📄 ফিজার যুদ্ধে মহানবী (স)-এর অংশগ্রহণ
দীন ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্ব পর্যন্ত আরবজাহানে অব্যাহতভাবে যেসব যুদ্ধ চলিয়া আসিতেছিল তাহার মধ্যে 'হারবুল ফিজার' বা ফিজার যুদ্ধ ছিল সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও ভয়ংকর। 'হারব' শব্দের অর্থ যুদ্ধ এবং 'ফিজার' শব্দের অর্থ সত্য পথ ত্যাগ করিয়া বিপথে গমন। জাহিলী যুগেও আরবদের মধ্যে মুহাররম, রজব, যুল-কা'দা ও যুল-হিজ্জা এই মাস চতুষ্টয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ থাকিত। এই চারিটি মাস তাহাদের নিকট নিষিদ্ধ মাস হিসাবে অত্যন্ত পবিত্র ছিল। এসব মাসে যুদ্ধ করা ছিল তাহাদের নিকট মহাপাপ (ফুজুর)। আলোচ্য যুদ্ধ নিষিদ্ধ মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ায় তাহারা ইহার নামকরণ করে 'হারবুল ফিজার' (পাপের যুদ্ধ, অন্যায় যুদ্ধ)। বিভিন্ন কারণে এই যুদ্ধ চারবার অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ফিজার যুদ্ধ বানু কিনানা ও বানু হাওয়াযিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়, তখন নবী (স)-এর বয়স ছিল দশ বৎসর। দ্বিতীয় ফিজার যুদ্ধ কুরায়শ ও হাওয়াযিন গোত্রের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়, তৃতীয় ফিজার যুদ্ধ কিনানা ও হাওয়াযিন গোত্রের মধ্যে এবং চতুর্থ ফিজার যুদ্ধ কুরায়শ ও কায়স আয়লান গোত্রের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় (হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স), সমকালীন পরিবেশ, পৃ. ১৯৬, টীকা ১)।
চতুর্থ ফিজার যুদ্ধেই মহানবী (স) তাঁহার পিতৃব্যদের সহিত কোন কোন দিন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন (ইবন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৯১)। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে এই যুদ্ধ সম্পর্কেই আলোচনা করা হইবে। আবরাহার হস্তীবাহিনী ধ্বংসের পর এই যুদ্ধই ছিল সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ঘটনা (শিবলীর সীরাতুন্নবী, ১খ, পৃ. ৯৩)। ইবন ইসহাক, ইবন সা'দ, বালাযুরী ও ইবন জারীর তাবারীর মতে এই যুদ্ধ বিশ হস্তী বৎসরে সংঘটিত হয় (সীরাতে সারওয়ারে আলম, ১খ, পৃ. ১০৯)। ইবন হিশামের মতে তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর বয়স ১৪/১৫ বৎসর (সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ, পৃ. ১৮৯) এবং ইবন ইসহাকের মতে ২০ বৎসর (ঐ গ্রন্থ, ১খ, পৃ. ১৯১))। এই যুদ্ধের এক পক্ষে ছিল কিনানা-গোত্র ও কুরায়শ গোত্র এবং অপর পক্ষে ছিল কায়স আয়লান গোত্র (ছাকীফ ও হাওয়াযিন গোত্রদ্বয়সহ)। কুরায়শ গোত্রের সকল উপগোত্র স্বতন্ত্রভাবে নিজ নিজ বাহিনী গঠন করে। হাশিম উপগোত্রের সামরিক পতাকা বহন করেন যুবায়র ইব্ন আবদুল মুত্তালিব এবং রাসূলুল্লাহ (স) এই বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কুরায়শ পক্ষের প্রধান সেনাপতি ছিল আবূ সুফ্যান (রা)-র পিতা হারব ইবন উমায়্যা (সীরাতুন-নবী, ১খ, পৃ. ১১৪)।
একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া এই যুদ্ধের সূচনা হয়। হিরা-অধিপতি নু'মান ইব্ন মুনযির প্রতি বৎসর 'উকাযের মেলায় নিজের ব্যবসায়িক পণ্যসামগ্রী প্রেরণ করিত। যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার বৎসর হাওয়াযিন গোত্রের 'উরওয়া আর-রাহহাল নামক এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি নু'মানের পণ্যসম্ভার 'উকাযের মেলায় পৌঁছানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে। ইহাতে কিনানা গোত্রের বাররাদ ইব্ন কায়স নামক এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ক্ষিপ্ত হইয়া তাহাকে বলিল, কিনানা গোত্র বর্তমান থাকিতে তুমি তাহাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়াছ। তোমার পিতা তোমাকে তাড়াইয়া দিয়াছে, তুমি স্বগোত্রের বিতাড়িত কুকুর। তুমি আবার এত বড় কাজের ভার গ্রহণ করিতে চাও! এই কাজ আমিই করিব। ইহার উত্তরে 'উরওয়া বলিল, হাঁ, গোটা পৃথিবীর বিরুদ্ধে হইলেও আমি এই দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছি। ইহাতে বাররাদ ক্রোধান্বিত হইয়া তাহাকে হত্যা করিবার সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। অবশেষে সুযোগমত সে উরওয়াকে নাজদের উচ্চভূমি তায়মান যী-তালাল নামক এলাকায় হত্যা করে। কুরায়শগণ 'উকাযের মেলায় উপস্থিত থাকা অবস্থায় তাহাদের নিকট 'উরওয়ার নিহত হওয়ার খবর পৌঁছায়। তাহারা তৎক্ষণাৎ হারাম এলাকার দিকে রওয়ানা হয়, কিন্তু হারামের সীমানায় পৌঁছার পূর্বেই হাওয়াযিন গোত্র তাহাদের নাগাল পায় এবং দিনভর যুদ্ধ চলিতে থাকে। রাত্রিবেলা কুরায়শরা হারাম এলাকার সীমার মধ্যে পৌঁছিয়া যায় এবং হাওয়াযিন গোত্র যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত হয়। অতঃপর কয়েক দিন ধরিয়া যুদ্ধ চলিতে থাকে। ইব্ন কাছীর (র) বর্ণনা করেন যে, একাধারে চার দিন যুদ্ধ চলে। 'উকায এলাকায় সংঘটিত দুই দিনের যুদ্ধ ইয়াওমু শামতাহ ও ইয়াওমুল আবলা নামে অভিহিত। তৃতীয় দিনের যুদ্ধ ইয়াওমুশ শুরব নামে অভিহিত এবং এই দিন রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। চতুর্থ দিন বাতনে নাখলা নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধ ইয়াওমুল হারীরাহ নামে অভিহিত (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯০)। এই যুদ্ধ চলাকালে মহানবী (স) যুদ্ধে যোগদানের বয়সে পৌঁছিলেও তিনি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই এবং কাহাকেও আঘাত করেন নাই। এই সম্পর্কে মহানবী (স) বলেনঃ
কুনতু উনাব্বিলু আলা আমামিয়্যা আন আরুদ্দা আনহুম নাবালা আদুবিহিম বিহা
"দুশমনদের নিক্ষিপ্ত তীর আমি কুড়াইয়া আনিয়া আমার পিতৃব্যদের হাতে দিতাম" (ইব্ন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৯১)।
ইবন সা'দের বর্ণনায় আছে, পরবর্তী কালে রাসূলুল্লাহ (স) বলিতেন, আমি যদি এতটুকু অংশগ্রহণও না-করিতাম তবে তাহাই উত্তম ছিল (আত-তাবাস্কাতুল কুবরা, ১খ, পৃ. ১২৮)। চূড়ান্ত যুদ্ধের দিন প্রথম দিকে কায়স গোত্র এবং দিনের শেষভাগে কুরায়শ গোত্র যুদ্ধে জয়লাভ করে। অতঃপর উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হওয়ার ফলে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে (শিবলীর সীরাতুন-নবী, ১খ, পৃ. ১১৪)। মহানবী (স) তাঁহার নবুওয়াত লাভের পর তাঁহার সেনাপতিত্বে পরিচালিত যুদ্ধসমূহ (গাওয়া) ছাড়া ইতোপূর্বে কেবল এই ফিজার যুদ্ধে নামমাত্র অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা তাঁহার ছিল না। ইহার দ্বারা একদিকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা জাহিলী যুদ্ধসমূহে অংশগ্রহণ হইতে তাঁহাকে বিরত রাখেন, অপরদিকে ইসলামী যুগের যুদ্ধসমূহে তিনি যে অসম বীরত্ব ও বিচক্ষণতার স্বাক্ষর রাখেন তাহাও ছিল সম্পূর্ণ আল্লাহ প্রদত্ত। তিনি পেশাদার সিপাহসালার ছিলেন না, ছিলেন জন্মগতভাবেই সিপাহসালার (সীরাতে সারওয়ারে আলম, ২খ, পৃ. ১০৭)।
টিকাঃ
১. ইব্ন হিশাম, আস সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, আল-মাকতাবাতুত তাওফীকিয়্যা, আল-আযহার, ১খ, পৃ. ১৮৯-৯১;
২. ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, দারু সাদির, বৈরূত তা.বি, ১খ, পৃ. ১২৬-২৯;
৩. আবদুর রহমান আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, আবদুর রহমান আল-ওয়াকীল সম্পা. ১ম সং, বৈরূত ১৪১২/১৯৯২, ২খ, পৃ. ২২৯-৩০;
৪. ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দারুল ফিকার আল-আরাবী, বৈরূত তা.বি, ২খ, পৃ. ২৮৯-৯০;
৫. শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, করাচী ১৯৮৪ খ., ১খ, পৃ. ১১৪-৫;
৬. মাওলানা ইদরীস কান্ধলাবী, সীরাতুল মুসতাফা, ১ম সং, দিল্লী ১৯৮১ খৃ. ১খ, পৃ. ৯৩;
৭. সায়্যিদ আবুল আ'লা মওদূদী, সীরাতে সারওয়ারে আলম, ৩য় সং, দিল্লী ১৯৮১ খৃ., ২খ, পৃ. ১১০-১১৮;
৮. শায়খুল হাদীছ মাওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (স)ঃ সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, ১ম সং, ঢাকা ১৪১৯/১৯৯৮, পৃ. ১৯৫-৮;
৯. মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, হায়াতে মুহাম্মাদ (স), মিসর তা.বি, পৃ. ৭৭-৭৯;
১০. ইয়াকৃত আল-হামাবী, মু'জামুল বুলদান, বৈরূত তা.বি, ২খ, পৃ. ৬৮ (শুধু তায়মান যীল-তালাল নামক স্থানের জন্য)।
📄 হিলফুল ফুযূল
হিলফুল ফুযূল )حلف الفضول(-এর হিল্ল্ফ শব্দটির উচ্চারণ হিল্ল্ফ, অর্থ পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যের অংগীকার (ইবন মানজুর, লিসানুল আরাব, ২খ, পৃ. ৯৬৩)। সুদূর অতীতে আল-ফাদল নামক কয়েকজন শান্তিপ্রিয় লোকের উদ্যোগে হিজাযে, বিশেষত মক্কা মুআজ্জমায় সামাজিক শান্তি-শৃংখলা ও জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহাই ইতিহাসে হিলফুল ফুযূল নামে প্রসিদ্ধ। আল-ফুদায়ল ইব্ন হারিছ আল-জুরহুমী, আল-ফুদায়ল ইব্ন ওয়াদা'আ আল-কাতৃরী ও আল-মুফাদ্দাল ইব্ন ফাদালা আল-জুরহুমী একতাবদ্ধ হইয়া এই মর্মে অঙ্গীকার করেন যে, তাহারা মক্কায় কোনও স্বৈরাচারী যালিমকে অবস্থান করিতে দিবে না। তাহারা আরও বলেন যে, আল্লাহ মক্কাকে যেই মর্যাদা ও মহিমা দান করিয়াছেন, তাহাতে এইরূপই হওয়া উচিৎ (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৫৭০)। ইন্ন কুতায়বার মতে তাহাদের তিনজনেরই নাম ছিল আল-ফাদল (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯২)। হিলয়াতুল আওলিয়া গ্রন্থেও তাহাদের এই নাম উল্লিখিত হইয়াছে, কিন্তু তাহাদের পিতার নাম পর্যায়ক্রমে শারা'আ, বিদা'আ ও কাদা'আ বলা হইয়াছে (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯৩)। সুহায়লী ফাদল ইব্ন বিদা'আর স্থলে ফাদল ইব্ন ওয়াদা'আ উল্লেখ করিয়াছেন। কোন কোন বর্ণনায় কেবল ফাদল ইন্ন শারাআ ও ফadল ইব্ন কাদাআর উল্লেখ আছে, তৃতীয় ব্যক্তির উল্লেখ নাই (পৃ. গ্র. ২খ, পৃ. ২৯৩, টীকা ১)। এই সংঘ মহানবী (স)-এর আবির্ভাবের কত যুগ পূর্বে গঠিত হইয়াছিল তাহা কোন ঐতিহাসিক তথ্যে পাওয়া যায় না। কালের প্রবাহে আরবদের মধ্যে শুধু ইহার নামটিই স্মরণীয় হইয়া থাকে।
আরব গোত্রসমূহের মধ্যে অব্যাহত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ব্যাপক হানাহানির ফলে, বিশেষ করিয়া ফিজার যুদ্ধে বহু সংখ্যক জীবনহানি ঘটিলে এবং সামাজিক শান্তি-শৃংখলা ও জনজীবনে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইলে কিছু সংখ্যক লোকের মনে হিলফুল ফুযূলের কথা জাগ্রত হয় এবং সামাজিক নিরাপত্তা বহাল করার জন্য উক্ত সংঘের পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। সুতরাং মহানবী (স)-এর পিতৃব্য যুবায়র ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের অনুপ্রেরণায় বানু হাশিম, বানুল মুত্তালিব, বানু আসাদ ইব্ন আবদিল 'উয্যা, বানু যুহরা ইন কিলাব ও বানু তায়ম ইন্ন মুররা আবদুলজ্জাহ্ ইব্ন জুদ'আনের বাড়িতে সমবেত হইয়া ফিজার যুদ্ধের চারি বৎসর পর মহানবী (স)-এর নবুওয়াত লাভের বিশ বৎসর পূর্বে যুল-কা'দা মার্সে'হিলফুল ফুযূল' 'নামক সেবাসংঘ পুনর্গঠিত করে। ইহা আরবদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ও প্রসিদ্ধ চুক্তি হিসাবে বিবেচিত ছিল (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ, পৃ. ১৩৯-৪০; বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৭০; তাবাকাত ইবন সা'দ, ১খ, পৃ. ১২৮)। যুবায়র ইবন আবদুল মুত্তালিব তাহার কবিতায় এই সম্পর্কে বলেন:
ইন্নাল ফুদূলা তাহালাফূ ওয়া তাহাকামূ ওয়া তাআকাদূ ইন্নাল লা ইউকাররু বি বাতনি মাক্কাতা জালিমুন আমরিহী তাআহাদূ ওয়া তাওয়াফাকু ফাআ জারূনা ওয়া মু'তারিফূ বিহিম সালিমুন।
"ফযলেরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইল যে, মক্কায় কোন অত্যাচারীর ঠাঁই হইবে না। এই বিষয়ে তাহারা দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হইল যে, এখানে মক্কাবাসী ও বহিরাগত সকলে নিরাপদ থাকিবে"।
মহানবী (স)-ও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তখন তাঁহার বয়স বিশ বৎসর (তাবাকাত, ১খ, পৃ. ১২৮)। নবুওয়াত প্রাপ্তির এক সময় তিনি এই সম্পর্কে বলেনঃ
লাক্বাদ শাহিতু মা'আ উমূমাতী হিলফান ফী দরি আব্দিল্লাহ ইবন জুদ'আন মা উহিব্বু আন্নাল্লি বিহী হুমারান নি'আম ওয়ালও দু'ঈতু বিহী ফিল ইসলামি লাআজাবতু।
"আবদুল্লাহ ইব্ন জুদআনের গৃহে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠানে আমি আমার পিতৃব্যগণের সহিত অংশগ্রহণ করিয়াছি। তাহার বিনিময়ে আমাকে লাল বর্ণের উস্ত্রী প্রদান করা হইলেও আমি উহাতে সন্তুষ্ট হইব না। ইসলামী সমাজেও যদি কেহ আমাকে উহার দোহাই দিয়া ডাকে তবে আমি অবশ্যই সাড়া দিব" (মুসতাদরাক হাকেম, ২খ, পৃ. ২২০; মুসনাদে আহমাদ ১খ, পৃ. ১৯০, ১৯৪, নং)।
এই সংঘের নামকরণ সম্পর্কে বলা হইয়া থাকে যে, আদি যুগে যাহাদের উদ্যোগে ইহা গঠিত হইয়াছিল তাহাদের সকলের নামের ধাতুমূল ছিল ফা-দ-ল (ফাদল) এবং ইহা হইতেই হিলফুল ফুযূল (ফুদূল) নামকরণ করা হইয়াছে। কিন্তু ইব্ন হিশাম এই সংঘ গঠনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশগ্রহণ সংক্রান্ত হাদীছের উল্লেখ করিয়া বলেন যে, তাঁহারা প্রাপকের মাল (আল-ফুদূল) তাহাকে ফেরত প্রদানের অঙ্গীকার করিয়াছিলেন বিধায় ইহার নাম হিলফুল ফুযূল হইয়াছে। আল-হারিছ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন আবূ উসামা আল-মায়মীর আল-মুসনাদ গ্রন্থে হাদীছের শেষাংশ নিম্নরূপঃ
তা হালাফূ আন তুরদ্দাল ফুযূলা আলা আহলিহা ওয়াল্লা ইউ'আদ্দু জালিমুন মাযলূমান।
"তাহারা অঙ্গীকার করে যে, তাহারা (জোরপূর্বক ছিনাইয়া লওয়া) 'ফুদূল" (মাল) ইহার প্রাপককে প্রত্যর্পণ করিবে এবং যালেম যেন মজলুমের উপর বাড়াবাড়ি করিতে না পারে" (সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ, পৃ. ১৩৯)। ইন্ন হিশাম এই ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দিয়াছেন।
হিলফুল ফুযূলের প্রতিজ্ঞাসমূহ নিম্নরূপঃ
১) আমরা দেশ হইতে অশান্তি দূর করিব;
২) আমরা বহিরাগতদেরকে রক্ষা করিব;
৩) আমরা নিঃস্বদিগকে সাহায্য করিব;
৪) আমরা শক্তিহীনদের উপর শক্তিমানদের অত্যাচার প্রতিহত করিব (রাহমাতুল্লিল আলামীন, পৃ. ৪৩)।
এই সেবাসংঘের প্রচেষ্টায় সমাজে অত্যাচার-অবিচার বহুলাংশে হ্রাস পায়, মানুষের যাতায়াত নিরাপদ হয়। ইসলাম-পূর্ব যুগে একদা খাছ'আম গোত্রীয় জনৈক ব্যক্তি তাহার পরমা সুন্দরী কন্যাসহ হজ্জ অথবা উমরা করার উদ্দেশে মক্কায় আগমন করিলে নুবায়হ ইব্ন হাজ্জাজ নামক এক দুর্বৃত্ত জোরপূর্বক তাহার কন্যাকে অপহরণ করে। সে সাহায্যের আহবান জানাইলে জনতা তাহাকে বলিল, তুমি হিলফুল ফুযূলের সদস্যবৃন্দকে জানাও। তখন সে কা'বা ঘরের নিকটে দাঁড়াইয়া উচ্চস্বরে ডাকিতে লাগিল, হে হিলফুল ফুযূল। এই ডাক শুনিয়া চতুর্দিক হইতে সেবকগণ উলঙ্গ তরবারি হাতে লইয়া দৌড়াইয়া আসিয়া তাহার বিপদের কথা জিজ্ঞাসা করিল। ঘটনার বিবরণ শুনিয়া তাহারা নুবায়হ-এর বাড়িতে পৌঁছিয়া তাহার কন্যাকে উদ্ধার করিয়া আনে (বিদায়া, ২খ)।
এই প্রসঙ্গে আরও একটি ঘটনার উল্লেখ আছে। যুবায়দ গোত্রের এক ব্যক্তি তাহার পণ্যসামগ্রী লইয়া মক্কায় পৌছিয়া তাহা আস ইব্ন ওয়াইল-এর নিকট বিক্রয় করে। কিন্তু সে তাহার পণ্যদ্রব্যের মূল্য প্রদান না করিয়া তাহা আত্মসাৎ করে। উপায়ান্তর না দেখিয়া যুবায়দী হিলফুল ফুযূলভুক্ত গোত্রসমূহে উপস্থিত হইয়া তাহাদের সাহায্য প্রার্থনা করে, কিন্তু তাহারা তাহাকে সহায়তা করিতে অসম্মতি প্রকাশ করে। যুবায়দী অনিষ্ট আশংকা করিয়া সূর্যোদয়কালে আবূ কুবায়স পাহাড়ের চূড়ায় উঠিয়া উচ্চস্বরে ডাক দিয়া তাহার সর্বস্ব অপহরণের ঘটনা বিবৃত করিয়া সাহায্য প্রার্থনা করে। এই সময় কুরায়শরা তাহাদের সম্মেলন স্থলে (নাদওয়া) উপস্থিত ছিল। এই ডাক শুনিয়া যুবায়র ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের আহ্বানে আবদুল্লাহ ইব্ন জুদআনের গৃহে পূর্বোক্ত গোত্রসমূহ একত্র হইয়া হিলফুল ফুযূল গঠন করে, অতঃপর সংঘবদ্ধভাবে 'আস ইব্ন ওয়াইলের গৃহে উপস্থিত হইয়া যুবায়দীর মালপত্র উদ্ধার করিয়া দেয় (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯১-২)।
এই আবদুল্লাহ্ ইব্ন জুদআন সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন আইশা (রা)-র চাচাত ভাই। একদা তিনি নবী (স)-কে বলিলেন, সে খুব অতিথিপরায়ণ ছিল এবং জনগণকে পানাহার করাইত। কিয়ামতের দিন ইহা তাহার কোন উপকারে আসিবে কিনা? মহানবী (স) বলিলেনঃ না। কেননা সে কোন দিনও এই কথা বলে নাই:
রব্বি ইগফিরলী খাতীআতী ইয়াওমাদ্দীন।
"প্রভু! কিয়ামতের দিন আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন" (মুসলিম, বাংলা অনু, ঈমান, বাবঃ যে কুফরী অবস্থায় মারা যায় তাহার কোন আমল তাহার উপকারে আসিবে না, নং ৪০৯, ১খ, পৃ. ৪০৩)।
এই হিলফুল ফুযূল ইসলামের প্রাথমিক কাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল, কিন্তু ইহার প্রেরণা ও কার্যকরী শক্তি অনেকটা নিষ্প্রভ হইয়া পড়ে। জনগণের ইসলাম গ্রহণের পর এই সংঘের আর প্রয়োজন রহিল না। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তাহাদের জান-মালের নিরাপত্তা লাভ করে, দেশে শান্তি-শৃংখলা ফিরিয়া আসে এবং সবলেরা দুর্বলদের অত্যাচার করার পরিবর্তে সাহায্য-সহযোগিতায় আগাইয়া আসে। তাই মুসলিম সমাজে এই জাতীয় সংঘ গঠনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ফকীহগণের দুইটি বিপরীত মত লক্ষ্য করা যায়। একদল বিশেষজ্ঞ বলিয়াছেন যে, সাহায্যের মুখাপেক্ষী ব্যক্তি ইসলামের নামেই সাহায্য প্রার্থনা করিবে, কোন সংঘের দোহাই দিয়া নহে। কারণ ইহার মধ্যে জাহিলী যুগের পক্ষপাতমূলক উপাদান (তাআসসুব) বিদ্যামান। মুরায়সি' যুদ্ধকালে সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া দুই ব্যক্তির মধ্যে বিবাদ বাধিলে আনসার ব্যক্তি তাহার সহায়তার জন্য আনসারদিগকে এবং মুহাজির ব্যক্তি তাহার সহায়তার জন্য মুহাজিরদেরকে আহবান করিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) এই ডাক শুনিয়া বলিলেনঃ ইহা ত্যাগ কর, কেননা ইহা দুর্গন্ধময়। তিনি ইহাকে জাহিলী যুগের ডাক হিসাবে আখ্যায়িত করেন (রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৮১)। মুমিনগণকে আল্লাহ তা'আলা পরস্পর ভাই হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছেন (দ্র. ৪৯৪ ১০)। তাই হযরত 'উমার (রা) যেভাবে আহ্বান করিয়াছেন (ইয়া লিল্লাহ, ওয়া ইয়া লিল-মুসলিমীন"), সেভাবেই আহ্বান করিতে হইবে। কারণ তাঁহারা সকলে মিলিয়া একটি দল (রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৮২)।
অপর দলের মতে হিলফুল ফুযূলের বৈধতা এখনও বিদ্যমান। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পূর্বোক্ত হাদীছ )دعيت به اليوم لأجبت( ইহার প্রমাণ। তাঁহার কথার অর্থ ছিল, যদি কোন অত্যাচারিত ব্যক্তি হিলফুল ফুযূলের সদস্যগণকে সাহায্যের জন্য আহবান করে তবে আমি অবশ্যই তাহার ডাকে সাড়া দিব (আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৮২)। কেননা সত্যের প্রতিষ্ঠা করিতে এবং নির্যাতিতের সাহায্য করিতে ইসলামের অভ্যুদয় হইয়াছে। অতএব উক্ত সংঘ দ্বারা তাহার শক্তিই বর্দ্ধিত হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) জাহিলী যুগের গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ-সংঘাতে শত্রু পক্ষের বিরুদ্ধে মিত্র (হালীফ) পক্ষকে সহায়তা করার সংঘ অবৈধ ঘোষণা করিয়াছেন। ইসলাম কেবল এই জাতীয় জাহিলী আহবানকে নিষিদ্ধ করিয়াছে। অন্যথায় হিলফুল ফুযূলের আবেদন এখনও অবশিষ্ট আছে (আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৮২)। হুসায়ন ইব্ন আলী (রা)-র একটি ঘটনা হইতেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। যুল-মারওয়া নামক স্থানে (ওয়াদিল কুরার একটি গ্রাম; মু'জামুল বুলদান, ৫খ, পৃ. ১১৬) তাঁহার ও ওলীদ ইব্ন উৎবা ইব্ন আবূ সুফ্যানের একটি যৌথ সম্পত্তি ছিল এবং ইহাকে কেন্দ্র করিয়া তাহাদের মধ্যে বিবাদ বাধে। ওলীদ তখন আমীর মু'আবিয়া (রা)-র পক্ষ হইতে মদীনার গভর্নর ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছত্রছায়ায় হুসায়ন (রা)-কে বঞ্চিত করিয়া সম্পত্তি নিজে করায়ত্ত করেন। হুসায়ন (রা) তাহাকে বলেন, হয় তুমি আমার প্রাপ্য অধিকারের ব্যাপারে আমার প্রতি ন্যায়বিচার করিবে, অন্যথায় আমি অবশ্যই তরবারি সজ্জিত হইয়া মহানবী (স)-এর মসজিদে দাঁড়াইয়া হিলফুল ফুযূলের নামে আহবান জানাইব। তখন ওলীদের সামনে উপস্থিত আবদুল্লাহ ইব্নুয যুবায়র (রা) বলেন, আমিও আল্লাহর নামে হলফ করিতেছি যে, আমিও তাহার আহবানে সাড়া দিয়া তরবারি সজ্জিত হইয়া অবশ্যি তাহার সহায়তা করিব, যতক্ষণ না সে তাহার স্বত্বের ব্যাপারে ন্যায়বিচার প্রাপ্ত হয়। মিসওয়ার ইব্ন মাখরামা (রা) ও আবদুর রহমান ইব্ন 'উছমান (রা)-ও একই প্রতিজ্ঞা করেন। অবস্থা বেগতিক দেখিয়া ওলীদ ইব্ন উৎবা তাঁহার প্রতি সুবিচার করিতে বাধ্য হন (ইব্ন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৪০-১৬; আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৯৩-৯৪; ইব্নুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৫৭০-৫৭১; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯৩)। অতএব এই জাতীয় স্বৈরাচার ও অন্যায়-অবিচারের প্রতিরোধকালে হিলফুল ফুযূলের মত কল্যাণধর্মী সংঘের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। মহানবী (স) বলেনঃ
মান সুন্নাতান খাইরান ফাত্তাবিয়াহু আলাইহা ফালাহু আজরুহু ওয়া মিছলু উজুরি মান ইত্তাবাহু গাইরু মানকূসিন মিন উজুরিহিম শাইআন।
"কোন ব্যক্তি উত্তম প্রথার প্রচলন করিলে এবং তাহার অনুসরণ করা হইলে সে তাহার নিজের সওয়াবও প্রাপ্ত হইবে এবং তাহার অনুসারীদের সম-পরিমাণ সওয়াবও প্রাপ্ত হইবে, তবে ইহাতে তাহাদের সওয়াব হইতে কিছুই হ্রাসপ্রাপ্ত হইবে না" (তিরমিযী, 'ইল্ম, বাবঃ সৎপথে বা ভ্রান্ত পথে ডাকার ফলাফল; মুসলিম, ইল্ম, বাবঃ মান সান্না সুন্নাতান হাসানাতান..., বাংলা অনু, ৮খ, পৃ. ১৯৩-৪, নং ৬৫৫৬)।
পরবর্তী কালে বানু আবদে শামস ও বানু নাওফাল 'আবদুল্লাহ্ ইবনুয যুবায়র (রা)-র নিহত হওয়ার পর হিলফুল ফুযূল ত্যাগ করে। তাঁহার নিহত হওয়ার পর উমায়্যা-রাজ 'আবদুল মালিক ইব্ন মারওয়ানের নিকট লোকজন জড়ো হইলে কুরায়শ বংশীয় শ্রেষ্ঠ 'আলিম মুহাম্মাদ ইব্ন জুবায়র ইবন মুত'ইম (র)-কে আবদুল মালিক জিজ্ঞাসা করেন, হে সা'ঈদের পিতা! আমরা ও আপনারা অর্থাৎ বানু 'আবদে শামস ইব্ন 'আবদে মানাফ ও বানু নাওফাল ইব্ন 'আবদে মানাফ কি হিলফুল ফুযূলে শামিল নই? তিনি বলিলেন, আপনিই ভালো জানেন! আবদুল মালিক বলেন, হে সা'ঈদের পিতা! এই বিষয়ে অবশ্যই আপনি আমাকে সঠিক তথ্য প্রদান করিবেন। তিনি বলিলেন, আল্লাহর শপথ! আমরা ও আপনারা নিজেদের চুক্তি ভঙ্গ করিয়াছি। 'আবদুল মালিক বলিলেন, আপনার কথাই সত্য (ইব্ন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৪১)।
টিকাঃ
১. ইব্ন 'হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, আল-মাকতাবাতুত তাওফীকিয়্যা, আল-আযহার (মিসর), তা. বি, ১খ, পৃ. ১৩৮-১৩৯;
২. ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দারুল ফিকার আল-আরাবী, বৈরূত তা.বি, ২খ, পৃ. ২৯০-২৯৩;
৩. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১ম সং, বৈরূত ১৪০৭/১৯৮৭, ১খ, পৃ. ৫৭০-১;
৪. আবদুর রহমান আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, আবদুর রহমান আল-ওয়াকীল সম্পা., ১ম সং, বৈরূত ১৪১২/১৯৯২, ২খ, পৃ. ৬৩-৬৪;৭০-৭৪; ৮১-৮৩;
৫. ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, দারু সাদির, বৈরূত তা. বি, ১খ, পৃ. ১২৮-৯;
৬. কাযী মুহাম্মাদ সুলায়মান মানসূরপুরী, রাহমাতুল-লিল-আলামীন, লাহোর তা. বি, পৃ. ৪৩;
৭. সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নাদবী, নবীয়ে রহমাত (বাংলা অন্), ১ম সং, ঢাকা ১৪১৮/১৯৯৭, পৃ. ১২২-৩;
৮. শায়খুল হাদীস মওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, ১ম সং, ঢাকা ১৪১৯/১৯৯৮, পৃ. ১৯৯-২০১;
৯. মুঈনুদ্দীন আহমাদ নাদবী, তারীখে ইসলাম (উর্দু), লাহোর তা. বি, ১খ, পৃ. ৩৬-৭;
১০. ইদরীস কান্ধলাবী, সীরাতুল মুসতাফা, ১ম সং, দিল্লী ১৯৮১খৃ., ১খ, পৃ. ৯৩-৪;
১১. ইব্ন মানজুর, লিসানুল আরাব, দারুল মাআরিফ, বৈরূত তা.বি., ২খ, পৃ. ৯৬৩, কলাম ৩;
১২. মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, হায়াতে মুহাম্মাদ, কায়রো তা.বি., পৃ. ৭৯-৮০;
১৩. শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, করাচী ১৯৮৪ খৃ., ১খ, পৃ. ১১৫;
১৪. ইয়াকৃত আল-হামাবী, মু'জামুল বুলদান, দারুল কিতাব, বৈরূত তা.বি., ৫খ, পৃ. ১১৬।
📄 আল-আমীন উপাধিতে ভূষিত
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাহাদিগকে নবী ও রাসূল হিসাবে মনোনীত করিয়াছেন তাঁহারা সকলেই শৈশবকাল হইতেই অত্যন্ত নম্র, ভদ্র ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। তিনি যখন আরবদেশে জন্মগ্রহণ করেন তখন আরবের সামাজিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। মদ্যপান, জুয়াখেলা, নারী নির্যাতন, মূর্তিপূজা ইত্যাদি ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার, এমনকি সামান্য কারণেই গোত্রে গোত্রে যুদ্ধের দাবানল জ্বলিয়া উঠিত, যেই যুদ্ধ যুগ যুগ ধরিয়া চলিত এবং নিরপরাধ অসংখ্য লোক সেই যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করিত। এমন একটি সমাজে জন্মগ্রহণ করিয়াও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম শৈশবকাল হইতেই ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক ও নৈতিক চরিত্রের অধিকারী।
আল-আমীন উপাধি প্রদানের কারণ হিসাবে দুই-একটি বাস্তব ঘটনার উল্লেখ প্রয়োজন। কিশোর বয়সের সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, নম্রতা ও ভদ্রতা, নিঃসার্থ মানবপ্রেম ও সত্যিকার কল্যাণ প্রচেষ্টা, চরিত্র মাধুর্য ও অমায়িক ব্যবহারের ফলে আরবগণ তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হয়। অবশেষে আরবগণ তাঁহাকে আল-আমীন বা বিশ্বস্ত বলিয়া ডাকিতে থাকে। ফলে মুহাম্মাদ নাম অন্তরালে পড়িয়া গিয়া তিনি আল-আমীন নামেই খ্যাত হইয়া উঠিলেন। নীতিধর্ম বিবর্জিত ঈর্ষা-বিদ্বেষ, কলুষিত, পরশ্রীকাতর দুর্ধর্ষ আরবদের অন্তরে এতখানি স্থান লাভ করা ঐ সময়ে খুবই কঠিন ছিল। অনুপম চরিত্র মাধুর্যের অধিকারী হওয়ার কারণেই হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর পক্ষে তাহা সম্ভব হইয়াছিল। সীরাতে ইবন হিশামে বর্ণিত আছে:
ফা শাব্বা রাসুলুল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াল্লাহু ইয়াকলাউহু ওয়া ইয়াহফাযু ওয়া ইয়াহুতুহু মিন আকযারিল জাহিলিয়্যাতি লিমা ইউরিলু বিহী মিন কারামতিহী ওয়া রিসালাতিহী হাত্তা বালাগা আন্নাল হু কানা রাজুলান ওয়া আফযালা কাউমিহী মুরুআতান ওয়া আহসানা হুম খালক্বান ওয়া আকরামা হুম হাসাবান ওয়া আহসানা হুম জিওয়ারান ওয়া আ'যামা হুম হিলমান ওয়া আসদাক্বাহুম হাদীছান ওয়া আ'যামা হুম আমানাতান ওয়া আব'আদাহুম মিনাল ফাহশি ওয়াল আখলাক্বিল লাতী তুদান্নিসু আর-রিজলা তানাজ্জুহান ওয়া তাক্বররুমান ওয়া ইসমুহু ফী ক্বাওমিহিল আমিনু লিমা জামা'আল্লাহু ফিহী মিনাল উমুরিস সালিহাতি।
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) এই অবস্থায় বয়প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন যে, স্বয়ং আল্লাহ পাক তাঁহাকে হিফাযত ও তাঁহার প্রতি দৃষ্টি রাখেন এবং জাহিলিয়াতের সমস্ত অনাচার থেকে তাঁহাকে পবিত্র ও হিফাযতে রাখেন। কেননা তাঁহাকে নবুওয়াত, রিসালাত ও উঁচু মর্যাদা প্রদান করা ছিল মহান আল্লাহ্, অভিপ্রায়। ফলে তিনি একজন নম্র, ভদ্র, চরিত্রবান, উত্তম বংশীয়, ধৈর্যশীল, সত্যবাদী ও আমনতদার ব্যক্তি হিসাবে সমাজে শীর্ষস্থান অধিকার করেন। অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা হইতে তিনি দূরে থাকিতেন। এই সমস্ত উত্তম ও নৈতিক গুণাবলীর কারণে তাঁহার স্বজাতির মধ্যে তিনি আল-আমীন খেতাবে ভূষিত হইয়াছিলেন" (সীরাতে ইবন হিশাম, ১খ, পৃ. ৬২)।
তিনি অত্যন্ত সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারির সহিত ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করিতেন। এইজন্য কুরায়শদের অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা থাকা সত্ত্বেও শৈশবকালেই অনেক জটিল সমস্যার সমাধান ও মীমাংসার ভার তাঁহার উপর ন্যস্ত করা হইত। রাসূলুল্লাহ (স)-এর বয়স যখন পঁয়ত্রিশ বৎসর তখন মক্কার সকল গোত্র মিলিত হইয়া পবিত্র কা'বা ঘর নির্মাণের কাজ আরম্ভ করে। যখন নির্মাণ কাজ শেষ হইয়া যায় তখন হাজরে আসওয়াদ পুনস্থাপন নিয়া এক মহাসমস্যা দেখা দেয়। প্রত্যেক গোত্রই এই কাজটি অত্যন্ত পুণ্যের মনে করিয়া তাহারা হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করার জন্য বেশ আগ্রহী হইয়া উঠে। বিভিন্ন গোত্রের নেতৃবৃন্দ কয়েক দিন পরামর্শ করিয়াও কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারিল না। ফলে গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ ও রক্তপাতের প্রবল আশংকা দেখা দেয়। এই সময় কুরায়শ গোত্রের সবচেয়ে বয়বৃদ্ধ ও সম্মানিত ব্যক্তি আবূ উমায়্যা ইব্ন্ন মুগীরা মাখযূমী নেতৃবৃন্দকে ডাকিয়া বলিলেন, তোমরা শুভ কাজের মধ্যে অশুভের সূত্রপাত করিও না। আমার কথা শোন! আগামী কাল ভোরে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম কা'বা ঘরে আগমন করিবেন, তাহার উপর এই বিরোধের মীমাংসার ভার অর্পণ করা হইবে। সকলেই এই প্রস্তাব মানিয়া লইল এবং শাসরুদ্ধকর অবস্থায় আগন্তুকের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিল। তাহারা ভাবিতে লাগিল, না জানি কে সর্বপ্রথম কা'বা ঘরে প্রবেশ করেন, না জানি তিনি কোন গোত্রের লোক হন এবং কি মীমাংসা করিয়া বসেন। যদি তাহার মীমাংসা মনঃপূত না হয় তাহা হইলে কি হইবে, এই উদ্বেগ ও আশংকায় তাহারা পলকহীন নেত্রে কা'বা ঘরের দিকে তাকাইয়া থাকে। এমন সময় দেখা গেল কুরায়শ বংশীয় যুবক হযরত মুহাম্মাদ (স) এই দিকে আগমন করিতেছেন। তাঁহাকে দেখিয়া সকলেই আনন্দিত হইয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলিয়া উঠিল, ”হাযা মুহাম্মাদুন আল-আমীনু ক্বাদ রাযীনাহু।" "আল-আমীন, আমরা তাঁহার মীমাংসায় সম্মত আছি"।
নবী করীম (স) কা'বা ঘরে উপস্থিত হওয়ার পর নেতৃবৃন্দের নিকট হইতে বিষয়টি অবগত হইলেন এবং তাহাদিগকে একটি চাদর আনিতে বলিলেন। চাদর লইয়া আসার পর প্রত্যেক গোত্র হইতে একজন লোককে চাদরটি ধরিতে বলিলেন। পবিত্র হাজরে আসওয়াদ তিনি নিজ হাতে উঠাইয়া চাদরে রাখিলেন। নেতৃবৃন্দ হাজরে আসওয়াদসহ চাদর ধরিয়া কা'বা ঘরে নিয়া আসিল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) চادর হইতে হাজরে আসওয়াদ উঠাইয়া যথাস্থানে স্থাপন করিলেন। নবৃওয়াত লাভের পূর্বেই হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (স)-এর বিশ্বস্ততা, বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা ও নিরপেক্ষতার কারণে পবিত্র মক্কার জনগণ সম্ভাব্য এক ভয়াবহ যুদ্ধ ও রক্তপাত হইতে রক্ষা পাইল এবং অকুণ্ঠ চিত্তে তাঁহার প্রশংসা করিতে লাগিল (ইদরীস কান্দেহলবী, সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, ১৯৮০ খৃ. পৃ. ১১৫)
মহানবী (স)-এর সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার কারণে সকলের নিকট তিনি প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন। তিনি কখনও কোন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিতেন না, কষ্ট হইলেও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিতে চেষ্টা করিতেন। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আবিল হামসা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, নবৃওয়াত লাভের পূর্বে একবার আমি হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সহিত ব্যবসার কাজে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। ইহাতে আমার যিম্মায় কিছু দেনা বাকী থাকে। আমি অঙ্গীকার করিলাম যে, অনতিবিলম্বে আমি ফিরিয়া আসিব এবং বাকী দেনা পরিশোধ করিব। আপনি কিছুক্ষণ এই জায়গায় আমার জন্য অপেক্ষা করিবেন। আমি বাড়ীতে চলিয়া যাওয়ার পর ঘটনাক্রমে ঐ অঙ্গীকারের কথা ভুলিয়া যাই। তিন দিন পর ঐ অঙ্গীকারের কথা আমার মনে পড়ে। আমি দ্রুত ঐ স্থানে আগমন করিয়া দেখিতে পাই যে, তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। আমাকে দেখিয়া তিনি কোন ক্রোধ প্রকাশ করিলেন না, এমনকি কোন কটুবাক্যও প্রয়োগ করিলেন না। শুধু ইহাই বলিলেন যে, তুমি আমাকে কষ্টের মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছ। আমি তিন দিন যাবত এইখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছি (সুনান আবূ দাউদ, কিতাবুল আদাব, বাবুল ইদ্দত, ২খ, পৃ. ৩২৬)।
টিকাঃ
১. আবূ দাউদ, আস-সুনান, দিল্লী তা.বি, ২খ, পৃ. ৩২৬;
২. ইব্ন খালদুন, তারীখ, দেওবন্দ ১৯৭৮ খৃ, ১খ. পৃ. ২৭;
৩. ইদ্রীস কান্দলাবী, সীরাতুল মুস্তাফা (স) দেওবন্দ ১৯৮০ খৃ, ১খ., পৃ. ৯৫-৯৬, ১১৫;
৪. মুফতী মুহাম্মাদ শফী (র),-সীরাতে খাতিমুল আম্বিয়া, অনুবাদ-মুহাম্মদ সিরাজুল হক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ৪র্থ সংস্করণ, ঢাকা ১৯৯৫ খৃ., পৃ. ২৪;
৫. মোহাম্মদ আকরম খা, মোস্তফা চরিত, ৪র্থ সংস্করণ, ঢাকা ১৯৭৫ খৃ. ১খ., পৃ. ২৯৫-২৯৬;
৬. গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, ঢাকা, ১৯৭৩, খৃ., দ্বাদশ সংস্করণ, পৃ. ৫৪-৫৮;
৭. সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী, নবীয়ে রহমত, অনুবাদঃ আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী, ঢাকা-চট্টগ্রাম ১৯৯৭ খৃ., পৃ. ১১৮;
৮. Karen Armstrong, Muhammad (SM), London 1991, p. 78.
📄 হযরত খাদীজা (রা)-এর সহিত বিবাহ
হযরত খাদীজা বিনতে খুওয়ায়লিদ (রা) ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মহিলা। সেই যুগে আরবে নারীদের অধিকার বলিতে কিছুই ছিল না। পদে পদে নারীরা চরম অবমাননা ও লাঞ্ছনার শিকার হইত। সেই সময় এই সতী-সাধ্বী মহিলা স্বীয় পবিত্রতা ও বংশমর্যাদা রক্ষা করিয়া অতি সম্মানের সহিত জীবন যাপন করিতেন। তাঁহার এই পবিত্র ও সুমধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে, যাহার ফলে আইয়ামে জাহিলিয়া এবং ইসলামের যুগেও লোকজন তাঁহাকে 'তাহিরা' উপাধিতে ভূষিত করে (সীরাতুল মুস্তাফা, ইদরীস কান্দহলবী, ১খ., পৃ. ৯৯; ফতহুল বারী, ১খ, পৃ. ৭৭)।
হযরত খাদীজা (রা)-র পরপর দুইজন স্বামী ইনতিকাল করেন। তাহাদের পরিত্যক্ত এবং পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ মিলিয়া তিনি অগাধ ধন-সম্পদের মালিক হইয়াছিলেন। এই ধন-সম্পদ তিনি দরিদ্র ও অসহায়গণকে দান করিতেন এবং মানুষের কল্যাণে ব্যয় করিতেন। তিনি কর্মচারী নিয়োগ করিয়া তাহাদের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে মালামাল প্রেরণ করিয়া ব্যবসা-বাণিজ্যও অব্যাহত রাখিয়াছিলেন এবং নিজেই তাহা তত্ত্বাবধান করিতেন। একবার কুরায়শদের একটি বাণিজ্যিক দল তাহাদের মালামাল নিয়া ব্যবসার উদ্দেশে সিরিয়া গমনের জন্য প্রস্তুত হইতেছিল। তখন হযরত খাদীজা (রা) তাঁহার মালামাল বিদেশে প্রেরণের চিন্তা করিতেছিলেন এবং কাহাকে স্বীয় ব্যবসার দায়িত্ব প্রদান করা যায় এই নিয়া ভাবিতেছিলেন। তাঁহার মালামালের পরিমাণ এত অধিক ছিল যে, সমগ্র কুরায়শদের মালামাল একত্র করিলেও তাহার সমপরিমাণ হইত না।
এই সময় হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর বয়স ছিল পঁচিশ বৎসর। তাঁহার সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও আমানতদারি প্রভৃতি গুণের কথা চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে এবং মক্কা নগরীর সকলেই তাঁহাকে আল-আমীন বা সত্যবাদী বলিয়া ডাকিতে থাকে। ইতোমধ্যে হযরত খাদীজা (রা) তাঁহার সত্যবাদিতা ও কর্মদক্ষতার কথা জানিতে পারিয়াছেন এবং দেশ-বিদেশে যাতায়াত করিয়া ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে তাঁহার যে পূর্ব অভিজ্ঞতা রহিয়াছে ইহাও তিনি অবগত হইয়াছেন। সুতরাং এইরূপ বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ ব্যক্তির উপর স্বীয় ব্যবসার দায়িত্বভার অর্পণ করিবার জন্য হযরত খাদীজা (রা) স্থির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। এই উদ্দেশে তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে তাঁহার বাড়ীতে ডাকিয়া আনিবার জন্য লোক পাঠাইলেন।
হযরত খাদীজা (রা)-র আহ্বানে নবী করীম (স) তাঁহার বাড়ীতে উপস্থিত হইলেন। হযরত খাদীজা (রা) তাঁহাকে সম্ভ্রমে বলিলেন, আমি আপনার সত্যনিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা ও উন্নত চরিত্রের কথা জানিতে পারিয়াছি। যদি অনুগ্রহ করিয়া আপনি আমার ব্যবসার দায়িত্বভার গ্রহণ করিয়া মালামালসহ সিরিয়া গমন করেন তাহা হইলে আমি খুবই বাধিত হইব এবং আপনার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করার জন্য আমার গোলাম মায়সারাকে আপনার সহিত প্রেরণ করিব। ইহা ছাড়া অন্যান্যদিগকে আমি যেই হারে লভ্যাংশ দিয়া থাকি আপনাকে উহার দ্বিগুণ প্রদান করিব। হযরত খাদীজার প্রস্তাবে তিনি খাজা আবূ তালিবের পরামর্শ ও অনুমতি চাহিলেন। আবূ তালিব তখন প্রায় বৃদ্ধ অবস্থায় উপনীত হইয়াছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য করা বা বিদেশ গমন এখন আর তাহার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তিনি খাদীজার ব্যবসার দায়িত্ব নিয়া সিরিয়া গমনের মাধ্যমে কিছু অর্থ উপার্জন করা উত্তম বলিয়া মনে করিলেন এবং হযরত খাদীজার প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করিলেন (আল্লামা ইদরীস কান্দেলবী, সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, পৃ. ৮৭)।
বাণিজ্য কাফেলা প্রস্তুত হইল। এইবার রাসূলুল্লাহ (স) অনেক মূলধন ও প্রচুর মালামাল লইয়া সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলেন। হযরত খাদীজা (রা)-র গোলাম মায়সারাও এই সফরে তাঁহার সঙ্গী ছিলেন। কয়েক দিন চলার পর তাহারা সিরিয়ার অন্তর্গত বুসরা নগরে পৌছিলেন এবং বিশ্রাম গ্রহণের জন্য একটি গাছের ছায়ায় উপবেশন করিলেন। নিকটেই ছিল এক খৃস্টান পাদ্রীর গির্জা। তাহার নাম ছিল নাসতুরা। তিনি নবী করীম (স)-কে দেখিয়া তাঁহার নিকটে আসিলেন এবং তাঁহাকে বলিলেন, হযরত ঈসা ইবন মারয়ামের পর আপনি ছাড়া আর কোন নবী এই গাছের ছায়ায় অবস্থান করেন নাই। ইহার পর তিনি মায়সারাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, এই ব্যক্তি কে যিনি এই গাছের নিচে বসিয়াছেন? মায়সারা বলিল, পবিত্র মক্কার কুরায়শ বংশের এক সম্ভ্রান্ত যুবক। অতঃপর পাদ্রী মায়সারাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তাঁহার উভয় চোখে লালিমা আছে কি? মায়সারা বিলল, হাঁ, লালিমা আছে এবং এই লালিমা কখনও দূরীভূত হয় না। পাদ্রী বলিলেন, ইনিই হইলেন প্রতিশ্রুত শেষনবী (আল্লামা সুয়ূতী (র), আল-খাসাইসুল কুবরা, ১খ, পৃ. ৯১; ইদরীস কান্দেহলাবী, সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, পৃ. ১০০)।
অতঃপর নবী করীম (স) সমস্ত পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করিলেন এবং নূতন কিছু দ্রব্যাদি ক্রয় করিলেন। পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগাইয়া এইবার তিনি প্রচুর লাভবান হইলেন। ফলে অত্যন্ত আনন্দ ও প্রফুল্ল চিত্তে তিনি কাফেলার সহিত মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হইলেন। পথিমধ্যে মায়সারা দেখিতে পায় যে, যখনই দ্বিপ্রহরের রৌদ্রে উত্তাপ প্রচণ্ড বৃদ্ধি পায়, তখনই দুইজন ফেরেশতা হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে ছায়া দিয়া রৌদ্রের উত্তাপ হইতে রক্ষা করিতেছে (আল-খাসাইসুল কুবra; ১খ, পৃ. ৯১)। এই দিকে হযরত খাদীজা (রা) বাণিজ্য কাফেলার প্রতীক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করিতেছিলেন।
একদিন তিনি স্বীয় কক্ষে বসিয়া বাহিরের দিকে তাকাইয়া আছেন। এই সময় দেখিতে পাইলেন যে, দূরে একটি কাফেলা আসিতেছে এবং ইহার অগ্রভাগে হযরত মুহাম্মাদ (স) উটের উপর আরোহণ করিয়া আসিতেছেন। তিনি আরো দেখিতে পাইলেন যে, প্রখর রৌদ্রের উত্তপ হইতে রক্ষার জন্য দুইজন ফেরেশতা তাঁহার উপর ছায়াদান করিতেছে। তিনি নিকটস্থ মহিলাগণকে এই দৃশ্য দেখাইলেন। সকলে এই দৃশ্য দেখিয়া আশ্চর্য হইয়া গেল (ইদরীস কানধলাবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, ১০০-১০১)। কিছুক্ষণের মধ্যেই নবী করীম (স) হযরত খাদীজা (রা)-র বাড়িতে আসিয়া পৌছিলেন এবং আমদানীকৃত সমস্ত মালামাল ও অর্থ তাঁহাকে যথাযথভাবে বুঝাইয়া দিলেন। এই সফরে হযরত খাদীজা (রা) পূর্বের চাইতে অধিক লাভবান হইলেন। সুতরাং অঙ্গীকার অনুযায়ী আনন্দচিত্তে দ্বিগুণের বেশী লভ্যাংশ প্রদান করিয়া তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে ধন্যবাদ জানাইয়া বিদায় করিলেন, অপরদিকে মায়সারাও হযরত খাদীজা (রা)-র নিকট উপস্থিত হইল এবং বিগত সফরের অভিজ্ঞতাসহ পাদ্রী নাসতুরার ভবিষ্যদ্বাণী ও ফেরেশতাদের ছায়াদানের ঘটনা সবিস্তারে বর্ণনা করিল।
হযরত খাদীজা (রা) অত্যন্ত বুদ্ধিমতি ও বিচক্ষণ মহিলা ছিলেন। যুবক বয়স হইতেই নবী করীম (স)-এর সত্যবাদিতা ও অন্যান্য গুণাবলীর কারণে হযরত খাদীজা (রা) তাঁহার গুণমুগ্ধ ছিলেন। ব্যবসায় যোগদানের পর তাঁহার সহিত আরো ঘনিষ্ঠভাবে পরিচয় ঘটে। তাঁহার সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, উন্নত চরিত্র, মধুর ব্যবহার ও সৌম্যকান্তি ইত্যাদি হযরত খাদীজা (রা)-কে আরো আকৃষ্ট করিয়া তোলে। তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স) সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করিতে লাগিলেন। তাই সিরিয়া সফরের সময় তাঁহার সম্পর্কে পাদ্রীর ভবিষ্যদ্বাণী, ফেরেশতাদের ছায়াদান ও অন্যান্য ঘটনাবলী ওয়ারাকা ইব্ নওফাল-এর নিকট বর্ণনা করিলেন। তিনি ছিলেন হযরত খাদীজা (রা)-র চাচাত ভাই এবং তাওরাত ও ইঞ্জীলের জ্ঞানে সমৃদ্ধ একজন পণ্ডিত ব্যক্তি। ওয়ারাকা বলিলেন, যদি এই সমস্ত ঘটনা সত্য হয় তাহা হইলে নিশ্চয় হযরত মুহাম্মাদ (স) এই উম্মতের নবী হইবেন। আমি ইহা নিশ্চিতভাবে অবগত আছি যে, এই উম্মতের মধ্যে শীঘ্রই একজন নবী আগমন করিবেন এবং আমরা তাঁহার আগমন অপেক্ষায় আছি। ওয়ারাকা ইন নওফালের নিকট এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনিয়া হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর প্রতিশ্রুত শেষ নবী হওয়া সম্পর্কে তাঁহার মনে দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টি হইল। সুতরাং তাঁহাকে ঘনিষ্ঠভাবে পাওয়া একটি বিরাট সৌভাগ্যের বিষয় হইবে বলিয়া তাঁহার মন আন্দোলিত হইতে লাগিল এবং তাঁহার সহধর্মিনী হওয়ার জন্য হযরত খাদীজা (রা)-র মনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগিয়া উঠিল (মাওলানা শিবলী নু'মানী, সীরাতুন্নবী, ১খ, পৃ. ১৮৮; ইদরীস কান্দহলবী, সীরাতুল মুস্তাফা, ১খ, পৃ. ১১১)।
এই সময় হযরত খাদীজা (রা)-র বয়স হইয়াছিল চল্লিশ বৎসর। ইহার পূর্বে তাঁহার আরো দুইবার বিবাহ হইয়াছিল। প্রথম বিবাহ হইয়াছিল আবূ হালা ইন্ন যুরারার সহিত। তাহার ঔরসে হযরত খাদীজার দুইটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাহাদের নাম ছিল যথাক্রমে হিন্দ ও হারিস। আবূ হালার মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার তাঁহার বিবাহ হয় আতিক ইন্ন আয়েসের সঙ্গে। আতীকের ঔরসে হযরত খাদীজার একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাহার নাম ছিল হিন্দ। ইহার পর তিনি বিধবা অবস্থায় পবিত্র জীবন যাপন করিতে থাকেন। এত অধিক বয়সে বিবাহের প্রস্তাব দিতে স্বভাবতই তিনি ইতস্তত করিতেছিলেন। ইতোপূর্বে কুরায়শ গোত্রের নেতৃস্থানীয় অনেকেই খাদীজার নিকট বিবাহের প্রস্তাব দিয়াছিল, কিন্তু তিনি কাহারও প্রস্তাবে সাড়া দেন নাই। পক্ষান্তরে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর বয়স তখন ছিল মাত্র পঁচিশ বৎসর। সুতরাং এই যুবক বয়সে তাঁহাকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করিতে সম্মত হইবেন কিনা সেই আশংকাও হযরত খাদীজার মনে জাগিয়া উঠিল। কিন্তু এই স্বর্গীয় আকর্ষণের কারণে তাঁহাকে কোন ভয়-ভাবনা নিবৃত্ত করিতে পারিল না। সুতরাং খাদীজা তাঁহার সহচরী এবং উভয় পক্ষের আত্মীয়া নাফীসার মাধ্যমে নবী করীম (স)-এর নিকট বিবাহের প্রস্তাব পাঠাইলেন।
বিবি নাফীসা বলেন, আমি তাঁহার নিকট যাইয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, হে মুহাম্মাদ! আপনি বিবাহ করিতেছেন না কেন? তিনি উত্তরে বলিলেন, এখনও আমি বিবাহের চিন্তাই করি নাই। ইহা ছাড়া বিবাহ করিবার মত সম্পদও আমার নাই। আমি বলিলাম, যদি আমি ইহার সুব্যবস্থা করিয়া দিতে পারি এবং এমন মহিলার সহিত সম্পর্কের কথা বলি যিনি রূপে, গুণে, ধনে, বংশমর্যাদায় ও স্বভাব-চরিত্রে অতুলনীয়া, তাহা হইলে আপনি কি এই বিবাহে সম্মত হইবেন? তিনি বলিলেন, এমন মহিলা কে তাহা জানিতে পারি কি? তিনি বলেন, তখন আমি খাদীজার নাম বলিলাম। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করিলেন, খাদীজা বিবাহ করিবেন? নাফীসা বলিলেন, আমি এই বিবাহের দায়িত্ব গ্রহণ করিলাম। ইহার পর আমি খাদীজার নিকট যাইয়া হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সম্মতির কথা জানাইলাম। খাদীজার তখন কি আনন্দ! তিনি যেন আনন্দে আত্মহারা হইয়া গেলেন। অতঃপর বিবাহের ব্যাপারে তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলেন। কারণ সেই যুগে বিবাহের ব্যাপারে নারীদের পূর্ণ স্বাধীনতা ও অধিকার ছিল। তখন হযরত খাদীজার পিতা খুওয়ায়লিদ ইব্ন আসাদ জীবিত ছিলেন না। ফিজার যুদ্ধের পূর্বেই তিনি ইনতিকাল করেন। সুতরাং তিনি তাঁহার চাচা আমর ইব্ন আসাদকে বিবাহের ব্যাপারে তাঁহার অভিপ্রায় জানাইলেন এবং বিবাহ কার্য সম্পন্ন করিয়া দিবার জন্য অনুরোধ জ্ঞাপন করিলেন (মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স), পৃ. ৩৯)।
অপরদিকে রাসূলুল্লাহ (স) তাঁহার পিতৃব্য আবূ তালিবকে খাদীজার এই প্রস্তাব সম্পর্কে অবহিত করিলেন। আবূ তালিব সর্বদা তাহার এই স্নেহের ভাতিজার কল্যাণ কামনা করিতেন। সুতরাং সর্বদিক বিবেচনা করিয়া তিনি আনন্দচিত্তে এই বিবাহে সম্মতি জানাইলেন। আবূ তালিব তখন যথানিয়মে হযরত খাদীজার পিতৃব্য আমর ইবন আসাদের নিকট স্বীয় ভ্রাতুষ্পুত্রের বিবাহের পয়গাম পাঠাইলেন এবং সকলের সম্মতিক্রমে এই মহামিলন ও শুভ কাজের দিন, তারিখ ও মোহর ধার্য করিলেন। যথাসময়ে উভয় পক্ষের আত্মীয়বর্গ হযরত খাদীজার বাড়ীতে উপস্থিত হইলেন। হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর চাচা আবূ তালিব ও হামযা প্রমুখ কুরায়শ নেতৃবৃন্দ বিবাহ মজলিসে সমাগত হইলেন। হযরত খাদীজার চাচা আমর ইব্ন আসাদ এবং তাঁহার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইবন নাওফাল বিবাহ মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। এই বিবাহে পাত্র পক্ষে আবু তালিব এবং পাত্রীপক্ষে আমর, ইব্ন আসাদ অভিভাবকত্বের দায়িত্ব পালন করিলেন। সকলকে যথাযোগ্য আদর অভ্যর্থনার পর আবু তালিব বিবাহ মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে সম্বোধন করিয়া এই খুতবা প্রদান করেন:
আলহামদুলিল্লাহিল্লাজী জাআলানা মিন যুররিয়াতি ইবরাহীমা ওয়া যার'ই ইসমাইলা ওয়া যীযি মা'আদ ওয়া উনসু'রি মুদার ওয়া জা'আলানা হাযানাতা বাইতিহী ওয়া সুওয়াসা হারামিহী ওয়া জা'আলা লানা বাইতান মাহজুজান ওয়া হারামান আমনান ওয়া জা'আলা নাল হুক্কামা আলান নাস। ছুম্মা ইন্নাবনা আখী হাযা মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহি লা ইউওয়াজ্জানূ বি-রাজুলিন ইল্লা রাজ্জাহা বিহী শারাফান ওয়া নুবলান ওয়া ফাযলান ওয়া 'আক্বিলান। ফাইন্ন কান ফীল মাল কিল্লু ফা ইন্না আল-মাল্লা যিল্লুন যাইলুন ওয়া আমরুন হাইলুন। ওয়া মুহাম্মাদুন মিন ক্বাদ ফা'তামু ক্বারাবাতাহু ওয়াক্বাদ খাতাবতু খাদীজা বিনত খুওয়াইলিদ ওয়াবাযালতুস সাদা'ক্বা মা আজালাহু ওয়া আজালাহু মিন মালী 'ইশরুনা বায়'রুন। ওয়া হুওয়া ওয়াল্লাহু বা'দাল হাযা লাহু নাবা'উন আ'যীমুন ওয়া খাত্ব্রুন জালী'লুন জাসীমুন।
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য যিনি আমাদিগকে হযরত ইবরাহীম (আ)-এর বংশে এবং হযরত ইসমাঈল (আ)-এর গোত্রে সৃষ্টি করিয়াছেন, যিনি আমাদিগকে মা'আদ্দ ও মুদারের বংশোদ্ভূত করিয়াছেন, যিনি আমাদিগকে তাঁহার পবিত্র কা'বা গৃহের মর্যাদা রক্ষা এবং পবিত্র হারাম শরীফের খাদেম মনোনীত করিয়াছেন, যিনি কা'বা শরীফকে হজ্জব্রত পালনের স্থান এবং হারাম শরীফকে নিরাপত্তার স্থান বানাইয়াছেন এবং যিনি আমাদিগকে জনসাধারণের হাকীম নির্বাচিত করিয়াছেন। অতঃপর আমার এই ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল্লাহ জ্ঞানে, গুণে, মর্যাদা ও মহত্বে কেহই তাঁহার সমকক্ষ নহে। যদিও তাঁহার ধন-সম্পদ কম কিন্তু পার্থিব ধন-সম্পদ অস্থায়ী ছায়ার মত পরিবর্তনশীল, নশ্বর। মুহাম্মদের আত্মীয়-স্বজনদের সম্পর্কে নিশ্চয় তোমরা অবগত রহিয়াছ। অতঃপর মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল্লাহ খাদীজা বিনত খুওয়ায়লিদ-এর সহিত বিবাহের প্রস্তাব পেশ করিতেছি এবং আমার পক্ষ হইতে মোহরানা বাবদ বিশটি উট আদায় করিতেছি। আল্লাহ্র শপথ! তাঁহার ভবিষ্যত অতি উজ্জ্বল ও অতি মহান। কিছু দিন পরই তাঁহার অবস্থার পরিবর্তন হইয়া যাইবে (তারীখে ইব্ন খালদুন, ১খ, পৃ. ২৫-২৬; মুহাম্মাদ রিদা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৯)।
আবূ তালিবের খুতবার পর পাত্রীপক্ষ হইতে হযরত খাদীজার চাচাত ভাই ওয়ারাকা ইব্ন নাওফাল আগত মেহমানদিগকে সম্বোধন করিয়া এই খুতবা পাঠ করেন:
আলহামদুলিল্লাহিল্লাজী কামা যাকারা তা ওয়া ফায্যলানা আলা মা আদাদতা ফানাহনু সাদাতুল আরাবি ওয়া ক্বদাতুহা ওয়া আনতুম আহলু যালিক কুল্লুহু লা তুনকিরুল আশীরাতু ফাযলাকুম ওয়া লা ইয়ারুদ্দু আহাদুন মিনান নাসি খারা'কুম ওয়া শারাফাকুম ওয়াক্বাদ রাগিবনা ফিল ইত্তিসালি বি হাবলিকুম ওয়া শারাফিকুম ফা আশহাদূ আলা মাআ'শির ক্বুরাইশ বি আন্নী ক্বাদ জাওওয়াজতু খাদীজা বিনত খুওয়াইলিদ মিন মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ আলা ক্বাযা।
"সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য, যিনি আমাদিগকে ঐরূপ মর্যাদা দান করিয়াছেন, (হে আবূ তালিব) আপনি যাহা বলিয়াছেন। অতঃপর আমরা আরবের সর্দার ও নেতা এবং আপনারা সমস্ত মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী। আপনাদের বংশমর্যাদা, আভিজাত্য ও উচ্চ মর্যাদা কোন আরব অস্বীকার করিতে পারে না এবং অন্য কেহও অস্বীকার করিতে পারে না। নিশ্চয় আমরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সহিত আপনাদের সহিত আত্মীয়তার সম্পর্ক করিতে আগ্রহান্বিত। অতএব হে কুরায়শগণ! তোমরা সাক্ষী থাক, আমি খাদীজা বিন্ত খুওয়ায়লিদকে মুহাম্মদি ইব্ আবদুল্লাহ্ সহিত বর্ণিত মোহরানায় বিবাহ দিলাম” (প্রাগুক্ত)।
এই সময় আবূ তালিব বলিলেন, হে ওয়ারাকা! খাদীজার চাচা আমর ইব্ন আসাদও এইখানে উপস্থিত রহিয়াছেন। তিনি যদি আপনার সহিত বিবাহ প্রদানে আপনার পৃষ্ঠপোষকতা করেন তাহা হইলে আমরা আনন্দিত হইব। তখন আমর ইব্ন আসাদ বলিলেন, আপনারা সাক্ষী থাকুন, আমি আমার ভাই খুওয়ায়লিদ-এর কন্যা খাদীজাকে মুহাম্মাদ ইব্ন আবদুল্লাহ্র সহিত বিবাহ দিলাম। ইহার পর উভয় পক্ষে ইজাব ও কবুল সম্পন্ন হয় এবং পানাহারের মাধ্যমে বিপুল উৎসাহ, আনন্দ ও কোলাহলের সহিত শুভ বিবাহ সমাপ্ত হয় (আল খাসাইসুল কুবরা, আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (র), বৈরূত, ১খ, পৃ. ৯১; সীরাতুল মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, হযরত মাওলানা ইদরীস কান্দেহলবী, ১খ, দেওবন্দ, পৃ. ১১১-১১২; (আস-সীরাতু ইন্ন হিশাম, মিসর, পৃ. ১৯০)।
আস-সীরাতুল হালবিয়্যাসহ অন্যান্য সীরাত গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী প্রতীয়মান হয় যে, হযরত খাদীজা (রা)-র বিবেহে সাড়ে বার উকিয়া (اوقیه) দেনমোহর নির্ধারণ করা হইয়াছিল। উকিয়া হইল তৎকালে প্রচলিত এক প্রকার স্বর্ণ-মূদ্রার নাম আর রৌপ্যমুদ্রার নাম ছিল দিরহাম। এক উকিয়া চল্লিশ দিরহামের সমান। সুতরাং সাড়ে বার উকিয়ায় হইল ৫০০ দিরহাম। রাসূলুল্লাহ (স) উম্মুল মু'মিনীনদের জন্য সাড়ে বার বা ৫০০ দিরহাম দেনমোহর নির্ধারণ করিতেন। যেহেতু হযরত ফাতিমা (রা)-র মোহরও ৫০০ দিরহাম ছিল, এইজন্য এই পরিমাণ দেন মোহরানাকে মহরে ফাতেমী বলা হয় (আল্লামা আলী ইব্ন বুরহানুদ্দীন হালাবী (র), সীরাতে হালাবীয়া, পৃ. ৫-১২; আল্লামা শিবলী নুমানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নদবী, সীরাতুন্নবী (স), ১খ, পৃ. ১১৮)।
ইবন হিশাম তাঁহার সীরাত গ্রন্থে বর্ণনা করিয়াছেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত খাদীজা (রা)-কে মোহরানা হিসাবে বিশটি উট প্রদান করিয়াছিলেন। যুরকানী বলেন, ইন্ন হিশামের এই বর্ণনাটি অন্যান্য বর্ণনার পরিপন্থী নহে। কারণ বিবাহের সময় সাড়ে বার উকিয়া মোহর নির্ধারিত হইয়াছিল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ্ (স) সন্তুষ্ট হইয়া অতিরিক্ত মোহররূপে এই বিশটি উট প্রদান করিয়াছিলেন (যুরকানী, ১খ, পৃ. ২৭৫)।
নবী করীম (স)-এর বয়স যখন পঞ্চাশ বৎসর তখন হযরত খাদীজা (রা) ৬৫ বৎসর বয়সে ইনতিকাল করেন। পঁচিশ বৎসরের বৈবাহিক জীবনে হযরত খাদীজা (রা)-র গর্ভে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর দুই পুত্র ও চার কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। সন্তানদের মধ্যে কাসেম ও আবদুল্লাহ পুত্র সন্তান ছিলেন। আবদুল্লাহ-এর উপনাম ছিল তাহের ও তায়্যিব। কাসেম-এর নামানুসারেই রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর উপনাম হইয়াছিল আবুল কাসেম। পুত্রগণ শিশুকালেই ইনতিকাল করেন। কন্যাগণের নাম হইল যয়নব, রুকায়্যা, উম্মে কুলছুম ও ফাতিমা (রা)।
টিকাঃ
১. আল্লামা আবদুর রহমান ইব্ন খালদুন, তারীখে ইব্ন খালদুন, ইদারায়ে দরসে ইসলাম, দেওবন্দ ১৯৭৮ খৃ., ১খ, পৃ. ২৫-২৬;
২. আবদুর রউফ দানাপুরী, আসাহহুস সিয়ার, দেওবন্দ, ১৯৩২ খৃ., পৃ. ৮-১১;
৩. জালালুদ্দীন আস-সুয়ূতী, আল-খাসাইরূসুল কুবরা, বৈরূত, ১খ, পৃ. ৯২;
৪. আবদুর রহমান ইবনুল জাওযী, আল-ওয়াফা বিআহওয়ালিল মুস্তাফা, মিসর ১৩৮৬ হি:/ ১৯৬৬ খৃ., ১খ, পৃ. ১৪৩-১৪৫;
৫. ইব্ন হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, মিসর, ১খ, পৃ. ১৯২-১৯৫;
৬. আলী ইব্ন বুরহানুদ্দীন হালাবী (র), সীরাতে হালাবীয়া, দেওবন্দ, পৃ. ৭১-৮০;
৭. ইদরীস কান্দেহলাবী, সীরাতুল মুস্তাফা সাল্লাল্লঅহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম, দেওবন্দ ১৯৮০ খৃ., ১খ, পৃ. ১১১-১১২;
৮. আল্লামা শিবলী নুমানী ও আল্লামা সুলায়মান নদবী, সীরাতুন্নবী (স), করাচী, ১৯৮৪ খৃ., ১খ, পৃ. ১১৭-১১৮;
৯. আলহাজ্জ শমসের আলী খান রাও, সীরাতে মুহসিনে কায়েনাত (সা), বৃটেন, পৃ. ৪২-৪৬;
১০. মুহাম্মাদ রিদা, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (স), বৈরূত ১৯৮৫ খৃ., পৃ. ৩৩;
১১. শিবলী নুমানী, সীরাতুন্নবী (সা), আযমগড়,, ১৩৩৯ হি. পৃ. ১৮৫-১৮৯;
১২. মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোস্তফা চরিত, ঢাকা ১৩৯৫ হি. ১৯৭৫ খৃ., পৃ. ২৮১-২৮৬;
১৩. গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, ঢাকা ১৯৭৩ খৃ., পৃ. ৫৯-৬৪;
১৪. আবদুল খালেক, এম, এ, সাইয়েদুল মুরসালীন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১ম সং, ১৯৮৪ খৃ., পৃ. ৫৬-৫৮;
১৫. সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী, অনু. আবূ সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী, নবীয়ে রহমত (সা), মজলিস নাশরিয়াত-ই ইসলাম, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ১ম সং ১৯৯৭ খৃ., পৃ. ১২০;
১৬. মুফতী মোহাম্মদ শফী (র), অনু. মুহাম্মদ সিরাজুল হক, সীরাতে খাতিমুল আম্বিয়া, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ৪র্থ সং. ১৯৯৫, পৃ. ১০-১২;
১৭. ডঃ মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, অনু. মাওলানা আবদুল আউয়াল, হায়াতে মুহাম্মদ (স) (মহানবীর জীবন চরিত), ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১ম সং. ১৯৯৮ খৃ., পৃ. ১৫১-১৫৪;
১৮. শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, ঢাকা ১৯৯৮ খৃ., ১ম সং, পৃ. ২০৭-২১২;
১৯. ডঃ সালেহ ইবন আবদুল্লাহ ইবন হুমায়দ ও সদস্যবৃন্দ, নাদরাতুন নাঈম ফী মাকারিমে আখলাকির রাসূল (স), ঢাকা ২০০০ খৃ., ১ম সং, ১খ., পৃ. ৩১৭;
২০. মাহমুদুর রহমান, মাহবুবে খোদা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১ম সং., পৃ. ৫৯-৬২;
২১. Martin Lings, Muhammad, London 1983;
২২. W. Montgomery Watt, Muhammad At Mecca, Oxford University Press, Great Britain 1953, Page 38;
২৩. A. Guillaume, The Life of Muhammad (SM), Oxford University Press, New York 1955, P. 82.