📄 হিলফুল ফুযূল
হিলফুল ফুযূল )حلف الفضول(-এর হিল্ল্ফ শব্দটির উচ্চারণ হিল্ল্ফ, অর্থ পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যের অংগীকার (ইবন মানজুর, লিসানুল আরাব, ২খ, পৃ. ৯৬৩)। সুদূর অতীতে আল-ফাদল নামক কয়েকজন শান্তিপ্রিয় লোকের উদ্যোগে হিজাযে, বিশেষত মক্কা মুআজ্জমায় সামাজিক শান্তি-শৃংখলা ও জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহাই ইতিহাসে হিলফুল ফুযূল নামে প্রসিদ্ধ। আল-ফুদায়ল ইব্ন হারিছ আল-জুরহুমী, আল-ফুদায়ল ইব্ন ওয়াদা'আ আল-কাতৃরী ও আল-মুফাদ্দাল ইব্ন ফাদালা আল-জুরহুমী একতাবদ্ধ হইয়া এই মর্মে অঙ্গীকার করেন যে, তাহারা মক্কায় কোনও স্বৈরাচারী যালিমকে অবস্থান করিতে দিবে না। তাহারা আরও বলেন যে, আল্লাহ মক্কাকে যেই মর্যাদা ও মহিমা দান করিয়াছেন, তাহাতে এইরূপই হওয়া উচিৎ (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৫৭০)। ইন্ন কুতায়বার মতে তাহাদের তিনজনেরই নাম ছিল আল-ফাদল (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯২)। হিলয়াতুল আওলিয়া গ্রন্থেও তাহাদের এই নাম উল্লিখিত হইয়াছে, কিন্তু তাহাদের পিতার নাম পর্যায়ক্রমে শারা'আ, বিদা'আ ও কাদা'আ বলা হইয়াছে (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯৩)। সুহায়লী ফাদল ইব্ন বিদা'আর স্থলে ফাদল ইব্ন ওয়াদা'আ উল্লেখ করিয়াছেন। কোন কোন বর্ণনায় কেবল ফাদল ইন্ন শারাআ ও ফadল ইব্ন কাদাআর উল্লেখ আছে, তৃতীয় ব্যক্তির উল্লেখ নাই (পৃ. গ্র. ২খ, পৃ. ২৯৩, টীকা ১)। এই সংঘ মহানবী (স)-এর আবির্ভাবের কত যুগ পূর্বে গঠিত হইয়াছিল তাহা কোন ঐতিহাসিক তথ্যে পাওয়া যায় না। কালের প্রবাহে আরবদের মধ্যে শুধু ইহার নামটিই স্মরণীয় হইয়া থাকে।
আরব গোত্রসমূহের মধ্যে অব্যাহত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ব্যাপক হানাহানির ফলে, বিশেষ করিয়া ফিজার যুদ্ধে বহু সংখ্যক জীবনহানি ঘটিলে এবং সামাজিক শান্তি-শৃংখলা ও জনজীবনে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইলে কিছু সংখ্যক লোকের মনে হিলফুল ফুযূলের কথা জাগ্রত হয় এবং সামাজিক নিরাপত্তা বহাল করার জন্য উক্ত সংঘের পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। সুতরাং মহানবী (স)-এর পিতৃব্য যুবায়র ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের অনুপ্রেরণায় বানু হাশিম, বানুল মুত্তালিব, বানু আসাদ ইব্ন আবদিল 'উয্যা, বানু যুহরা ইন কিলাব ও বানু তায়ম ইন্ন মুররা আবদুলজ্জাহ্ ইব্ন জুদ'আনের বাড়িতে সমবেত হইয়া ফিজার যুদ্ধের চারি বৎসর পর মহানবী (স)-এর নবুওয়াত লাভের বিশ বৎসর পূর্বে যুল-কা'দা মার্সে'হিলফুল ফুযূল' 'নামক সেবাসংঘ পুনর্গঠিত করে। ইহা আরবদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ও প্রসিদ্ধ চুক্তি হিসাবে বিবেচিত ছিল (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ, পৃ. ১৩৯-৪০; বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৭০; তাবাকাত ইবন সা'দ, ১খ, পৃ. ১২৮)। যুবায়র ইবন আবদুল মুত্তালিব তাহার কবিতায় এই সম্পর্কে বলেন:
ইন্নাল ফুদূলা তাহালাফূ ওয়া তাহাকামূ ওয়া তাআকাদূ ইন্নাল লা ইউকাররু বি বাতনি মাক্কাতা জালিমুন আমরিহী তাআহাদূ ওয়া তাওয়াফাকু ফাআ জারূনা ওয়া মু'তারিফূ বিহিম সালিমুন।
"ফযলেরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইল যে, মক্কায় কোন অত্যাচারীর ঠাঁই হইবে না। এই বিষয়ে তাহারা দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হইল যে, এখানে মক্কাবাসী ও বহিরাগত সকলে নিরাপদ থাকিবে"।
মহানবী (স)-ও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তখন তাঁহার বয়স বিশ বৎসর (তাবাকাত, ১খ, পৃ. ১২৮)। নবুওয়াত প্রাপ্তির এক সময় তিনি এই সম্পর্কে বলেনঃ
লাক্বাদ শাহিতু মা'আ উমূমাতী হিলফান ফী দরি আব্দিল্লাহ ইবন জুদ'আন মা উহিব্বু আন্নাল্লি বিহী হুমারান নি'আম ওয়ালও দু'ঈতু বিহী ফিল ইসলামি লাআজাবতু।
"আবদুল্লাহ ইব্ন জুদআনের গৃহে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠানে আমি আমার পিতৃব্যগণের সহিত অংশগ্রহণ করিয়াছি। তাহার বিনিময়ে আমাকে লাল বর্ণের উস্ত্রী প্রদান করা হইলেও আমি উহাতে সন্তুষ্ট হইব না। ইসলামী সমাজেও যদি কেহ আমাকে উহার দোহাই দিয়া ডাকে তবে আমি অবশ্যই সাড়া দিব" (মুসতাদরাক হাকেম, ২খ, পৃ. ২২০; মুসনাদে আহমাদ ১খ, পৃ. ১৯০, ১৯৪, নং)।
এই সংঘের নামকরণ সম্পর্কে বলা হইয়া থাকে যে, আদি যুগে যাহাদের উদ্যোগে ইহা গঠিত হইয়াছিল তাহাদের সকলের নামের ধাতুমূল ছিল ফা-দ-ল (ফাদল) এবং ইহা হইতেই হিলফুল ফুযূল (ফুদূল) নামকরণ করা হইয়াছে। কিন্তু ইব্ন হিশাম এই সংঘ গঠনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশগ্রহণ সংক্রান্ত হাদীছের উল্লেখ করিয়া বলেন যে, তাঁহারা প্রাপকের মাল (আল-ফুদূল) তাহাকে ফেরত প্রদানের অঙ্গীকার করিয়াছিলেন বিধায় ইহার নাম হিলফুল ফুযূল হইয়াছে। আল-হারিছ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন আবূ উসামা আল-মায়মীর আল-মুসনাদ গ্রন্থে হাদীছের শেষাংশ নিম্নরূপঃ
তা হালাফূ আন তুরদ্দাল ফুযূলা আলা আহলিহা ওয়াল্লা ইউ'আদ্দু জালিমুন মাযলূমান।
"তাহারা অঙ্গীকার করে যে, তাহারা (জোরপূর্বক ছিনাইয়া লওয়া) 'ফুদূল" (মাল) ইহার প্রাপককে প্রত্যর্পণ করিবে এবং যালেম যেন মজলুমের উপর বাড়াবাড়ি করিতে না পারে" (সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ, পৃ. ১৩৯)। ইন্ন হিশাম এই ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দিয়াছেন।
হিলফুল ফুযূলের প্রতিজ্ঞাসমূহ নিম্নরূপঃ
১) আমরা দেশ হইতে অশান্তি দূর করিব;
২) আমরা বহিরাগতদেরকে রক্ষা করিব;
৩) আমরা নিঃস্বদিগকে সাহায্য করিব;
৪) আমরা শক্তিহীনদের উপর শক্তিমানদের অত্যাচার প্রতিহত করিব (রাহমাতুল্লিল আলামীন, পৃ. ৪৩)।
এই সেবাসংঘের প্রচেষ্টায় সমাজে অত্যাচার-অবিচার বহুলাংশে হ্রাস পায়, মানুষের যাতায়াত নিরাপদ হয়। ইসলাম-পূর্ব যুগে একদা খাছ'আম গোত্রীয় জনৈক ব্যক্তি তাহার পরমা সুন্দরী কন্যাসহ হজ্জ অথবা উমরা করার উদ্দেশে মক্কায় আগমন করিলে নুবায়হ ইব্ন হাজ্জাজ নামক এক দুর্বৃত্ত জোরপূর্বক তাহার কন্যাকে অপহরণ করে। সে সাহায্যের আহবান জানাইলে জনতা তাহাকে বলিল, তুমি হিলফুল ফুযূলের সদস্যবৃন্দকে জানাও। তখন সে কা'বা ঘরের নিকটে দাঁড়াইয়া উচ্চস্বরে ডাকিতে লাগিল, হে হিলফুল ফুযূল। এই ডাক শুনিয়া চতুর্দিক হইতে সেবকগণ উলঙ্গ তরবারি হাতে লইয়া দৌড়াইয়া আসিয়া তাহার বিপদের কথা জিজ্ঞাসা করিল। ঘটনার বিবরণ শুনিয়া তাহারা নুবায়হ-এর বাড়িতে পৌঁছিয়া তাহার কন্যাকে উদ্ধার করিয়া আনে (বিদায়া, ২খ)।
এই প্রসঙ্গে আরও একটি ঘটনার উল্লেখ আছে। যুবায়দ গোত্রের এক ব্যক্তি তাহার পণ্যসামগ্রী লইয়া মক্কায় পৌছিয়া তাহা আস ইব্ন ওয়াইল-এর নিকট বিক্রয় করে। কিন্তু সে তাহার পণ্যদ্রব্যের মূল্য প্রদান না করিয়া তাহা আত্মসাৎ করে। উপায়ান্তর না দেখিয়া যুবায়দী হিলফুল ফুযূলভুক্ত গোত্রসমূহে উপস্থিত হইয়া তাহাদের সাহায্য প্রার্থনা করে, কিন্তু তাহারা তাহাকে সহায়তা করিতে অসম্মতি প্রকাশ করে। যুবায়দী অনিষ্ট আশংকা করিয়া সূর্যোদয়কালে আবূ কুবায়স পাহাড়ের চূড়ায় উঠিয়া উচ্চস্বরে ডাক দিয়া তাহার সর্বস্ব অপহরণের ঘটনা বিবৃত করিয়া সাহায্য প্রার্থনা করে। এই সময় কুরায়শরা তাহাদের সম্মেলন স্থলে (নাদওয়া) উপস্থিত ছিল। এই ডাক শুনিয়া যুবায়র ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের আহ্বানে আবদুল্লাহ ইব্ন জুদআনের গৃহে পূর্বোক্ত গোত্রসমূহ একত্র হইয়া হিলফুল ফুযূল গঠন করে, অতঃপর সংঘবদ্ধভাবে 'আস ইব্ন ওয়াইলের গৃহে উপস্থিত হইয়া যুবায়দীর মালপত্র উদ্ধার করিয়া দেয় (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯১-২)।
এই আবদুল্লাহ্ ইব্ন জুদআন সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন আইশা (রা)-র চাচাত ভাই। একদা তিনি নবী (স)-কে বলিলেন, সে খুব অতিথিপরায়ণ ছিল এবং জনগণকে পানাহার করাইত। কিয়ামতের দিন ইহা তাহার কোন উপকারে আসিবে কিনা? মহানবী (স) বলিলেনঃ না। কেননা সে কোন দিনও এই কথা বলে নাই:
রব্বি ইগফিরলী খাতীআতী ইয়াওমাদ্দীন।
"প্রভু! কিয়ামতের দিন আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন" (মুসলিম, বাংলা অনু, ঈমান, বাবঃ যে কুফরী অবস্থায় মারা যায় তাহার কোন আমল তাহার উপকারে আসিবে না, নং ৪০৯, ১খ, পৃ. ৪০৩)।
এই হিলফুল ফুযূল ইসলামের প্রাথমিক কাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল, কিন্তু ইহার প্রেরণা ও কার্যকরী শক্তি অনেকটা নিষ্প্রভ হইয়া পড়ে। জনগণের ইসলাম গ্রহণের পর এই সংঘের আর প্রয়োজন রহিল না। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তাহাদের জান-মালের নিরাপত্তা লাভ করে, দেশে শান্তি-শৃংখলা ফিরিয়া আসে এবং সবলেরা দুর্বলদের অত্যাচার করার পরিবর্তে সাহায্য-সহযোগিতায় আগাইয়া আসে। তাই মুসলিম সমাজে এই জাতীয় সংঘ গঠনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ফকীহগণের দুইটি বিপরীত মত লক্ষ্য করা যায়। একদল বিশেষজ্ঞ বলিয়াছেন যে, সাহায্যের মুখাপেক্ষী ব্যক্তি ইসলামের নামেই সাহায্য প্রার্থনা করিবে, কোন সংঘের দোহাই দিয়া নহে। কারণ ইহার মধ্যে জাহিলী যুগের পক্ষপাতমূলক উপাদান (তাআসসুব) বিদ্যামান। মুরায়সি' যুদ্ধকালে সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া দুই ব্যক্তির মধ্যে বিবাদ বাধিলে আনসার ব্যক্তি তাহার সহায়তার জন্য আনসারদিগকে এবং মুহাজির ব্যক্তি তাহার সহায়তার জন্য মুহাজিরদেরকে আহবান করিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) এই ডাক শুনিয়া বলিলেনঃ ইহা ত্যাগ কর, কেননা ইহা দুর্গন্ধময়। তিনি ইহাকে জাহিলী যুগের ডাক হিসাবে আখ্যায়িত করেন (রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৮১)। মুমিনগণকে আল্লাহ তা'আলা পরস্পর ভাই হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছেন (দ্র. ৪৯৪ ১০)। তাই হযরত 'উমার (রা) যেভাবে আহ্বান করিয়াছেন (ইয়া লিল্লাহ, ওয়া ইয়া লিল-মুসলিমীন"), সেভাবেই আহ্বান করিতে হইবে। কারণ তাঁহারা সকলে মিলিয়া একটি দল (রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৮২)।
অপর দলের মতে হিলফুল ফুযূলের বৈধতা এখনও বিদ্যমান। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পূর্বোক্ত হাদীছ )دعيت به اليوم لأجبت( ইহার প্রমাণ। তাঁহার কথার অর্থ ছিল, যদি কোন অত্যাচারিত ব্যক্তি হিলফুল ফুযূলের সদস্যগণকে সাহায্যের জন্য আহবান করে তবে আমি অবশ্যই তাহার ডাকে সাড়া দিব (আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৮২)। কেননা সত্যের প্রতিষ্ঠা করিতে এবং নির্যাতিতের সাহায্য করিতে ইসলামের অভ্যুদয় হইয়াছে। অতএব উক্ত সংঘ দ্বারা তাহার শক্তিই বর্দ্ধিত হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) জাহিলী যুগের গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ-সংঘাতে শত্রু পক্ষের বিরুদ্ধে মিত্র (হালীফ) পক্ষকে সহায়তা করার সংঘ অবৈধ ঘোষণা করিয়াছেন। ইসলাম কেবল এই জাতীয় জাহিলী আহবানকে নিষিদ্ধ করিয়াছে। অন্যথায় হিলফুল ফুযূলের আবেদন এখনও অবশিষ্ট আছে (আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৮২)। হুসায়ন ইব্ন আলী (রা)-র একটি ঘটনা হইতেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। যুল-মারওয়া নামক স্থানে (ওয়াদিল কুরার একটি গ্রাম; মু'জামুল বুলদান, ৫খ, পৃ. ১১৬) তাঁহার ও ওলীদ ইব্ন উৎবা ইব্ন আবূ সুফ্যানের একটি যৌথ সম্পত্তি ছিল এবং ইহাকে কেন্দ্র করিয়া তাহাদের মধ্যে বিবাদ বাধে। ওলীদ তখন আমীর মু'আবিয়া (রা)-র পক্ষ হইতে মদীনার গভর্নর ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছত্রছায়ায় হুসায়ন (রা)-কে বঞ্চিত করিয়া সম্পত্তি নিজে করায়ত্ত করেন। হুসায়ন (রা) তাহাকে বলেন, হয় তুমি আমার প্রাপ্য অধিকারের ব্যাপারে আমার প্রতি ন্যায়বিচার করিবে, অন্যথায় আমি অবশ্যই তরবারি সজ্জিত হইয়া মহানবী (স)-এর মসজিদে দাঁড়াইয়া হিলফুল ফুযূলের নামে আহবান জানাইব। তখন ওলীদের সামনে উপস্থিত আবদুল্লাহ ইব্নুয যুবায়র (রা) বলেন, আমিও আল্লাহর নামে হলফ করিতেছি যে, আমিও তাহার আহবানে সাড়া দিয়া তরবারি সজ্জিত হইয়া অবশ্যি তাহার সহায়তা করিব, যতক্ষণ না সে তাহার স্বত্বের ব্যাপারে ন্যায়বিচার প্রাপ্ত হয়। মিসওয়ার ইব্ন মাখরামা (রা) ও আবদুর রহমান ইব্ন 'উছমান (রা)-ও একই প্রতিজ্ঞা করেন। অবস্থা বেগতিক দেখিয়া ওলীদ ইব্ন উৎবা তাঁহার প্রতি সুবিচার করিতে বাধ্য হন (ইব্ন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৪০-১৬; আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৯৩-৯৪; ইব্নুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৫৭০-৫৭১; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯৩)। অতএব এই জাতীয় স্বৈরাচার ও অন্যায়-অবিচারের প্রতিরোধকালে হিলফুল ফুযূলের মত কল্যাণধর্মী সংঘের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। মহানবী (স) বলেনঃ
মান সুন্নাতান খাইরান ফাত্তাবিয়াহু আলাইহা ফালাহু আজরুহু ওয়া মিছলু উজুরি মান ইত্তাবাহু গাইরু মানকূসিন মিন উজুরিহিম শাইআন।
"কোন ব্যক্তি উত্তম প্রথার প্রচলন করিলে এবং তাহার অনুসরণ করা হইলে সে তাহার নিজের সওয়াবও প্রাপ্ত হইবে এবং তাহার অনুসারীদের সম-পরিমাণ সওয়াবও প্রাপ্ত হইবে, তবে ইহাতে তাহাদের সওয়াব হইতে কিছুই হ্রাসপ্রাপ্ত হইবে না" (তিরমিযী, 'ইল্ম, বাবঃ সৎপথে বা ভ্রান্ত পথে ডাকার ফলাফল; মুসলিম, ইল্ম, বাবঃ মান সান্না সুন্নাতান হাসানাতান..., বাংলা অনু, ৮খ, পৃ. ১৯৩-৪, নং ৬৫৫৬)।
পরবর্তী কালে বানু আবদে শামস ও বানু নাওফাল 'আবদুল্লাহ্ ইবনুয যুবায়র (রা)-র নিহত হওয়ার পর হিলফুল ফুযূল ত্যাগ করে। তাঁহার নিহত হওয়ার পর উমায়্যা-রাজ 'আবদুল মালিক ইব্ন মারওয়ানের নিকট লোকজন জড়ো হইলে কুরায়শ বংশীয় শ্রেষ্ঠ 'আলিম মুহাম্মাদ ইব্ন জুবায়র ইবন মুত'ইম (র)-কে আবদুল মালিক জিজ্ঞাসা করেন, হে সা'ঈদের পিতা! আমরা ও আপনারা অর্থাৎ বানু 'আবদে শামস ইব্ন 'আবদে মানাফ ও বানু নাওফাল ইব্ন 'আবদে মানাফ কি হিলফুল ফুযূলে শামিল নই? তিনি বলিলেন, আপনিই ভালো জানেন! আবদুল মালিক বলেন, হে সা'ঈদের পিতা! এই বিষয়ে অবশ্যই আপনি আমাকে সঠিক তথ্য প্রদান করিবেন। তিনি বলিলেন, আল্লাহর শপথ! আমরা ও আপনারা নিজেদের চুক্তি ভঙ্গ করিয়াছি। 'আবদুল মালিক বলিলেন, আপনার কথাই সত্য (ইব্ন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৪১)।
টিকাঃ
১. ইব্ন 'হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, আল-মাকতাবাতুত তাওফীকিয়্যা, আল-আযহার (মিসর), তা. বি, ১খ, পৃ. ১৩৮-১৩৯;
২. ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দারুল ফিকার আল-আরাবী, বৈরূত তা.বি, ২খ, পৃ. ২৯০-২৯৩;
৩. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১ম সং, বৈরূত ১৪০৭/১৯৮৭, ১খ, পৃ. ৫৭০-১;
৪. আবদুর রহমান আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, আবদুর রহমান আল-ওয়াকীল সম্পা., ১ম সং, বৈরূত ১৪১২/১৯৯২, ২খ, পৃ. ৬৩-৬৪;৭০-৭৪; ৮১-৮৩;
৫. ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, দারু সাদির, বৈরূত তা. বি, ১খ, পৃ. ১২৮-৯;
৬. কাযী মুহাম্মাদ সুলায়মান মানসূরপুরী, রাহমাতুল-লিল-আলামীন, লাহোর তা. বি, পৃ. ৪৩;
৭. সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নাদবী, নবীয়ে রহমাত (বাংলা অন্), ১ম সং, ঢাকা ১৪১৮/১৯৯৭, পৃ. ১২২-৩;
৮. শায়খুল হাদীস মওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, ১ম সং, ঢাকা ১৪১৯/১৯৯৮, পৃ. ১৯৯-২০১;
৯. মুঈনুদ্দীন আহমাদ নাদবী, তারীখে ইসলাম (উর্দু), লাহোর তা. বি, ১খ, পৃ. ৩৬-৭;
১০. ইদরীস কান্ধলাবী, সীরাতুল মুসতাফা, ১ম সং, দিল্লী ১৯৮১খৃ., ১খ, পৃ. ৯৩-৪;
১১. ইব্ন মানজুর, লিসানুল আরাব, দারুল মাআরিফ, বৈরূত তা.বি., ২খ, পৃ. ৯৬৩, কলাম ৩;
১২. মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, হায়াতে মুহাম্মাদ, কায়রো তা.বি., পৃ. ৭৯-৮০;
১৩. শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, করাচী ১৯৮৪ খৃ., ১খ, পৃ. ১১৫;
১৪. ইয়াকৃত আল-হামাবী, মু'জামুল বুলদান, দারুল কিতাব, বৈরূত তা.বি., ৫খ, পৃ. ১১৬।
📄 আল-আমীন উপাধিতে ভূষিত
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাহাদিগকে নবী ও রাসূল হিসাবে মনোনীত করিয়াছেন তাঁহারা সকলেই শৈশবকাল হইতেই অত্যন্ত নম্র, ভদ্র ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। তিনি যখন আরবদেশে জন্মগ্রহণ করেন তখন আরবের সামাজিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। মদ্যপান, জুয়াখেলা, নারী নির্যাতন, মূর্তিপূজা ইত্যাদি ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার, এমনকি সামান্য কারণেই গোত্রে গোত্রে যুদ্ধের দাবানল জ্বলিয়া উঠিত, যেই যুদ্ধ যুগ যুগ ধরিয়া চলিত এবং নিরপরাধ অসংখ্য লোক সেই যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করিত। এমন একটি সমাজে জন্মগ্রহণ করিয়াও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম শৈশবকাল হইতেই ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক ও নৈতিক চরিত্রের অধিকারী।
আল-আমীন উপাধি প্রদানের কারণ হিসাবে দুই-একটি বাস্তব ঘটনার উল্লেখ প্রয়োজন। কিশোর বয়সের সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, নম্রতা ও ভদ্রতা, নিঃসার্থ মানবপ্রেম ও সত্যিকার কল্যাণ প্রচেষ্টা, চরিত্র মাধুর্য ও অমায়িক ব্যবহারের ফলে আরবগণ তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হয়। অবশেষে আরবগণ তাঁহাকে আল-আমীন বা বিশ্বস্ত বলিয়া ডাকিতে থাকে। ফলে মুহাম্মাদ নাম অন্তরালে পড়িয়া গিয়া তিনি আল-আমীন নামেই খ্যাত হইয়া উঠিলেন। নীতিধর্ম বিবর্জিত ঈর্ষা-বিদ্বেষ, কলুষিত, পরশ্রীকাতর দুর্ধর্ষ আরবদের অন্তরে এতখানি স্থান লাভ করা ঐ সময়ে খুবই কঠিন ছিল। অনুপম চরিত্র মাধুর্যের অধিকারী হওয়ার কারণেই হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর পক্ষে তাহা সম্ভব হইয়াছিল। সীরাতে ইবন হিশামে বর্ণিত আছে:
ফা শাব্বা রাসুলুল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াল্লাহু ইয়াকলাউহু ওয়া ইয়াহফাযু ওয়া ইয়াহুতুহু মিন আকযারিল জাহিলিয়্যাতি লিমা ইউরিলু বিহী মিন কারামতিহী ওয়া রিসালাতিহী হাত্তা বালাগা আন্নাল হু কানা রাজুলান ওয়া আফযালা কাউমিহী মুরুআতান ওয়া আহসানা হুম খালক্বান ওয়া আকরামা হুম হাসাবান ওয়া আহসানা হুম জিওয়ারান ওয়া আ'যামা হুম হিলমান ওয়া আসদাক্বাহুম হাদীছান ওয়া আ'যামা হুম আমানাতান ওয়া আব'আদাহুম মিনাল ফাহশি ওয়াল আখলাক্বিল লাতী তুদান্নিসু আর-রিজলা তানাজ্জুহান ওয়া তাক্বররুমান ওয়া ইসমুহু ফী ক্বাওমিহিল আমিনু লিমা জামা'আল্লাহু ফিহী মিনাল উমুরিস সালিহাতি।
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) এই অবস্থায় বয়প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন যে, স্বয়ং আল্লাহ পাক তাঁহাকে হিফাযত ও তাঁহার প্রতি দৃষ্টি রাখেন এবং জাহিলিয়াতের সমস্ত অনাচার থেকে তাঁহাকে পবিত্র ও হিফাযতে রাখেন। কেননা তাঁহাকে নবুওয়াত, রিসালাত ও উঁচু মর্যাদা প্রদান করা ছিল মহান আল্লাহ্, অভিপ্রায়। ফলে তিনি একজন নম্র, ভদ্র, চরিত্রবান, উত্তম বংশীয়, ধৈর্যশীল, সত্যবাদী ও আমনতদার ব্যক্তি হিসাবে সমাজে শীর্ষস্থান অধিকার করেন। অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা হইতে তিনি দূরে থাকিতেন। এই সমস্ত উত্তম ও নৈতিক গুণাবলীর কারণে তাঁহার স্বজাতির মধ্যে তিনি আল-আমীন খেতাবে ভূষিত হইয়াছিলেন" (সীরাতে ইবন হিশাম, ১খ, পৃ. ৬২)।
তিনি অত্যন্ত সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারির সহিত ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করিতেন। এইজন্য কুরায়শদের অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা থাকা সত্ত্বেও শৈশবকালেই অনেক জটিল সমস্যার সমাধান ও মীমাংসার ভার তাঁহার উপর ন্যস্ত করা হইত। রাসূলুল্লাহ (স)-এর বয়স যখন পঁয়ত্রিশ বৎসর তখন মক্কার সকল গোত্র মিলিত হইয়া পবিত্র কা'বা ঘর নির্মাণের কাজ আরম্ভ করে। যখন নির্মাণ কাজ শেষ হইয়া যায় তখন হাজরে আসওয়াদ পুনস্থাপন নিয়া এক মহাসমস্যা দেখা দেয়। প্রত্যেক গোত্রই এই কাজটি অত্যন্ত পুণ্যের মনে করিয়া তাহারা হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করার জন্য বেশ আগ্রহী হইয়া উঠে। বিভিন্ন গোত্রের নেতৃবৃন্দ কয়েক দিন পরামর্শ করিয়াও কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারিল না। ফলে গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ ও রক্তপাতের প্রবল আশংকা দেখা দেয়। এই সময় কুরায়শ গোত্রের সবচেয়ে বয়বৃদ্ধ ও সম্মানিত ব্যক্তি আবূ উমায়্যা ইব্ন্ন মুগীরা মাখযূমী নেতৃবৃন্দকে ডাকিয়া বলিলেন, তোমরা শুভ কাজের মধ্যে অশুভের সূত্রপাত করিও না। আমার কথা শোন! আগামী কাল ভোরে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম কা'বা ঘরে আগমন করিবেন, তাহার উপর এই বিরোধের মীমাংসার ভার অর্পণ করা হইবে। সকলেই এই প্রস্তাব মানিয়া লইল এবং শাসরুদ্ধকর অবস্থায় আগন্তুকের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিল। তাহারা ভাবিতে লাগিল, না জানি কে সর্বপ্রথম কা'বা ঘরে প্রবেশ করেন, না জানি তিনি কোন গোত্রের লোক হন এবং কি মীমাংসা করিয়া বসেন। যদি তাহার মীমাংসা মনঃপূত না হয় তাহা হইলে কি হইবে, এই উদ্বেগ ও আশংকায় তাহারা পলকহীন নেত্রে কা'বা ঘরের দিকে তাকাইয়া থাকে। এমন সময় দেখা গেল কুরায়শ বংশীয় যুবক হযরত মুহাম্মাদ (স) এই দিকে আগমন করিতেছেন। তাঁহাকে দেখিয়া সকলেই আনন্দিত হইয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলিয়া উঠিল, ”হাযা মুহাম্মাদুন আল-আমীনু ক্বাদ রাযীনাহু।" "আল-আমীন, আমরা তাঁহার মীমাংসায় সম্মত আছি"।
নবী করীম (স) কা'বা ঘরে উপস্থিত হওয়ার পর নেতৃবৃন্দের নিকট হইতে বিষয়টি অবগত হইলেন এবং তাহাদিগকে একটি চাদর আনিতে বলিলেন। চাদর লইয়া আসার পর প্রত্যেক গোত্র হইতে একজন লোককে চাদরটি ধরিতে বলিলেন। পবিত্র হাজরে আসওয়াদ তিনি নিজ হাতে উঠাইয়া চাদরে রাখিলেন। নেতৃবৃন্দ হাজরে আসওয়াদসহ চাদর ধরিয়া কা'বা ঘরে নিয়া আসিল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) চادর হইতে হাজরে আসওয়াদ উঠাইয়া যথাস্থানে স্থাপন করিলেন। নবৃওয়াত লাভের পূর্বেই হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (স)-এর বিশ্বস্ততা, বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা ও নিরপেক্ষতার কারণে পবিত্র মক্কার জনগণ সম্ভাব্য এক ভয়াবহ যুদ্ধ ও রক্তপাত হইতে রক্ষা পাইল এবং অকুণ্ঠ চিত্তে তাঁহার প্রশংসা করিতে লাগিল (ইদরীস কান্দেহলবী, সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, ১৯৮০ খৃ. পৃ. ১১৫)
মহানবী (স)-এর সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার কারণে সকলের নিকট তিনি প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন। তিনি কখনও কোন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিতেন না, কষ্ট হইলেও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিতে চেষ্টা করিতেন। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আবিল হামসা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, নবৃওয়াত লাভের পূর্বে একবার আমি হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সহিত ব্যবসার কাজে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। ইহাতে আমার যিম্মায় কিছু দেনা বাকী থাকে। আমি অঙ্গীকার করিলাম যে, অনতিবিলম্বে আমি ফিরিয়া আসিব এবং বাকী দেনা পরিশোধ করিব। আপনি কিছুক্ষণ এই জায়গায় আমার জন্য অপেক্ষা করিবেন। আমি বাড়ীতে চলিয়া যাওয়ার পর ঘটনাক্রমে ঐ অঙ্গীকারের কথা ভুলিয়া যাই। তিন দিন পর ঐ অঙ্গীকারের কথা আমার মনে পড়ে। আমি দ্রুত ঐ স্থানে আগমন করিয়া দেখিতে পাই যে, তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। আমাকে দেখিয়া তিনি কোন ক্রোধ প্রকাশ করিলেন না, এমনকি কোন কটুবাক্যও প্রয়োগ করিলেন না। শুধু ইহাই বলিলেন যে, তুমি আমাকে কষ্টের মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছ। আমি তিন দিন যাবত এইখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছি (সুনান আবূ দাউদ, কিতাবুল আদাব, বাবুল ইদ্দত, ২খ, পৃ. ৩২৬)।
টিকাঃ
১. আবূ দাউদ, আস-সুনান, দিল্লী তা.বি, ২খ, পৃ. ৩২৬;
২. ইব্ন খালদুন, তারীখ, দেওবন্দ ১৯৭৮ খৃ, ১খ. পৃ. ২৭;
৩. ইদ্রীস কান্দলাবী, সীরাতুল মুস্তাফা (স) দেওবন্দ ১৯৮০ খৃ, ১খ., পৃ. ৯৫-৯৬, ১১৫;
৪. মুফতী মুহাম্মাদ শফী (র),-সীরাতে খাতিমুল আম্বিয়া, অনুবাদ-মুহাম্মদ সিরাজুল হক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ৪র্থ সংস্করণ, ঢাকা ১৯৯৫ খৃ., পৃ. ২৪;
৫. মোহাম্মদ আকরম খা, মোস্তফা চরিত, ৪র্থ সংস্করণ, ঢাকা ১৯৭৫ খৃ. ১খ., পৃ. ২৯৫-২৯৬;
৬. গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, ঢাকা, ১৯৭৩, খৃ., দ্বাদশ সংস্করণ, পৃ. ৫৪-৫৮;
৭. সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী, নবীয়ে রহমত, অনুবাদঃ আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী, ঢাকা-চট্টগ্রাম ১৯৯৭ খৃ., পৃ. ১১৮;
৮. Karen Armstrong, Muhammad (SM), London 1991, p. 78.
📄 হযরত খাদীজা (রা)-এর সহিত বিবাহ
হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়ায়লিদ (রা) ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মহিলা। সেই যুগে আরবে নারীদের অধিকার বলিতে কিছুই ছিল না। পদে পদে নারীরা চরম অবমাননা ও লাঞ্ছনার শিকার হইত। সেই সময় এই সতী-সাধ্বী মহিলা স্বীয় পবিত্রতা ও বংশমর্যাদা রক্ষা করিয়া অতি সম্মানের সহিত জীবন যাপন করিতেন। তাঁহার এই পবিত্র ও সুমধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে, যাহার ফলে আইয়ামে জাহিলিয়া এবং ইসলামের যুগেও লোকজন তাঁহাকে 'তাহিরা' উপাধিতে ভূষিত করে (সীরাতুল মুস্তাফা, ইদরীস কান্দহলবী, ১খ., পৃ. ৯৯; ফতহুল বারী, ১খ, পৃ. ৭৭)।
হযরত খাদীজা (রা)-র পরপর দুইজন স্বামী ইনতিকাল করেন। তাহাদের পরিত্যক্ত এবং পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ মিলিয়া তিনি অগাধ ধন-সম্পদের মালিক হইয়াছিলেন। এই ধন-সম্পদ তিনি দরিদ্র ও অসহায়গণকে দান করিতেন এবং মানুষের কল্যাণে ব্যয় করিতেন। তিনি কর্মচারী নিয়োগ করিয়া তাহাদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে মালামাল প্রেরণ করিয়া ব্যবসা-বাণিজ্যও অব্যাহত রাখিয়াছিলেন এবং নিজেই তাহা তত্ত্বাবধান করিতেন। একবার কুরায়শদের একটি বাণিজ্যিক দল তাহাদের মালামাল নিয়া ব্যবসার উদ্দেশে সিরিয়া গমনের জন্য প্রস্তুত হইতেছিল। তখন হযরত খাদীজা (রা) তাঁহার মালামাল বিদেশে প্রেরণের চিন্তা করিতেছিলেন এবং কাহাকে স্বীয় ব্যবসার দায়িত্ব প্রদান করা যায় এই নিয়া ভাবিতেছিলেন। তাঁহার মালামালের পরিমাণ এত অধিক ছিল যে, সমগ্র কুরায়শদের মালামাল একত্র করিলেও তাহার সমপরিমাণ হইত না।
এই সময় হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর বয়স ছিল পঁচিশ বৎসর। তাঁহার সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও আমানতদারি প্রভৃতি গুণের কথা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে এবং মক্কা নগরীর সকলেই তাঁহাকে আল-আমীন বা সত্যবাদী বলিয়া ডাকিতে থাকে। ইতোমধ্যে হযরত খাদীজা (রা) তাঁহার সত্যবাদিতা ও কর্মদক্ষতার কথা জানিতে পারিয়াছেন এবং দেশ-বিদেশে যাতায়াত করিয়া ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে তাঁহার যে পূর্ব অভিজ্ঞতা রহিয়াছে ইহাও তিনি অবগত হইয়াছেন। সুতরাং এইরূপ বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির উপর স্বীয় ব্যবসার দায়িত্বভার অর্পণ করিবার জন্য হযরত খাদীজা (রা) স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। এই উদ্দেশে তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে তাঁহার বাড়ীতে ডাকিয়া আনিবার জন্য লোক পাঠাইলেন।
হযরত খাদীজা (রা)-র আহ্বানে নবী করীম (স) তাঁহার বাড়ীতে উপস্থিত হইলেন। হযরত খাদীজা (রা) তাঁহাকে সম্ভ্রমে বলিলেন, আমি আপনার সত্যনিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা ও উন্নত চরিত্রের কথা জানিতে পারিয়াছি। যদি অনুগ্রহ করিয়া আপনি আমার ব্যবসার দায়িত্বভার গ্রহণ করিয়া মালামালসহ সিরিয়া গমন করেন তাহা হইলে আমি খুবই বাধিত হইব এবং আপনার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করার জন্য আমার গোলাম মায়সারাকে আপনার সহিত প্রেরণ করিব। ইহা ছাড়া অন্যান্যদিগকে আমি যেই হারে লভ্যাংশ দিয়া থাকি আপনাকে উহার দ্বিগুণ প্রদান করিব। হযরত খাদীজার প্রস্তাবে তিনি খাজা আবূ তালিবের পরামর্শ ও অনুমতি চাহিলেন। আবূ তালিব তখন প্রায় বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হইয়াছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য করা বা বিদেশ গমন এখন আর তাহার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তিনি খাদীজার ব্যবসার দায়িত্ব নিয়া সিরিয়া গমনের মাধ্যমে কিছু অর্থ উপার্জন করা উত্তম বলিয়া মনে করিলেন এবং হযরত খাদীজার প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করিলেন (আল্লামা ইদরীস কান্দেলবী, সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, পৃ. ৮৭)।
বাণিজ্য কাফেলা প্রস্তুত হইল। এইবার রাসূলুল্লাহ (স) অনেক মূলধন ও প্রচুর মালামাল লইয়া সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলেন। হযরত খাদীজা (রা)-র গোলাম মায়সারাও এই সফরে তাঁহার সঙ্গী ছিলেন। কয়েক দিন চলার পর তাহারা সিরিয়ার অন্তর্গত বুসরা নগরে পৌছিলেন এবং বিশ্রাম গ্রহণের জন্য একটি গাছের ছায়ায় উপবেশন করিলেন। নিকটেই ছিল এক খৃস্টান পাদ্রীর গির্জা। তাহার নাম ছিল নাসতুরা। তিনি নবী করীম (স)-কে দেখিয়া তাঁহার নিকটে আসিলেন এবং তাঁহাকে বলিলেন, হযরত ঈসা ইবন মারয়ামের পর আপনি ছাড়া আর কোন নবী এই গাছের ছায়ায় অবস্থান করেন নাই। ইহার পর তিনি মায়সারাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই ব্যক্তি কে যিনি এই গাছের নিচে বসিয়াছেন? মায়সারা বলিল, পবিত্র মক্কার কুরায়শ বংশের এক সম্ভ্রান্ত যুবক। অতঃপর পাদ্রী মায়সারাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তাঁহার উভয় চোখে লালিমা আছে কি? মায়সারা বিলল, হাঁ, লালিমা আছে এবং এই লালিমা কখনও দূরীভূত হয় না। পাদ্রী বলিলেন, ইনিই হইলেন প্রতিশ্রুত শেষনবী (আল্লামা সুয়ূতী (র), আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ, পৃ. ৯১; ইদরীস কান্দেহলাবী, সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, পৃ. ১০০)।
অতঃপর নবী করীম (স) সমস্ত পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করিলেন এবং নূতন কিছু দ্রব্যাদি ক্রয় করিলেন। পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাইয়া এইবার তিনি প্রচুর লাভবান হইলেন। ফলে অত্যন্ত আনন্দ ও প্রফুল্ল চিত্তে তিনি কাফেলার সহিত মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হইলেন। পথিমধ্যে মায়সারা দেখিতে পায় যে, যখনই দ্বিপ্রহরের রৌদ্রে উত্তাপ প্রচণ্ড বৃদ্ধি পায়, তখনই দুইজন ফেরেশতা হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে ছায়া দিয়া রৌদ্রের উত্তাপ হইতে রক্ষা করিতেছে (আল-খাসাইসুল কুবra; ১খ, পৃ. ৯১)। এই দিকে হযরত খাদীজা (রা) বাণিজ্য কাফেলার প্রতীক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করিতেছিলেন।
একদিন তিনি স্বীয় কক্ষে বসিয়া বাহিরের দিকে তাকাইয়া আছেন। এই সময় দেখিতে পাইলেন যে, দূরে একটি কাফেলা আসিতেছে এবং ইহার অগ্রভাগে হযরত মুহাম্মাদ (স) উটের উপর আরোহণ করিয়া আসিতেছেন। তিনি আরো দেখিতে পাইলেন যে, প্রখর রৌদ্রের উত্তপ হইতে রক্ষার জন্য দুইজন ফেরেশতা তাঁহার উপর ছায়াদান করিতেছে। তিনি নিকটস্থ মহিলাগণকে এই দৃশ্য দেখাইলেন। সকলে এই দৃশ্য দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল (ইদরীস কানধলাবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, ১০০-১০১)। কিছুক্ষণের মধ্যেই নবী করীম (স) হযরত খাদীজা (রা)-র বাড়িতে আসিয়া পৌছিলেন এবং আমদানীকৃত সমস্ত মালামাল ও অর্থ তাঁহাকে যথাযথভাবে বুঝাইয়া দিলেন। এই সফরে হযরত খাদীজা (রা) পূর্বের চাইতে অধিক লাভবান হইলেন। সুতরাং অঙ্গীকার অনুযায়ী আনন্দচিত্তে দ্বিগুণের বেশী লভ্যাংশ প্রদান করিয়া তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে ধন্যবাদ জানাইয়া বিদায় করিলেন, অপরদিকে মায়সারাও হযরত খাদীজা (রা)-র নিকট উপস্থিত হইল এবং বিগত সফরের অভিজ্ঞতাসহ পাদ্রী নাসতুরার ভবিষ্যদ্বাণী ও ফেরেশতাদের ছায়াদানের ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করিল।
হযরত খাদীজা (রা) অত্যন্ত বুদ্ধিমতি ও বিচক্ষণ মহিলা ছিলেন। যুবক বয়স হইতেই নবী করীম (স)-এর সত্যবাদিতা ও অন্যান্য গুণাবলীর কারণে হযরত খাদীজা (রা) তাঁহার গুণমুগ্ধ ছিলেন। ব্যবসায় যোগদানের পর তাঁহার সহিত আরো ঘনিষ্ঠভাবে পরিচয় ঘটে। তাঁহার সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, উন্নত চরিত্র, মধুর ব্যবহার ও সৌম্যকান্তি ইত্যাদি হযরত খাদীজা (রা)-কে আরো আকৃষ্ট করিয়া তোলে। তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স) সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করিতে লাগিলেন। তাই সিরিয়া সফরের সময় তাঁহার সম্পর্কে পাদ্রীর ভবিষ্যদ্বাণী, ফেরেশতাদের ছায়াদান ও অন্যান্য ঘটনাবলী ওয়ারাকা ইব্ নওফাল-এর নিকট বর্ণনা করিলেন। তিনি ছিলেন হযরত খাদীজা (রা)-র চাচাত ভাই এবং তাওরাত ও ইঞ্জীলের জ্ঞানে সমৃদ্ধ একজন পণ্ডিত ব্যক্তি। ওয়ারাকা বলিলেন, যদি এই সমস্ত ঘটনা সত্য হয় তাহা হইলে নিশ্চয় হযরত মুহাম্মাদ (স) এই উম্মতের নবী হইবেন। আমি ইহা নিশ্চিতভাবে অবগত আছি যে, এই উম্মতের মধ্যে শীঘ্রই একজন নবী আগমন করিবেন এবং আমরা তাঁহার আগমন অপেক্ষায় আছি। ওয়ারাকা ইন নওফালের নিকট এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনিয়া হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর প্রতিশ্রুত শেষ নবী হওয়া সম্পর্কে তাঁহার মনে দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হইল। সুতরাং তাঁহাকে ঘনিষ্ঠভাবে পাওয়া একটি বিরাট সৌভাগ্যের বিষয় হইবে বলিয়া তাঁহার মন আন্দোলিত হইতে লাগিল এবং তাঁহার সহধর্মিনী হওয়ার জন্য হযরত খাদীজা (রা)-র মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া উঠিল (মাওলানা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ১খ, পৃ. ১৮৮; ইদরীস কান্দহলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, পৃ. ১১১)।
এই সময় হযরত খাদীজা (রা)-র বয়স হইয়াছিল চল্লিশ বৎসর। ইহার পূর্বে তাঁহার আরো দুইবার বিবাহ হইয়াছিল। প্রথম বিবাহ হইয়াছিল আবূ হালা ইন্ন যুরারার সহিত। তাহার ঔরসে হযরত খাদীজার দুইটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাহাদের নাম ছিল যথাক্রমে হিন্দ ও হারিস। আবূ হালার মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার তাঁহার বিবাহ হয় আতিক ইন্ন আয়েসের সঙ্গে। আতীকের ঔরসে হযরত খাদীজার একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাহার নাম ছিল হিন্দ। ইহার পর তিনি বিধবা অবস্থায় পবিত্র জীবন যাপন করিতে থাকেন। এত অধিক বয়সে বিবাহের প্রস্তাব দিতে স্বভাবতই তিনি ইতস্তত করিতেছিলেন। ইতোপূর্বে কুরায়শ গোত্রের নেতৃস্থানীয় অনেকেই খাদীজার নিকট বিবাহের প্রস্তাব দিয়াছিল, কিন্তু তিনি কাহারও প্রস্তাবে সাড়া দেন নাই। পক্ষান্তরে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর বয়স তখন ছিল মাত্র পঁচিশ বৎসর। সুতরাং এই যুবক বয়সে তাঁহাকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করিতে সম্মত হইবেন কিনা সেই আশংকাও হযরত খাদীজার মনে জাগিয়া উঠিল। কিন্তু এই স্বর্গীয় আকর্ষণের কারণে তাঁহাকে কোন ভয়-ভাবনা নিবৃত্ত করিতে পারিল না। সুতরাং খাদীজা তাঁহার সহচরী এবং উভয় পক্ষের আত্মীয়া নাফীসার মাধ্যমে নবী করীম (স)-এর নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠাইলেন।
বিবি নাফীসা বলেন, আমি তাঁহার নিকট যাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, হে মুহাম্মাদ! আপনি বিবাহ করিতেছেন না কেন? তিনি উত্তরে বলিলেন, এখনও আমি বিবাহের চিন্তাই করি নাই। ইহা ছাড়া বিবাহ করিবার মত সম্পদও আমার নাই। আমি বলিলাম, যদি আমি ইহার সুব্যবস্থা করিয়া দিতে পারি এবং এমন মহিলার সহিত সম্পর্কের কথা বলি যিনি রূপে, গুণে, ধনে, বংশমর্যাদায় ও স্বভাব-চরিত্রে অতুলনীয়া, তাহা হইলে আপনি কি এই বিবাহে সম্মত হইবেন? তিনি বলিলেন, এমন মহিলা কে তাহা জানিতে পারি কি? তিনি বলেন, তখন আমি খাদীজার নাম বলিলাম। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করিলেন, খাদীজা বিবাহ করিবেন? নাফীসা বলিলেন, আমি এই বিবাহের দায়িত্ব গ্রহণ করিলাম। ইহার পর আমি খাদীজার নিকট যাইয়া হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সম্মতির কথা জানাইলাম। খাদীজার তখন কি আনন্দ! তিনি যেন আনন্দে আত্মহারা হইয়া গেলেন। অতঃপর বিবাহের ব্যাপারে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। কারণ সেই যুগে বিবাহের ব্যাপারে নারীদের পূর্ণ স্বাধীনতা ও অধিকার ছিল। তখন হযরত খাদীজার পিতা খুওয়ায়লিদ ইব্ন আসাদ জীবিত ছিলেন না। ফিজার যুদ্ধের পূর্বেই তিনি ইনতিকাল করেন। সুতরাং তিনি তাঁহার চাচা আমর ইব্ন আসাদকে বিবাহের ব্যাপারে তাঁহার অভিপ্রায় জানাইলেন এবং বিবাহ কার্য সম্পন্ন করিয়া দিবার জন্য অনুরোধ জ্ঞাপন করিলেন (মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স), পৃ. ৩৯)।
অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পিতৃব্য আবূ তালিবকে খাদীজার এই প্রস্তাব সম্পর্কে অবহিত করিলেন। আবূ তালিব সর্বদা তাহার এই স্নেহের ভাতিজার কল্যাণ কামনা করিতেন। সুতরাং সর্বদিক বিবেচনা করিয়া তিনি আনন্দচিত্তে এই বিবাহে সম্মতি জানাইলেন। আবূ তালিব তখন যথানিয়মে হযরত খাদীজার পিতৃব্য আমর ইবন আসাদের নিকট স্বীয় ভ্রাতুষ্পুত্রের বিবাহের পয়গাম পাঠাইলেন এবং সকলের সম্মতিক্রমে এই মহামিলন ও শুভ কাজের দিন, তারিখ ও মোহর ধার্য করিলেন। যথাসময়ে উভয় পক্ষের আত্মীয়বর্গ হযরত খাদীজার বাড়ীতে উপস্থিত হইলেন। হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর চাচা আবূ তালিব ও হামযা প্রমুখ কুরায়শ নেতৃবৃন্দ বিবাহ মজলিসে সমাগত হইলেন। হযরত খাদীজার চাচা আমর ইব্ন আসাদ এবং তাঁহার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফাল বিবাহ মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। এই বিবাহে পাত্র পক্ষে আবু তালিব এবং পাত্রীপক্ষে আমর, ইব্ন আসাদ অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করিলেন। সকলকে যথাযোগ্য আদর অভ্যর্থনার পর আবু তালিব বিবাহ মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে সম্বোধন করিয়া এই খুতবা প্রদান করেন:
আলহামদুলিল্লাহিল্লাজী জাআলানা মিন যুররিয়াতি ইবরাহীমা ওয়া যার'ই ইসমাইলা ওয়া যীযি মা'আদ ওয়া উনসু'রি মুদার ওয়া জা'আলানা হাযানাতা বাইতিহী ওয়া সুওয়াসা হারামিহী ওয়া জা'আলা লানা বাইতান মাহজুজান ওয়া হারামান আমনান ওয়া জা'আলা নাল হুক্কামা আলান নাস। ছুম্মা ইন্নাবনা আখী হাযা মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহি লা ইউওয়াজ্জানূ বি-রাজুলিন ইল্লা রাজ্জাহা বিহী শারাফান ওয়া নুবলান ওয়া ফাযলান ওয়া 'আক্বিলান। ফাইন্ন কান ফীল মাল কিল্লু ফা ইন্না আল-মাল্লা যিল্লুন যাইলুন ওয়া আমরুন হাইলুন। ওয়া মুহাম্মাদুন মিন ক্বাদ ফা'তামু ক্বারাবাতাহু ওয়াক্বাদ খাতাবতু খাদীজা বিনত খুওয়াইলিদ ওয়াবাযালতুস সাদা'ক্বা মা আজালাহু ওয়া আজালাহু মিন মালী 'ইশরুনা বায়'রুন। ওয়া হুওয়া ওয়াল্লাহু বা'দাল হাযা লাহু নাবা'উন আ'যীমুন ওয়া খাত্ব্রুন জালী'লুন জাসীমুন।
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য যিনি আমাদিগকে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বংশে এবং হযরত ইসমাঈল (আ)-এর গোত্রে সৃষ্টি করিয়াছেন, যিনি আমাদিগকে মা'আদ্দ ও মুদারের বংশোদ্ভূত করিয়াছেন, যিনি আমাদিগকে তাঁহার পবিত্র কা'বা গৃহের মর্যাদা রক্ষা এবং পবিত্র হারাম শরীফের খাদেম মনোনীত করিয়াছেন, যিনি কা'বা শরীফকে হজ্জব্রত পালনের স্থান এবং হারাম শরীফকে নিরাপত্তার স্থান বানাইয়াছেন এবং যিনি আমাদিগকে জনসাধারণের হাকীম নির্বাচিত করিয়াছেন। অতঃপর আমার এই ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল্লাহ জ্ঞানে, গুণে, মর্যাদা ও মহত্বে কেহই তাঁহার সমকক্ষ নহে। যদিও তাঁহার ধন-সম্পদ কম কিন্তু পার্থিব ধন-সম্পদ অস্থায়ী ছায়ার মত পরিবর্তনশীল, নশ্বর। মুহাম্মদের আত্মীয়-স্বজনদের সম্পর্কে নিশ্চয় তোমরা অবগত রহিয়াছ। অতঃপর মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল্লাহ খাদীজা বিনত খুওয়ায়লিদ-এর সহিত বিবাহের প্রস্তাব পেশ করিতেছি এবং আমার পক্ষ হইতে মোহরানা বাবদ বিশটি উট আদায় করিতেছি। আল্লাহ্র শপথ! তাঁহার ভবিষ্যত অতি উজ্জ্বল ও অতি মহান। কিছু দিন পরই তাঁহার অবস্থার পরিবর্তন হইয়া যাইবে (তারীখে ইব্ন খালদুন, ১খ, পৃ. ২৫-২৬; মুহাম্মাদ রিদা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯)।
আবূ তালিবের খুতবার পর পাত্রীপক্ষ হইতে হযরত খাদীজার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইব্ন নাওফাল আগত মেহমানদিগকে সম্বোধন করিয়া এই খুতবা পাঠ করেন:
আলহামদুলিল্লাহিল্লাজী কামা যাকারা তা ওয়া ফায্যলানা আলা মা আদাদতা ফানাহনু সাদাতুল আরাবি ওয়া ক্বদাতুহা ওয়া আনতুম আহলু যালিক কুল্লুহু লা তুনকিরুল আশীরাতু ফাযলাকুম ওয়া লা ইয়ারুদ্দু আহাদুন মিনান নাসি খারা'কুম ওয়া শারাফাকুম ওয়াক্বাদ রাগিবনা ফিল ইত্তিসালি বি হাবলিকুম ওয়া শারাফিকুম ফা আশহাদূ আলা মাআ'শির ক্বুরাইশ বি আন্নী ক্বাদ জাওওয়াজতু খাদীজা বিনত খুওয়াইলিদ মিন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ আলা ক্বাযা।
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য, যিনি আমাদিগকে ঐরূপ মর্যাদা দান করিয়াছেন, (হে আবূ তালিব) আপনি যাহা বলিয়াছেন। অতঃপর আমরা আরবের সর্দার ও নেতা এবং আপনারা সমস্ত মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। আপনাদের বংশমর্যাদা, আভিজাত্য ও উচ্চ মর্যাদা কোন আরব অস্বীকার করিতে পারে না এবং অন্য কেহও অস্বীকার করিতে পারে না। নিশ্চয় আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সহিত আপনাদের সহিত আত্মীয়তার সম্পর্ক করিতে আগ্রহান্বিত। অতএব হে কুরায়শগণ! তোমরা সাক্ষী থাক, আমি খাদীজা বিন্ত খুওয়ায়লিদকে মুহাম্মদি ইব্ আবদুল্লাহ্ সহিত বর্ণিত মোহরানায় বিবাহ দিলাম” (প্রাগুক্ত)।
এই সময় আবূ তালিব বলিলেন, হে ওয়ারাকা! খাদীজার চাচা আমর ইব্ন আসাদও এইখানে উপস্থিত রহিয়াছেন। তিনি যদি আপনার সহিত বিবাহ প্রদানে আপনার পৃষ্ঠপোষকতা করেন তাহা হইলে আমরা আনন্দিত হইব। তখন আমর ইব্ন আসাদ বলিলেন, আপনারা সাক্ষী থাকুন, আমি আমার ভাই খুওয়ায়লিদ-এর কন্যা খাদীজাকে মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল্লাহ্র সহিত বিবাহ দিলাম। ইহার পর উভয় পক্ষে ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হয় এবং পানাহারের মাধ্যমে বিপুল উৎসাহ, আনন্দ ও কোলাহলের সহিত শুভ বিবাহ সমাপ্ত হয় (আল খাসাইসুল কুবরা, আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র), বৈরূত, ১খ, পৃ. ৯১; সীরাতুল মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, হযরত মাওলানা ইদরীস কান্দেহলবী, ১খ, দেওবন্দ, পৃ. ১১১-১১২; (আস-সীরাতু ইন্ন হিশাম, মিসর, পৃ. ১৯০)।
আস-সীরাতুল হালবিয়্যাসহ অন্যান্য সীরাত গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী প্রতীয়মান হয় যে, হযরত খাদীজা (রা)-র বিবেহে সাড়ে বার উকিয়া (اوقیه) দেনমোহর নির্ধারণ করা হইয়াছিল। উকিয়া হইল তৎকালে প্রচলিত এক প্রকার স্বর্ণ-মূদ্রার নাম আর রৌপ্যমুদ্রার নাম ছিল দিরহাম। এক উকিয়া চল্লিশ দিরহামের সমান। সুতরাং সাড়ে বার উকিয়ায় হইল ৫০০ দিরহাম। রাসূলুল্লাহ (স) উম্মুল মু'মিনীনদের জন্য সাড়ে বার বা ৫০০ দিরহাম দেনমোহর নির্ধারণ করিতেন। যেহেতু হযরত ফাতিমা (রা)-র মোহরও ৫০০ দিরহাম ছিল, এইজন্য এই পরিমাণ দেন মোহরানাকে মহরে ফাতেমী বলা হয় (আল্লামা আলী ইব্ন বুরহানুদ্দীন হালাবী (র), সীরাতে হালাবীয়া, পৃ. ৫-১২; আল্লামা শিবলী নুমানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন্নবী (স), ১খ, পৃ. ১১৮)।
ইবন হিশাম তাঁহার সীরাত গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত খাদীজা (রা)-কে মোহরানা হিসাবে বিশটি উট প্রদান করিয়াছিলেন। যুরকানী বলেন, ইন্ন হিশামের এই বর্ণনাটি অন্যান্য বর্ণনার পরিপন্থী নহে। কারণ বিবাহের সময় সাড়ে বার উকিয়া মোহর নির্ধারিত হইয়াছিল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ্ (স) সন্তুষ্ট হইয়া অতিরিক্ত মোহররূপে এই বিশটি উট প্রদান করিয়াছিলেন (যুরকানী, ১খ, পৃ. ২৭৫)।
নবী করীম (স)-এর বয়স যখন পঞ্চাশ বৎসর তখন হযরত খাদীজা (রা) ৬৫ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন। পঁচিশ বৎসরের বৈবাহিক জীবনে হযরত খাদীজা (রা)-র গর্ভে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দুই পুত্র ও চার কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। সন্তানদের মধ্যে কাসেম ও আবদুল্লাহ পুত্র সন্তান ছিলেন। আবদুল্লাহ-এর উপনাম ছিল তাহের ও তায়্যিব। কাসেম-এর নামানুসারেই রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উপনাম হইয়াছিল আবুল কাসেম। পুত্রগণ শিশুকালেই ইনতিকাল করেন। কন্যাগণের নাম হইল যয়নব, রুকায়্যা, উম্মে কুলছুম ও ফাতিমা (রা)।
টিকাঃ
১. আল্লামা আবদুর রহমান ইব্ন খালদুন, তারীখে ইব্ন খালদুন, ইদারায়ে দরসে ইসলাম, দেওবন্দ ১৯৭৮ খৃ., ১খ, পৃ. ২৫-২৬;
২. আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, দেওবন্দ, ১৯৩২ খৃ., পৃ. ৮-১১;
৩. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আল-খাসাইরূসুল কুবরা, বৈরূত, ১খ, পৃ. ৯২;
৪. আবদুর রহমান ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা বিআহওয়ালিল মুস্তাফা, মিসর ১৩৮৬ হি:/ ১৯৬৬ খৃ., ১খ, পৃ. ১৪৩-১৪৫;
৫. ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, মিসর, ১খ, পৃ. ১৯২-১৯৫;
৬. আলী ইব্ন বুরহানুদ্দীন হালাবী (র), সীরাতে হালাবীয়া, দেওবন্দ, পৃ. ৭১-৮০;
৭. ইদরীস কান্দেহলাবী, সীরাতুল মুস্তাফা সাল্লাল্লঅহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, দেওবন্দ ১৯৮০ খৃ., ১খ, পৃ. ১১১-১১২;
৮. আল্লামা শিবলী নুমানী ও আল্লামা সুলায়মান নদবী, সীরাতুন্নবী (স), করাচী, ১৯৮৪ খৃ., ১খ, পৃ. ১১৭-১১৮;
৯. আলহাজ্জ শমসের আলী খান রাও, সীরাতে মুহসিনে কায়েনাত (সা), বৃটেন, পৃ. ৪২-৪৬;
১০. মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স), বৈরূত ১৯৮৫ খৃ., পৃ. ৩৩;
১১. শিবলী নুমানী, সীরাতুন্নবী (সা), আযমগড়,, ১৩৩৯ হি. পৃ. ১৮৫-১৮৯;
১২. মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোস্তফা চরিত, ঢাকা ১৩৯৫ হি. ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ২৮১-২৮৬;
১৩. গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, ঢাকা ১৯৭৩ খৃ., পৃ. ৫৯-৬৪;
১৪. আবদুল খালেক, এম, এ, সাইয়েদুল মুরসালীন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১ম সং, ১৯৮৪ খৃ., পৃ. ৫৬-৫৮;
১৫. সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী, অনু. আবূ সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী, নবীয়ে রহমত (সা), মজলিস নাশরিয়াত-ই ইসলাম, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ১ম সং ১৯৯৭ খৃ., পৃ. ১২০;
১৬. মুফতী মোহাম্মদ শফী (র), অনু. মুহাম্মদ সিরাজুল হক, সীরাতে খাতিমুল আম্বিয়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ৪র্থ সং. ১৯৯৫, পৃ. ১০-১২;
১৭. ডঃ মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, অনু. মাওলানা আবদুল আউয়াল, হায়াতে মুহাম্মদ (স) (মহানবীর জীবন চরিত), ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১ম সং. ১৯৯৮ খৃ., পৃ. ১৫১-১৫৪;
১৮. শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, ঢাকা ১৯৯৮ খৃ., ১ম সং, পৃ. ২০৭-২১২;
১৯. ডঃ সালেহ ইবন আবদুল্লাহ ইবন হুমায়দ ও সদস্যবৃন্দ, নাদরাতুন নাঈম ফী মাকারিমে আখলাকির রাসূল (স), ঢাকা ২০০০ খৃ., ১ম সং, ১খ., পৃ. ৩১৭;
২০. মাহমুদুর রহমান, মাহবুবে খোদা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১ম সং., পৃ. ৫৯-৬২;
২১. Martin Lings, Muhammad, London 1983;
২২. W. Montgomery Watt, Muhammad At Mecca, Oxford University Press, Great Britain 1953, Page 38;
২৩. A. Guillaume, The Life of Muhammad (SM), Oxford University Press, New York 1955, P. 82.
📄 কা'বা গৃহ মেরামতে এবং হাজরে আসওয়াদ পুনঃস্থাপনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর ভূমিকা
কা'বা শরীফ নির্মাণ
পৃথিবীতে আল্লাহ্ ইবাদতের জন্য যে গৃহটি সর্বপ্রথম নির্মাণ করা হয় তাহা হইল মক্কায় অবস্থিত কা'বা গৃহ বা বায়তুল্লাহ শরীফ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করিয়াছেন: ইন্নাল আউওয়ালা বাইতিন উজি'আ লিলন্নাসি লাল্লাযী বি-বাক্কাতা মুবারাকান ওয়া হুদাল্লিল আ'লামীন। "নিশ্চয় মানবজাতির (ইবাদতের) জন্য সর্বপ্রথম যে গৃহ প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল তাহা তো বাক্কায় (মক্কায়), উহা বরকতময় ও বিশ্বজগতের জন্য দিশারী" (৩ঃ ৯৬)।
হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আমর ইব্ন আস (রা) হইতে বর্ণিত, আল্লাহ পাক হযরত জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে হযরত আদম (আ)-এর নিকট বায়তুল্লাহ বা কা'বা ঘর নির্মাণের আদেশ প্রদান করিলেন। যখন হযরত আদম (আ) নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করিলেন তখন নির্দেশ হইল, হে আদম! এই ঘরের তাওয়াফ কর। তুমিই প্রথম ব্যক্তি এবং ইহাই পৃথিবীতে নির্মিত প্রথম ঘর যাহা মানুষের ইবাদতের জন্য তৈয়ার করা হইয়াছে (আশ-শাওকানী, ফাতহুল বারী, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৮৫)।
হযরত নূহ (আ)-এর যুগে সংঘটিত দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়ানক তুফানে কা'বা ঘরের অবস্থান সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। এইভাবে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হয়। ইহার পর হযরত ইবরাহীম (আ) দ্বিতীয়বার কা'বা ঘর নির্মাণের আদেশ প্রাপ্ত হইলেন, কিন্তু অনেক চেষ্টা করিয়াও কা'বা ঘরের কিছু খুঁজিয়া পাইলেন না। অবশেষে হযরত জিবরাঈল (আ) আগমন করিয়া হযরত ইবরাহীম (আ)-কে কা'বা ঘরের অবস্থান ও মূল ভিত্তির চিহ্ন দেখাইয়া দিলেন। ইহার পর স্বীয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ)-কে সাথে নিয়া হযরত ইবরাহীম (আ) কা'বা ঘর পুনরায় নির্মাণ করিলেন। উক্ত ঘটনা উল্লেখ করিয়া আল্লাহ রব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন: ওয়া ইয ইয়ারফা'উ ইবরাহীমুল ক্বাওয়া'ইদা মিনাল বাইতি ওয়া ইসমাইলু রব্বানা তাক্বাব্বাল মিন্না ইন্নাকা আনতাস সামি'উল 'আলিম। "এবং স্মরণ কর যখন ইবরাহীম ও ইসমাঈল কা'বা গৃহের ভিত্তির উপর দেওয়াল নির্মাণের মাধ্যমে তাহা উঁচু করে, তখন তাহারা দু'আ করে, হে আমাদের প্রভু! আমাদের এই কাজ গ্রহণ কর, নিশ্চয় আপনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী" (ফাতহুল বারী, ৬খ, পৃ. ২৮৪, ২৯২)।
অতঃপর বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসালামের নবৃওয়াত লাভের পাঁচ বৎসর পূর্বে যখন তাঁহার বয়স ছিল পঁয়ত্রিশ বৎসর তখন মক্কার কুরায়শগণ কা'বা ঘর পুনঃ নির্মাণ করেন। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পর দীর্ঘকাল পর্যন্ত কা'বা ঘর সংস্কার করা হয় নাই। বিশেষ করিয়া ঐ সময় কা'বা ঘরের ছাদ ছিল না। দেওয়ালের উচ্চতা ছিল আঠার হাত। দীর্ঘদিন সংস্কার না করার ফলে ইহার দেওয়ালে ফাটল দেখা দেয় এবং তাহা ভাঙ্গিয়া পড়িবার উপক্রম হয়। ইহা ছাড়া কা'বা ঘরটি নিম্নভূমিতে নির্মিত হওয়ায় পাহাড় হইতে বৃষ্টির পানি নামিয়া আসিয়া ইহার অভ্যন্তরে ঢুকিয়া যাইত। ইহাতে কা'বা গৃহটি প্রায় প্রতি বৎসরই ক্ষতিগ্রস্ত হইত, যাহার ফলে কা'বা ঘর পুনঃনির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই সময় কুরায়শ গোত্রসহ মক্কার অন্যান্য গোত্রের নেতৃবৃন্দ এক পরামর্শ সভায় বসিলেন। যেহেতু কা'বা ঘর সর্বকালে সকলের নিকট মর্যাদাসম্পন্ন ছিল তাই সভায় সর্বসম্মতিক্রমে কা'বা ঘর পুনঃনির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
যেহেতু কা'বা ঘর প্রথম তৈয়ার করার সময় ছাদ নির্মাণ করা হয় নাই। শুধু চারিদিকে প্রাচীর দিয়া বেষ্টন করিয়া রাখা হইয়াছিল, যাহার ফলে যে কেহই অনায়াসে কা'বা ঘরে ঢুকিয়া যাইতে পারিত। একবার এক ব্যক্তি প্রাচীরের উপর দিয়া ভিতরে প্রবেশ করে এবং কা'বা ঘর যিয়ারতকারীদের প্রদত্ত বেশ কিছু মূল্যবান দ্রব্যাদি চুরি করিয়া লইয়া যায়। ফলে ছাদ তৈয়ারীর বিষয়টি আরো জরুরী হইয়া পড়ে। এই প্রাচীর বেষ্টিত স্থানে একটি কূপ ছিল। সংস্কারের অভাবে আবর্জনাদি পচিয়া কূপটির অবস্থা শোচনীয় হইয়া পড়িয়াছিল। এই সময় কোথা হইতে একটি সাপ আসিয়া ঐ কূপে অবস্থান করিতে থাকে। কোন কোন সময় ঐ সাপটিকে প্রাচীরের উপর চলাচল করিতে দেখা যাইত। লোকজন দেখিলে সাপটি ফণা তুলিয়া ভয়ংকর আকৃতি ধারণ করিত। ইহাতে কা'বা ঘরে আগমনকারী লোকজনের ভয় ও ত্রাসের সৃষ্টি হইত। একদিন প্রাচীরের উপর সাপটি চলাচল করিতেছিল। এমন সময় কোথা হইতে একটি বাজপাখী আসিয়া সাপটিকে ছোঁ মারিয়া লইয়া গেল। ইহাতে সকলের মন হইতে সর্পভীতি দূরীভূত হইল। সকলেই ধারণা করিল যে, তাহারা কা'বা ঘর সংস্কারের যে সদিচ্ছা পোষণ করিয়াছে সেই নেক নিয়তের ফলে আল্লাহ তাহাদের প্রতি সদয় হইয়াছেন এবং বাজপাখী পাঠাইয়া সেই সর্পভীতি হইতে তাহাদিগকে মুক্ত করিয়াছেন (মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোস্তফা চরিত, পৃ. ২৯৩)।
অবশেষে কা'বা ঘর ভাঙ্গিয়া পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মাণের জন্য কুরায়শ নেতৃবৃন্দ যখন ঐক্যবদ্ধ হইলেন তখন আবু ওহ্হাব ইবন আমর মাখযূমী (তিনি ছিলেন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের পিতা আবদুল্লাহ্র মামা) কুরায়শদিগকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, ভাইসব! আল্লাহ তাআলা পবিত্র এবং তিনি পবিত্রতা পছন্দ করেন। সুতরাং পবিত্র সম্পদ দ্বারা কা'বা ঘর নির্মাণ করা হইবে। সূদ অথবা চুরির অর্থ এই পবিত্র কাজে ব্যয় করা ঠিক হইবে না। এই প্রস্তাবে সকলেই সম্মত হইলেন। কা'বা ঘর বা বায়তুল্লাহ নির্মাণের এই পবিত্র ও সম্মানজনক কাজ হইতে যাহাতে কেউ বঞ্চিত না হয় সেই উদ্দেশ্যে বায়তুল্লাহ্র বিভিন্ন অংশ নির্মাণের জন্য মক্কার বিভিন্ন গোত্রকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
কা'বা ঘরের দরওয়াযা নির্মাণের জন্য বানু আব্দ মানাফ ও বানু যুহরা গোত্রকে, হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মধ্যবর্তী স্থান বানু মাখযূম ও কুরায়শ-এর অন্য গোত্রকে, কা'বা ঘরের পিছনের অংশ বানু সাহম ও বানু জামহ গোত্রকে, হাতীমের অংশ বানু আবদুদ-দার ইবন কুসায়্যি ইব্ন আসাদ এবং বানূ আদীকে দায়িত্ব প্রদান করা হয় (ইদরীস কানধলাবী, সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, ১১৪)। এই সময় কুরায়শগণ সংবাদ পায় যে, গ্রীকদের একটি জাহাজ বাত্যাতাড়িত হইয়া দুর্ঘটনায় পতিত হইয়াছে এবং জিদ্দা সমুদ্র বন্দরের নিকট ভাঙ্গিয়া খানখান হইয়া গিয়াছে। ওয়ালীদ ইবন মুগীরা এই খবর পাওয়া মাত্র মক্কা হইতে জিদ্দা উপস্থিত হইলেন এবং কা'বা ঘরের ছাদ নির্মাণের জন্য ঐ জাহাজের কাঠ ক্রয় করিয়া মক্কায় নিয়া আসেন। ঐ জাহাজে বাকুম নামক একজন রোমীয় মিস্ত্রী ছিল। কা'বা ঘর নির্মাণের জন্য ওয়ালীদ তাহাকে সাথে নিয়া আসিলেন (আল-ইসাবা, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৭)। ইবন হিশামের বর্ণনায় দেখা যায় যে, এই সময় মক্কায় জনৈক কিবতী জাতীয় মিস্ত্রি বাস করিত, সে তাহাদিগকে নির্মাণ কাজে সাহায্য করিয়াছিল।
ইহার পর নির্মাণ কাজের সুবিধার্থে যখন প্রাচীন কা'বা ঘর ভাঙ্গার প্রয়োজন হইল, তখন কাহারও এই কাজ শুরু করার সাহস হইল না। আল্লাহর ঘর ভাঙ্গার ব্যাপারে তাহারা সকলেই এক অজানা আশংকায় ভীত-সন্ত্রস্ত ছিল। অবশেষে ওয়ালীদ ইবন মুগীরা সামনে অগ্রসর হইল এবং কোদাল হাতে কা'বা ঘরের সম্মুখে দাঁড়াইয়া বলিল,
আল্লাহুম্মা লা নুরিদু ইল্লাল খায়র।
"হে আল্লাহ! কল্যাণ ও মঙ্গল ব্যতীত এই কাজে আমাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য নাই"।
ইহা বলিয়াই তিনি হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর দিক হইতে ভাঙ্গা আরম্ভ করিলেন। মক্কার বাসিন্দারা বলিতে লাগিল, আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর। তোমরা হয়ত দেখিতে পাইবে যে, রাত্রে ওয়ালীদের উপর আসমান হইতে গযব নাযিল হইয়াছে। যদি এইরূপ ঘটিয়া যায় তাহা হইলে আমরা কা'বা ঘর নির্মাণ না করিয়া পূর্ব অবস্থায় রাখিয়া দিব। যদি এইরূপ কোন অঘটন না ঘটে তাহা হইলে আমরা ওয়ালীদের কাজে সহযোগিতা করিব। পরের দিন সকালে অনেকেই দেখিতে পাইল যে, ওয়ালীদ সুস্থ দেহে কোদাল নিয়া পুনরায় কা'বা ঘরে উপস্থিত হইয়াছেন। তখন সকলেই এই ধারণা করিল যে, আল্লাহ তাহাদের এই কাজে সন্তুষ্ট ও রাযী আছেন। ইহার ফলে কা'বা ঘর নির্মাণ কাজে সকলের সাহস বৃদ্ধি পাইল এবং সকলে সম্মিলিতভাবে এই পুণ্যকাজ আরম্ভ করিল।
কয়েক দিন খনন করার পর হযরত ইবরাহীম (আ)-এর মূল ভিত্তিপ্রস্তর বাহির হইল। একজন কুরায়শ যখন হযরত ইবরাহীম (আ)-এর ভিত্তির উপর কোদাল মারিল তখন সমস্ত মক্কায় এক কম্পন সৃষ্টি হইল। ফলে সেখানেই খনন কার্য বন্ধ করা হয় এবং ঐ ভিত্তির উপরই নির্মাণ কাজ চলিতে থাকে।
সম্মিলিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রত্যেক গোত্রই তাহাদের জন্য নির্ধারিত স্থান পৃথক পৃথকভাবে নির্মাণ করিতে থাকে। প্রথম হইতে বেশ একতা ও শৃঙ্খলার সহিত কাজ চলিতেছিল। দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের কোন লক্ষণই দেখা যাইতেছিল না। কিন্তু নির্মাণ কাজ শেষ হইবার পর হাজরে আসওয়াদ ইহার নির্দিষ্ট যায়গায় স্থাপনের বিষয় নিয়া বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। কারণ এই পবিত্র পাথর স্থাপনের কাজটি অতি পুণ্যময় মনে করিয়া সকলেই এই কাজটি করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিল। কিন্তু কোন গোত্রই হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের দাবি ত্যাগ করিতে সম্মত হইল না। ফলে সকল গোত্রের মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘাত, এমনকি যুদ্ধ শুরু হইবার উপক্রম হইল। আরবগণের এই কোন্দল ও মতবিরোধে মক্কা নগরী যেন মহাতঙ্কে শিহরিয়া উঠিল। সামান্য কারণ বা অকারণে যুগ যুগ ধরিয়া পুরুষানুক্রমে যাহারা যুদ্ধে লিপ্ত হইত, পরস্পরের রক্ত প্লাবিত করিয়াও যাহাদের প্রতিহিংসা নিবৃত্ত হইত না, তাহারা সকলে স্বীয় কৌলিন্য ও গৌরব এবং পূর্বপুরুষদের মর্যাদা রক্ষার নামে যুদ্ধ শুরু করিতেছে ভাবিয়া আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া পড়িল। এইভাবে চারিদিন অতিবাহিত' হইল কিন্তু কোন মীমাংসা হইল না। অবশেষে তাহারা সেই সময় প্রচলিত দেশের প্রথা অনুযায়ী রক্তপূর্ণ পাত্রে হাত ডুবাইয়া মৃত্যুর প্রতিজ্ঞা করিল। উল্লেখ্য যে, ইহা ছিল আরবদের কঠোরতম প্রতিজ্ঞা। নিমিষের মধ্যে চারিদিকে অস্ত্রের মহড়া শুরু হইয়া গেল। যে কোন মুহূর্তে ভয়াবহ যুদ্ধ ও রক্তপাত শুরু হইয়া যাইতে পারে।
এইরূপ সংকটময় মুহূর্তে কুরায়শদের সবচেয়ে প্রবীণ ব্যক্তি আবু উমায়্যা ইবন মুগীরা মাখযূমী দুই বাহু ঊর্ধ্বে তুলিয়া আবেগের সুরে সকলকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, হে কুরায়শ সম্প্রদায়! তোমরা শান্ত হও, আমার কথা শুন। এই শোভ কাজ সম্পাদনের শেষ মুহূর্তে তোমরা অশুভ ও অকল্যাণের সূত্রপাত করিও না। হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের ব্যাপারে আমার সুচিন্তিত মতামত ও পরামর্শ এই যে, আগামী কাল সকালে যেই ব্যক্তি সর্বপ্রথম কা'বা ঘরে উপস্থিত হইবে তাহার মতামত ও পরামর্শ অনুযায়ী এই বিবাদের মীমাংসা করা হইবে। সকলে এই প্রবীণ ব্যক্তির পরামর্শ সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করিল। পরের দিন সকলেই কা'বা ঘরে সমবেত হইল। সকলে রুদ্ধশ্বাসে, আশংকা ও আতঙ্ক মিশ্রিত মনে আগন্তুকের অপেক্ষা করিতে লাগিল। সকলেই ভাবিতে লাগিল, কি জানি কে প্রথম কা'বা প্রান্তরে প্রবেশ করে, কে জানে সে কাহার পক্ষের লোক হইবে, না জানি সে কি মীমাংসা করিয়া বসে। তাহার মীমাংসা যদি প্রতিকূল হয় তাহা হইলে কি করিয়া উহা মানিয়া লওয়া যাইবে। এই উদ্বেগ নিয়া সকলেই পলকহীন নেত্রে কা'বা গৃহের দিকে তাকাইয়া আছে। হঠাৎ সকলে দেখিতে পাইল যে, তাহাদের সুপরিচিত মুহাম্মাদ (স) আজ প্রথম ব্যক্তি যিনি কা'বার দিকে আগমন করিতেছেন। আনন্দে সকলের কণ্ঠে উচ্চারিত হইল,
হাযা মুহাম্মাদুনিল আমীন, ক্বাদ রযীনাহু, হাযা মুহাম্মাদুনিল আমীন।
"এই হইল মুহাম্মাদ আল-আমীন, আমরা তাঁহার নির্দেশ ও মতামত মানিতে রাযী আছি। এই হইল মুহাম্মদ আল-আমীন"।
কা'বা ঘরে উপস্থিত হওয়ার পর হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়া উদ্ভুত ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা হযরত মুহাম্মাদকে অবহিত করা হইল। তিনি সমস্ত ব্যাপার অবগত হইয়া সকল নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন, যে সকল গোত্র হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের মাধ্যমে পুণ্য লাভের অধিকারী হওয়ার আকাংখা করিতেছে তাহারা নিজ নিজ গোত্র হইতে এক একজন প্রতিনিধি নির্বাচন করুক যাহাতে কোন গোত্রই এই পুণ্যময় কাজ হইতে বঞ্চিত না হয়। অতঃপর তিনি একটি চাদর চাহিয়া আনাইলেন এবং নিজ হাতে পাথরখানা চাদরের উপর রাখিলেন। সাথে সাথে সকল গোত্রের প্রতিনিধিগণকে চাদরের এক এক প্রান্ত ধরিয়া তাহা যথাস্থানে নিয়া যাওয়ার জন্য বলিলেন। কুরায়শদের যে সমস্ত নেতৃবৃন্দ ঐদিন চাদর ধরিয়াছিলেন তাহারা হইলেন: (১) উত্তা ইবন রাবীআ ইন্ন আবদ শাম্স, (২) আসওয়াদ ইবন মুত্তালিব ইব্ন আসাদ ইব্ন আবদুল উয্যা, (৩) আবূ হুযায়ফা ইন্ন মুগীরা ইবন উমার ইব্ন মাখযূম ও (৪) কায়স ইব্ন আদী সাহমী। এইভাবে যখন পাথরখানা নির্দিষ্ট স্থানে নেওয়া হইল তখন হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে চাদর হইতে পাথরখানা উঠাইয়া কা'বা ঘরের প্রাচীরে স্থাপন করিলেন।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও ঐতিহাসিক ভূমিকার ফলে আরববাসীদের মধ্যে সৃষ্ট সংঘাত ও সম্মুখ যুদ্ধ পরিস্থিতি সুকৌশলে নির্বাপিত হইল এবং মক্কাবাসী এক ভয়াবহ রক্তপাত হইতে মুক্তি পাইল।
টিকাঃ
১. আবদুর রহমান ইবন খালদুন, অনুবাদ হাকীম আহমদ হোসাইন, তারীখে ইবন খালদুন, প্রকাশক ইদারায়ে রশীদিয়া, দেওবন্দ, মার্চ ১৯৮৮, পৃ. ৩৫-৩৬;
২. মাওলানা হাকীম আবুল বারাকাত আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহ্হুস সিয়ার, সামাদ বুক ডিপো, দেওবন্দ, ১খ., পৃ. ১২-১৩;
৩. আবদুল মালিক ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবীয়া লি ইবন হিশাম, দারুল কুতুব, মিসর, ১খ, পৃ. ১৯০-১৯৬;
৪. মাওলানা মুহাম্মদ ইদরীস কান্দেহলবী, সীরাতুল মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, ইদারায়ে ইলম ও হিকমত, দেওবন্দ, মার্চ ১৯৮০, পৃ. ১১৩-১১৬;
৫. মাওলানা কারী মুহাম্মাদ তায়্যিব, খুতবাতে হাকীমুল ইসলাম, তাজ উসমানী এন্ড সন্স, দেওবন্দ, ১৩৭৮ হি. ১খ;
৬. মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খা, মোস্তফা চরিত, ঝিনুক পুস্তিকা, ৩/১৩, লিয়াকত এভিন্যু, ঢাকা, সেপ্টেম্বর ৯৭৫, পৃ. ২৯৩-২৯৬;
৭. গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, ঢাকা, ১৯৭৩, খৃ., দ্বাদশ সংস্করণ, পৃ. ৬৭-৬৮;
৮. আবদুল খালেক এম, এ, সাইয়েদুল মুরসালীন, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ, বায়তুল মোকাররম, ঢাকা, জুন ১৯৮৪, পৃ. ৫৮-৫৯;
৯. মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, নবী গৃহ সংবাদ, ই. ফা. বা. ১৯৮৩ পৃ. ৮০-৮১;
১০. সায়্যিদ আমীর আলী, দি স্পিরিট অব ইসলাম (ইসলামের মর্মবাণী), অনু-অধ্যাপক মুহাম্মদ দরবেশ আলী খান, ই.ফা.বা. ১৯৯৩, পৃ. ৫৯-৬০;
১১. ডঃ মুহাম্মদ হোসাইন হায়কল, দি লাইফ অব মুহাম্মাদ (স), (মহানবী (স) জীবন চরিত), অনু.-মওলানা আবদুল আউয়াল, জুন ১৯৯৮, পৃ. ১৫৬-১৫৮;
১২. আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী, খাসাইসুল কুবরা, অনুবাদ-মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, সীরাত গবেষণা ও প্রচার সংস্থা, ঢাকা, জুলাই ১৯৯৮, পৃ. ১৫৯;
১৩. শায়খুল হাদীস মওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন ও ড. এ, এইচ, এম, মুজতবা হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ, জুলাই ১৯৯৮, পৃ. ২২২-২২৪।
রাসূলুল্লাহ রবিউল আউয়াল মাসে এবং সোমবারে ইন্তেকাল করার ব্যাপারে কারো কোন মতভেদ নেই। কিন্তু তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। অধিকাংশের মতে সেদিন ছিল, ১২ (বার) রবিউল আউয়াল।
রাসূলুল্লাহ এর ওফাতের দিন আবু বকর (রাঃ) লোকদের ইমামতি করেন:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : آخِرُ نَظْرَةٍ نَظَرْتُهَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ كَشَفَ السَّتَارَةَ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ ، فَنَظَرْتُ إِلَى وَجْهِهِ كَأَنَّهُ وَرَقَةُ مُصْحَفٍ وَالنَّاسُ خَلْفَ أَبِي بَكْرٍ ، فَأَشَارَ إِلَى النَّاسِ أَنِ اثْبُتُوا ، وَأَبُو بَكْرٍ يَؤُمُّهُمْ وَأَلْقَى السِّجْفَ ، وَتُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مِنْ آخِرِ ذَلِكَ الْيَوْمِ
২৯৫. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূল কে শেষবারের মতো দর্শন করলাম, যখন মৃত্যু রোগে আক্রান্ত অবস্থায় সোমবার ফজরের নামাজের সময়; তখন তিনি পর্দা তুলে উম্মতের সালাতের অবস্থা দেখছিলেন। আমি তাঁর চেহেরায় যেন আল-কুরআনের পৃষ্ঠা জ্বলজ্বল করতে দেখেছিলাম। লোকেরা আবু বকর (রাঃ) এর পেছনে সালাত আদায় করছিল। (লোকেরা সরে দাঁড়াতে চাইল) কিন্তু তিনি ইঙ্গিতে সকলকে স্থির থাকার নির্দেশ দিলেন এবং আবু বকর (রাঃ) ইমামতি করলেন। সেদিন শেষ বেলায় রাসূলুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। ২৯৮
রাসূলুল্লাহ ওফাতের সময় আয়েশা (রাঃ) এর কোলে ঠেস লাগিয়ে ছিলেন:
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ : كُنْتُ مُسْنِدَةُ النَّبِيَّ ﷺ إِلَى صَدْرِي أَوْ قَالَتْ : إِلَى حِجْرِي فَدَعَا بِطَسْتٍ لِيَبُولَ فِيْهِ ، ثُمَّ بَالَ ، فَمَاتَ
২৯৬. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর ওফাতের সময় তিনি আমার সিনায় বা আমার কোলে ঠেস লাগিয়ে ছিলেন। অতঃপর তিনি প্রস্রাব করার জন্য একটি পাত্র আনতে বললেন এবং তাতে প্রস্রাব করলেন। এরপর তিনি ইন্তেকাল করেন। ২৯৯
রাসূলুল্লাহ-ও মৃত্যুর যন্ত্রণা ভোগ করেছিলেন:
عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ : لَا أَغْبِطُ أَحَدًا بَهَوْنِ مَوْتٍ بَعْدَ الَّذِي رَأَيْتُ مِنْ شِدَّةِ مَوْتِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ
২৯৭. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর মৃত্যুর কষ্ট দেখার পর অন্য কারো মৃত্যুর সময় কষ্ট হলে আমার হিংসা হয় না।
ব্যাখ্যা: এখানে মৃত্যুর পূর্বে রোগের কষ্ট বুঝানো হয়েছে। আয়েশা (রাঃ) এ কথা বলার উদ্দেশ্য, আমি মনে করতাম, রোগ ছাড়া হঠাৎ মৃত্যু সম্মান ও সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু রাসূলুল্লাহ এর রোগের কষ্ট দেখে অবগত হতে পেরেছি, এটা কোন সৌভাগ্যের ব্যাপার নয়। কারণ রাসূলুল্লাহ এর চেয়ে ভাগ্যবান আর কে হতে পারে? বরং রোগের কষ্ট দ্বারা গোনাহ মাফ হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। রোগের কারণে মৃত্যুর প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়।
রাসূলুল্লাহর কে তাঁর মৃত্যুর স্থানেই দাফন করা হয়:
عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ : لَمَّا قُبِضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ اخْتَلَفُوا فِي دَفْنِهِ ، فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ : سَمِعْتُ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ شَيْئًا مَا نَسِيْتُهُ قَالَ : مَا قَبَضَ اللَّهُ نَبِيًّا إِلَّا فِي الْمَوْضِعِ الَّذِي يُحِبُّ أَنْ يُدْفَنَ فِيْهِ. أَدْفِنُوهُ فِي مَوْضِعِ فِرَاشِهِ
২৯৮. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ ইন্তিকাল হলো তখন তাঁর দাফন নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিল। আবু বকর (রাঃ) বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ হতে এ সম্পর্কে এমন কিছু শুনেছি, যা আমি আজও ভুলিনি। অতঃপর বলেন, আল্লাহ তা'আলা নবীদেরকে এমন স্থানেই মৃত্যু দেন, যেখানে দাফন করা তিনি পছন্দ করেন। অতএব রাসূলুল্লাহ কে তাঁর মৃত্যুশয্যার স্থানেই দাফন করা হোক।৩০০
রাসূলুল্লাহ এর ওফাতের পর আবু বكر (রাঃ) তাঁর কপালে চুম্বন করেন:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، وَعَائِشَةَ ، أَنَّ أَبَا بَكْرٍ ، قَبَّلَ النَّبِيَّ ﷺ بَعْدَ مَا مَاتَ
২৯৯. ইবনে আব্বাস ও আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ এর ওফাতের পর আবু বকর (রাঃ) তাঁর কপালে চুম্বন করেন।১০০১
عَنْ عَائِشَةَ ، أَنَّ أَبَا بَكْرٍ ، دَخَلَ عَلَى النَّبِيِّ ﷺ بَعْدَ وَفَاتِهِ فَوَضَعَ فَمَهُ بَيْنَ عَيْنَيْهِ وَوَضَعَ يَدَيْهِ عَلَى سَاعِدَيْهِ ، وَقَالَ : وَانَبِيَّاهُ ، وَاصَفِيَّاهُ ، وَاخَلِيْلَاهُ
৩০০. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ এর ওফাতের পর আবু বকর (রাঃ) তাঁর নিকট এসে তাঁর দুই চোখের মাঝখানে মুখ লাগিয়ে চুম্বন করেন এবং তাঁর বাহুতে দু'হাত রেখে বলেন, হায় নবী! হায় অন্তরঙ্গ বন্ধু! হায় বন্ধু!৩০২
ব্যাখ্যা: আবু বকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর কপালে দু'চোখের মাঝখানে চুম্বন করেছেন। সাহাবী উসমান ইবনে মাযউনের ইন্তেকালের পর রাসূলুল্লাহ তাঁকে চুম্বন করেছেন। এতে বুঝা যায়, মৃত ব্যক্তিকে চুম্বন করা জায়েয।
রাসূলুল্লাহর এর মৃত্যুতে সাহাবীদের কাছে সবকিছু অন্ধকার মনে হচ্ছিল:
عَنْ أَنَسٍ هِ قَالَ : لَمَّا كَانَ الْيَوْمُ الَّذِي دَخَلَ فِيْهِ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ الْمَدِينَةَ أَضَاءَ مِنْهَا كُلُّ شَيْءٍ ، فَلَمَّا كَانَ الْيَوْمُ الَّذِي مَاتَ فِيْهِ أَظْلَمَ مِنْهَا كُلُّ شَيْءٍ ، وَمَا نَفَضْنَا أَيْدِيَنَا مِنَ التُّرَابِ . وَإِنَّا لَفِي دَفْنِهِ ﷺ حَتَّى أَنْكَرْنَا قُلُوبَنَا
৩০১. আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ যেদিন মদিনায় প্রবেশ করছিলেন, সেদিন সেখানকার প্রতিটি জিনিস আলোকোজ্জল হয়ে পড়েছিল। অতঃপর যেদিন তিনি ইন্তেকাল করেন, সেদিন আবার তথাকার প্রতিটি জিনিস অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। আমরা তাঁর দাফনকার্য শেষ করে কবরের মাটি থেকে হাত ঝাড়া না দিতেই আমাদের অন্তরে পরিবর্তন অনুভব করলাম।৩০৩
ব্যাখ্যা: এ বক্তব্যের অর্থ, এটা নয় যে, সাহাবীদের আমল ও আক্বীদার মাঝে পরিবর্তন হয়ে গেছে; বরং উদ্দেশ্য হলো, তারা রাসূলুল্লাহ এর সান্নিধ্যে অন্তরে প্রশান্তি লাভ করতেন, সে বিশেষ অবস্থার পরিবর্তন অনুভব করেছেন।
রাসূলুল্লাহ সোমবারের দিন ইন্তেকাল করেন:
عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ : تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ
৩০২. আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সোমবারের দিন ইন্তেকাল করেন। ৩০০৪
মঙ্গলবারের দিন রাতে তাঁকে দাফন করা হয়:
عَنْ جَعْفَرِ بْنِ مُحَمَّدٍ ، عَنْ أَبِيهِ قَالَ : قُبِضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ فَمَكَثَ ذَلِكَ الْيَوْمَ وَلَيْلَةَ الثَّلَاثَاءِ ، وَدُفِنَ مِنَ اللَّيْلِ
৩০৩. জা'ফর ইবনে মুহাম্মদ (রহঃ) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সোমবারে ইন্তেকাল করেন। সোমবার ও মঙ্গলবার দাফন-কাফনের প্রস্তুতিতেই চলে যায়। অতঃপর মঙ্গলবার দিবাগত রাতে তাঁকে দাফন করা হয়।
রাসূলুল্লাহ এর মৃত্যু ও আবু বকর (রাঃ) এর বাইয়াত গ্রহণ:
عَنْ سَالِمِ بْنِ عُبَيْدٍ ، وَكَانَتْ لَهُ صُحْبَةٌ قَالَ : أُغْنِيَ عَلَى رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ فِي مَرَضِهِ فَأَفَاقَ ، فَقَالَ : حَضَرَتِ الصَّلَاةُ؟ فَقَالُوا : نَعَمْ . فَقَالَ : مُرُوا بِلَالًا فَلْيُؤَذِّنُ ، وَمُرُوا أَبَا بَكْرٍ أَنْ تُصَلِّيَ النَّاسِ أَوْ قَالَ : بِالنَّاسِ قَالَ : ثُمَّ أُغْنِيَ عَلَيْهِ ، فَأَفَاقَ ، فَقَالَ : حَضَرَتِ الصَّلَاةُ ؟ فَقَالُوا : نَعَمْ ، فَقَالَ : مُرُوا بِلَالًا فَلْيُؤَذِّنُ ، وَمُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِ بِالنَّاسِ ، فَقَالَتْ عَائِشَةُ : إِنَّ أَبِي رَجُلٌ أَسِيفٌ . إِذَا قَامَ ذَلِكَ الْمَقَامَ بَكَى فَلَا يَسْتَطِيعُ ، فَلَوْ اَمَرْتَ غَيْرَهُ قَالَ : ثُمَّ أُغْنِيَ عَلَيْهِ فَأَفَاقَ فَقَالَ : مُرُوا بِلَالًا فَلْيُؤَذِّنُ ، وَمُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِ بِالنَّاسِ ، فَإِنَّكُنَّ صَوَاحِبُ أَوْ صَوَاحِبَاتُ يُوسُفَ . قَالَ : فَأُمِرَ بِلَالٌ فَأَذَّنَ ، وَأُمِرَ أَبُو بَكْرٍ فَصَلَّى بِالنَّاسِ ، ثُمَّ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ وَجَدَ خِفَةً ، فَقَالَ : انْظُرُوا لِي مَنْ أَتَّكِئِ عَلَيْهِ ، فَجَاءَتْ بَرِيرَةُ وَرَجُلٌ أَخَرُ ، فَاتَّكَا عَلَيْهِمَا فَلَمَّا رَأَهُ أَبُو بَكْرٍ ذَهَبَ لِينْكُصَ فَأَوْمَا إِلَيْهِ أَنْ يَثْبُتَ مَكَانَهُ ، حَتَّى قَضَى أَبُو بَكْرٍ صَلَاتَهُ ، ثُمَّ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قُبِضَ ، فَقَالَ عُمَرُ : وَاللَّهِ لَا أَسْمَعُ أَحَدًا يَذْكُرُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قُبِضَ إِلَّا ضَرَبْتُهُ بِسَيْفِي هُذَا قَالَ : وَكَانَ النَّاسُ أُمِيْنَ لَمْ يَكُنْ فِيْهِمْ نَبِيٌّ قَبْلَهُ ، فَأَمْسَكَ النَّاسُ ، فَقَالُوا : يَا سَالِمُ ، انْطَلِقُ إِلَى صَاحِبِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَادْعُهُ ، فَأَتَيْتُ أَبَا بَكْرٍ وَهُوَ فِي الْمَسْجِدِ فَأَتَيْتُهُ أَبْكِي دَهِشًا ، فَلَمَّا رَانِي
قَالَ : أَقُبِضَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ؟ قُلْتُ : إِنَّ عُمَرَ يَقُولُ : لَا اَسْمَعُ أَحَدًا يَذْكُرُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قُبِضَ إِلَّا ضَرَبْتُهُ بِسَيْفِي هَذَا ، فَقَالَ لِي : انْطَلِقُ ، فَانْطَلَقْتُ مَعَهُ ، فَجَاءَ هُوَ وَالنَّاسُ قَدْ دَخَلُوا عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فَقَالَ : يَا أَيُّهَا النَّاسُ ، أَفْرِجُوا لِي ، فَأَخْرَجُوا لَهُ فَجَاءَ حَتَّى أَكَبَّ عَلَيْهِ وَمَسَّهُ ، فَقَالَ : ﴿إِنَّكَ مَيِّتٌ وَإِنَّهُمْ مَيِّتُونَ﴾ ثُمَّ قَالُوا : يَا صَاحِبَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ، أَقُبِضَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ ؟ قَالَ : نَعَمْ ، فَعَلِمُوا أَنْ قَدْ صَدَقَ ، قَالُوا : يَا صَاحِبَ رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ أَيُصَلَّى عَلَى رَسُولِ اللَّهِ ؟ قَالَ : نَعَمْ ، قَالُوا : وَكَيْفَ ؟ قَالَ : يَدْخُلُ قَوْمٌ فَيُكَبِّرُونَ وَيُصَلُّونَ وَيَدْعُوْنَ . ثُمَّ يَخْرُجُونَ ، ثُمَّ يَدْخُلُ قَوْمٌ فَيُكَبِّرُونَ وَيُصَلُّونَ وَيَدْعُوْنَ ، ثُمَّ يَخْرُجُونَ ، حَتَّى يَدْخُلَ النَّاسُ ، قَالُوا : يَا صَاحِبَ رَسُولِ اللهِ ﷺ ، أَيْدُ فَنُ رَسُولُ اللهِ ﷺ ؟ قَالَ : نَعَمْ ، قَالُوا : أَيْنَ ؟ قَالَ : فِي الْمَكَانِ الَّذِي قَبَضَ اللَّهُ فِيهِ رُوحَهُ . فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَقْبِضُ رُوْحَهُ إِلَّا فِي مَكَانٍ طَيِّبٍ . فَعَلِمُوا أَنْ قَدْ صَدَقَ ، ثُمَّ أَمَرَهُمْ أَنْ يَغْسِلَهُ بَنُو أَبِيْهِ وَاجْتَمَعَ الْمُهَاجِرُونَ يَتَشَاوَرُونَ ، فَقَالُوا : انْطَلِقُ بِنَا إِلَى إِخْوَانِنَا مِنَ الْأَنْصَارِ نُدْخِلُهُمْ مَعَنَا فِي هُذَا الْأَمْرِ ، فَقَالَتِ الْأَنْصَارُ : مِنَّا أَمِيرٌ وَمِنْكُمْ أَمِيرٌ ، فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ : مَنْ لَهُ مِثْلُ هُذِهِ الثَّلَاثِ ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا "দু'জনের একজন যখন তারা ছিল গুহার মধ্যে, যখন সে তার সাথিকে বলল, বিচলিত হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।"৩০৬ কারা ছিলেন সে দু'জন? বর্ণনাকারী বলেন, তারপর উমর (রাঃ) তাঁর হাত প্রসারিত করে দিয়ে আবু বকর (রাঃ)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। তারপর লোকেরাও তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করেন। ৩০৭
রাসূলুল্লাহ এর মৃত্যুতে ফাতিমা (রাঃ) এর ক্রন্দন:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ﷺ قَالَ : لَمَّا وَجَدَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مِنْ كُرَبِ الْمَوْتِ مَا وَجَدَ ، قَالَتْ فَاطِمَةُ : وَا كَرْبَاهُ ، فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ : لَا كَرْبَ عَلَى أَبِيْكِ بَعْدَ الْيَوْمِ ، إِنَّهُ قَدْ حَضَرَ مِنْ أَبِيْكِ مَا لَيْسَ بِتَارِكِ مِنْهُ أَحَدًا الْمُوَافَاةُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
৩০৫. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন মৃত্যুর কষ্ট ভোগ করছিলেন, তখন ফাতেমা (রাঃ) বললেন, হায়! আমার আব্বার কতই না কষ্ট হচ্ছে! রাসূলুল্লাহ বলেন, আজকের পর তোমার পিতার আর কোন কষ্ট থাকবে না। তোমার পিতার নিকট মৃত্যু নামক এমন এক বিষয় উপস্থিত হয়েছে, যা থেকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত কেউ রেহাই পাবে না।৩০৮
টিকাঃ
২৯৮ সহীহ বুখারী, হা/৬৮০; সহীহ মুসলিম, হা/৯৭১; ইবনে মাজাহ, হা/১৬২৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/১২০৯৩; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬৮৭৫; বায়হাকী, হা/৪৮২৫; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৮২৪; মুসনাদে হুমাইদী, হা/১২৪১।
২৯৯ ইবনে খুযাইমা, হা/৬৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৬২৬; মুসনাদে আবু 'আওয়ানা, হা/৫৭৫০।
৩০০ শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৮৩২;।
১০০১ সহীহ বুখারী, হা/৪৪৫৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৪৫৭; সুনানে নাসাঈ, হা/১৮৪০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২০২৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩০২৯; মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইba, হা/১২১৯৫।
৩০২ মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪০৭৫; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/৪৮।
৩০৩ ইবনে মাজাহ, হা/১৬৩১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৩৮৫৭; মুসনাদুল বাযযার, হা/৬৮৭১; মুসনানে আবু ই'আলা, হা/৩২৯৬; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৮৩৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬৬৩৪; মুসনাদুত তায়ালুসী, হা/১৪০৫।
৩০৪ মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪৮৩৪।
৩০৬ সূরা তাওবা- ৪০।
৩০৭ সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৭০৮১; সুনanul কুবরা লিত তাবারানী, হা/৬২৪৩।
৩০৮ ইবনে মাজাহ, হা/১৬২৯।