📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আরবদেশের ভৌগোলিক সীমারেখা

📄 আরবদেশের ভৌগোলিক সীমারেখা


ভৌগোলিক দিক দিয়া আরবদেশ এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায়, পৃথিবীর বৃহত্তম উপদ্বীপরূপে খ্যাত। ইহা দৈর্ঘ্যে ১২০০ মাইল/ ১৮০০ কি. মি., প্রস্থে গড়ে ৭০০ মাইল/ ১১৫০ কি. মি. ব্যাপিয়া সর্বমোট দশ লক্ষ বর্গমাইলের অধিক ষোল লক্ষ বর্গ কি. মি. বিস্তৃত। অতএব ভূ-বিস্তৃতির দিক দিয়া ইহা সমগ্র ইউরোপের এক-তৃতীয়াংশের এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক-চতুর্থাংশের সমান। কিন্তু আরবদেশের লোকবসতি সংস্থানের সামর্থ্য অতি কিঞ্চিৎকর। পশ্চিমে লোহিত সাগর, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, পূর্বে ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগর এবং উত্তরে সিরিয়া-ইরাকী মরুভূমি। এশিয়া আফ্রিকার মূল স্থলভাগ হইতে উত্তর ভাগের মরু অঞ্চল দ্বারা বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে আরবদেশকে ইহার অধিবাসিগণ 'জাযীরা' (جزيرة) বা উপদ্বীপ নামে অভিহিত করে। ভূতলে আরবদেশ টেবিল সদৃশ্য একখণ্ড বৃহদাকার পাথরের উপর অবস্থিত। তাই উপরিভাগে আরবদেশকে একটি বিশাল মালভূমি বলা চলে। এই মালভূমিটি পশ্চিম হইতে পূর্বদিকে কিঞ্চিৎ নিম্নমুখী কাৎ হইয়া এক প্রান্তে পারস্য উপসাগরে ও অন্য প্রান্তে ইরাকের নিম্নভূমিতে গিয়া মিলিত হয়। আবার পশ্চিমাঞ্চলের পূর্ণ দৈর্ঘ ব্যাপী, পশ্চিম সীমান্ত ধরিয়া ভূভাগটির মেরুদণ্ডের মত পর্বতসারি চলিয়া গিয়াছে যাহার আকার লোহিত সাগরের প্রান্তে খণ্ডবিখণ্ড ও খাড়া এবং পারস্য উপসাগরের প্রান্তে প্রলম্বিত ও ক্রমান্বয়ে নিম্নগামী। এই পর্বতশ্রেণী পশ্চিমে সমুদ্রতীরের সমান্তরালে চলিয়া গিয়াছে, যাহার উত্তরাংশের মাদয়ান অঞ্চলে পর্বতশ্রেণী ৯,০০০ ফুট উচ্চ; আর দক্ষিণাংশে ইয়ামন এলাকায় ইহার উচ্চতা ১২,০০০ ফুটে উন্নীত। হিজাযের 'সরাহ' এলাকায় পর্বতের উচ্চতা ১০,০০০ ফুট পর্যন্ত পৌঁছিয়া যায়। দক্ষিণাংশের তিহামা এলাকা সমুদ্র তটের নিম্নভূমির এবং নাজদ এলাকার কেন্দ্রীয় উত্তর মালভূমির উচ্চতা মাত্র ২৫০০ ফুট। পর্বতশ্রেণী ও উচ্চভূমি ব্যতিরেকে পুরা উপদ্বীপটি মরু অঞ্চল ও প্রান্তর বিশেষ। প্রান্তরগুলি প্রায়শ গোলাকার ও সমতল, যাহা একদিকে বালির টিলা দ্বারা বিচ্ছিন্ন ও অন্যদিকে পাতাল জলাশয় দ্বারা সিক্ত (ডঃ শাহ ইনায়াতুল্লাহ, জিয়োগ্রাফিক্যাল ফ্যাক্টস্ ইন্ এরাবিয়ান লাইফ এণ্ড হিস্ট্রী, লাহোর ১৯৪২ খ্রি., পৃ. ১৫-৩৭ দ্র.)। আরবদেশে এমন কোন নদী নাই, যাহাতে সারা বৎসর পানির স্রোত বহিয়া চলে অথবা সাগরে পতিত হয়। নদী প্রবাহের বদলে আবহমান কাল হইতে সাময়িক বৃষ্টির পানি চলাচলের জন্য এখানে পরস্পর সংযুক্ত অসংখ্য উপত্যকা বিদ্যমান। এইগুলিকে 'ওয়াদী' বলা হয়। আরবী ভাষায় তাই প্রচলিত অর্থে 'ওয়াদী' মানে নদী। এ ওয়াদীগুচ্ছকে সাধারণভাবে শুষ্ক নদী বা নদীগাত্রের মত দেখায়। বজ্রবৃষ্টি হইলে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ ধরিয়া এগুলিতে বন্যার পানি প্রবাহিত হয়। তবে বৎসরের অন্যান্য সময় এইগুলি শুষ্ক থাকে। কিন্তু এইগুলির তলদেশে পানির স্তর বিদ্যমান থাকে, যাহা বিভিন্ন গভীরতায় কূপ খননের মাধ্যমে পানি আহরণ করিতে সাহায্য করে। যেখানে পানির আর্দ্রতা ভূভাগ ছাপাইয়া উপচাইয়া পড়ে সেখানে মরূদ্যান দেখা দেয়। আরবদেশের স্থল-মানচিত্রে দৃষ্টিপাত করিলে ছোট বড় ওয়াদীর ঘনীভূত বৃত্ত বা বিন্দুর চিহ্ন দ্বারা সমগ্র ভূভাগটি পরিপূর্ণ দেখা যায়। এগুলিতে সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী ছোট বড় জনবসতি গড়িয়া ওঠে অথবা শুষ্ক মৌসুমে চলাচলের পথ প্রতিষ্ঠা লাভ করে (পি. কে. হিট্টি, হিস্ট্রী অব দি এ্যারাব্স, লন্ডন ১৯৫৯ খ্রি., পৃ. ১৬, সামনে দ্র.)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ভূমি ব্যবস্থা

📄 ভূমি ব্যবস্থা


আরবদেশের ভূমি ব্যবহার প্রক্রিয়া বেশ চিত্তাকর্ষক। ভূমি ব্যবহারের প্রেক্ষিতে আরব উপদ্বীপকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। ইহার বিপুলাংশ ভূমি স্থল-মরুর কবলে নিপতিত। এই সামান্য অংশকে যাযাবর বেদুঈন মরুচারিগণ চারণভূমিরূপে ব্যবহার করে। তাহাও সময়ে সময়ে বৃষ্টিপাতের দ্বারা ঘাঁসপাতা জন্মিলে ব্যবহারযোগ্য হয়। এই চারণভূমির কমবেশী এক-দশমাংশ সমুদ্র তটে প্রলম্বিত আর্দ্র ভূমি, যাহাতে অল্পস্বল্প কৃষিকর্ম হইয়া থাকে। এইরূপ কৃষিভূমির আশেপাশে জনবসতি গড়িয়া ওঠে। তাহাতেও শুষ্ক আবহাওয়া ও মাটির লবণাক্ততার দরুন সহজে উদ্ভিদ জন্মায় না। সাধারণভাবে বলা যায়, হিজাযে অধিক পরিমাণে খেজুরের চাষ হয়। ইয়ামানে গমের চাষ হয়, ওমান ও হাসায় ধান জন্মে। মরূদ্যানে এখানে সেখানে বার্লি ও ভুট্টার চাষ হয়। দক্ষিণ উপকূল বিশ্বখ্যাত ফ্রাংকিনসেন্স বা লোবান জাতীয় সুগন্ধির উপাদান প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়। আশীর এলাকা আরবীয় গামের জন্য প্রসিদ্ধ। মোটকথা, তেল আবিস্কারের পূর্ব পর্যন্ত আরব উপদ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকাকে মরুভূমি ও মরূদ্যান এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হইত। তদনুযায়ী আরবদেশের বাসিন্দারাও দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। ইহাদের এক ভাগ ছিল মরুচারী বেদুঈন (আহলুল বাদ্‌ও) এবং অন্যভাগ হইল স্থায়ী বাসিন্দা (আহলুল হাদূর)। বেদুঈনরা পশু পালন করিয়া জীবন ধারণ করিত এবং গ্রাম ও শহরের স্থায়ী বাসিন্দারা কৃষিকর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বারা জীবিকা উপার্জন করিত। পশু পালনের ক্ষেত্রে উট, ছাগল ও ভেড়াই প্রধান। তবে মধ্য আরবে ও নাজদে ঘোড়া পালনও জনপ্রিয়। সার্বিকভাবে গবেষকরা বলিয়া থাকেন, আরবীয় জনজীবনের প্রধান বেদুঈনদের অবলম্বন উট এবং স্থায়ী বাসিন্দাদের খেজুর গাছ। লতাপাতা, কাঁটা গাছ-গাছালি খাইয়া এবং কিছু না পাইলে খেজুর বীচি চিবাইয়া জীবন যাপন করার সামর্থ্য উটকে মরুজীবনের একনিষ্ঠ বাহনরূপে উপযুক্ত করিয়া তোলে। ইহা শীতকালে ২৫ দিন ও গরম কালে ৫ দিন পানি পান না করিয়াও থাকিতে পারে। মরুভূমিতে পানির সংকট নিরসনে একটি বৃদ্ধ উটকে যবেহ করিয়া তাহার পেটের সঞ্চিত পানি বাহির করা হইত অথবা তাহার মুখের ভিতরে লাঠি ঢুকাইয়া তাহাকে পানি বমি করানো হইত; আর তাহা দিয়াই বেদুঈনরা সংকট মুহূর্তে তৃষ্ণা নিবারণ করিত। আরবী ভাষায় বিভিন্ন জাত, বয়স ও আকারের উটের প্রায় এক হাজার নাম রহিয়াছে। আদতে উট ছাড়া বেদুঈন জীবন কল্পনা করা যায় না। একজন বে두ঈনের জন্য উট যেরূপ, একজন গ্রামবাসী বা নগরবাসীর জন্য খেজুর গাছ অদ্রূপ। আরবদেশের গাছপালার মধ্যে খেজুর গাছ রাণীর সমতুল্য। একজন যাযাবর বেদুঈনের জন্য উটের দুধ যেমন প্রধান খাদ্য, আর বেদুঈন যেখানে তার দুগ্ধ-খাদ্যের সাথে খেজুর ও ভুট্টা যোগ করিতে চাহে, স্থায়ী বাসিন্দার নিকট দুধ তেমনি প্রিয় খাদ্য। মরূদ্যানবাসীর সম্পদের উৎস খেজুর গাছ। ইহা উষ্ণ মরুতে বর্ধিত হয়, এমনকি লবণাক্ততাও ইহাকে দমাইতে পারে না। খেজুর গাছ তাহাকে একটি উন্নত মানের খাদ্যপ্রাণ যোগায়। ইহার কাণ্ড কাঠের কাজ দেয়। ঘর, বিছানা ও আসবাবপত্র প্রস্তুত করিতে ইহা তাহার কাজে লাগে। ইহার ডাল হইতে সে ঝুড়ি, হাতিয়ার ও অন্যান্য ঘর সাজানোর আসবাব তৈরি করে। ইহার পাতা দিয়া ছাউনী ও মাদুর তৈরি করা হয়। উটের মত, আরবী ভাষায়, খেজুরেরও পাঁচ শতাধিক নাম আছে। মদীনা ও আশেপাশের স্থানগুলিতে শতাধিক প্রকারের খেজুর বিদ্যমান। যাযাবরের সম্পদের পরিমাণ যেমন তাহার পোষ্য পশুর সংখ্যায় নির্ণীত হইত, তেমনি স্থায়ী বাসিন্দার সম্পদ তাহার খেজুর গাছের সংখ্যার দ্বারা নির্ণীত হইত। হিট্টির মতে মরুভূমির সব জীবিত জিনিসের উপর বেদুঈন, উট ও খেজুর গাছের ক্ষমতা সর্বব্যাপী এবং এ তিনের সহিত মরুজীবনের চতুর্থ উপাদান বালুকারাজি (দ্র. হিস্ট্রী অব দি এ্যারাব্স, পৃ. ১৯)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 আরবদেশের সামাজিক অবস্থা

📄 আরবদেশের সামাজিক অবস্থা


উপরিউক্ত ভৌগোলিক পরিবেশ ও আবহাওয়ার পরিস্থিতি হইতে বিশেষজ্ঞদের মতে, আরবদের সামাজিক জীবনে চারটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব হয়। এগুলি যথাক্রমে (ক) অন্তর্মুখী মনস্তত্ত্ব ও বিশুদ্ধবাদী মনোভাব, (খ) ঐতিহ্যগত ঐক্যের বলয়ে সামাজিক বিভাজন, (গ) জোটবদ্ধভাবে স্থানান্তরিত হওয়ার মনোভাব এবং (ঘ) গোত্রীয় রেষারেষি। এই বৈশিষ্ট্যগুলির সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপ:
(ক) আরবদেশের ভৌগোলিক বিশালতার প্রেক্ষিতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জোটবদ্ধ জীবনধারা অধিবাসীদের মধ্যে এক প্রকার ভূভাগীয় অন্তর্মুখী মানসিকতার জন্ম দেয় যাহা আরবদিগকে বহির্জগত হইতে বিছিন্ন করিয়া রাখিত। ইহা তাহাদের মধ্যে আত্মম্ভরিতা, বিশুদ্ধবাদিতা ও আত্ম-সচেতনতার মনোভাব সৃষ্টি করিত। বলা হয় যে, নৈসর্গিক কারণে আরবী ভাষায় ইহা প্রকটভাবে পরিস্ফুট হইতে দেখা যায়। আরবী ভাষার শব্দ চয়নে ও শাব্দিক বিন্যাসে, ব্যাকরণিক ভাব সংযুক্তিতে এবং ভাষাগত প্রকাশভংগিতে আবহমান কাল ধরিয়া এক প্রকার বিশুদ্ধবাদী ধ্যান-ধারণা পরিলক্ষিত হয়। এসব বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতা স্বাভাবিকভাবে আরবী ভাষার মাহাত্ম্য এবং অন্যান্য ভাষার অপাংতেয়তা প্রকাশ করে। তাই সগর্বে আরবরা নিজেদেরকে শুদ্ধভাষী আরব এবং অন্যান্য ভাষাভাষীকে 'আজম' অর্থাৎ বোবা নামে আখ্যায়িত করে। ইহাতে তাহাদের মধ্যে একটি আত্মম্ভরিতার ভাব সৃষ্টি হয়। ফলে তাহারা অন্যদেরকে হেয় জ্ঞান করিতে অভ্যস্ত ছিল। ইহা হইতে গোত্রীয় মাওয়ালী প্রথার সূচনা হইয়াছিল, যাহাতে একজন বহিরাগত আরব অথবা অনারব কোন রক্ত শপথের মাধ্যমে গোত্রভুক্ত হইতে পারে। তখন সে অন্যান্য গোত্রীয় সদস্যদের সহিত সম-মর্যাদা প্রাপ্ত হয় (জুর্জী যায়দান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪-৮)।
(খ) আরবদেশের জনসংখ্যার স্বল্পতার তুলনায় ভূমি বিস্তৃতির বিশালতা এবং মরুময় প্রতিবন্ধকতা, বিশেষত উত্তর আরব ও দক্ষিণ আরবের মধ্যবর্তী বিশাল মরুভূমির বিস্তর ব্যবধানের কারণে, উভয় অঞ্চলের আরবগণ জোটবদ্ধ হইতে পারে নাই। অতএব তাহাদের মধ্যে প্রজাতিগত ও ভাষাগত ঐক্য বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও, তাহারা জাতিগতভাবে একতাবদ্ধ হইতে অপারগ হয়, বরং তাহারা উত্তর আরবের লোকজনকে 'মুদার' এবং দক্ষিণ আরবের লোকজনকে য়ামানীরূপে আখ্যায়িত করিয়া নিজেরা দ্বিধাবিভক্ত হইয়া পড়ে। পক্ষান্তরে মুদারকে 'আদনান' এবং য়ামানীকে 'কাহতান' বংশরূপে আখ্যায়িত করা হইত। ইব্‌ন খালদুন আরবদের বংশ পরিচয়ের ক্ষেত্রে তাহাদিগকে আদনান, কাহতান ও কুদা'আ এই তিন ভাগে বিভক্ত করেন (কিতাব আল-'ইবার, বৈরূত ১৯৭৯ খ্রি., পৃ. ২৫৮)।
(গ) হিট্টির হিস্ট্রী অব সিরিয়া (১৯৫০ খ্রি., পৃ. ৬২)-এ তিনি আরবদের জোটবদ্ধ দেশান্তরের প্রবণতা ব্যাখ্যা করিয়া বলেন, যেহেতু আরবদেশ তিন দিক হইতে সমুদ্র বেষ্টিত এবং যেহেতু মরু অঞ্চলের পক্ষে জনবসতির সংস্থান করার সাধ্য অতিশয় সীমিত, সেহেতু এই বিশাল উপদ্বীপে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাইয়া ভূমির ধারণ ক্ষমতাকে অতিক্রম করিলে বর্ধিত জনগোষ্ঠী বহির্গমনের পথ ধরে। এই অবস্থায় তাহারা উত্তরের সিরিয়া-ইরাক, মরু অঞ্চল পাড়ি দিয়া সিরিয়া, ইরাক, জর্ডান ও ফিলিস্তীন অঞ্চলে উপনীত হয় এবং সেখান হইতে দুনিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে ছড়াইয়া পড়ে। এইভাবে যুগে যুগে তাহারা জোটবদ্ধ হইয়া অভিবাসিত হয়। আরবদেশে সর্বসাকুল্যে পানির অপ্রতুলতা, কৃষির স্বল্পতা, মরু প্রান্তরে উদ্ভিদ ও গাছপালার অভাব, স্থানীয় ও আঞ্চলিকভাবে খাদ্যশস্য উৎপাদন ও খাদ্য সরবরাহ সর্বদা প্রয়োজনীয় চাহিদার তুলনায় বিপুলাংশে ঘাটতিপূর্ণ থাকে। ফলে আরবের সর্বত্র ব্যষ্টিকভাবে লোকজন তেল উৎপাদনের পূর্ব পর্যন্ত অভাবগ্রস্ত থাকিত। বিশেষত মরু অঞ্চলের যাযাবর উপজাতিগুলি সর্বক্ষণ অনাহারক্লিষ্ট থাকিত। বিরাজমান অভাব-অনটন উত্তরণে নগরবাসীরা স্বভাবতই ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকিয়া পড়ে। প্রান্তরবাসী দুর্ধর্ষ উপজাতীয় লোকজন পূর্বকালে সুযোগ পাইলেই দলবদ্ধ হইয়া একে অন্যের সম্পদ লুণ্ঠনে লিপ্ত হইত। ফলে গোত্রীয় রেষারেষিতে জীবনধারা সর্বদা বিপন্ন থাকিত। সুতরাং একদিকে তাহারা যেমন লুট-তরাজে লিপ্ত হইয়া জীবন যাপনের পরিস্থিতিকে অস্থির, বিপন্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ করিয়া তুলিত, অপরদিকে পারস্পরিক নিরাপত্তার খাতিরে যত্রতত্র আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ হইতে আত্মরক্ষার লক্ষ্যে সমঝোতা, সন্ধি বা সোলেহ-এর মাধ্যমে জোটবদ্ধ হইত। বিরাজমান আনুগত্যের বিবেচনায়, আরবদেশ পূর্বে যেমন বর্তমানেও তেমন অসংখ্য গোত্রের বসবাসস্থল। তাহাদের বেশীরভাগ প্রাকৃতিক কারণবশত বিক্ষিপ্ত বসতিপূর্ণ গ্রাম বা কারিয়ায় বসবাস করে। যেখানে স্বল্প পানি ভাগ্যের জোরে মিলে সেখানে তাহারা কৃষিকর্মে ব্যাপৃত হয়, সুযোগমত ধান, গম, ভুট্টা বা খেজুর চাষের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আর যেখানে শুষ্ক মরুপ্রান্তরে সাময়িক বৃষ্টিপাতে ঘাঁসপাতার উন্মেষ ঘটে, সেখানে আরব বেদুঈনরা উট, ছাগল, মেষ ও দুম্বা পালনে স্থান হইতে স্থানান্তরে বিচরণ করে। তদুপরি সমুদ্রতটে জেলেরা মাছ ধরার কাজে নিয়োজিত হয়। শহরে-নগরে ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় লোকদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। তাহারা যে যেভাবেই বসবাস করুক না কেন, সবাই নিজেদেরকে সামী বা সেমেটিক জাতির অংশ হিসাবে গণ্য এবং সামী সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত বলিয়া দাবি করে (এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা মাইক্রোপেডিয়া, ১৫শ সংস্করণ, ১৯৯৩-৭৪ খ্রি., ১ম খণ্ড, পৃ. ১০৪৩)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সংস্কৃতিক ও সভ্যতা

📄 সংস্কৃতিক ও সভ্যতা


আরবদেশে সেমীয় ঐতিহ্যের সহিত সম্পৃক্ত, স্থানান্তরে বিক্ষিপ্ত নানা প্রকার জাতীয় ও বিজাতীয় সংস্কৃতি ও সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া যায়। স্মর্তব্য যে, আরব উপদ্বীপের পার্শ্বদেশ ঘেঁসিয়া বিশ্ববাণিজ্যের মহাসড়ক চলিয়া গিয়াছে, যাহা এই অঞ্চলকে প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি মিসর, গ্রীস, রোম, ইরান, ভারতবর্ষ, ইন্দোনেশিয়া ও চীনদেশের সহিত যুক্ত করে। প্রাচীন কালে দক্ষিণ আরবের লোকেরা চাষাবাদে বিপুল উন্নতি সাধন করে। সেচকর্মের সুবিধার্থে তাহারা বাঁধ প্রতিষ্ঠা ও খাল খনন কার্যের প্রভূত উৎকর্ষ সাধন করে। কৃষিকর্মের উৎকর্ষের ফলে তথায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি দেখা দেয় এবং দক্ষিণাঞ্চলের ইয়ামানে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংগঠনের উন্নতি সাধিত হয়। তাহাতে এক চমকপ্রদ সভ্যতার উন্মেষ ঘটে।
প্রত্নতত্ত্ববিদরা খননকার্যের মাধ্যমে ইয়ামান এলাকা হইতে ছামূদী, সাফাবী, আরামীয়, গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষায় উৎকীর্ণ বহু শিলালিপি উদ্ধার করিয়াছেন। এই অঞ্চলে মাঈন, সাবা, কাতাবান, হাদারামাওত প্রভৃতি চারটি প্রধান রাষ্ট্রের আকর্ষণীয় নিদর্শন পাওয়া যায়। ইহাদের মধ্যে সাবার লোকেরা রাজধানী সাবা শহরে মা'রিব বাঁধ বা ড্যাম নির্মাণ করিয়া প্রাচীন যুগের বিস্ময়কর সেচকর্মের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে।
দক্ষিণ আরবের প্রধান বাণিজ্য-সম্ভার ছিল লোবান বা ফ্রাংকিন্সেন্স জাতীয় সুগন্ধিদ্রব্য। বিলাসবহুল দেশসমূহে, যথা মিসর, ইরাক, সিরিয়া, গ্রীস, রোম ইত্যাদিতে ইহার চাহিদা ছিল অপরিসীম। ব্যাপক হারে সুগন্ধি দ্রব্যের উৎপাদন ও বিশ্বব্যাপী সুগন্ধি দ্রব্যের জনপ্রিয়তা সৃষ্টির জন্য সম্ভবত আরবদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের হাদারামাওত ও ইয়ামান এলাকার সাবাঈগণই সর্বপ্রথম উদ্যোগী হয়। গ্রীক পণ্ডিত থিওফ্যাসটাস-এর মতে, খৃস্টপূর্ব ১০০০ অব্দের দিকে উহারা সমুদ্র বাণিজ্যে কৃতিত্বের পরিচয় দেয়। স্থলপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার সাধনের লক্ষ্যে মক্কা, পেট্রা, মিসর, সিরিয়া ও ইরাক (মেসোপটেমিয়া)-এর সহিত যোগাযোগ রক্ষাকারী ইয়ামান হইতে সিরিয়া পর্যন্ত বাণিজ্য পথ নির্মাণ করে। প্রত্নতত্ত্ববিদ হার্ভে ও গ্ল্যাসার (Harvey and Glasier)-এর প্রচেষ্টায় অসংখ্য আরবীয় শিলালিপি আবিষ্কৃত হইয়াছে। ইহাদের রাজধানী ছিল মা'রিব, ভাষা ছিল মিনাঈ ও সাবাঈ এবং বর্ণমালা ছিল সিনিয়াটিক (ডঃ সৈয়দ মাহমুদুল হাসান, ইসলামের ইতিহাস, ঢাকা ১৯৮৫ খৃ., পৃ. ৪০-৪১)। ইহার সমান্তরাল মিনাইয়ান রাজ্যের খোঁজ পাওয়া যায় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনযুক্ত শিলালিপি আবিষ্কারের মাধ্যমে। এই পর্যন্ত খৃ. পৃ. ১২০০ হইতে ৬৫০ অব্দের মধ্যে এই রাজত্বকারী বংশের ২৬ জন রাজার নাম পাওয়া গিয়াছে। তাহাদের স্থাপত্য শিল্প, ভাস্কর্য ও শিলালিপি সমৃদ্ধ সভ্যতার সাক্ষর বহন করে (ঐ, এবং এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০৪৫)। খৃ. পূর্ব ১১৫ হইতে খৃস্টীয় ৩০০ অব্দ পর্যন্ত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম আরবে হিময়ারীদের শাসনকার্য ছিল। ইহাদের রাজধানী ছিল 'জাফর' নামক স্থানে।
তাহাদের সময়ে সামুদ্রিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হিময়ারীদের সহিত রোমানদের সংঘাত বাঁধে। তবে ৩০০ খৃ. পরবর্তীতে লোহিত সাগরে রেমানদের জাহাজ চলাচল বন্ধ হইয়া যায়। ফলে হিম্য়ারীরা প্রভাবশালী হয়। কিন্তু ৩৪০ খৃ. আবিসিনিয়া হিময়ারীদের পরাজিত করে এবং ৩৭৮ খৃ. পর্যন্ত সেখানে রাজত্ব করে। অতঃপর দক্ষিণ আরব পুনরায় হিয়ারীদের শাসনে আসে এবং ৫২৫ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত তাহাদের রাজত্ব বহাল থাকে। কিন্তু ৫২৫ হইতে ৫৭৫ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত দক্ষিণ আরবে পুনরায় আবিসিনীয়দের রাজত্ব কায়েম হয়। এই সময়ের শেষের দিকে আবরাহার মক্কা আক্রমণের ঘটনা ঘটে। আবিসিনীয় শাসকদের রাজধানী ছিল সানআ। মক্কায় অবস্থিত কা'বার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উদ্দেশ্যে আবরাহা সানআ-য় একটি বিশাল উপাসনালয় নির্মাণ করে এবং ৫৭০ বা ৫৭১ খৃস্টাব্দে কা'বা ধ্বংস করার লক্ষ্যে মক্কা আক্রমণ করিতে গিয়া বিপর্যস্ত হয় (জুর্জি যায়দান, তারীখ আত-তামাদ্দুন আল-ইসলামী, পৃ. ২৮-৩৪)।
আবিসিনীয়দের শাসনামলে মা'রিব বাঁধ ভাঙ্গিয়া গেলে সেই স্থানের বানূ গাসসান সিরিয়ার হাতরান এলাকায় ও বানু লাখম্ ইরাকের হীরা এলাকায় প্রস্থান করে। পরবর্তীতে এই বংশদ্বয় ঐসব এলাকায় নিজ নিজ রাজত্ব কায়েম করে। ৫৭৫ খৃস্টাব্দে জনৈক হিম্য়ারী রাজপুত্র পারস্য সম্রাট নওশেরওয়ার সামরিক সহায়তায় ইয়ামান হইতে আবিসিনীয়দের উৎখাত করে। কিন্তু অচিরেই দক্ষিণ আরব পারস্য সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয় এবং ইয়ামান রাজনৈতিক গুরুত্ব হারায়। ইসলামের অভ্যূদয়ের কয়েক বৎসর পর ইয়ামান সহজেই ইসলামের আওতায় আসে (মুহাম্মদ রেজা-ই করিম, আরবজাতির ইতিহাস, ঢাকা ১৯৭২ খৃ., পৃ. ৯-১০; জুর্জি যায়দান, তা'রীখ, পৃ. ৪৪ এবং আমীন আর-রায়হানী, মুলুক আল-আরাব, কায়রো ১৩৫৩ হি.)।
উত্তর আরবের অবস্থা ছিল কিছুটা ভিন্নতর। ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্ববর্তীকালীন সমগ্র আরবের অবস্থাকে আয়্যামে জাহিলিয়া (অজ্ঞতার যুগ) নামে অখ্যায়িত করা হয়। প্রকৃতপক্ষে ইহার দ্বারা সে যুগে যে আরবদেশে সত্যিকারের কোন ধর্ম ছিল না, আল্লাহ প্রেরিত কোন রাসূল ছিলেন না অথবা কোন প্রত্যাদিষ্ট ধর্মগ্রন্থ ছিল না, বুঝানো হয়। উত্তর আরবের বিপুল সংখ্যক অধিবাসী ছিল যাযাবর। তাহাদের ইতিহাস ছিল এক প্রকার গেরিলা যুদ্ধ, যেইগুলিকে 'আয়্যাম আল-আরাব' অর্থাৎ আরবদের স্মরণীয় দিন বলা হইত। এইসব যুদ্ধে আক্রমণ ও লুটতরাজের প্রচুর সুযোগ গ্রহণ করা হইত, কিন্তু রক্তপাত হইত কচিৎ। অন্যদিকে হিজায ও নাজদের স্থায়ী বাসিন্দারা নাবাতীয়, পালমিরীয়, গাসসান ও লাখমীদের মত কোন প্রাচীন সভ্যতা গড়িয়া তোলে নাই। আবার নাবাতীয়রা ও পালমিরীয়রা উত্তর আরবে যে সভ্যতা সৃষ্টি করে, তাহা অংশত আরামীয় সভ্যতা ছিল। আর গাসসানী ও লাখমীরা উত্তর আরবে মূলত দক্ষিণ আরবীয় উপনিবেশিক ছিল। তাহাও ছিল সিরিয়া ভিত্তিক বায়যানটাইন রোমান সংস্কৃতি ও ইরাক ভিত্তিক ইরানী সংস্কৃতির আদলে প্রতিষ্ঠিত। অতএব ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্বে উত্তর আরবে সংস্কৃতি সভ্যতা আইয়াম আল-আরবের ঐতিহ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বলিয়া ধরিয়া লওয়া যায় (হিট্টি, হিস্ট্রী অব দ্যা এ্যারাব্স, পৃ. ৮৭-৮৮)।
কোন কোন বিশেষজ্ঞর মতে, আরবীয় বলিতে যদিও সমগ্র আরব উপদ্বীপকে বুঝায়, তবুও আরব কথাটির বিশুদ্ধবাদী মনোভাব ও মরু ভাবাপন্নতা উত্তর আরবকেও নির্দেশ করে এবং এই উত্তর আরবের অধিবাসীরা ইসলামের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করে নাই। আরবী ভাষা বলিতে সভ্যতা-সংস্কৃতির দিক হইতে যেমন হিম্য়ারী সাবাঈ আরবীকে নির্দেশ করে, তেমনি উত্তর আরবীয় হিজাযী ভাষাকেও বুঝায়। তবুও কার্যত আরবের মহাগৌরবান্নিত পর্যায় ইসলামের অভ্যুত্থানের দরুন আল-কুরআনের পবিত্র ভাষার ভিত্তিতে উত্তর আরবের হিজাযী আরবী ভাষা প্রাধান্য লাভ করে, বিশেষত মক্কার কুরায়শী উপভাষাই গৌরবোজ্জ্বল ভাষারূপে প্রতিষ্ঠা লাভ করে (হিট্টি, প্রাগুক্ত)। অতএব ইসলামী সভ্যতার বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত জাতি ও ভাষা হিসাবে আরব বলিতে উত্তর আরব ও আরবী ভাষা বলিতে নির্ভেজাল উত্তর আরবের মরু ভাষাকেই চিহ্নিত করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00