখিয়াছি ভরসাকারী। উহাতে আরও বলা হইয়াছে, আমিই তাহার হস্ত ধারণ করিব ও তাহাকে হেফাজত করিব। সে কঠোর অন্তকরণের কঠিন প্রাণ হইবে না, সে দুর্বল ও অক্ষমদের উপর নির্যাতন চালাইবে না এবং অমঙ্গলের বদলা অপমান দ্বারা গ্রহণ করিবে না, বরং ক্ষমা করিবে।
মোটকথা, হযরত ইয়াসইয়া (আ) তাওরাতে বর্ণিত ভাবী রাসূলের পরিচয় ও গুণাবলীর সহিত কেবল রাসূলুল্লাহ (স)-এর হুবহু মিল দেখা যায়, অন্য কাহারও সহিত নহে। এক্ষণে উক্ত তাওরাতের বর্ণনার সহিত কুরআন-হাদীছের আলোকে রাসূলে পাক (স)-এর বর্ণনা মিলাইয়া দেখিলে এই দাবির সত্যতা সুস্পষ্ট হইয়া ধরা দিবে। কুরআন পাকে সূরা আহযাবে আল্লাহ তা'আলা বলেন:
"হে নবী! আমি তোমাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, পরন্তু আল্লাহ্ দিকে আল্লাহর অনুমোদিত আহবায়ক ও সমুজ্জ্বল প্রদীপরূপে প্রেরণ করিয়াছি।"
তেমনি সূরা ফাতির-এ তিনি বলেন: "নিশ্চয় আমি তোমাকে সত্যসহ সুসংবাদদাতা ও ভয়প্রদর্শক হিসাবে পাঠাইয়াছি"।
হযরত কা'ব (র) ও হযরত আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আমর (রা) বলেন যে, তাওরাতেও ঠিক এইসব আয়াতের প্রতিধ্বনি করিয়া বলা হইয়াছে: "হে নবী! আমি তোমাকে সুসংবাদদাতা ও উম্মীদের আশ্রয়স্থলরূপে প্রেরণ করিয়াছি ...... তুমি অন্ধদের চোখে আলো প্রদান করিবে এবং যাহারা অন্ধকারে গুমরাইয়া মরিতেছে তাহাদিগকে মুক্তি প্রদান করিবে। ...... আমিই তোমাকে মানুষের জন্য অঙ্গীকারস্থল এবং লোকজনদের জন্য নূর বানাইব।”
হযরত ইয়াসইয়া (আ)-এর সুসংবাদের প্রতিটি শব্দের প্রতি লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে যে, উহার সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর গুণাবলীর একটি নিবিড় মিল ও সংগতি রহিয়াছে। প্রথমত, উক্ত পয়গাম্বরকে বান্দা ও রাসূল বলা হইয়াছে। এই দুইটি গুণের সমন্বয় কেবল রসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র সত্তার বেলায়ই ঘটিয়াছে। তিনিই সর্বদা নিজেকে একই সঙ্গে আল্লাহর বান্দা ও রসূল বলিয়া ঘোষণা করিতেন, এমনকি তাঁহার প্রবর্তিত নামাযই পরিসমাপ্ত হয় না যতক্ষণ না তাশাহ্হুদের মাঝে পাঠ করা হয়:
وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ "আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, মুহাম্মদ (স) আল্লাহর বান্দা ও তাঁহার রাসূল"।
কালামে পাকের সূরা বানু ইসরাঈলে রাসূলুল্লাহ (স)-কে আল্লাহ তা'আলা বান্দা বলিয়া আখ্যায়িত করেন: سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلاً. "পবিত্র সেই সত্তা যিনি স্বীয় বান্দাকে নৈশ ভ্রমণ করাইলেন" (১৭:১)।
তেমনি আল্লাহ পাক সূরা বাকারায় বলেন: وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا . "যদি তোমাদের ইহাতে কোন সন্দেহ থাকে যাহা আমি আমার বান্দার প্রতি অবতীর্ণ করিয়াছি” (২: ২৩)।
রাসূলে পাক (স) উভয় হাঁটু মোবারক দাঁড় করিয়া বসিয়া আহার গ্রহণ করিতেন। ইহার কারণস্বরূপ তিনি বলেন: "আমি আল্লাহ পাকের বান্দা। তাই সেইভাবেই আহার গ্রহণ করি যেভাবে একজন ভৃত্য আহার করে।"
ইয়াসইয়া (আ)-এর তাওরাতে ভাবী পয়গাম্বরকে 'রাসূল' বলা হইয়াছে। আল-কুরআনে আল্লাহ পাক মুহাম্মাদ (স)-কে 'রাসূল' বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন। তিনি বলেন: يَسْتَغْفِرْ لَكُمْ رَسُولُ اللَّهِ. "আল্লাহ্র রাসূল তোমাদের জন্য মাগফেরাত চাহিবেন” (৬৩:৫)।
কুরআন পাকে ইহা ছাড়াও প্রায় বিশটি স্থানে মুহাম্মদ (স)-কে রাসূল উপাধিতে বিভূষিত করা হইয়াছে। এমনকি হযরত ঈসা (আ) তাঁহার পরবর্তী নবী সম্পর্কে যে সুসংবাদ দিয়াছেন, তাহাতেও তিনি তাঁহাকে রাসূল বলিয়াছেন। যেমন: وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يُبَنِي إِسْرَا مِيْلَ إِنَّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُّصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَى مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ. "স্মরণ কর, যখন মরিয়মের পুত্র ঈসা বানু ইসরাঈলগণকে বলিল, আমি আল্লাহ্র রাসূল হিসাবে তোমাদের নিকট আসিয়াছি। আমি আমার সামনে উপস্থিত তাওরাতকে সত্যায়নকারী 'এবং এমন এক রাসূল সম্পর্কে সুসংবাদদাতা যিনি আমার পরে আসিবেন, তাহার নাম আহমাদ" (৬১:৬)।
এভাবে সূরা আহযাবে আল্লাহ পাক বলেন: لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ. ৮৭ "অবশ্যই তোমাদের জন্য আল্লাহ্র রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ রহিয়াছে” (৩৩: ২১)।
ইয়াসইয়া (আ)-এর ভবিষ্যদ্বাণীতে এই ইংগিতও প্রদান করা হইয়াছে যে, সেই-রাসূল কীদার ইবন ইসমাঈল (আ)-এর বংশে জন্মগ্রহণ করিবেন। কীদার ইবন ইসমাঈল (আ)-এর বংশই হইল বিখ্যাত কুরায়শ বংশ। কীদারের বাসস্থানই হইল মক্কা মুআজ্জমা। তাওরাতে বলা হইয়াছে:
"কে সেই সত্যবাদীকে পূর্বদেশ হইতে আর্বিভূত করিবেন এবং স্বীয় নিকটতম সান্নিধ্যে আহবান করিবেন। কে তাহার সামনে উম্মতগণকে তুলিয়া ধরিবেন ও বাদশাহদের উপর বিজয়ী করিবেন এবং কে অবিশ্বাসিগণকে তাহার তরবারির সামনে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণা ও উড়ন্ত ভূষির মত করিবেন"।
বলা বাহুল্য, এই সমস্ত বৈশিষ্ট্যই রাসূলুল্লাহ (স) সম্পর্কে প্রযোজ্য। তিনি তাঁহার জাতির দ্বারা 'আল-আমীন' খেতাবে ভূষিত হন। তাওরাতের পরিভাষায় পূর্বদেশ হইল আরব দেশ (আরদুল কুরআন)। তাঁহার ও তাঁহার উম্মতগণের হাতে দেশ-বিদেশের রাজা-বাদশাহগণ পরাজিত হইয়াছেন এবং তাঁহার তরবারির সামনে কাফের-মুশরিকগণ ধূলিকণার মত উড়িয়া গিয়াছে। পৃথিবীর ইতিহাস ইহার সাক্ষী।"
ইয়াসইয়ার ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হইয়াছে, "আমার সেই বান্দাকে আমি স্মরণ করিয়া রাখিয়াছি, আমিই তাহার হস্ত ধারণ করিব ও-তাহাকে হেফাজত করিব। সে কঠোর অন্তকরণ বিশিষ্ট পাষাণ হৃদয় হইবে না। সে অমঙ্গলের বদলা অমঙ্গল দ্বারা গ্রহণ করিবে না, বরং ক্ষমা করিবে।” (ইয়াসইয়া) প্রচারিত তাওরাত সংকলনের ৪২তম অধ্যায়ের 'সুসংবাদ পর্ব', সীরাতুন্নবী, পৃ. ১৫৮৩)।
আশ্চর্য যে, কালামে পাকের বিভিন্ন স্থানে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ব্যাপারে এইসব কথাই বলা হইয়াছে এবং তাঁহার সমগ্র জীবন-চরিত উক্ত গুণাবলীরই ধারক ও বাহকরূপে ধিরাজ করিতেছে। যেমন আল্লাহপাক বলেন:
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَانْفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ. "আল্লাহর অনুগ্রহে তুমি বিনম্র অন্তকরণের হইয়াছ। যদি তুমি পাষান হৃদয় হইতে তাহা হইলে লোকসমাজ তোমার নিকট হইতে সরিয়া যাইত" (৩: ১৫৯)।
ادفع بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيُّ حَمِيمٌ.
"উত্তম আচরণ দ্বারা অধম আচরণের বদলা নাও। তাহা হইলে তোমার ও তাহার ভিতর যে শত্রুতা বিদ্যমান উহা বন্ধুত্বে পরিণত হইবে" (৪১ঃ ৩৪)।
يأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلَغَ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَّبِّكَ وَإِنْ لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَغْتَ رِسَالَتَهُ.
"হে রাসূল! তোমার উপর যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে তাহার প্রচার কর। যদি না কর' তবে তো তুমি তাঁহার বার্তা প্রচার করিলে না" (৫ : ৬৭)।
তাহা ছাড়া তায়েফের ঘটনা, হুদায়বিয়ার সন্ধি, মক্কা বিজয়, মুনাফিকদের সহিত আচরণ, বদরের যুদ্ধ বন্দীদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন ইত্যাকার তাঁহার জীবনেতিহাসের প্রতিটি পাতায়ই তাওরাতের বর্ণিত উক্ত চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের জ্বলন্ত স্বাক্ষর বিদ্যমান।
তাওরাতের ভবিষ্যদ্বাণীতে বলা হইয়াছে, তিনি চীৎকার করিবেন না। স্বীয় আওয়াজ বুলন্দ করিবেন না। বাজারে কখনও শোরগোল করবেন না [প্রচলিত তাওরাত, ৪২তম অধ্যায়, সুসংবাদ পর্ব। ইয়াসইয়া (আ) প্রচারিত (সীরাতুন্নবী, ১৫৮০-৮২]।
তিরমিযী ও আবু দাউদে হযরত আয়েশা (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, "রাসূলুল্লাহ (স) অপ্রিয়ভাষী ছিলেন না, এমনকি বাজারেও শোরগোল করিতেন না।"
তাওরাতে আছে, আল্লাহ বলেন: "আমি তাঁহার প্রতি রাজী থাকিব।"
সূরা মাইদা, সূরা তাওবা, সূরা মুজাদালা ও সূরা বাইয়েনা'য় আল্লাহ পাক হযরত মুহাম্মাদ (স) ও তাঁহার সহচরদের সম্পর্কে বলেন: “আল্লাহ তাহাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তাহারাও তাঁহাতে সন্তুষ্ট” (৫ : ১১৯; ৯ : ১০০; ৫৮ : ২২; ৯৮ : ৮)।
শামায়েলে তিরমিযীতে আছে যে, হযরত আয়েশা (রা) বলেন: 'রাসূলুল্লাহ (স) কখনও কাহারও উপর নিজের জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ করেন নাই। তিনি খারাপের বদলা খারাপ দ্বারা নিতেন না, বরং ক্ষমা করিয়া দিতেন। তিনি স্বহস্তে কাহাকেও বধ করেন নাই। হযরত আলী (রা) বলেন: তিনি ছিলেন সহাস্য আনন, নম্র চরিত্র এবং দয়ার্দ্র স্বভাবের অধিকারী। তিনি কঠোর মেযাজ ও সংকীর্ণ অন্তরের লোক ছিলেন না।
বলা বাহুল্য, হযরত ইয়াসইয়া (আ)-এর বর্ণিত তাওরাতের ভবিষ্যদ্বাণীর পয়গাম্বরের চরিত্রের সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই সব চরিত্রের হুবহু মিল রহিয়াছে।
হযরত ইয়াসইয়া (আ) ভাবী নবীর কার্যধারা সম্পর্কে উল্লেখ করিয়াছেন যে, "তিনি এমন ইনসাফ কায়েম করিবেন যাহা চিরকাল টিকিয়া থাকিবে" (ইয়াসইয়া প্রচারিত কিতাবের ৪২তম অধ্যায়, সুসংবাদ পর্ব; সীরাতুন্নবী পৃ. ১৫৮০-৮১)।
বস্তুত রাসূল পাক (স) সর্বশেষ পয়গাম্বর হিসাবে দুনিয়ার বুকে আল্লাহ পাকের নির্দেশিত যে ইনসাফের হুকুমত কায়েম করেন তাহার জের কিয়ামত পর্যন্ত চলিবে এবং কোথাও না কোথাও উহার কম-বেশি প্রভাব বিদ্যমান থাকিবে। আল্লাহ পাক তাঁহার হাতেই দীনের পূর্ণতা সাধন করিয়া উক্ত পূর্ণাঙ্গ দীন ও ইনসাফের বিধানকে কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য মনোনীত করিয়াছেন। যেমন আল্লাহ পাক বলেন :
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَاَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِيْنًا . ৮৯ "আজ আমি আমার দীনকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করিলাম ও আমার নেয়ামতকে তোমাদের উপর পূর্ণ করিলাম এবং ইসলামকেই তোমাদের একমাত্র দীন হিসাবে মনোনীত করিলাম" (৫:৩)।
তাওরাতের ভবিষ্যদ্বাণীতে ইহাও বলা হইয়াছে, "সকল সামুদ্রিক সীমা অতিক্রম করিয়া তাঁহার শরীআত পরিব্যাপ্ত হইবে।"
নিঃসন্দেহে রাসূলে পাক (স)-এর এই শরীআত লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর, 'ভূমধ্য সাগর, আটলান্টিক মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়াছে, এমনকি ভারত মহাসাগর ও কৃষ্ণ সাগরের উত্তাল তরঙ্গ অতিক্রম করিয়াছে। এই শরীআতের আলোকে সমুজ্জ্বল হইয়াছে অনেক দেশ ও অগণিত দ্বীপপুঞ্জ।
বলা বাহুল্য, রাসূলুল্লাহ (স)-এর পূর্ববর্তী নবী হযরত ঈসা (আ)-এর শরীআত সম্পর্কে এই ভবিষ্যদ্বাণী এজন্য প্রযোজ্য নহে যে, তাঁহার জীবদ্দশায় তাঁহার শরীআত না সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে, না উহা এরূপ সর্বত্র পরিব্যাপ্ত হইয়াছে। পরন্ত তাঁহার শরীআত পূর্ণত্ব প্রাপ্তও হয় নাঁই।
ইয়াসইয়া (আ)-এর তাওরাতের ভবিষ্যদ্বাণীতে উক্ত ভাবী নবীকে আল্লাহ পাক এই প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন, "আমিই তোমার হস্ত ধারণ করিব এবং আমিই তোমার হেফাজত করিব"।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এই প্রতিশ্রুতি রাসূলে পাক (স)-এর ক্ষেত্রে সর্বাধিক প্রযোজ্য। চতুর্দিকে দুশমন পরিবেষ্টিত অবস্থায় তিনি যখন নির্ভয়ে আল্লাহ্ দীন প্রতিষ্ঠার জন্য অগ্রসর হন, তখন একমাত্র আল্লাহ পাকই অগণিত শত্রুর উপর তাঁহাকে বিজয়ের পর বিজয় দান কুরিয়াছেন এবং তাঁহাকে হত্যার বহু ষড়যন্ত্র ও হামলা হইতে তিনিই রক্ষা করিয়াছেন। যেমন সূরা ইসরায় বলা হইয়াছে:
وَاِذْ قُلْنَا لَكَ اِنَّ رَبَّكَ اَحَاطَ بِالنَّاسِ .
“(হে মুহাম্মদ) যখন আমি তোমাকে বলিলাম যে, তোমার প্রতিপালক তোমার চতুর্দিকের উদ্যত হস্তসমূহ প্রতিহত করিয়াছেন" (১৭:৬০)।
শত্রু পরিবেষ্টিত মক্কী জীবনে আল্লাহ পাক রাসূলুল্লাহ (স)-কে হিজরত পূর্বকাল পর্যন্ত বারংবার শত্রুর হাত হইতে এভাবেই রক্ষা করিয়াছেন, এমনকি হিজরত পরবর্তী জীবনেও খোদায়ী মদদের এই ধারা সর্বক্ষেত্রে অব্যাহত ছিল। যেমন সূরা ত্বরে বলা হইয়াছে:
وَاصْبِرْ لِحُكْمِ رَبِّكَ فَاِنَّكَ بِاَعْيُنِنَا
"স্বীয় প্রতিপালকের নির্দেশের জন্য ধৈর্যের সহিত অপেক্ষা কর, তুমি আমার প্রহরায় রহিয়াছ” (৫২:৪৮)।
وَاللّٰهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ .
৯০ "আল্লাহ তোমাকে মানুষের বিরাগ হইতে রক্ষা করিবেন" (৫ঃ ৬৭)।
ঠিক এই কারণে রণাঙ্গনে যখন সাহাবায়ে কিরাম (রা) জীবন বাজি রাখিয়া রাসূলুল্লাহ (স)-কে হেফাজতের জন্য তাঁহার চতুষ্পার্শে বেষ্টনী তৈরি করিতেন, তখন তিনি বলিতেন, তোমরা সরিয়া গিয়া নিজ নিজ দায়িত্ব পালন কর। আমাকে হেফাজতের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ পাক গ্রহণ করিয়াছেন।
ইয়াসইয়া (আ)-এর সুসংবাদে ইহাও বলা হইয়াছে, "আমি তোমাকে মানুষের জন্য অঙ্গীকার ও জাতির জন্য নূর হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করিব। তুমি অন্ধজনের চক্ষু খুলিয়া দিবে, বন্দীগণের বন্দীদশা মুক্ত করিবে ও যাহারা অন্ধকারে ডুবিয়া রহিয়াছে তাহাদিগকে আলো দান করিবে।"
বস্তুত ইতিহাস সাক্ষী যে, রাসূলে পাক (স)-এর কর্মধারার সহিত উক্ত সুসংবাদের হুবহু মিল দেখা যাইতেছে। তাই কুরআন পাকও সাক্ষ্য প্রদান করিতেছে: الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهُهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبْتَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ أَضْرَهُمْ وَالْأَغْلُلَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ .
"যাহারা উম্মী নবীর অনুসরণ করে, যাহার উল্লেখ তাহারা তাওরাত ও ইনজীলে লিখিতভাবে পাইয়াছে, সে তাহাদিগকে নেক কাজের নির্দেশ দেয়, পাপ কাজ হইতে বিরত রাখে, উত্তম জিনিস তাহাদের জন্য হালাল করে, অপবিত্র বস্তু তাহাদের জন্য হারাম করে ও তাহাদেরকে তাহাদের গুরভার বন্ধন হইতে মুক্ত করে। তাই যাহারা তাহার প্রতি ঈমান আনিয়াছে, সম্মান করিয়াছে-ও তাহাকে সাহায্য করিয়াছে এবং যে নূর তাহার সহিত নাযিল হইয়াছে উহার অনুসরণ করে তাহারাই সফলকাম" (৭:১৫৭)।
কুরআন পাকে রাসূলুল্লাহ (স)-কে বারংবার নূর হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। যেমন সূরা আ'তাফে বলা হইয়াছে, "যাহারা এই নূরের অনুসরণ করিবে২ (৭: ১৫৭)। وداعيا إلى الله باذنهِ وَسَرَاجًا منيرا .
সূরা আহযাবে বলা হইয়ছি, "তুমি আল্লাহ্র তরফ হইতে তাঁহারই দিকে আহবানকারী ও প্রদীপ্ত প্রদীপস্বরূপ প্রেরিত হইয়াছ" (৩৩: ৪৬)।
وَالنُّورِ الَّذِي أَنْزَلْنَا "এবং সেই নূরের উপর ঈমান আন যাহা আমি অবতীর্ণ করিয়াছি" (৬৪৪৮)।
كتُبُ أَنْزَلْتُهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَتِ إِلَى النُّورِ .
"এই কিতাব আমি তোমার কাছে এই জন্য প্রেরণ করিয়াছি যেন তুমি মানুষকে অন্ধকার হইতে আলোর পথে বাহির করিয়া আন" (১৪:১)।
ইয়াসইয়া (আ)-এর সুসংবাদে ইহাও বলা হইয়াছে, "ভাবী পয়গাম্বর পরিপূর্ণ তাওহীদের প্রচারক, মূর্তি বিনাশক ও বাতিল পূজারীদের দুশমন হইবেন, এমনকি তিনি মূর্তিপূজক কাফির ও মুশরিকদের চরমভাবে পরাজিত করিবেন।"
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাসূলে পাক (স)-ই পূর্ণাঙ্গ তাওহীদের প্রচারক ছিলেন। তিনিই মূর্তিপূজার অবসান ঘটাইয়াছেন, মূর্তি ধ্বংস করিয়াছেন, মূর্তিপূজকদের পরাজিত করিয়া ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করিয়াছেন ও বাতিল পূজারীগণকে চিরতরে শায়েস্তা করিয়াছেন। মোটকথা যথার্থ তাওহীদের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা তিনিই জগদ্বাসীকে দিয়াছিলেন এবং সর্ব প্রকার শেরেক- বিদয়াতের তিনি, মূলোৎপাটন করিয়াছেন।
আগমনকারী রাসূল সম্পর্কে তাওরাতে অবশেষে বলা হইয়াছে, "তিনি হইবেন যোদ্ধা ও তরবারিধারী। তিনি বাতিল পূজারীদের বিরুদ্ধে তরবারি ধারণ করিবেন।" উহাতে অপর এক জায়গায় বলা হইয়াছে, "খোদাওন্দ এক বাহাদুরের মত আবির্ভূত হইবেন। তিনি যোদ্ধা ব্যক্তির মত স্বীয় শৌর্যকে বিকশিত করিবেন। হাঁ, তিনি যুদ্ধের প্রতি আহবান জানাইবেন এবং তিনি স্বীয় দুশমনদের উপর বিজয়ী হইবেন।"
পরবর্তী নবী-রাসূলদের ভিতর একমাত্র রাসূলুল্লাহ (স)-এর ক্ষেত্রেই তাওরাতের উক্ত ভবিষ্যদ্বাণী হুবহু প্রযোজ্য। তিনিই বদর, উহুদ, হুনায়ন, খন্দক ইত্যাকার বড় বড় যুদ্ধের সিপাহসালার ছিলেন। তিনিই বাতিল পূজারীদের সম্মিলিত শক্তিকে পরাভূত ও পর্যুদস্ত করিয়া আল্লাহর সত্যদীনের ঝাণ্ডা বুলন্দ করেন। তিনি বহু ক্ষুদ্র দল লইয়া বিশাল বিশাল বাহিনীকে বিপর্যস্ত করার মাধ্যমে আল্লাহর অসীম রহমত ও কুদরতের প্রকাশ ঘটান। তাওরাতে অন্যত্র বলা হইয়াছে, "আরব মুরু ও উহার বস্তির বাসিন্দা ও বেদুঈনদের নিকট তিনি স্বীয় আহবান বুলন্দ করিবেন।" এই ভবিষ্যদ্বাণীও সুস্পষ্ট বলিয়া দেয় যে, মরু ভাস্কর হযরত মুহাম্মাদ (স)-ই আরবে জন্মগ্রহণ করেন ও উহার বেদুঈন বাসিন্দাগণকে ইসলামের পথে আহবান করেন। তিনিই ছিলেন উম্মীদের মধ্য হইতে উম্মীদের জন্য আল্লাহ্র মনোনীত উম্মী নবী।
হযরত ইয়াসইয়া (আ)-এর বর্ণিত তাওরাতের ভবিষ্যদ্বাণীর শেষাংশে বলা হইয়াছে, "তিনি পথহারা অন্ধজনদিগকে তাহাদের অজানা রাস্তায় নিয়া যাইবেন এবং তাহারা যে পথ সম্পর্কে অবহিত নহে, সেই পথের দিকেই তাহাদিগকে পরিচালিত করিবেন [ইয়াসইয়া (আ) প্রচারিত তাওরাত সংকলনের ৪২তম অধ্যায়, সুংসংবাদ পর্ব; সীরাতুন্নবী, পৃ. ১৫৮০-৮১]।
উপরিউক্ত ভবিষ্যদ্বাণীতে অন্ধজন দ্বারা উম্মী লোকদের বুঝানো হইয়াছে এবং অজানা রাস্তা বলিতে আল্লাহর পথকে বুঝানো হইয়াছে। অর্থাৎ ভাবী পয়গাম্বরের কওম উম্মী ও ঐশীবাণী হইতে বঞ্চিত থাকিবে। এই বৈশিষ্ট্য আরব বেদুঈনদেরই বৈশিষ্ট্য। তাহারা একদিকে যেমন উম্মী
ছিল, অন্যদিকে এই কওমের কাছে রাসূলুল্লাহ (স)-এর পূর্বে অন্য কোন নবী প্রত্যাদেশ লইয়া আসেন নাই। হযরত ঈসা (আ) বনূ ইসরাঈলদের নিকট প্রেরিত হন। তাই তিনি তাওরাতে বর্ণিত ভাবী নবী নহেন। কুরআন পাকের সূরা কাসাসেও বলা হইয়াছে, "তুমি যেন তাহাদিগকে সতর্ক করিতে (পার যাহাদের নিকট তুমি ছাড়া অন্য কোন সতর্ককারী আগমন করে নাই" (২৮ : ৪৬)। সূরা জুমুআয় বলা হইয়াছে, "তিনিই আল্লাহ যিনি উম্মীগণের জন্য তাহাদের মধ্য হইতে একজনকে রাসূল করিয়া পাঠাইয়াছেন"। সূর হাদীদে বলা হইয়াছে, "তিনিই আল্লাহ যিনি তাঁহার বান্দার উপর প্রকাশ্য আয়াত ও নিদর্শন নাযিল করেন যেন তোমাদিগকে অন্ধকার হইতে বাহির করিয়া আলোর দিকে নিয়া আসেন" (৫৭:৯)।
তাওরাতের ভবিষ্যদ্বাণী, কুরআন পাকের বর্ণনা ও রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনেতিহাস মিলিতভাবে অধ্যয়ন করিলে ইহা দিবালোকের মতই সুস্পষ্ট হইয়া ধরা দেয় যে, তাওরাতে বর্ণিত পয়গাম্বর একমাত্র রাসূলুল্লাহ (স) ছাড়া অন্য কেহ নহে।
তাওরাতের দ্বিতীয় বিবরণের তেইশতম পরিচ্ছেদে হযরত মূসা (আ)-এর অন্তিম ওসিয়াত বিধৃত হইয়াছে। ইহাতে তিনি বনূ ইসরাঈলগণের উদ্দেশ্যে বলেনঃ
"সিনাই হইতে আগমন করিয়া তিনি সাঈরের উপর উদিত হইলেন। অবশেষে ফারান পর্বতের উপর আবির্ভূত হইলেন। তিনি দশ হাজার অগ্রগামী বাহিনীর সহিত আসিলেন এবং তাঁহার হাতে ছিল অগ্নিময় শরীআত" (৩৩: ২)। "হাঁ, তিনি স্বীয় সাহাবীগণের সহিত গভীর ভালবাসা রাখেন। তাঁহার যাবতীয় সহচর তোমার সহিত রহিয়াছে, সে তোমার চরণতলে বসা রহিয়াছে ও তোমার যাবতীয় কথা মানিয়া চলিবে” (সীরাতুন্নবী, ৪খ, শুভ সংবাদ অধ্যায়, পৃ. ১৫৯৩)।
সর্বশেষ নবীর আবির্ভাবের ব্যাপারে ইহাই হযরত মূসা (আ)-এর সর্বশেষ ভবিষ্যদ্বাণী। এই সুসংবাদে ফারান পর্বত হইতে আখেরী নবীর আবির্ভূত হওয়ার কথা বলা হইয়াছে। ইহাতে যে চারটি বক্তব্য বিবৃত হইয়াছে, কুরআন পাকের সূরা ফাতহের বর্ণনার সহিত তাহার সুস্পষ্ট মিল রহিয়াছে।
প্রথমত, তাওরাতে বলা হইয়াছে, 'তিনি দশ হাজার অগ্রবর্তী বাহিনীসহ আগমন করিবেন'। সূরা ফাতহে বলা হইয়াছে, "মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ ও তাহার সহচরবৃন্দ।” বলা বাহুল্য, মক্কা বিজয়ের অভিযানে তাঁহার সহিত দশ হাজারের এক বাহিনী ছিল। দ্বিতীয়ত, তাওরাতে বলা হইয়াছে, 'তাহার হাতে আতশী শরীআত থাকিবে'। অর্থাৎ আপোষহীন কঠোর শরীআত। এই সম্পর্কে সূরা ফাতহে বলা হইয়াছে, তিনি কাফেরদের ক্ষেত্রে কঠোর ও আপোষহীন হইবেন। তৃতীয়ত, তাওরাতে বলা হইয়াছে, "সহচরদের সহিত তিনি গভীর ভালবাসার সম্পর্ক বজায় রাখিবেন"। সূরা ফাতহে বলা হইয়াছে, "তাহাদের পারস্পরিক সম্পর্ক হইবে গভীর প্রীতিময়”। চতুর্থত, তাওরাতের অন্তিম সংবাদে বলা হইয়াছে, 'তাহার পবিত্র স্বভাবের সহচরবৃন্দ তোমার
৯৩ অধীনেই গভীর সান্নিধ্যে রহিয়াছে এবং তাহারা তোমার নির্দেশন পালন করিবে। সূরা ফাতহে বলা হইয়াছে, 'তোমরা তাহাদিগকে দেখিতেছ যে, তাহারা রুকূ ও সিজদায় আনত হইয়া আল্লাহ্ রেযামন্দী ও মেহেরবানী প্রত্যাশা করিতেছে। তাহাদের মুখমণ্ডলে আনুগত্য ও ইবাদতের চিহ্ন প্রতিভাত হইতেছে'।
অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, হযরত মূসা (আ) সর্বশেষ পয়গাম্বর সম্পর্কে তাঁহার সর্বশেষ উপদেশে যে দশ হাজার অগ্রবর্তী সেনাসহ ফারান উপত্যকায় আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছেন, মহানবী (স)- এর দশ হাজার সেনাসহ মাতৃভূমি মক্কা নগরী বিজয়ের মাধ্যমে তাহা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হইয়াছে। আল্লাহর সত্য দীনের উদাহরণ সূরা ফাতহে এইভাবে তুলিয়া ধরা হয়, "উহার উদাহরণ যেন একটি চারা গাছ, উহাতে বীজ অঙ্কুরিত ও চারা উদগত হইয়াছে, আবার উহা মজবুতভাবে মাথা তুলিয়াছে। অবশেষে উহার শাখা-প্রশাখা ছাইয়া গিয়াছে। (এই দৃশ্য) কৃষককে পুলকিত ও বিস্মিত করিয়াছে” (৪৮: ২৯)। ঠিক এই উদাহরণটি হযরত ঈসা (আ)-এর ইনর্জীলেও বিদ্যমান। উহাতে বলা হইয়াছে, 'আসমানী হুকুমত যেন একটি শর্ষের দানার মত। কোন কৃষক যেন উহা জমিতে বপণ করিল। উক্ত ক্ষুদ্রতম বীজ যখন অংকুরোদগম ঘটাইল তখন উহা বড় এক জমিতে পরিণত হইল। ফলে পতঙ্গ ও পাখিরা আসিয়া উহার শাখা প্রশাখা জুড়িয়া বসিল' (মথি: ১২: ৩১; মার্ক, ৪: ৩১-৩২; ৩১ সীরাতুন্নবী, ৪খ, শুভ সংবাদ অধ্যায়, পৃ. ১৫৯৩)।
বলা বাহুল্য, রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পবিত্র হস্তে ইসলামের যে বীজটি বপণ করিলেন, তাহা তাঁহার জীবদ্দশায়ও বিপুল শাখা-প্রশাখাযুক্ত এক মহীরূহে পরিণত হইল। ফলে স্বভাবতই তিনি তাঁহার চাষাবাদের এই বিস্ময়কর সাফল্য দেখিয়া পুলকিত হইলেন। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে হযরত ঈসা (আ)-এর ভবিষ্যদ্বাণীতে বর্ণিত আসমানী হুকুমত প্রতিষ্ঠাও পূর্ণত্ব প্রাপ্ত হইল। তাওরাতের দ্বিতীয় বিবরণ অধ্যায়ে আল্লাহ পাক বলেন, "আমি তাহাদের জন্য তাহাদের ভ্রাতাদের মধ্য হইতেই তোমার মত এক পয়গাম্বরের আবির্ভাব ঘটাইব এবং তোমার কালাম তাঁহার বক্ষে স্থাপন করিব। সে সেইসব কালাম সকলের সামনে প্রচার করিবে। সে এইরূপ হইবে যে, যাহা কিছু বলিবে তাহা আমার নাম স্মরণ করিয়া বলিবে। যাহারা তাঁহার কথা মানিবে না, আমি তাহাদের কাজের হিসাব লইব। পক্ষান্তরে সেই পয়গাম্বর যদি আমার নির্দেশের বাহিরে কোন কথা বলে, এমন কি অন্যান্য উপাস্যরা কোন কথা বলে, তাহা হইলে তাহাকে হত্যা করা হইবে" (দ্বিতীয় বিবরণ: ১৮-১৯)।
বলা বাহুল্য, কালামে পাকে তাওরাতের উক্ত ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কিত বহু আয়াত বিদ্যমান। যেমন 'তাওরাতে আল্লাহ পাক বলেন, "আমি তাহাদের ভ্রাতাদের মধ্য হইতে তাহাদের জন্য তোমার মতই এক পয়গাম্বরের আবির্ভাব ঘটাইব।” লক্ষণীয় যে, এখানে তাহাদের মধ্য 'হইতে বলা হয় নাই, বরং বলা হইয়াছে তাহাদের ভ্রাতাদের মধ্য হইতে। সুতরাং এই পয়গাম্বর বনূ ইসরাঈল বংশোদ্ভূত হইবেন না, বরং বনূ ইসরাঈলীদের ভ্রাতা বনূ ইসমাঈল বংশোদ্ভূত
হইবেন। হযরত ইবরাহীম (আ) কা'বা ঘর প্রতিষ্ঠাকালে হযরত ইসমাঈল (আ)-কে লইয়া যে প্রার্থনা করিলেন, “হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি তাহাদের মধ্য হইতে তাহাদের জন্য একজন রাসূল পাঠাও, যে তাহাদিগকে তোমার আয়াত শুনাইবে, তাহাদিগকে তোমার কিতাব ও হিকমত শিখাইবে এবং তাহাদিগকে পুত-পবিত্র করিবে” (২: ১২৯)। তাওরাতের ঠিক এই প্রার্থনারই অনুরূপ সাক্ষ্য দিলেন আল্লাহ পাক। সুতরাং উক্ত পয়গাম্বর নিঃসন্দেহে বনূ ইসমাঈল বংশোদ্ভূত একমাত্র পয়গাম্বর হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স)। তাওরাতের ভাষ্যে বলা হইয়াছে, "আল্লাহ পাক স্বীয় কালাম তাঁহার মুখে অর্পণ করিবেন এবং তিনি তাহা সকলের সামনে প্রচার করিবেন"। কুরআন পাকেও মহানবী (স) সম্পর্কে বলা হইয়াছে, "সে নিজ খেয়াল-খুশী মত কোন কথা বলে না, বরং তাহার কাছে যে ওহী অবতীর্ণ হয় তাহাই প্রকাশ করে" (৫৩: ৩-৪)।
তাওরাতে বলা হইয়াছে, "যাহারা তাঁহার কথা মানিবে না, আমি তাহাদের হিসাব গ্রহণ করিব"। কুরআন পাকে বলা হইয়াছে, "তোমার কাজ হইল আমার নির্দেশাবলী তাহাদের কাছে পৌঁছাইয়া দেওয়া এবং আমার কাজ হইবে তাহাদের হিসাব গ্রহণ করা" (১৩:৪০)।
তাওরাতের ভাষ্যে বলা হইয়াছে, "সেই পয়গাম্বর যদি আমার নির্দেশ ব্যতীত কোন কথা বলে, এমনকি অন্যসব উপাস্যদের নামে কথা বলে তাহা হইলে তাহাকে হত্যা করা হইবে।" কুরআন পাকে বলা হইয়াছে, "যদি এই পয়গম্বর কোন কথা নিজের তরফ হইতে মিশ্রণ করিয়া বলিত, তাহা হইলে আমি তাহার হস্ত ধারণ পূর্বক পাকড়াও করিতাম এবং তাহার গর্দানের শাহরগ কাটিয়া ফেলিতাম" (৬৯: ৪৪-৪৬)।
তাওরাতে ভাবী পয়গাম্বর সম্পর্কে ইহাও বলা হইয়াছে যে, তিনি যে সকল ভবিষ্যদ্বাণী করিবেন, তাহা সবই বাস্তবায়িত হইবে। বলা বাহুল্য, রাসূলে পাক (স)-এর গোটা জীবনের ইতিহাসের পাতায় পাতায় ইহার প্রচুর দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, এমনকি তিনি যাহা কিছু স্বপ্নে দেখিতেন, তাহাও অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়িত হইত (সহীহ বুখারী)। মুসলমান তো দূরে, এমনকি কাফিররাও বিশ্বাস করিত যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর যে কোন ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হইবেই। তাই কাফির সর্দার উমাইয়া সম্পর্কে তিনি যখন ভবিষ্যদ্বাণী করিলেন যে, উমাইয়া অচিরেই নিহত হইবে, তখন সে ইহা শুনিয়া ভয়ে কাঁপিয়া উঠিল এবং বদর যুদ্ধে যাওয়ার ডাক আসিলে তাহার স্ত্রী তাহাকে সেই ভবিষ্যদ্বাণী স্মরণ করাইল। ফলে সে যুদ্ধে যাইতে চাহিল না। কিন্তু কাফিরদের তিরস্কারে বাধ্য হইয়া সে যুদ্ধে গেল এবং নিহত হইল। শুধু তাহাই নহে, বদর যুদ্ধের কুরায়শ সর্দারদের মধ্যে কে কোথায় নিহত হইবে সেই সম্পর্কিত তাঁহার ভবিষ্যদ্বাণীও হুবহু বাস্তবায়িত হইয়াছিল।
• বুখারী শরীফে রোম সম্রাটের ব্যক্তিগত পরামর্শে তো সিরিয়ার বিশপ ইব্‌ নাতুর-এর এই বর্ণনাটি বিধৃত রহিয়াছে: "রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস জ্যোতির্বিদ ছিলেন। একদিন তিনি দরবারে অত্যন্ত বিষণ্ণ বদনে আগমন করিলেন। জনৈক সভাসদ ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিল। তিনি বলিলেন, গত রাতে তারকারজির প্রতি নজর করিয়া দেখিলাম, 'মালিকুল খাতান' (খাতনার
৯৫ বাদশাহ) আত্মপ্রকাশ করিয়াছেন। এখন তোমরা অনুসন্ধান করিয়া দেখ, কোন সম্প্রদায়ের মাঝে খতনার প্রচলন বিদ্যমান। জনৈক সভাসদ বলিল, খতনা তো শুধু ইয়াহুদীদের মাঝে চালু রহিয়াছে। তাই আপনি বিচলিত হইবেন না। প্রত্যেক প্রদেশে নির্দেশ জারী করুন যে, এই বৎসর ইয়াহুদীদের ঘরে যত শিশু ভূমিষ্ঠ হইবে তাহাদের সকলকে যেন হত্যা করা হয়।"
ইত্যবসরে সিরিয়া সীমান্তের গাস্সান এলাকার আরব সর্দার খবর দিল যে, আরবে একজন পয়গাম্বরের আবির্ভাব ঘটিয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে রোম সম্রাট প্রশ্ন করিলেন, আরবরা কি খতনা করে? তদুত্তরে তাহাকে বলা হইল, হাঁ, তাহারা খতনা করে। তখন রোম সম্রাট বলিলেন, হাঁ, এই উম্মতের বাদশাহর আবির্ভাব ঘটিয়াছে। অতঃপর তিনি দরবারের লোকদের লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, যদি তোমরা নিজেদের সাম্রাজ্য রক্ষা করিতে চাও, তাহা হইলে তাহার উপর ঈমান আনয়ন কর। সভাসদবৃন্দ সম্রাটের এই মন্তব্য পছন্দ করিল না। রোম সম্রাট তখন তাহার এক ঘনিষ্ঠ রোমক বন্ধুকে সব কথা লিখিয়া তাহার অভিমত চাহিলেন। তিনি সম্রাটের অভিমতের সহিত পূর্ণ একমত হইলেন।
মূলত ইয়াহুদীরাও খতনা করিত, কিন্তু খৃস্টানরা খতনা করিত না। তাই সম্রাট খতনাকারী রাসূল সন্ধানের জন্য নির্দেশ দিলেন। যখন সেই রাসূলের সন্ধান মিলিল, তখনই তিনি বুঝিতে পারিলেন যে, খতনাবিহীন খৃস্টান ধর্ম বাতিল হইয়াছে এবং এখন হইতে আবার খতনার ধর্ম চালু হইয়াছে। বলা বাহুল্য, হযরত ইবরাহীম (আ)-এর প্রবর্তিত খতনাকারী জাতির স্থায়ীভাবে আবির্ভাব ঘটিল হযরত ইসমাঈল (আ)-এর বংশোদ্ভূত একমাত্র ও সর্বশেষ পয়গাম্বর হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর মাধ্যমে।
তাওরাতের দ্বিতীয় বিবরণ নামক সহীফায় আল্লাহর তথা তাঁহার সত্য দীন প্রকাশের স্থল বলা হইয়াছে তিনটি পর্বতকে। একটি সিনাই, অপরটি সাঈর ও তৃতীয়টি ফারান পর্বতমালা। পর্বতত্রয় উল্লেখের পর্যায়ে অনুসন্ধানে সিনাই হইতে হযরত মূসা (আ), সাঈর পর্বত হইতে হযরত ঈসা (আ) ও ফারান হইতে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আবির্ভাব ঘটিল।
হযরত হাবকুক (আ)-এর প্রদত্ত সুসংবাদে বলা হইয়াছে, সেই পয়গাম্বরের শৌর্য-বীর্য ও শান-শওকতের সামনে আকাশ ম্লান হইবে এবং সমগ্র পৃথিবী তাঁহার প্রশংসায় মুখর হইবে।
বস্তুত রাসূলে পাক (স)-এর আগমনের শান-শওকতের সামনে সপ্ত আকাশ ম্লান হইয়াছিল ও তাঁহার অন্তর্ধানের পর অর্ধ শতকের ভিতর পৃথিবীর এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তাঁহার প্রশংসায় মুখর হইল, এমনকি বর্তমান কালেও গোটা পৃথিবীর জাতিধর্ম নির্বিশেষে মানুষ তাঁহার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
বলা বাহুল্য, তাওরাত ও ইনজীলের বিভিন্ন সহীফায় এইসব সুসংবাদ ও ভবিষ্যদ্বাণীর কারণেই ইয়াহুদী ও নাসারারা এই সর্বশেষ পয়গাম্বরের আগমনের অপেক্ষায় অধীরভাবে দিন গুণিতে ছিল। কুরআন মজীদে বলা হইয়াছে:
৯৬ "ইয়াহুদী ও নাসারারা এই পয়গাম্বরকে ঠিক সেইভাবে চিনে যেভাবে তাহারা নিজ সন্তানদিগকে চিনিতে পায়"। বুখারী শরীফে হযরত আবূ সুফ্যান (রা) হইতে বর্ণিত আছে, "রাসূলে পাক (স) যখন ইসলামের দাওয়াতনামা নিয়া রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াসের কাছে লোক পাঠাইলেন, তখন রোম সম্রাট আমাকে ডাকিয়া তাঁহার সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করিলেন। আমি তাহার প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিলাম। তখন সম্রাট সকল সভাসদের সামনে মন্তব্য করিলেন, তুমি যাহা কিছু বর্ণনা করিয়াছ তাহা যদি সত্য হয়, তাহা হইলে একদিন সেই নবী আমার পায়ের তলের ভূখণ্ড করতলগত করিবেন। এই বিশ্বাস আমার অটুট ছিল যে, একজন পয়গাম্বরের আবির্ভাব ঘটিবে। তবে তিনি যে আরবে আবির্ভূত হইবেন তাহা আমি ভাবি নাই। যদি সম্ভব হইত, তাহা হইলে আমি নিজে গিয়া তাঁহার সহিত সাক্ষাত করিতাম। তবে তিনি যদি এখানে থাকিতেন তাহা হইলে আমি নিজেই তাঁহার কদম মুষারক ধৌত করিতাম।"
মিসর অধিপতি মুকাওকিসের নিকট ইসলামের দাওয়াতনামা নিয়া প্রেরিত মহানবী (স)-এর দূতের নিকট মুকাওকিস বলেন, হাঁ, আমাদেরও বিশ্বাস ছিল যে, একজন পয়গাম্বরের আবির্ভাব ঘটিবে। তবে আমাদের ধারণা ছিল তিনি সিরিয়ায় আবির্ভূত হইবেন।
আবিসিনিয়ার খৃস্টান সম্রাট নাজাশী রাসূলুল্লাহ (স)-এর ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত সম্বলিত পত্র পাইয়া জবাব দিলেন, "আমরাও সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি সত্য পয়গম্বর।" তিনি মনে-প্রাণে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাই তাঁহার ইন্তিকালের খবর পাইয়া রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার গায়েবানা জানাযা আদায় করেন।
বস্তুত ইয়াহুদী ও নাসারাদের ভিতর এ বিশ্বাসটি অত্যন্ত ব্যাপক ছিল যে, অচিরেই তাওরাত ও ইনজীলে বর্ণিত শেষ পয়গাম্বরের আবির্ভাব ঘটিবে। শুধু তাহাই নহে, তাঁহার আগমনের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্তও তাহারা তাঁহার উপর ঈমান আনয়নের জন্য অপেক্ষা করিতেছিল। কিন্তু তিনি সত্য সত্যই যখন আবির্ভূত হইলেন, তখন তাহাদের অধিকাংশই পৈত্রিক ধর্মের দোহাই পাড়িয়া তাঁহার উপর ঈমান আনিতে অস্বীকার করিল।
তাওরাত ও ইনজীলের বিভিন্ন সহীফায় মহানবী (স)-এর আবির্ভাব ও পরিচিতি সম্পর্কে এত পরিষ্কার আলোকপাত করা হইয়াছে যে, ইয়াহুদী ও নাসারাদের কোন আলেম ও ধর্মযাজক তাঁহাকে চিনিতে আদৌ অপারগ হন নাই। শুধু নিজেদের এত দিনের প্রতিষ্ঠিত মর্যাদা ও প্রতিপত্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশংকায় তাহারা নানা অজুহাত সৃষ্টি করিয়া সত্য পয়গাম্বরকে মানিয়া লইতে ব্যর্থ হইলেন। কুরআন মজীদে তাহাদের এই ব্যর্থতা ও ইহার কারণ উদ্ধৃত করিয়া আল্লাহ পাক তাহাদিগকে তীব্র ভর্ৎসনা করিয়াছেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নাজরান প্রদেশের খৃস্টানরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের দাবি মিথ্যা বলিয়া ঘোষণা করায় তিনি তাহাদিগকে মুবাহালার জন্য আহবান জানাইলেন। নাজরানের খৃস্টান ধর্মযাজকগণ তাহার দরবারে হাজির হইয়া সত্য নির্ধারণের এই মুবাহালা সম্পর্কে সিদ্ধান্তও নিয়াছিল। কিন্তু তাহাদের বিজ্ঞ আলেমরা তাহাদিগকে এই কথা বলিয়া নিবৃত্ত করিল যে, যদি
৯৭ তিনি সত্য পয়গাম্বর হন তাহা হইলে মুবাহালার কারণে আমরা ধ্বংস হইয়া যাইব। ইহাতেও বুঝা যায় যে, তাহাদের বিজ্ঞ আলেমরা তাঁহাকে সত্য নবী বলিয়া চিনিতে পারিয়াছিলেন।
হযরত খাদীজা (রা)-এর চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফাল একজন বিজ্ঞ খৃস্টান ছিলেন। তিনি যখন তাহার কাছে মুহাম্মাদ (স)-এর হেরা গুহার ঘটনা শুনিলেন, তখন তাঁহার নবুওয়াতের সত্যতা স্বীকার করিলেন এবং আক্ষেপ করিয়া বলিলেন, যদি আমি আপনার হিজরত পর্যন্ত বাঁচিয়া থাকিতাম, তাহা হইলে আপনাকে সর্বক্ষেত্রে অবশ্যই সাহায্য করিতাম।
বিজ্ঞ খৃস্টান আলেম ওয়ারাকা ইবন নাওফালের উপরিউক্ত উক্তি হইতে বুঝা যায় যে, ইনজীলে ভাবী নবীকে যে কাফিরদের অত্যাচারে হিজরত করিতে হইবে তাহাও লিপিবদ্ধ রহিয়াছে।
ইসলাম-পূর্ব যুগে যায়দ নামক এক একত্ববাদী (মুওয়াহিদ) আরব সত্যের সন্ধানে বাহির হইয়া সিরিয়ার জনৈক খৃস্টান ধর্মযাজকের নিকট গেল। তিনি তাহাকে ইরাকের এক খৃস্টান ধর্মযাজকের নিকট পাঠাইলেন। যায়দ তাহার নিকট পৌঁছিলে তিনি প্রশ্ন করিলেন, তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ? যায়দ জবাব দিল, আমি মক্কা হইতে আসিয়াছি। তাহা শুনিয়া সেই যাজক বলিলেন, যাও, তুমি স্বদেশে ফিরিয়া যাও। সত্য নবী সেখানেই আগমন করিবেন। ইহা শুনিয়া যায়দ মক্কায় ফিরিয়া আসিল। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের আগেই সে মৃত্যুবরণ করিল (মুসনাদে আবু যুরআ)।
তাবাকাতে ইবন সা'দ, তারীখে ইবনে ইসহাক, মুসনাদে আহমাদ, মুস্তাদরাকে হাকেম, দালাইয়েলে বায়হাকী, মু'জামে তাবারানী, দালায়েলে আবু নাঈম প্রভৃতি গ্রন্থে বিভিন্ন বর্ণনার সামগ্রিক বক্তব্য দ্বারা জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাবের পূর্বে মদীনার ইয়াহুদীদের মাঝেও একজন আগমনকারী পয়গাম্বর সম্পর্কে আলোচনা চলিত। মদীনার আওস ও খাযরাজ নামক গোত্রদ্বয়ের অধিকাংশ লোকই অবশেষে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করিল।
সহীহ সনদে এক আনসার যুবকের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, তিনি বলেন, আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন মদীনার এক ইয়াহূদী ওয়ায়েজ তাহার ওয়াজে ভাবী পয়গম্বরের আশু আবির্ভাবের সুসংবাদ দিলেন। শ্রোতারা প্রশ্ন করিল, তিনি কত দিনের মধ্যে আগমন করিবেন? তখন ছোট একটি ছেলের দিকে ইঙ্গিত করিয়া তিনি বলিলেনঃ এই ছেলেটি যদি বাঁচিয়া থাকে তাহা হইলে সে অবশ্যই সেই পয়গাম্বরের দেখা পাইবে।
হযরত আনাস ইব্‌ন মালেক (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, এক ইয়াহুদী বালক রাসূলুল্লাহ (স)-এর খেদমতে কিছুদিন ছিল। একবার সে অসুস্থ হইয়া পড়িলে রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে দেখিতে পেলেন। বালকটির পিতাকে রাসূলুল্লাহ (স) জিজ্ঞাসা করিলেন, আমার কথা কি তোমরা তাওরাতে পাইয়াছ? সে উত্তর দিল, না। রুগ্ন বালকটি তৎক্ষণাৎ বলিয়া উঠিল, হাঁ। আমরা আপনার কথা তাওরাতে পাঠ করিয়াছি। এই কথা বলিয়া সে সঙ্গে সঙ্গে কালেমা পড়িয়া মুসলমান হইল (বায়হাকী)। অবশ্য সহীহ বুখারীর বর্ণনায় বলা হইয়াছে, বালকটি তাহার পিতার পরামর্শেই মুসলমান হইয়াছিল।
৯৮ ঠিক এই কারণেই আরবের মুশরিক ও ইয়াহুদীদের মাঝে যখন কোন যুদ্ধ বাধিত, তখন ইয়াহুদীরা এই বলিয়া কুরায়শগণকে শাসাইত যে, অচিরেই একজন পয়গাম্বরের আবির্ভাব ঘটিবে। তখন আমরা তাঁহার নেতৃত্বে তোমাদের উপর বিজয়ী হইব। তাই সূরা বাকারায় আল্লাহ পাক বলেন :
الَّذِينَ آتَيْنَهُمُ الْكِتَبَ يَعْرِفُونَهُ كَمَا يَعْرِفُونَ أَبْنَاءَهُمْ وَإِنَّ فَرِيقًا مِنْهُمْ لَيَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَهُمْ يَعْلَمُونَ .
"আমি যাহাদিগকে কিতাব প্রদান করিয়াছি, তাহারা তাহাকে (মুহাম্মাদ) সেইরূপ চিনে যেরূপ তাহারা তাহাদের সন্তানদিগকে চিনে। তাহাদের একদল জানিয়া শুনিয়া সত্য গোপন করিতেছে” (২: ১৪৬)।
বস্তুত সমসাময়িক কালের ইয়াহুদী ও নাসারা আলিমগণ তাহাদের গ্রন্থের বর্ণনার সহিত রাসূলুল্লাহ (স)-কে মিলাইয়া দেখার জন্য তাঁহার দরবারে হাজির হইতেন এবং তাঁহাকে বিভিন্নরূপ প্রশ্ন করিয়া যখন আশ্বস্ত হইতেন তখন একদল ইসলাম গ্রহণ করিতেন ও একদল ফিরিয়া যাইত। যাহারা ফিরিয়া যাইত ও ইসলাম গ্রহণ হইতে বিরত থাকিত তাহাদের সম্পর্কেই উপরিউক্ত আয়াত অবতীর্ণ হইয়াছে।
কুরআন পাকে বলা হইয়াছে, আল্লাহ তা'আলা রোজে আযলে আম্বিয়ায়ে কিরাম (আ) হইতে এই প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করিয়াছিলেন যে, তাঁহাদের প্রত্যেক নবী অপর নবীকে সমর্থন ও সাহায্য-সহযোগিতা করিবেন, এমনকি স্ব স্ব উম্মতকে এই উপদেশ দিয়া যাইবেন যে, যখন কোন নবী তাহার কাছে আসিবে তখন সে তাহার সত্যতা স্বীকার করিয়া আনুগত্য গ্রহণ করিবে। আল-কুরআনের সূরা আল ইমরানে বলা হইয়াছে :
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّنَ لَمَا آتَيْتُكُمْ مِنْ كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُصَدِّقٌ لِمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرَنَّهُ قَالَ أَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذُلِكُمْ اصْرِى قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُمْ مِّنَ الشَّهِدِينَ .
"স্মরণ কর, যখন আল্লাহ পাক নবীদের এই অঙ্গীকার নিলেন যে, তোমাদিগকে যেই কিতাব ও হিকমত দান করিয়াছি। অতঃপর তোমাদের কাছে যাহা আছে তাহার সমর্থকরূপে যখন একজন রাসূল আসিবে, তখন নিশ্চয় তোমরা, তাহাকে বিশ্বাস করিবে এবং তাহার সহায়তা করিবে। অতপর তিনি বলিলেন, তোমরা কি স্বীকার করিলে এবং আমার অঙ্গীকার কি তোমরা গ্রহণ করিয়াছ? বলিল, আমরা স্বীকার করিলাম। তিনি বলিলেন, তাহা হইলে তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সঙ্গে সাক্ষী থাকিলাম" (৩ঃ ৮১)।
এই অঙ্গীকার রক্ষার জন্যই প্রত্যেক নবী তাঁহার পরবর্তী নবীদের স্বীকৃতি দান ও পরবর্তী নবী সম্পর্কে উম্মতকে উপদেশ দানকে নিজেদের অপরিহার্য দায়িত্ব হিসাবে পালন করিয়া
৯৯ গিয়াছেন। আর তাঁহাদের উম্মতদের যাহারা সত্যনিষ্ঠ ও অকপট ছিলেন, তাহারা পরবর্তী সত্য নবীর আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে তাঁহাকে চিনিতে পারিয়াছে ও নির্দ্বিধায় মানিয়া লইয়াছে। কিন্তু যাহারা কপটাচারী ধর্ম ব্যবসায়ী ছিল, তাহারা সমূহ ক্ষতির আশংকায় সত্য গোপন করিয়াছে ও সত্য নবীকে অস্বীকার করিয়াছে। আল্লাহ পাক কুরআন মজীদে প্রথমোক্ত দলকে দুই নবীর আনুগত্যের জন্য দ্বিগুণ ছওয়াব ও দ্বিতীয় দলকে দুই নবীকে অমান্য করার জন্য দ্বিগুণ শাস্তির প্রতিশ্রুতি দান করিয়াছেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 উপমহাদেশের ধর্মগ্রন্থসমূহে বিধৃত ভবিষ্যদ্বাণী ও সুসংবাদ

📄 উপমহাদেশের ধর্মগ্রন্থসমূহে বিধৃত ভবিষ্যদ্বাণী ও সুসংবাদ


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বুদ্ধদেবের ভবিষ্যদ্বাণী

📄 বুদ্ধদেবের ভবিষ্যদ্বাণী


“বুদ্ধ” শব্দের অর্থ 'বুদ্ধি দ্বারা যুক্ত”। বৌদ্ধ ধর্মে নবী ও রাসূলগণকে 'বুদ্ধ' বলা হয়। গৌতম বুদ্ধ তাঁহার অন্তিম শয্যায় প্রিয় শিষ্য আনন্দকে অন্তিম বুদ্ধ বা সর্বশেষ রাসূল সম্পর্কে এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনাইলেন :
"আনন্দ! এই পৃথিবীতে আমি প্রথম বুদ্ধ নহি এবং অন্তিম বুদ্ধও নহি। এই পৃথিবীতে সত্য এবং পরোপকার শিক্ষা দান করার জন্য সময়মত একজন বুদ্ধ আবির্ভূত হইবেন। তিনি পূতঃপবিত্র অন্তকরণের হইবেন। তাঁহার হৃদয় পরিশুদ্ধ হইবে। তিনি জ্ঞানী ও প্রতিভাবান হইবেন। তিনি সকল লোকের নায়ক ও পথপ্রদর্শক হইবেন। যদ্রূপ আমি পৃথিবীতে সত্যের শিক্ষা দিয়াছি, তিনিও অদ্রূপ পৃথিবীতে সত্যের শিক্ষা প্রদান করিবেন। তিনি পৃথিবীতে এমন জীবন দর্শন প্রতিষ্ঠা করিবেন যাহা একাধারে পবিত্র ও পূর্ণাঙ্গ হইবে। আনন্দ! তাহার নাম হইবে মৈত্রেয়” (বেদ ও পুরাণে হযরত মুহাম্মদ (স), ডঃ দেব প্রকাশ উপাধ্যায়, পৃ. ৬৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 মৈত্রেয় বুদ্ধের বৈশিষ্ট্য

📄 মৈত্রেয় বুদ্ধের বৈশিষ্ট্য


'ধর্মপদ'সহ বৌদ্ধধর্ম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গ্রন্থে বৌদ্ধ ও বিশেষ অন্তিম বুদ্ধের যেসব বৈশিষ্ট্য লিপিবদ্ধ রহিয়াছে তাহা নিম্নরূপ :
১। তিনি ধনৈশ্বর্যের অধিকারী হইবেন।
২। তিনি স্ত্রী, সংসার ও সন্তানাদির অধিকারী হইবেন।
৩। তিনি শাসনক্ষমতার অধিকারী হইবেন।
৪। তিনি স্বীয় পূর্ণ আয়ু পর্যন্ত জীবিত থাকিবেন।
৫। তিনি স্বীয় কার্যাদি স্বয়ং সম্পাদন করিবেন।
৬। তিনি আজীবন ধর্মপ্রচারে ব্যাপৃত থাকিবেন।
৭। তিনি 'তথাগত'ও হইবেন। যখন তিনি নিঃসঙ্গ ও নিরালায় অবস্থান করিবেন, তখন আল্লাহ্ তরফ হইতে ঐশীদূত আসিয়া তাঁহাকে ঐশীবাণী শুনাইবেন।
৮। তিনি তাঁহার অনুগামিগণকে পূর্ববর্তী বুদ্ধগণের কথা স্মরণ করাইবেন।
১০০ ৯। তিনি তাঁহার অনুসারিগণকে শয়তান সম্পর্কে সতর্ক করিবেন।
১০। তাঁহাকে ও তাঁহার সহচরবৃন্দকে কেহই পথভ্রষ্ট করিতে পারিবে না এবং তাঁহার সহচরগণ তাঁহার পার্শ্বে সুদৃঢ়ভাবে অবস্থান করিবেন।
১১। পৃথিবীতে তাঁহার কোন গুরু থাকিবে না।
১২। তিনি পার্থিব অথবা অপার্থিব হইতে বোধিবৃক্ষের তলায় দিব্যজ্ঞান লাভ করিবেন এবং দিব্যদৃষ্টি দ্বারা উহাতে দৃষ্টিপাত করিবেন। বোধিবৃক্ষের নিম্নে তিনি সভা করিবেন।
১৩। সাধারণ মানুষের ঘাড় অপেক্ষা তাঁহার ঘাড়ের হাড় অত্যধিক দৃঢ় হইবে। ফলে ঘাড় ঘুরাইবার সময় তাঁহাকে সমস্ত শরীর ঘুরাইতে হইবে (ডঃ বেদ প্রকাশ উপাধ্যায়, বেদ ও পুরাণে হযরত মুহাম্মদ, পৃ. ৬৪-৬৫)।
১৪। তিনি যখন পৃথিবীতে আবির্ভূত হইবেন তখন অন্য কোন বুদ্ধ পৃথিবীতে থাকিবেন না। কেননা তিনি পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য প্রেরিত হইবেন।
এক্ষণে বিচার্য বিষয় এই যে, বুদ্ধদেবের ভবিষ্যদ্বাণীর অন্তিম বুদ্ধের এই গুণাবলী কাহার ভিতরে পরিপূর্ণভাবে পাওয়া যায়? নিঃসন্দেহে তিনি হইবেন অন্তিম বুদ্ধ মৈত্রেয়। কুরআন পাকে হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে সম্বোধন করিয়া আল্লাহ তা'আলা বলেন: وَوَجَدَكَ عَائِلاً فَأَغْنُی "তিনি তোমাকে নির্ধন পাইয়াছেন, অতঃপর তোমাকে তিনি ধনাঢ্য ও ঐশ্বর্যবান করিয়াছেন"।
বস্তুত মুহাম্মাদ (স) দরিদ্র ও ইয়াতীম ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ পাক নবুওয়াতের পূর্বেই হযরত খাদীজা (রা)-এর সহিত তাঁহার বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করিয়া তাঁহাকে বিপুল ধনৈশ্বর্যের মালিক করেন। সুতরাং মৈত্রেয় বুদ্ধ হওয়ার প্রথম শর্তটি তাঁহার ভিতর পাওয়া গেল। অবশ্য তিনি তাহা ভোগ না করিয়া দান করেন।
মৈত্রেয় বুদ্ধের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হইল, তাঁহার স্ত্রী, সংসার ও সন্তানাদি থাকিবে। বলা বাহুল্য, মুহাম্মাদ (স)-এর স্ত্রী ও সন্তান ছিলেন। ফলে দেখা যাইতেছে যে, অন্তিম বুদ্ধের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যও পূর্ণাঙ্গভাবেই তাঁহার মধ্যে পাওয়া যাইতেছে।
বুদ্ধের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হইল, তিনি শাসনযুক্ত ব্যক্তি হইবেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও সমগ্র আরবের শাসক হন এবং তাঁহার প্রতিপক্ষগণকে পর্যুদস্ত করিয়া ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেন।
মৈত্রেয় বুদ্ধের চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হইল, তিনি তাঁহার পূর্ণ আয়ুষ্কাল পর্যন্ত বাঁচিয়া থাকিবেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাঁহার পূর্ণ আয়ুষ্কাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। তাঁহার অকাল মৃত্যু হয় নাই বা তিনি কাহারো দ্বারা নিহত হন নাই।
মৈত্রেয় বুদ্ধের পঞ্চম লক্ষণ হইল, তিনি নিজের কার্যসমূহ নিজেই সমাধা করিবেন। রাসূলুল্লাহ (স)-ও তাহাই করিয়াছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00