📄 ওহীর সাময়িক বিরতি
ফাতরাতুল ওয়াহয় (فَتْرَةُ الْوَحْى) : ফাত্রা শব্দের অর্থ ভাঙ্গা, দুর্বল হওয়া। কোন বস্তু কঠিন থাকার পর নরম হইলে এবং গরমের তীব্রতা হ্রাস পাইলে 'আরবগণ বলিয়া থাকেন, فَترالشَّنِيُّ وَالْحَرُ অর্থাৎ বস্তুটি নরম হইয়াছে এবং গরমের তীব্রতা হ্রাস পাইয়াছে। দেহের জোড়াসমূহ দুর্বল হইয়া পড়িলে বলা হয়, فتر جسمه )তাহার দেহ দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে)। দুইজন নবীর মধ্যবর্তী সময়কে বলা হয় الْفَتْرَةُ; সিহাহ গ্রন্থে উল্লেখ আছে :
الْفَتْرَةُ هِيَ مَا بَيْنَ كُلِّ رَسُولَيْنِ مِنْ رُّسُلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنَ الزَّمَانِ الَّذِي انْقَطَعَتْ فِيهِ الرسالة.
"আল্লাহ তা'আলার রাসূলগণের মধ্যে দুইজন রাসূলের মধ্যবর্তী সময়ে রিসালাত বন্ধ থাকার কালকে ফাতরাত বলা হয়" (ইবন মানজুর, লিসানুল 'আরাব, ১০খ., পৃ. ১৭৪)।
বর্ণিত আছে,
فَتْرَةُ مَا بَيْنَ عِيسَى عَلَيْهِ السَّلامُ وَمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سِتِّمِائَةٍ.
"হযরত 'ঈসা (আ) এবং হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর মাঝে নবীর আগমন বন্ধ থাকার মেয়াদ হইতেছে ছয় শত বৎসর" (শায়খ মুহাম্মাদ তাহির, মাজমা'উ বিহারিল-আনওয়ার, ৩খ, পৃ. ৫৪)।
'আল্লামা কিরমানীর (র) মতে, احْتِبَاسُ الْوَحْيِ فَتْرَةُ الْوَحْيِ অর্থাৎ ওহীর অবতরণ থামিয়া থাকা, বন্ধ থাকা। 'আল্লামা 'আয়নীর মতে, فَتَرَ الْوَحْىَ অর্থ ধারাবাহিকভাবে ওহী নাযিল হওয়ার পর তাহা বন্ধ হওয়া (বদরুদ্দীন 'আয়নী, 'উমদাতুল কারী, ১খ, পৃ. ৫৩)।
ইবন হাজার আসকালানী (র) ফাতরাতু'ল ওহীর সংজ্ঞায় বলেন,
عِبَارَةٌ عَنْ تَأَخَّرِهِ مُدَّةٌ مِّنَ الزَّمَانِ.
"কিছু সময় পর্যন্ত ওহীর অবতরণ বিলম্ব হওয়াকে ফাতরাতুল-ওহী বলা হয়"।
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র) ইমাম শা'বী (র) হইতে বর্ণনা করেন,
إِنَّ مُدَّةَ فَتْرَةِ الْوَحْيِ كَانَتْ ثَلَاثَ سِنِينَ
"ফাতরাতু'ল-ওহীর মেয়াদ হইতেছে তিন বৎসর।"
ইবন ইসহাক (র) ফাত্রাতু'ল-ওহীর এই মেয়াদকে সঠিক বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইবন হাজার (র) এই প্রসঙ্গে বলেন, ইমাম বায়হাকী (র) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর
৫১০ স্বপ্ন দর্শনের সময় ছিল ছয় মাস। এই হিসাব অনুসারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের সূচনা যেই স্বপ্নের মাধ্যমে হইয়াছিল তাহা সংঘটিত হয় তাঁহার বয়স চল্লিশ বৎসর পূর্ণ হওয়া অব্যবহিত পরে তাঁহার জন্মের মাস রবীউল আওয়ালে। আর জাগ্রত অবস্থায় ওহীর সূচনা হইয়াছিল রমযান মাসে।
ফাত্রাতু'ল-ওহীর মেয়াদকাল তিন বৎসর অর্থাৎ এই সময়ে মহানবী (স)-এর নিকট কুরআন মাজীদের অবতরণ বন্ধ ছিল। এই সময়টি হইতেছে সূরা 'আলাক এবং সূরা আল-মুদ্দাছছির নাযিল হওয়ার মধ্যবর্তী সময় (ইবন হাজার, ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ২২)।
ইবন হাজার আরও বলেন, দাউদ ইবন আবী হিন্দ-এর সনদে শা'বী (র) হইতে বর্ণিত আছে: أُنْزِلَتْ عَلَيْهِ النُّبُوَّةُ وَهُوَ ابْنُ أَرْبَعِينَ سَنَةً فَقُرِنَ بِنَبُوتِهِ إِسْرَافِيلُ ثَلَاثَ سِنِينَ فَكَانَ يُعَلِّمُهُ الْكَلِمَةَ وَالشَّيْئَ وَلَمْ يَنْزِلْ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ عَلَى لِسَانِهِ عِشْرِينَ سَنَةً.
"নবী করীম (স)-এর বয়স যখন চল্লিশ বৎসর তখন তিনি নবুওয়াত লাভ করেন। তখন হইতে তিন বৎসর পর্যন্ত হযরত ইসরাফীল (আ) তাঁহার নবুওয়াতের সহিত সম্পৃক্ত থাকেন। তিনি তাঁহাকে বিভিন্ন বাক্য ও বস্তু শিক্ষা দিতেন। তাঁহার যবানে বিশ বৎসর যাবৎ কখনও নবী করীম (স)-এর উপর কুরআন নাযিল হয় নাই" (ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ.০২২-২৩)।
ইবন আবূ খায়ছামা অপর একটি সনদে দাউদ হইতে সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করিয়াছেন, بعثَ لِأَرْبَعِينَ وَوَكِلَ بِهِ إِسْرَافِيلُ ثَلَاثَ سِنِينَ ثُمَّ وَكِلَ بِهِ جِبْرِيلُ.
"চল্লিশ বৎসর বয়সে তাঁহাকে নবুওয়াত দান করা হয়। তখন হইতে তিন বৎসর পর্যন্ত ইসরাফীল (আ)-কে তাঁহার সহিত সম্পৃক্ত রাখা হয়। অতঃপর জিবরীল (আ)-কে তাঁহার সহিত সম্পৃক্ত করা হয়।"
ইবন হাজার বলেন, এই মুরসাল হাদীছটির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মক্কায় অবস্থানের সময়সীমা সম্পর্কে দুইটি বর্ণনার মধ্যে সুন্দর সমন্বয় সাধন করা যায়। একটি মত অনুসারে তিনি তের বৎসর মক্কায় অবস্থান করিয়াছেন। আর অপর মত অনুসারে তিনি ১০ বৎসর মক্কায় অবস্থান করিয়াছেন। পরবর্তী মতের সহিত ফাতরাতুল ওহীর তিন বৎসর সময়কে যোগ করা হয় নাই।
ইবনুত তীনও পরের রিওয়ায়াতটি বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু তাঁহার বর্ণনায় ইসরাফীল (আ)-এর স্থলে মীকাঈল (আ)-এর উল্লেখ রহিয়াছে। ওয়াকিদী এই মুরসাল রিওয়ায়াতটিকে অস্বীকার করিয়াছেন। তিনি বলেন, নবী কারীম (স)-এর সহিত জিবরাঈল (আ) ভিন্ন অপর কোন ফেরেশতাকে সম্পৃক্ত করা হয় নাই।
৫১১ ইবন হাজারের মতে মুছবিত (مُثْبِتْ ) (ইতিবাচক) বর্ণনা নাফী (نَفْي ) (নেতিবাচক) বর্ণনার উপর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত হইয়া থাকে। তবে নাফী-এর সহিত দলীলের উল্লেখ থাকিলে তাহা অগ্রাধিকার লাভ করে।
'আল্লামা সুহায়লী মুরসাল রিওয়ায়াতটিকে গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি ইহার মাধ্যমে নবী কারীম (স)-এর মক্কায় অবস্থানের সময়সীমার ব্যাপারে পরস্পর বিপরীত মতের মধ্যে সমন্বয় সাধন করিয়াছেন। তিনি বলেন, কোন কোন মুসনাদ বর্ণনায় অসিয়াছে যে, ফাতরাতুল ওহীর মুদ্দত ছিল আড়াই বৎসর। আর অপর বর্ণনায় স্বপ্ন দর্শনের মুদ্দত ছিল ছয় মাস। অতএব যাহারা বলেন, মক্কায় অবস্থানের মুদ্দত হইতেছে দশ বৎসর তাঁহারা স্বপ্নদর্শন এবং ফাতরাতুল ওহীর মুদ্দতকে বাদ দিয়াছেন। আর যাহারা তের বৎসর বলিয়াছেন তাহারা এই দুইটি সময়কে যোগ করিয়াই তের বৎসর গণনা করিয়াছেন (ফাতহুল বারী, ১খ, পৃ. ২৩)।
উল্লিখিত বর্ণনাসমূহ হইতে দেখা যায়, সুদীর্ঘ আড়াই হইতে তিন বৎসর ছিল ফাত্রাতুল ওহীর সময়সীমা। কিন্তু ইবন সা'দ-এর একটি বর্ণনা হইতে বুঝা যায়, ফাত্রাতুল ওহীর সময়সীমা ছিল অতি কম। ইবন সা'দ তাহার সনদে ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا نَزَلَ عَلَيْهِ الْوَحْيُ بِحِرَاء مَكَثَ أَيَّامًا لَا يَرَى جِبْرِيلَ فَحَزَنَ حُزْنًا شَدِيدًا حَتَّى كَانَ يَعْدُو إِلى شَبِيرٍ مَرَّةً وَإِلَى حِرَاء مَرَّةً يُرِيدُ أَنْ يُلْقِيَ نَفْسَهُ مِنْهُ فَبَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَذلِكَ عَامِداً لِبَعْضٍ تِلْكَ الْجِبَالِ إِلَى أَنْ سَمِعَ صَوْتًا مِنَ السَّمَاءِ فَوَقَفَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَعِقًا لِلصَّوْتِ ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ فَإِذَا جِبْرِيلُ عَلَى كُرْسِي بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ مُتَرَبَعًا عَلَيْهِ يَقُولُ يَا مُحَمَّدُ أَنْتَ رَسُولُ اللهِ حَقًّا وَأَنَا جِبْرِيلُ قَالَ فَانْصَرَفَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَدْ أَقَرَّ اللَّهُ عَيْنَهُ وَرَبَطَ جَاشَهُ ثُمَّ تَتَابَعَ الْوَحْيُ بَعْدُ وَحَمِي.
"রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর হেরা পর্বতে ওহী নাযিল হওয়ার পর কয়েক দিন পর্যন্ত তিনি জিবরাঈল (আ)-কে দেখিতে পান নাই। ইহাতে তিনি ভীষণভাবে দুশ্চিন্তায় পতিত হন। এমনকি তিনি একবার 'ছাবীর' পর্বতে এবং আর একবার 'হেরা' পর্বতে গমন করিয়া নিজেকে তথা হইতে নিক্ষেপ করিবার ইচ্ছা পোষণ করেন। এইভাবে রাসূলুল্লাহ (স) একদিন যখন এই পর্বতগুলির কোন একটির উদ্দেশে গমন করিতেছিলেন তখন হঠাৎ আকাশের দিক হইতে একটি শব্দ শুনিলেন। আর অমনি রাসূলুল্লাহ (স) ঐ শব্দের ভয়ে আতংকিত হইয়া থমকিয়া দাঁড়াইলেন। অতঃপর তিনি উপরের দিকে শির উত্তোলন করিলেন। সেইখানে তিনি জিবরাঈল
৫১২ (আ)-কে আকাশ ও যমীনের মাঝে একটি কুরসীতে চারজানু হইয়া উপবিষ্ট অবস্থায় দেখিতে পাইলেন। তিনি বলিতেছেন, “হে মুহাম্মাদ! আপনি নিশ্চিতভাবে আল্লাহর সত্য রাসূল। আর আমি হইতেছি জিবরাঈল”। রাবী বলেন, ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং আল্লাহ তা’আলা তখন তাঁহার চক্ষু শীতল করিলেন এবং তাঁহার অন্তরে প্রশান্তি দান করিলেন। ইহার পর লাগাতারভাবে ওহী নাযিল হইতে থাকে এবং ওহীর অবতরণ নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকে” (মুহাম্মাদ ইবন সা’দ, আত-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ, পৃ. ১০৪)।
এই হাদীছ হইতে স্পষ্টভাসে প্রতীয়মান হয় যে, ফাতরাতুল-ওহীর সময়সীমা খুব দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু বুখারী শরীফের কিতাবুত-তাবীরে ইবন শিহাব যুহরী (র) ‘উরওয়ার মাধ্যমে হযরত আয়েশা (রা) হইতে যেই হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন তাহা হইতে জানা যায় যে, ওহী বন্ধের সময়সীমা বেশ দীর্ঘায়িত হইয়াছিল। হাদীছটি এই :
وَفَتَرَ الْوَحْيُ فَتْرَةً حَتَّى حَزِنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْمَا بَلَغَنَا حُزْنًا مِّنْهُ مَرَّارًا كَىْ يَتَرَدَّى مِنْ رُؤُسِ شَوَاهِقِ الْجِبَالِ فَكُلَّمَا أَوْفَى بِذِرْوَةِ جَبَلٍ لِّكَىْ يُلْقِىْ مِنْهُ نَفْسَهُ تَبَدَّى لَهُ جِبْرِيْلُ فَقَالَ يَا مُحَمَّدُ اِنَّكَ رَسُوْلُ اللهِ حَقًّا فَيَسْكُنُ لِذٰلِكَ جَأْشُهُ وَتَقِرُّ نَفْسُهُ فَيَرْجِعُ فَاِذَا طَالَتْ عَلَيْهِ فَتْرَةُ الْوَحْيِ غَدَا لِمِثْلِ ذٰلِكَ فَاِذَا أَوْفَى بِذِرْوَةِ جَبَلٍ تَبَدَّى لَهُ جِبْرِيْلُ فَقَالَ لَهُ مِثْلَ ذٰلِكَ-
“অতঃপর ওহী বন্ধ হইয়া যায়। আর এই সম্পর্কে আমাদের (ইমাম যুহরীর) নিকট যেই সংবাদ পৌঁছিয়াছে তাহা হইতেছে, ওহী বন্ধ থাকার কারণে নবী করীম (স) এমনভাবে বিষণ্ণ হইয়া পড়েন যে, কয়েকবার তিনি পাহাড়ের চূড়ায় দ্রুত আরোহণ করিয়া তথা হইতে নিজেকে নিক্ষেপ করিতে উদ্যত হন। যখনই তিনি পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করিয়া নিজেকে তথা হইতে নিক্ষেপ করিতে চাহেন, তখনই জিবরীল (আ) তাঁহার নিকট আত্মপ্রকাশ করেন এবং বলেন, “হে মুহাম্মাদ! আপনি অবশ্যই সত্য রাসূল”। ইহাতে তাঁহার অন্তর প্রশান্ত হইত, তাঁহার আত্মা স্থির হইত এবং তিনি প্রত্যাবর্তন করিতেন। অতঃপর যখন ফাতরাতুল-ওহীর সময় সুদীর্ঘ হইত তখন তিনি পুনরায় এইরূপ করিতেন। যখনই তিনি পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় আরোহণ করিতেন তখনই হযরত জিবরীল (আ) আত্মপ্রকাশ করিতেন এবং তাঁহাকে অনুরূপ সান্ত্বনা বাক্য শুনাইতেন” (মুহাম্মাদ ইবন ইসমাঈল, আল-জামি, ২খ, পৃ. ১০৪)।
এই হাদীছ হইতে প্রতীয়মান হয়, ফাতরাতুল-ওহীর সময়সীমা ছিল দীর্ঘ। ফাতরাতুল-ওহীর সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর সূরা আল-মুদ্দাস্সিরের শুরুর পাঁচটি আয়াত সর্বপ্রথম নাযিল হয়। বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে :
৫১৩ قَالَ ابْنُ شِهَابٍ وَأَخْبَرَنِي أَبُو سَلَمَةَ ابْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ أَنَّ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ الْأَنْصَارِي قَالَ وَهُوَ يُحَدِّثُ عَنْ فَتْرَةِ الْوَحِي فَقَالَ فِي حَدِيثِهِ بَيْنَا أَنَا أَمْشِي إِذْ سَمِعْتُ صَوْتًا مِنَ السَّمَاءِ فَرَفَعْتُ بَصَرِى فَإِذَا الْمَلَكُ الَّذِي جَاءَ نِي بِحِرَاءَ جَالِسٌ عَلَى كُرْسِي بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ فَرُوعِبْتُ مِنْهُ فَرَجَعْتُ فَقُلْتُ زَمِّلُونِي فَأَنْزَلَ اللهُ تَعَالَى يُأَيُّهَا الْمُدَّثِرُ إِلَى قَوْلِهِ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ فَحَمِيَ الْوَحْيُّ وَتَتَابَعَ.
"ইবন শিহাব বলেন, আমার নিকট আবু সালামা ইবন 'আবদুর রাহমান বর্ণনা করেন যে, জাবির ইবন 'আবদুল্লাহ আনসারী (রা) ফাতরাতু'ল-ওহী সম্পর্কে হাদীছ বর্ণনা করিতে গিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইহার বিবরণ প্রসঙ্গে তাঁহার বর্ণনায় বলিয়াছেন, আমি যখন চলিতেছিলাম তখন হঠাৎ আকাশ হইতে একটি শব্দ শুনিয়া সেইদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিলাম। আমি সেইখানে আকাশ ও যমীনের মধ্যস্থলে কুরসীতে উপবিষ্ট ঐ ফেরেশতাকে দেখিতে পাইলাম যিনি হেরা পর্বতে আমার নিকট আসিয়াছিলেন। ইহার পর আমি গৃহে ফিরিয়া আসিলাম এবং বলিলাম, আমাকে বস্ত্রাবৃত করিয়া দাও। আর তখনই আল্লাহ তাআলা নাযিল করেন, “হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠ, সতর্কবাণী প্রচার কর এবং তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ। অপবিত্রতা হইতে দূরে থাক" (৭৪: ১-৫)। ইহার পর ওহী অধিক হারে নাযিল হওয়া শুরু হয় এবং লাগাতারভাবে অবতীর্ণ হইতে থাকে” (মুহাম্মাদ ইবন ইসমাঈল, আল-জামি, ১খ, পৃ. ২১)।
মুহাম্মদ ইবন ইসহাক-এর মতে ফাতরাতুল ওহী-এর পরে সর্বপ্রথম সূরা দুহা নাযিল হয়। কোনও কোনও রাবী এই প্রসঙ্গে বলেন,
وَلِهَذَا كَبَّرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أُولِهَا فَرْحًا .
"আর এই কারণেই রাসূলুল্লাহ (স) উৎফুল্ল হইয়া ইহার শুরুতে তাকবীর ধ্বনি দিয়াছিলেন" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ, পৃ. ১৭)।
ইবন কাছীর (র) এই মতটিকে অগ্রহণযোগ্য বলিয়া উল্লেখ করেন। অতঃপর তিনি বলেন:
وَلكِنْ نَزَلَتْ سُورَةُ وَالضُّحَى بَعْدَ فَتْرَةٍ أُخْرى كَانَتْ لَيَالِيَ يَسِيْرَةٍ كَمَا ثَبَتَ فِي الصَّحِيحَيْنِ وَغَيْرِهِمَا مِنْ حَدِيثِ الأَسْوَدِ بْنِ قَيْسٍ عَنْ جُنْدَبِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الْبُجَلِي قَالَ اشْتَكَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمْ يَقُمْ لَيْلَةَ أَوْ لَيْلَتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا فَقَالَتْ امْرَأَةٌ مَا
৫১৪ أَرَى شَيْطَانَكَ إِلَّا تَرَكَ فَأَنْزَلَ اللهُ تَعَالَى وَالضُّحَى وَالَّيْلِ إِذَا سَجَى مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى.
"অপর একটি বিরতির পরে সূরা ওয়াদ্-দুহা নাযিল হয়। এই বিরতি ছিল অল্প কয়েকটি রাত্রের। বুখারী, মুসলিম প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ণিত আছে, আসওয়াদ ইবন কায়স (র) জুনদুব ইবন 'আবদুল্লাহ আল-বাজালী (রা) হইতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, এক সময় রাসূলুল্লাহ (স) অসুস্থ হইয়া পড়েন। ইহাতে তিনি এক অথবা দুই অথবা তিন রজনী (তাহাজ্জুদ সালাতের জন্য) উঠেন নাই। তখন জনৈকা নারী (আবু লাহাবের স্ত্রী এবং আবূ সুফয়ানের ভগ্নি 'আওরা বিনত হারব) বলিল, আমার ধারণা তোমার শয়তান তোমাকে ত্যাগ করিয়াছে। তখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করেন, "শপথ পূর্বাহ্নের, শপথ রাত্রির যখন তাহা গভীর হয়। আপনার পালনকর্তা আপনাকে ত্যাগ করেন নাই এবং আপনার প্রতি বিরূপও হন নাই" (৯৩ : ১-৩)।
হাফিজ ইবন কাছীর (র) এই হাদীছটি উল্লেখ করিবার পর মন্তব্য করেন, وَبِهَذَا الْأَمْرِ حَصَلَ الْإِرْسَالُ إِلَى النَّاسِ وَبِالْأَوَّلِ حَصَلَتِ النُّبُوَّةُ.
"এই ঘটনা ও আয়াত নাযিলের প্রেক্ষিতে জনগণের প্রতি মহানবী (স)-এর রিসালাত সাব্যস্ত হয় এবং প্রথমটির প্রেক্ষিতে তাঁহার নবুওয়াত সাব্যস্ত হয়।"
হাফিজ ইবন কাছীর আরও বলেন, কেহ কেহ বলেন, ফাতরাতের সময়সীমা ছিল দুই অথবা আড়াই বৎসরের কাছাকাছি। তাহাতে স্পষ্ট দেখা যায় যে, ফাতরাতুল-ওহী হইতেছে ঐ সময়কাল যখন মীকাঈল (আ) তাঁহার সহিত সম্পৃক্ত ছিলেন। যেমন শা'বী এবং অন্যান্যরাও এই মত পোষণ করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৭-১৮)।
গ্রন্থপঞ্জী : (১) ইবন মানজুর, লিসানুল-'আরাব, ১০খ., পৃ. ১৭৪; (২) শায়খ মুহাম্মাদ তাহির, মাজমা'উ বিহারিল-আনওয়ার, ৩খ., পৃ. ৫৪; (৩) বদরুদ্দীন 'আয়নী, 'উমদাতুল কারী, দারু'ল-ফিকর, ১খ., পৃ. ৫৩; (৪) ইবন হাজার, ফাতুহুল বারী, ১খ, ২য় সং, পৃ. ২৩-২৩, বৈরূত ১৪০২ হিজরী; (৫) মুহাম্মাদ ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতু'ল-কুবরা, ১খ, ১ম সং, বৈরূত ১৪১০/১৯৯০, পৃ. ১৫৪; (৬) মুহাম্মাদ ইবন ইসমা'ঈল, আল-জামি', ২খ, পাকিস্তান ১০৩৪; পৃ. ১৯৬ ১খ., পৃ. ২; (৯) ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ১৭-১৮, ১ম সং ১৪১৭/১৯৯৭)।
ড. মুহাম্মদ শফিকুল্লাহ