📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 জন্মভূমি হইতে বিতাড়িত করা

📄 জন্মভূমি হইতে বিতাড়িত করা


ইবন জারীর তাবারী সূদ্দী হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, হযরত ঈসা (আ) আল্লাহর নিদের্শমত দাওয়াতী কাজ আরম্ভ করিলে তাঁহার প্রতি ইসরাঈলীরা বিক্ষুব্ধ হইল এবং তাঁহাকে দেশ হইতে বহিষ্কার করিল। হযরত ঈসা (আ) ও তাঁহার মাতা স্বদেশ হইতে বিতাড়িত হইয়া দেশে দেশে ঘুরিতে থাকেন (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, page ৪১০)। হযরত ঈসা (আ) দুঃখ করিয়া বলিয়াছিলেন, নিজের গ্রাম ও নিজের বাড়ি ছাড়া সমস্ত জায়গাতেই নবীরা সম্মান পান (মথি, ১৩ঃ ৫৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 শয়তান কর্তৃক প্ররোচনা

📄 শয়তান কর্তৃক প্ররোচনা


হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের ক্ষেত্রে আরেকটি বাঁধা ছিল শয়তান কর্তৃক প্ররোচনা। ইবন কাছীর বর্ণনা করেন যে, হযরত ঈসা (আ) বায়তুল মুকাদ্দাসে সালাত আদায় করেন। সেখানে হইতে ফিরিবার পথে যখন তিনি এক গিরিপথে ছিলেন তখন শয়তান তাঁহাকে আটকাইয়া বিভিন্ন প্রস্তাব দেওয়া শুরু করিল এবং বলিল, হে ঈসা! আপনার খোদার বান্দা হওয়া উচিত নহে। শয়তান এই বক্তব্য দ্বারা বারবার পীড়াপীড়ি করিবার পর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাহিলেন। তখন জিবরাঈল ও মীকাঈল আসিলেন আর দেখিলেন, ইবলীস তাহাকে পথে আটকাইয়া রাখিয়াছে। তখন জিবরাঈল (আ) তাহার দুই ডানা দ্বারা ইবলীসকে এক উপত্যকায় নিক্ষেপ করিলেন। তখন আবার শয়তান তাঁহার নিকট ফিরিয়া আসিল এবং ঈসাকে বলিতে লাগিল, আমি একটু আগেই আপনাকে সংবাদ দিলাম যে, আপনি একজন বান্দা হওয়া সমীচীন নহে, আর আপনি ক্রোধান্বিত হইলেন। আর এই ক্রোধ কোন বান্দার ক্রোধ হইতে পারে না। কারণ আপনি রাগ করার সময় কি অবস্থা দাঁড়াইয়াছিল তাহা তো আপনি দেখিলেন। তাই আমি আপনাকে একটি বিষয়ে আহ্বান করিব। তাহা হইল, আপনার জন্য আমি শয়তানদেরকে আদেশ করিব এবং তাহারা আপনার অনুসরণ করিবে। অতঃপর লোকজন যখন দেখিবে শয়তানরা আপনার অনুসরণ করিতেছে তখন তাহারা আপনার 'ইবাদত করিবে। আর আমি ইহা বলিতেছি না যে, আপনি একাই ইলাহ, আপনার সাথে আর কোন ইলাহ নাই; বরং আল্লাহ হইবেন আসমানে ইলাহ, আপনি হইবেন যমীনে ইলাহ। ঈসা (আ) আল্লাহর সাহায্য চাহিলেন। তখন ঈসরাফীল (আ), জিবরাঈল ও মীকাঈল (আ) তাঁহাকে সাহায্য করিলেন। আর ইবলীসও ঐ প্ররোচনা হইতে বিরত হইল (ইব্‌ন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২খ., page ৭৪-৭৫)। মথি সুসমাচারেও এই মর্মের একটি ঘটনার উল্লেখ রহিয়াছে (দ্র. মথি, ৩ : ৬-১২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 অনুসারীদেরকে বাধা দেওয়া

📄 অনুসারীদেরকে বাধা দেওয়া


যখন হাজার হাজার লোক হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসরণ করিতে শুরু করিল তখন ইয়াহুদী ধর্মীয় নেতারা হিংসা-বিদ্বেষে, ক্ষোভে-ক্রোধে উন্মত্ত হইয়া গেল। তাহারা তখন শুধু হযরত ঈসা (আ)-কেই বাধা দেয় নাই, বরং তাঁহার অনুসারীদেরকেও বাধা দিয়াছিল। যোহন সুসমাচারে আসিয়াছে যে, ইয়াহূদী নেতারা আগেই ঠিক করিয়াছিল যে, কেহ যদি ঈসাকে মসীহ বলিয়া স্বীকার করে তবে তাহাকে সমাজ হইতে বাহির করিয়া দেওয়া হইবে (যোহন, ৯:২২)।
এই তথ্য প্রমাণ করে যে, ইয়াহুদী সন্ত্রাসীরা জনমনে ভীতির সঞ্চার করিয়াছিল, যেন তাহারা ঈসা (আ)-এর অনুসরণ করিতে সাহস না পায়। তাহারা আল্লাহ্র রাস্তায় বাধা সৃষ্টি করিয়াছিল। তাই ইয়াহুদীদের সম্পর্কে আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
فَبِظُلْم مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَت أُحِلَّتْ لَهُمْ وَيَصَدِهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا .
"ভাল ভাল যাহা ইয়াহুদীদের জন্য বৈধ ছিল তাহা উহাদের জন্য অবৈধ করিয়াছি-তাহাদের সীমালংঘনের জন্য এবং আল্লাহ্ পথে অনেককে বাধা দেওয়ার জন্য" (৪:১৬০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হত্যার ষড়যন্ত্র

📄 হত্যার ষড়যন্ত্র


হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াত চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িল। ইয়াহুদীরা দেখিল যে, কোনভাবেই ঈসা (আ)-কে দাওয়াতী কাজ হইতে বিরত করা যাইতেছে না। তখন তাহারা তাঁহাকে মারিয়া ফেলার ষড়যন্ত্র করে। এই লক্ষ্যে প্রথমে তাহারা গোপন বৈঠক করে। মথি সুসমাচারে আসিয়াছে, সেই সময় মহা ইমাম কাইয়াফার বাড়ীতে প্রধান ইমামেরা ও ইয়াহুদীদের বৃদ্ধ নেতারা একত্র হইল এবং ঈসা (আ)-কে ধরিয়া আনিয়া মারিয়া ফেলিবার ষড়যন্ত্র করিল (দ্র. মথি, ২৬:৩-৪)।
এই ক্ষেত্রে দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসাবে তাহারা গোয়েন্দা নিয়োগ করে, তাঁহাকে বিভিন্ন লোভ দেখাইয়া আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। মথি সুসমাচারে আসিয়াছে: তখন সেই বারজন হাওয়ারীর মধ্যে এহুদা ইস্কারিয়োৎ নামের ব্যক্তিটি প্রধান ইমামের নিকট গিয়া বলিল, 'ঈসাকে আপনাদের হাতে ধরাইয়া দিলে আপনারা আমাকে দিবেন। প্রধান ইমামেরা তিরিশটা রূপার টাকা গুনিয়া দিল তাহাকে। তাহার পর হইতেই এহুদা ঈসাকে ধরাইয়া দিবার জন্য সুযোগ খুঁজিতে লাগিল (দ্র. মথি, ২৬:১৪-১৬)।
এই ক্ষেত্রে তৃতীয় পদক্ষেপ হিসাবে তাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে গ্রেফতার করার জন্য চেষ্টা চালায়। বারবার এই, প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। হযরত ঈসা (আ) এই বিষয়ে আল্লাহ্র পক্ষ হইতে অবহিত হইয়াছিলেন, যেজন্য বারবার তিনি তাঁহার অনুসারীবৃন্দকে ঐ ব্যাপারে আগাম খবর বলিয়াছিলেন। যাহাই হউক, এই দুনিয়ায় তাঁহার নবুওয়াতের শেষ সময়ে তিনি গৎসেমানি বাগানে একটা জায়গায় তাঁহার সাথীবৃন্দসহ রাত্রে আশ্রয় লইলেন। সেই সময়ে পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে ইয়াহুদা আসখারিয়তী রোমান সৈন্যদেরকে লইয়া ছোরা ও লাঠিসহ হযরত ঈসা (আ)-এর অবস্থান স্থলে পৌঁছিয়া গেল। সুসমাচারের বর্ণনানুসারে তাহাদের আগমন সম্পর্কে হযরত ঈসা (আ) আগেই টের পাইয়া গিয়াছিলেন। তাই তাঁহার সাথীরর্গ ঘুমাইয়া গেলেও তিনি তাহাদের মধ্যে পিতর, জেমস ও যোহনকে লইয়া কিছুটা জাগ্রত ছিলেন। পরে তিনি কিছু দূরে গিয়া মাটিতে সিজদায় পড়িয়া আল্লাহ্র দরবারে কান্নাকাটি করিতে লাগিলেন এবং আসন্ন বিপদ হইতে রক্ষার জন্য আল্লাহ্র কাছে সাহায্য চাহিলেন (দ্র. মথি, ২৬: ৩৬-৩৯)।
পরে তিনি তাঁহার সাথীবর্গের কাছে ফিরিয়া আসিলেন। আবার মুনাজাত করিতে লাগিলেন। ইয়াহুদা পূর্বেই সৈনিকদেরকে বুঝাইয়া আনিয়াছিল যে, আমি সেখানে গিয়া যাহাকে চুম্বন দিব তিনিই ঈসা। আর ইয়াহুদা সেখানে আসিয়া তাহাই করিল। বাইবেলের বর্ণনামতে সঙ্গে সঙ্গে সৈনিকরা আসিয়া তাহাকে ধরিল।
এই ক্ষেত্রে চতুর্থ পদক্ষেপ হিসাবে ঈসাকে গ্রেফতার করার পর ইয়াহুদী মহাসভার সামনে তাঁহার বিচার নাটকের আয়োজন করা হয় এবং এক পর্যায়ে তাহারা ঈসার বিচারের জন্য তথা হত্যা করার সিদ্ধান্ত লইয়াই রোমীয় শাসনকর্তা পীলাতের হাতে তাঁহাকে সমর্পণ করে। বার্ণাবাসের বাইবেলের বর্ণনা অনুসারে, জুদানসহ সেনাবাহিনী যখন হযরত ঈসা (আ)-এর আস্তানায় পৌছিল তখন লোকের সমাগম অনুভব করিয়া ঈসা (আ) ঘরের ভিতরে আসিয়া ঢুকিলেন। তখনি আল্লাহ পাক তাঁহাকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে সেই ঘর হইতে আসমানে তুলিয়া নেন এবং ঈসা (আ)-এর চেহারায় বিশ্বাসঘাতক জুদাস তথা ইয়াহুদার রূপান্তর ঘটে। আর সৈন্যরা তাহাকে গ্রেফতার করে (বার্ণাবাসের বাইবেল, অধ্যায় নং ২১৫-২১৬, page ২৫৪-২৫৫)। যাহাই হউক, সৈন্যদের কর্তৃক গ্রেফতার নাটক হইতে ইয়াহুদী মহাসভার সামনে বিচারকার্য এবং পরবর্তীতে পিলাতের হাতে হস্তান্তর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে কোন সময়ে হযরত ঈসা (আ)-কে উত্তোলন করা হইতে পারে। প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00