📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত খাদীজা (রা)-এর সহিত বিবাহ

📄 হযরত খাদীজা (রা)-এর সহিত বিবাহ


হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়ায়লিদ (রা) ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মহিলা। সেই যুগে আরবে নারীদের অধিকার বলিতে কিছুই ছিল না। পদে পদে নারীরা চরম অবমাননা ও লাঞ্ছনার শিকার হইত। সেই সময় এই সতী-সাধ্বী মহিলা স্বীয় পবিত্রতা ও বংশমর্যাদা রক্ষা করিয়া অতি সম্মানের সহিত জীবন যাপন করিতেন। তাঁহার এই পবিত্র ও সুমধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে, যাহার ফলে আইয়ামে জাহিলিয়া এবং ইসলামের যুগেও লোকজন তাঁহাকে 'তাহিরা' উপাধিতে ভূষিত করে (সীরাতুল মুস্তাফা, ইদরীস কান্দহলবী, ১খ., পৃ. ৯৯; ফতহুল বারী, ১খ, পৃ. ৭৭)।
হযরত খাদীজা (রা)-র পরপর দুইজন স্বামী ইনতিকাল করেন। তাহাদের পরিত্যক্ত এবং পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ মিলিয়া তিনি অগাধ ধন-সম্পদের মালিক হইয়াছিলেন। এই ধন-সম্পদ তিনি দরিদ্র ও অসহায়গণকে দান করিতেন এবং মানুষের কল্যাণে ব্যয় করিতেন। তিনি কর্মচারী নিয়োগ করিয়া তাহাদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে মালামাল প্রেরণ করিয়া ব্যবসা-বাণিজ্যও অব্যাহত রাখিয়াছিলেন এবং নিজেই তাহা তত্ত্বাবধান করিতেন। একবার কুরায়শদের একটি বাণিজ্যিক দল তাহাদের মালামাল নিয়া ব্যবসার উদ্দেশে সিরিয়া গমনের জন্য প্রস্তুত হইতেছিল। তখন হযরত খাদীজা (রা) তাঁহার মালামাল বিদেশে প্রেরণের চিন্তা করিতেছিলেন এবং কাহাকে স্বীয় ব্যবসার দায়িত্ব প্রদান করা যায় এই নিয়া ভাবিতেছিলেন। তাঁহার মালামালের পরিমাণ এত অধিক ছিল যে, সমগ্র কুরায়শদের মালামাল একত্র করিলেও তাহার সমপরিমাণ হইত না।
এই সময় হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর বয়স ছিল পঁচিশ বৎসর। তাঁহার সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও আমানতদারি প্রভৃতি গুণের কথা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে এবং মক্কা নগরীর সকলেই তাঁহাকে আল-আমীন বা সত্যবাদী বলিয়া ডাকিতে থাকে। ইতোমধ্যে হযরত খাদীজা (রা) তাঁহার সত্যবাদিতা ও কর্মদক্ষতার কথা জানিতে পারিয়াছেন এবং দেশ-বিদেশে যাতায়াত করিয়া ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে তাঁহার যে পূর্ব অভিজ্ঞতা রহিয়াছে ইহাও তিনি অবগত হইয়াছেন। সুতরাং এইরূপ বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির উপর স্বীয় ব্যবসার দায়িত্বভার অর্পণ করিবার জন্য হযরত খাদীজা (রা) স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। এই উদ্দেশে তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে তাঁহার বাড়ীতে ডাকিয়া আনিবার জন্য লোক পাঠাইলেন।
হযরত খাদীজা (রা)-র আহ্বানে নবী করীম (স) তাঁহার বাড়ীতে উপস্থিত হইলেন। হযরত খাদীজা (রা) তাঁহাকে সম্ভ্রমে বলিলেন, আমি আপনার সত্যনিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা ও উন্নত চরিত্রের কথা জানিতে পারিয়াছি। যদি অনুগ্রহ করিয়া আপনি আমার ব্যবসার দায়িত্বভার গ্রহণ করিয়া মালামালসহ সিরিয়া গমন করেন তাহা হইলে আমি খুবই বাধিত হইব এবং আপনার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করার জন্য আমার গোলাম মায়সারাকে আপনার সহিত প্রেরণ করিব। ইহা ছাড়া অন্যান্যদিগকে আমি যেই হারে লভ্যাংশ দিয়া থাকি আপনাকে উহার দ্বিগুণ প্রদান করিব। হযরত খাদীজার প্রস্তাবে তিনি খাজা আবূ তালিবের পরামর্শ ও অনুমতি চাহিলেন। আবূ তালিব তখন প্রায় বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হইয়াছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য করা বা বিদেশ গমন এখন আর তাহার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তিনি খাদীজার ব্যবসার দায়িত্ব নিয়া সিরিয়া গমনের মাধ্যমে কিছু অর্থ উপার্জন করা উত্তম বলিয়া মনে করিলেন এবং হযরত খাদীজার প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করিলেন (আল্লামা ইদরীস কান্দেলবী, সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, পৃ. ৮৭)।
বাণিজ্য কাফেলা প্রস্তুত হইল। এইবার রাসূলুল্লাহ (স) অনেক মূলধন ও প্রচুর মালামাল লইয়া সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলেন। হযরত খাদীজা (রা)-র গোলাম মায়সারাও এই সফরে তাঁহার সঙ্গী ছিলেন। কয়েক দিন চলার পর তাহারা সিরিয়ার অন্তর্গত বুসরা নগরে পৌছিলেন এবং বিশ্রাম গ্রহণের জন্য একটি গাছের ছায়ায় উপবেশন করিলেন। নিকটেই ছিল এক খৃস্টান পাদ্রীর গির্জা। তাহার নাম ছিল নাসতুরা। তিনি নবী করীম (স)-কে দেখিয়া তাঁহার নিকটে আসিলেন এবং তাঁহাকে বলিলেন, হযরত ঈসা ইবন মারয়ামের পর আপনি ছাড়া আর কোন নবী এই গাছের ছায়ায় অবস্থান করেন নাই। ইহার পর তিনি মায়সারাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই ব্যক্তি কে যিনি এই গাছের নিচে বসিয়াছেন? মায়সারা বলিল, পবিত্র মক্কার কুরায়শ বংশের এক সম্ভ্রান্ত যুবক। অতঃপর পাদ্রী মায়সারাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তাঁহার উভয় চোখে লালিমা আছে কি? মায়সারা বিলল, হাঁ, লালিমা আছে এবং এই লালিমা কখনও দূরীভূত হয় না। পাদ্রী বলিলেন, ইনিই হইলেন প্রতিশ্রুত শেষনবী (আল্লামা সুয়ূতী (র), আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ, পৃ. ৯১; ইদরীস কান্দেহলাবী, সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, পৃ. ১০০)।
অতঃপর নবী করীম (স) সমস্ত পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করিলেন এবং নূতন কিছু দ্রব্যাদি ক্রয় করিলেন। পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাইয়া এইবার তিনি প্রচুর লাভবান হইলেন। ফলে অত্যন্ত আনন্দ ও প্রফুল্ল চিত্তে তিনি কাফেলার সহিত মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হইলেন। পথিমধ্যে মায়সারা দেখিতে পায় যে, যখনই দ্বিপ্রহরের রৌদ্রে উত্তাপ প্রচণ্ড বৃদ্ধি পায়, তখনই দুইজন ফেরেশতা হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে ছায়া দিয়া রৌদ্রের উত্তাপ হইতে রক্ষা করিতেছে (আল-খাসাইসুল কুবra; ১খ, পৃ. ৯১)। এই দিকে হযরত খাদীজা (রা) বাণিজ্য কাফেলার প্রতীক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করিতেছিলেন।
একদিন তিনি স্বীয় কক্ষে বসিয়া বাহিরের দিকে তাকাইয়া আছেন। এই সময় দেখিতে পাইলেন যে, দূরে একটি কাফেলা আসিতেছে এবং ইহার অগ্রভাগে হযরত মুহাম্মাদ (স) উটের উপর আরোহণ করিয়া আসিতেছেন। তিনি আরো দেখিতে পাইলেন যে, প্রখর রৌদ্রের উত্তপ হইতে রক্ষার জন্য দুইজন ফেরেশতা তাঁহার উপর ছায়াদান করিতেছে। তিনি নিকটস্থ মহিলাগণকে এই দৃশ্য দেখাইলেন। সকলে এই দৃশ্য দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল (ইদরীস কানধলাবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, ১০০-১০১)। কিছুক্ষণের মধ্যেই নবী করীম (স) হযরত খাদীজা (রা)-র বাড়িতে আসিয়া পৌছিলেন এবং আমদানীকৃত সমস্ত মালামাল ও অর্থ তাঁহাকে যথাযথভাবে বুঝাইয়া দিলেন। এই সফরে হযরত খাদীজা (রা) পূর্বের চাইতে অধিক লাভবান হইলেন। সুতরাং অঙ্গীকার অনুযায়ী আনন্দচিত্তে দ্বিগুণের বেশী লভ্যাংশ প্রদান করিয়া তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে ধন্যবাদ জানাইয়া বিদায় করিলেন, অপরদিকে মায়সারাও হযরত খাদীজা (রা)-র নিকট উপস্থিত হইল এবং বিগত সফরের অভিজ্ঞতাসহ পাদ্রী নাসতুরার ভবিষ্যদ্বাণী ও ফেরেশতাদের ছায়াদানের ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করিল।
হযরত খাদীজা (রা) অত্যন্ত বুদ্ধিমতি ও বিচক্ষণ মহিলা ছিলেন। যুবক বয়স হইতেই নবী করীম (স)-এর সত্যবাদিতা ও অন্যান্য গুণাবলীর কারণে হযরত খাদীজা (রা) তাঁহার গুণমুগ্ধ ছিলেন। ব্যবসায় যোগদানের পর তাঁহার সহিত আরো ঘনিষ্ঠভাবে পরিচয় ঘটে। তাঁহার সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, উন্নত চরিত্র, মধুর ব্যবহার ও সৌম্যকান্তি ইত্যাদি হযরত খাদীজা (রা)-কে আরো আকৃষ্ট করিয়া তোলে। তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স) সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করিতে লাগিলেন। তাই সিরিয়া সফরের সময় তাঁহার সম্পর্কে পাদ্রীর ভবিষ্যদ্বাণী, ফেরেশতাদের ছায়াদান ও অন্যান্য ঘটনাবলী ওয়ারাকা ইব্‌ নওফাল-এর নিকট বর্ণনা করিলেন। তিনি ছিলেন হযরত খাদীজা (রা)-র চাচাত ভাই এবং তাওরাত ও ইঞ্জীলের জ্ঞানে সমৃদ্ধ একজন পণ্ডিত ব্যক্তি। ওয়ারাকা বলিলেন, যদি এই সমস্ত ঘটনা সত্য হয় তাহা হইলে নিশ্চয় হযরত মুহাম্মাদ (স) এই উম্মতের নবী হইবেন। আমি ইহা নিশ্চিতভাবে অবগত আছি যে, এই উম্মতের মধ্যে শীঘ্রই একজন নবী আগমন করিবেন এবং আমরা তাঁহার আগমন অপেক্ষায় আছি। ওয়ারাকা ইন নওফালের নিকট এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনিয়া হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর প্রতিশ্রুত শেষ নবী হওয়া সম্পর্কে তাঁহার মনে দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হইল। সুতরাং তাঁহাকে ঘনিষ্ঠভাবে পাওয়া একটি বিরাট সৌভাগ্যের বিষয় হইবে বলিয়া তাঁহার মন আন্দোলিত হইতে লাগিল এবং তাঁহার সহধর্মিনী হওয়ার জন্য হযরত খাদীজা (রা)-র মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া উঠিল (মাওলানা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ১খ, পৃ. ১৮৮; ইদরীস কান্দহলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, পৃ. ১১১)।
এই সময় হযরত খাদীজা (রা)-র বয়স হইয়াছিল চল্লিশ বৎসর। ইহার পূর্বে তাঁহার আরো দুইবার বিবাহ হইয়াছিল। প্রথম বিবাহ হইয়াছিল আবূ হালা ইন্ন যুরারার সহিত। তাহার ঔরসে হযরত খাদীজার দুইটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাহাদের নাম ছিল যথাক্রমে হিন্দ ও হারিস। আবূ হালার মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার তাঁহার বিবাহ হয় আতিক ইন্ন আয়েসের সঙ্গে। আতীকের ঔরসে হযরত খাদীজার একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাহার নাম ছিল হিন্দ। ইহার পর তিনি বিধবা অবস্থায় পবিত্র জীবন যাপন করিতে থাকেন। এত অধিক বয়সে বিবাহের প্রস্তাব দিতে স্বভাবতই তিনি ইতস্তত করিতেছিলেন। ইতোপূর্বে কুরায়শ গোত্রের নেতৃস্থানীয় অনেকেই খাদীজার নিকট বিবাহের প্রস্তাব দিয়াছিল, কিন্তু তিনি কাহারও প্রস্তাবে সাড়া দেন নাই। পক্ষান্তরে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর বয়স তখন ছিল মাত্র পঁচিশ বৎসর। সুতরাং এই যুবক বয়সে তাঁহাকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করিতে সম্মত হইবেন কিনা সেই আশংকাও হযরত খাদীজার মনে জাগিয়া উঠিল। কিন্তু এই স্বর্গীয় আকর্ষণের কারণে তাঁহাকে কোন ভয়-ভাবনা নিবৃত্ত করিতে পারিল না। সুতরাং খাদীজা তাঁহার সহচরী এবং উভয় পক্ষের আত্মীয়া নাফীসার মাধ্যমে নবী করীম (স)-এর নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠাইলেন।
বিবি নাফীসা বলেন, আমি তাঁহার নিকট যাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, হে মুহাম্মাদ! আপনি বিবাহ করিতেছেন না কেন? তিনি উত্তরে বলিলেন, এখনও আমি বিবাহের চিন্তাই করি নাই। ইহা ছাড়া বিবাহ করিবার মত সম্পদও আমার নাই। আমি বলিলাম, যদি আমি ইহার সুব্যবস্থা করিয়া দিতে পারি এবং এমন মহিলার সহিত সম্পর্কের কথা বলি যিনি রূপে, গুণে, ধনে, বংশমর্যাদায় ও স্বভাব-চরিত্রে অতুলনীয়া, তাহা হইলে আপনি কি এই বিবাহে সম্মত হইবেন? তিনি বলিলেন, এমন মহিলা কে তাহা জানিতে পারি কি? তিনি বলেন, তখন আমি খাদীজার নাম বলিলাম। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করিলেন, খাদীজা বিবাহ করিবেন? নাফীসা বলিলেন, আমি এই বিবাহের দায়িত্ব গ্রহণ করিলাম। ইহার পর আমি খাদীজার নিকট যাইয়া হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সম্মতির কথা জানাইলাম। খাদীজার তখন কি আনন্দ! তিনি যেন আনন্দে আত্মহারা হইয়া গেলেন। অতঃপর বিবাহের ব্যাপারে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। কারণ সেই যুগে বিবাহের ব্যাপারে নারীদের পূর্ণ স্বাধীনতা ও অধিকার ছিল। তখন হযরত খাদীজার পিতা খুওয়ায়লিদ ইব্‌ন আসাদ জীবিত ছিলেন না। ফিজার যুদ্ধের পূর্বেই তিনি ইনতিকাল করেন। সুতরাং তিনি তাঁহার চাচা আমর ইব্‌ন আসাদকে বিবাহের ব্যাপারে তাঁহার অভিপ্রায় জানাইলেন এবং বিবাহ কার্য সম্পন্ন করিয়া দিবার জন্য অনুরোধ জ্ঞাপন করিলেন (মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স), পৃ. ৩৯)।
অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পিতৃব্য আবূ তালিবকে খাদীজার এই প্রস্তাব সম্পর্কে অবহিত করিলেন। আবূ তালিব সর্বদা তাহার এই স্নেহের ভাতিজার কল্যাণ কামনা করিতেন। সুতরাং সর্বদিক বিবেচনা করিয়া তিনি আনন্দচিত্তে এই বিবাহে সম্মতি জানাইলেন। আবূ তালিব তখন যথানিয়মে হযরত খাদীজার পিতৃব্য আমর ইবন আসাদের নিকট স্বীয় ভ্রাতুষ্পুত্রের বিবাহের পয়গাম পাঠাইলেন এবং সকলের সম্মতিক্রমে এই মহামিলন ও শুভ কাজের দিন, তারিখ ও মোহর ধার্য করিলেন। যথাসময়ে উভয় পক্ষের আত্মীয়বর্গ হযরত খাদীজার বাড়ীতে উপস্থিত হইলেন। হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর চাচা আবূ তালিব ও হামযা প্রমুখ কুরায়শ নেতৃবৃন্দ বিবাহ মজলিসে সমাগত হইলেন। হযরত খাদীজার চাচা আমর ইব্‌ন আসাদ এবং তাঁহার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফাল বিবাহ মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। এই বিবাহে পাত্র পক্ষে আবু তালিব এবং পাত্রীপক্ষে আমর, ইব্‌ন আসাদ অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করিলেন। সকলকে যথাযোগ্য আদর অভ্যর্থনার পর আবু তালিব বিবাহ মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে সম্বোধন করিয়া এই খুতবা প্রদান করেন:
আলহামদুলিল্লাহিল্লাজী জাআলানা মিন যুররিয়াতি ইবরাহীমা ওয়া যার'ই ইসমাইলা ওয়া যীযি মা'আদ ওয়া উনসু'রি মুদার ওয়া জা'আলানা হাযানাতা বাইতিহী ওয়া সুওয়াসা হারামিহী ওয়া জা'আলা লানা বাইতান মাহজুজান ওয়া হারামান আমনান ওয়া জা'আলা নাল হুক্কামা আলান নাস। ছুম্মা ইন্নাবনা আখী হাযা মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহি লা ইউওয়াজ্জানূ বি-রাজুলিন ইল্লা রাজ্জাহা বিহী শারাফান ওয়া নুবলান ওয়া ফাযলান ওয়া 'আক্বিলান। ফাইন্ন কান ফীল মাল কিল্লু ফা ইন্না আল-মাল্লা যিল্লুন যাইলুন ওয়া আমরুন হাইলুন। ওয়া মুহাম্মাদুন মিন ক্বাদ ফা'তামু ক্বারাবাতাহু ওয়াক্বাদ খাতাবতু খাদীজা বিনত খুওয়াইলিদ ওয়াবাযালতুস সাদা'ক্বা মা আজালাহু ওয়া আজালাহু মিন মালী 'ইশরুনা বায়'রুন। ওয়া হুওয়া ওয়াল্লাহু বা'দাল হাযা লাহু নাবা'উন আ'যীমুন ওয়া খাত্ব্রুন জালী'লুন জাসীমুন।
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য যিনি আমাদিগকে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বংশে এবং হযরত ইসমাঈল (আ)-এর গোত্রে সৃষ্টি করিয়াছেন, যিনি আমাদিগকে মা'আদ্দ ও মুদারের বংশোদ্ভূত করিয়াছেন, যিনি আমাদিগকে তাঁহার পবিত্র কা'বা গৃহের মর্যাদা রক্ষা এবং পবিত্র হারাম শরীফের খাদেম মনোনীত করিয়াছেন, যিনি কা'বা শরীফকে হজ্জব্রত পালনের স্থান এবং হারাম শরীফকে নিরাপত্তার স্থান বানাইয়াছেন এবং যিনি আমাদিগকে জনসাধারণের হাকীম নির্বাচিত করিয়াছেন। অতঃপর আমার এই ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ জ্ঞানে, গুণে, মর্যাদা ও মহত্বে কেহই তাঁহার সমকক্ষ নহে। যদিও তাঁহার ধন-সম্পদ কম কিন্তু পার্থিব ধন-সম্পদ অস্থায়ী ছায়ার মত পরিবর্তনশীল, নশ্বর। মুহাম্মদের আত্মীয়-স্বজনদের সম্পর্কে নিশ্চয় তোমরা অবগত রহিয়াছ। অতঃপর মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ খাদীজা বিনত খুওয়ায়লিদ-এর সহিত বিবাহের প্রস্তাব পেশ করিতেছি এবং আমার পক্ষ হইতে মোহরানা বাবদ বিশটি উট আদায় করিতেছি। আল্লাহ্র শপথ! তাঁহার ভবিষ্যত অতি উজ্জ্বল ও অতি মহান। কিছু দিন পরই তাঁহার অবস্থার পরিবর্তন হইয়া যাইবে (তারীখে ইব্‌ন খালদুন, ১খ, পৃ. ২৫-২৬; মুহাম্মাদ রিদা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯)।
আবূ তালিবের খুতবার পর পাত্রীপক্ষ হইতে হযরত খাদীজার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইব্‌ন নাওফাল আগত মেহমানদিগকে সম্বোধন করিয়া এই খুতবা পাঠ করেন:
আলহামদুলিল্লাহিল্লাজী কামা যাকারা তা ওয়া ফায্যলানা আলা মা আদাদতা ফানাহনু সাদাতুল আরাবি ওয়া ক্বদাতুহা ওয়া আনতুম আহলু যালিক কুল্লুহু লা তুনকিরুল আশীরাতু ফাযলাকুম ওয়া লা ইয়ারুদ্দু আহাদুন মিনান নাসি খারা'কুম ওয়া শারাফাকুম ওয়াক্বাদ রাগিবনা ফিল ইত্তিসালি বি হাবলিকুম ওয়া শারাফিকুম ফা আশহাদূ আলা মাআ'শির ক্বুরাইশ বি আন্নী ক্বাদ জাওওয়াজতু খাদীজা বিনত খুওয়াইলিদ মিন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ আলা ক্বাযা।
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য, যিনি আমাদিগকে ঐরূপ মর্যাদা দান করিয়াছেন, (হে আবূ তালিব) আপনি যাহা বলিয়াছেন। অতঃপর আমরা আরবের সর্দার ও নেতা এবং আপনারা সমস্ত মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। আপনাদের বংশমর্যাদা, আভিজাত্য ও উচ্চ মর্যাদা কোন আরব অস্বীকার করিতে পারে না এবং অন্য কেহও অস্বীকার করিতে পারে না। নিশ্চয় আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সহিত আপনাদের সহিত আত্মীয়তার সম্পর্ক করিতে আগ্রহান্বিত। অতএব হে কুরায়শগণ! তোমরা সাক্ষী থাক, আমি খাদীজা বিন্ত খুওয়ায়লিদকে মুহাম্মদি ইব্‌ আবদুল্লাহ্ সহিত বর্ণিত মোহরানায় বিবাহ দিলাম” (প্রাগুক্ত)।
এই সময় আবূ তালিব বলিলেন, হে ওয়ারাকা! খাদীজার চাচা আমর ইব্‌ন আসাদও এইখানে উপস্থিত রহিয়াছেন। তিনি যদি আপনার সহিত বিবাহ প্রদানে আপনার পৃষ্ঠপোষকতা করেন তাহা হইলে আমরা আনন্দিত হইব। তখন আমর ইব্‌ন আসাদ বলিলেন, আপনারা সাক্ষী থাকুন, আমি আমার ভাই খুওয়ায়লিদ-এর কন্যা খাদীজাকে মুহাম্মাদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্র সহিত বিবাহ দিলাম। ইহার পর উভয় পক্ষে ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হয় এবং পানাহারের মাধ্যমে বিপুল উৎসাহ, আনন্দ ও কোলাহলের সহিত শুভ বিবাহ সমাপ্ত হয় (আল খাসাইসুল কুবরা, আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র), বৈরূত, ১খ, পৃ. ৯১; সীরাতুল মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, হযরত মাওলানা ইদরীস কান্দেহলবী, ১খ, দেওবন্দ, পৃ. ১১১-১১২; (আস-সীরাতু ইন্ন হিশাম, মিসর, পৃ. ১৯০)।
আস-সীরাতুল হালবিয়‍্যাসহ অন্যান্য সীরাত গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী প্রতীয়মান হয় যে, হযরত খাদীজা (রা)-র বিবেহে সাড়ে বার উকিয়া (اوقیه) দেনমোহর নির্ধারণ করা হইয়াছিল। উকিয়া হইল তৎকালে প্রচলিত এক প্রকার স্বর্ণ-মূদ্রার নাম আর রৌপ্যমুদ্রার নাম ছিল দিরহাম। এক উকিয়া চল্লিশ দিরহামের সমান। সুতরাং সাড়ে বার উকিয়ায় হইল ৫০০ দিরহাম। রাসূলুল্লাহ (স) উম্মুল মু'মিনীনদের জন্য সাড়ে বার বা ৫০০ দিরহাম দেনমোহর নির্ধারণ করিতেন। যেহেতু হযরত ফাতিমা (রা)-র মোহরও ৫০০ দিরহাম ছিল, এইজন্য এই পরিমাণ দেন মোহরানাকে মহরে ফাতেমী বলা হয় (আল্লামা আলী ইব্‌ন বুরহানুদ্দীন হালাবী (র), সীরাতে হালাবীয়া, পৃ. ৫-১২; আল্লামা শিবলী নুমানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন্নবী (স), ১খ, পৃ. ১১৮)।
ইবন হিশাম তাঁহার সীরাত গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত খাদীজা (রা)-কে মোহরানা হিসাবে বিশটি উট প্রদান করিয়াছিলেন। যুরকানী বলেন, ইন্ন হিশামের এই বর্ণনাটি অন্যান্য বর্ণনার পরিপন্থী নহে। কারণ বিবাহের সময় সাড়ে বার উকিয়া মোহর নির্ধারিত হইয়াছিল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ্ (স) সন্তুষ্ট হইয়া অতিরিক্ত মোহররূপে এই বিশটি উট প্রদান করিয়াছিলেন (যুরকানী, ১খ, পৃ. ২৭৫)।
নবী করীম (স)-এর বয়স যখন পঞ্চাশ বৎসর তখন হযরত খাদীজা (রা) ৬৫ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন। পঁচিশ বৎসরের বৈবাহিক জীবনে হযরত খাদীজা (রা)-র গর্ভে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দুই পুত্র ও চার কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। সন্তানদের মধ্যে কাসেম ও আবদুল্লাহ পুত্র সন্তান ছিলেন। আবদুল্লাহ-এর উপনাম ছিল তাহের ও তায়্যিব। কাসেম-এর নামানুসারেই রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উপনাম হইয়াছিল আবুল কাসেম। পুত্রগণ শিশুকালেই ইনতিকাল করেন। কন্যাগণের নাম হইল যয়নব, রুকায়্যা, উম্মে কুলছুম ও ফাতিমা (রা)।

টিকাঃ
১. আল্লামা আবদুর রহমান ইব্‌ন খালদুন, তারীখে ইব্‌ন খালদুন, ইদারায়ে দরসে ইসলাম, দেওবন্দ ১৯৭৮ খৃ., ১খ, পৃ. ২৫-২৬;
২. আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, দেওবন্দ, ১৯৩২ খৃ., পৃ. ৮-১১;
৩. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আল-খাসাইরূসুল কুবরা, বৈরূত, ১খ, পৃ. ৯২;
৪. আবদুর রহমান ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা বিআহওয়ালিল মুস্তাফা, মিসর ১৩৮৬ হি:/ ১৯৬৬ খৃ., ১খ, পৃ. ১৪৩-১৪৫;
৫. ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, মিসর, ১খ, পৃ. ১৯২-১৯৫;
৬. আলী ইব্‌ন বুরহানুদ্দীন হালাবী (র), সীরাতে হালাবীয়া, দেওবন্দ, পৃ. ৭১-৮০;
৭. ইদরীস কান্দেহলাবী, সীরাতুল মুস্তাফা সাল্লাল্লঅহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, দেওবন্দ ১৯৮০ খৃ., ১খ, পৃ. ১১১-১১২;
৮. আল্লামা শিবলী নুমানী ও আল্লামা সুলায়মান নদবী, সীরাতুন্নবী (স), করাচী, ১৯৮৪ খৃ., ১খ, পৃ. ১১৭-১১৮;
৯. আলহাজ্জ শমসের আলী খান রাও, সীরাতে মুহসিনে কায়েনাত (সা), বৃটেন, পৃ. ৪২-৪৬;
১০. মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স), বৈরূত ১৯৮৫ খৃ., পৃ. ৩৩;
১১. শিবলী নুমানী, সীরাতুন্নবী (সা), আযমগড়,, ১৩৩৯ হি. পৃ. ১৮৫-১৮৯;
১২. মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোস্তফা চরিত, ঢাকা ১৩৯৫ হি. ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ২৮১-২৮৬;
১৩. গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, ঢাকা ১৯৭৩ খৃ., পৃ. ৫৯-৬৪;
১৪. আবদুল খালেক, এম, এ, সাইয়েদুল মুরসালীন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১ম সং, ১৯৮৪ খৃ., পৃ. ৫৬-৫৮;
১৫. সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী, অনু. আবূ সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী, নবীয়ে রহমত (সা), মজলিস নাশরিয়াত-ই ইসলাম, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ১ম সং ১৯৯৭ খৃ., পৃ. ১২০;
১৬. মুফতী মোহাম্মদ শফী (র), অনু. মুহাম্মদ সিরাজুল হক, সীরাতে খাতিমুল আম্বিয়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ৪র্থ সং. ১৯৯৫, পৃ. ১০-১২;
১৭. ডঃ মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, অনু. মাওলানা আবদুল আউয়াল, হায়াতে মুহাম্মদ (স) (মহানবীর জীবন চরিত), ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১ম সং. ১৯৯৮ খৃ., পৃ. ১৫১-১৫৪;
১৮. শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, ঢাকা ১৯৯৮ খৃ., ১ম সং, পৃ. ২০৭-২১২;
১৯. ডঃ সালেহ ইবন আবদুল্লাহ ইবন হুমায়দ ও সদস্যবৃন্দ, নাদরাতুন নাঈম ফী মাকারিমে আখলাকির রাসূল (স), ঢাকা ২০০০ খৃ., ১ম সং, ১খ., পৃ. ৩১৭;
২০. মাহমুদুর রহমান, মাহবুবে খোদা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১ম সং., পৃ. ৫৯-৬২;
২১. Martin Lings, Muhammad, London 1983;
২২. W. Montgomery Watt, Muhammad At Mecca, Oxford University Press, Great Britain 1953, Page 38;
২৩. A. Guillaume, The Life of Muhammad (SM), Oxford University Press, New York 1955, P. 82.

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 কা'বা গৃহ মেরামতে এবং হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভূমিকা

📄 কা'বা গৃহ মেরামতে এবং হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভূমিকা


কা'বা শরীফ নির্মাণ
পৃথিবীতে আল্লাহ্ ইবাদতের জন্য যে গৃহটি সর্বপ্রথম নির্মাণ করা হয় তাহা হইল মক্কায় অবস্থিত কা'বা গৃহ বা বায়তুল্লাহ শরীফ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করিয়াছেন: ইন্নাল আউওয়ালা বাইতিন উজি'আ লিলন্নাসি লাল্লাযী বি-বাক্কাতা মুবারাকান ওয়া হুদাল্লিল আ'লামীন। "নিশ্চয় মানবজাতির (ইবাদতের) জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল তাহা তো বাক্কায় (মক্কায়), উহা বরকতময় ও বিশ্বজগতের জন্য দিশারী" (৩ঃ ৯৬)।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্‌ন আমর ইব্‌ন আস (রা) হইতে বর্ণিত, আল্লাহ পাক হযরত জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে হযরত আদম (আ)-এর নিকট বায়তুল্লাহ বা কা'বা ঘর নির্মাণের আদেশ প্রদান করিলেন। যখন হযরত আদম (আ) নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করিলেন তখন নির্দেশ হইল, হে আদম! এই ঘরের তাওয়াফ কর। তুমিই প্রথম ব্যক্তি এবং ইহাই পৃথিবীতে নির্মিত প্রথম ঘর যাহা মানুষের ইবাদতের জন্য তৈয়ার করা হইয়াছে (আশ-শাওকানী, ফাতহুল বারী, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৫)।
হযরত নূহ (আ)-এর যুগে সংঘটিত দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়ানক তুফানে কা'বা ঘরের অবস্থান সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। এইভাবে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়। ইহার পর হযরত ইবরাহীম (আ) দ্বিতীয়বার কা'বা ঘর নির্মাণের আদেশ প্রাপ্ত হইলেন, কিন্তু অনেক চেষ্টা করিয়াও কা'বা ঘরের কিছু খুঁজিয়া পাইলেন না। অবশেষে হযরত জিবরাঈল (আ) আগমন করিয়া হযরত ইবরাহীম (আ)-কে কা'বা ঘরের অবস্থান ও মূল ভিত্তির চিহ্ন দেখাইয়া দিলেন। ইহার পর স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ)-কে সাথে নিয়া হযরত ইবরাহীম (আ) কা'বা ঘর পুনরায় নির্মাণ করিলেন। উক্ত ঘটনা উল্লেখ করিয়া আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন: ওয়া ইয ইয়ারফা'উ ইবরাহীমুল ক্বাওয়া'ইদা মিনাল বাইতি ওয়া ইসমাইলু রব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না ইন্নাকা আনতাস সামি'উল 'আলিম। "এবং স্মরণ কর যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা'বা গৃহের ভিত্তির উপর দেওয়াল নির্মাণের মাধ্যমে তাহা উঁচু করে, তখন তাহারা দু'আ করে, হে আমাদের প্রভু! আমাদের এই কাজ গ্রহণ কর, নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী" (ফাতহুল বারী, ৬খ, পৃ. ২৮৪, ২৯২)।
অতঃপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসালামের নবৃওয়াত লাভের পাঁচ বৎসর পূর্বে যখন তাঁহার বয়স ছিল পঁয়ত্রিশ বৎসর তখন মক্কার কুরায়শগণ কা'বা ঘর পুনঃ নির্মাণ করেন। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পর দীর্ঘকাল পর্যন্ত কা'বা ঘর সংস্কার করা হয় নাই। বিশেষ করিয়া ঐ সময় কা'বা ঘরের ছাদ ছিল না। দেওয়ালের উচ্চতা ছিল আঠার হাত। দীর্ঘদিন সংস্কার না করার ফলে ইহার দেওয়ালে ফাটল দেখা দেয় এবং তাহা ভাঙ্গিয়া পড়িবার উপক্রম হয়। ইহা ছাড়া কা'বা ঘরটি নিম্নভূমিতে নির্মিত হওয়ায় পাহাড় হইতে বৃষ্টির পানি নামিয়া আসিয়া ইহার অভ্যন্তরে ঢুকিয়া যাইত। ইহাতে কা'বা গৃহটি প্রায় প্রতি বৎসরই ক্ষতিগ্রস্ত হইত, যাহার ফলে কা'বা ঘর পুনঃনির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই সময় কুরায়শ গোত্রসহ মক্কার অন্যান্য গোত্রের নেতৃবৃন্দ এক পরামর্শ সভায় বসিলেন। যেহেতু কা'বা ঘর সর্বকালে সকলের নিকট মর্যাদাসম্পন্ন ছিল তাই সভায় সর্বসম্মতিক্রমে কা'বা ঘর পুনঃনির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
যেহেতু কা'বা ঘর প্রথম তৈয়ার করার সময় ছাদ নির্মাণ করা হয় নাই। শুধু চারিদিকে প্রাচীর দিয়া বেষ্টন করিয়া রাখা হইয়াছিল, যাহার ফলে যে কেহই অনায়াসে কা'বা ঘরে ঢুকিয়া যাইতে পারিত। একবার এক ব্যক্তি প্রাচীরের উপর দিয়া ভিতরে প্রবেশ করে এবং কা'বা ঘর যিয়ারতকারীদের প্রদত্ত বেশ কিছু মূল্যবান দ্রব্যাদি চুরি করিয়া লইয়া যায়। ফলে ছাদ তৈয়ারীর বিষয়টি আরো জরুরী হইয়া পড়ে। এই প্রাচীর বেষ্টিত স্থানে একটি কূপ ছিল। সংস্কারের অভাবে আবর্জনাদি পচিয়া কূপটির অবস্থা শোচনীয় হইয়া পড়িয়াছিল। এই সময় কোথা হইতে একটি সাপ আসিয়া ঐ কূপে অবস্থান করিতে থাকে। কোন কোন সময় ঐ সাপটিকে প্রাচীরের উপর চলাচল করিতে দেখা যাইত। লোকজন দেখিলে সাপটি ফণা তুলিয়া ভয়ংকর আকৃতি ধারণ করিত। ইহাতে কা'বা ঘরে আগমনকারী লোকজনের ভয় ও ত্রাসের সৃষ্টি হইত। একদিন প্রাচীরের উপর সাপটি চলাচল করিতেছিল। এমন সময় কোথা হইতে একটি বাজপাখী আসিয়া সাপটিকে ছোঁ মারিয়া লইয়া গেল। ইহাতে সকলের মন হইতে সর্পভীতি দূরীভূত হইল। সকলেই ধারণা করিল যে, তাহারা কা'বা ঘর সংস্কারের যে সদিচ্ছা পোষণ করিয়াছে সেই নেক নিয়তের ফলে আল্লাহ তাহাদের প্রতি সদয় হইয়াছেন এবং বাজপাখী পাঠাইয়া সেই সর্পভীতি হইতে তাহাদিগকে মুক্ত করিয়াছেন (মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোস্তফা চরিত, পৃ. ২৯৩)।
অবশেষে কা'বা ঘর ভাঙ্গিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মাণের জন্য কুরায়শ নেতৃবৃন্দ যখন ঐক্যবদ্ধ হইলেন তখন আবু ওহ্হাব ইবন আমর মাখযূমী (তিনি ছিলেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের পিতা আবদুল্লাহ্র মামা) কুরায়শদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, ভাইসব! আল্লাহ তাআলা পবিত্র এবং তিনি পবিত্রতা পছন্দ করেন। সুতরাং পবিত্র সম্পদ দ্বারা কা'বা ঘর নির্মাণ করা হইবে। সূদ অথবা চুরির অর্থ এই পবিত্র কাজে ব্যয় করা ঠিক হইবে না। এই প্রস্তাবে সকলেই সম্মত হইলেন। কা'বা ঘর বা বায়তুল্লাহ নির্মাণের এই পবিত্র ও সম্মানজনক কাজ হইতে যাহাতে কেউ বঞ্চিত না হয় সেই উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহ্র বিভিন্ন অংশ নির্মাণের জন্য মক্কার বিভিন্ন গোত্রকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
কা'বা ঘরের দরওয়াযা নির্মাণের জন্য বানু আব্দ মানাফ ও বানু যুহরা গোত্রকে, হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মধ্যবর্তী স্থান বানু মাখযূম ও কুরায়শ-এর অন্য গোত্রকে, কা'বা ঘরের পিছনের অংশ বানু সাহম ও বানু জামহ গোত্রকে, হাতীমের অংশ বানু আবদুদ-দার ইবন কুসায়্যি ইব্‌ন আসাদ এবং বানূ আদীকে দায়িত্ব প্রদান করা হয় (ইদরীস কানধলাবী, সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, ১১৪)। এই সময় কুরায়শগণ সংবাদ পায় যে, গ্রীকদের একটি জাহাজ বাত্যাতাড়িত হইয়া দুর্ঘটনায় পতিত হইয়াছে এবং জিদ্দা সমুদ্র বন্দরের নিকট ভাঙ্গিয়া খানখান হইয়া গিয়াছে। ওয়ালীদ ইবন মুগীরা এই খবর পাওয়া মাত্র মক্কা হইতে জিদ্দা উপস্থিত হইলেন এবং কা'বা ঘরের ছাদ নির্মাণের জন্য ঐ জাহাজের কাঠ ক্রয় করিয়া মক্কায় নিয়া আসেন। ঐ জাহাজে বাকুম নামক একজন রোমীয় মিস্ত্রী ছিল। কা'বা ঘর নির্মাণের জন্য ওয়ালীদ তাহাকে সাথে নিয়া আসিলেন (আল-ইসাবা, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৭)। ইবন হিশামের বর্ণনায় দেখা যায় যে, এই সময় মক্কায় জনৈক কিবতী জাতীয় মিস্ত্রি বাস করিত, সে তাহাদিগকে নির্মাণ কাজে সাহায্য করিয়াছিল।
ইহার পর নির্মাণ কাজের সুবিধার্থে যখন প্রাচীন কা'বা ঘর ভাঙ্গার প্রয়োজন হইল, তখন কাহারও এই কাজ শুরু করার সাহস হইল না। আল্লাহর ঘর ভাঙ্গার ব্যাপারে তাহারা সকলেই এক অজানা আশংকায় ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল। অবশেষে ওয়ালীদ ইবন মুগীরা সামনে অগ্রসর হইল এবং কোদাল হাতে কা'বা ঘরের সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিল,
আল্লাহুম্মা লা নুরিদু ইল্লাল খায়র।
"হে আল্লাহ! কল্যাণ ও মঙ্গল ব্যতীত এই কাজে আমাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য নাই"।
ইহা বলিয়াই তিনি হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর দিক হইতে ভাঙ্গা আরম্ভ করিলেন। মক্কার বাসিন্দারা বলিতে লাগিল, আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর। তোমরা হয়ত দেখিতে পাইবে যে, রাত্রে ওয়ালীদের উপর আসমান হইতে গযব নাযিল হইয়াছে। যদি এইরূপ ঘটিয়া যায় তাহা হইলে আমরা কা'বা ঘর নির্মাণ না করিয়া পূর্ব অবস্থায় রাখিয়া দিব। যদি এইরূপ কোন অঘটন না ঘটে তাহা হইলে আমরা ওয়ালীদের কাজে সহযোগিতা করিব। পরের দিন সকালে অনেকেই দেখিতে পাইল যে, ওয়ালীদ সুস্থ দেহে কোদাল নিয়া পুনরায় কা'বা ঘরে উপস্থিত হইয়াছেন। তখন সকলেই এই ধারণা করিল যে, আল্লাহ তাহাদের এই কাজে সন্তুষ্ট ও রাযী আছেন। ইহার ফলে কা'বা ঘর নির্মাণ কাজে সকলের সাহস বৃদ্ধি পাইল এবং সকলে সম্মিলিতভাবে এই পুণ্যকাজ আরম্ভ করিল।
কয়েক দিন খনন করার পর হযরত ইবরাহীম (আ)-এর মূল ভিত্তিপ্রস্তর বাহির হইল। একজন কুরায়শ যখন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ভিত্তির উপর কোদাল মারিল তখন সমস্ত মক্কায় এক কম্পন সৃষ্টি হইল। ফলে সেখানেই খনন কার্য বন্ধ করা হয় এবং ঐ ভিত্তির উপরই নির্মাণ কাজ চলিতে থাকে।
সম্মিলিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রত্যেক গোত্রই তাহাদের জন্য নির্ধারিত স্থান পৃথক পৃথকভাবে নির্মাণ করিতে থাকে। প্রথম হইতে বেশ একতা ও শৃঙ্খলার সহিত কাজ চলিতেছিল। দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের কোন লক্ষণই দেখা যাইতেছিল না। কিন্তু নির্মাণ কাজ শেষ হইবার পর হাজরে আসওয়াদ ইহার নির্দিষ্ট যায়গায় স্থাপনের বিষয় নিয়া বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। কারণ এই পবিত্র পাথর স্থাপনের কাজটি অতি পুণ্যময় মনে করিয়া সকলেই এই কাজটি করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিল। কিন্তু কোন গোত্রই হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের দাবি ত্যাগ করিতে সম্মত হইল না। ফলে সকল গোত্রের মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘাত, এমনকি যুদ্ধ শুরু হইবার উপক্রম হইল। আরবগণের এই কোন্দল ও মতবিরোধে মক্কা নগরী যেন মহাতঙ্কে শিহরিয়া উঠিল। সামান্য কারণ বা অকারণে যুগ যুগ ধরিয়া পুরুষানুক্রমে যাহারা যুদ্ধে লিপ্ত হইত, পরস্পরের রক্ত প্লাবিত করিয়াও যাহাদের প্রতিহিংসা নিবৃত্ত হইত না, তাহারা সকলে স্বীয় কৌলিন্য ও গৌরব এবং পূর্বপুরুষদের মর্যাদা রক্ষার নামে যুদ্ধ শুরু করিতেছে ভাবিয়া আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া পড়িল। এইভাবে চারিদিন অতিবাহিত' হইল কিন্তু কোন মীমাংসা হইল না। অবশেষে তাহারা সেই সময় প্রচলিত দেশের প্রথা অনুযায়ী রক্তপূর্ণ পাত্রে হাত ডুবাইয়া মৃত্যুর প্রতিজ্ঞা করিল। উল্লেখ্য যে, ইহা ছিল আরবদের কঠোরতম প্রতিজ্ঞা। নিমিষের মধ্যে চারিদিকে অস্ত্রের মহড়া শুরু হইয়া গেল। যে কোন মুহূর্তে ভয়াবহ যুদ্ধ ও রক্তপাত শুরু হইয়া যাইতে পারে।
এইরূপ সংকটময় মুহূর্তে কুরায়শদের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি আবু উমায়্যা ইবন মুগীরা মাখযূমী দুই বাহু ঊর্ধ্বে তুলিয়া আবেগের সুরে সকলকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, হে কুরায়শ সম্প্রদায়! তোমরা শান্ত হও, আমার কথা শুন। এই শোভ কাজ সম্পাদনের শেষ মুহূর্তে তোমরা অশুভ ও অকল্যাণের সূত্রপাত করিও না। হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের ব্যাপারে আমার সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শ এই যে, আগামী কাল সকালে যেই ব্যক্তি সর্বপ্রথম কা'বা ঘরে উপস্থিত হইবে তাহার মতামত ও পরামর্শ অনুযায়ী এই বিবাদের মীমাংসা করা হইবে। সকলে এই প্রবীণ ব্যক্তির পরামর্শ সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করিল। পরের দিন সকলেই কা'বা ঘরে সমবেত হইল। সকলে রুদ্ধশ্বাসে, আশংকা ও আতঙ্ক মিশ্রিত মনে আগন্তুকের অপেক্ষা করিতে লাগিল। সকলেই ভাবিতে লাগিল, কি জানি কে প্রথম কা'বা প্রান্তরে প্রবেশ করে, কে জানে সে কাহার পক্ষের লোক হইবে, না জানি সে কি মীমাংসা করিয়া বসে। তাহার মীমাংসা যদি প্রতিকূল হয় তাহা হইলে কি করিয়া উহা মানিয়া লওয়া যাইবে। এই উদ্বেগ নিয়া সকলেই পলকহীন নেত্রে কা'বা গৃহের দিকে তাকাইয়া আছে। হঠাৎ সকলে দেখিতে পাইল যে, তাহাদের সুপরিচিত মুহাম্মাদ (স) আজ প্রথম ব্যক্তি যিনি কা'বার দিকে আগমন করিতেছেন। আনন্দে সকলের কণ্ঠে উচ্চারিত হইল,
হাযা মুহাম্মাদুনিল আমীন, ক্বাদ রযীনাহু, হাযা মুহাম্মাদুনিল আমীন।
"এই হইল মুহাম্মাদ আল-আমীন, আমরা তাঁহার নির্দেশ ও মতামত মানিতে রাযী আছি। এই হইল মুহাম্মদ আল-আমীন"।
কা'বা ঘরে উপস্থিত হওয়ার পর হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়া উদ্ভুত ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা হযরত মুহাম্মাদকে অবহিত করা হইল। তিনি সমস্ত ব্যাপার অবগত হইয়া সকল নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, যে সকল গোত্র হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের মাধ্যমে পুণ্য লাভের অধিকারী হওয়ার আকাংখা করিতেছে তাহারা নিজ নিজ গোত্র হইতে এক একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করুক যাহাতে কোন গোত্রই এই পুণ্যময় কাজ হইতে বঞ্চিত না হয়। অতঃপর তিনি একটি চাদর চাহিয়া আনাইলেন এবং নিজ হাতে পাথরখানা চাদরের উপর রাখিলেন। সাথে সাথে সকল গোত্রের প্রতিনিধিগণকে চাদরের এক এক প্রান্ত ধরিয়া তাহা যথাস্থানে নিয়া যাওয়ার জন্য বলিলেন। কুরায়শদের যে সমস্ত নেতৃবৃন্দ ঐদিন চাদর ধরিয়াছিলেন তাহারা হইলেন: (১) উত্তা ইবন রাবীআ ইন্ন আবদ শাম্স, (২) আসওয়াদ ইবন মুত্তালিব ইব্‌ন আসাদ ইব্‌ন আবদুল উয্যা, (৩) আবূ হুযায়ফা ইন্ন মুগীরা ইবন উমার ইব্‌ন মাখযূম ও (৪) কায়স ইব্‌ন আদী সাহমী। এইভাবে যখন পাথরখানা নির্দিষ্ট স্থানে নেওয়া হইল তখন হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে চাদর হইতে পাথরখানা উঠাইয়া কা'বা ঘরের প্রাচীরে স্থাপন করিলেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও ঐতিহাসিক ভূমিকার ফলে আরববাসীদের মধ্যে সৃষ্ট সংঘাত ও সম্মুখ যুদ্ধ পরিস্থিতি সুকৌশলে নির্বাপিত হইল এবং মক্কাবাসী এক ভয়াবহ রক্তপাত হইতে মুক্তি পাইল।

টিকাঃ
১. আবদুর রহমান ইবন খালদুন, অনুবাদ হাকীম আহমদ হোসাইন, তারীখে ইবন খালদুন, প্রকাশক ইদারায়ে রশীদিয়া, দেওবন্দ, মার্চ ১৯৮৮, পৃ. ৩৫-৩৬;
২. মাওলানা হাকীম আবুল বারাকাত আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহ্হুস সিয়ার, সামাদ বুক ডিপো, দেওবন্দ, ১খ., পৃ. ১২-১৩;
৩. আবদুল মালিক ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবীয়া লি ইবন হিশাম, দারুল কুতুব, মিসর, ১খ, পৃ. ১৯০-১৯৬;
৪. মাওলানা মুহাম্মদ ইদরীস কান্দেহলবী, সীরাতুল মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, ইদারায়ে ইলম ও হিকমত, দেওবন্দ, মার্চ ১৯৮০, পৃ. ১১৩-১১৬;
৫. মাওলানা কারী মুহাম্মাদ তায়্যিব, খুতবাতে হাকীমুল ইসলাম, তাজ উসমানী এন্ড সন্স, দেওবন্দ, ১৩৭৮ হি. ১খ;
৬. মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খা, মোস্তফা চরিত, ঝিনুক পুস্তিকা, ৩/১৩, লিয়াকত এভিন্যু, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ৯৭৫, পৃ. ২৯৩-২৯৬;
৭. গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, ঢাকা, ১৯৭৩, খৃ., দ্বাদশ সংস্করণ, পৃ. ৬৭-৬৮;
৮. আবদুল খালেক এম, এ, সাইয়েদুল মুরসালীন, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, বায়তুল মোকাররম, ঢাকা, জুন ১৯৮৪, পৃ. ৫৮-৫৯;
৯. মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, নবী গৃহ সংবাদ, ই. ফা. বা. ১৯৮৩ পৃ. ৮০-৮১;
১০. সায়্যিদ আমীর আলী, দি স্পিরিট অব ইসলাম (ইসলামের মর্মবাণী), অনু-অধ্যাপক মুহাম্মদ দরবেশ আলী খান, ই.ফা.বা. ১৯৯৩, পৃ. ৫৯-৬০;
১১. ডঃ মুহাম্মদ হোসাইন হায়কল, দি লাইফ অব মুহাম্মাদ (স), (মহানবী (স) জীবন চরিত), অনু.-মওলানা আবদুল আউয়াল, জুন ১৯৯৮, পৃ. ১৫৬-১৫৮;
১২. আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী, খাসাইসুল কুবরা, অনুবাদ-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, সীরাত গবেষণা ও প্রচার সংস্থা, ঢাকা, জুলাই ১৯৯৮, পৃ. ১৫৯;
১৩. শায়খুল হাদীস মওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন ও ড. এ, এইচ, এম, মুজতবা হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ, জুলাই ১৯৯৮, পৃ. ২২২-২২৪।

রাসূলুল্লাহ রবিউল আউয়াল মাসে এবং সোমবারে ইন্তেকাল করার ব্যাপারে কারো কোন মতভেদ নেই। কিন্তু তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। অধিকাংশের মতে সেদিন ছিল, ১২ (বার) রবিউল আউয়াল।
রাসূলুল্লাহ এর ওফাতের দিন আবু বকর (রাঃ) লোকদের ইমামতি করেন:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ  قَالَ : آخِرُ نَظْرَةٍ نَظَرْتُهَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ كَشَفَ السَّتَارَةَ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ ، فَنَظَرْتُ إِلَى وَجْهِهِ كَأَنَّهُ وَرَقَةُ مُصْحَفٍ وَالنَّاسُ خَلْفَ أَبِي بَكْرٍ ، فَأَشَارَ إِلَى النَّاسِ أَنِ اثْبُتُوا ، وَأَبُو بَكْرٍ يَؤُمُّهُمْ وَأَلْقَى السِّجْفَ ، وَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مِنْ آخِرِ ذَلِكَ الْيَوْمِ
২৯৫. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল কে শেষবারের মতো দর্শন করলাম, যখন মৃত্যু রোগে আক্রান্ত অবস্থায় সোমবার ফজরের নামাজের সময়; তখন তিনি পর্দা তুলে উম্মতের সালাতের অবস্থা দেখছিলেন। আমি তাঁর চেহেরায় যেন আল-কুরআনের পৃষ্ঠা জ্বলজ্বল করতে দেখেছিলাম। লোকেরা আবু বকর (রাঃ) এর পেছনে সালাত আদায় করছিল। (লোকেরা সরে দাঁড়াতে চাইল) কিন্তু তিনি ইঙ্গিতে সকলকে স্থির থাকার নির্দেশ দিলেন এবং আবু বকর (রাঃ) ইমামতি করলেন। সেদিন শেষ বেলায় রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। ২৯৮
রাসূলুল্লাহ ওফাতের সময় আয়েশা (রাঃ) এর কোলে ঠেস লাগিয়ে ছিলেন:
عَنْ عَائِشَةَ  قَالَتْ : كُنْتُ مُسْنِدَةُ النَّبِيَّ ﷺ إِلَى صَدْرِي أَوْ قَالَتْ : إِلَى حِجْرِي فَدَعَا بِطَسْتٍ لِيَبُولَ فِيْهِ ، ثُمَّ بَالَ ، فَمَاتَ
২৯৬. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর ওফাতের সময় তিনি আমার সিনায় বা আমার কোলে ঠেস লাগিয়ে ছিলেন। অতঃপর তিনি প্রস্রাব করার জন্য একটি পাত্র আনতে বললেন এবং তাতে প্রস্রাব করলেন। এরপর তিনি ইন্তেকাল করেন। ২৯৯
রাসূলুল্লাহ-ও মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন:
عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ : لَا أَغْبِطُ أَحَدًا بَهَوْنِ مَوْتٍ بَعْدَ الَّذِي رَأَيْتُ مِنْ شِدَّةِ مَوْتِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ
২৯৭. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর মৃত্যুর কষ্ট দেখার পর অন্য কারো মৃত্যুর সময় কষ্ট হলে আমার হিংসা হয় না।
ব্যাখ্যা: এখানে মৃত্যুর পূর্বে রোগের কষ্ট বুঝানো হয়েছে। আয়েশা (রাঃ) এ কথা বলার উদ্দেশ্য, আমি মনে করতাম, রোগ ছাড়া হঠাৎ মৃত্যু সম্মান ও সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু রাসূলুল্লাহ এর রোগের কষ্ট দেখে অবগত হতে পেরেছি, এটা কোন সৌভাগ্যের ব্যাপার নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ এর চেয়ে ভাগ্যবান আর কে হতে পারে? বরং রোগের কষ্ট দ্বারা গোনাহ মাফ হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। রোগের কারণে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়।
রাসূলুল্লাহর কে তাঁর মৃত্যুর স্থানেই দাফন করা হয়:
عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ : لَمَّا قُبِضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ اخْتَلَفُوا فِي دَفْنِهِ ، فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ : سَمِعْتُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ شَيْئًا مَا نَسِيْتُهُ قَالَ : مَا قَبَضَ اللَّهُ نَبِيًّا إِلَّا فِي الْمَوْضِعِ الَّذِي يُحِبُّ أَنْ يُدْفَنَ فِيْهِ. أَدْفِنُوهُ فِي مَوْضِعِ فِرَاشِهِ
২৯৮. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল হলো তখন তাঁর দাফন নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিল। আবু বকর (রাঃ) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ হতে এ সম্পর্কে এমন কিছু শুনেছি, যা আমি আজও ভুলিনি। অতঃপর বলেন, আল্লাহ তা'আলা নবীদেরকে এমন স্থানেই মৃত্যু দেন, যেখানে দাফন করা তিনি পছন্দ করেন। অতএব রাসূলুল্লাহ কে তাঁর মৃত্যুশয্যার স্থানেই দাফন করা হোক।৩০০
রাসূলুল্লাহ এর ওফাতের পর আবু বكر (রাঃ) তাঁর কপালে চুম্বন করেন:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، وَعَائِشَةَ ، أَنَّ أَبَا بَكْرٍ ، قَبَّلَ النَّبِيَّ ﷺ بَعْدَ مَا مَاتَ
২৯৯. ইবনে আব্বাস ও আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ এর ওফাতের পর আবু বকর (রাঃ) তাঁর কপালে চুম্বন করেন।১০০১
عَنْ عَائِشَةَ ، أَنَّ أَبَا بَكْرٍ ، دَخَلَ عَلَى النَّبِيِّ ﷺ بَعْدَ وَفَاتِهِ فَوَضَعَ فَمَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ وَوَضَعَ يَدَيْهِ عَلَى سَاعِدَيْهِ ، وَقَالَ : وَانَبِيَّاهُ ، وَاصَفِيَّاهُ ، وَاخَلِيْلَاهُ
৩০০. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ এর ওফাতের পর আবু বকর (রাঃ) তাঁর নিকট এসে তাঁর দুই চোখের মাঝখানে মুখ লাগিয়ে চুম্বন করেন এবং তাঁর বাহুতে দু'হাত রেখে বলেন, হায় নবী! হায় অন্তরঙ্গ বন্ধু! হায় বন্ধু!৩০২
ব্যাখ্যা: আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর কপালে দু'চোখের মাঝখানে চুম্বন করেছেন। সাহাবী উসমান ইবনে মাযউনের ইন্তেকালের পর রাসূলুল্লাহ তাঁকে চুম্বন করেছেন। এতে বুঝা যায়, মৃত ব্যক্তিকে চুম্বন করা জায়েয।
রাসূলুল্লাহর এর মৃত্যুতে সাহাবীদের কাছে সবকিছু অন্ধকার মনে হচ্ছিল:
عَنْ أَنَسٍ هِ قَالَ : لَمَّا كَانَ الْيَوْمُ الَّذِي دَخَلَ فِيْهِ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ الْمَدِينَةَ أَضَاءَ مِنْهَا كُلُّ شَيْءٍ ، فَلَمَّا كَانَ الْيَوْمُ الَّذِي مَاتَ فِيْهِ أَظْلَمَ مِنْهَا كُلُّ شَيْءٍ ، وَمَا نَفَضْنَا أَيْدِيَنَا مِنَ التُّرَابِ . وَإِنَّا لَفِي دَفْنِهِ ﷺ حَتَّى أَنْكَرْنَا قُلُوبَنَا
৩০১. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ যেদিন মদিনায় প্রবেশ করছিলেন, সেদিন সেখানকার প্রতিটি জিনিস আলোকোজ্জল হয়ে পড়েছিল। অতঃপর যেদিন তিনি ইন্তেকাল করেন, সেদিন আবার তথাকার প্রতিটি জিনিস অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। আমরা তাঁর দাফনকার্য শেষ করে কবরের মাটি থেকে হাত ঝাড়া না দিতেই আমাদের অন্তরে পরিবর্তন অনুভব করলাম।৩০৩
ব্যাখ্যা: এ বক্তব্যের অর্থ, এটা নয় যে, সাহাবীদের আমল ও আক্বীদার মাঝে পরিবর্তন হয়ে গেছে; বরং উদ্দেশ্য হলো, তারা রাসূলুল্লাহ এর সান্নিধ্যে অন্তরে প্রশান্তি লাভ করতেন, সে বিশেষ অবস্থার পরিবর্তন অনুভব করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সোমবারের দিন ইন্তেকাল করেন:
عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ : تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ
৩০২. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সোমবারের দিন ইন্তেকাল করেন। ৩০০৪
মঙ্গলবারের দিন রাতে তাঁকে দাফন করা হয়:
عَنْ جَعْفَرِ بْنِ مُحَمَّدٍ ، عَنْ أَبِيهِ قَالَ : قُبِضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ فَمَكَثَ ذَلِكَ الْيَوْمَ وَلَيْلَةَ الثَّلَاثَاءِ ، وَدُفِنَ مِنَ اللَّيْلِ
৩০৩. জা'ফর ইবনে মুহাম্মদ (রহঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সোমবারে ইন্তেকাল করেন। সোমবার ও মঙ্গলবার দাফন-কাফনের প্রস্তুতিতেই চলে যায়। অতঃপর মঙ্গলবার দিবাগত রাতে তাঁকে দাফন করা হয়।
রাসূলুল্লাহ এর মৃত্যু ও আবু বকর (রাঃ) এর বাইয়াত গ্রহণ:
عَنْ سَالِمِ بْنِ عُبَيْدٍ ، وَكَانَتْ لَهُ صُحْبَةٌ قَالَ : أُغْنِيَ عَلَى رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ فِي مَرَضِهِ فَأَفَاقَ ، فَقَالَ : حَضَرَتِ الصَّلَاةُ؟ فَقَالُوا : نَعَمْ . فَقَالَ : مُرُوا بِلَالًا فَلْيُؤَذِّنُ ، وَمُرُوا أَبَا بَكْرٍ أَنْ تُصَلِّيَ النَّاسِ أَوْ قَالَ : بِالنَّاسِ قَالَ : ثُمَّ أُغْنِيَ عَلَيْهِ ، فَأَفَاقَ ، فَقَالَ : حَضَرَتِ الصَّلَاةُ ؟ فَقَالُوا : نَعَمْ ، فَقَالَ : مُرُوا بِلَالًا فَلْيُؤَذِّنُ ، وَمُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِ بِالنَّاسِ ، فَقَالَتْ عَائِشَةُ : إِنَّ أَبِي رَجُلٌ أَسِيفٌ . إِذَا قَامَ ذَلِكَ الْمَقَامَ بَكَى فَلَا يَسْتَطِيعُ ، فَلَوْ اَمَرْتَ غَيْرَهُ قَالَ : ثُمَّ أُغْنِيَ عَلَيْهِ فَأَفَاقَ فَقَالَ : مُرُوا بِلَالًا فَلْيُؤَذِّنُ ، وَمُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِ بِالنَّاسِ ، فَإِنَّكُنَّ صَوَاحِبُ أَوْ صَوَاحِبَاتُ يُوسُفَ . قَالَ : فَأُمِرَ بِلَالٌ فَأَذَّنَ ، وَأُمِرَ أَبُو بَكْرٍ فَصَلَّى بِالنَّاسِ ، ثُمَّ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَجَدَ خِفَةً ، فَقَالَ : انْظُرُوا لِي مَنْ أَتَّكِئِ عَلَيْهِ ، فَجَاءَتْ بَرِيرَةُ وَرَجُلٌ أَخَرُ ، فَاتَّكَا عَلَيْهِمَا فَلَمَّا رَأَهُ أَبُو بَكْرٍ ذَهَبَ لِينْكُصَ فَأَوْمَا إِلَيْهِ أَنْ يَثْبُتَ مَكَانَهُ ، حَتَّى قَضَى أَبُو بَكْرٍ صَلَاتَهُ ، ثُمَّ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قُبِضَ ، فَقَالَ عُمَرُ : وَاللَّهِ لَا أَسْمَعُ أَحَدًا يَذْكُرُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قُبِضَ إِلَّا ضَرَبْتُهُ بِسَيْفِي هُذَا قَالَ : وَكَانَ النَّاسُ أُمِيْنَ لَمْ يَكُنْ فِيْهِمْ نَبِيٌّ قَبْلَهُ ، فَأَمْسَكَ النَّاسُ ، فَقَالُوا : يَا سَالِمُ ، انْطَلِقُ إِلَى صَاحِبِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَادْعُهُ ، فَأَتَيْتُ أَبَا بَكْرٍ وَهُوَ فِي الْمَسْجِدِ فَأَتَيْتُهُ أَبْكِي دَهِشًا ، فَلَمَّا رَانِي
قَالَ : أَقُبِضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ؟ قُلْتُ : إِنَّ عُمَرَ يَقُولُ : لَا اَسْمَعُ أَحَدًا يَذْكُرُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قُبِضَ إِلَّا ضَرَبْتُهُ بِسَيْفِي هَذَا ، فَقَالَ لِي : انْطَلِقُ ، فَانْطَلَقْتُ مَعَهُ ، فَجَاءَ هُوَ وَالنَّاسُ قَدْ دَخَلُوا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ ، أَفْرِجُوا لِي ، فَأَخْرَجُوا لَهُ فَجَاءَ حَتَّى أَكَبَّ عَلَيْهِ وَمَسَّهُ ، فَقَالَ : ﴿إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ﴾ ثُمَّ قَالُوا : يَا صَاحِبَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ، أَقُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ؟ قَالَ : نَعَمْ ، فَعَلِمُوا أَنْ قَدْ صَدَقَ ، قَالُوا : يَا صَاحِبَ رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ أَيُصَلَّى عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ؟ قَالَ : نَعَمْ ، قَالُوا : وَكَيْفَ ؟ قَالَ : يَدْخُلُ قَوْمٌ فَيُكَبِّرُونَ وَيُصَلُّونَ وَيَدْعُوْنَ . ثُمَّ يَخْرُجُونَ ، ثُمَّ يَدْخُلُ قَوْمٌ فَيُكَبِّرُونَ وَيُصَلُّونَ وَيَدْعُوْنَ ، ثُمَّ يَخْرُجُونَ ، حَتَّى يَدْخُلَ النَّاسُ ، قَالُوا : يَا صَاحِبَ رَسُولِ اللهِ ﷺ ، أَيْدُ فَنُ رَسُولُ اللهِ ﷺ ؟ قَالَ : نَعَمْ ، قَالُوا : أَيْنَ ؟ قَالَ : فِي الْمَكَانِ الَّذِي قَبَضَ اللَّهُ فِيهِ رُوحَهُ . فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَقْبِضُ رُوْحَهُ إِلَّا فِي مَكَانٍ طَيِّبٍ . فَعَلِمُوا أَنْ قَدْ صَدَقَ ، ثُمَّ أَمَرَهُمْ أَنْ يَغْسِلَهُ بَنُو أَبِيْهِ وَاجْتَمَعَ الْمُهَاجِرُونَ يَتَشَاوَرُونَ ، فَقَالُوا : انْطَلِقُ بِنَا إِلَى إِخْوَانِنَا مِنَ الْأَنْصَارِ نُدْخِلُهُمْ مَعَنَا فِي هُذَا الْأَمْرِ ، فَقَالَتِ الْأَنْصَارُ : مِنَّا أَمِيرٌ وَمِنْكُمْ أَمِيرٌ ، فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ : مَنْ لَهُ مِثْلُ هُذِهِ الثَّلَاثِ ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا "দু'জনের একজন যখন তারা ছিল গুহার মধ্যে, যখন সে তার সাথিকে বলল, বিচলিত হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।"৩০৬ কারা ছিলেন সে দু'জন? বর্ণনাকারী বলেন, তারপর উমর (রাঃ) তাঁর হাত প্রসারিত করে দিয়ে আবু বকর (রাঃ)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। তারপর লোকেরাও তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। ৩০৭
রাসূলুল্লাহ এর মৃত্যুতে ফাতিমা (রাঃ) এর ক্রন্দন:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ﷺ قَالَ : لَمَّا وَجَدَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مِنْ كُرَبِ الْمَوْتِ مَا وَجَدَ ، قَالَتْ فَاطِمَةُ : وَا كَرْبَاهُ ، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ : لَا كَرْبَ عَلَى أَبِيْكِ بَعْدَ الْيَوْمِ ، إِنَّهُ قَدْ حَضَرَ مِنْ أَبِيْكِ مَا لَيْسَ بِتَارِكِ مِنْهُ أَحَدًا الْمُوَافَاةُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
৩০৫. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন মৃত্যুর কষ্ট ভোগ করছিলেন, তখন ফাতেমা (রাঃ) বললেন, হায়! আমার আব্বার কতই না কষ্ট হচ্ছে! রাসূলুল্লাহ বলেন, আজকের পর তোমার পিতার আর কোন কষ্ট থাকবে না। তোমার পিতার নিকট মৃত্যু নামক এমন এক বিষয় উপস্থিত হয়েছে, যা থেকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত কেউ রেহাই পাবে না।৩০৮

টিকাঃ
২৯৮ সহীহ বুখারী, হা/৬৮০; সহীহ মুসলিম, হা/৯৭১; ইবনে মাজাহ, হা/১৬২৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/১২০৯৩; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬৮৭৫; বায়হাকী, হা/৪৮২৫; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৮২৪; মুসনাদে হুমাইদী, হা/১২৪১।
২৯৯ ইবনে খুযাইমা, হা/৬৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৬২৬; মুসনাদে আবু 'আওয়ানা, হা/৫৭৫০।
৩০০ শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৮৩২;।
১০০১ সহীহ বুখারী, হা/৪৪৫৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৪৫৭; সুনানে নাসাঈ, হা/১৮৪০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০২৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩০২৯; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইba, হা/১২১৯৫।
৩০২ মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪০৭৫; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/৪৮।
৩০৩ ইবনে মাজাহ, হা/১৬৩১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৩৮৫৭; মুসনাদুল বাযযার, হা/৬৮৭১; মুসনানে আবু ই'আলা, হা/৩২৯৬; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৮৩৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬৬৩৪; মুসনাদুত তায়ালুসী, হা/১৪০৫।
৩০৪ মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪৮৩৪।
৩০৬ সূরা তাওবা- ৪০।
৩০৭ সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৭০৮১; সুনanul কুবরা লিত তাবারানী, হা/৬২৪৩।
৩০৮ ইবনে মাজাহ, হা/১৬২৯।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রাসূলুল্লাহ (স) জাহিলী প্রথা হইতে মুক্ত ছিলেন

📄 রাসূলুল্লাহ (স) জাহিলী প্রথা হইতে মুক্ত ছিলেন


সকল মুসলিমের সর্বসম্মত আকীদা ও বিশ্বাস এই যে, নবৃওয়াত লাভের পূর্বেও আম্বিয়া-ই কিরামকে যাবতীয় ত্রুটি ও অন্যায় কাজ হইতে মুক্ত রাখা হয় (আল্লামা মুহাম্মাদ ইদরীস কান্দেহলবী, তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন, ১খ., ৯৯-১০৩)। কেননা নবীদের সমস্ত কাজ ও কথা উম্মতের জন্য আদর্শ বিধায় তাঁহাদের দ্বারা কোন প্রকার ত্রুটি-বিচ্যুতি হইতে পারে না।
সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম নবৃওয়াত লাভের পূর্ব হইতেই কুফর, শিরক, মূর্তিপুজা, মদ্যপান ইত্যাদিসহ আইয়ামে জাহিলিয়াতের সকল প্রকার অসামাজিক কার্যকলাপ হইতে বিরত ছিলেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁহার বিশেষ ব্যবস্থাধীনে তাঁহাকে সকল প্রকার অন্যায় ও নৈতিকতা বিরোধী কাজ হইতে হেফাযত করিয়াছিলেন, যাহাতে তিনি মানবতা, ধৈর্যশীলতা, সত্যবাদিতা, নৈতিকতা ও আমানতদারিসহ যাবতীয় মহৎ গুণের উচ্চতম আসনে সমাসীন হইতে পারেন। তাঁহার সত্যবাদিতার কারণে তিনি আরব সমাজে নবৃওয়াত লাভের পূর্বেই "আল-আমীন" উপাধিতে ভূষিত হইয়াছিলেন (সীরাতে ইবন হিশাম, ১খ., পৃ. ৬২)। এখানে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর জাহিলী প্রথা হইতে বিরত থাকার কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ করা হইল।
(১) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স ১৪ বৎসর। এই সময় একবার মক্কায় কুরায়শদের এক পরিবারে বিবাহ উৎসবে গানবাজনা চলিতেছিল। নাচগান ও রং তামাশায় রাত্রে ঐ বাড়িটি ছিল আনন্দ মুখরিত। সমবয়স্ক কয়েকজন কিশোর সাথী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে কিছুটা জোর করিয়াই ঐ বাড়ীতে লইয়া চলিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজেই বর্ণনা করেন, আমি সবেমাত্র বিবাহের আসরে গিয়া বসিয়াছি, তখনও গানবাজনা শুরু হয় নাই, হঠাৎ আমাকে এমন গভীর নিদ্রা আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল যে, বসিয়া থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হইল না। আমি সেই জায়গায় শুইয়া পড়িলাম এবং সারা রাত্র গভীর নিন্দ্রায় বিভোর হইয়া রহিলাম। এইখানে কোন নাচগান হইয়াছে কিনা আমি কিছুই শুনিতে পাই নাই। পরম করুণাময় আল্লাহ সারা রাত্র গানবাজনা শ্রবণ হইতে আমাকে হেফাযত করেন। সকাল বেলায় প্রখর তাপে আমি ঘুম হইতে জাগ্রত হইয়া আমার সাথীদের নিকট গেলাম। তাহারা আমাকে জিজ্ঞাসা করিল, বিবাহ বাড়ীতে কি নাচগান দেখিয়াছ এবং কি কি গানবাজনা শুনিয়াছ তাহা আমাদিগকে বল। আমি বলিলাম, আমি কিছুই দেখিতে ও শুনিতে পাই নাই। কারণ আমি বিবাহ বাড়ীতে যাওয়ার পরপরই সারা রাত্র ঘুমাইয়া কাটাইয়াছি। সুতরাং এই বিষয়ে আমি তোমাদিগকে কিছুই বলিতে পারিব না (সীরাতুল মুসতাফা (স), ১খ., পৃ. ১১৯)।
(২) একবার বৃষ্টির কারণে মক্কায় বন্যার সৃষ্টি হইল। কা'বা ঘরের অবস্থান ছিল একটু নিচু স্থানে এবং চতুর্দিকে ছিল পাহাড়। ফলে চতুর্দিক হইতে পানি আসিয়া কা'বা ঘরে প্রবেশ করিল। ইহাতে পাথর খসিয়া রং নষ্ট হইয়া কা'বা ঘরের অনেক ক্ষতি হইল। দেওয়াল ভাঙ্গিয়া যাওয়ার উপক্রম হইল। সেই যুগে মক্কার বাসিন্দাগণ শিরক ও কুফরীসহ নানা প্রকার পাপকাজে লিপ্ত ছিল। এতদসত্ত্বেও কা'বা ঘরের প্রতি ছিল তাহাদের অগাধ শ্রদ্ধা ও মর্যাদাবোধ। তাই ক্ষতিগ্রস্ত কা'বা ঘর কিভাবে মেরামত করা যায় এই বিষয়ে পরামর্শ করিবার জন্য সকলে মিলিয়া এক বৈঠকে বসিল। যেহেতু ঐ সময় অনেকেই চুরি-ডাকাতি ও সূদ গ্রহণের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করিত, তাই অবৈধ ও হারাম মাল দ্বারা পবিত্র কা'বা ঘর মেরামত করা তাহারা বৈধ মনে করিল না। সুতরাং ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি কাজের মাধ্যমে অর্জিত হালাল অর্থ দ্বারা নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার জন্য এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হইল এবং নির্মাণ কাজের জন্য সকলের নিকট চাঁদা ধার্য করা হইল। কিন্তু চাঁদার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ এই পরিমাণ হইল যাহার দ্বারা বায়তুল্লাহ হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ভিত্তি অনুযায়ী নির্মাণ করা সম্ভব হইবে না বলিয়া ধারণা করা হইল। সুতরাং তাহারা পুনরায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল যে, হালাল অর্থ দ্বারা যতটুকু সম্ভব আমরা তাহাই নির্মাণ করিব। কাজেই তাহারা কা'বা ঘরের উত্তর পার্শ্বের কিছু অংশ বাদ দিয়া নির্মাণ কাজের ব্যবস্থা গ্রহণ করিল। এই স্থানটুকুর নাম হইল হাতীম। ফলে হাতীম কা'বা ঘরের অংশ হওয়া সত্ত্বেও তাহা আজও কা'ba ঘরের বাহিরে রহিয়াছে, তবে কা'বা ঘরের মূল অংশ হিসাবে সামান্য উঁচু দেওয়াল দ্বারা বেষ্টনী দিয়া রাখা হইয়াছে। ইহা কা'ba ঘরের মতই পবিত্র এবং দু'আ কবুলের স্থান।
কা'বা গৃহ নির্মাণে হালাল ও বৈধ মাল ব্যয় করার ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত ছিল খুবই উত্তম; কিন্তু কা'বা গৃহ নির্মাণের ব্যাপারে অন্য একটি চিন্তা মক্কাবাসীদের মনে উদয় হইল। তাহারা যে সকল কাপড় পরিধান করিয়া পাপ কাজে লিপ্ত হইয়াছে, সেই সকল কাপড়ে দেহ আবৃত করিয়া কা'বা ঘর নির্মাণ করা কোনভাবেই সুঙ্গত মনে করিল না। সুতরাং ঐ সমস্ত পোশাক ত্যাগ করিয়া শুধু উলঙ্গ হইয়া তাহারা কা'বা নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিল। কার্যত তাহারা এক পাপ হইতে পরিত্রাণ লাভ করিতে গিয়া আরো এক নূতন পাপে জড়াইয়া পড়িল। সুতরাং তাহারা নির্ধারিত দিনে উলঙ্গ হইয়া নির্মাণ কাজ আরম্ভ করিল। এই সময় কিশোর মুহাম্মাদ সেইখানে আগমন করিলেন এবং কুরায়শগণ বলিল, তুমি আমাদের সঙ্গে নির্মাণ কাজে অংশ গ্রহণ কর, ইহা অত্যন্ত পবিত্র কাজ। তবে আমাদের মত উলঙ্গ হইয়া যাও (আস-সুয়ূতী, আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ, পৃ. ৮৮)।
অপর এক বর্ণনায় উল্লেখ করা হইয়াছে যে, এই সময় তাহার চাচা আব্বাস (রা) বলিলেন, ভাতিজা! তুমি যদি লুঙ্গি খুলিয়া কাঁধের উপর রাখ তাহা হইলে পাথরের চাপ হইতে রক্ষা পাইবে। তোমার বয়স কম, তুমি কিশোর, সুতরাং ইহাতে কোন লজ্জা নাই। নবী করীম (স) এই ঘটনা সম্পর্কে বলিয়াছেন, "আমি লুঙ্গি খোলার ব্যাপারে ইতস্তত করিতেছিলাম এবং মনে মনে সম্মতও হইয়াছিলাম, এমনকি খোলার জন্য যখন কাপড়ে হাত লাগাইলাম তখন হঠাৎ আমি বেহুঁশ হইয়া মাটিতে পড়িয়া গেলাম। ইহার পর আমার কোন জ্ঞান ছিল না। কিভাবে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হইয়াছে তাহা আমি বলিতে পারিব না। যখন আমার জ্ঞান ফিরিয়া আসিল তখন চাহিয়া দেখিলাম, কা'বা ঘর নির্মাণ সমাপ্ত হইয়া গিয়াছে। আল্লাহ তাআলা এইভাবে আমাকে জাহিলী প্রথা ও উলঙ্গ হওয়ার মত লজ্জাজনক নৈতিকতাবিরোধী গর্হিত কাজ হইতে বিরত ও মুক্ত রাখিলেন।"
আবুত তুফায়ল হইতে বর্ণিত আছে, ঐ সময় হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর নিকট আওয়ায আসিল ইয়া মুহাম্মাদু আওরাতুক। "হে মুহাম্মদ! স্বীয় সতর (গুপ্তস্থান) হিফাযত কর"। ইহাই ছিল তাঁহার অদৃশ্য হইতে শ্রুত সর্বপ্রথম আওয়ায।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত, নবী করীম (স)-এর চাচা আবূ তালিব তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন, কা'বা নির্মাণের দিন কি ঘটিয়াছিল? মহানবী বলিলেন, আমি ঐ সময় দেখিলাম একজন সাদা পোশাক পরিহিত লোক আমাকে বলিল, হে মুহাম্মাদ! স্বীয় সতর (গুপ্তস্থান) হিফাযত কর (সীরাতুল মুসতাফা, ১খ., পৃ. ১১৯)।
(৩) একবার কুরায়শদের বাড়ীতে রাসূলুল্লাহ (স)-কে দাওয়াত দেওয়া হইল। তিনি সময় মত তাহাদের বাড়ীতে গিয়া উপস্থিত হইলেন। যথারীতি তাঁহার সম্মুখে বিভিন্ন প্রকার খাদ্যদ্রব্য রাখা হইল। ঐ মজলিসে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা) চাচাত ভাই এবং সাঈদ ইবন যায়দের (রা) পিতা যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল উপস্থিত ছিলেন। তিনি পূর্ব হইতেই শিরক ও মূর্তিপূজা হইতে মুক্ত ছিলেন এবং সত্য দীনের অপেক্ষায় ছিলেন। নবী করীম (স) কুরায়শদের খাবার গ্রহণ করা হইতে বিরত রহিলেন। তখন যায়দ বলিলেন, দেবতা ও মূর্তির নামে যবেহৃত জন্তুর গোশত আমি খাই না। শুধু ঐ বস্তুই খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করিয়া থাকি যাহার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়। সুতরাং খাবার খাইতে অস্বীকার করিলেন (সীরাতুল মুসতাফা, ১খ., পৃ. ১২০)।
(৪) হযরত যায়দ ইবন হারিসা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, জাহিলিয়ার যুগে কা'বা ঘরে ইসাফ ও নায়েলা নামক দুইটি দেবতা রাখা ছিল। কাফির মুশরিকগণ কা'বা ঘর তাওয়াফ করার সময় এই দুইটি দেবতাকে কল্যাণ ও মঙ্গলের উদ্দেশ্যে স্পর্শ করিত। তিনি বলিয়াছেন, একবার আমি নবী করীম (স)-এর সঙ্গে কা'বা ঘর তাওয়াফ করিতেছিলাম, তখন আমিও প্রথা অনুযায়ী এই দেবতাগুলি স্পর্শ করিলাম। রাসূলুল্লাহ (স) আমাকে বলিলেন, এইগুলি স্পর্শ করিও না। আমি মনে মনে ভাবিলাম, দ্বিতীয়বারও স্পর্শ করিব, দেখিব ইহার ফলে কি হয়। সুতরাং দ্বিতীয়বার তাওয়াফের সময় আমি দেবতাগুলিকে পুনরায় স্পর্শ করিলাম। নবী করীম (স) এইবার আরও কঠোরভাবে বলিলেন, আমি কি তোমাকে এই কাজ করিতে নিষেধ করি নাই? হযরত যায়দ (রা) বলেন, আল্লাহর শপথ! ইহার পর আমি কখনও কোন দেবতা স্পর্শ করি নাই। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআন নাযিল করেন এবং রাসূলুল্লাহ (স)-কে নবুওয়াত ও রিসালাত দান করেন। তিনি নবুওয়াত লাভের পূর্বেও কখনও কোন দেবতাকে স্পর্শ করেন নাই।
হযরত আলী (রা) হইতে বর্ণিত। মহানবী (স)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি কি কখনও কোন দেবতার পূজা করিয়াছেন? তিনি উত্তরে বলেন, না। পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি কি কখনও শরাব পান করিয়াছেন? তিনি জওয়াবে বলেন, না। তিনি আরো বলিয়াছেন, আমি সর্বদা এই সকল বস্তু অপছন্দ করিয়া থাকি (সীরাতুল মুসতাফা, ১খ, পৃ. ১১৬-১২০)।

টিকাঃ
১. আল্লামা আবদুর রহমান ইবন খালদুন, অনুবাদ আল্লামা হাকীম আহমদ হোসাইন, তারীখে ইবন খালদুন, দেওবন্দ, মার্চ ১৯৮৮, পৃ. ৩৫-৩৬;
২. আবদুল মালিক ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবীয়া, ১খ., ১৯০-১৯৬;
৩. হাকীম আবুল বারাকাত আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস্ সিয়ার, দেওবন্দ, ১খ., পৃ. ১২-১৩;
৪. মাওলানা মুহাম্মদ ইদরীস কান্দেহলবী, সীরাতুল মুসতাফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, দেওবন্দ, ১৯৮০, ১খ., পৃ. ১১৬-১২০;
৫. মাওলানা কারী মুহাম্মদ তায়্যিব, খুতবাতে হাকীমুল ইসলাম, দেওবন্দ, ১৩৭৮ হি, ১খ., পৃ. ২৬-২৯;
৬. জালালুদ্দীন আবদুল রহমান সুয়ূতী, মুহিউদ্দীন খান, খাসাইসুল কুবরা, ঢাকা, জুলাই ১৯৯৮ খৃ., ১খ, পৃ. ১৫৪-১৫৬;
৭. আবদুল খালেক, সাইয়েদুল মুরসালীন, ই.ফা.বা. ১৯৮৪ খৃ., ১খ., পৃ. ৬৪।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 উম্মুল মু'মিনীন খাদীজা (রা)-এর সান্ত্বনাদান এবং ওয়ারাকা ইবন নাওফালের সমর্থন

📄 উম্মুল মু'মিনীন খাদীজা (রা)-এর সান্ত্বনাদান এবং ওয়ারাকা ইবন নাওফালের সমর্থন


হযরত মুহাম্মাদ (স) উম্মুল মু'মিনীন খাদীজা (রা)-এর সাহায্য-সহযোগিতা দাম্পত্য জীবনের প্রথম হইতেই লাভ করিয়াছেন। প্রথম ওহী (ওয়াহহিয়) নাযিল হওয়ার উত্তেজনাপূর্ণ ও অস্থির মুহূর্তে খাদীজা (রা)-এর নৈতিক সমর্থন ও সান্ত্বনাদান রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে সাহস ও শান্তি প্রদান করিয়াছিল। ওহী প্রাপ্তির প্রথম অভিজ্ঞতায় হযরত মুহাম্মাদ (স) যখন শংকাবোধ করিতেছিলেন তখন খাদীজা (রা) তাঁহাকে আপন চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফালের নিকট লইয়া যান, যিনি খৃস্টধর্মের পণ্ডিত ছিলেন। এই প্রসঙ্গে বুখারী শরীফের নিম্নোক্ত হাদীছটি উদ্ধৃত করা হইল :
"উম্মুল মু'মিনীন হযরত আইশা (রা) বলিলেন, যেই ওহী রাসূলুল্লাহ (স)-এর নিকট আসিত তাহা হইল ঘুমের মধ্যে তাঁহার সত্য স্বপ্ন। তিনি যেই স্বপ্নই দেখিতেন তাহা ভোরের আলোর মতই সত্যে পরিণত হইত। ইহার পর নির্জন জীবন যাপনের প্রতি তাঁহার আগ্রহ সৃষ্টি হইল। তাই তিনি একাধারে কয়েক দিন পর্যন্ত নিজ পরিবারের নিকট না যাইয়া হেরা পর্বতের গুহায় নির্জন পরিবেশে আল্লাহ্ ইবাদতে মগ্ন থাকিতে লাগিলেন। আর এই উদ্দেশ্যে তিনি কিছু খাবার সঙ্গে লইয়া যাইতেন, আবার তিনি বিবি খাদীজার নিকট ফিরিয়া আসিয়া ঐরূপ কয়েক দিনের জন্য কিছু খাবার সঙ্গে লইয়া যাইতেন। এইভাবে হেরা গুহায় থাকাকালে তাঁহার নিকট সত্যের পয়গাম (ওহী) আসিল। হযরত জিবরীল (আ) সেইখানে আসিয়া তাঁহাকে বলিলেন, পড়ুন। রাসূলুল্লাহ (স) বলেনঃ আমি বলিলাম, আমি তো পড়িতে জানি না। তিনি বলেন, ফেরেশতা তখন আমাকে ধরিয়া এমন জোরে আলিঙ্গন করিলেন যে, ইহাতে আমি ভীষণ কষ্ট অনুভব করিলাম। ইহার পর ফেরেশতা আমাকে ছাড়িয়া দিয়া বলিলেন, 'পড়ুন'। আমি বলিলাম, আমি তো পড়িতে পারি না। পুনরায় দ্বিতীয়বার তিনি আমাকে ধরিয়া খুব জোরে চাপিয়া ধরিলেন। ফলে পুনঃ ক্লান্ত ও শ্রান্ত হইয়া পড়িলাম। অতঃপর আমাকে ছাড়িয়া দিয়া পড়িতে বলিলেন। আমি বলিলাম, আমি পড়িতে পারি না। রাসূলে কারীম (স) বলিলেন, জিবরাঈল ফেরেস্তা আমাকে তৃতীয়বার কাছে টানিয়া দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করিলেন। ফলে আমি পূর্ণমাত্রায় ক্লান্ত-শ্রান্ত হইয়া পড়িলাম। তারপর তিনি আমাকে আলিঙ্গনমুক্ত করিয়া বলিলেন,
ٱقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ
"পড়ুন, আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন। সাঁটিয়া থাকা বস্তু (আলাক) হইতে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন। পড়ুন! আর আপনার প্রতিপালক মহামহিমান্বিত” (৯৬: ১-৩)।
রাসূলুল্লাহ (স) কম্পমান হৃদয়ে গৃহে ফিরিয়া আসিলেন। তিনি খাদীজা বিন্‌তে খুওয়ায়লিদ-এর গৃহে প্রবেশ করিয়া ডাকিয়া বলিলেন, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর।” তিনি তাঁহাকে বস্ত্রাবৃত করিলেন। পরে তাঁহার ভয় চলিয়া গেলে তিনি খাদীজার নিকট সমস্ত ঘটনা জানাইয়া বলিলেন, আমি আমার জীবনের আশংকা করিতেছি। খাদীজা (রা) সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, "কখনও নয়, আল্লাহ্র কসম! তিনি কখনও আপনাকে
৪৭৩ অপমানিত করিবেন না। কারণ আপনি নিজ আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখেন, দুর্বল ও অসহায়দের খেদমত করেন, অভাবীগণকে উপার্জনক্ষম করেন, অতিথিদের সেবা করেন, সত্য প্রতিষ্ঠাতে আপনি সাহায্য করেন। অতঃপর খাদীজা (রা) রাসূলে আকরাম (স)-কে সঙ্গে লইয়া তাঁহার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ইব্‌ন আসাদ ইবন 'আবদুল 'উয্যা-এর কাছে গেলেন। ওয়ারাকা জাহিলী যুগে 'ঈসায়ী ধর্মের অনুসারী ছিলেন। তিনি হিব্রু ভাষাতে পুস্তকাদি লিখিতেন, এমনকি ইন্জীল-এর কিছু অংশ লিখিয়াছিলেন মহান আল্লাহ্র ইচ্ছা অনুযায়ী। বয়স ছিল অনেক বিধায় তিনি দৃষ্টিহীন হইয়া পড়িয়াছিলেন। খাদীজা (রা) তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, ভ্রাত! আপনি আপনার ভাতিজার কথা শুনুন। ওয়ারাকা বলিলেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! তুমি কি দেখিয়াছ? রাসূলুল্লাহ্ (স) যাহা দেখিয়াছেন তাহার বর্ণনা দিলেন। ওয়ারাকা তখন তাঁহাকে বলিলেন, "উহা নামুস", ইনিই জিব্রাঈল ফেরেস্তা, যাঁহাকে আল্লাহ মূসা (আ)-এর নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন। হায় আফসোস! আমি যদি বাঁচিয়া থাকিতাম, যখন নিজ বংশের লোকেরা তোমাকে বিতাড়িত করিবে। রাসূলে কারীম (স) বিস্ময়ের সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন, তাহাদের দ্বারা আমি কি বিতাড়িত হইব? উত্তরে বলিলেন, হাঁ, যাঁহারাই অনুরূপ জ্যোতি লইয়া আসিয়াছিলেন তাঁহাদের সকলকে দেশ হইতে বিতাড়িত হইতে হইয়াছিল। তোমার জীবনের ঐ দিনগুলিতে যদি আমি বাঁচিয়া থাকি, তবে আমি সর্বশক্তি দিয়া তোমাকে সাহায্য করিব।
ইহার পরে ওয়ারাকা বেশি দিন জীবিত ছিলেন না এবং কিছু দিনের জন্য ওহী প্রাপ্তির সাময়িক বিরতি ঘটে” (বুখারী, আওয়ালু মা বুদিআ বিহিল-ওয়াহহিয়, বাব, ৩; তু. মুসলিম, ঈমান, পৃ. ২৬৩, ২৫৪)।
ইব্‌ন শিহাব (র) বলেন, আমার কাছে আবূ সালামা ইব্‌ন আবদুর রহমান এই মর্মে বর্ণনা করিয়াছেন যে, জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ আনসারী (রা) বলিয়াছেন, তিনি ওহীর সাময়িক বিরতি প্রসঙ্গে বর্ণনা করিয়াছেন যে, আমি একবার চলিতেছিলাম। হঠাৎ আকাশ হইতে একটি আওয়াজ শ্রবণ করিলাম। অতঃপর আমি আকাশ ও যমিনের মাঝে চেয়ারে বসা অবস্থায় ঐ ফেরেশতাকে দেখিলাম যিনি আমার কাছে হেরা গুহায় আসিয়াছিলেন। উহাতে আমার ভয়ের সঞ্চার হইল। অতঃপর আমি গৃহে ফিরিয়া আসিয়া বলিলাম, “যাম্মিলুনী যাম্মিলূনী, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর! আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা এই আয়াত অবতীর্ণ করেন, “হে চাদরাবৃত! উঠুন, সতর্ক করুন এবং আপনার পালনকর্তার বড়ত্ব ঘোষণা করুন, আপন পোশাক পবিত্র করুন এবং অপবিত্রতা হইতে দূরে থাকুন।" অতঃপর ওহীর বিরতি ঘটে (উভয় হাদীছের বরাতের জন্য দ্র. সহীহ বুখারী, বাব কায়ফা কানা বাদউল ওয়াহহিয়, ১খ, পৃ. ২, ৩, ৪)।
ওয়ারাকা হযরত মুহাম্মদ (স)-এর নবুওয়াতের সত্যতা প্রকাশ করিলে রাসূলুল্লাহ্ (স) মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন। তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সাফল্য ও বিজয় লাভের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তদুপরি তিনি রাসূলুল্লাহ্ (স)-কে পূর্ণ সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন (আল-বালাযুরী, আনসাবুল আশরাফ, ১খ., পৃ. ১০৬)।
ইবন ইসহাক বলেন, খাদীজা বিনতে খুওয়ায়লিদ (রা)-এর চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইব্‌ন আবদিল উয্যা ছিলেন পূর্বতন আসমানী কিতাবসমূহে পারদর্শী একজন ধর্মপরায়ণ খৃস্টান পণ্ডিত। ইহা ছাড়া পার্থিব জ্ঞানেও তিনি যথেষ্ট ব্যুৎপত্তিসম্পন্ন ছিলেন। খাদীজা
৪৭৪ (রা) মায়সারার নিকট হইতে সিরীয় ধর্মযাজকের যেই মন্তব্য শুনিয়াছিলেন এবং মায়সারা দুইজন ফেরেশতা কর্তৃক নবী (স)-কে ছায়াদানের যে দৃশ্য অবলোকন করিয়াছিলেন তাহা ওয়ারাকাকে সবিস্তার জানাইলেন (৭খ., পৃ. ৩৪৪, বৈরূত, লেবানন, তা.বি)। ওয়ারাকা বলিলেন, “খাদীজা! এইসব ঘটনা যদি সত্যই ঘটিয়া থাকে তাহা হইলে নিশ্চিতভাবে জানিয়া রাখ যে, মুহাম্মাদ এই উম্মতের নবী। আমি জানিতাম, তিনিই হইবেন এই উম্মতের প্রতীক্ষিত নবী। এই যুগ সেই নবীরই যুগ। এই কথা বলিয়া ওয়ারাকা প্রতীক্ষিত নবীর আগমনে এত বিলম্বিত হওয়ায় আক্ষেপ করিতে লাগিলেন এবং বলিতে লাগিলেন, "আর কত দেরী।” তিনি তাঁহার আক্ষেপ প্রকাশ করিয়া নিম্নের স্বরচিত কবিতাটি আবৃত্তি করেনঃ
لججت وكفت في الذكر لجوجا لهم طالما بعث النشيجا ووصف من خديجة بعد وصف فقال طال انتظاری یا خدیجا حديثك أن أرى منه خروجا ببطن المكتين على رجائي من الرهبان اكره ان يعوجا بما خبرتنا من قول قس ويخصم من يكون له حجيجا بان محمد سيعود فينا يقيم به البرية ان تموجا ويظهر في البلاد ضياء نور ويلقى من يسالمه فلوجا فيلقى من يحاربه خسارا شهدت فكنت أولهم ولوجا فيا ليتني اذا ما كان ذاكم ولوجا في الذي كرهت قريش ولو عجت بمكتها عجيبا الى ذي العرش إن سفلوا عروجا أرجى بالذي كرهوا جميعا وهل أمر السفالة غير كفر بمن يختار من سمك البروجا يضج الكافرون لها ضجيجا فان يبقوا وابق تكن امور من الاقدا متلغة خروجا .
وان أهلك فكل فتى سيلقى "আমি অতি উৎসাহের সহিত এমন একটি জিনিসকে স্মরণ করিয়া চলিয়াছি যাহা দীর্ঘদিন অনেককে কাঁদাইয়া আসিতেছে। অনেক বিবরণের পর সেই জিনিসটির নূতন করিয়া খাদীজার নিকট হইতেও বিবরণ পাওয়া গেল। বস্তুত হে খাদীজা! আমার প্রতীক্ষা অনেক দীর্ঘ হইয়াছে। আমার প্রত্যাশা, মক্কার উচ্চভূমি ও নিম্নভূমির মাঝখান হইতে যেন তোমার কথার বাস্তব রূপ প্রতিভাত হইতে দেখিতে পাই, যেই কথা তুমি ঈসায়ী ধর্মযাজকের বরাত দিয়া জানাইলে। বস্তুত ধর্মযাজকের কথায় হেরফের হউক তাহা আমি পছন্দ করি না। সেই প্রতীক্ষিত ব্যাপারটি এই যে, মুহাম্মাদ অচিরেই আমাদের নেতা ও সরদার হইবেন এবং তাঁহার বিরুদ্ধবাদীদেরকে প্রাজিত করিবেন। দেশের সর্বত্র তিনি এমন আলো ছড়াইবেন যাহা দ্বারা সমগ্র সৃষ্টিজগতকে
৪৭৫ তিনি বিশৃংখলা হইতে রক্ষা করিবেন। যাহারা তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হইবে তাহারা পর্যুদস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। আর যাহারা তাঁহার সঙ্গে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপন করিবে তাহারা হইবে সফলকাম। আফসোস! যখন এইসব ঘটনা ঘটিবে তখন যদি আমি উপস্থিত থাকিতাম, তাহা হইলে তোমাদের সকলের আগেই আমি সেই দলের অন্তর্ভুক্ত হইতাম, কুরায়শ যাহাকে খুবই অপছন্দ করিবে, যদিও তাহারা নিজেদের মক্কা নগরীতে তাঁহার বিরুদ্ধে চীৎকার করিয়া আকাশ-বাতাস মুখরিত করিয়া তুলিবে। যেই জিনিসকে তাহারা সকলেই অপছন্দ করিবে, আমার প্রত্যাশা এই যে, তাহা দিয়াই আমি আরশের অধিপতির নিকট উন্নীত হইব, যখন তাহারা অধঃপতিত হইবে। তাহাদের অধঃপতনের কারণ এই যে, তাহারা যিনি উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হইয়াছেন তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিবে। কুরায়শরা যদি বাঁচিয়া থাকে আমিও যদি বাঁচিয়া থাকি তবে সেই দিন অস্বীকারকারীরা ভীষণভাবে আর্তনাদ করিবে। আর আমি যদি মরিয়া যাই তাহা হইলে প্রত্যেক যুবক প্রত্যক্ষ করিবে যে, নিয়তির বিধান অনুযায়ী ধ্বংস হইয়া যাইবে' (ইব্‌ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ., পৃ.১৯৭, ১৯৮, ১৯৯)।
ওহীর প্রারম্ভকালে হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে আল্লাহর তরফ হইতে মানসিকভাবে নবুওয়াতের দায়িত্বভার বহনের জন্য প্রস্তুত করা হইতেছিল (ইবন সা'দ, কিতাবুত তাবাকাতিল কুবরা, ১খ, পৃ. ১২৯)। এই উদ্দেশ্যে তাঁহাকে সত্য স্বপ্নের মাধ্যমে সুসংবাদ প্রদান করা হইত। ভবিষ্যৎ ঘটনাবলী সম্পর্কে অবহিত করা হইত এবং অনেক গোপন তত্ত্ব সম্পর্কে আভাস দেওয়া হইত। ইহা ছাড়া অনেক নিদর্শন গোচরীভূত হইতে থাকে (ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা বিআহওয়ালিল মুসতাফা, ১খ., পৃ. ১৬১)।
ওহী নাযিলের আনুমানিক ছয় মাস পূর্ব হইতেই মুহাম্মাদ (স) ধ্যান ও চিন্তা-গবেষণায় অধিক মনোযোগী হইয়া পড়েন। তিনি হেরা গুহাতে একাধারে কয়েক দিন অবস্থান করিতে আরম্ভ করিলেন। এমতাবস্থায় খাদীজা (রা) নিজে যাইয়া খোঁজ করিয়া তাঁহাকে খাবার পৌঁছাইয়া দিতে লাগিলেন (আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহ্হুস্ সিয়ার, পৃ. ১৫-১৬)। গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকা অবস্থায় তিনি হঠাৎ আকাশ হইতে একটি আওয়াজ শুনিতে পাইলেন। কেহ যেন বলিতেছেন, হে মুহাম্মাদ! 'আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরীল। রাসূলুল্লাহ (স) বলেন, অতঃপর আমি যখন আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করিলাম তখন দেখিতে পাইলাম, জিবরীল একটি লোকের আকৃতিতে (যাহার পদদ্বয় ছিল পরিষ্কার) দণ্ডায়মান রহিয়াছেন। তিনি বলিতেছেন, "হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল এবং আমি জিবরীল। কিছুক্ষণ পর জিবরীল আমার নিকট হইতে অন্তর্হিত হইলেন (সায়্যিদ গিলানী, আয়নুল য়াকীন, পৃ. ১২)।
অতঃপর আমি আমার পরিবারে ফিরিয়া গেলাম, এমনকি খাদীজার খুব কাছাকাছি (সান্নিধ্যে) বসিলাম। খাদীজা বলিল, হে আবুল কাসিম! আপনি কোথায় ছিলেন? আল্লাহ্র কসম! আমি আপনার খোঁজে লোক পাঠাইয়াছিলাম। তাহারা মক্কা পর্যন্ত গিয়া আমার নিকট ফেরত আসিয়াছে। অতঃপর আমি যাহা দেখিয়াছিলাম তাহার সবকিছুই খাদীজার নিকট ব্যক্ত করিলাম। তৎক্ষণাৎ সে বলিল:
৪৭৬ ابشر يا ابن العم وأثبت فوالذي نفس خديجة بيده إني لأرجو ان تكون نبي هذه الامة.
"হে আমার চাচাত ভাই! আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন এবং অটল থাকুন। আল্লাহ্র কসম, যাহার হাতে খাদীজার জীবন! আমি অবশ্যই এই আশা করিতেছি যে, আপনিই হইবেন এই উম্মতের নবী" (ইব্‌ন হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়‍্যা, পৃ. ২৪৬)।
অতঃপর খাদীজা (রা) কাপড়-চোপড় পরিধান করিয়া তাহার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইব্‌ন নাওফাল ইব্‌ন আসাদ ইব্‌ন আবদিল উয্যা ইন্ন কুসাঈ-এর নিকট উপস্থিত হইলেন। রাসূলুল্লাহ (স) যেই ঘটনা প্রত্যক্ষ করিয়াছেন ও শুনিয়াছেন খাদীজা তাহা সবিস্তার ওয়ারাকাকে জানাইলেন। ওয়ারাকা ঘটনা শুনিয়াই চীৎকার করিয়া বলিয়া উঠিলেন, কুদ্দুস! কুদ্দুস (মহাপবিত্র, মহাপবিত্র)। ওয়ারাকার জীবন যাঁহার হস্তে ন্যস্ত তাঁহার কসম! হে খাদীজা! তুমি যাহা আমাকে বলিয়াছ তাহা যদি সত্য হইয়া থাকে তাহা হইলে মুহাম্মাদের নিকট সেই মহাদূতই আগমন করিয়াছিলেন যিনি মূসার নিকটও আসিতেন। আর মুহাম্মদ (স) যে এই উম্মতের নবী তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। সুতরাং তুমি তাহাকে অবিচল ও স্থির থাকিতে বল (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, পৃ. ২৪৬ ও ২৪৭)।
আল-বালাযুরীর ভাষ্যমতে, ওয়ারাকা (অপর এক সময়ে) বলিয়াছেনঃ আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আপনি সেই নবী হযরত মূসা (আ) যাঁহার সুসংবাদ দিয়াছিলেন (আনসাবুল আশরাফ, ১খ, পৃ. ১০৬)। অতঃপর অল্প দিনের মধ্যেই ওয়ারাকা ইনতিকাল করেন। ইহার পর তিন বৎসর পর্যন্ত ওহী বন্ধ থাকে। এই বিরতিকালে রাসূলুল্লাহ (স) পুনরায় প্রত্যাদেশ প্রাপ্তির আশায় অস্থির হইয়া পড়িলেন। তখন ঊর্ধ্বগগনে সেই মহান নামূসের জ্যোতি দৃষ্টিগোচর হইত যিনি তাঁহাকে এই আশ্বাস প্রদান করিতেন যে, তিনি নিশ্চিত আল্লাহর রাসূল এবং সেই নামূস হইলেন হযরত জিবরীল (ইবন সা'দ, আততাবাকাত, ১খ, পৃ. ১৯৬)।
গ্রন্থপঞ্জী: (১) মুহম্মাদ ইব্‌ন ইসমাঈল আল-বুখারী, আল-জামি'উস-সাহীহ, দারু ইহয়াইত তুরাছিল আরাবী, বৈরূত-লেবানন ১৩১৩ হি., বাব কায়ফা কানা বাদউল ওয়াহয়ি, ১খ, পৃ. ২, ৩ ও ৪; (২) ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নবাবিয়্যা, ১খ, পৃ. ১৯৭, ১৯৮, ১৯৯, ২৪৬, ২৪৭, দারুত-তাওফিকীয়্যা, আজহার তা. বি; (৩) আল-বালাযুরী, আনসাবুল আশরাফ, ১খ, পৃ. ১০৬, বায়তুল মাকদিস্ সং ১৯৩৬ খৃ.; (৪) বুতরুস আল-বুসতানী, দাইরাতুল-মাআরিফিল-ইসলামিয়্যা, ৭খ, দারুল মা'রিফা, বৈরূত- লেবানন, তা. বি, পৃ. ৩৪৪; (৫) ইন্ন সাদ, কিতাবুত তাবাকাত, ১খ, বৈরূত ১৯৬০খৃ., পৃ. ১২৯ ও ১৯৬; (৬) ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা' বিআহওয়ালিল মুসতাফা, লাহোর ১৯৭৭ খৃ., ১খ, পৃ. ১৬১; (৭) আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস্ সিয়ার, দেওবন্দ, ১৯৮২ খৃ., পৃ. ১৫, ১৬; (৮) সায়্যিদ গিলানী, 'আয়নুল-ইয়াকীন, বৈরূত, ১৯৮৭ খৃ., পৃ. ১২।
মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00