📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর আরব উপদ্বীপে আবির্ভূত হওয়ার কারণ

📄 রাসূলুল্লাহ (স)-এর আরব উপদ্বীপে আবির্ভূত হওয়ার কারণ


আল্লাহ তা'আলার ইচ্ছা ও হিকমতের ফয়সালা এই ছিল যে, মানবতার হেদায়াত ও নাজাত তথা পথপ্রদর্শন ও মুক্তির এই সূর্য, যদ্দ্বারা সমগ্র সৃষ্টিজগতে আলো বিস্তার লাভ করে, জাযীরাতুল আরবের দিগ্বলয় হইতে উদিত হইবে, যাহা ছিল দুনিয়ার সবচেয়ে অন্ধকার ভূভাগ আর যে ভূভাগের এই প্রখর আলোক-রশ্মির সর্বাধিক প্রয়োজন ছিল।
আল্লাহ তা'আলা দীন ইসলামের দাওয়াতের জন্য আরবদেরকে নির্বাচিত করেন এবং তাহাদেরকে সমগ্র বিশ্বে ইহা তাবলীগ তথা প্রচার-প্রসার-এর যিম্মাদার বানান এ জন্য যে, তাহাদের হৃদয়পট ছিল একেবারেই স্বচ্ছ ও নির্মল। পূর্ব হইতে কোন অংকিত ছবি কিংবা চিত্র ইহাতে ছিল না যাহা মোছা কঠিন হইত। ইহার বিপরীতে রোমক, পারসিক অথবা ভারতীয়দের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও দর্শনের ব্যাপারে বিরাট গর্ব ছিল। ইহার দরুন তাহাদের ভেতর এমন কিছু মানসিক গ্রন্থি ও চিন্তাগত জটিলতা সৃষ্টি হইয়া গিয়াছিল যাহা দূর হওয়া সহজ ছিল না। আরবদের মন-মস্তিষ্কের নিস্কলংক পট কেবল সেই মামুলী ও হাল্কা রচনাবলীর সঙ্গে পরিচিত ছিল যাহা তাহাদের মূর্খতা, অশিক্ষা ও বেদুঈন জীবন তাহার ভেতর অংকিত করিয়া দিয়াছিল যাহা মুছিয়া ফেলা এবং তদস্থলে নূতন চিত্র অংকন করা খুবই সহজ ছিল। বর্তমান ধর্মীয় পরিভাষায় তাহারা অকাট মূর্খতার শিকার ছিল, আর ইহাই ছিল সেই ভুল যাহার প্রতিবিধান হইতে পারিত। অপরাপর সুসভ্য ও উন্নত জাতিগোষ্ঠী ছিল মিশ্রিত ভেজাল, মূর্খতায় লিপ্ত যাহার চিকিৎসা ও প্রতিবিধান এবং যাহা ধুইয়া নূতন হরফ লেখা সব সময় অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হইয়া থাকে।
এই আরবরা তাহাদের আপন প্রকৃতিতে ছিল সমুজ্জ্বল। মজবুত ও লৌহসম সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী ছিল তাহারা। যদি হক কথা তাহাদের উপলব্ধিতে ধরা না দিত তাহা হইলে তাহারা ইহার বিরুদ্ধে তলোয়ার হাতে তুলিয়া লইতে এতটুকু ইতস্তত করিত না। আর যদি সত্য স্বচ্ছ-সুন্দর দর্পণের ন্যায় তাহাদের সামনে পরিষ্কার হইয়া ধরা পড়িত তাহা হইলে তাহা তাহারা মনে-প্রাণে গ্রহণ করিত, প্রাণের অধিক ভালবাসিত, তাহাকে বুকের সহিত জড়াইয়া ধরিত এবং ইহার জন্য প্রয়োজনে জীবন বিলাইয়া দিতেও এতটুকু দ্বিধা করিত না।
এই আরবীয় মন-মানসিকতা সুহায়ল ইবন 'আমরের সেই কথার ভেতর প্রতিফলিত হয় যাহা হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের সময় তাহার মুখ দিয়া বাহির হইয়াছিল। সন্ধি চুক্তির সূচনা হইয়াছিল নিম্নোক্ত বাক্য দ্বারা, هذا ما قضى عليه محمد رسول الله ইহা সেই ফয়সালা যাহা আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মাদ করিয়াছেন। ইহাতে সুহায়ল বলিল, والله لوكنا نعلم انك رسول الله ما صددناك عن البيت ولا قاتلناك আল্লাহ্র কসম! যদি আমরা জানিতাম যে, আপনি আল্লাহ্র রাসূল, তাহা হইলে কখনো আপনাকে আল্লাহ্র ঘর যিয়ারতে বাধা দিতাম না, এবং আপনার সঙ্গে-সংঘর্ষেও প্রবৃত্ত হইতাম না। এই একই মন-মানসিকতা ইকরিমা (রা) ইবন আবু জাহলের কথায়ও ফুটিয়া উঠে। যখন ইয়ারমুক যুদ্ধ প্রবল তুঙ্গে তখন তাহার উপর প্রতিপক্ষের প্রবল চাপ। রোমক সৈন্যরা প্রচণ্ড বিক্রমে যুদ্ধ করিতে করিতে হযরত ইকরিমা (রা)-র দিকে অগ্রসর হইতেছিল। তখন তিনি তাহাদেরকে লক্ষ্য করিয়া চীৎকার দিয়া বলিয়াছিলেনঃ জ্ঞানবুদ্ধির দুশমনেরা! (যত দিন অবধি আমার মাথায় এ সত্য আসেনি) আমি রাসূলুল্লাহ (স)-এর মুকাবিলায় সর্বত্র প্রবল প্রতিপক্ষ হিসাবে মুখামুখি হইয়াছি। আর আজ আমি তোমাদের হইতে পালাইয়া যাইব? ইহার পর তিনি হাঁক ছাড়িয়া বলেন, এমন কেহ আছ যে আমার হাতে মৃত্যুর শপথ লইতে পারিবে? ইহাতে কিছু সংখ্যক লোক আগাইয়া আসিলেন এবং বায়আত হইলেন। ইহার পর সকলে সম্মুখে অগ্রসর হইয়া যুদ্ধ করিতে লাগিলেন, অতঃপর আহত হইয়া শাহাদত লাভ করিলেন (তাবারী, ৪খ, পৃ. ৩৬)।
আরবের লোকেরা ছিল বড়ই বাস্তবতাপ্রিয়, চিন্তাশীল, মননশীল, ধীরস্থির প্রকৃতির, স্পষ্টভাষী, কঠোরপ্রাণ ও সহিষ্ণু। তাহারা না অন্যকে প্রতারিত করিত আর না নিজেদেরকে প্রতারণার মধ্যে রাখা পছন্দ করিত। তাহারা সত্য ও পরিপক্ক কথায় অভ্যস্ত, কথার সম্মান রক্ষাকারী এবং সুদৃঢ় ইচ্ছাশক্তির অধিকারী ছিল। ইহার একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ আমরা দেখিতে পাই আকাবার দ্বিতীয় বায়আতে যাহার পরই হিজরতের সূচনা হয় মদীনা তায়্যিবার দিকে।
ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন যে, যখন আওস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় আকাবা উপত্যকায় রসূলুল্লাহ (স)-এর হাতে বায়আত গ্রহণের উদ্দেশ্যে সমবেত হয় তখন আব্বাস ইবন উবাদা আল-খাযরাজী স্বীয় গোত্রকে সম্বোধন করিয়া বলেন, হে খাযরাজের লোকেরা! তোমাদের কি জানা আছে, তোমরা মহানবী (স)-এর হাতে কোন্ বিষয়ে বায়আত গ্রহণ করিতে যাইতেছ? উত্তরে তাহারা বলিল: আমরা জানি। তিনি বলিলেন, তোমরা তাঁহার হাতে সাদা-কালো সকল বর্ণের মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বায়আত করিতেছ (অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক ও বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শপথ লইতেছ)। যদি তোমরা ভাবিয়া থাক, তোমাদিগের সম্পদ লুণ্ঠিত হইবে, ধ্বংস করা হইবে, তোমাদিগের অভিজাত সন্তান ও গোত্রের নেতৃবর্গ নিহত হইবে, সেক্ষেত্রে তোমরা তাঁহাকে শত্রুর হাতে তুলিয়া দিয়া নিজেরা সরিয়া দাঁড়াইবে তাহা হইলে শুরুতেই এই বিষয়টির নিষ্পত্তি হউক। আর তাহা এইজন্য যে, যদি এমন কিছু কর তবে আল্লাহ্র কসম! দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানেই তোমরা লজ্জিত ও অপমানিত হইবে। আর তোমাদিগের ফয়সালা যদি এই হইয়া থাকে যে, যেই বস্তুর জন্য তোমরা তাঁহাকে দাওয়াত দিয়াছ তাহা তোমরা পূরণ করিবে, ইহাতে তোমাদিগের গোটা বিত্ত-সম্পদ তছনছ হইয়া গেলেও, তোমাদিগের নেতা ও অভিজাত সম্প্রদায় মারা গেলেও তোমরা পরওয়া করিবে না, তবে তোমরা তাঁহার হাতে হাত দিও। সেক্ষেত্রে আল্লাহর কসম! ইহাতে দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় জাহানেই তোমাদের জন্য সাফল্য ও কল্যাণ নিহিত রহিয়াছে। তাহারা সকলেই সমস্বরে বলিল, আমরা আমাদের বিত্ত-সম্পদের ধ্বংস ও নেতৃবর্গের মৃত্যু সকল কিছুর বিনিময়েও আপনার হাতে বায়আত করিতে চাই। কিন্তু হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা যদি আমাদের প্রতিজ্ঞা পূরণ করি সেক্ষেত্রে এসবের বিনিময়ে আমরা কি পাইব? আল্লাহ্র রসূল (স) বলিলেন, জান্নাত। তাহারা বলিল, আপনি হাত বাড়াইয়া দিন। তিনি দস্ত মুবারক সামনে বাড়াইলে সকলেই বায়আত করিল (সীরাতে ইবন হিশাম, ১খ., ৪৪৬ পৃ)।
প্রকৃত ব্যাপার এই যে, তাহারা সেই প্রতিজ্ঞা পালন করিয়াছিল যেই প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য তাহারা রাসূল আকরাম (স)-এর হাতে বায়আত হইয়াছিল। হযরত সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা) তাঁহারা বিখ্যাত উক্তির মধ্যে সব কিছুর প্রতিনিধিত্ব করিয়াছিলেন। তিনি বলিয়াছিলেন, আল্লাহ্ কসম! (ইয়া রাসূলাল্লাহ!) যদি চলিতে চলিতে বারকু'ল-গিমাদ (বারকুল গিমাদ সম্পর্কে বিভিন্ন মত রহিয়াছে। একটি মত এই যে, ইহা য়ামনের একটি দূরবর্তী এলাকা। সুহায়লী বলেন, ইহার দ্বারা আবিসিনিয়াকে বোঝানো হইয়াছে। ইহার উদ্দেশ্য এই যে, আপনি যদি দূরবর্তী এলাকা পর্যন্ত গমন করেন তবুও আমরা আপনার সঙ্গে থাকিব, সঙ্গ ত্যাগ করিব না) অবধি পৌঁছিয়া যান তখনও আমরা আপনার সহিত চলিতে থাকিব। যদি আপনি সমুদ্র পার হইতে চান তবে সেক্ষেত্রেও আমরা আপনার সহিত সমুদ্রে ঝাঁপাইয়া পড়িব (যাদুল-মা'আদ, ২খ,; সীরাত ইব্‌ন হিশাম, ১খ.; বুখারী ও মুসলিমেও অনুরূপ বর্ণনা রহিয়াছে)।
অটুট সংকল্প ও সুদৃঢ় এই ইচ্ছাশক্তি ও সততা, কর্মের স্থিরতা, সত্যের সামনে মস্তক অবনত করিয়া দেওয়ার মেযাজ ও মানসিকতা সেই বাক্য হইতেও স্পষ্ট প্রতিভাত যাহা মুসলিম ফৌজের বিখ্যাত সিপাহসালার উকবা ইব্‌ন নাফে (র) উচ্চারণ করিয়াছিলেন, যখন বিজয়ের পর বিজয়ের মাধ্যমে সম্মুখে অগ্রসর হইতে গিয়া আটলান্টিক মহাসমুদ্র তাঁহার পথের বাধা হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। এই সময় তিনি বলিয়াছিলেন, হে আল্লাহ! এই মহাসমুদ্র আমার অগ্রযাত্রার পথের প্রতিবন্ধক। অন্যথায় আমার মন চায় সমান্তরাল গতিতে আমি সামনে আগাইয়া যাই এবং জলে-স্থলে তোমার নামের মহিমা গাই (ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৪খ.)।
ইহার বিপরীতে গ্রীস, রোম ও পারস্যের লোকেরা যুগ স্রোতে ভাসিয়া যাইতে ও হাওয়ার অনুকূলে পাল তুলিতে অভ্যস্ত ছিল। কোন প্রকার জুলুম ও বাড়াবাড়ি তাহাদের ভেতর আন্দোলন সৃষ্টি করিতে অক্ষম ছিল। নীতিপরায়ণতা ও সত্যের প্রতি কোন আকর্ষণ তাহাদের মধ্যে ছিল না। কোন দাওয়াত বা আহ্হ্বান ও আকীদা-বিশ্বাস তাহাদের ধ্যান-ধারণা, চিন্তাধারা ও তাহাদের আবেগ-অনুভূতির উপর এভাবে ছাপ ফেলিত না যাহার জন্য নিজেদের সত্তাকে তাহারা বিস্মৃত হইতে পারে এবং নিজেদের আরাম-আয়েশ ও পার্থিব ভোগ-বিলাসকে বিপদের মুখে ঠেলিয়া দিতে পারে।
আরবগণ সভ্যতা-সংস্কৃতি, ভোগ-বিলাস ও আরামপ্রিয়তা হইতে সৃষ্ট এইসব ব্যাধি ও খারাপ অভ্যাস হইতে মুক্ত ছিল। ইহা কোন ঈমান-আকীদার জন্য উত্তাপ সৃষ্টিতে ও আত্মোৎসর্গের ক্ষেত্রে সর্বদাই প্রতিবন্ধক হইয়া থাকে এবং অধিকাংশ সময় মানুষের পায়ে বেড়ি পরাইয়া দেয়।
তাহাদের মধ্যে সত্যবাদিতা ছিল, আমানতদারি ও ছিল, ছিল বীরত্বও। মুনাফিকী, গাদ্দারী ও ষড়যন্ত্রের সহিত তাহার প্রকৃতি ছিল সামঞ্জস্যহীন। লড়াই-এর ক্ষেত্রে জীবন বাজি রাখিয়া লড়াকু যোদ্ধা, অশ্বপৃষ্ঠে অধিকক্ষণ অতিবাহিতকারী, কঠোর প্রতিরোধ ক্ষমতা ও সহ্য শক্তির অধিকারী, সহজ সরল জীবন যাপনে অভ্যস্ত, অশ্বারোহণ ও যুদ্ধ-বিগ্রহপ্রিয় যাহা এমন এক জাতিগোষ্ঠীর জন্য আবশ্যকীয় শর্ত যাহাকে দুনিয়ায় কোন বড় কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখিয়া যাইতে হইবে, বিশেষত সেই যুগে যখন লড়াই-সংঘর্ষ ও অভিযান পরিচালনার ধারাবাহিকতা চলিতে থাকে এবং বীরত্ব ও শৌর্য-বীর্য সাধারণ প্রদর্শনের ব্যাপক ঘটিতে থাকে।
দ্বিতীয় বিষয় এই যে, তাহাদের চিন্তাধারাগত ও কার্যকর সমূহশক্তি এবং স্বভাবজাত প্রাকৃতিক যোগ্যতাসমূহ নিরাপদ ও সুরক্ষিত ছিল এবং কাল্পনিক দর্শন, অনুপকারী যুক্তি-তর্কের কচকচানি ও খুটিনাটি বিষয়াদি, ইলমে কালামের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ও নাযুক অধ্যায়সমূহে অথবা স্থানীয় ও আঞ্চলিক গৃহযুদ্ধেও তাহা বিনষ্ট হয়নি। ইহা একটি উর্বর এবং এই দিক দিয়া নিরাপদ ও সুরক্ষিত জাতিগোষ্ঠী ছিল। তাহাদের জীবন উত্তাপ, আবেগ-উদ্দীপনা, আনন্দ-প্রফুল্লতা, অটুট সংকল্প ও লৌহ দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি দ্বারা ছিল ভরপুর।
স্বাধীনতা ও সাম্য, প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর সঙ্গে ভালবাসা, অনাড়ম্বর ও সারল্য তাহাদের অস্থি-মজ্জায় মিশিয়াছিল। তাহাদেরকে কখনও বিদেশী শক্তির সামনে মস্তকাবনত হইতে হয় নাই। এই জাতি গোলামী, একজন আরেক জনের উপর ছড়ি ঘুরাইবে এবং প্রভুত্ব করিবে এইরূপ অর্থের সঙ্গে অপরিচিত ছিল। তাহারা ইরানী ও রোমক রাজতন্ত্রের গর্ব ও অহমিকা এবং মানুষ মানুষকে ঘৃণা ও অবজ্ঞার চোখে দেখিবে এইরূপ অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত ছিল না। ইহার বিপরীতে পারস্য সম্রাটদেরকে (যাহারা আরব উপদ্বীপের প্রতিবেশী ছিল) অতি মানব জ্ঞান করা হইত। যদি পারস্য সম্রাট রক্ত মোক্ষণ করাইত কিংবা কোন ঔষধ ব্যবহার করিত তবে রাজধানীতে ঘোষণা প্রদান করা হইত যে, আজ মহামান্য সম্রাট রক্ত মোক্ষণ করাইয়াছেন কিংবা ঔষধ ব্যবহার করিয়াছেন। এই ঘোষণার পর শহরে কোন পেশাজীবী আপন পেশায় নিমগ্ন হইতে কিংবা কোন সরকারী কর্মকর্তা বা সভাসদ কাজ করিতে পারিত না (সাসানী আমলে ইরান, পৃ. ৩৩৫-৩৬)। যদি কখনও সম্রাটের হাঁচি আসিত তবে তাহার জন্য কোন মঙ্গলবাণী উচ্চারণের অধিকার কাহারও ছিল না। যদি তিনি নিজে কোন মঙ্গলবাক্য উচ্চারণ করিতেন তবুও ইহার সমর্থনে কিছু বলা যাইত না। যদি তিনি কখনও কোন উযীর কিংবা আমীরের বাসভবনে গমন করিতেন তবে এই দিনটিকে খুবই অস্বাভাবিক ও গুরুত্ববহ মনে করা হইত। সেই দিন হইতে সেই খান্দানের নূতন বর্ষপঞ্জী শুরু হইত এবং চিঠিপত্রে নূতন তারিখ বসানো হইত। একটি নির্ধারিত সময়সীমার জন্য তাহার ট্যাক্স মাফ করা হইত। উল্লিখিত ব্যক্তিকে নানা রকমের সম্মান, পুরস্কার, ক্ষমা ও পদোন্নতি দ্বারা ভূষিত করা হইত কেবল এইজন্য যে, সম্রাট পদধূলি দ্বারা তাহাকে ধন্য ও অনুগৃহীত করিয়াছেন (সাসানী আমলে ইরান)।
এ সব আদব, বন্দেগী ও সম্রাটকে তাজীম প্রদর্শনের আবশ্যকীয় শর্তের অতিরিক্ত যেইগুলি প্রদর্শন করা সাম্রাজ্যের কর্মকর্তা, দরবারের সভাসদবর্গ ও অপরাপর সকল মানুষের জন্য অপিরিহার্য ছিল। যেমন সম্রাটের সামনে হাত বাঁধিয়া দাঁড়াইয়া থাকা (লিসামুল আরব, ৭খ, পৃ. ৪৬৬, কাফফারার শিহরা দ্র.) (অর্থাৎ বুকের উপর হাত রাখিয়া আদবের সহিত মাথা নীচু করিয়া দেওয়া), তাহার সামনে এইভাবে আদবের সহিত দাঁড়াইয়া থাকা যেভাবে নামাযে আল্লাহর সামনে কেহ দাঁড়ায়। এ সেই সম্রাটের আমলের কথা বলা হইতেছে যিনি নওশেরওয়ানে 'আদিল বা ন্যায়বিচারক নওশেরওয়াঁ নামে পৃথিবীখ্যাত অর্থাৎ খসরূ ১ম (৫৩১-৫৭৯ খৃ.)। ইহা হইতে পরিমাপ করা যাইতে পারে যে, ইরানের সেই সম্রাটদের অবস্থা কি হইবে যাহারা জুলুম-নিপীড়ন ও নির্দয়তার ক্ষেত্রে স্ব স্ব আমলে কুখ্যাত ছিল।
মুক্ত চিন্তা ও মতামত প্রকাশ (সমালোচনা নয়) বিস্তৃত ইরানী সাম্রাজ্যে প্রায় হারাইয়া গিয়াছিল। এই ব্যাপারে ঐতিহাসিক তাবারী "ন্যায়বিচারক সম্রাট নওশেরওয়া"র একটি চিত্তাকর্ষক কাহিনী বর্ণনা করিয়াছেন যদ্দ্বারা আমরা পরিমাপ করিতে পারি যে, ইরানী রাজতন্ত্রে মতামত প্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতার উপর কত কঠিন বাধানিষেধ আরোপিত ছিল এবং শাহী দরবারে মুখ খোলার কি মূল্য পরিশোধ করিতে হইত। ঘটনাটি "সাসানী আমলে ইরান" নামক গ্রন্থের লেখক ঐতিহাসিক তাবারীর সূত্রে লিপিবদ্ধ করিয়াছেন:
"সম্রাট একটি কাউন্সিল সভার আয়োজন করেন এবং রাজস্ব বিভাগের পরিচালক/সচিবকে নির্দেশ দেন জমির খাজনার নূতন ভাষ্য সজোরে পাঠ করিয়া শুনাইতে। তিনি তাহা পাঠ করিলে সম্রাট খসরু (নওশেরওয়াঁ) উপস্থিত লোকদেরকে দুইবার জিজ্ঞাসা করেন, কাহারো কোন আপত্তি নাই তো? সকলেই ছিল নিশ্চুপ। যখন সম্রাট তৃতীয়বারের মত একই প্রশ্ন করিলেন তখন একজন দাঁড়াইয়া সসম্মানে জিজ্ঞেসা করিল: সম্রাটের ইচ্ছা কি এই যে, অস্থাবর জিনিসের উপর স্থায়ী টাক্স বসাইবেন যাহা কাল-পরিক্রমায় অবিচার ও বে-ইনসাফীতে পর্যবসিত হইবে? ইহাতে সম্রাট ক্রোধে চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠেন, ওহে অভিশপ্ত বেআদব! তোর পরিচয় কি? কোথা হইতে আসিয়াছিস? সে উত্তরে জানাইল যে, সে রাজস্ব কর্মকর্তাদের একজন। সম্রাট তখন নির্দেশ দেন কলমদানি দিয়া পিটাইয়া তাহাকে মারিয়া ফেলিতে। ইহার পর পরিচালক/সচিবদের সকলেই তাহাকে কলমদানি দিয়া পিটাইতে শুরু করে। ফলে বেচারা সেখানেই মারা যায়। ইহার পর সকলেই বলিল, সম্রাট! আপনি যে ট্যাক্স আমাদের উপর ধার্য করিয়াছেন তা খুবই যুক্তিযুক্ত ও ন্যায়ানুগ হইয়াছে” (সাসানী আমলে ইরান, পৃ. ৫১১)।
ভারতবর্ষে সম্মান ও সম্ভ্রমের অপমান ও অবমাননা এবং সেইসব পশ্চাৎপদ শ্রেণীর প্রতি ঘৃণা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন (যাহাদেরকে বিজয়ী আর্য জাতিগোষ্ঠী ও দেশীয় আইন একটি নিকৃষ্টতম সৃষ্টি হিসাবে অভিহিত করিয়াছিল এবং যাহারা গৃহপালিত পশু হইতে কেবল এই দিক দিয়া ভিন্ন ছিল যে, ইহারা দুই পায়ে ভর দিয়া চলিত এবং দেখিতে মানুষের মত) কল্পনাতীত ছিল। উক্ত আইনে ইহা নিয়মিত ধারা হিসাবে বর্ণিত ছিল যে, যদি কোন শূদ্র কোন ব্রাহ্মণকে মারিবার উদ্দেশে হাত উঠায় কিংবা লাঠি উঠায় তবে তাহার হাত কাটিয়া দিতে হইবে। যদি লাথি মারে তবে তাহার পা কাটিয়া দিতে হইবে। যদি সে দাবি করে যে, সে ব্রাহ্মণকে লেখাপড়া শিখাইতে পারে, তবে তাহাকে ফুটন্ত ভৈল পান করানো হইবে। এই আইনের দৃষ্টিতে কুকুর, ব্যাঙ, গিরগিটি, কাক, উল্লু ও অদ্যুৎ বা অস্পৃশ্য শ্রেণীর কাহাকেও হত্যা করিলে তাহার জরিমানা ছিল একইরূপ (মনু সংহিতা, ১০ম অধ্যায়)।
রোমকরাও এই ব্যাপারে ইরানীদিগের হইতে বেশী কিছু ভিন্ন ছিল না, যদিও নির্লজ্জতা ও মানবতাকে অপমান-অপদস্ত করিবার ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন পর্যায়ে তাহারা পৌঁছিতে পারে নাই। একজন পাশ্চাত্য ঐতিহাসিক Victor Chopart তদীয় The Roman World নামক গ্রন্থে বলেন, "রোম সম্রাট কাইজারকে উপাস্য মনে করা হইত। বিষয়টি মৌরছী ও পারিবারিকভাবে ছিল না, বরং যিনিই সিংহাসন ও রাজমুকুটের মালিক হইতেন তাহাকেই খোদার আসনে অধিষ্ঠিত করা হইত, যদিও তাহার ভেতর এমন কোন চিহ্ন থাকিত না যাহা তাহার এই স্তরে অধিষ্ঠিত হইবার দিকে ইঙ্গিত দেয়। Augustus- এর শাহী উপাধি এক সম্রাট হইতে অপর সম্রাট অবধি সংবিধান ও আইন অনুযায়ী স্থানান্তরিত হইত না, বরং রোমক সরকারী সংসদের কাজ কেবল এতটুকুই ছিল যে, এমন প্রতিটি নির্দেশ যাহা তরবারির তীক্ষ্ণ ধারের জৌরে প্রচারিত হইবে তাহা প্রচারিত হইতে দেওয়া। এই রাজত্ব ও বাদশাহী ছিল কেবল এক ধরনের সামরিক একনায়কতন্ত্রেরই রূপ (The Roman World, London 1928, P. 418)।
যদি ইহার তুলনা করা হয় আরবদের স্বাধীনতাপ্রিয়তা, আত্মসম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার সঙ্গে, যাহা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে তাহাদের মাঝে দেখিতে পাওয়া যায়, তাহা হইলে এই দুই জাতিগোষ্ঠীর মেযাজ এবং আরব ও অনারব সমাজের পার্থক্য সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হইবে। তাহারা কখনও তাহাদের বাদশাহকে ابيت اللعن ও عم صباحا (অর্থাৎ আপনি সর্বপ্রকার দোষ-ত্রুটি হইতে মুক্ত থাকুন এবং আপনার প্রভাত কল্যাণময় হউক)-এর মত শব্দসমষ্টি দ্বারা সম্বোধন করিত। এই স্বাধীনতা ও আত্মপরিচিতি, আপন মান-সম্ভমের হেফাজত ও রক্ষণাবেক্ষণ আরবদের মধ্যে এই পরিমাণে ছিল যে, তাহারা তাহাদের বাদশাহ ও আমীর-উমারার কোন কোন দাবি পূরণ করিতেও অনেক সময় আপত্তি করিত। এই সম্পর্কিত একটি চিত্তাকর্ষক কাহিনী ইতিহাসের পাতায় বর্ণিত হইয়াছে যে, একবার এক আরব বাদশাহ বনী তামীমের এক ব্যক্তির নিকট সিকার নামক একটি ঘোটকী চাহিয়া বসে। লোকটি ঘোটকী দিতে পরিষ্কারভাবে অস্বীকার করে এবং নিম্নোক্ত বিখ্যাত কবিতা আবৃত্তি করে: ابيت اللعن أن سكاب علق + نفيس لا تعار ولا تباع فلا تطمع ابيت اللعن فيها + ومنعكها بشئ يستطاع "হে রাজন! এই বহু দামী ও সুন্দরী ঘোটকী; ইহাকে না ধার দেওয়া যায়, না বিক্রয় করা যায়। আপনি ইহাকে পাইবার জন্য চেষ্টা করিবেন না; আপনার হাত হইতে ইহাকে ফেরানো আমার পক্ষে সম্ভব” (দীওয়ান-ই হামাসা, বাবুল-হামাসা, পৃ. ৬৭-৮)।
ঠিক অনুরূপ একটি ঘটনা সংঘটিত হয় যখন হযরত মুগীরা ইব্‌ন শু'বা (রা) মুসলিম পক্ষের দূত হিসাবে পারসিক সেনাপতি রুস্তমের দরবারে গিয়াছিলেন। রুস্তম পূর্ণ জাঁকজমক ও শাহী জৌলুসের সঙ্গে স্বীয় সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন। মুগীরা ইব্‌ন শু'বা (রা) আরবদের অভ্যাস মাফিক রুস্তমের পাশাপাশি স্থাপিত কুরসীতে গিয়া বসিয়া পড়েন। তাহার দরবারীরা সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়ে এবং তাঁহাকে টানিয়া নীচে নামাইয়া আনে। ইহাতে তিনি বলেন: আমরা খবর পাইয়াছিলাম তোমরা নাকি খুবই বুদ্ধিমান। কিন্তু আমার চোখে তোমাদের চেয়ে বেকুফ আর কাহাকেও দেখিতে পাইতেছি না। আমরা আরবরা তো সকলের সঙ্গে সমান ব্যবহার করিয়া থাকি। আমাদের মধ্যে কেহ কাহাকে গোলাম বানায় না একমাত্র যুদ্ধাবস্থা ছাড়া। আমার ধারণা ছিল, তোমরাও তোমাদের জাতির সঙ্গে ঠিক তেমনি সাম্যের আচরণ করিয়া থাকিবে। তোমরা আমাকে প্রথমেই অবহিত করিলে ভাল হইত যে, তোমরা একে অপরকে নিজেদের খোদা বানাইয়া রাখিয়াছ এবং এই বিষয়ে তোমাদের সঙ্গে নিষ্পত্তি হইবে না। এমতাবস্থায় আমরা তোমাদিগের সঙ্গে এই আচরণ করিতাম না, আর তোমাদিগের নিকটও আগমন করিতাম না। কিন্তু তোমরা নিজেরাই আমাদিগকে দাওয়াত দিয়াছ (তারীখ তাবারী, ৪খ, পৃ. ১০৮)।
আরব উপদ্বীপে শেষ নবী প্রেরণের দ্বিতীয় কারণ হইল, এখানে মক্কা মু'আজ্জমায় কা'বার অস্তিত্ব ও উপস্থিতি যাহা হযরত ইবরাহীম ও হযরত ইসমা'ঈল (আ) এজন্যই নির্মাণ করিয়াছিলেন যেন তাহাতে এক আল্লাহর ইবাদত করা হয় এবং এই জায়গাটি চিরদিনের জন্য তাওহীদের দাওয়াতের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
إِنَّ أَوَّلَ بَيْتٍ وُضِعَ لِلنَّاسِ لَلَّذِي بِبَكَّةَ مُبَارَكًا وَهُدًى لِلْعَلَمِينَ.
বাইবেল (পুরাতন নিয়ম) গ্রন্থে ব্যাপক পরিমাণ বিকৃতি সত্ত্বেও "বাক্কা' উপত্যকা" শব্দটি অদ্যাবধি বর্তমান, কিন্তু অনুবাদকগণ ইহাকে বুকা' উপত্যকা বানাইয়া দিয়াছেন এবং ইহাকে নির্দিষ্ট জ্ঞাপকের পরিবর্তে অনির্দিষ্ট জ্ঞাপকে পরিণত করিয়াছেন। গীত সংহিতায় ইহার যে শব্দসমষ্টি যাহা আরবী ভাষায় আসিয়াছে তাহা এই:
طوبي لاناس عزهم بك طرق بيتك في قلوبهم عابرين في وادي البكاء يصيرونه ينبوعا .
"বরকতময় ও পবিত্র সেই মানুষ যাঁহার ভেতর তোমার পক্ষ হইতে শক্তি নিহিত, যাঁহার অন্তরে রহিয়াছে তোমার ঘরের রাস্তা যিনি বুকা উপত্যকা অতিক্রমরত অবস্থায় তাহাকে একটি কুয়া বানান” (গীত সংহিতা, ৮৪ : ৫, ৬, ৭; পবিত্র গ্রন্থ, বৃটিশ এন্ড ফরেন বাইবেল সোসাইটি)। কিন্তু ইয়াহুদী পণ্ডিতগণ কয়েক শতাব্দী পর অনুভব করিতে সক্ষম হন যে, এই অনুবাদ ভুল। অনন্তর Jewish Encyclopaedia-তে এই স্বীকারোক্তি বর্তমান যে, ইহা এক নির্দিষ্ট উপত্যকা যেখানে পানি পাওয়া যাইত না। যাহারা উপরোল্লিখিত কথা লিখিয়াছেন তাহাদের মস্তিষ্কে এমন একটি উপত্যকার ছবি ছিল যাহার ছিল বিশেষ কুদরতী অবস্থা, যাহার প্রতিনিধিত্ব তাহারা উল্লিখিত শব্দসমষ্টি দ্বারা করিয়াছেন (২খ, পৃ. ৪১৫) ।
ঐসব সহীফার ইংরাজী অনুবাদকগণ অনুবাদের ক্ষেত্রে আরবী অনুবাদকদের তুলনায় অধিকতর বিশ্বস্ততা ও সতর্কতার প্রমাণ দিয়াছেন। তাঁহারা "বাক্কা" শব্দটিকে মূল সহীফার ন্যায় অবিকৃত ও বিশুদ্ধ অবস্থায় হুবহু অবশিষ্ট রাখিয়াছেন এবং ইংরাজী "b" অক্ষরে না লিখিয়া বড় "B" অক্ষরে লিখিয়াছেন, যেমন সাধারণত Noun-এর ক্ষেত্রে লেখা হইয়া থাকে। ইংরাজী অনুবাদ নিম্নে উদ্ধৃত হইল: Blessed is the man whose strength is in Thee in whose heart are the ways of them. Who passing through the Valley of Baca make it a well. Psalm 84. 5-6. (মাওলানা আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদীকৃত তাফসীরে মাজেদী, কাযী সুলায়মান মানসুরপূরীর 'রাহমাতুল্লিল 'আলামীন, ১ম খণ্ড হইতে গৃহীত)।
"মুবারকবাদ সেইসব লোকের প্রতি যাহাদের সম্মান ও শক্তি রহিয়াছে তোমার সহিত যাহাদের অন্তরে তাহাদের রাস্তা রহিয়াছে যাহা বাক্কা উপত্যকা অতিক্রম করিবে এবং তাহাকে একটি কুয়া বানাইবে”।
রাসূলুল্লাহ (স)-এর পবিত্র আবির্ভাব ছিল হযরত ইবরাহীম ও ইসমা'ঈল (আ)-এর সেই দু'আর ফল যাহা তাঁহারা কা'বা গৃহের ভিত্তি স্থাপন করিতে গিয়া ও তাহা নির্মাণ করার সময় করিয়াছিলেন: رَبَّنَا وَابْعَثْ فِيهِمْ رَسُولاً مِّنْهُمْ يَتْلُوا عَلَيْهِمْ أَيْتِكَ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَيُزَكِّيهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ. "হে আমাদের প্রতিপালক! তাহাদের মধ্য হইতে তাহাদের নিকট এক রাসূল প্রেরণ কর যে তোমার আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট আবৃত্তি করিবে, তাহাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবে এবং তাহাদেরকে পবিত্র করিবে। তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়” (২: ২২৯)।
আসমানী সহীফা ও সত্য সংবাদসমূহ এইসব উদাহরণে ভরপুর। স্বয়ং তাওরাতে ইহার প্রমাণ বিদ্যমান যে, আল্লাহ তা'আলা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর এই দু'আ কবুল করেন। পুস্তকে (২০) পরিষ্কারভাবে লিখিত আছে:
"এবং ইসমাঈলের অনুকূলে আমি তোমার কথা শুনিলাম। দেখ. আমি তাহাকে প্রাচুর্য দান করিব, তাহাকে সৌভাগ্যশালী করিব এবং তাহাকে খুব বর্ধিত করিব, তাহার হইতে বারজন সর্দার জন্ম নিবে এবং তাহাকে বিরাট বড় জাতি (কওম) বানাইব।"
এইজন্যই রাসূলুল্লাহ (স) হইতে বর্ণিত হইয়াছে যে, তিনি তাঁহার নিজের সম্পর্কে বলিতেন, أنا دعوة ابراهيم وبشرى عيسى "আমি ইবরাহীম (আ)-এর দু'আ এবং ঈসা (আ)-র সুসংবাদ” (মুসনাদে আহমাদ)। তাওরাত-এ বিকৃতি সত্ত্বেও অদ্যাবধি ইহার সাক্ষ্য মিলিব যে, এই দু'আ কবুল হয়। দ্বিতীয় বিবরণ পুস্তকে (১৫-১৮) মূসা (আ)-র ভাষায় উদ্ধৃত হইয়াছে: يقيم لك الرب الهك نبيا من وسطك من اخوتك مثلى له تسمعون. "খোদাওয়ান্দ তোমার প্রভু তোমার রব তোমার নিমিত্ত তোমারই ভেতর হইতে তোমারই ভাইদের হইতে আমার মত একজন নবী পাঠাইবেন; তোমরা গভীর মনোযোগের সহিত তাঁহার কথা শুনিবে।"
اخوتك (তোমার ভাই) শব্দ নিজে হইতেই বলিয়া দেয় যে, ইহার দ্বারা বনী ইসমাঈলকেই বোঝানো হইতেছে যে, বনী ইসরাঈলের চাচার বংশধর। উক্ত সহীফাতেই দুইটি শ্লোকের পর এই বাক্য লিপিবদ্ধ রহিয়াছে:
قال لى الرب قد احسنوا فيما تكلموا اقيم لهم نبيا من وسط اخوتهم مثلك واجعل كلامي في فمه فيكلمهم بكل ما اوصيه به.
"আর খোদাওয়ান্দ আমাকে বলিলেন যে, তাহারা যাহা বলিয়াছে তাহা ভালই বলিয়াছে। আমি তাহাদের নিমিত্ত তাহাদের ভাইদের মধ্য হইতে তোমার মত একজন নবী পাঠাইব, আর আমি আমার বাক্য তাহার মুখে নিক্ষেপ করিব এবং যাহা কিছু আমি তাহাকে বলিব সে তাহা সব তাহাদেরকে বলিবে" (যাত্রাপুস্তক-২, ১৮:১৭-১৮)।
(اجعل كلامي في فمه )আমি আমার কথা তাঁহার মুখে নিক্ষেপ করিব) এই বাক্যটি মুহাম্মাদ (স)-কে নির্দিষ্টভাবে ইঙ্গিত দিতেছে। কেননা তিনিই একমাত্র নবী যাহার উপর আল্লাহ্ কালাম শব্দগত ও অর্থগতভাবে নাযিল হইয়াছে এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁহার ঘোষণাও দিয়াছেন:
وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى أَنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى. "এবং তিনি মনগড়া কথা বলেন না; ইহা তো ওহী যাহা তাঁহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়" (সূরা নাজমঃ ৩-৪)।
لَا يَأْتِيْهِ الْبَاطِلُ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَلَا مِنْ خَلْفِهِ تَنْزِيلٌ مِّنْ حَكِيمٍ حَمِيدٌ. "কোন মিথ্যা ইহাতে অনুপ্রবেশ করিবে না, সামনে হইতেও নয়, পিছন হইতেও নয়; এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসার্হ আল্লাহ্র নিকট হইতে অবতীর্ণ" (হামীম আস-সাজদা, ৪২ আয়াত)।
ইহার বিপরীতে বানু ইসরাঈলের নবীদের সহীফাসমূহ আদৌ এই দাবি করে না যে, সেগুলো শব্দগত ও অর্থগতভাবে আল্লাহর কালাম। তাহাদের পণ্ডিতগণও সেইসবকে তাহাদের নবীদের দিকে সম্পর্কযুক্ত করার ক্ষেত্রে কৃত্রিমতার আশ্রয় গ্রহণ করে না। Jewish Encyclopaedia-তে বলা হইয়াছে:
"ওল্ড টেস্টামেন্ট (পুরাতন নিয়ম)-এর প্রথম পাঁচটি পুস্তক (যেমন প্রাচীন ইয়াহুদী-ধর্মীয় কিংবদন্তী আমাদেরকে বলে) মূসা নবীর রচনা। শেষ আটটি শ্লোক বাদে [যেগুলিতে মূসা (আ)-এর ইনতিকালের ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে]। রিব্বীগণ (ইয়াহুদী 'আলিম) এই বৈপরীত্য ও পরস্পর হইতে ভিন্ন বর্ণনার উপর গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করিতে থাকে যাহা এসব সহীফায় আসিয়াছে এবং ইহার মধ্যে নিজেদের কৌশল ও বুদ্ধিবৃত্তির সাহায্যে সংশোধন করিতে থাকে” (Jewish Encyclopaedia, vol. 8, P. 589) ।
ইনজীল চতুষ্টয়ের সম্পর্ক যতখানি, যেগুলোকে "নিউ টেস্টামেন্ট বা নূতন নিয়ম" বলা হয়, সেগুলি শব্দগত ও অর্থগতভাবে আল্লাহর কালাম হওয়ার ব্যাপারে দূরতম সম্পর্কও নাই। এই ব্যাপারে তাহারাই সন্দেহ নিরসন করিতে পারেন যাহারা এগুলি পড়িয়া দেখিয়াছেন। প্রকৃত ব্যাপার এই যে, এসব পুস্তক জীবনী ও কাহিনীমূলক পুস্তক হিসাবেই অধিক প্রতিভাত হয়। আল্লাহ্ অবতীর্ণ কিতাব হিসাবে, যাহার ভিত্তি হয় ওহী ও ইলহাম, তাহা ইহাতে খুবই কম দৃষ্ট হয় (বিস্তারিত দ্র. লেখকের منصب نبوت এর ৭ম বক্তৃতা ختم نبوت এর "আসমানী সহীফা ও কুরআন জ্ঞান ও ইতিহাসের আলোকে" নামক অধ্যায়)।
ইহার পরের নম্বরে আসে জযীরাতু'ল 'আরবের তথা আরব উপদ্বীপের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থানের যাহা ইহাকে দাওয়াতের কেন্দ্র হিসাবে সর্বাধিক উপযোগী রূপ দান করিয়াছে, যেখান হইতে এই দাওয়াত সমগ্র বিশ্বে পৌঁছাইয়া দেওয়া যায় এবং পৃথিবীর তাবৎ জাতিগোষ্ঠীকে সম্বোধন করা যায়। একদিকে ইহা এশিয়া মহাদেশের একটি অংশ, অপরদিকে তাহা আফ্রিকা মহাদেশ, ইহার পর য়ুরোপেরও কাছাকাছি এবং ইহা সেই এলাকা যাহা সভ্যতা ও কৃষ্টি, জ্ঞান ও শিল্পকলা, ধর্ম ও দর্শনের সর্বদাই কেন্দ্র থাকিয়াছে এবং যেখানে বিরাট বিস্তৃত ও শক্তিশালী সাম্রাজ্য কায়েম হইয়াছে। অতঃপর এই এলাকা বাণিজ্যিক কাফেলার অতিক্রমস্থলও ছিল যাহার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের লোক একে অপরের সঙ্গে মিলিত হইত। ইহা ছিল কয়েকটি মহাদেশের সঙ্গমস্থল এবং এক জায়গার নির্দিষ্ট বস্তুসামগ্রী ও উৎপাদিত দ্রব্য, যেখানে ইহার প্রয়োজন পড়িত, সেখানে স্থানান্তরিত করিত। ১ এই আরব উপদ্বীপ দুই বিরাট প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মাঝে অবস্থিত ছিল: খৃস্টান শক্তি ও অগ্নি উপাসক শক্তি, প্রাচ্য শক্তি ও পাশ্চাত্য শক্তি। কিন্তু এতদসত্ত্বেও তাহারা নিজস্ব স্বাধীনতা ও আপন ব্যক্তিত্বের সর্বদাই হেফাজত করিয়াছে এবং নিজেদের কতিপয় সীমান্ত এলাকা ও কতকগুলো গোত্র ব্যতিরেকে তাহারা কখনো ঐসব শক্তির অধীনতা স্বীকার করে নাই। আরব উপদ্বীপ বিনা প্রশ্নে নির্দ্বিধায় নবৃওয়াতের এমন এক বিশ্বব্যাপী দাওয়াতের কেন্দ্রে পরিণত হইতে পারিত যাহা আন্তর্জাতিক রেখার উপর প্রতিষ্ঠিত হইবে, মানবতাকে সমুন্নত মঞ্চ হইতে সম্বোধন করিবে, সর্বপ্রকার রাজনৈতিক চাপ ও বিদেশী প্রভাব হইতে পরিপূর্ণরূপে স্বাধীন হইবে।
এই সমস্ত কারণে আল্লাহ তা'আলা আরব উপদ্বীপ ও মক্কা মুকাররামাকে রসূলুল্লাহ (স)-এর আবির্ভাব, আসমানী ওহীর অবতরণ এবং দুনিয়ার বুকে ইসলাম প্রচারের বিশ্বব্যাপী কেন্দ্র ও সূচনাবিন্দু হিসাবে নির্বাচিত করেন। اللَّهُ أَعْلَمُ حَيْثُ يَجْعَلُ رَسَالَتَهُ "আল্লাহই বেশী জানেন তাঁহার পয়গাম কোথায় এবং কাহাকে সোপর্দ করিবেন (৬ঃ ১২৪)।
গ্রন্থপঞ্জী: বরাত নিবন্ধ গর্বে এবং টীকা আকারে প্রদত্ত হইয়াছে। নিবন্ধটি সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নাদবী (র)-এর 'নবীয়ে রহমাত' গ্রন্থ হইতে সন্নিবিষ্ট করা হইয়াছে। অনুবাদঃ আ. স. ম. ওমর আলী

টিকাঃ
১. ড. হুসায়ন কামালুদ্দীন রিয়াদ ভার্সিটির ইঞ্জিরিং কলেজের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার সভাপতি। তিনি এক সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়া বলেন যে, তিনি এক নূতন ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণে উপনীত হইয়াছেন যদ্দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মক্কা মুকাররামা পৃথিবীর শুষ্ক অংশের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। তিনি তাঁহার গবেষণার সূচনা করিয়াছেন এমন একটি চিত্র দ্বারা যেখানে মক্কা মুকাররামা হইতে পৃথিবীর অপরাপর স্থানের দূরত্ব দেখানো হইয়াছিল। ইহার দ্বারা তাঁহার কাছে এই 'সত্যও দিবালোকের মত স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে যে, মক্কা মুকাররামী ঠিক দুনিয়ার মাঝখানে অবস্থিত। এই গবেষণা দ্বারা তাঁহার সামনে এই রহস্যও উন্মোচিত হইয়াছে যে, মক্কা মুকাররামাকে বায়তুল্লাহর কেন্দ্র ও আসমানী হেদায়াতের সূচনা বিন্দু বানাইবার মধ্যে আল্লাহর কি রহস্য ও কুদরত নিহিত ছিল (দৈনিক আল-আহরাম, ৫ জানুয়ারী, ১৯৯৭ খৃ.).

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আরব সমাজে নারী জাতির দুর্দশা

📄 আরব সমাজে নারী জাতির দুর্দশা


মহানবী (স)-এর আবির্ভাবকালে সমগ্র পৃথিবীতে নারী জাতির অবস্থা ছিল অতি শোচনীয় ও মর্মান্তিক। আরব সমাজেও নারীর অবস্থা উহার তুলনায় মোটেই উন্নততর ছিল না। নারী তাহার দেহের রক্ত দিয়া মানব বংশধারা অব্যাহত রাখিলেও তাহার সেই অবদানের কোন স্বীকৃতি ছিল না। সে পিতা, ভ্রাতা, স্বামী সকলের দ্বারাই নিগৃহীত হইত। যুদ্ধবন্দী হইলে হাটে-বাজারে দাসীরূপে বিক্রয় হইত চতুষ্পদ পশুর ন্যায়। আরব সমাজে কন্যা সন্তানের জন্মই ছিল এক অশুভ লক্ষণ, সম্মান হানিকর ও আভিজাত্যে কুঠারাঘাততুল্য। তাই কন্যার জন্মগ্রহণের সংগে সংগে তাহার জন্মদাতা লজ্জায় ও অপমানে মুখ লুকাইয়া বেড়াইত এবং হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হইয়া তাহাকে জীবন্ত মাটিচাপা দিতেও কুণ্ঠাবোধ করিত না। কুরআন মজীদে তাহা এইভাবে তুলিয়া ধরা হইয়াছেঃ
وَاِذَا بُشِّرَ اَحَدُهُمْ بِالْاُنْثٰى ظَلَّ وَجْهُهُ مُسْوَدًّا وَّهُوَ كَظِيْمٌ يَّتَوَارٰى مِنَ الْقَوْمِ مِنْ سُوْءِ مَا بُشِّرَ بِهِ اَيُمْسِكُهُ عَلٰى هُوْنٍ اَمْ يَّدُسُّهُ فِي التُّرَابِ اَلَا سَاءَ مَا يَحْكُمُوْنَ.
"তাহাদের কাহাকেও যখন কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয় তখন তাহার মুখমণ্ডল কালো হইয়া যায় এবং সে অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট হয়। তাহাকে যে সংবাদ দেওয়া হয় উহার গ্লানিহেতু সে নিজ সম্প্রদায় হইতে আত্মগোপন করে। সে চিন্তা করে, হীনতা সত্ত্বেও সে উহাকে রাখিয়া দিবে, না মাটিতে পুঁতিয়া ফেলিবে। সাবধান! তাহারা যাহা সিদ্ধান্ত করে তাহা কত নিকৃষ্ট” (১৬: ৫৮-৫৯; আরও দ্র. ৪৩:১৭)।
وَاِذَا الْمَوْءُدَةُ سُئِلَتْ بِاَيِّ ذَنْبٍ قُتِلَتْ.
"যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে, কী অপরাধে তাহাকে হত্যা করা হইয়াছিল” (৮১:৮-৯)?
এই প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত হাদীছে একটি মর্মান্তিক ঘটনা বর্ণিত হইয়াছে যাহার বিবরণ শ্রবণ করিয়া মহানবী (স) তাঁহার দুই চোখের পানি ছাড়িয়া দেন :
إِنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّا كُنَّا أَهْلُ جَاهِلِيَّةٍ وَعَبَدَةُ أَوْثَانِ فَكُنَّا نَقْتُلُ الْأَوْلَادَ وَكَانَتْ عِنْدِي ابْنَةٌ لِي فَلَمَّا أَجَابَتْ وَكَانَتْ مَسْرُورَةٌ بِدُعَائِي إِذَا دَعَوْتُهَا فَدَعَوْتُهَا يَوْمًا فَاتَّبَعَتْنِي فَمَرَرْتُ حَتَّى أَتَيْتُ بِئْرًا مِنْ أَهْلِي غَيْرَ بَعِيدٍ فَأَخَذْتُ بِيَدِهَا فَرَدَّيْتُ بِهَا فِي الْبِئْرِ وَكَانَ آخِرُ عَهْدِي بِهَا أَنْ تَقُولَ يَا أَبَتَاهُ يَا اَبْنَاهُ فَبَكَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَتَّى وَكَفَ دَمْعُ عَيْنَيْهِ فَقَالَ لَهُ رَجُلٌ مِّنْ جُلَسَاء رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحْزَنْتَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ لَهُ كَفَّ فَإِنَّهُ يَسْئَلُ عَمَّا أَهَمَّهُ ثُمَّ قَالَ لَهُ أَعِدْ عَلَى حَدِيثَكَ فَأَعَادَهُ فَبَكَى حَتَّى وَكَفَ الدَّمْعُ مِنْ عَيْنَيْهِ عَلَى لِحْيَتِهِ ثُمَّ قَالَ لَهُ إِنَّ اللَّهَ قَدْ وَضَعَ عَنِ الْجَاهِلِيَّةِ مَا عَمِلُوا فَاسْتَأْنِفْ عملك.
"এক ব্যক্তি নবী (স)-এর নিকট আসিয়া বলিল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা ছিলাম জাহিলী যুগের লোক এবং প্রতীমা পূজারী। আমরা সন্তানদিগকে হত্যা করিতাম। আমার একটি কন্যা সন্তান ছিল। আমি ছিলাম তাহার খুব প্রিয়। আমি ডাকিলে সে আমার ডাকে খুবই আনন্দিত হইয়া সাড়া দিত। একদিন আমি তাহাকে ডাকিলে সে আমার নিকট চলিয়া আসে। আমি (তাহাকে সঙ্গে লইয়া) অনতি দূরে আমাদের পরিবারের একটি কূপের নিকট আসিলাম। আমি তাহার হাত ধরিয়া তাহাকে কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করিলাম। তাহার শেষ বাক্য যাহা আমার কর্ণগোচর হইয়াছে তাহা হইল, আব্বা, হায় আব্বা। (ইহা শুনিয়া) রাসূলুল্লাহ (স) কাঁদিলেন, এমনকি তাঁহার দুই চক্ষু হইতে অশ্রুর ফোটা পড়িতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স)-এর দরবারে উপস্থিত এক ব্যক্তি লোকটিকে বলিল, তুমি রাসূলুল্লাহ (স)-কে বেদনাতুর করিয়াছ। রাসূলুল্লাহ (স) তাহাকে বলিলেন: থামো, যে বিষয় তাহাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করিয়াছে সে সেই সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিতেছে। অতঃপর তিনি তাহাকে বলিলেন: আমার নিকট তোমার ঘটনাটির পুনরাবৃত্তি কর। সে তাহার পুনরাবৃত্তি করিলে তিনি আবারও কাঁদিলেন, এমনকি তাঁহার চক্ষুদ্বয় হইতে অশ্রুর ফোটা গড়াইয়া তাঁহার দাড়িতে পতিত হইল। অতঃপর তিনি তাহাকে বলেন: জাহিলী যুগে তাহারা যাহা করিয়াছে, তাহা আল্লাহ ক্ষমা করিয়াছেন। অতএব তুমি এখন নূতন উদ্যমে কাজ কর" (সুনানুদ দারিমি, মুকাদ্দিমা, প্রথম বাব, হাদীছ নং ২)।
প্রখ্যাত আরব কবি ফারাযদাকের পিতামহ সা'সা'আ ইব্‌ন নাজিয়া আল-মুজাশিঈ (রা) বলিলেন, "ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি জাহিলী যুগে কিছু উত্তম কাজও করিয়াছি। তন্মধ্যে একটি এই যে, আমি ৩৬০টি কন্যা সন্তানকে জীবন্ত প্রোথিত হওয়া হইতে রক্ষা করিয়াছি। ইহাদের প্রত্যেকের জীবনের জন্য আমাকে দুইটি করিয়া উট বিনিময় মূল্যরূপে প্রদান করিতে হইয়াছে। আমি কি ইহার সওয়াব পাইব? নবী (স) বলিলেন: হাঁ, তোমার জন্য সওয়াব রহিয়াছে। তাহা এই যে, আল্লাহ তাআলা তোমাকে ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য দান করিয়াছেন" (তাবারানীর বরাতে তাফহীমুল কুরআন, উর্দু সংস্করণ, ৬খ, পৃ. ২৬৬, টীকা ৯)।
জাহিলী যুগে কোন মেয়েকে জীবন্ত কবরস্থ করিতে দেখিলে যায়দ ইবন আমর ইব্‌ন নুফায়ল অর্থব্যয়ে তাহাকে ক্রয় করিয়া মুক্ত করিয়া দিতেন। স্বীয় কন্যাকে জীবন্ত কবরস্থ করার মনোভাব কোন লোকের মধ্যে দেখিলে তিনি তাহাকে বলিতেন, "তুমি তাহাকে হত্যা করিও না, বরং আমি তোমাকে তাহার যথাযথ বিনিময় প্রদান করিতেছি, তাহার বদলে মেয়েটি আমাকে প্রদান কর।" এইভাবে তিনি মেয়ে গ্রহণ করিতেন। তাহার পর মেয়েটি যখন অস্থিরতা প্রদর্শন করিত, তিনি তাহার পিতাকে বলিতেন, তুমি চাহিলে তাহাকে তোমার নিকট ফিরাইয়া দিব, আর তুমি চাহিলে তাহার পূর্ণ বিনিময় দিয়াই গ্রহণ করিব (ইমাম বুখারী, আল-জামি, মানাকিবুল আনসার, বাব হাদীছ যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল, নং ৩৮২৮)।
উপরিউক্ত বিবরণ হইতে প্রতিভাত হয় যে, কত ব্যাপক হারে কন্যা সন্তানদের হত্যা করা হইত। হযরত উমার ফারুক (রা) বলেন, وَاللَّهِ إِنْ كُنَّا فِي الْجَاهِلِيَّةِ مَا نَعُدُّ لِلنَّسَاءِ أَمْرًا . "আল্লাহ্র শপথ! জাহিলী যুগে আমরা নারীদের কোন ধর্তব্যের বিষয় হিসাবে গণ্য করিতাম না" (ইসলামী সমাজে নারী, পৃ. ২৬)।
জাহিলী আরব সমাজে বিবাহের কোন নির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। যে যত সংখ্যক নারীকে ইচ্ছা বিবাহ করিতে পারিত। নিম্নের হাদীছদ্বয় হইতে ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়: قَالَ ابْنُ عُمَيْرَةَ الْأَسَدِيُّ أَسْلَمْتُ وَعِنْدِى ثَمَانُ نِسْوَةٍ قَالَ فَذَكَرْتُ ذَلِكَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اخْتَرْ مِنْهُنَّ أَرْبَعَةً . "ইবন উমায়রা আল-আসাদী (রা) বলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করার সময় আমার আটজন স্ত্রী ছিল। বিষয়টি আমি নবী (স)-কে জানাইলাম। নবী (স) বলেন: তাহাদের মধ্য হইতে চারজনকে বাছিয়া লও” (আবূ দাউদ, কিতাবুত তালাক, বাব ফী মান আসলামা ওয়া ইনদাহু নিসায়ান আকছারা মিন আরবা 'আও উখতানে, নং ২২৪১)। عَنِ ابْنِ عُمَرَ أَنَّ غَيْلَانَ بْنَ سَلَمَةَ الثَّقَفِيُّ أَسْلَمَ وَلَهُ عَشْرُ نِسْوَة فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَأَسْلَمْنَ مَعَهُ فَأَمَرَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَتَخَيَّرَ أَرْبَعًا مِّنْهُنَّ. "ইবন উমার (রা) হইতে বর্ণিত। গায়লান আছ-ছাকাফী (রা) ইসলাম গ্রহণ করিলেন। জাহিলী যুগে তাহার দশজন স্ত্রী ছিল। তাহারাও তাহার সহিত ইসলাম গ্রহণ করেন। নবী (স) তাহাকে তাহাদের মধ্য হইতে চারজনকে বাছিয়া লইবার নির্দেশ দিলেন" (তিরমিযী, কিতাবুন নিকাহ, বাব মা জাআ ফির রাজুলি ইউসলিমু ওয়া ইনদাহু আশru নিসওয়াহ, নং ১১২৮)।
'একইভাবে তালাকের ব্যাপারেও কোন প্রতিবন্ধকতা ছিল না। পুরুষরা যখনই ইচ্ছা করিত এবং যতবার চাহিত স্ত্রীকে তালাক দিত এবং ইদ্দাত পূর্ণ হইবার পূর্বেই তালাক প্রত্যাহার করিত। হাদীছে বর্ণিত আছে:
إِنَّ الرَّجُلَ كَانَ إِذَا طَلَّقَ امْرَأَتَهُ فَهُوَ أَحَقُّ بِرَجْعَتِهَا وَإِنْ طَلَّقَهَا ثَلَاثًا .
"কোন ব্যক্তি নিজ স্ত্রীকে তালাক প্রদানের পর তাহা প্রত্যাহার করিবার অধিকারী হইত, যদিও সে তাহাকে তিন তালাক দিত" (আবূ দাউদ, তালাক, বাব ফী নাসখিল মুরাজাআ বা'দাত তাতলীকাতিছ ছালাছ, নং ২১৯৫)।
এক ব্যক্তি সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, সে তাহার স্ত্রীকে নাজেহাল করার জন্য বলিল, আমি তোমাকে সঙ্গেও রাখিব না, আবার ত্যাগও করিব না। স্ত্রী বলিল, তাহা কিভাবে? সে বলিল, আমি তোমাকে তালাক দিব এবং ইদ্দাত শেষ হইবার পূর্বে তোমাকে রুজু করিব। ইহার পর আবার তালাক দিব এবং ইদ্দাত শেষ হইবার পূর্বে আবার রুজু করিব (মুসতাদরাক হাকিম, ২খ, পৃ. ২৮০)।
স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী নিজ স্বামীর ওয়ারিসদের ওয়ারিসী সম্পত্তিতে পরিণত হইত। তাহাদের কেহ ইচ্ছা করিলে তাহাকে বিবাহ করিত অথবা অপরের নিকট বিবাহ দিত অথবা আদৌ বিবাহ না দেওয়ার ব্যাপারেও তাহাদের এখতিয়ার ছিল, যাহাতে স্বামী প্রদত্ত তাহার সম্পত্তি অপরের হস্তগত না পারে। নিম্নোক্ত হাদীছ হইতে ইহার প্রমাণ পাওয়া যায়ঃ
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ يُأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَحِلُّ لَكُمْ أَنْ تَرِثُوا النِّسَاءَ كَرْهًا وَلَا تَعْضُلُوهُنَّ لِتَذْهَبُوا بِبَعْضٍ مَا أَتَيْتُمُوهُنَّ قَالَ كَانُوا إِذا مَاتَ الرَّجُلُ كَانَ أَوْلِيَاؤُهُ أَحَقَّ بِامْرَأَتِهِ إِنْ شَاءَ بَعْضُهُمْ تَزَوَّجَهَا وَإِنْ شَاؤُا لَمْ يُزَوَّجُهَا وَهُمْ أَحَقَّ بِهَا مِنْ أَهْلِهَا فَنَزَلَتْ هُذِهِ الْآيَةُ فِي ذلِكَ.
"ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত: "হে ঈমানদারগণ! নারীদেরকে যবরদস্তিমূলকভাবে উত্তরাধিকার গণ্য করা তোমাদের জন্য বৈধ নহে। তোমরা তাহাদেরকে যাহা দিয়াছ তাহা হইতে কিছু আত্মসাৎ করার উদ্দেশে তাহাদেরকে অবরুদ্ধ করিয়া রাখিও না" (৪: ১৯)। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি মারা গেলে তাহার ওয়ারিসগণ তাহার স্ত্রীর উপর কর্তৃত্বশালী হইত। কেহ ইচ্ছা করিলে তাহাকে বিবাহ করিত অথবা চাহিলে অন্যত্র বিবাহ দিত অথবা চাহিলে বিবাহ না দিয়া আটক করিয়া রাখিত। তাহার পরিবারের লোকজনের তুলনায় তাহারাই হইত তাহার উপর কর্তৃত্বশালী। এই সম্পর্কে উপরিউক্ত আয়াত নাযিল হয়” (বুখারী, তাফসীর সূরা আন-নিসা, বাব "লা ইয়াহিলু লাকুম আন অরিছুন নিসাআ কারহান....", নং ৪৫৭৯)।
মৃতের সম্পদে নারীর কোন ওয়ারিসী স্বত্ব স্বীকৃত ছিল না। ছাবিত ইব্‌ন্ন কায়স (রা)-র স্ত্রী নবী (স)-এর নিকট উপস্থিত হইয়া বলিলেন, ছাবিত উহুদ যুদ্ধে শহীদ হইয়াছেন। তাহার দুইটি কন্যা সন্তান আছে। কিন্তু ছাবিতের ভাই তাহার সমস্ত পরিত্যক্ত সম্পত্তি দখল করিয়া নিয়াছে। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের মীরাছ সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হয় (দ্র. আবূ দাউদ, ফায়াইদ, বাব মা জাআ ফী মীরাছিস সুলব, নং ২৮৯১; তিরমিযী, ফারাইদ, বাব মা জাআ ফী মীরাছিল বানাত, নং ২০৯২; তিরমিযীতে ছাবিতের স্থলে সাদ ইবনুর রবী' (রা)-এর উল্লেখ আছে)।
নারীকে উত্তরাধিকারী সাব্যস্ত করিয়া আয়াত নাযিল হইলে আরবরা অত্যন্ত বিস্মিত হইল। তাহারা রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিল, হে আল্লাহ্র রাসূল! নারী কি অর্ধেকের হকদার? অথচ সে না জানে ঘোড়ায় চড়িতে (যুদ্ধ করিতে) এবং না পারে আত্মরক্ষা করিতে (তাফসীর ইব্‌ন কাছীর, ১খ, পৃ. ৪৫৮)। এমনিভাবে জাহিলী আরব সমাজে নারী ছিল অবহেলিত, লাঞ্ছিত ও অধিকার বঞ্চিত।
গ্রন্থপঞ্জী: বরাত নিবন্ধগর্ভে উক্ত হইয়াছে।
মুহাম্মদ মুসা

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00