📄 ক. তাওহীদে দৃঢ়তা
হযরত ঈসা (আ) তাঁহার স্বজাতি বনু ইসরাঈলকে সত্য দীন শিক্ষাদান করিতেন। তাঁহার শিক্ষার কয়েকটি দিক বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বনু ইসরাঈলের শেষ নবী হিসাবে তিনি তাহাদিগকে নির্ভেজাল তাওহীদের শিক্ষা দিয়াছিলেন। তাওহীদ হইল একত্ববাদ। আল্লাহ্ সত্তাগত দিক, গুণগত দিক এবং সমস্ত কার্যক্রমের দিক হইতে এক ও অদ্বিতীয়। হযরত ঈসা (আ) এই আহবান ইসরাঈলী জনগণকে দিয়াছেন। যেমন পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছেঃ
وَقَالَ الْمَسِيحُ يُبَنِي إِسْرَاء مِيلَ اعْبُدُوا اللهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَاؤُهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّلِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ.
"মসীহ বলিল, হে বনূ ইসরাঈল! তোমরা আমার প্রতিপালক ও তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্ ইবাদত কর। কেহ আল্লাহ্ শরীক করিলে আল্লাহ তাহার জন্য জান্নাত নিষিদ্ধ করিবেন ও তাহার আবাস জাহান্নাম; জালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নাই" (৫ঃ ৭২)।
হযরত ঈসা (আ) আল্লাহ পাকের সত্তা, গুণাবলী ও কার্যাবলীতে একত্ব তথা তাওহীদের প্রতি আহবান করিয়ছিলেন। ঈসা (আ)-এর দাওয়াতে আল্লাহ পাক এমন সত্তা যাহা বিভাজ্য নহে, নশ্বর কোন কিছুর তিনি তুল্য নহেন। তাঁহার মধ্যে কোন ত্রুটি বা অসম্পূর্ণতা নাই। হযরত ঈসা (আ)-এর সেই সুস্পষ্ট তাওহীদের দাওয়াত সম্পর্কে আল-কুরআনে আরও বলা হয়:
وَإِذْ قَالَ اللهُ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأَمَّى الهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ قَالَ سُبْحَنَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقِّ إِنْ كُنْتُ قُلْتُهُ فَقَدْ عَلِمْنَهُ تَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِي وَلَا أَعْلَمُ مَا فِي نَفْسِكَ إِنَّكَ أَنْتَ عَلامُ الغُيُوب . مَا قُلْتُ لَهُمْ إِلا مَا أَمَرْتَنِي بِهِ أَنِ اعْبُدُوا اللهَ رَبِّي وَرَبِّكُمْ وَكُنْتُ عَلَيْهِمْ شَهِيدًا مَا دُمْتُ فِيهِمْ فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ وَأَنْتَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ إِنْ تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادَكَ وَإِنْ تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الحكيم .
"আর আল্লাহ যখন বলিবেন, হে মারয়াম তনয় ঈসা! তুমি কি লোকদিগকে বলিয়াছিলে যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আমাকে ও আমার জননীকে ইলাহরূপে গ্রহণ কর? সে বলিবে, তুমিই মহিমান্বিত! যাহা বলার অধিকার আমার নাই, তাহা বলা আমার পক্ষে শোভন নহে। যদি আমি তাহা বলিতাম তবে তুমি তো তাহা জানিতে। আমার অন্তরের কথা তো তুমি অবগত আছ, কিন্তু তোমার অন্তরের কথা আমি অবগত নহি! তুমি তো অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত। তুমি আমাকে যে আদেশ করিয়াছ তাহা ব্যতীত তাহাদিগকে আমি কিছুই বলি নাই; তাহা এই: তোমরা আমার ও তোমাদিগের প্রতিপালক আল্লাহর ইবাদত কর এবং যত দিন আমি তাহাদিগের মধ্যে ছিলাম তত দিন আমি ছিলাম তাহাদিগের কার্যকলাপের সাক্ষী। কিন্তু যখন তুমি আমাকে তুলিয়া লইলে তখন তুমিই তো ছিলে তাহাদিগের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক এবং তুমিই সর্ব বিষয়ে সাক্ষী। তুমি যদি তাহাদিগকে শাস্তি দাও তবে তাহারা তো তোমারই বান্দা, আর যদি তাহাদিগকে ক্ষমা কর তবে তুমি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়" (৫: ১১৬-১১৮)।
উপরিউক্ত আয়াতগুলি পর্যালোচনা করিলে তাওহীদের ব্যাপারে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, ঈসা (আ) ও তাঁহার মাতা মা'বুদ ছিলেন না, বরং তাঁহারা ছিলেন আল্লাহ্র বান্দা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, খৃস্টানগণ পরবর্তীতে ত্রিত্ববাদ (Trinity)-এর মাধ্যমে এক আল্লাহকে বিভাজিত করিয়া তিন খোদা বানাইয়াছে। আকীদা বিষয়ে হযরত ঈসা (আ) রেসালতের আকীদাকে অন্তর্ভুক্ত করিয়াছিলেন। তিনি দাবি করেন নাই যে, তিনি আল্লাহর পুত্র বা মানুষের প্রভু, বরং ঘোষণা করিয়াছিলেন, আমি তোমাদের প্রতি প্রেরিত আল্লাহ্র রাসূল ও নবী। যেমন- আল-কুরআনে বলা হইয়াছে:
وَإِذْ قَالَ عِبْسَى بْنُ مَرْيَمَ يُبَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِنْ بَعْدِى اسْمُهُ أَحْمَدُ فَلَمَّا جَاءَهُمْ بِالْبَيِّنَتِ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُّبِينٌ .
"আর স্মরণ কর, মারয়াম তনয় ঈসা বলিয়াছিল, হে বনূ ইসরাঈল! আমি তোমাদিগের নিকট আল্লাহ্র রাসূল এবং আমার পূর্ব হইতে তোমাদিগের নিকট যে তাওরাত রহিয়াছে আমি তাহার সমর্থক এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসূল আসিবে আমি তাহার সুসংবাদদাতা। পরে সে যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ ইহাদিগের নিকট আসিল উহারা বলিতে লাগিল, ইহা তো এক স্পষ্ট যাদু" (৬১:৬)।
এমনিভাবে আখেরাতের 'আকীদা-বিশ্বাসের দিকেও তিনি বনূ ইসরাঈলকে দাওয়াত দিয়াছেন। আল-কুরআনে এই সম্পর্কে তাঁহার উক্তি উল্লেখ করা হইয়াছে:
وَالسَّلَامُ عَلَى يَوْمَ ولدتُ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أَبْعَثُ حَيَا .
"আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মলাভ করিয়াছি, যেদিন আমার মৃত্যু হইবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হইব" (১৯:৩৩)।
এমনিভাবে তিনি তাঁহার অনুসারীদেরকে বেহেশত-দোযখের কথা বর্ণনা করিয়াছেন। যেমন আয়াতে কুরআনে আসিয়াছে, ঈসা (আ) বলিয়াছিলেন:
إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ .
"কেহ আল্লাহ্ শরীক করিলে আল্লাহ তাঁহার জন্য জান্নাত নিষিদ্ধ করিবেন" (৫: ৭২)।
আর ইবাদতের ক্ষেত্রেও তাঁহার দিকনিদের্শনা ছিল। তিনি লোকজনকে সালাত ও যাকাত আদায়ের জন্য আদেশ করিতেন। আল-কুরআনে উল্লেখ করা হইয়াছে:
وأوصني بالصلوة والزكوة مَا دُمْتُ حَيا .
"তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করিতে" (১৯:৩১)।
সুতরাং সেই ইবাদতগুলি তিনি নিজে পালন করিতেন এবং অপরকে পালন করিতে আদেশ দিতেন। সুসমাচারসমূহেও ইহার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় (দ্র. মথি সুসমাচার: ১৬-১৮)।
📄 খ. তাকওয়া ও রাসূলের অনুসরণ শিক্ষা
হযরত ঈসা (আ)-এর শিক্ষার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হইল তাকওয়া অবলম্বন। তিনি যেমনিভাবে নিজে কাকুতি-মিনতি করিয়া আল্লাহ্র কাছে কান্নাকাটি করিতেন তেমনিভাবে তাঁহার স্ব-জাতির লোকজনকেও নির্দেশ দিতেন আল্লাহকে ভয় করিবার জন্য। সাথে সাথে ইসরাঈল জাতিকে আল্লাহ্র রাসূল হিসাবে তাঁহার অনুসরণের আদেশ করিতেন। আল-কুরআনে ঈসা (আ)-এর এই শিক্ষাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই আসিয়াছে। ইরশাদ হইয়াছে:
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ.
"সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে অনুসরণ কর" (৩ঃ ৫০)।
সূরা যুখরুফ-এ আরো উল্লেখ আছে : "ঈসা যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ আসিল, সে বলিয়াছিল, আমি তো তোমাদিগের নিকট আসিয়াছি প্রজ্ঞাসহ এবং তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করিতেছ তাহা স্পষ্ট করিয়া দিবার জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার অনুসরণ কর" (সূরা যুখরুফ: ৬৩)।
উল্লেখ্য যে, অধিকাংশ মুফাসসির-এর মতে হিকমত শব্দের অর্থ বাস্তবায়ন রীতি যাহাকে সুন্নাতও বলা হয়। তাই উপরিউক্ত আয়াতে ঈসা (আ)-এর হিকমত অর্থ তাঁহার সুন্নাত। তাই উক্ত আয়াতে কারীমায় আল্লাহভীতি তথা তাকওয়ার পাশাপাশি তাঁহার প্রেরিত নবীর সুন্নাত অনুসরণের জন্য আহবান জানাইয়াছিলেন। উল্লেখ্য যে, বার্নাবাসের বাইবেলে বারবার তাকওয়ার প্রসঙ্গটি আসিয়াছে (দ্র. বার্নাবাসের বাইবেল, অধ্যায় নং ৩৩, page ৩৯, অধ্যায় নং ১০৮, page ১৩০, অধ্যায় নং ১১১, page ১৩৩)।
📄 গ. আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধন
হযরত ঈসা (আ)-এর মু'জিযাগুলি রূহানী জগতের সন্ধান দেয়। এইগুলির মাধ্যমে তিনি বস্তুবাদী ইয়াহুদীদেরকে আধ্যাত্মিকতার উৎকর্ষ সাধনের আহবান জানান। আল-কুরআনে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ)-কে রূহানী শক্তিতে বলিয়ান করা হইয়াছিল। ইরশাদ হইয়াছে :
إِذْ قَالَ اللَّهُ يُعِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ وَعَلَى وَالِدَتِكَ إِذْ أَيْدَتُكَ بِرُوحِ الْقُدُسِ.
"আল্লাহ বলিবেন, হে মারয়াম তনয় ঈসা! তোমার প্রতি ও তোমার জননীর প্রতি আমার অনুগ্রহ স্মরণ কর, পবিত্র আত্মা দ্বারা আমি তোমাকে শক্তিশালী করিয়াছিলাম" (৫ঃ ১১০)।
বার্নাবাসের বাইবেলে একাধিকবার ঈসা (আ) কর্তৃক তওবা ও অনুতাপের শিক্ষা এবং ইহার প্রতি তাকীদ দানেরও উল্লেখ রহিয়াছে (বার্নাবাসের বাইবেল, অধ্যায় নং ১০১, পৃষ্ঠা নং ১২০-১২, অধ্যায় নং ১০৭, page ১২৮, অধ্যায় নং ১৬৬, page ২০৬; মার্ক, ১: ১৫; লুক, ১৩: ৩)।