📄 উম্মুল মু'মিনীন খাদীজা (রা)-এর সান্ত্বনাদান এবং ওয়ারাকা ইবন নাওফালের সমর্থন
হযরত মুহাম্মাদ (স) উম্মুল মু'মিনীন খাদীজা (রা)-এর সাহায্য-সহযোগিতা দাম্পত্য জীবনের প্রথম হইতেই লাভ করিয়াছেন। প্রথম ওহী (ওয়াহহিয়) নাযিল হওয়ার উত্তেজনাপূর্ণ ও অস্থির মুহূর্তে খাদীজা (রা)-এর নৈতিক সমর্থন ও সান্ত্বনাদান রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে সাহস ও শান্তি প্রদান করিয়াছিল। ওহী প্রাপ্তির প্রথম অভিজ্ঞতায় হযরত মুহাম্মাদ (স) যখন শংকাবোধ করিতেছিলেন তখন খাদীজা (রা) তাঁহাকে আপন চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফালের নিকট লইয়া যান, যিনি খৃস্টধর্মের পণ্ডিত ছিলেন। এই প্রসঙ্গে বুখারী শরীফের নিম্নোক্ত হাদীছটি উদ্ধৃত করা হইল :
"উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা (রা) বলিলেন, যেই ওহী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিত তাহা হইল ঘুমের মধ্যে তাঁহার সত্য স্বপ্ন। তিনি যেই স্বপ্নই দেখিতেন তাহা ভোরের আলোর মতই সত্যে পরিণত হইত। ইহার পর নির্জন জীবন যাপনের প্রতি তাঁহার আগ্রহ সৃষ্টি হইল। তাই তিনি একাধারে কয়েক দিন পর্যন্ত নিজ পরিবারের নিকট না যাইয়া হেরা পর্বতের গুহায় নির্জন পরিবেশে আল্লাহ্ ইবাদতে মগ্ন থাকিতে লাগিলেন। আর এই উদ্দেশ্যে তিনি কিছু খাবার সঙ্গে লইয়া যাইতেন, আবার তিনি বিবি খাদীজার নিকট ফিরিয়া আসিয়া ঐরূপ কয়েক দিনের জন্য কিছু খাবার সঙ্গে লইয়া যাইতেন। এইভাবে হেরা গুহায় থাকাকালে তাঁহার নিকট সত্যের পয়গাম (ওহী) আসিল। হযরত জিবরীল (আ) সেইখানে আসিয়া তাঁহাকে বলিলেন, পড়ুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ আমি বলিলাম, আমি তো পড়িতে জানি না। তিনি বলেন, ফেরেশতা তখন আমাকে ধরিয়া এমন জোরে আলিঙ্গন করিলেন যে, ইহাতে আমি ভীষণ কষ্ট অনুভব করিলাম। ইহার পর ফেরেশতা আমাকে ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন, 'পড়ুন'। আমি বলিলাম, আমি তো পড়িতে পারি না। পুনরায় দ্বিতীয়বার তিনি আমাকে ধরিয়া খুব জোরে চাপিয়া ধরিলেন। ফলে পুনঃ ক্লান্ত ও শ্রান্ত হইয়া পড়িলাম। অতঃপর আমাকে ছাড়িয়া দিয়া পড়িতে বলিলেন। আমি বলিলাম, আমি পড়িতে পারি না। রাসূলে কারীম (স) বলিলেন, জিবরাঈল ফেরেস্তা আমাকে তৃতীয়বার কাছে টানিয়া দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিলেন। ফলে আমি পূর্ণমাত্রায় ক্লান্ত-শ্রান্ত হইয়া পড়িলাম। তারপর তিনি আমাকে আলিঙ্গনমুক্ত করিয়া বলিলেন,
ٱقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ
"পড়ুন, আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন। সাঁটিয়া থাকা বস্তু (আলাক) হইতে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন। পড়ুন! আর আপনার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত” (৯৬: ১-৩)।
রাসূলুল্লাহ (স) কম্পমান হৃদয়ে গৃহে ফিরিয়া আসিলেন। তিনি খাদীজা বিন্তে খুওয়ায়লিদ-এর গৃহে প্রবেশ করিয়া ডাকিয়া বলিলেন, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর।” তিনি তাঁহাকে বস্ত্রাবৃত করিলেন। পরে তাঁহার ভয় চলিয়া গেলে তিনি খাদীজার নিকট সমস্ত ঘটনা জানাইয়া বলিলেন, আমি আমার জীবনের আশংকা করিতেছি। খাদীজা (রা) সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, "কখনও নয়, আল্লাহ্র কসম! তিনি কখনও আপনাকে
৪৭৩ অপমানিত করিবেন না। কারণ আপনি নিজ আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখেন, দুর্বল ও অসহায়দের খেদমত করেন, অভাবীগণকে উপার্জনক্ষম করেন, অতিথিদের সেবা করেন, সত্য প্রতিষ্ঠাতে আপনি সাহায্য করেন। অতঃপর খাদীজা (রা) রাসূলে আকরাম (স)-কে সঙ্গে লইয়া তাঁহার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ইব্ন আসাদ ইবন 'আবদুল 'উয্যা-এর কাছে গেলেন। ওয়ারাকা জাহিলী যুগে 'ঈসায়ী ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তিনি হিব্রু ভাষাতে পুস্তকাদি লিখিতেন, এমনকি ইন্জীল-এর কিছু অংশ লিখিয়াছিলেন মহান আল্লাহ্র ইচ্ছা অনুযায়ী। বয়স ছিল অনেক বিধায় তিনি দৃষ্টিহীন হইয়া পড়িয়াছিলেন। খাদীজা (রা) তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ভ্রাত! আপনি আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। ওয়ারাকা বলিলেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! তুমি কি দেখিয়াছ? রাসূলুল্লাহ্ (স) যাহা দেখিয়াছেন তাহার বর্ণনা দিলেন। ওয়ারাকা তখন তাঁহাকে বলিলেন, "উহা নামুস", ইনিই জিব্রাঈল ফেরেস্তা, যাঁহাকে আল্লাহ মূসা (আ)-এর নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। হায় আফসোস! আমি যদি বাঁচিয়া থাকিতাম, যখন নিজ বংশের লোকেরা তোমাকে বিতাড়িত করিবে। রাসূলে কারীম (স) বিস্ময়ের সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাদের দ্বারা আমি কি বিতাড়িত হইব? উত্তরে বলিলেন, হাঁ, যাঁহারাই অনুরূপ জ্যোতি লইয়া আসিয়াছিলেন তাঁহাদের সকলকে দেশ হইতে বিতাড়িত হইতে হইয়াছিল। তোমার জীবনের ঐ দিনগুলিতে যদি আমি বাঁচিয়া থাকি, তবে আমি সর্বশক্তি দিয়া তোমাকে সাহায্য করিব।
ইহার পরে ওয়ারাকা বেশি দিন জীবিত ছিলেন না এবং কিছু দিনের জন্য ওহী প্রাপ্তির সাময়িক বিরতি ঘটে” (বুখারী, আওয়ালু মা বুদিআ বিহিল-ওয়াহহিয়, বাব, ৩; তু. মুসলিম, ঈমান, পৃ. ২৬৩, ২৫৪)।
ইব্ন শিহাব (র) বলেন, আমার কাছে আবূ সালামা ইব্ন আবদুর রহমান এই মর্মে বর্ণনা করিয়াছেন যে, জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ আনসারী (রা) বলিয়াছেন, তিনি ওহীর সাময়িক বিরতি প্রসঙ্গে বর্ণনা করিয়াছেন যে, আমি একবার চলিতেছিলাম। হঠাৎ আকাশ হইতে একটি আওয়াজ শ্রবণ করিলাম। অতঃপর আমি আকাশ ও যমিনের মাঝে চেয়ারে বসা অবস্থায় ঐ ফেরেশতাকে দেখিলাম যিনি আমার কাছে হেরা গুহায় আসিয়াছিলেন। উহাতে আমার ভয়ের সঞ্চার হইল। অতঃপর আমি গৃহে ফিরিয়া আসিয়া বলিলাম, “যাম্মিলুনী যাম্মিলূনী, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর! আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন, “হে চাদরাবৃত! উঠুন, সতর্ক করুন এবং আপনার পালনকর্তার বড়ত্ব ঘোষণা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন এবং অপবিত্রতা হইতে দূরে থাকুন।" অতঃপর ওহীর বিরতি ঘটে (উভয় হাদীছের বরাতের জন্য দ্র. সহীহ বুখারী, বাব কায়ফা কানা বাদউল ওয়াহহিয়, ১খ, পৃ. ২, ৩, ৪)।
ওয়ারাকা হযরত মুহাম্মদ (স)-এর নবুওয়াতের সত্যতা প্রকাশ করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন। তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সাফল্য ও বিজয় লাভের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তদুপরি তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন (আল-বালাযুরী, আনসাবুল আশরাফ, ১খ., পৃ. ১০৬)।
ইবন ইসহাক বলেন, খাদীজা বিনতে খুওয়ায়লিদ (রা)-এর চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইব্ন আবদিল উয্যা ছিলেন পূর্বতন আসমানী কিতাবসমূহে পারদর্শী একজন ধর্মপরায়ণ খৃস্টান পণ্ডিত। ইহা ছাড়া পার্থিব জ্ঞানেও তিনি যথেষ্ট ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন ছিলেন। খাদীজা
৪৭৪ (রা) মায়সারার নিকট হইতে সিরীয় ধর্মযাজকের যেই মন্তব্য শুনিয়াছিলেন এবং মায়সারা দুইজন ফেরেশতা কর্তৃক নবী (স)-কে ছায়াদানের যে দৃশ্য অবলোকন করিয়াছিলেন তাহা ওয়ারাকাকে সবিস্তার জানাইলেন (৭খ., পৃ. ৩৪৪, বৈরূত, লেবানন, তা.বি)। ওয়ারাকা বলিলেন, “খাদীজা! এইসব ঘটনা যদি সত্যই ঘটিয়া থাকে তাহা হইলে নিশ্চিতভাবে জানিয়া রাখ যে, মুহাম্মাদ এই উম্মতের নবী। আমি জানিতাম, তিনিই হইবেন এই উম্মতের প্রতীক্ষিত নবী। এই যুগ সেই নবীরই যুগ। এই কথা বলিয়া ওয়ারাকা প্রতীক্ষিত নবীর আগমনে এত বিলম্বিত হওয়ায় আক্ষেপ করিতে লাগিলেন এবং বলিতে লাগিলেন, "আর কত দেরী।” তিনি তাঁহার আক্ষেপ প্রকাশ করিয়া নিম্নের স্বরচিত কবিতাটি আবৃত্তি করেনঃ
لججت وكفت في الذكر لجوجا لهم طالما بعث النشيجا ووصف من خديجة بعد وصف فقال طال انتظاری یا خدیجا حديثك أن أرى منه خروجا ببطن المكتين على رجائي من الرهبان اكره ان يعوجا بما خبرتنا من قول قس ويخصم من يكون له حجيجا بان محمد سيعود فينا يقيم به البرية ان تموجا ويظهر في البلاد ضياء نور ويلقى من يسالمه فلوجا فيلقى من يحاربه خسارا شهدت فكنت أولهم ولوجا فيا ليتني اذا ما كان ذاكم ولوجا في الذي كرهت قريش ولو عجت بمكتها عجيبا الى ذي العرش إن سفلوا عروجا أرجى بالذي كرهوا جميعا وهل أمر السفالة غير كفر بمن يختار من سمك البروجا يضج الكافرون لها ضجيجا فان يبقوا وابق تكن امور من الاقدا متلغة خروجا .
وان أهلك فكل فتى سيلقى "আমি অতি উৎসাহের সহিত এমন একটি জিনিসকে স্মরণ করিয়া চলিয়াছি যাহা দীর্ঘদিন অনেককে কাঁদাইয়া আসিতেছে। অনেক বিবরণের পর সেই জিনিসটির নূতন করিয়া খাদীজার নিকট হইতেও বিবরণ পাওয়া গেল। বস্তুত হে খাদীজা! আমার প্রতীক্ষা অনেক দীর্ঘ হইয়াছে। আমার প্রত্যাশা, মক্কার উচ্চভূমি ও নিম্নভূমির মাঝখান হইতে যেন তোমার কথার বাস্তব রূপ প্রতিভাত হইতে দেখিতে পাই, যেই কথা তুমি ঈসায়ী ধর্মযাজকের বরাত দিয়া জানাইলে। বস্তুত ধর্মযাজকের কথায় হেরফের হউক তাহা আমি পছন্দ করি না। সেই প্রতীক্ষিত ব্যাপারটি এই যে, মুহাম্মাদ অচিরেই আমাদের নেতা ও সরদার হইবেন এবং তাঁহার বিরুদ্ধবাদীদেরকে প্রাজিত করিবেন। দেশের সর্বত্র তিনি এমন আলো ছড়াইবেন যাহা দ্বারা সমগ্র সৃষ্টিজগতকে
৪৭৫ তিনি বিশৃংখলা হইতে রক্ষা করিবেন। যাহারা তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইবে তাহারা পর্যুদস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। আর যাহারা তাঁহার সঙ্গে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপন করিবে তাহারা হইবে সফলকাম। আফসোস! যখন এইসব ঘটনা ঘটিবে তখন যদি আমি উপস্থিত থাকিতাম, তাহা হইলে তোমাদের সকলের আগেই আমি সেই দলের অন্তর্ভুক্ত হইতাম, কুরায়শ যাহাকে খুবই অপছন্দ করিবে, যদিও তাহারা নিজেদের মক্কা নগরীতে তাঁহার বিরুদ্ধে চীৎকার করিয়া আকাশ-বাতাস মুখরিত করিয়া তুলিবে। যেই জিনিসকে তাহারা সকলেই অপছন্দ করিবে, আমার প্রত্যাশা এই যে, তাহা দিয়াই আমি আরশের অধিপতির নিকট উন্নীত হইব, যখন তাহারা অধঃপতিত হইবে। তাহাদের অধঃপতনের কারণ এই যে, তাহারা যিনি উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হইয়াছেন তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিবে। কুরায়শরা যদি বাঁচিয়া থাকে আমিও যদি বাঁচিয়া থাকি তবে সেই দিন অস্বীকারকারীরা ভীষণভাবে আর্তনাদ করিবে। আর আমি যদি মরিয়া যাই তাহা হইলে প্রত্যেক যুবক প্রত্যক্ষ করিবে যে, নিয়তির বিধান অনুযায়ী ধ্বংস হইয়া যাইবে' (ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ.১৯৭, ১৯৮, ১৯৯)।
ওহীর প্রারম্ভকালে হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে আল্লাহর তরফ হইতে মানসিকভাবে নবুওয়াতের দায়িত্বভার বহনের জন্য প্রস্তুত করা হইতেছিল (ইবন সা'দ, কিতাবুত তাবাকাতিল কুবরা, ১খ, পৃ. ১২৯)। এই উদ্দেশ্যে তাঁহাকে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে সুসংবাদ প্রদান করা হইত। ভবিষ্যৎ ঘটনাবলী সম্পর্কে অবহিত করা হইত এবং অনেক গোপন তত্ত্ব সম্পর্কে আভাস দেওয়া হইত। ইহা ছাড়া অনেক নিদর্শন গোচরীভূত হইতে থাকে (ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা বিআহওয়ালিল মুসতাফা, ১খ., পৃ. ১৬১)।
ওহী নাযিলের আনুমানিক ছয় মাস পূর্ব হইতেই মুহাম্মাদ (স) ধ্যান ও চিন্তা-গবেষণায় অধিক মনোযোগী হইয়া পড়েন। তিনি হেরা গুহাতে একাধারে কয়েক দিন অবস্থান করিতে আরম্ভ করিলেন। এমতাবস্থায় খাদীজা (রা) নিজে যাইয়া খোঁজ করিয়া তাঁহাকে খাবার পৌঁছাইয়া দিতে লাগিলেন (আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ১৫-১৬)। গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকা অবস্থায় তিনি হঠাৎ আকাশ হইতে একটি আওয়াজ শুনিতে পাইলেন। কেহ যেন বলিতেছেন, হে মুহাম্মাদ! 'আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরীল। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, অতঃপর আমি যখন আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করিলাম তখন দেখিতে পাইলাম, জিবরীল একটি লোকের আকৃতিতে (যাহার পদদ্বয় ছিল পরিষ্কার) দণ্ডায়মান রহিয়াছেন। তিনি বলিতেছেন, "হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরীল। কিছুক্ষণ পর জিবরীল আমার নিকট হইতে অন্তর্হিত হইলেন (সায়্যিদ গিলানী, আয়নুল য়াকীন, পৃ. ১২)।
অতঃপর আমি আমার পরিবারে ফিরিয়া গেলাম, এমনকি খাদীজার খুব কাছাকাছি (সান্নিধ্যে) বসিলাম। খাদীজা বলিল, হে আবুল কাসিম! আপনি কোথায় ছিলেন? আল্লাহ্র কসম! আমি আপনার খোঁজে লোক পাঠাইয়াছিলাম। তাহারা মক্কা পর্যন্ত গিয়া আমার নিকট ফেরত আসিয়াছে। অতঃপর আমি যাহা দেখিয়াছিলাম তাহার সবকিছুই খাদীজার নিকট ব্যক্ত করিলাম। তৎক্ষণাৎ সে বলিল:
৪৭৬ ابشر يا ابن العم وأثبت فوالذي نفس خديجة بيده إني لأرجو ان تكون نبي هذه الامة.
"হে আমার চাচাত ভাই! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন এবং অটল থাকুন। আল্লাহ্র কসম, যাহার হাতে খাদীজার জীবন! আমি অবশ্যই এই আশা করিতেছি যে, আপনিই হইবেন এই উম্মতের নবী" (ইব্ন হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, পৃ. ২৪৬)।
অতঃপর খাদীজা (রা) কাপড়-চোপড় পরিধান করিয়া তাহার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইব্ন নাওফাল ইব্ন আসাদ ইব্ন আবদিল উয্যা ইন্ন কুসাঈ-এর নিকট উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) যেই ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়াছেন ও শুনিয়াছেন খাদীজা তাহা সবিস্তার ওয়ারাকাকে জানাইলেন। ওয়ারাকা ঘটনা শুনিয়াই চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন, কুদ্দুস! কুদ্দুস (মহাপবিত্র, মহাপবিত্র)। ওয়ারাকার জীবন যাঁহার হস্তে ন্যস্ত তাঁহার কসম! হে খাদীজা! তুমি যাহা আমাকে বলিয়াছ তাহা যদি সত্য হইয়া থাকে তাহা হইলে মুহাম্মাদের নিকট সেই মহাদূতই আগমন করিয়াছিলেন যিনি মূসার নিকটও আসিতেন। আর মুহাম্মদ (স) যে এই উম্মতের নবী তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। সুতরাং তুমি তাহাকে অবিচল ও স্থির থাকিতে বল (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, পৃ. ২৪৬ ও ২৪৭)।
আল-বালাযুরীর ভাষ্যমতে, ওয়ারাকা (অপর এক সময়ে) বলিয়াছেনঃ আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি সেই নবী হযরত মূসা (আ) যাঁহার সুসংবাদ দিয়াছিলেন (আনসাবুল আশরাফ, ১খ, পৃ. ১০৬)। অতঃপর অল্প দিনের মধ্যেই ওয়ারাকা ইনতিকাল করেন। ইহার পর তিন বৎসর পর্যন্ত ওহী বন্ধ থাকে। এই বিরতিকালে রাসূলুল্লাহ (স) পুনরায় প্রত্যাদেশ প্রাপ্তির আশায় অস্থির হইয়া পড়িলেন। তখন ঊর্ধ্বগগনে সেই মহান নামূসের জ্যোতি দৃষ্টিগোচর হইত যিনি তাঁহাকে এই আশ্বাস প্রদান করিতেন যে, তিনি নিশ্চিত আল্লাহর রাসূল এবং সেই নামূস হইলেন হযরত জিবরীল (ইবন সা'দ, আততাবাকাত, ১খ, পৃ. ১৯৬)।
গ্রন্থপঞ্জী: (১) মুহম্মাদ ইব্ন ইসমাঈল আল-বুখারী, আল-জামি'উস-সাহীহ, দারু ইহয়াইত তুরাছিল আরাবী, বৈরূত-লেবানন ১৩১৩ হি., বাব কায়ফা কানা বাদউল ওয়াহয়ি, ১খ, পৃ. ২, ৩ ও ৪; (২) ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নবাবিয়্যা, ১খ, পৃ. ১৯৭, ১৯৮, ১৯৯, ২৪৬, ২৪৭, দারুত-তাওফিকীয়্যা, আজহার তা. বি; (৩) আল-বালাযুরী, আনসাবুল আশরাফ, ১খ, পৃ. ১০৬, বায়তুল মাকদিস্ সং ১৯৩৬ খৃ.; (৪) বুতরুস আল-বুসতানী, দাইরাতুল-মাআরিফিল-ইসলামিয়্যা, ৭খ, দারুল মা'রিফা, বৈরূত- লেবানন, তা. বি, পৃ. ৩৪৪; (৫) ইন্ন সাদ, কিতাবুত তাবাকাত, ১খ, বৈরূত ১৯৬০খৃ., পৃ. ১২৯ ও ১৯৬; (৬) ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা' বিআহওয়ালিল মুসতাফা, লাহোর ১৯৭৭ খৃ., ১খ, পৃ. ১৬১; (৭) আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস্ সিয়ার, দেওবন্দ, ১৯৮২ খৃ., পৃ. ১৫, ১৬; (৮) সায়্যিদ গিলানী, 'আয়নুল-ইয়াকীন, বৈরূত, ১৯৮৭ খৃ., পৃ. ১২।
মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম
📄 ওহীর সাময়িক বিরতি
ফাতরাতুল ওয়াহয় (فَتْرَةُ الْوَحْى) : ফাত্রা শব্দের অর্থ ভাঙ্গা, দুর্বল হওয়া। কোন বস্তু কঠিন থাকার পর নরম হইলে এবং গরমের তীব্রতা হ্রাস পাইলে 'আরবগণ বলিয়া থাকেন, فَترالشَّنِيُّ وَالْحَرُ অর্থাৎ বস্তুটি নরম হইয়াছে এবং গরমের তীব্রতা হ্রাস পাইয়াছে। দেহের জোড়াসমূহ দুর্বল হইয়া পড়িলে বলা হয়, فتر جسمه )তাহার দেহ দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে)। দুইজন নবীর মধ্যবর্তী সময়কে বলা হয় الْفَتْرَةُ; সিহাহ গ্রন্থে উল্লেখ আছে :
الْفَتْرَةُ هِيَ مَا بَيْنَ كُلِّ رَسُولَيْنِ مِنْ رُّسُلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنَ الزَّمَانِ الَّذِي انْقَطَعَتْ فِيهِ الرسالة.
"আল্লাহ তা'আলার রাসূলগণের মধ্যে দুইজন রাসূলের মধ্যবর্তী সময়ে রিসালাত বন্ধ থাকার কালকে ফাতরাত বলা হয়" (ইবন মানজুর, লিসানুল 'আরাব, ১০খ., পৃ. ১৭৪)।
বর্ণিত আছে,
فَتْرَةُ مَا بَيْنَ عِيسَى عَلَيْهِ السَّلامُ وَمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سِتِّمِائَةٍ.
"হযরত 'ঈসা (আ) এবং হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর মাঝে নবীর আগমন বন্ধ থাকার মেয়াদ হইতেছে ছয় শত বৎসর" (শায়খ মুহাম্মাদ তাহির, মাজমা'উ বিহারিল-আনওয়ার, ৩খ, পৃ. ৫৪)।
'আল্লামা কিরমানীর (র) মতে, احْتِبَاسُ الْوَحْيِ فَتْرَةُ الْوَحْيِ অর্থাৎ ওহীর অবতরণ থামিয়া থাকা, বন্ধ থাকা। 'আল্লামা 'আয়নীর মতে, فَتَرَ الْوَحْىَ অর্থ ধারাবাহিকভাবে ওহী নাযিল হওয়ার পর তাহা বন্ধ হওয়া (বদরুদ্দীন 'আয়নী, 'উমদাতুল কারী, ১খ, পৃ. ৫৩)।
ইবন হাজার আসকালানী (র) ফাতরাতু'ল ওহীর সংজ্ঞায় বলেন,
عِبَارَةٌ عَنْ تَأَخَّرِهِ مُدَّةٌ مِّنَ الزَّمَانِ.
"কিছু সময় পর্যন্ত ওহীর অবতরণ বিলম্ব হওয়াকে ফাতরাতুল-ওহী বলা হয়"।
ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র) ইমাম শা'বী (র) হইতে বর্ণনা করেন,
إِنَّ مُدَّةَ فَتْرَةِ الْوَحْيِ كَانَتْ ثَلَاثَ سِنِينَ
"ফাতরাতু'ল-ওহীর মেয়াদ হইতেছে তিন বৎসর।"
ইবন ইসহাক (র) ফাত্রাতু'ল-ওহীর এই মেয়াদকে সঠিক বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। ইবন হাজার (র) এই প্রসঙ্গে বলেন, ইমাম বায়হাকী (র) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর
৫১০ স্বপ্ন দর্শনের সময় ছিল ছয় মাস। এই হিসাব অনুসারে রাসূলুল্লাহ (স)-এর নবুওয়াতের সূচনা যেই স্বপ্নের মাধ্যমে হইয়াছিল তাহা সংঘটিত হয় তাঁহার বয়স চল্লিশ বৎসর পূর্ণ হওয়া অব্যবহিত পরে তাঁহার জন্মের মাস রবীউল আওয়ালে। আর জাগ্রত অবস্থায় ওহীর সূচনা হইয়াছিল রমযান মাসে।
ফাত্রাতু'ল-ওহীর মেয়াদকাল তিন বৎসর অর্থাৎ এই সময়ে মহানবী (স)-এর নিকট কুরআন মাজীদের অবতরণ বন্ধ ছিল। এই সময়টি হইতেছে সূরা 'আলাক এবং সূরা আল-মুদ্দাছছির নাযিল হওয়ার মধ্যবর্তী সময় (ইবন হাজার, ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ. ২২)।
ইবন হাজার আরও বলেন, দাউদ ইবন আবী হিন্দ-এর সনদে শা'বী (র) হইতে বর্ণিত আছে: أُنْزِلَتْ عَلَيْهِ النُّبُوَّةُ وَهُوَ ابْنُ أَرْبَعِينَ سَنَةً فَقُرِنَ بِنَبُوتِهِ إِسْرَافِيلُ ثَلَاثَ سِنِينَ فَكَانَ يُعَلِّمُهُ الْكَلِمَةَ وَالشَّيْئَ وَلَمْ يَنْزِلْ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ عَلَى لِسَانِهِ عِشْرِينَ سَنَةً.
"নবী করীম (স)-এর বয়স যখন চল্লিশ বৎসর তখন তিনি নবুওয়াত লাভ করেন। তখন হইতে তিন বৎসর পর্যন্ত হযরত ইসরাফীল (আ) তাঁহার নবুওয়াতের সহিত সম্পৃক্ত থাকেন। তিনি তাঁহাকে বিভিন্ন বাক্য ও বস্তু শিক্ষা দিতেন। তাঁহার যবানে বিশ বৎসর যাবৎ কখনও নবী করীম (স)-এর উপর কুরআন নাযিল হয় নাই" (ফাতহুল বারী, ১খ., পৃ.০২২-২৩)।
ইবন আবূ খায়ছামা অপর একটি সনদে দাউদ হইতে সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করিয়াছেন, بعثَ لِأَرْبَعِينَ وَوَكِلَ بِهِ إِسْرَافِيلُ ثَلَاثَ سِنِينَ ثُمَّ وَكِلَ بِهِ جِبْرِيلُ.
"চল্লিশ বৎসর বয়সে তাঁহাকে নবুওয়াত দান করা হয়। তখন হইতে তিন বৎসর পর্যন্ত ইসরাফীল (আ)-কে তাঁহার সহিত সম্পৃক্ত রাখা হয়। অতঃপর জিবরীল (আ)-কে তাঁহার সহিত সম্পৃক্ত করা হয়।"
ইবন হাজার বলেন, এই মুরসাল হাদীছটির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মক্কায় অবস্থানের সময়সীমা সম্পর্কে দুইটি বর্ণনার মধ্যে সুন্দর সমন্বয় সাধন করা যায়। একটি মত অনুসারে তিনি তের বৎসর মক্কায় অবস্থান করিয়াছেন। আর অপর মত অনুসারে তিনি ১০ বৎসর মক্কায় অবস্থান করিয়াছেন। পরবর্তী মতের সহিত ফাতরাতুল ওহীর তিন বৎসর সময়কে যোগ করা হয় নাই।
ইবনুত তীনও পরের রিওয়ায়াতটি বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু তাঁহার বর্ণনায় ইসরাফীল (আ)-এর স্থলে মীকাঈল (আ)-এর উল্লেখ রহিয়াছে। ওয়াকিদী এই মুরসাল রিওয়ায়াতটিকে অস্বীকার করিয়াছেন। তিনি বলেন, নবী কারীম (স)-এর সহিত জিবরাঈল (আ) ভিন্ন অপর কোন ফেরেশতাকে সম্পৃক্ত করা হয় নাই।
৫১১ ইবন হাজারের মতে মুছবিত (مُثْبِتْ ) (ইতিবাচক) বর্ণনা নাফী (نَفْي ) (নেতিবাচক) বর্ণনার উপর অগ্রাধিকার প্রাপ্ত হইয়া থাকে। তবে নাফী-এর সহিত দলীলের উল্লেখ থাকিলে তাহা অগ্রাধিকার লাভ করে।
'আল্লামা সুহায়লী মুরসাল রিওয়ায়াতটিকে গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি ইহার মাধ্যমে নবী কারীম (স)-এর মক্কায় অবস্থানের সময়সীমার ব্যাপারে পরস্পর বিপরীত মতের মধ্যে সমন্বয় সাধন করিয়াছেন। তিনি বলেন, কোন কোন মুসনাদ বর্ণনায় অসিয়াছে যে, ফাতরাতুল ওহীর মুদ্দত ছিল আড়াই বৎসর। আর অপর বর্ণনায় স্বপ্ন দর্শনের মুদ্দত ছিল ছয় মাস। অতএব যাহারা বলেন, মক্কায় অবস্থানের মুদ্দত হইতেছে দশ বৎসর তাঁহারা স্বপ্নদর্শন এবং ফাতরাতুল ওহীর মুদ্দতকে বাদ দিয়াছেন। আর যাহারা তের বৎসর বলিয়াছেন তাহারা এই দুইটি সময়কে যোগ করিয়াই তের বৎসর গণনা করিয়াছেন (ফাতহুল বারী, ১খ, পৃ. ২৩)।
উল্লিখিত বর্ণনাসমূহ হইতে দেখা যায়, সুদীর্ঘ আড়াই হইতে তিন বৎসর ছিল ফাত্রাতুল ওহীর সময়সীমা। কিন্তু ইবন সা'দ-এর একটি বর্ণনা হইতে বুঝা যায়, ফাত্রাতুল ওহীর সময়সীমা ছিল অতি কম। ইবন সা'দ তাহার সনদে ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا نَزَلَ عَلَيْهِ الْوَحْيُ بِحِرَاء مَكَثَ أَيَّامًا لَا يَرَى جِبْرِيلَ فَحَزَنَ حُزْنًا شَدِيدًا حَتَّى كَانَ يَعْدُو إِلى شَبِيرٍ مَرَّةً وَإِلَى حِرَاء مَرَّةً يُرِيدُ أَنْ يُلْقِيَ نَفْسَهُ مِنْهُ فَبَيْنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَذلِكَ عَامِداً لِبَعْضٍ تِلْكَ الْجِبَالِ إِلَى أَنْ سَمِعَ صَوْتًا مِنَ السَّمَاءِ فَوَقَفَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَعِقًا لِلصَّوْتِ ثُمَّ رَفَعَ رَأْسَهُ فَإِذَا جِبْرِيلُ عَلَى كُرْسِي بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ مُتَرَبَعًا عَلَيْهِ يَقُولُ يَا مُحَمَّدُ أَنْتَ رَسُولُ اللهِ حَقًّا وَأَنَا جِبْرِيلُ قَالَ فَانْصَرَفَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَدْ أَقَرَّ اللَّهُ عَيْنَهُ وَرَبَطَ جَاشَهُ ثُمَّ تَتَابَعَ الْوَحْيُ بَعْدُ وَحَمِي.
"রাসূলুল্লাহ (স)-এর উপর হেরা পর্বতে ওহী নাযিল হওয়ার পর কয়েক দিন পর্যন্ত তিনি জিবরাঈল (আ)-কে দেখিতে পান নাই। ইহাতে তিনি ভীষণভাবে দুশ্চিন্তায় পতিত হন। এমনকি তিনি একবার 'ছাবীর' পর্বতে এবং আর একবার 'হেরা' পর্বতে গমন করিয়া নিজেকে তথা হইতে নিক্ষেপ করিবার ইচ্ছা পোষণ করেন। এইভাবে রাসূলুল্লাহ (স) একদিন যখন এই পর্বতগুলির কোন একটির উদ্দেশে গমন করিতেছিলেন তখন হঠাৎ আকাশের দিক হইতে একটি শব্দ শুনিলেন। আর অমনি রাসূলুল্লাহ (স) ঐ শব্দের ভয়ে আতংকিত হইয়া থমকিয়া দাঁড়াইলেন। অতঃপর তিনি উপরের দিকে শির উত্তোলন করিলেন। সেইখানে তিনি জিবরাঈল
৫১২ (আ)-কে আকাশ ও যমীনের মাঝে একটি কুরসীতে চারজানু হইয়া উপবিষ্ট অবস্থায় দেখিতে পাইলেন। তিনি বলিতেছেন, “হে মুহাম্মাদ! আপনি নিশ্চিতভাবে আল্লাহর সত্য রাসূল। আর আমি হইতেছি জিবরাঈল”। রাবী বলেন, ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) প্রত্যাবর্তন করিলেন এবং আল্লাহ তা’আলা তখন তাঁহার চক্ষু শীতল করিলেন এবং তাঁহার অন্তরে প্রশান্তি দান করিলেন। ইহার পর লাগাতারভাবে ওহী নাযিল হইতে থাকে এবং ওহীর অবতরণ নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত থাকে” (মুহাম্মাদ ইবন সা’দ, আত-তাবাকাতুল-কুবরা, ১খ, পৃ. ১০৪)।
এই হাদীছ হইতে স্পষ্টভাসে প্রতীয়মান হয় যে, ফাতরাতুল-ওহীর সময়সীমা খুব দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু বুখারী শরীফের কিতাবুত-তাবীরে ইবন শিহাব যুহরী (র) ‘উরওয়ার মাধ্যমে হযরত আয়েশা (রা) হইতে যেই হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন তাহা হইতে জানা যায় যে, ওহী বন্ধের সময়সীমা বেশ দীর্ঘায়িত হইয়াছিল। হাদীছটি এই :
وَفَتَرَ الْوَحْيُ فَتْرَةً حَتَّى حَزِنَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيْمَا بَلَغَنَا حُزْنًا مِّنْهُ مَرَّارًا كَىْ يَتَرَدَّى مِنْ رُؤُسِ شَوَاهِقِ الْجِبَالِ فَكُلَّمَا أَوْفَى بِذِرْوَةِ جَبَلٍ لِّكَىْ يُلْقِىْ مِنْهُ نَفْسَهُ تَبَدَّى لَهُ جِبْرِيْلُ فَقَالَ يَا مُحَمَّدُ اِنَّكَ رَسُوْلُ اللهِ حَقًّا فَيَسْكُنُ لِذٰلِكَ جَأْشُهُ وَتَقِرُّ نَفْسُهُ فَيَرْجِعُ فَاِذَا طَالَتْ عَلَيْهِ فَتْرَةُ الْوَحْيِ غَدَا لِمِثْلِ ذٰلِكَ فَاِذَا أَوْفَى بِذِرْوَةِ جَبَلٍ تَبَدَّى لَهُ جِبْرِيْلُ فَقَالَ لَهُ مِثْلَ ذٰلِكَ-
“অতঃপর ওহী বন্ধ হইয়া যায়। আর এই সম্পর্কে আমাদের (ইমাম যুহরীর) নিকট যেই সংবাদ পৌঁছিয়াছে তাহা হইতেছে, ওহী বন্ধ থাকার কারণে নবী করীম (স) এমনভাবে বিষণ্ণ হইয়া পড়েন যে, কয়েকবার তিনি পাহাড়ের চূড়ায় দ্রুত আরোহণ করিয়া তথা হইতে নিজেকে নিক্ষেপ করিতে উদ্যত হন। যখনই তিনি পাহাড়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করিয়া নিজেকে তথা হইতে নিক্ষেপ করিতে চাহেন, তখনই জিবরীল (আ) তাঁহার নিকট আত্মপ্রকাশ করেন এবং বলেন, “হে মুহাম্মাদ! আপনি অবশ্যই সত্য রাসূল”। ইহাতে তাঁহার অন্তর প্রশান্ত হইত, তাঁহার আত্মা স্থির হইত এবং তিনি প্রত্যাবর্তন করিতেন। অতঃপর যখন ফাতরাতুল-ওহীর সময় সুদীর্ঘ হইত তখন তিনি পুনরায় এইরূপ করিতেন। যখনই তিনি পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় আরোহণ করিতেন তখনই হযরত জিবরীল (আ) আত্মপ্রকাশ করিতেন এবং তাঁহাকে অনুরূপ সান্ত্বনা বাক্য শুনাইতেন” (মুহাম্মাদ ইবন ইসমাঈল, আল-জামি, ২খ, পৃ. ১০৪)।
এই হাদীছ হইতে প্রতীয়মান হয়, ফাতরাতুল-ওহীর সময়সীমা ছিল দীর্ঘ। ফাতরাতুল-ওহীর সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর সূরা আল-মুদ্দাস্সিরের শুরুর পাঁচটি আয়াত সর্বপ্রথম নাযিল হয়। বুখারী শরীফে বর্ণিত আছে :
৫১৩ قَالَ ابْنُ شِهَابٍ وَأَخْبَرَنِي أَبُو سَلَمَةَ ابْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ أَنَّ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللَّهِ الْأَنْصَارِي قَالَ وَهُوَ يُحَدِّثُ عَنْ فَتْرَةِ الْوَحِي فَقَالَ فِي حَدِيثِهِ بَيْنَا أَنَا أَمْشِي إِذْ سَمِعْتُ صَوْتًا مِنَ السَّمَاءِ فَرَفَعْتُ بَصَرِى فَإِذَا الْمَلَكُ الَّذِي جَاءَ نِي بِحِرَاءَ جَالِسٌ عَلَى كُرْسِي بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ فَرُوعِبْتُ مِنْهُ فَرَجَعْتُ فَقُلْتُ زَمِّلُونِي فَأَنْزَلَ اللهُ تَعَالَى يُأَيُّهَا الْمُدَّثِرُ إِلَى قَوْلِهِ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ فَحَمِيَ الْوَحْيُّ وَتَتَابَعَ.
"ইবন শিহাব বলেন, আমার নিকট আবু সালামা ইবন 'আবদুর রাহমান বর্ণনা করেন যে, জাবির ইবন 'আবদুল্লাহ আনসারী (রা) ফাতরাতু'ল-ওহী সম্পর্কে হাদীছ বর্ণনা করিতে গিয়া বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইহার বিবরণ প্রসঙ্গে তাঁহার বর্ণনায় বলিয়াছেন, আমি যখন চলিতেছিলাম তখন হঠাৎ আকাশ হইতে একটি শব্দ শুনিয়া সেইদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিলাম। আমি সেইখানে আকাশ ও যমীনের মধ্যস্থলে কুরসীতে উপবিষ্ট ঐ ফেরেশতাকে দেখিতে পাইলাম যিনি হেরা পর্বতে আমার নিকট আসিয়াছিলেন। ইহার পর আমি গৃহে ফিরিয়া আসিলাম এবং বলিলাম, আমাকে বস্ত্রাবৃত করিয়া দাও। আর তখনই আল্লাহ তাআলা নাযিল করেন, “হে বস্ত্রাচ্ছাদিত! উঠ, সতর্কবাণী প্রচার কর এবং তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখ। অপবিত্রতা হইতে দূরে থাক" (৭৪: ১-৫)। ইহার পর ওহী অধিক হারে নাযিল হওয়া শুরু হয় এবং লাগাতারভাবে অবতীর্ণ হইতে থাকে” (মুহাম্মাদ ইবন ইসমাঈল, আল-জামি, ১খ, পৃ. ২১)।
মুহাম্মদ ইবন ইসহাক-এর মতে ফাতরাতুল ওহী-এর পরে সর্বপ্রথম সূরা দুহা নাযিল হয়। কোনও কোনও রাবী এই প্রসঙ্গে বলেন,
وَلِهَذَا كَبَّرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي أُولِهَا فَرْحًا .
"আর এই কারণেই রাসূলুল্লাহ (স) উৎফুল্ল হইয়া ইহার শুরুতে তাকবীর ধ্বনি দিয়াছিলেন" (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ, পৃ. ১৭)।
ইবন কাছীর (র) এই মতটিকে অগ্রহণযোগ্য বলিয়া উল্লেখ করেন। অতঃপর তিনি বলেন:
وَلكِنْ نَزَلَتْ سُورَةُ وَالضُّحَى بَعْدَ فَتْرَةٍ أُخْرى كَانَتْ لَيَالِيَ يَسِيْرَةٍ كَمَا ثَبَتَ فِي الصَّحِيحَيْنِ وَغَيْرِهِمَا مِنْ حَدِيثِ الأَسْوَدِ بْنِ قَيْسٍ عَنْ جُنْدَبِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ الْبُجَلِي قَالَ اشْتَكَى رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَلَمْ يَقُمْ لَيْلَةَ أَوْ لَيْلَتَيْنِ أَوْ ثَلَاثًا فَقَالَتْ امْرَأَةٌ مَا
৫১৪ أَرَى شَيْطَانَكَ إِلَّا تَرَكَ فَأَنْزَلَ اللهُ تَعَالَى وَالضُّحَى وَالَّيْلِ إِذَا سَجَى مَا وَدَّعَكَ رَبُّكَ وَمَا قَلَى.
"অপর একটি বিরতির পরে সূরা ওয়াদ্-দুহা নাযিল হয়। এই বিরতি ছিল অল্প কয়েকটি রাত্রের। বুখারী, মুসলিম প্রভৃতি গ্রন্থে বর্ণিত আছে, আসওয়াদ ইবন কায়স (র) জুনদুব ইবন 'আবদুল্লাহ আল-বাজালী (রা) হইতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, এক সময় রাসূলুল্লাহ (স) অসুস্থ হইয়া পড়েন। ইহাতে তিনি এক অথবা দুই অথবা তিন রজনী (তাহাজ্জুদ সালাতের জন্য) উঠেন নাই। তখন জনৈকা নারী (আবু লাহাবের স্ত্রী এবং আবূ সুফয়ানের ভগ্নি 'আওরা বিনত হারব) বলিল, আমার ধারণা তোমার শয়তান তোমাকে ত্যাগ করিয়াছে। তখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করেন, "শপথ পূর্বাহ্নের, শপথ রাত্রির যখন তাহা গভীর হয়। আপনার পালনকর্তা আপনাকে ত্যাগ করেন নাই এবং আপনার প্রতি বিরূপও হন নাই" (৯৩ : ১-৩)।
হাফিজ ইবন কাছীর (র) এই হাদীছটি উল্লেখ করিবার পর মন্তব্য করেন, وَبِهَذَا الْأَمْرِ حَصَلَ الْإِرْسَالُ إِلَى النَّاسِ وَبِالْأَوَّلِ حَصَلَتِ النُّبُوَّةُ.
"এই ঘটনা ও আয়াত নাযিলের প্রেক্ষিতে জনগণের প্রতি মহানবী (স)-এর রিসালাত সাব্যস্ত হয় এবং প্রথমটির প্রেক্ষিতে তাঁহার নবুওয়াত সাব্যস্ত হয়।"
হাফিজ ইবন কাছীর আরও বলেন, কেহ কেহ বলেন, ফাতরাতের সময়সীমা ছিল দুই অথবা আড়াই বৎসরের কাছাকাছি। তাহাতে স্পষ্ট দেখা যায় যে, ফাতরাতুল-ওহী হইতেছে ঐ সময়কাল যখন মীকাঈল (আ) তাঁহার সহিত সম্পৃক্ত ছিলেন। যেমন শা'বী এবং অন্যান্যরাও এই মত পোষণ করিয়াছেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৩খ., পৃ. ১৭-১৮)।
গ্রন্থপঞ্জী : (১) ইবন মানজুর, লিসানুল-'আরাব, ১০খ., পৃ. ১৭৪; (২) শায়খ মুহাম্মাদ তাহির, মাজমা'উ বিহারিল-আনওয়ার, ৩খ., পৃ. ৫৪; (৩) বদরুদ্দীন 'আয়নী, 'উমদাতুল কারী, দারু'ল-ফিকর, ১খ., পৃ. ৫৩; (৪) ইবন হাজার, ফাতুহুল বারী, ১খ, ২য় সং, পৃ. ২৩-২৩, বৈরূত ১৪০২ হিজরী; (৫) মুহাম্মাদ ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতু'ল-কুবরা, ১খ, ১ম সং, বৈরূত ১৪১০/১৯৯০, পৃ. ১৫৪; (৬) মুহাম্মাদ ইবন ইসমা'ঈল, আল-জামি', ২খ, পাকিস্তান ১০৩৪; পৃ. ১৯৬ ১খ., পৃ. ২; (৯) ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., পৃ. ১৭-১৮, ১ম সং ১৪১৭/১৯৯৭)।
ড. মুহাম্মদ শফিকুল্লাহ