📄 মেষ চারণ
হযরত মুহাম্মাদ (স) সা'দ গোত্রে দুধমা হালীমার নিকট অবস্থানকালে তাঁহার দুধ-ভাইদের সঙ্গে ছাগল চরাইতে যাইতেন। পিতামহের মৃত্যুর পর পিতৃব্য আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে থাকাকালেও তিনি মক্কায় আশেপাশে ছাগল চরাইয়াছিলেন। হযরত আবূ হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, "রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা এমন কোন নবী প্রেরণ করেন নাই যিনি ছাগল চরান নাই"। সাহাবীগণ তখন জানিতে চাহিলেন, "আপনিও কি?" তিনি বলিলেন, হাঁ, আমিও পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল চরাইয়াছিলাম।¹ ইবন ইসহাক উল্লেখ করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, সমস্ত নবী ছাগল লালন-পালন করিয়াছিলেন। বলা হইল, আপনিও কি ইয়া রাসূলুল্লাহ? তিনি বলিলেন, হাঁ আমিও।²
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) হইতে বর্ণিত। সাহাবীগণ জানিতে চাহিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি ছাগল চরাইয়াছিলেন? তিনি বলিলেন, হাঁ অবশ্যই, আমি ছাগল চরাইয়াছি।³
হযরত কুতাবী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, মূসা (আ) ছাগল পালক ছিলেন, দাউদ নবী (আ) ছাগল পালক ছিলেন। আমাকে নবূওয়াত দেওয়া হইয়াছে, আমিও ছাগল পালন করিয়াছি। ⁴
হযরত জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ (রা) হইতে বর্ণিত। একদা আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর সঙ্গে মেসওয়াকের ডাল সংগ্রহ করিতেছিলাম। তখন তিনি বলিলেন, তোমরা কালো রংয়ের ডালগুলো বাছিয়া লও। কারণ এগুলো ভালো ও গন্ধময় হইয়া থাকে। আমি যখন ছাগল চরাইতাম তখন এই ধরনের ডাল সংগ্রহ করিতাম। আমরা বলিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি ছাগল চরাইতেন? তিনি বলিলেন, হাঁ, আমি ছাগল চরাইয়াছিলাম। আমার পূর্বে অন্যান্য নবীগণও ছাগল চরাইয়াছিলেন। ⁵
উপরিউক্ত হাদীছ ও সীরাত গ্রন্থের বিশুদ্ধ বর্ণনা দ্বারা স্পষ্ট প্রতীয়মান হইতেছে যে, হযরত মুহাম্মাদ (স) তাঁহার জীবনের প্রথম দিকে ছাগল চরানোর দায়িত্ব পালন করিয়াছিলেন। আল্লামা সুহায়লী (র) বলেন, রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনে সম্পাদিত এই মেষ চারণকর্মটি দুই পর্বে ভাগ করা যাইতে পারে। ১ম পর্ব: শৈশবকালে যখন তিনি বনী সা'দে অবস্থান করিয়াছিলেন, তখন তিনি তাঁহার দুধ-ভাইদের সঙ্গে ছাগল চরাইতেন। ২য় পর্ব: কৈশোর অবস্থায়, তাঁহার পিতৃব্য আবূ তালিবের তত্ত্বাবধানে থাকাকালে তিনি সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কাবাসীদের ছাগল চরাইয়াছিলেন। ⁶
মক্কা বা আরবের তৎকালীন সমাজে ছাগল চরানো বা মেষ পালনকে হেয় জ্ঞান করা হইত না। জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্যান্য পেশার ন্যায় ইহাকে একটি অতি সাধারণ পেশা হিসাবে গণ্য করা হইত। হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর ছাগল চরানোর দায়িত্ব পালনে গূঢ় রহস্য ও সূক্ষ্ম তাৎপর্য ছিল এই যে, ছাগল লালন-পালনের দায়িত্ব পালনের পর তাঁহাকে আরেকটি বৃহৎ দায়িত্বভার অর্পণ করা হইতে পারে, এই ধরনের ইঙ্গিত করা হইতেছিল। ছাগল চরানোর এই ক্ষুদ্র দায়িত্ব যেন তাঁহার উপর আগত সেই বিশাল দায়িত্বের অনুশীলন ও প্রশিক্ষণ মাত্র।
একারণেই শুধুমাত্র হযরত মুহাম্মাদ (স) ছাগল চরাইয়াছিলেন তাহাই নয়, বরং ইতোপূর্বে অন্যান্য নবীগণ এই ছাগল চরানোর দায়িত্ব পালন করিয়াছিলেন। ইহার কারণ বিশ্লেষণ করিয়া বিশেষজ্ঞরা বলিয়াছেন, ছাগল লালন-পালনের মাধ্যমে একজন পালক বিনয়ী, নম্র ও ধৈর্যশীল হইয়া উঠে। আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-কে বলিতে শুনিয়াছি, "ছাগল পালকরা শান্ত, নম্র, বিনয়ী ও ধৈর্যশীল হইয়া থাকে। সাধারণত তাহারা কঠোর, নিষ্ঠুর বা অহংকারী হয় না।⁷
অপর হাদীছে তিনি বর্ণনা করেন, শান্ত, কোমলতা, নম্রতা ও সহনশীলতা হইতেছে ছাগল পালকদের স্বভাব। অপরদিকে গ্রামের যাহারা উট ও ঘোড়া লালন-পালন করে তাহারা সাধারণত হইয়া থাকে দাম্ভিক, কঠোর ও অহংকারী। ⁸
এই হাদীছদ্বয়ের বাস্তব প্রতিফলন আমরা রাসূলুল্লাহ (স)-এর জীবনে দেখিতে পাই। তিনি ছিলেন ধৈর্য, সহনশীলতা ও কোমলতার মূর্ত প্রতীক। এই সকল গুণের কারণেই মুসলিমদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়িতেছিল। আল্লাহ তাআলা তাঁহার এই গুণের কথা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে সবাইকে জানাইয়া দিলেন। "আল্লাহ্র রহমতে আপনি তাহাদের প্রতি দয়ালু ও নম্র ছিলেন। আর যদি আপনি কঠোর ও নিষ্ঠুর স্বভাবের হইতেন তবে সবাই আপনার নিকট হইতে চলিয়া যাইত।"⁹
ইবন হাজার আসকালানী বলিয়াছেন, নবীদের নবৃওয়াতের দায়িত্ব প্রদানের পূর্বে ছাগল লালন-পালনের তাৎপর্য হইতেছে, তাঁহারা যেন এই ছাগল পালনের দ্বারা মানুষ সম্পর্কে খানিকটা ধারণা নিতে পারেন। কারণ ছাগল ও মানুষের স্বভাবের মাঝে কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেশ সামঞ্জস্য রহিয়াছে, যেমন সংখ্যার আধিক্য। গরু, উট বা ঘোড়ার তুলনায় সাধারণত ছাগলের সংখ্যা বেশী হইয়া থাকে। দুর্বল প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও ছাগলের স্বভাব হইেতেছে একতাবদ্ধ থাকিতে না চাওয়া, পালকের অবাধ্য হওয়া, সুযোগ পাইলেই দলছুট হইয়া যাওয়া ইত্যাদি। ¹⁰
ছাগল চরানো ও নবৃওয়াতের দায়িত্ব পালনের মাঝে সামঞ্জস্য প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ তাঁহার মুসনাদে উল্লেখ করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (স) একদা স্বপ্নে দেখিলেন যে, "তিনি একটা কূপ হইতে পানি তুলিতেছেন। কূপের আশেপাশে সাদা ও কালো রংয়ের বিশাল এক ছাগলের পাল। তিনি পানি তুলিয়া সেই ছাগল পালকে পান করাইতেছেন। কিছুক্ষণ পরে আবু বাক্স (রা) আসিলেন এবং কিছুক্ষণ পানি তুলিলেন। তারপর উমার আসিলেন এবং অনেকক্ষণ পানি তুলিয়া ছাগলগুলোকে পান করাইলেন।" ইমাম আহমাদ এই স্বপ্নের ব্যাখ্যায় বলেন, ইহার দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর এই বিশাল উম্মতের দায়িত্ব গ্রহণ এবং তাঁহার পর আবু বাক্স ও উমার (রা) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করিবেন তাহাই বুঝানো হইয়াছে। ¹¹
আল্লাহ তা'আলা এভাবেই নবী-রাসূলগণকে বিশাল দায়িত্ব প্রদানের পূর্বে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দ্বারা নয়, বরং প্রকৃতির মাঝে মরুভূমির শুষ্ক পরিবেশে ছাগল পালনের মাধ্যমে শিক্ষা দিলেন দায়িত্ব পালন ও পরিচালনার মূলনীতিগুলি। একজন ছাগল পালকের প্রতিদিন ভোরে একপাল ছাগল হাঁকাইয়া লইয়া যাওয়া, ইহাদের জন্য উপযুক্ত তৃণভূমি নির্বাচন, বিক্ষিপ্ত ছাগল পালকে একত্র রাখা, চোর-বদমাইশ বা হিংস্র প্রাণীর কবল হইতে ইহাদের হেফাজত করা, আবার দিন শেষে এই ছাগল পালকে বাড়িতে ফিরাইয়া আনা— এই সবই তাহাকে করিয়া তোলে অত্যন্ত ধৈর্যশীল, সহনশীল, সহিষ্ণু, সদাজাগ্রত, কাজের প্রতি একনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল। আধুনিক গবেষকরাও ইহা স্বীকার করিয়াছেন যে, কোন জাতির দায়িত্ব গ্রহণ, পরিচালনা বা প্রশাসনের জন্য উপরিউক্ত গুণগুলিই হইতেছে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। ¹²
ছাগল পালনের মাধ্যমে আরেকটা বিষয় স্পষ্টভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছে। হযরত মুহাম্মাদ (স) বাল্যকাল হইতেই ছিলেন তীক্ষ্ণ উপলব্ধি ও বোধসম্পন্ন। পিতামহের মৃত্যুর পর তিনি পিতৃব্য আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হইতেছিলেন। আবু তালিবের সংসার ছিল বেশ অসচ্ছল। অধিক সন্তান এবং অল্প আয়ের কারণে সংকটের মাঝে তাহার সংসার চলিতেছিল। হযরত মুহাম্মাদ (স) বালক বয়সেই তাহা ভালোভাবে উপলব্ধি করিলেন। তাঁহার মন ব্যথিত হইয়া উঠিল। তিনি ভাবিতে লাগিলেন, কি করিয়া তাঁহার পিতৃব্যের সহযোগিতা করিতে পারেন। মক্কার অদূরে সাফা পাহাড়ের নিকটে তিনি ছাগল চরাইতেন। তাঁহার অর্জিত সামান্য পারিশ্রমিক হয়ত বা চাচা আবু তালিবের বিরাট সংসারে তেমন কোন ভূমিকা রাখিত না, কিন্তু ইহার দ্বারা রাসূলুল্লাহ (স)-এর মহানুভবতা, উদারতা ও কৃতজ্ঞতাবোধ স্পষ্টভাবে ফুটিয়া উঠিয়াছিল। ¹³
টিকাঃ
১. বুখারী, ১খ., কিতাবুল ইজারা, বাব রা'ইল গানাম, পৃ. ৩০১;
২. ইমাম আহমাদ, ৩খ., পৃ. ১৭;
৩. ইবন হিশাম, সীরাত, ১খ., পৃ. ১৬৭;
৪. সুহায়লী, রাওদুল উনুফ, ১খ., পৃ.,১৯৩;
৫. রাওদুল উনুফ, ১খ., পৃ. ১৯৫;
৬. রাওদুল উনুফ, ১খ.;
৭. মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, ১খ., পৃ. ৭২;
৮. মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, ১খ., পৃ. ৭৩;
৯. সূরা আল-ইমরান, আয়াত নং ৫৯;
১০. ফাতহুল বারী, ৪খ., পৃ. ৪৪১;
১১. মুসনাদ আহমাদ ৫খ., পৃ. ৪৫৫;
১২. ড. রাউফ পালাবী, আল-মুজতামিঈল কাবলাল ইসলাম, পৃ. ১৯৬;
১৩. সাঈদ হাবী, সীরা নববীয়া, ১খ., পৃ. ৯২।
📄 ফিজার যুদ্ধে মহানবী (স)-এর অংশগ্রহণ
দীন ইসলামের অভ্যুদয়ের পূর্ব পর্যন্ত আরবজাহানে অব্যাহতভাবে যেসব যুদ্ধ চলিয়া আসিতেছিল তাহার মধ্যে 'হারবুল ফিজার' বা ফিজার যুদ্ধ ছিল সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও ভয়ংকর। 'হারব' শব্দের অর্থ যুদ্ধ এবং 'ফিজার' শব্দের অর্থ সত্য পথ ত্যাগ করিয়া বিপথে গমন। জাহিলী যুগেও আরবদের মধ্যে মুহাররম, রজব, যুল-কা'দা ও যুল-হিজ্জা এই মাস চতুষ্টয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ থাকিত। এই চারিটি মাস তাহাদের নিকট নিষিদ্ধ মাস হিসাবে অত্যন্ত পবিত্র ছিল। এসব মাসে যুদ্ধ করা ছিল তাহাদের নিকট মহাপাপ (ফুজুর)। আলোচ্য যুদ্ধ নিষিদ্ধ মাসে অনুষ্ঠিত হওয়ায় তাহারা ইহার নামকরণ করে 'হারবুল ফিজার' (পাপের যুদ্ধ, অন্যায় যুদ্ধ)। বিভিন্ন কারণে এই যুদ্ধ চারবার অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ফিজার যুদ্ধ বানু কিনানা ও বানু হাওয়াযিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়, তখন নবী (স)-এর বয়স ছিল দশ বৎসর। দ্বিতীয় ফিজার যুদ্ধ কুরায়শ ও হাওয়াযিন গোত্রের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়, তৃতীয় ফিজার যুদ্ধ কিনানা ও হাওয়াযিন গোত্রের মধ্যে এবং চতুর্থ ফিজার যুদ্ধ কুরায়শ ও কায়স আয়লান গোত্রের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় (হযরত মুহাম্মাদ মুস্তাফা (স), সমকালীন পরিবেশ, পৃ. ১৯৬, টীকা ১)।
চতুর্থ ফিজার যুদ্ধেই মহানবী (স) তাঁহার পিতৃব্যদের সহিত কোন কোন দিন যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন (ইবন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৯১)। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে এই যুদ্ধ সম্পর্কেই আলোচনা করা হইবে। আবরাহার হস্তীবাহিনী ধ্বংসের পর এই যুদ্ধই ছিল সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ঘটনা (শিবলীর সীরাতুন্নবী, ১খ, পৃ. ৯৩)। ইবন ইসহাক, ইবন সা'দ, বালাযুরী ও ইবন জারীর তাবারীর মতে এই যুদ্ধ বিশ হস্তী বৎসরে সংঘটিত হয় (সীরাতে সারওয়ারে আলম, ১খ, পৃ. ১০৯)। ইবন হিশামের মতে তখন রাসূলুল্লাহ (স)-এর বয়স ১৪/১৫ বৎসর (সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ, পৃ. ১৮৯) এবং ইবন ইসহাকের মতে ২০ বৎসর (ঐ গ্রন্থ, ১খ, পৃ. ১৯১))। এই যুদ্ধের এক পক্ষে ছিল কিনানা-গোত্র ও কুরায়শ গোত্র এবং অপর পক্ষে ছিল কায়স আয়লান গোত্র (ছাকীফ ও হাওয়াযিন গোত্রদ্বয়সহ)। কুরায়শ গোত্রের সকল উপগোত্র স্বতন্ত্রভাবে নিজ নিজ বাহিনী গঠন করে। হাশিম উপগোত্রের সামরিক পতাকা বহন করেন যুবায়র ইব্ন আবদুল মুত্তালিব এবং রাসূলুল্লাহ (স) এই বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কুরায়শ পক্ষের প্রধান সেনাপতি ছিল আবূ সুফ্যান (রা)-র পিতা হারব ইবন উমায়্যা (সীরাতুন-নবী, ১খ, পৃ. ১১৪)।
একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া এই যুদ্ধের সূচনা হয়। হিরা-অধিপতি নু'মান ইব্ন মুনযির প্রতি বৎসর 'উকাযের মেলায় নিজের ব্যবসায়িক পণ্যসামগ্রী প্রেরণ করিত। যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার বৎসর হাওয়াযিন গোত্রের 'উরওয়া আর-রাহহাল নামক এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি নু'মানের পণ্যসম্ভার 'উকাযের মেলায় পৌঁছানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে। ইহাতে কিনানা গোত্রের বাররাদ ইব্ন কায়স নামক এক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ক্ষিপ্ত হইয়া তাহাকে বলিল, কিনানা গোত্র বর্তমান থাকিতে তুমি তাহাকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়াছ। তোমার পিতা তোমাকে তাড়াইয়া দিয়াছে, তুমি স্বগোত্রের বিতাড়িত কুকুর। তুমি আবার এত বড় কাজের ভার গ্রহণ করিতে চাও! এই কাজ আমিই করিব। ইহার উত্তরে 'উরওয়া বলিল, হাঁ, গোটা পৃথিবীর বিরুদ্ধে হইলেও আমি এই দায়িত্ব গ্রহণ করিয়াছি। ইহাতে বাররাদ ক্রোধান্বিত হইয়া তাহাকে হত্যা করিবার সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। অবশেষে সুযোগমত সে উরওয়াকে নাজদের উচ্চভূমি তায়মান যী-তালাল নামক এলাকায় হত্যা করে। কুরায়শগণ 'উকাযের মেলায় উপস্থিত থাকা অবস্থায় তাহাদের নিকট 'উরওয়ার নিহত হওয়ার খবর পৌঁছায়। তাহারা তৎক্ষণাৎ হারাম এলাকার দিকে রওয়ানা হয়, কিন্তু হারামের সীমানায় পৌঁছার পূর্বেই হাওয়াযিন গোত্র তাহাদের নাগাল পায় এবং দিনভর যুদ্ধ চলিতে থাকে। রাত্রিবেলা কুরায়শরা হারাম এলাকার সীমার মধ্যে পৌঁছিয়া যায় এবং হাওয়াযিন গোত্র যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত হয়। অতঃপর কয়েক দিন ধরিয়া যুদ্ধ চলিতে থাকে। ইব্ন কাছীর (র) বর্ণনা করেন যে, একাধারে চার দিন যুদ্ধ চলে। 'উকায এলাকায় সংঘটিত দুই দিনের যুদ্ধ ইয়াওমু শামতাহ ও ইয়াওমুল আবলা নামে অভিহিত। তৃতীয় দিনের যুদ্ধ ইয়াওমুশ শুরব নামে অভিহিত এবং এই দিন রাসূলুল্লাহ (স) যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত ছিলেন। চতুর্থ দিন বাতনে নাখলা নামক স্থানে সংঘটিত যুদ্ধ ইয়াওমুল হারীরাহ নামে অভিহিত (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯০)। এই যুদ্ধ চলাকালে মহানবী (স) যুদ্ধে যোগদানের বয়সে পৌঁছিলেও তিনি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন নাই এবং কাহাকেও আঘাত করেন নাই। এই সম্পর্কে মহানবী (স) বলেনঃ
কুনতু উনাব্বিলু আলা আমামিয়্যা আন আরুদ্দা আনহুম নাবালা আদুবিহিম বিহা
"দুশমনদের নিক্ষিপ্ত তীর আমি কুড়াইয়া আনিয়া আমার পিতৃব্যদের হাতে দিতাম" (ইব্ন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৯১)।
ইবন সা'দের বর্ণনায় আছে, পরবর্তী কালে রাসূলুল্লাহ (স) বলিতেন, আমি যদি এতটুকু অংশগ্রহণও না-করিতাম তবে তাহাই উত্তম ছিল (আত-তাবাস্কাতুল কুবরা, ১খ, পৃ. ১২৮)। চূড়ান্ত যুদ্ধের দিন প্রথম দিকে কায়স গোত্র এবং দিনের শেষভাগে কুরায়শ গোত্র যুদ্ধে জয়লাভ করে। অতঃপর উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হওয়ার ফলে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে (শিবলীর সীরাতুন-নবী, ১খ, পৃ. ১১৪)। মহানবী (স) তাঁহার নবুওয়াত লাভের পর তাঁহার সেনাপতিত্বে পরিচালিত যুদ্ধসমূহ (গাওয়া) ছাড়া ইতোপূর্বে কেবল এই ফিজার যুদ্ধে নামমাত্র অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা তাঁহার ছিল না। ইহার দ্বারা একদিকে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ্ তা'আলা জাহিলী যুদ্ধসমূহে অংশগ্রহণ হইতে তাঁহাকে বিরত রাখেন, অপরদিকে ইসলামী যুগের যুদ্ধসমূহে তিনি যে অসম বীরত্ব ও বিচক্ষণতার স্বাক্ষর রাখেন তাহাও ছিল সম্পূর্ণ আল্লাহ প্রদত্ত। তিনি পেশাদার সিপাহসালার ছিলেন না, ছিলেন জন্মগতভাবেই সিপাহসালার (সীরাতে সারওয়ারে আলম, ২খ, পৃ. ১০৭)।
টিকাঃ
১. ইব্ন হিশাম, আস সীরাতুন-নাবাবিয়্যা, আল-মাকতাবাতুত তাওফীকিয়্যা, আল-আযহার, ১খ, পৃ. ১৮৯-৯১;
২. ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, দারু সাদির, বৈরূত তা.বি, ১খ, পৃ. ১২৬-২৯;
৩. আবদুর রহমান আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, আবদুর রহমান আল-ওয়াকীল সম্পা. ১ম সং, বৈরূত ১৪১২/১৯৯২, ২খ, পৃ. ২২৯-৩০;
৪. ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দারুল ফিকার আল-আরাবী, বৈরূত তা.বি, ২খ, পৃ. ২৮৯-৯০;
৫. শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, করাচী ১৯৮৪ খ., ১খ, পৃ. ১১৪-৫;
৬. মাওলানা ইদরীস কান্ধলাবী, সীরাতুল মুসতাফা, ১ম সং, দিল্লী ১৯৮১ খৃ. ১খ, পৃ. ৯৩;
৭. সায়্যিদ আবুল আ'লা মওদূদী, সীরাতে সারওয়ারে আলম, ৩য় সং, দিল্লী ১৯৮১ খৃ., ২খ, পৃ. ১১০-১১৮;
৮. শায়খুল হাদীছ মাওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (স)ঃ সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, ১ম সং, ঢাকা ১৪১৯/১৯৯৮, পৃ. ১৯৫-৮;
৯. মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, হায়াতে মুহাম্মাদ (স), মিসর তা.বি, পৃ. ৭৭-৭৯;
১০. ইয়াকৃত আল-হামাবী, মু'জামুল বুলদান, বৈরূত তা.বি, ২খ, পৃ. ৬৮ (শুধু তায়মান যীল-তালাল নামক স্থানের জন্য)।
📄 হিলফুল ফুযূল
হিলফুল ফুযূল )حلف الفضول(-এর হিল্ল্ফ শব্দটির উচ্চারণ হিল্ল্ফ, অর্থ পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যের অংগীকার (ইবন মানজুর, লিসানুল আরাব, ২খ, পৃ. ৯৬৩)। সুদূর অতীতে আল-ফাদল নামক কয়েকজন শান্তিপ্রিয় লোকের উদ্যোগে হিজাযে, বিশেষত মক্কা মুআজ্জমায় সামাজিক শান্তি-শৃংখলা ও জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহাই ইতিহাসে হিলফুল ফুযূল নামে প্রসিদ্ধ। আল-ফুদায়ল ইব্ন হারিছ আল-জুরহুমী, আল-ফুদায়ল ইব্ন ওয়াদা'আ আল-কাতৃরী ও আল-মুফাদ্দাল ইব্ন ফাদালা আল-জুরহুমী একতাবদ্ধ হইয়া এই মর্মে অঙ্গীকার করেন যে, তাহারা মক্কায় কোনও স্বৈরাচারী যালিমকে অবস্থান করিতে দিবে না। তাহারা আরও বলেন যে, আল্লাহ মক্কাকে যেই মর্যাদা ও মহিমা দান করিয়াছেন, তাহাতে এইরূপই হওয়া উচিৎ (আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৫৭০)। ইন্ন কুতায়বার মতে তাহাদের তিনজনেরই নাম ছিল আল-ফাদল (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯২)। হিলয়াতুল আওলিয়া গ্রন্থেও তাহাদের এই নাম উল্লিখিত হইয়াছে, কিন্তু তাহাদের পিতার নাম পর্যায়ক্রমে শারা'আ, বিদা'আ ও কাদা'আ বলা হইয়াছে (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯৩)। সুহায়লী ফাদল ইব্ন বিদা'আর স্থলে ফাদল ইব্ন ওয়াদা'আ উল্লেখ করিয়াছেন। কোন কোন বর্ণনায় কেবল ফাদল ইন্ন শারাআ ও ফadল ইব্ন কাদাআর উল্লেখ আছে, তৃতীয় ব্যক্তির উল্লেখ নাই (পৃ. গ্র. ২খ, পৃ. ২৯৩, টীকা ১)। এই সংঘ মহানবী (স)-এর আবির্ভাবের কত যুগ পূর্বে গঠিত হইয়াছিল তাহা কোন ঐতিহাসিক তথ্যে পাওয়া যায় না। কালের প্রবাহে আরবদের মধ্যে শুধু ইহার নামটিই স্মরণীয় হইয়া থাকে।
আরব গোত্রসমূহের মধ্যে অব্যাহত যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ব্যাপক হানাহানির ফলে, বিশেষ করিয়া ফিজার যুদ্ধে বহু সংখ্যক জীবনহানি ঘটিলে এবং সামাজিক শান্তি-শৃংখলা ও জনজীবনে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হইলে কিছু সংখ্যক লোকের মনে হিলফুল ফুযূলের কথা জাগ্রত হয় এবং সামাজিক নিরাপত্তা বহাল করার জন্য উক্ত সংঘের পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। সুতরাং মহানবী (স)-এর পিতৃব্য যুবায়র ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের অনুপ্রেরণায় বানু হাশিম, বানুল মুত্তালিব, বানু আসাদ ইব্ন আবদিল 'উয্যা, বানু যুহরা ইন কিলাব ও বানু তায়ম ইন্ন মুররা আবদুলজ্জাহ্ ইব্ন জুদ'আনের বাড়িতে সমবেত হইয়া ফিজার যুদ্ধের চারি বৎসর পর মহানবী (স)-এর নবুওয়াত লাভের বিশ বৎসর পূর্বে যুল-কা'দা মার্সে'হিলফুল ফুযূল' 'নামক সেবাসংঘ পুনর্গঠিত করে। ইহা আরবদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত ও প্রসিদ্ধ চুক্তি হিসাবে বিবেচিত ছিল (আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ, পৃ. ১৩৯-৪০; বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৭০; তাবাকাত ইবন সা'দ, ১খ, পৃ. ১২৮)। যুবায়র ইবন আবদুল মুত্তালিব তাহার কবিতায় এই সম্পর্কে বলেন:
ইন্নাল ফুদূলা তাহালাফূ ওয়া তাহাকামূ ওয়া তাআকাদূ ইন্নাল লা ইউকাররু বি বাতনি মাক্কাতা জালিমুন আমরিহী তাআহাদূ ওয়া তাওয়াফাকু ফাআ জারূনা ওয়া মু'তারিফূ বিহিম সালিমুন।
"ফযলেরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইল যে, মক্কায় কোন অত্যাচারীর ঠাঁই হইবে না। এই বিষয়ে তাহারা দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারাবদ্ধ হইল যে, এখানে মক্কাবাসী ও বহিরাগত সকলে নিরাপদ থাকিবে"।
মহানবী (স)-ও এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তখন তাঁহার বয়স বিশ বৎসর (তাবাকাত, ১খ, পৃ. ১২৮)। নবুওয়াত প্রাপ্তির এক সময় তিনি এই সম্পর্কে বলেনঃ
লাক্বাদ শাহিতু মা'আ উমূমাতী হিলফান ফী দরি আব্দিল্লাহ ইবন জুদ'আন মা উহিব্বু আন্নাল্লি বিহী হুমারান নি'আম ওয়ালও দু'ঈতু বিহী ফিল ইসলামি লাআজাবতু।
"আবদুল্লাহ ইব্ন জুদআনের গৃহে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠানে আমি আমার পিতৃব্যগণের সহিত অংশগ্রহণ করিয়াছি। তাহার বিনিময়ে আমাকে লাল বর্ণের উস্ত্রী প্রদান করা হইলেও আমি উহাতে সন্তুষ্ট হইব না। ইসলামী সমাজেও যদি কেহ আমাকে উহার দোহাই দিয়া ডাকে তবে আমি অবশ্যই সাড়া দিব" (মুসতাদরাক হাকেম, ২খ, পৃ. ২২০; মুসনাদে আহমাদ ১খ, পৃ. ১৯০, ১৯৪, নং)।
এই সংঘের নামকরণ সম্পর্কে বলা হইয়া থাকে যে, আদি যুগে যাহাদের উদ্যোগে ইহা গঠিত হইয়াছিল তাহাদের সকলের নামের ধাতুমূল ছিল ফা-দ-ল (ফাদল) এবং ইহা হইতেই হিলফুল ফুযূল (ফুদূল) নামকরণ করা হইয়াছে। কিন্তু ইব্ন হিশাম এই সংঘ গঠনে রাসূলুল্লাহ (স)-এর অংশগ্রহণ সংক্রান্ত হাদীছের উল্লেখ করিয়া বলেন যে, তাঁহারা প্রাপকের মাল (আল-ফুদূল) তাহাকে ফেরত প্রদানের অঙ্গীকার করিয়াছিলেন বিধায় ইহার নাম হিলফুল ফুযূল হইয়াছে। আল-হারিছ ইব্ন আবদুল্লাহ ইব্ন আবূ উসামা আল-মায়মীর আল-মুসনাদ গ্রন্থে হাদীছের শেষাংশ নিম্নরূপঃ
তা হালাফূ আন তুরদ্দাল ফুযূলা আলা আহলিহা ওয়াল্লা ইউ'আদ্দু জালিমুন মাযলূমান।
"তাহারা অঙ্গীকার করে যে, তাহারা (জোরপূর্বক ছিনাইয়া লওয়া) 'ফুদূল" (মাল) ইহার প্রাপককে প্রত্যর্পণ করিবে এবং যালেম যেন মজলুমের উপর বাড়াবাড়ি করিতে না পারে" (সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১খ, পৃ. ১৩৯)। ইন্ন হিশাম এই ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দিয়াছেন।
হিলফুল ফুযূলের প্রতিজ্ঞাসমূহ নিম্নরূপঃ
১) আমরা দেশ হইতে অশান্তি দূর করিব;
২) আমরা বহিরাগতদেরকে রক্ষা করিব;
৩) আমরা নিঃস্বদিগকে সাহায্য করিব;
৪) আমরা শক্তিহীনদের উপর শক্তিমানদের অত্যাচার প্রতিহত করিব (রাহমাতুল্লিল আলামীন, পৃ. ৪৩)।
এই সেবাসংঘের প্রচেষ্টায় সমাজে অত্যাচার-অবিচার বহুলাংশে হ্রাস পায়, মানুষের যাতায়াত নিরাপদ হয়। ইসলাম-পূর্ব যুগে একদা খাছ'আম গোত্রীয় জনৈক ব্যক্তি তাহার পরমা সুন্দরী কন্যাসহ হজ্জ অথবা উমরা করার উদ্দেশে মক্কায় আগমন করিলে নুবায়হ ইব্ন হাজ্জাজ নামক এক দুর্বৃত্ত জোরপূর্বক তাহার কন্যাকে অপহরণ করে। সে সাহায্যের আহবান জানাইলে জনতা তাহাকে বলিল, তুমি হিলফুল ফুযূলের সদস্যবৃন্দকে জানাও। তখন সে কা'বা ঘরের নিকটে দাঁড়াইয়া উচ্চস্বরে ডাকিতে লাগিল, হে হিলফুল ফুযূল। এই ডাক শুনিয়া চতুর্দিক হইতে সেবকগণ উলঙ্গ তরবারি হাতে লইয়া দৌড়াইয়া আসিয়া তাহার বিপদের কথা জিজ্ঞাসা করিল। ঘটনার বিবরণ শুনিয়া তাহারা নুবায়হ-এর বাড়িতে পৌঁছিয়া তাহার কন্যাকে উদ্ধার করিয়া আনে (বিদায়া, ২খ)।
এই প্রসঙ্গে আরও একটি ঘটনার উল্লেখ আছে। যুবায়দ গোত্রের এক ব্যক্তি তাহার পণ্যসামগ্রী লইয়া মক্কায় পৌছিয়া তাহা আস ইব্ন ওয়াইল-এর নিকট বিক্রয় করে। কিন্তু সে তাহার পণ্যদ্রব্যের মূল্য প্রদান না করিয়া তাহা আত্মসাৎ করে। উপায়ান্তর না দেখিয়া যুবায়দী হিলফুল ফুযূলভুক্ত গোত্রসমূহে উপস্থিত হইয়া তাহাদের সাহায্য প্রার্থনা করে, কিন্তু তাহারা তাহাকে সহায়তা করিতে অসম্মতি প্রকাশ করে। যুবায়দী অনিষ্ট আশংকা করিয়া সূর্যোদয়কালে আবূ কুবায়স পাহাড়ের চূড়ায় উঠিয়া উচ্চস্বরে ডাক দিয়া তাহার সর্বস্ব অপহরণের ঘটনা বিবৃত করিয়া সাহায্য প্রার্থনা করে। এই সময় কুরায়শরা তাহাদের সম্মেলন স্থলে (নাদওয়া) উপস্থিত ছিল। এই ডাক শুনিয়া যুবায়র ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের আহ্বানে আবদুল্লাহ ইব্ন জুদআনের গৃহে পূর্বোক্ত গোত্রসমূহ একত্র হইয়া হিলফুল ফুযূল গঠন করে, অতঃপর সংঘবদ্ধভাবে 'আস ইব্ন ওয়াইলের গৃহে উপস্থিত হইয়া যুবায়দীর মালপত্র উদ্ধার করিয়া দেয় (বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯১-২)।
এই আবদুল্লাহ্ ইব্ন জুদআন সম্পর্কে উম্মুল মুমিনীন আইশা (রা)-র চাচাত ভাই। একদা তিনি নবী (স)-কে বলিলেন, সে খুব অতিথিপরায়ণ ছিল এবং জনগণকে পানাহার করাইত। কিয়ামতের দিন ইহা তাহার কোন উপকারে আসিবে কিনা? মহানবী (স) বলিলেনঃ না। কেননা সে কোন দিনও এই কথা বলে নাই:
রব্বি ইগফিরলী খাতীআতী ইয়াওমাদ্দীন।
"প্রভু! কিয়ামতের দিন আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন" (মুসলিম, বাংলা অনু, ঈমান, বাবঃ যে কুফরী অবস্থায় মারা যায় তাহার কোন আমল তাহার উপকারে আসিবে না, নং ৪০৯, ১খ, পৃ. ৪০৩)।
এই হিলফুল ফুযূল ইসলামের প্রাথমিক কাল পর্যন্ত বলবৎ ছিল, কিন্তু ইহার প্রেরণা ও কার্যকরী শক্তি অনেকটা নিষ্প্রভ হইয়া পড়ে। জনগণের ইসলাম গ্রহণের পর এই সংঘের আর প্রয়োজন রহিল না। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তাহাদের জান-মালের নিরাপত্তা লাভ করে, দেশে শান্তি-শৃংখলা ফিরিয়া আসে এবং সবলেরা দুর্বলদের অত্যাচার করার পরিবর্তে সাহায্য-সহযোগিতায় আগাইয়া আসে। তাই মুসলিম সমাজে এই জাতীয় সংঘ গঠনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ফকীহগণের দুইটি বিপরীত মত লক্ষ্য করা যায়। একদল বিশেষজ্ঞ বলিয়াছেন যে, সাহায্যের মুখাপেক্ষী ব্যক্তি ইসলামের নামেই সাহায্য প্রার্থনা করিবে, কোন সংঘের দোহাই দিয়া নহে। কারণ ইহার মধ্যে জাহিলী যুগের পক্ষপাতমূলক উপাদান (তাআসসুব) বিদ্যামান। মুরায়সি' যুদ্ধকালে সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া দুই ব্যক্তির মধ্যে বিবাদ বাধিলে আনসার ব্যক্তি তাহার সহায়তার জন্য আনসারদিগকে এবং মুহাজির ব্যক্তি তাহার সহায়তার জন্য মুহাজিরদেরকে আহবান করিতে লাগিল। রাসূলুল্লাহ (স) এই ডাক শুনিয়া বলিলেনঃ ইহা ত্যাগ কর, কেননা ইহা দুর্গন্ধময়। তিনি ইহাকে জাহিলী যুগের ডাক হিসাবে আখ্যায়িত করেন (রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৮১)। মুমিনগণকে আল্লাহ তা'আলা পরস্পর ভাই হিসাবে আখ্যায়িত করিয়াছেন (দ্র. ৪৯৪ ১০)। তাই হযরত 'উমার (রা) যেভাবে আহ্বান করিয়াছেন (ইয়া লিল্লাহ, ওয়া ইয়া লিল-মুসলিমীন"), সেভাবেই আহ্বান করিতে হইবে। কারণ তাঁহারা সকলে মিলিয়া একটি দল (রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৮২)।
অপর দলের মতে হিলফুল ফুযূলের বৈধতা এখনও বিদ্যমান। রাসূলুল্লাহ (স)-এর পূর্বোক্ত হাদীছ )دعيت به اليوم لأجبت( ইহার প্রমাণ। তাঁহার কথার অর্থ ছিল, যদি কোন অত্যাচারিত ব্যক্তি হিলফুল ফুযূলের সদস্যগণকে সাহায্যের জন্য আহবান করে তবে আমি অবশ্যই তাহার ডাকে সাড়া দিব (আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৮২)। কেননা সত্যের প্রতিষ্ঠা করিতে এবং নির্যাতিতের সাহায্য করিতে ইসলামের অভ্যুদয় হইয়াছে। অতএব উক্ত সংঘ দ্বারা তাহার শক্তিই বর্দ্ধিত হইবে। রাসূলুল্লাহ (স) জাহিলী যুগের গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ-সংঘাতে শত্রু পক্ষের বিরুদ্ধে মিত্র (হালীফ) পক্ষকে সহায়তা করার সংঘ অবৈধ ঘোষণা করিয়াছেন। ইসলাম কেবল এই জাতীয় জাহিলী আহবানকে নিষিদ্ধ করিয়াছে। অন্যথায় হিলফুল ফুযূলের আবেদন এখনও অবশিষ্ট আছে (আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৮২)। হুসায়ন ইব্ন আলী (রা)-র একটি ঘটনা হইতেও ইহার সমর্থন পাওয়া যায়। যুল-মারওয়া নামক স্থানে (ওয়াদিল কুরার একটি গ্রাম; মু'জামুল বুলদান, ৫খ, পৃ. ১১৬) তাঁহার ও ওলীদ ইব্ন উৎবা ইব্ন আবূ সুফ্যানের একটি যৌথ সম্পত্তি ছিল এবং ইহাকে কেন্দ্র করিয়া তাহাদের মধ্যে বিবাদ বাধে। ওলীদ তখন আমীর মু'আবিয়া (রা)-র পক্ষ হইতে মদীনার গভর্নর ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছত্রছায়ায় হুসায়ন (রা)-কে বঞ্চিত করিয়া সম্পত্তি নিজে করায়ত্ত করেন। হুসায়ন (রা) তাহাকে বলেন, হয় তুমি আমার প্রাপ্য অধিকারের ব্যাপারে আমার প্রতি ন্যায়বিচার করিবে, অন্যথায় আমি অবশ্যই তরবারি সজ্জিত হইয়া মহানবী (স)-এর মসজিদে দাঁড়াইয়া হিলফুল ফুযূলের নামে আহবান জানাইব। তখন ওলীদের সামনে উপস্থিত আবদুল্লাহ ইব্নুয যুবায়র (রা) বলেন, আমিও আল্লাহর নামে হলফ করিতেছি যে, আমিও তাহার আহবানে সাড়া দিয়া তরবারি সজ্জিত হইয়া অবশ্যি তাহার সহায়তা করিব, যতক্ষণ না সে তাহার স্বত্বের ব্যাপারে ন্যায়বিচার প্রাপ্ত হয়। মিসওয়ার ইব্ন মাখরামা (রা) ও আবদুর রহমান ইব্ন 'উছমান (রা)-ও একই প্রতিজ্ঞা করেন। অবস্থা বেগতিক দেখিয়া ওলীদ ইব্ন উৎবা তাঁহার প্রতি সুবিচার করিতে বাধ্য হন (ইব্ন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৪০-১৬; আর-রাওদুল উনুফ, ১খ, পৃ. ৯৩-৯৪; ইব্নুল আছীর, আল-কামিল, ১খ, পৃ. ৫৭০-৫৭১; ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া, ২খ, পৃ. ২৯৩)। অতএব এই জাতীয় স্বৈরাচার ও অন্যায়-অবিচারের প্রতিরোধকালে হিলফুল ফুযূলের মত কল্যাণধর্মী সংঘের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। মহানবী (স) বলেনঃ
মান সুন্নাতান খাইরান ফাত্তাবিয়াহু আলাইহা ফালাহু আজরুহু ওয়া মিছলু উজুরি মান ইত্তাবাহু গাইরু মানকূসিন মিন উজুরিহিম শাইআন।
"কোন ব্যক্তি উত্তম প্রথার প্রচলন করিলে এবং তাহার অনুসরণ করা হইলে সে তাহার নিজের সওয়াবও প্রাপ্ত হইবে এবং তাহার অনুসারীদের সম-পরিমাণ সওয়াবও প্রাপ্ত হইবে, তবে ইহাতে তাহাদের সওয়াব হইতে কিছুই হ্রাসপ্রাপ্ত হইবে না" (তিরমিযী, 'ইল্ম, বাবঃ সৎপথে বা ভ্রান্ত পথে ডাকার ফলাফল; মুসলিম, ইল্ম, বাবঃ মান সান্না সুন্নাতান হাসানাতান..., বাংলা অনু, ৮খ, পৃ. ১৯৩-৪, নং ৬৫৫৬)।
পরবর্তী কালে বানু আবদে শামস ও বানু নাওফাল 'আবদুল্লাহ্ ইবনুয যুবায়র (রা)-র নিহত হওয়ার পর হিলফুল ফুযূল ত্যাগ করে। তাঁহার নিহত হওয়ার পর উমায়্যা-রাজ 'আবদুল মালিক ইব্ন মারওয়ানের নিকট লোকজন জড়ো হইলে কুরায়শ বংশীয় শ্রেষ্ঠ 'আলিম মুহাম্মাদ ইব্ন জুবায়র ইবন মুত'ইম (র)-কে আবদুল মালিক জিজ্ঞাসা করেন, হে সা'ঈদের পিতা! আমরা ও আপনারা অর্থাৎ বানু 'আবদে শামস ইব্ন 'আবদে মানাফ ও বানু নাওফাল ইব্ন 'আবদে মানাফ কি হিলফুল ফুযূলে শামিল নই? তিনি বলিলেন, আপনিই ভালো জানেন! আবদুল মালিক বলেন, হে সা'ঈদের পিতা! এই বিষয়ে অবশ্যই আপনি আমাকে সঠিক তথ্য প্রদান করিবেন। তিনি বলিলেন, আল্লাহর শপথ! আমরা ও আপনারা নিজেদের চুক্তি ভঙ্গ করিয়াছি। 'আবদুল মালিক বলিলেন, আপনার কথাই সত্য (ইব্ন হিশাম, ১খ, পৃ. ১৪১)।
টিকাঃ
১. ইব্ন 'হিশাম, আস-সীরাতুন নাবabিয়্যা, আল-মাকতাবাতুত তাওফীকিয়্যা, আল-আযহার (মিসর), তা. বি, ১খ, পৃ. ১৩৮-১৩৯;
২. ইব্ন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, দারুল ফিকার আল-আরাবী, বৈরূত তা.বি, ২খ, পৃ. ২৯০-২৯৩;
৩. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ১ম সং, বৈরূত ১৪০৭/১৯৮৭, ১খ, পৃ. ৫৭০-১;
৪. আবদুর রহমান আস-সুহায়লী, আর-রাওদুল উনুফ, আবদুর রহমান আল-ওয়াকীল সম্পা., ১ম সং, বৈরূত ১৪১২/১৯৯২, ২খ, পৃ. ৬৩-৬৪;৭০-৭৪; ৮১-৮৩;
৫. ইবন সা'দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, দারু সাদির, বৈরূত তা. বি, ১খ, পৃ. ১২৮-৯;
৬. কাযী মুহাম্মাদ সুলায়মান মানসূরপুরী, রাহমাতুল-লিল-আলামীন, লাহোর তা. বি, পৃ. ৪৩;
৭. সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নাদবী, নবীয়ে রহমাত (বাংলা অন্), ১ম সং, ঢাকা ১৪১৮/১৯৯৭, পৃ. ১২২-৩;
৮. শায়খুল হাদীস মওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোছাইন, হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (স): সমকালীন পরিবেশ ও জীবন, ১ম সং, ঢাকা ১৪১৯/১৯৯৮, পৃ. ১৯৯-২০১;
৯. মুঈনুদ্দীন আহমাদ নাদবী, তারীখে ইসলাম (উর্দু), লাহোর তা. বি, ১খ, পৃ. ৩৬-৭;
১০. ইদরীস কান্ধলাবী, সীরাতুল মুসতাফা, ১ম সং, দিল্লী ১৯৮১খৃ., ১খ, পৃ. ৯৩-৪;
১১. ইব্ন মানজুর, লিসানুল আরাব, দারুল মাআরিফ, বৈরূত তা.বি., ২খ, পৃ. ৯৬৩, কলাম ৩;
১২. মুহাম্মাদ হুসায়ন হায়কাল, হায়াতে মুহাম্মাদ, কায়রো তা.বি., পৃ. ৭৯-৮০;
১৩. শিবলী নু'মানী ও সায়্যিদ সুলায়মান নাদবী, সীরাতুন-নবী, করাচী ১৯৮৪ খৃ., ১খ, পৃ. ১১৫;
১৪. ইয়াকৃত আল-হামাবী, মু'জামুল বুলদান, দারুল কিতাব, বৈরূত তা.বি., ৫খ, পৃ. ১১৬।
📄 আল-আমীন উপাধিতে ভূষিত
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাহাদিগকে নবী ও রাসূল হিসাবে মনোনীত করিয়াছেন তাঁহারা সকলেই শৈশবকাল হইতেই অত্যন্ত নম্র, ভদ্র ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল। তিনি যখন আরবদেশে জন্মগ্রহণ করেন তখন আরবের সামাজিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। মদ্যপান, জুয়াখেলা, নারী নির্যাতন, মূর্তিপূজা ইত্যাদি ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার, এমনকি সামান্য কারণেই গোত্রে গোত্রে যুদ্ধের দাবানল জ্বলিয়া উঠিত, যেই যুদ্ধ যুগ যুগ ধরিয়া চলিত এবং নিরপরাধ অসংখ্য লোক সেই যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করিত। এমন একটি সমাজে জন্মগ্রহণ করিয়াও নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম শৈশবকাল হইতেই ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক ও নৈতিক চরিত্রের অধিকারী।
আল-আমীন উপাধি প্রদানের কারণ হিসাবে দুই-একটি বাস্তব ঘটনার উল্লেখ প্রয়োজন। কিশোর বয়সের সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, নম্রতা ও ভদ্রতা, নিঃসার্থ মানবপ্রেম ও সত্যিকার কল্যাণ প্রচেষ্টা, চরিত্র মাধুর্য ও অমায়িক ব্যবহারের ফলে আরবগণ তাঁহার প্রতি আকৃষ্ট হয়। অবশেষে আরবগণ তাঁহাকে আল-আমীন বা বিশ্বস্ত বলিয়া ডাকিতে থাকে। ফলে মুহাম্মাদ নাম অন্তরালে পড়িয়া গিয়া তিনি আল-আমীন নামেই খ্যাত হইয়া উঠিলেন। নীতিধর্ম বিবর্জিত ঈর্ষা-বিদ্বেষ, কলুষিত, পরশ্রীকাতর দুর্ধর্ষ আরবদের অন্তরে এতখানি স্থান লাভ করা ঐ সময়ে খুবই কঠিন ছিল। অনুপম চরিত্র মাধুর্যের অধিকারী হওয়ার কারণেই হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর পক্ষে তাহা সম্ভব হইয়াছিল। সীরাতে ইবন হিশামে বর্ণিত আছে:
ফা শাব্বা রাসুলুল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়াল্লাহু ইয়াকলাউহু ওয়া ইয়াহফাযু ওয়া ইয়াহুতুহু মিন আকযারিল জাহিলিয়্যাতি লিমা ইউরিলু বিহী মিন কারামতিহী ওয়া রিসালাতিহী হাত্তা বালাগা আন্নাল হু কানা রাজুলান ওয়া আফযালা কাউমিহী মুরুআতান ওয়া আহসানা হুম খালক্বান ওয়া আকরামা হুম হাসাবান ওয়া আহসানা হুম জিওয়ারান ওয়া আ'যামা হুম হিলমান ওয়া আসদাক্বাহুম হাদীছান ওয়া আ'যামা হুম আমানাতান ওয়া আব'আদাহুম মিনাল ফাহশি ওয়াল আখলাক্বিল লাতী তুদান্নিসু আর-রিজলা তানাজ্জুহান ওয়া তাক্বররুমান ওয়া ইসমুহু ফী ক্বাওমিহিল আমিনু লিমা জামা'আল্লাহু ফিহী মিনাল উমুরিস সালিহাতি।
"অতঃপর রাসূলুল্লাহ (স) এই অবস্থায় বয়প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন যে, স্বয়ং আল্লাহ পাক তাঁহাকে হিফাযত ও তাঁহার প্রতি দৃষ্টি রাখেন এবং জাহিলিয়াতের সমস্ত অনাচার থেকে তাঁহাকে পবিত্র ও হিফাযতে রাখেন। কেননা তাঁহাকে নবুওয়াত, রিসালাত ও উঁচু মর্যাদা প্রদান করা ছিল মহান আল্লাহ্, অভিপ্রায়। ফলে তিনি একজন নম্র, ভদ্র, চরিত্রবান, উত্তম বংশীয়, ধৈর্যশীল, সত্যবাদী ও আমনতদার ব্যক্তি হিসাবে সমাজে শীর্ষস্থান অধিকার করেন। অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা হইতে তিনি দূরে থাকিতেন। এই সমস্ত উত্তম ও নৈতিক গুণাবলীর কারণে তাঁহার স্বজাতির মধ্যে তিনি আল-আমীন খেতাবে ভূষিত হইয়াছিলেন" (সীরাতে ইবন হিশাম, ১খ, পৃ. ৬২)।
তিনি অত্যন্ত সততা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারির সহিত ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করিতেন। এইজন্য কুরায়শদের অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা থাকা সত্ত্বেও শৈশবকালেই অনেক জটিল সমস্যার সমাধান ও মীমাংসার ভার তাঁহার উপর ন্যস্ত করা হইত। রাসূলুল্লাহ (স)-এর বয়স যখন পঁয়ত্রিশ বৎসর তখন মক্কার সকল গোত্র মিলিত হইয়া পবিত্র কা'বা ঘর নির্মাণের কাজ আরম্ভ করে। যখন নির্মাণ কাজ শেষ হইয়া যায় তখন হাজরে আসওয়াদ পুনস্থাপন নিয়া এক মহাসমস্যা দেখা দেয়। প্রত্যেক গোত্রই এই কাজটি অত্যন্ত পুণ্যের মনে করিয়া তাহারা হাজরে আসওয়াদ স্থাপন করার জন্য বেশ আগ্রহী হইয়া উঠে। বিভিন্ন গোত্রের নেতৃবৃন্দ কয়েক দিন পরামর্শ করিয়াও কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারিল না। ফলে গোত্রে গোত্রে যুদ্ধ ও রক্তপাতের প্রবল আশংকা দেখা দেয়। এই সময় কুরায়শ গোত্রের সবচেয়ে বয়বৃদ্ধ ও সম্মানিত ব্যক্তি আবূ উমায়্যা ইব্ন্ন মুগীরা মাখযূমী নেতৃবৃন্দকে ডাকিয়া বলিলেন, তোমরা শুভ কাজের মধ্যে অশুভের সূত্রপাত করিও না। আমার কথা শোন! আগামী কাল ভোরে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম কা'বা ঘরে আগমন করিবেন, তাহার উপর এই বিরোধের মীমাংসার ভার অর্পণ করা হইবে। সকলেই এই প্রস্তাব মানিয়া লইল এবং শাসরুদ্ধকর অবস্থায় আগন্তুকের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিল। তাহারা ভাবিতে লাগিল, না জানি কে সর্বপ্রথম কা'বা ঘরে প্রবেশ করেন, না জানি তিনি কোন গোত্রের লোক হন এবং কি মীমাংসা করিয়া বসেন। যদি তাহার মীমাংসা মনঃপূত না হয় তাহা হইলে কি হইবে, এই উদ্বেগ ও আশংকায় তাহারা পলকহীন নেত্রে কা'বা ঘরের দিকে তাকাইয়া থাকে। এমন সময় দেখা গেল কুরায়শ বংশীয় যুবক হযরত মুহাম্মাদ (স) এই দিকে আগমন করিতেছেন। তাঁহাকে দেখিয়া সকলেই আনন্দিত হইয়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলিয়া উঠিল, ”হাযা মুহাম্মাদুন আল-আমীনু ক্বাদ রাযীনাহু।" "আল-আমীন, আমরা তাঁহার মীমাংসায় সম্মত আছি"।
নবী করীম (স) কা'বা ঘরে উপস্থিত হওয়ার পর নেতৃবৃন্দের নিকট হইতে বিষয়টি অবগত হইলেন এবং তাহাদিগকে একটি চাদর আনিতে বলিলেন। চাদর লইয়া আসার পর প্রত্যেক গোত্র হইতে একজন লোককে চাদরটি ধরিতে বলিলেন। পবিত্র হাজরে আসওয়াদ তিনি নিজ হাতে উঠাইয়া চাদরে রাখিলেন। নেতৃবৃন্দ হাজরে আসওয়াদসহ চাদর ধরিয়া কা'বা ঘরে নিয়া আসিল। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (স) চادর হইতে হাজরে আসওয়াদ উঠাইয়া যথাস্থানে স্থাপন করিলেন। নবৃওয়াত লাভের পূর্বেই হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (স)-এর বিশ্বস্ততা, বুদ্ধিমত্তা, দূরদর্শিতা ও নিরপেক্ষতার কারণে পবিত্র মক্কার জনগণ সম্ভাব্য এক ভয়াবহ যুদ্ধ ও রক্তপাত হইতে রক্ষা পাইল এবং অকুণ্ঠ চিত্তে তাঁহার প্রশংসা করিতে লাগিল (ইদরীস কান্দেহলবী, সীরাতুল মুস্তফা, ১খ, ১৯৮০ খৃ. পৃ. ১১৫)
মহানবী (স)-এর সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততার কারণে সকলের নিকট তিনি প্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ছিলেন। তিনি কখনও কোন প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিতেন না, কষ্ট হইলেও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিতে চেষ্টা করিতেন। এই প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইব্ন আবিল হামসা (রা) বর্ণনা করিয়াছেন, নবৃওয়াত লাভের পূর্বে একবার আমি হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর সহিত ব্যবসার কাজে অংশগ্রহণ করিয়াছিলাম। ইহাতে আমার যিম্মায় কিছু দেনা বাকী থাকে। আমি অঙ্গীকার করিলাম যে, অনতিবিলম্বে আমি ফিরিয়া আসিব এবং বাকী দেনা পরিশোধ করিব। আপনি কিছুক্ষণ এই জায়গায় আমার জন্য অপেক্ষা করিবেন। আমি বাড়ীতে চলিয়া যাওয়ার পর ঘটনাক্রমে ঐ অঙ্গীকারের কথা ভুলিয়া যাই। তিন দিন পর ঐ অঙ্গীকারের কথা আমার মনে পড়ে। আমি দ্রুত ঐ স্থানে আগমন করিয়া দেখিতে পাই যে, তিনি আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। আমাকে দেখিয়া তিনি কোন ক্রোধ প্রকাশ করিলেন না, এমনকি কোন কটুবাক্যও প্রয়োগ করিলেন না। শুধু ইহাই বলিলেন যে, তুমি আমাকে কষ্টের মধ্যে ফেলিয়া দিয়াছ। আমি তিন দিন যাবত এইখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছি (সুনান আবূ দাউদ, কিতাবুল আদাব, বাবুল ইদ্দত, ২খ, পৃ. ৩২৬)।
টিকাঃ
১. আবূ দাউদ, আস-সুনান, দিল্লী তা.বি, ২খ, পৃ. ৩২৬;
২. ইব্ন খালদুন, তারীখ, দেওবন্দ ১৯৭৮ খৃ, ১খ. পৃ. ২৭;
৩. ইদ্রীস কান্দলাবী, সীরাতুল মুস্তাফা (স) দেওবন্দ ১৯৮০ খৃ, ১খ., পৃ. ৯৫-৯৬, ১১৫;
৪. মুফতী মুহাম্মাদ শফী (র),-সীরাতে খাতিমুল আম্বিয়া, অনুবাদ-মুহাম্মদ সিরাজুল হক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ৪র্থ সংস্করণ, ঢাকা ১৯৯৫ খৃ., পৃ. ২৪;
৫. মোহাম্মদ আকরম খা, মোস্তফা চরিত, ৪র্থ সংস্করণ, ঢাকা ১৯৭৫ খৃ. ১খ., পৃ. ২৯৫-২৯৬;
৬. গোলাম মোস্তফা, বিশ্বনবী, ঢাকা, ১৯৭৩, খৃ., দ্বাদশ সংস্করণ, পৃ. ৫৪-৫৮;
৭. সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদবী, নবীয়ে রহমত, অনুবাদঃ আবু সাঈদ মুহাম্মদ ওমর আলী, ঢাকা-চট্টগ্রাম ১৯৯৭ খৃ., পৃ. ১১৮;
৮. Karen Armstrong, Muhammad (SM), London 1991, p. 78.