📄 আয়্যাস আল-আরাব
আয়্যাম আল-আরাবের গেরিলা যুদ্ধ, উৎপত্তির মূলে ছিল পালিত পশু, যথা উট, ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া অথবা চারণভূমি বা ঝরণার অধিকার লইয়া বিবাদ। তাহাতে বিবদমান দুই দলের বীর যোদ্ধাগণ প্রতিপক্ষের উপরিউক্ত সম্পদের উপর অতর্কিত আক্রমণ ও সম্পদ লুট করিয়া বীরত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করার সুযোগ লইত। আবার নিজ নিজ গোত্রের পক্ষ হইতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে 'হিজা' (কুৎসামূলক কবিতা) আবৃত্তি করিয়া নিজেদের বংশপরানুক্রমিক বিজয়গাথা ও প্রতিপক্ষের কাপুরুষোচিত আচরণ বিবৃত করিয়া আবেগ, উদ্যম, অনুপ্রেরণা, এমনকি উম্মাদনা সৃষ্টি করার প্রয়াস পাইত। কবিরা ছিল গোত্রের মুখপাত্র। অন্যদিকে তাহাদের বীর যোদ্ধারা যদিও সর্বক্ষণ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকিত, তবুও প্রাণহানির সংখ্যা ছিল কম। ফলে হিট্টির মতে, মরুচারী আরবগণ একদিকে খাদ্যাভাবে ভুখা জীবন যাপন করিত এবং অন্যদিকে তাহাদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব তাহাদের আত্মগৌরব, আত্মসম্মান ও আত্মপরিচয়ের প্রধান উপাদানরূপে প্রতিভাত হইত। ফলে বংশগত বিরোধ ও প্রতিশোধ গ্রহণের মনোবৃত্তি তাহাদের চরিত্রের বৈশিষ্ট্যরূপে প্রতীয়মান হইত।
আয়্যামের ঘটনা প্রবাহে যখন কয়েকজন লোকের মধ্যে আত্মসম্মান বা সীমানা বিরোধ লইয়া একটি ঝগড়া ও মারামারি বাঁধিত, তখন কিছু লোকের ঝগড়া সকলের ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইত। ফলে দুই গোত্র বা দুই গোত্রজোটের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা চলিত। অবশেষে কোন নিরপেক্ষ দলের হস্তক্ষেপে বিষয়টির নিষ্পত্তি হইত। তবে দুই পক্ষের মধ্যে হতাহতের সংখ্যা যে পক্ষে কম হইয়াছে, তাহারা অন্য পক্ষের অতিরিক্ত নিহতদের জন্য রক্তপণ আদায় করিত ও বংশগত শত্রুতা হইতে রেহাই পাইত। এই যুদ্ধের স্মৃতি তাহারা দীর্ঘ কাল বহন করিত। যেমন ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্বে বানু বাক্সের সহিত বানু তাগলিবের 'বাসুস যুদ্ধ' চল্লিশ বৎসর ধরিয়া চলিয়াছিল। গাতাফান উপজাতির অংশবিশেষ বানু 'আস্ ও বানু যুবয়ানের মধ্যকার যুদ্ধ আয়্যাম দাহিছ ও আল-গারা নামে প্রসিদ্ধ, যাহা খৃস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষপাদে আরম্ভ হইয়া কয়েক দশক ধরিয়া ইসলামের অভ্যুত্থান পর্যন্ত চলে।
ইয়াছরিবের (মদীনা) দুই প্রধান গোত্র আওস ও খাষরাজের মধ্যকার বু'আছ যুদ্ধ মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর হিজরত অবধি চলিয়াছিল। খোদ মক্কায় ফিজারের যুদ্ধ রাসূলুল্লাহ (স)-এর বাল্যকালে সংঘটিত হয় (ঐ)। এই সকল যুদ্ধকে উপলক্ষ করিয়া রচিত কবিদের বীরত্বগাঁথা যুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ ঘটনাবলীকে যুগ যুগ ধরিয়া স্মরণীয় করিয়া রাখে। বীর কবি মুহাল্লি (আনু. মৃ. ৫৩১ খৃ.) এবং আনতারা ইব্ন শাদ্দাদ আল-আবসী (আনু. মৃ. ৬১৫ খৃ.) এইরূপ প্রক্রিয়ায় সমগ্র আরবের কাব্য জগতে শ্রেষ্ঠত্বের আসন লাভ করে।
📄 আরবী কাব্য
আরবী কবিতাই জাহিলী যুগের আরব সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন। যুদ্ধের ঘটনা, বংশগৌরব ও প্রেম আরবী কবিতার বিষয়বস্তু। আরবগণ কাব্যের যে সৌন্দর্য সাধন করিয়াছে সমসাময়িক ইতিহাসে তাহার দৃষ্টান্ত বিরল। আরবী কবিতার ক্রমবিকাশের প্রথম পর্যায়ে মিলযুক্ত গদ্যের 'সাজা' রচনা ছন্দ দেখিতে পাওয়া যায়। আরব কবিরা 'হিজা' জাতীয় কুৎসা ও বীরত্ব গাঁথার পাশাপাশি ছন্দময় গীতি কবিতা 'রাজায়' ও মহাকাব্য 'কাসীদা' রচনা করিয়া প্রসিদ্ধি লাভ করেন। প্রাচীন আরবী কবিতার মধ্যে সাব'আ মু'আল্লাকাত বা সপ্ত ঝুলন্ত কবিতা সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। জনশ্রুতি অনুযায়ী এই কবিতাগুলি উকায মেলায় বার্ষিক পুরস্কার প্রাপ্ত হয় এবং এইগুলিকে সোনালী হরফে লিপিবদ্ধ করিয়া কা'বার দেয়ালে ঝুলাইয়া দেওয়া হইত। তাহা ছাড়াও আল-মুফাদ্দালীয়াত, দীওয়ান আল-হামাসা এবং কিতাব আল-আগানী সংকলিত হইয়াছে, যেগুলিতে প্রাচীন যুগের কয়েক শত কবিতা স্থান পাইয়াছে। ইসলামের অভ্যুদয় যুগের পূর্বে কবিদের মধ্যে ইমরুল-কায়স্, আমর ইবন কুলছুম, আনতারা ইবন শাদ্দাদ, তারাফা ইবন আবদ এবং যুহায়র ইবন আবী সুলমা-র নাম উল্লেখযোগ্য (লিটারারী হিস্ট্রী অব দ্য এ্যারাব্স দ্র.)। হিট্টি বলেন, গ্রীকদেশীয় হোমারের কাব্য প্রতিভার ন্যায় আকস্মিকভাবে হঠাৎ আরম্ভ হইয়া আরব্য 'কাসীদা' কাব্য নিপুণতা ও বর্ণনাশৈলীর পুংখানুপুংখতায় হোমারের ইলিয়াড ও ওডেসীকে অতিক্রম করিয়া যায় (হিস্ট্রী অব দ্য এ্যারাব্স, পৃ. ৯৩)।
📄 ধর্মীয় অবস্থা
ইসলামের উন্মেষকালে আরবদের ধর্মীয় অবস্থা বিভিন্ন স্থানে নানা প্রকার অসংলগ্ন পৌত্তলিকতা ভাবাপন্ন অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন আনুষ্ঠানিকতাপূর্ণ ছিল। আরব বিশেষজ্ঞরা আরবদেশে চার স্তরের ধর্মীয় বিকাশ লক্ষ্য করেন। প্রথম স্তর আদিম বিশ্বাস, গাছপালা, নদী-নালা, জিন-ভূত, পাহাড়-পর্বত, তীর্থস্থানের মাটি ও পাথর ইত্যাদির ভয়াল থাবা হইতে আত্মরক্ষার জন্য নানা প্রকার পূজা, পার্বণ, বলি প্রভৃতির অনুষ্ঠান। আদি যুগে উভয় উত্তর ও দক্ষিণ অরবের মরু ও পাহাড়ী অঞ্চলে এরূপ এ্যানিমিজম বা বস্তুপূজার নানা প্রকার নিদর্শন প্রত্নতত্ত্ববিদরা উদঘাটন করিয়াছেন। ফিলিপ হিট্টির মতে, মস্তবড় এরূপ অন্ধ বিশ্বাস ভিত্তিক ধর্মীয় অনুভূতি আদিম সামীয় জাতির মরুচারীদেরকে ক্ষতিকারক জিনের ভীতিপ্রবণ করিয়া তোলে এবং মরূদ্যানের অধিবাসীদেরকে কল্যাণকর দেব-দেবী পূজায় ও তীর্থস্থান পূজায় নিবিষ্ট করে (হিস্ট্রী অব দ্য এ্যারাবস, পৃ. ৯৭)।
দ্বিতীয় স্তরের ধর্মীয় মনোভাবের উৎপত্তি হয় পূজ্য বস্তুর সহিত আসমানী গ্রহ-নক্ষত্রের সংযোগের মাধ্যমে। তখন পূজ্য বস্তুগুলি চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদির প্রতীকরূপে বিবেচিত হয়। এই স্তরে কোন কোন গুহা, গহবর ও পাতাল দেব-দেবী ও প্রকৃতির শক্তির কেন্দ্রস্থলরূপে পবিত্র স্থানে পরিণত হয়। মক্কার অদূরে নাখলার প্রান্তের ঘরঘর্ গুহায় এইরূপ দেবী আল-উয্যার নামে পশু বলি দেওয়া হইত। খেজুর গাছের পানির চাহিদা পুরণের জন্য বা'আল-এর পূজা করা হইত। বা'আলকে বসন্তের দেবতারূপে কল্পনা করা হইত। এরূপ আকাশমুখী নক্ষত্র পূজার ক্ষেত্রে পশুচারণকারী যাযাবর আরব বেদুঈনরা সাধারণত চন্দ্র দেবতার পূজা করিত এবং চন্দ্র দেবতাকে কেন্দ্র করিয়া তাহারা অন্যান্য বহু দেব-দেবীর পূজা করিত। পক্ষান্তরে যেসব নগর বা রাষ্ট্র কৃষিভিত্তিক সম্পদের উপর প্রতিষ্ঠিত, যেমন প্রাচীন যুগের পেট্রা ও পালমীরা রাষ্ট্র, সেগুলিতে সূর্যদেবীকে প্রধান উপাস্যরূপে দেখা যায়। কেননা পশুচারণের ক্ষেত্রে সূর্যের প্রখর তাপ বেদুঈনদের পশুপাল, ভিটা-বাগান ও চলাচলের সুযোগ-সুবিধা ধ্বংস করার উপক্রম করে। আর অন্যদিকে কৃষিকর্মে নিয়োজিত গ্রামীণ ও নাগরিক আরবগণ জীবন দানকারী সূর্য রশ্মির প্রতি বৃষ্টি ও আর্দ্র জলবায়ুর জন্য মুখাপেক্ষী হইতে বাধ্য হয়, তাহা ছাড়া তাহাদের কৃষিকর্ম অচল হইয়া পড়ে।
তৃতীয় স্তরে দক্ষিণ আরবীয় সভ্য সমাজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-ব্যবহারে জ্যোতিষ্ক পূজা, অলঙ্কৃত মন্দির, বিস্তারিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং পশু বলিদান ধর্মের ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নয়ন নির্দেশ করে। এইগুলিতে আদিম অন্ধ বিশ্বাস ও সংস্কারাদি সম্পূর্ণ বিলীন হয় নাই, বরং সভ্য আচার-অনুষ্ঠানের জাঁকজমক এগুলিকে আড়াল করিয়া রাখিয়াছিল।
বলা হয়, দক্ষিণ আরবের উচ্চতর জ্যোতিধর্মী আচার-আচরণ চন্দ্র দেবতাকে কেন্দ্র করিয়া আবর্তিত হইত। চন্দ্র দেবতাকে হাদ্রামাওতে বলা হইত সীন, মিনায়ানরা বলিত ওয়াদ (ভালবাসা), সাবিয়ানরা বলিত আলমাকাহ (সুস্বাস্থ্যদাতা), কাতবানিয়ানরা বলিত 'আম্ম (চাচা)। চন্দ্র দেবতার স্ত্রীরূপে গণ্য করা হইত সূর্যদেবীকে, যাহার নাম হইল শামস্। বেবীলনের ঈশতার, ফোনেসীয়দের আশতার্ত ছিল ইহাদের পুত্র তৃতীয়জন। তদুপরি চন্দ্রদেব ও সূর্য দেবীর আরও ছোটখাটো অনেক ছেলেমেয়ে ছিল, সেগুলিকেও উপাস্য মনে করা হইত। পক্ষান্তরে উত্তর আরবে তেমন নিজস্ব উপas্য দেব-দেবীর সৃষ্টি হয় নাই, বরং পেট্রা, পালমীরাবাসীরা ও নাবাতীয়রা আশেপাশের দেশ-বিদেশ হইতে দেবদেবী গ্রহণ করিয়া পূজার ব্যবস্থা গড়িয়া তোলে। নাবাতীয়রা সূর্যকে দেবতা ও চন্দ্রকে দেবী মনে করিত এবং সূর্য দেবতার নাম ছিল দোশারা ও চন্দ্রদেবীর নাম আল্লাত। এমনকি পালমীরার লোকেরা বেবীলনের বা'আল দেবতাকে সর্বোচ্চ উপাস্যরূপে পূজা করিত। আদতে উত্তর আরবে প্রচলিত উপাস্যগুলি সিরিয়া, ইরান, বেবীলন ও দক্ষিণ আরব হইতে নেয়া মিশ্র উপাস্য জোট। ইহাতে সূর্যদেবতার আধিপত্য বিদ্যমান ছিল (ঐ, পৃ. ৯৮)।
ইসলামপূর্ব হিজাযে, যেখানে আনুমানিক পাঁচ ভাগের চারভাগ মানুষ যাযাবর বেদুঈন এবং মাত্র এক-পঞ্চমাংশ গ্রাম ও নগরের বাসিন্দা, তাহাতে মোটামুটি মরু অঞ্চলে আদি যুগের প্রিমিটিভ ধর্ম বা অন্ধ বিশ্বাসের প্রচলন তখনও ছিল। আর স্থায়ী বসতিপূর্ণ এলাকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের উচ্চতর ধর্মীয় উন্নয়ন সাধিত হইয়াছিল।
অতএব ইসলামের অভ্যুদয়ের যুগে সমগ্র আরবদেশের বেদুঈন সমাজে আদি যুগের কুসংস্কারের ছড়াছড়ি ছিল। কেবল মক্কা, মদীনা ও তায়েফে উচ্চতর মূর্তি পূজার প্রচলন প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিল। বেদুঈনরা সমগ্র মরু অঞ্চলে নিম্নমানের পশু চরিত্রধারী জিনদের অবস্থান কল্পনা করিয়া এগুলিকে নানাভাবে ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এবং প্রাণী বলি দিয়া তুষ্ট রাখিতে চেষ্টিত হয়। পক্ষান্তরে জনবসতির ভূবনে গ্রাম ও নগরবাসীরা নানা জ্যোতিষ্কের প্রতীক মূর্তিতে দেবত্ব আরোপ করিয়া এগুলির সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যাপৃত হয়। মক্কা, মদীনা (ইয়াছরিব) ও তায়েফে যদিও উপরে উল্লিখিত তৃতীয় স্তরের উচ্চতর পূজা-পার্বণের সূচনা হইয়াছিল, তবুও ইহাতে কোন প্রকার উপাস্য ও উপাসনার বিস্তারিত ব্যবস্থা, দেবতত্ত্ব ইত্যাদির উন্মেষ ঘটে নাই। উপাস্য দেবতাগুলি ছিল নিজ নিজ গোত্রীয় বা স্থানীয়।
একমাত্র মক্কায় একজন মহাপ্রভুর ধারণা বিদ্যমান ছিল। মক্কাবাসীরা হযরত ইবরাহীম (আ) কর্তৃক প্রচারিত এক আল্লাহকে বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও প্রতিপালকরূপে স্বীকার করিত। কিন্তু তাহারা তিন দেবীর পূজা করিত, যাহাদেরকে তাহারা আল্লাহর কন্যা বলিয়া বিশ্বাস করিত। এইগুলির নাম আল-লাত, মানাত ও আল-উয্যা। আল-লাত দেবীর একটি হিমা বা পবিত্র প্রান্তর ছিল এবং হেরেম বা পবিত্র প্রাঙ্গণ ছিল, যাহা তায়েফে অবস্থিত ছিল। তথায় মক্কাবাসীরা ও অন্যান্যরা তীর্থদর্শন ও প্রাণী বলিদানের জন্য দলে দলে গমন করিত। তাহার পবিত্র এলাকায় কোন গাছপালা কর্তন করা যাইত না, কোন প্রাণী শিকার করা যাইত না, কোন মানুষের রক্তপাত করা যাইত না। ইহাই ছিল নিয়ম।
মানাত ছিল ভাগ্যের দেবী। মক্কা ও মদীনার পথিমধ্যে কুদায়দ নামক স্থানে তাহার তীর্থ ছিল। মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্রের নিকট মানাত জনপ্রিয় ছিল। তাহাকে কাল বলিয়া কল্পনা করা হইত এবং দুর্ভাগের জন্য দায়ী করা হইত। আল-উয্যা ছিল শক্তিধর, ভেনাস ইহার প্রতীক অর্থাৎ প্রাতঃ তারকা। তাহার তীর্থ ছিল নাখলা নামক স্থানে, যাহা মক্কার পূর্বদিকে অবস্থিত। এই দেবী কুরায়শ গোত্রের বিশেষ সম্মানের পাত্রী ছিল। তাহার তীর্থ তিনটি বৃক্ষের সমন্বয়ে ছিল। তাহার নামে মানুষও বলি দেওয়া হইত।
মনে করা হইত যে, এগুলির মাধ্যমে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব। সম্ভবত আল্লাহকে ভয়াল মনে করিয়া, এইগুলির দয়ার আশ্রয় প্রার্থনা করা হইত। এগুলিকে তাই আদর করিয়া 'উলু উলু' করিয়া ডাকা হইত, যাহা 'ইলাহ' অর্থাৎ উপাস্যের প্রেমাস্পদ রূপায়ণ। বেদ বহির্ভূত অনার্য স্বরস্বতী, লক্ষ্মী ও দুর্গাপূজার সহিত আরবের এই তিন দেবী পূজার সাদৃশ্য বিদ্যমান এবং উলূর মাধ্যমে ইহাদের সম্ভাষণ করার কারণে মনে করা হয় যে, এগুলি আরব ও সিরিয়া হইতে আহরিত।
তাহা ছাড়া 'হুবল' নামের মানবাকারের এক মূর্তি কা'বা গৃহে স্থাপিত হয়। এই মূর্তির পাশে কাহিন বা ভবিষ্যৎদর্শীদের দ্বারা ভাগ্য নির্ণয় করার লক্ষ্যে কিছু সংখ্যক তীরফলক রাখা হইত। কাহিন এগুলি টানিয়া-বাছিয়া প্রার্থীদের ভাগ্য বলিয়া দিত। অন্যান্য উপাস্যগুলির মত ইহাও বিদেশ হইতে আমদানী করা হইয়াছিল। ইহা আদতে আরম হইতে নেয়া (ঐ, পৃ. ৯৯)।
ঐতিহাসিকদের মতে, মক্কা, মদীনা ও তায়েফে যেসব মূর্তি বা উপাস্যের পূজা করা হইত এইগুলির কোনটিই স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত হয় নাই, বরং এই সবগুলি আশেপাশের কোন দেশ হইতে আহরণ করিয়া এখানে প্রতিষ্ঠি করা হইয়াছিল। তদুপরি বিক্ষিপ্তভাবে আহরণ করার কারণে এখানে কোন একটি শৃংখলাযুক্ত পদবিন্যস্ত মূর্তিজোটীয় ব্যবস্থা গড়িয়া ওঠে নাই। অতএব এইগুলির একটির সহিত অন্যটির কোন সম্পর্ক নাই। সবগুলির বিক্ষিপ্তভাবে আলাদা আলাদা পূজা করা হইত। ফলে বেদুঈন ও শহরবাসী সবার মনের মণিকোঠায়, অন্তরাত্মার গভীরে, স্মরণাতীত কাল হইতে মক্কায় প্রবর্তিত পবিত্রতম উপাসনালয় 'কা'বা গৃহ' এবং আসমান-যমীনের সর্বময় স্রষ্টা প্রতিপালক 'রব্ব' হিসাবে মহাপ্রভু 'আল্লাহ্' ধারণা বিদ্যমান ছিল; আল্লাহকে কা'বার প্রভু এবং কা'বাকে আল্লাহ্র ঘর হিসাবে চিহ্নিত করা হইত।
আল্লাহ ও কা'বার নিরাপত্তায় বৎসরে চার মাসব্যাপী (যুল্-কা'দা, যুল-হিজ্জা, মুহাররাম ও রজব) নিরাপদে আরবরা সর্বত্র ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করিত। আবার হজ্জের মৌসুমে আরবরা মক্কায় হজ্জ পালন করিতে উদগ্রীব ছিল। তদুপরি বৎসরের যে কোন সময় মক্কায় পদার্পণ করিলে কা'বা ঘরের তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করিত, যাহা হযরত ইবরাহীম (আ)-এর দ্বিতীয় স্ত্রী হযরত হাজেরা (রা)-এর মক্কায় বনবাস ও হযরত ইসমাঈল (আ)-এর কুরবানীর স্মরণিকা ছিল। এতদসংগে আরও দুইটি বিষয় ইবরাহীম (আ)-এর সুন্নাত পন্থার সহিত বিজড়িত ছিল, যথা মক্কায় কুরায়শ গোত্রের মধ্যে প্রচলিত পুরুষদের খতনা এবং কা'বা গৃহে সংরক্ষিত কালো পাথর। খতনা সুন্নাতী ঐতিহ্য হিসাবে পালন করা হইত এবং কালো পাথরকে অতীব সম্মানের সহিত চুম্বন করা হইত।
ঐতিহাসিক ইবন হিশামের মতে, আমর ইবন লুয়াই নামক জনৈক প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি মোয়াব অর্থাৎ সিরিয়া হইতে সর্বপ্রথম মূর্তি আহরণ করিয়া কা'বা গৃহে স্থাপন করে। কালক্রমে ৩৬০টি ছোট ছোট দেবদেবীর মূর্তি কা'বা গৃহে স্থাপিত হয়, যেগুলির মধ্যে নাছর (শকুন) আওফ (বৃহৎ পাখী) ইত্যাদির মূর্তিও বিদ্যমান ছিল। ইবনুল কালবীর কিতাবুল আসনামে মূর্তিগুলির বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ হইয়াছে। উপরে উল্লিখিত সিরিয়ার ইতিহাসে, হিট্টি বলেন, লাত, মানাত, উয্যা ও হুবল-এর পূজা প্রাচীন নাবাতীয় পেট্রা নগরীতেও ছিল (পৃ. ৩৮৫)।
খ্রিস্ট ধর্ম ও ইয়াহুদী ধর্ম আরবদেশে সম্পূর্ণ অজানা ছিল না। কেননা চীন দেশীয় রেশমের এবং পূর্বাঞ্চলীয় মসলার বাণিজ্যের উপর আধিপত্য কায়েম করিতে রোমান সাম্রাজ্য ও পারস্য সাম্রাজ্যের মধ্যে যে যুদ্ধ-বিগ্রহ হইত তাহাতে অংশগ্রহণ করার জন্য আরব ঘোড়সওয়ার ও আরব যোদ্ধাদের ডাক পড়িত। এই কারণে উভয় পক্ষ আরবদেরকে একদিকে পদানত করিয়া রাখিত অথবা তাহাদের সহিত বন্ধুত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করিত। এরূপ সম্পর্ক গড়িয়া তুলিতে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হইত। মদীনা ও খায়বারে ইয়াহুদীরা আদি কাল হইতে বসতি স্থাপন করিয়াছিল। কিন্তু খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকের পূর্বে তাহাদেরকে ধর্মপ্রচার বা বসতি সম্প্রসারণে তেমন ব্যাপৃত দেখা যায় না। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে ফিলিস্তীনে সিজারিয়ার বিশপ ইউসেবিয়াস আরবদেশের পাঁচটি শহরে খ্রিস্টান সমাজ বিদ্যমান ছিল বলিয়া বর্ণনা করেন। শহরগুলি হইল পেট্রা, বুসরা, আনিয়া, জেছেরা ও কারিয়াতা। তবে পঞ্চম শতাব্দীতে খ্রিস্টানদের মধ্যে পলীয় ত্রিত্ববাদ ও নেস্টোরীয় একত্ববাদের সংঘাত চরম আকার ধারণ করিলে নেস্টোরিয়াসকে আরব মরুভূমিতে নির্বাসন দেয়া হয়। বিবাদ বাধে একটি মৌলিক প্রশ্ন নিয়া। তাহা হইল, বিবি মারয়াম (আ) থিয়োটোকোস (গডের জন্মদাত্রী), না খৃস্টোটোকোস্ (খৃস্টের জন্মদাত্রী)? পলীয়রা প্রথম কথার ধারক ছিল। আর নেস্টোরিয়াস দ্বিতীয় কথার ধারক ছিল। ইহার দ্বারা তিনি প্রমাণ করিতে চাহিয়াছিলেন যে, যিশু খ্রিস্ট বা ঈসা (আ) জন্মসূত্রে মানব।
সেই সময় নেস্টোরিয়বাদের সহিত অন্যান্য সহযোগী দল পলীয় ত্রিত্ববাদের বিরোধিতা করিয়া হেরেটিকরূপে দমননীতির শিকার হয়। এগুলি ছিল ইউটিকিয়ানিজম, মনোথেলিটিজম, পেলাজিয়ানজম ইত্যাদি। পরবর্তীতে মনোফিসাইটিজমও ইহাদের সহিত যোগদান করে। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে পলীয় খ্রিস্ট ধর্মের কিছু প্রসারও আরব ভূমিতে দেখা যায়। তবে ষষ্ঠ শতকের পূর্বে খ্রিস্ট ধর্ম তেমন কোন অগ্রগতি অর্জন করিতে সক্ষম হয় নাই।
ষষ্ঠ শতকে দক্ষিণ আরবের সাফার ও আদন অঞ্চলে খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার আবিসিনীয় (ইথিওপিয়ান অক্সামাইট) শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় জোরদার হইয়া উঠে। আবার একই সময়ে ইয়াহুদী রাব্বীরা একই স্থানে কতক আরব গোত্রকে ইয়াহুদী ধর্মে দীক্ষিত করে। ক্রমে হিময়ার রাজা দিমনোস ইয়াহুদী ধর্মে দীক্ষিত হইয়া রোমক সম্রাটের সহিত সংঘাতে লিপ্ত। হয়। ফলে রোমক সম্রাট জাস্টিনিয়ান আবিসিনিয়ার রাজা আন্দাসকে ইয়ামন আক্রমণ করিতে উদ্বুদ্ধ করে। আবিসিনীয় রাজারা ক্রমে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করে। ফলে হিময়ারের ইয়াহুদী রাজা যু-নুওয়াস আবিসিনীয়দেরকে আক্রমণ করিয়া পরাজিত করে এবং ৫১৯-২০ খ্রিস্টাব্দে ইয়ামনের খ্রিস্টানদের গণহত্যা করে। অতঃপর যু-নুওয়াস নাজরানের খ্রিস্টানদেরকে আক্রমণ করিয়া ২৮০ জন খ্রিস্টানকে জ্বালানী ইন্ধন ভর্তি পরিখার মধ্যে নিপতিত করিয়া আগুনে পোড়াইয়া হত্যা করে, যাহা পবিত্র কুরআনে 'আসহাবুল উখদূদ' নামে সূরা বুরুজে বিধৃত হইয়াছে (Ataullah Bogdan Kopanski, The Nazarean Legacy, Religious Conflict in Pre-Islamic Arabia as Seen through Greeco- Roman Eyes" in the American Journal of Islamic Social Sciences, The International Institute of Islamic Thought, Washington D. C., vol 13, no. 2, Summer 1998, p. 14-20)।
সিরিয়ায় বানু গাস্সান-এর কতক গোত্র নেস্টোরীয় বা রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু তাহারাও ৬১৩ খ্রিস্টাব্দে ইরানের শাহ খসরু পারভেয দ্বিতীয়-এর দ্বারা পদানত হয়। আল-কুরআনের সূরা রূম-এ ইহার উল্লেখ আছে। ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস সিরিয়া পুনরুদ্ধার করেন বটে কিন্তু ইয়ারমুকের মহান মুসলিম বিজয়ের (৬৩৬ খ্রি.) পর বানু গাস্সান ইসলাম গ্রহণ করে (ঐ)। ইত্যবসরে আবিসিনীয়রা পুনরায় ইয়ামান আক্রমণ করে এবং যু-নুওয়াসকে পরাজিত করিয়া হত্যা করে (৫২৫ খ্রি.), অতঃপর একজন হিময়ারী খ্রিস্টানকে রাজা নিযুক্ত করে। কিছুকাল পর আব্রাম বা আবরাহা নামক এক পূর্বকালের রোমকদের আবিসিনীয় ক্রীতদাস আবিসিনিয়ার রাজত্ব দখল করে এবং ইয়ামানের শাসকরূপে স্বীকৃতি পায়। এই আবরাহা একজন নও-খ্রিস্টান ছিল। গ্রীক সন্যাসী গ্রেগনটিয়াস-এর সাহায্যে আবরাহা হিময়ারী ইয়াহুদীদের দমন করিয়া তথায় পলীয় খ্রিস্টবাদের প্রসার ঘটায়। খ্রিস্ট ধর্মকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আবরাহা একটি বিরাট কুল্যাইস (কলিসা) বা চার্চ প্রতিষ্ঠা করে। অতঃপর - সমগ্র আরবে খ্রিস্ট ধর্মকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য সে মক্কার কা'বাকে ধ্বংস করিয়া তথায় একটি বৃহৎ চার্চ স্থাপন করার উদ্দেশ্যে মাহমূদ (Mahmoud) নামক হাতিতে সওয়ার হইয়া এক অভিযান পরিচালনা করে। আম আল-ফীল-এর বৎসর (হিজরী-পূর্ব ৫৩ সনে/ খ্রিস্টীয় ৫৭০ বা ৫৭১ সনে) ছোট ছোট আবাবীল পাখির দ্বারা নিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নুড়ি পাথরের আঘাতে তাহার সৈন্যবাহিনী বিধ্বস্ত হইয়া যায়। তাহার রাজত্বকালে মা'রিব-এর প্রকাণ্ড বাঁধ হঠাৎ ভাঙ্গিয়া গিয়া ইয়ামানের শস্যক্ষেত ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
অন্যদিকে 'সিনাগগের অনুসারী' নামক ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের বহু লোক রোমক সম্রাট টাইটাস ও হাড্রিয়ান-এর যুদ্ধ পরবর্তীতে বিতাড়িত হইয়া সিরিয়া ও ফিলিস্তীন হইতে ইয়াছরিবের (মদীনা) পার্শ্বদেশে বসবাস আরম্ভ করে। তাহারা ইয়াছরিব হইতে খায়বার এলাকা পর্যন্ত বসতি বিস্তার করে। কিন্তু তাহাদের কট্টর সাম্প্রদায়িকতা মনোভাবাপন্ন অন্তর্মুখী মননশীল ইয়াহুদী ধর্ম আরবদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে অসমর্থ হয়।
এসব ত্রিত্ববাদী খ্রিস্ট ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার দোষে কলুষিত ইয়াহুদী ধর্ম হইতে, আরবদেশের আনাচে-কানাচে রূপকথার মত ছড়াইয়া ছিটাইয়া থাকা হানীফ ধর্ম নামক এক ধরনের মরমীবাদী সূফীবাদী আল্লাহ্র একত্ববাদের আরাধনা, প্রাচীন যুগের ইবরাহীমী ঐতিহ্যের নিকটতর স্মারকরূপে তখনও প্রতীয়মান হইতেছিল।
টিকাঃ
১. জুর্জী যায়দান, তারীখ আত-তামাদ্দুন আল-ইসলামী, ১ম খণ্ড, বৈরূত, পৃ. ২৮-৩৮
২. “হুকুমত আল-আরাব ফিল-জাহিলিয়্যা" দাইরা মা'আরিফ আল-ইসলামীয়া, দানিশগাহ পাঞ্জাব, লাহোর
৩. আযযাম আস-সুলামী, আসমা জিবাল আত-তিহামা, কায়রো ১৯৭৩ খ্রি.
৪. আল-হামদানী, সিফাত জযীরা আল-আরাব
৫. আল-বাকরী, মু'জাম মা ইসতা'জাম, কায়রো ১৯৪৫ খ্রি.
৬. ইয়াকূত, মু'জাম আল-বুলদান
৭. আবুল ফিদা, ডেসক্রিপসিও পেনিনসুলা এ্যারাবে (ফরাসী ভাষা), অক্সফোর্ড ১৭১৬ খ্রি.
৮. আমীন রায়হানী, মুল্কুল-আরাব, বৈরূত ১৯২৯ খ্রি.
৯. হাফিয ওয়াহবা, জযীরাতুল-আরাব, কায়রো ১৯৫৪ খ্রি.
১০. উমার রিদা কাহ্হালা, জুগরাফিয়া সবহা জযীরাতুল-আরাব, দামেশক ১৩৬৪ হি.
১১. আবদুল কুদ্দুস আল-আনসারী, আছার আল-মদীনা, দামেশক ১৩৫৩ হি.
১২. ইন খালদুন, কিতাব আল-ইবার ওয়া দীওয়ান আল-মুবতাদা ওয়াল-খাবার ফী আয়্যাম আল-আরাব ওয়াল-আজাম ওয়াল বারবার ওয়ামান আছারাহুম মিন যবী আল-সুলতান আল-আকবার, বৈরূত ১৯৭৯ খ্রি.
১৩. স্যার টমাস আরনল্ড এণ্ড আলফ্রেড গিয়ূম, লিগেসী অব ইসলাম, অক্সফোর্ড ১৯৬৫ খ্রি.
১৪. ফিলিপ খৌরী হিট্টি, হিস্ট্রী অব দি এ্যারাস্ এবং হিস্ট্রী অব সিরিয়া, ১৯৫০ খ্রি.
১৫. জন রিচার্ডসন, ডিকশনারীঃ পার্সিয়ান, এ্যারাবিক এণ্ড ইংলিশ উইথ এ ডিসার্টেশন অন দি ল্যাংগুয়েজেস, লিটারেচার, ম্যানার্স অব ইস্টারন্ ন্যাশন্স্, লন্ডন ১৯০৬ খ্রি.
১৬. জুর্জী যায়দান, হিস্ট্রী অব দি ইসলামিক সিভিলাইযেশন, নয়া দিল্লী ১৯৭৮ খ্রি.
১৭. ড. শাহ ইনায়াতুল্লাহ, জিয়োগ্রাফিক্যাল ফেক্টরস্ ইন্ এ্যারাবিয়ান লাইফ এণ্ড হিস্ট্রী, লাহোর ১৯৪২ খ্রি.
১৮. এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা মাইক্রোপেডিয়া, ১৯৭৩-৭৪ খ্রি.
১৯. ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান, ইসলামের ইতিহাস, ঢাকা ১৯৮৫ খ্রি.
২০. মুহাম্মদ রেজা-ই করিম, আরব জাতির ইতিহাস, ঢাকা ১৯৭২ খ্রি.
২১. নিকলসন, লিটারারী হিস্ত্রী অব দি এ্যারাস্
২২. ইব্দুল কালবী, কিতাব আল-আসনাম
২৩. দি এমেরিকান জার্নাল অব ইসলামিক সোস্যাল সায়েন্সেস, ওয়াশিংটন, সামার ১৯৯৮ খ্রি.
📄 ইসলামের অভ্যুদয়কালে আরবের পার্শ্ববর্তী দেশগুলির রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অবস্থা
রোম, পারস্য, ভারতবর্ষ, চীন, মিসর ও হাবশা: আধুনিক ঐতিহাসিকদের মধ্যে "মিডল ইস্টঃ পাস্ট এণ্ড প্রেজেন্ট"-এর রচয়িতা ইয়াহ্ইয়া আরমাজানী মন্তব্য করেন যে, প্রাচীন ঐতিহাসিকগণ আরবদিগকে তেমন ভাল চোখে দেখিত না। প্রমাণস্বরূপ তিনি ইবন খালদূনের মনোভাবের কথা বলেন, যিনি আরবদেরকে শাসনকার্যের অযোগ্য বিচার করেন (মুকাদ্দিমা দ্র.)। আরবদিগের প্রধানত যাযাবর জীবন, মূর্খতা, লুটতরাজ ও প্রতিহিংসাপরায়ণতার এবং প্রকট বাস্তববাদিতার মনোবৃত্তি দেখিয়া তিনি এই ধরনের বিরূপ মত পোষণ করিয়াছেন।
পক্ষান্তরে বৃহত্তর সিরিয়ার অনবদ্য ইতিহাস "হিস্ট্রী অব সিরিয়া”-এর রচয়িতা ফিলিপ খৌরী হিট্টি আরবদেশকে বিশ্বসভ্যতার দোলনা হিসাবে বিচার করেন। তাঁহার মতে, আরবভূমির তিনদিকে সমুদ্র পরিবেষ্টনের অন্তর্মুখী চাপ ও অভ্যন্তরে সুদূরপ্রসারী ধূ ধূ বালুকা আবৃত ঊষর মরুভূমির বহির্মুখী অসহনীয় উষ্ণ চাপের তোড়ে স্পৃষ্ট হইয়া আরব ভূভাগের জনগোষ্ঠী স্মরণাতীত কাল হইত বহির্বিশ্বে হিজরত করিতে অভ্যস্ত হয়। তিনি বলেন, যখনই আরব অঞ্চলের জনসংখ্যা ভূভাগীয় ধারণ ক্ষমতা হইতে বড়িয়া যায়, তখন তাহারা বহির্গমনের আশ্রয় নেয় এবং উত্তরে সিরিয়া-ইরাক মরুভূমি পার হইয়া উর্বর অর্ধচন্দ্রে তথা সিরিয়া, ইরাক, ফিলিস্তীন, জর্দান ইত্যাদি অঞ্চলে বহির্গমন করে। তিনি তাঁহার অপর গ্রন্থ 'হিস্ট্রী অব দি এ্যারাব্স'-এ পাঁচটি বৃহৎ বহির্গমন বা হিজরতের তালিকা প্রদান করেন। যথা:
১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ: সুমেরীয়দের আরব্য সহযোগী আক্কাদীয়গণ, যাহারা পরবর্তীতে ব্যাবিলনীয় সভ্যতা গড়িয়া তোলে।
২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ: আমোরীয়, কেনানীয় বা ফিনিসীয়গণ, যাহারা সমগ্র বিশ্বে একটি বাণিজ্য সভ্যতা গড়িয়া তোলে এবং লিখন প্রক্রিয়ার বিস্তার সাধন করিয়া ছড়াইয়া দেয়।
১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ হইতে ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ: আরামীয় ও হিব্রুগণ।
৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ: নাবাতীয়গণ, যাহারা উত্তর আরবের পেট্রার একটি চমকপ্রদ সভ্যতা গড়িয়া তোলে।
৭০০-৮০০ খ্রিস্টাব্দ: আরব মুসলমান অভিযাত্রিগণ।
এই বহির্গমন প্রক্রিয়াকে হিট্টি 'মিলেনিয়্যাল আপহিভ্যাল ফ্রম দি এ্যরাবিয়ান ডেজার্ট' অর্থাৎ আরব মরুভূমি হইতে সহস্র বর্ষীয় বহির্গমন প্রক্রিয়া নামে অভিহিত করেন।
অতএব ভৌগোলিক দিক হইতে আরবদেশ 'ইনসুলার' বা জলবেষ্টিত, অন্যান্য ভূভাগ হইতে বিচ্ছিন্ন, ভারত মহাসাগরের তীরবর্তী দুনিয়ার একপাশে, এক কোণায় অবস্থিত এবং সেই কারণে আরবদের মনস্তত্ত্বে আত্মম্ভরি বিচ্ছিন্নতাবাদিতার প্রাবল্য দেখা গেলেও কালক্রমিক বহির্গমনের মাধ্যমে বহির্জগতের সহিত তাহাদের বিস্তর আত্মিক সংযোগ স্থাপিত হয়। তদুপরি দ্বিতীয়ত, প্রাচীন ও মধ্যযুগের পুরাতন বিশ্বে পূর্ব-পশ্চিম বাণিজ্য পথের মধ্যমণিরূপে আরব দেশের অবস্থান বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরবদেশকে সুপরিচিত করিয়া তোলে। তৃতীয়ত, তদানিন্তন 'সুয়েজ যোজক' দ্বারা বিচ্ছিন্ন এশিয়ার বাণিজ্য পথ হইতে ইউরোপের বাণিজ্য পথের সংযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল একদিকে দক্ষিণ আরবের ইয়ামান, অন্যদিকের উত্তর আরবের মরুভূমির দেড় হাজার মাইল ধূসর মরু প্রান্তর। আরব্য উটের পরিবহনে পাড়ি দিয়া আরবগণ ইরাকে অথবা সিরিয়ায় উপনীত হইত। আরবদেশ, আরবীয় উট চালক এবং আরবদেশের সংযোগকারী বণিকদল বিশ্ব বাণিজ্য জগতে সুপরিচিত ছিল।
এই বিশাল সংযোগ পথের নিয়ন্ত্রণ মিসরের ফিরআওন, ইরানের শাহিনশাহ, বায়যান্টাইন সম্রাট ও অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতাসীন সম্রাটদের আকর্ষণীয় রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তু ছিল। ফলে উটের পরিবহন বা কাফেলা পরিচালনা করিয়া, সংযোগ ব্যবসা করিয়া বা সহায়ক রাজনীতি করিয়াই আরবগণ বিশ্ব-বাণিজ্যের জীবন পথে উপবিষ্ট ছিল। তদুপরি আরবগণ ছিল জন্মগত ঘোড়সওয়ার ও সাহসী যোদ্ধা। প্রাচীন যুগের সম্রাটগণ, বিশেষত ইরানের শাহিনশাহ ও রোমীয় সম্রাট, আরবদেরকে যুদ্ধে সহায়ক সৈন্যবাহিনীরূপেও ব্যবহার করিত। অতএব ব্যবসা-বাণিজ্য ও যুদ্ধের মাধ্যমে আরবগণ রোম হইতে ক্যান্টন পর্যন্ত বিচরণ করিত। আরবদেশের কৃষি উৎপন্নে অভাবী আরবগণ ব্যবসায়ের মধ্যেমেই খাদ্যঘাটতি পূরণ করিত। সুতরাং আরবরা ছিল জাত ব্যবসায়ী। প্রাচীন যুগে উট চালনা ও ব্যবসা প্রায় সমার্থবোধক ছিল। আরব ব্যবসায়ী ছিল একটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় কথা।
ইহারই পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামের অভ্যুদয়কালে আরবদেশের সহিত পার্শ্ববর্তী অন্যান্য দেশের সম্পর্ক বিবেচনা করিতে হইবে। খ্রিস্টীয় আঠার শতকের ভারতীয় মুসলিম জ্ঞানতাপস শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দিহলাবী তাঁহার প্রখ্যাত গ্রন্থ 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা'-এ বলিয়াছেন, সমসাময়িক বিশ্বের দুই শীর্ষস্থানীয় পরাশক্তি রোমান ও ইরানী সাম্রাজ্যদ্বয়ে নৈতিক অধঃপাতের সংশোধনের জন্য ইসলামের আবির্ভাব অপরিহার্য হইয়া পড়িয়াছিল। আর এই উভয় সাম্রাজ্যই ইসলামের নৈতিক শক্তির দাপটে ধূলিস্যাত হইয়া যায়। আদতে 'হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা' (আল্লাহ্র পরিণত যুক্তি) নামে রচিত উক্ত গ্রন্থে তিনি মূলত ইসলামের সেই অভীষ্ট নৈতিক গুণাবলী আল-কুরআন ও সূন্নাহ হইতে প্রতীয়মান ও বিকশিত করার চেষ্টা করেন।
নিরেট ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ হইতে হিট্টি ও অন্যান্যরা বলেন, রোমান ও ইরানী পরাশক্তি সমকালীন বিশ্বে যদিও লক্ষ সৈন্যের যুদ্ধবাজ ক্ষমতার অধিকারী ছিল এবং বিস্ময়াভিভূত প্রভাব-প্রতিপত্তির ধারক ছিল, তবুও প্রায় দেড় শত হইতে দুই শত বৎসরের আক্রোশপূর্ণ শত্রুতা এবং পারস্পরিক লাগাতার যুদ্ধ-বিগ্রহের দ্বারা ক্ষত-বিক্ষত ও দুর্বল হইয়া পড়িয়াছিল। অন্যদিকে মরু প্রান্তরের গোত্রীয় বিবাদ ও লুটতরাজী গেরিলা যুদ্ধের কোলে লালিত-পালিত দুর্ধর্ষ আরব বেদুঈনগণ উভয় সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে-বিপক্ষে সহায়ক সৈন্যবাহিনীর আকারে যুদ্ধযাত্রায় পারদর্শী হইয়া উঠিয়াছিল। ইসলামের আধ্যাত্মিক ঐক্য ও আদর্শগত নেতৃত্ব আরবদিগকে বিশ্ব-বিজয়ের অভিযাত্রীরূপে প্রতিষ্ঠিত করে। যাহাই হউক-ইতিহাসের বিশ্লেষকগণ নির্বিশেষে স্বীকার করেন যে, ইসলামের অভ্যুদয় বিশ্ব-মানব ইতিহাসের এক নৈতিক, ধর্মীয়, মানবিক ও সামাজিক চরম অবনতির যুগে ঘটিয়াছিল এবং ইসলামের বিজয়াভিযানের বিশ্ব-বিস্তৃত সুদূরপ্রসারী বিজয় প্রবাহ ও অকল্পণীয় গতিশীলতা ইতিহাসের একটি বিস্ময়কর ঘটনা।
টিকাঃ
১. ড. শাহ ইনায়াতুল্লাহ্, জিয়োগ্রাফিক্যাল ফেক্টরস ইন এ্যারাবিয়ান লাইফ, লাহোর ১৯৪২ খ্রি.
২. ফিলিপ কে হিট্টি, হিস্ট্রী অব দি এ্যারাবস
৩. ফিলিপ কে হিট্টি, হিস্ট্রী অব সিরিয়া, ১৯৫০ খ্রি.
৪. এন্সাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা, ১৫শ সংকলন, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৯৭৩-৭৪
৫. জে. জে. সাইণ্ডারস, হিস্ট্রী অব মিডিয়াভ্যাল ইসলাম, লন্ডন ১৯৬৫ খ্রি.
৬. ইয়াহইয়া আরমাজানী, মধ্যপ্রাচ্য অতীত ও বর্তমান, বাংলা অনুবাদে ডঃ মুহাম্মদ ইনামুল হক, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ২য় সংস্করণ, ১৯৯৪খ্রি.
৭. শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিছ দিহলাবী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা।