📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রচনার উপলক্ষ

📄 রচনার উপলক্ষ


এই ব্যাপারে সকলে একমত যে, লেখক বিশেষ একটি মতকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য গ্রন্থটি রচনা করেন। আর তাহা হইল মসীহের প্রতি দেবত্ব আরোপ। উপরিউক্ত আলোচনা হইতে ইহা স্পষ্ট যে, এই ইনজীলটির লেখকও অজ্ঞাত। ইহার সংকলনের স্থান-কাল সম্পর্কেও মতভেদ রহিয়াছে। ইহাকে হযরত ঈসা (আ)-এর একজন সহচরের সাথে সম্পর্কিত করিয়া রচনা করিলেও লেখক দাবি করেন নাই যে, তিনি ঈসা (আ)-এর বিভিন্ন বাণী নিজ কানে শুনিয়াছেন বা ঘটনা সরাসরি প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। ইহা গ্রীক দর্শনের আলোকে সাজানো হইয়াছে।
খৃস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতেই এই সুসমাচারের বিরুদ্ধে খৃস্ট জগতে বিরাট ঝড় উঠে। খৃস্টানদের এক বৃহৎ গোষ্ঠী এই ইনজীলকে ইউহান্নার ইনজীল মানিয়া লইতে অস্বীকার করে এবং পরবর্তী যুগে এই সুসমাচার খৃস্ট জগতের পক্ষে এক নিদারুন দুরারোগ্য মাথাব্যথায় পরিণত হইয়া যায় (প্রাগুক্ত)।
বস্তুত এই চারটি ইনজীল বা সুসমাচার, যেইগুলিকে খৃস্ট সমাজ তাহাদের ধর্মের মূল উৎস হিসাবে ধারণ করিয়াছে, উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে সেইগুলি সম্পর্কে নিম্নরূপ মন্তব্য করা যায়ঃ (১) এইগুলি হযরত ঈসা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে লেখা নহে, এমনকি তাঁহার অনুসারীদের মাধ্যমেও লিখিত নহে। যাহারা লিখিয়াছেন তাহারা কাহার নিকট হইতে কখন কিভাবে শুনিয়া লিখিয়াছেন তাহা উল্লেখ করেন নাই। অতএব ঐগুলিতে ধারণকৃত ঈসা (আ)-এর বাণীগুলি নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত নহে, বরং সূত্র পরম্পরায় বিচ্ছিন্নতা ঘটিয়াছে।
(২) ইহার লেখকগণ এমন যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন না যাহারা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হইয়াছিলেন। কেননা তাহারা ছিলেন অজ্ঞাত। (৩) এইগুলি বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্যে রচিত বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে লিখিত। (৪) এইগুলির মূল পাণ্ডুলিপি বিলুপ্ত হইয়া যায়। পরবর্তীতে কাহারা সংকলন করেন বা কাহারা তাহা অনুবাদ করেন, তাহাও অজ্ঞাত।
(৫) অধিকাংশ ইনজীল গ্রীক ভাষায় লিখিত। একমাত্র মথি লিখিত সুসমাচারটি হিব্রু ভাষায় লিখিত বলিয়া অধিকাংশ গবেষক দাবি করিয়াছেন। তাহাও আবার হারাইয়া যায়। গ্রন্থটির একটি অজ্ঞাত অনুবাদের মাধ্যমে গ্রীক অনুবাদ প্রচলিত। অথচ হযরত ঈসা (আ) এবং তাঁহার সকল হাওয়ারীর ভাষা ছিল হিব্রু ও সুরিয়ানি।
(৬) ইনজীলগুলি লিপিবদ্ধ করার প্রচেষ্টা দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতাব্দীর পূর্বে হয় নাই। ১৫০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত সাধারণ ধারণা এই ছিল যে, মৌখিক বর্ণনা লিখিত বর্ণনা হইতে অধিকতর উপযোগী। দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষভাগে লিপিবদ্ধ করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। কিন্তু এই সময়ের লিখিত জিনিস নির্ভরযোগ্য মনে করা হয় না। নিউ টেস্টামেন্টের প্রথম নির্ভরযোগ্য মূল বচন ৩৯৭ খৃস্টাব্দে অনুষ্ঠিত কার্থেজের কাউন্সিলে অনুমোদিত হয়।
(৭) বর্তমানে ইনজীলের সে সকল প্রাচীন সংস্করণ পাওয়া যায় তাহা চতুর্থ খৃষ্টীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের। দ্বিতীয় সংস্করণ পঞ্চম শতাব্দীর এবং তৃতীয় অপূর্ণ সংস্করণ যাহা রোমীয় পোপের লাইব্রেরীতে আছে তাহাও চতুর্থ শতাব্দীর অধিক পুরাতন নহে। অতএব বলা মুশকিল যে, প্রথম তিন শতাব্দীতে যেসব ইনজীল প্রচলিত ছিল তাহার সহিত বর্তমানের ইনজীলের কতটুকু সামঞ্জস্য রহিয়াছে।
(৮) কুরআনের ন্যায় ইনজীল গ্রন্থগুলি হিয্য করার কোন চেষ্টা করা হয় নাই। এই সবের প্রকাশনা অর্থগত বর্ণনার উপর নির্ভর করিত। স্মৃতিশক্তি ও বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত চিন্তাধারার প্রভাব হইতে স্বাভাবিকভাবেই এইসব মুক্ত হইতে পারে না। পরে যখন লেখার কাজ শুরু হয় তখন তাহা নকলনবীশদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করিত। প্রত্যেকেই যাহা কিছু তাহার চিন্তাধারার পরিপন্থী মনে করিত তাহা সহজেই বাদ দিতে পারিত এবং তাহার মনঃপূত কোন কিছুর অভাব দেখিলে তাহা সংযোজন করিতে পারিত (প্রাগুক্ত, page ১৫৯)।
ঐ সকল সুসমাচারে মূল বক্তব্য ও বিষয়বস্তুর দিক দিয়াও বিভিন্ন রকম ভুল-ভ্রান্তি, বৈপরীত্য, বিকৃতি ও সংযোজন-বিয়োজনের ধারা অব্যাহত রহিয়াছে। সুতরাং সেইগুলি ঈসা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে সংকলিত ইনজীল হওয়া তো দূরের কথা, সাধারণ লেখকের সংকলিত একটি বিশুদ্ধ গ্রন্থ হওয়ারও যোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন। আর এই কথা সকলেরই জানা যে, হযরত ঈসা (আ)-এর ইনজীল ছিল একটি, কিন্তু খৃষ্ট সমাজ গ্রহণ করিয়াছে চারটি। ইহাতে প্রমাণিত হয় যে, ঈসা (আ)-এর আসল ইনজীল তাহাদের হাতে নাই। তাঁহার ইনজীলের বিলুপ্তির ইহাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

এই ব্যাপারে সকলে একমত যে, লেখক বিশেষ একটি মতকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য গ্রন্থটি রচনা করেন। আর তাহা হইল মসীহের প্রতি দেবত্ব আরোপ। উপরিউক্ত আলোচনা হইতে ইহা স্পষ্ট যে, এই ইনজীলটির লেখকও অজ্ঞাত। ইহার সংকলনের স্থান-কাল সম্পর্কেও মতভেদ রহিয়াছে। ইহাকে হযরত ঈসা (আ)-এর একজন সহচরের সাথে সম্পর্কিত করিয়া রচনা করিলেও লেখক দাবি করেন নাই যে, তিনি ঈসা (আ)-এর বিভিন্ন বাণী নিজ কানে শুনিয়াছেন বা ঘটনা সরাসরি প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। ইহা গ্রীক দর্শনের আলোকে সাজানো হইয়াছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00