📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 লেখক পরিচিতি

📄 লেখক পরিচিতি


যোহনের লিখিত সুসমাচারটি অপর তিন সুসমাচার হইতে অনেকটা ভিন্নধর্মী। খৃস্টানদের মতে সর্বপ্রথম রচিত গসপেলটি হইল মার্কের। আর সবচেয়ে যথাযথ মানের গসপেল হইল যোহনের গসপেলটি (Ency. Britannica. vol. 13., Page 14)। এইজন্য তাহারা ইহাকে খুবই গুরুত্ব দিয়া থাকে। এই সুসমাচারের লেখক যোহন কি যেবেদীর পুত্র ইউহান্না হাওয়ারী, যাহাকে হযরত মসীহ (আ) ভালবাসিতেন, না অন্য কোন যোহন উহা লইয়া গবেষকগণের মাঝে প্রচণ্ড মতবিরোধ রহিয়াছে। (১) খৃস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর খৃস্টান পণ্ডিতগণ উক্ত সুসমাচারকে হাওয়ারী যোহনের বলিয়া স্বীকার করেন না। (২) স্টাডলিন বলেন, গোটা সুসমাচারটি আলেকেজান্দ্রীয় খৃস্টমণ্ডলী বা জনৈক ছাত্রের রচিত (শায়খ আবূ যাহরা, প্রাগুক্ত, page ৫০; মুতাওয়াল্লী ইউসুফ শালাবী, প্রাগুক্ত, page ৪৭)।
এই সম্পর্কে ইকুমেনিক্যাল ট্রান্সলেশন অব দা বাইবেলের ভাষ্যকারবৃন্দ বলেন, বেশির ভাগ সমালোচকই মনে করেন, এই সুসমাচারটি যে যোহনের লেখা সে ধারণা গ্রহণযোগ্য নহে, যদিও যোহনের রচনার সম্ভাবনা একেবারে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। তবে সব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করিয়া দেখিলে একটা বিষয় সুস্পষ্ট হইয়া উঠে যে, আজ যোহনের নামে যে সুসমাচারটি আমরা পাইতেছি তাহার লেখক ছিলেন একাধিক ব্যক্তি। "খুব সম্ভব যীশুর সঙ্গী যোহন কর্তৃক লিখিত এই সুসমাচারটি (ইনজীলের চতুর্থ খণ্ড) তাঁহার শিষ্যবর্গের দ্বারা সাধারণ্যে সম্প্রচারিত হইয়াছিল। সেই শিষ্যরাই খুব সম্ভব এই সমাচারে ২১নং অধ্যায়টি সংযুক্ত করিয়াছিলেন; এবং সেই সঙ্গে বেশ কিছু বর্ণনাও তাহারা একসাথে জুড়িয়া দিয়া থাকিবেন, যেমন ৪:২ এবং সম্ভবত ৪:১; ৪:৪৪; ৭:৩৭ (খ); ১১:২ ও ১৯:৩৫)। ব্যভিচারী স্ত্রীলোক সংক্রান্ত বর্ণনাটি সম্পর্কে সকলেই স্বীকার করেন যে, ইহা অজ্ঞাতনামা লেখকের রচনা, পরে ইহার সাথে জুড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও কিন্তু এই রচনাটি আসমানী কিতাব বলিয়া পরিচিত ইন্‌ন্জীলের অন্তর্ভুক্ত হইয়া আছে"। ১৯ অধ্যায়ের ৩৫ নং বাণীতে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যের উল্লেখ রহিয়াছে (ও. ক্যালম্যান)। যোহনের গোটা সুসমাচারে ইহাই একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য; কিন্তু ভাষ্যকারদের বিশ্বাস, এই বক্তব্যটিও পরে সংযুক্ত করা হইয়াছে। ক্যালম্যানের মতে, যোহন লিখিত সুসমাচারে এ ধরনের পরবর্তী সংযোজন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। যেমন ২১ নম্বর অধ্যায়টি সম্ভবত যোহনের কোন শিষ্যের রচনা, যিনি গোটা সুসমাচারের মূল বর্ণনায়ও কিছু কিছু রদবদল সাধন করিয়া থাকিবেন। উপরে যেসব অভিমত তুলিয়া ধরা হইল সেসব অভিমত অন্য কাহারও নহে, বরং বাইবেল সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ এবং সর্বজন স্বীকৃত খৃস্টধর্ম তত্ত্ববিদগণের। বলা অনাবশ্যক যে, এই ধরনের সুবিখ্যাত খৃস্টধর্মীয় গবেষকদের অভিমতই এই সুসমাচারটির আসল লেখক যে কে সেই সম্পর্কে সন্দেহ জাগিবার জন্য যথেষ্ট (ড. মরিস বুকাইলি, প্রাগুক্ত, page ১১২-১১৩)।
Encyclopaedia Britannica-এর মতে, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, যোহনের সুসমাচারটি একটি জাল কিতাব। ইহার দ্বারা লেখক দুইজন হাওয়ারীর পরস্পর বিরোধ দেখানো হইয়াছে। সেই দুইজন হইলেন যোহন ও মথি। আর এই জাল লেখক মূল কিতাবে দাবি করিয়াছেন যে, তিনি সেই সহচর যাহাকে ঈসা (আ) ভালবাসিতেন। অতঃপর গীর্জা এই বাক্যটিকেই শিরোধার্য করিয়া লয় (Encyclopaedia Britannica)।
অতএব চতুর্থ ইনজীলের লেখক এই যোহন কে ছিলেন তাহা এমনকি খৃস্টান ঐতিহাসিকগণও জানেন না। যোহন নামে তো অনেকেই ছিল। সুসমাচারে বর্ণিত হইয়াছে যে, মার্ক নামীয় ব্যক্তিকেও যোহন নামে অভিহিত করা হইত। নিউয়র্কের ট্রিনিটি কলেজের অধ্যাপক ডঃ গ্রান্ট-এর মতে যোহন খৃস্টান ছিলেন। আর ইহার পাশাপাশি তিনি হেলেনিক দার্শনিকও ছিলেন, আর সম্ভবত তিনি ইয়াহুদী, ছিলেন না, কিন্তু পূর্বদেশীয় বা গ্রীসের অধিবাসী ছিলেন (F. Grant, Ibid, Page 174)। ইব্‌ন্ হাযম-এর মতে ইহা গ্রীক ভাষায় লিখিত ছিল।

যোহনের লিখিত সুসমাচারটি অপর তিন সুসমাচার হইতে অনেকটা ভিন্নধর্মী। খৃস্টানদের মতে সর্বপ্রথম রচিত গসপেলটি হইল মার্কের। আর সবচেয়ে যথাযথ মানের গসপেল হইল যোহনের গসপেলটি (Ency. Britannica. vol. 13., P.14)। এইজন্য তাহারা ইহাকে খুবই গুরুত্ব দিয়া থাকে।

লেখক পরিচিতি: এই সুসমাচারের লেখক যোহন কি যেবেদীর পুত্র ইউহান্না হাওয়ারী, যাহাকে হযরত মসীহ (আ) ভালবাসিতেন, না অন্য কোন যোহন উহা লইয়া গবেষকগণের মাঝে প্রচণ্ড মতবিরোধ রহিয়াছে। (১) খৃস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীর খৃস্টান পণ্ডিতগণ উক্ত সুসমাচারকে হাওয়ারী যোহনের বলিয়া স্বীকার করেন না। (২) স্টাডলিন বলেন, গোটা সুসমাচারটি আলেকেজান্দ্রীয় খৃস্টমণ্ডলী বা জনৈক ছাত্রের রচিত (শায়খ আবূ যাহরা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫০; মুতাওয়াল্লী ইউসুফ শালাবী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭)।

এই সম্পর্কে ইকুমেনিক্যাল ট্রান্সলেশন অব দা বাইবেলের ভাষ্যকারবৃন্দ বলেন, বেশির ভাগ সমালোচকই মনে করেন, এই সুসমাচারটি যে যোহনের লেখা সে ধারণা গ্রহণযোগ্য নহে, যদিও যোহনের রচনার সম্ভাবনা একেবারে উড়াইয়া দেওয়া যায় না। তবে সব কিছু বিচার-বিশ্লেষণ করিয়া দেখিলে একটা বিষয় সুস্পষ্ট হইয়া উঠে যে, আজ যোহনের নামে যে সুসমাচারটি আমরা পাইতেছি তাহার লেখক ছিলেন একাধিক ব্যক্তি। “খুব সম্ভব যীশুর সঙ্গী যোহন কর্তৃক লিখিত এই সুসমাচারটি (ইনজীলের চতুর্থ খণ্ড) তাঁহার শিষ্যবর্গের দ্বারা সাধারণ্যে সম্প্রচারিত হইয়াছিল। সেই শিষ্যরাই খুব সম্ভব এই সমাচারে ২১নং অধ্যায়টি সংযুক্ত করিয়াছিলেন; এবং সেই সঙ্গে বেশ কিছু বর্ণনাও তাহারা একসাথে জুড়িয়া দিয়া থাকিবেন, যেমন ৪:২ এবং সম্ভবত ৪:১; ৪:৪৪; ৭:৩৭ (খ); ১১:২ ও ১৯:৩৫)। ব্যভিচারী স্ত্রীলোক সংক্রান্ত বর্ণনাটি সম্পর্কে সকলেই স্বীকার করেন যে, ইহা অজ্ঞাতনামা লেখকের রচনা, পরে ইহার সাথে জুড়িয়া দেওয়া হইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও কিন্তু এই রচনাটি আসমানী কিতাব বলিয়া পরিচিত ইন্‌ন্জীলের অন্তর্ভুক্ত হইয়া আছে”। ১৯ অধ্যায়ের ৩৫ নং বাণীতে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যের উল্লেখ রহিয়াছে (ও. ক্যালম্যান)। যোহনের গোটা সুসমাচারে ইহাই একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য; কিন্তু ভাষ্যকারদের বিশ্বাস, এই বক্তব্যটিও পরে সংযুক্ত করা হইয়াছে। ক্যালম্যানের মতে, যোহন লিখিত সুসমাচারে এ ধরনের পরবর্তী সংযোজন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। যেমন ২১ নম্বর অধ্যায়টি সম্ভবত যোহনের কোন শিষ্যের রচনা, যিনি গোটা সুসমাচারের মূল বর্ণনায়ও কিছু কিছু রদবদল সাধন করিয়া থাকিবেন। উপরে যেসব অভিমত তুলিয়া ধরা হইল সেসব অভিমত অন্য কাহারও নহে, বরং বাইবেল সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ এবং সর্বজন স্বীকৃত খৃস্টধর্ম তত্ত্ববিদগণের। বলা অনাবশ্যক যে, এই ধরনের সুবিখ্যাত খৃস্টধর্মীয় গবেষকদের অভিমতই এই সুসমাচারটির আসল লেখক যে কে সেই সম্পর্কে সন্দেহ জাগিবার জন্য যথেষ্ট (ড. মরিস বুকাইলি, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১২-১১৩)।

Encyclopaedia Britannica-এর মতে, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, যোহনের সুসমাচারটি একটি জাল কিতাব। ইহার দ্বারা লেখক দুইজন হাওয়ারীর পরস্পর বিরোধ দেখানো হইয়াছে। সেই দুইজন হইলেন যোহন ও মথি। আর এই জাল লেখক মূল কিতাবে দাবি করিয়াছেন যে, তিনি সেই সহচর যাহাকে ঈসা (আ) ভালবাসিতেন। অতঃপর গীর্জা এই বাক্যটিকেই শিরোধার্য করিয়া লয় (Encyclopaedia Britannica)।

অতএব চতুর্থ ইনজীলের লেখক এই যোহন কে ছিলেন তাহা এমনকি খৃস্টান ঐতিহাসিকগণও জানেন না। যোহন নামে তো অনেকেই ছিল। সুসমাচারে বর্ণিত হইয়াছে যে, মার্ক নামীয় ব্যক্তিকেও যোহন নামে অভিহিত করা হইত। নিউয়র্কের ট্রিনিটি কলেজের অধ্যাপক ডঃ গ্রান্ট-এর মতে যোহন খৃস্টান ছিলেন। আর ইহার পাশাপাশি তিনি হেলেনিক দার্শনিকও ছিলেন, আর সম্ভবত তিনি ইয়াহুদী, ছিলেন না, কিন্তু পূর্বদেশীয় বা গ্রীসের অধিবাসী ছিলেন (F. Grant, Ibid, P. 174)। ইব্‌ন্ হাযম-এর মতে ইহা গ্রীক ভাষায় লিখিত ছিল।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রচনার কাল

📄 রচনার কাল


এই সুসমাচারের সংকলনের তারিখ লইয়া খৃস্টান গবেষকগণ মতানৈক্য করিয়াছেন। ড. পোষ্টের মতে, খুব সম্ভব ইহা ৯৫, ৯৮, ৯৬ খৃস্টাব্দে সংকলিত হয়। এই ব্যাপারে ইউরোন বলেন, ৪র্থ ইনজীলটি ৬৮ অথবা ৬৯ অথবা ৭০ অথবা ৭৯ অথবা ৯৮ খৃস্টাব্দে সংকলন করা হয় (শায়খ আবূ যাহরা, প্রাগুক্ত, page ৫২-৫৩)। যারজিস জেবিনের মতে, ইহা ৯৬ খৃস্টাব্দে রচিত হয়। আলুসীর মতে, ইহা ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্ব গমনের ৩০ বৎসর পর রচিত হয় (আলুসী, প্রাগুক্ত)।

এই সুসমাচারের সংকলনের তারিখ লইয়া খৃস্টান গবেষকগণ মতানৈক্য করিয়াছেন। ড. পোষ্টের মতে, খুব সম্ভব ইহা ৯৫, ৯৮, ৯৬ খৃস্টাব্দে সংকলিত হয়। এই ব্যাপারে ইউরোন বলেন, ৪র্থ ইনজীলটি ৬৮ অথবা ৬৯ অথবা ৭০ অথবা ৭৯ অথবা ৯৮ খৃস্টাব্দে সংকলন করা হয় (শায়খ আবূ যাহরা, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫২-৫৩)। যারজিস জেবিনের মতে, ইহা ৯৬ খৃস্টাব্দে রচিত হয়। আলুসীর মতে, ইহা ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্ব গমনের ৩০ বৎসর পর রচিত হয় (আলুসী, প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 সংকলনের স্থান

📄 সংকলনের স্থান


এই ব্যাপারেও ঐতিহাসিক ও গবেষকগণের মধ্যে মতবিরোধ রহিয়াছে। ইবন হাযমের মতে ইহা আস্তিয়া নামক শহরে সংকলিত হয় (ইবন হাযম, প্রাগুক্ত)। ইহা হিরাত ও গজনীর পার্বত্য অঞ্চলের ঘোরীয় একটি শহরের নাম (প্রাগুক্ত)। আলুসীর মতে ইহা পেসিস নামে একটি রোমান শহর যেখানে ঐ সুসমাচার সংকলিত হয়। ড. গ্রান্ট বলেন, যোহনের সুসমাচারটি এক হেলিনিক দার্শনিক কর্তৃক এন্টিয়ক শহরে কিংবা ইকসিনে নতুবা আলেকজান্দ্রীয়া। এমনকি রোমেও সংকলিত হইতে পারে। কেননা ঐ সমস্ত শহর প্রথম ও দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতাব্দীতে বিশ্বজনীন কেন্দ্র ছিল এবং পরস্পরের সাথে যোগাযোগ ছিল (ড. গ্রান্ট, প্রাগুক্ত)।

এই ব্যাপারেও ঐতিহাসিক ও গবেষকগণের মধ্যে মতবিরোধ রহিয়াছে। ইবন হাযমের মতে ইহা আস্তিয়া নামক শহরে সংকলিত হয় (ইবন হাযম, প্রাগুক্ত)। ইহা হিরাত ও গজনীর পার্বত্য অঞ্চলের ঘোরীয় একটি শহরের নাম (প্রাগুক্ত)। আলুসীর মতে ইহা পেসিস নামে একটি রোমান শহর যেখানে ঐ সুসমাচার সংকলিত হয়। ড. গ্রান্ট বলেন, যোহনের সুসমাচারটি এক হেলিনিক দার্শনিক কর্তৃক এন্টিয়ক শহরে কিংবা ইকসিনে নতুবা আলেকজান্দ্রীয়া। এমনকি রোমেও সংকলিত হইতে পারে। কেননা ঐ সমস্ত শহর প্রথম ও দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতাব্দীতে বিশ্বজনীন কেন্দ্র ছিল এবং পরস্পরের সাথে যোগাযোগ ছিল (ড. গ্রান্ট, প্রাগুক্ত)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 রচনার উপলক্ষ

📄 রচনার উপলক্ষ


এই ব্যাপারে সকলে একমত যে, লেখক বিশেষ একটি মতকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য গ্রন্থটি রচনা করেন। আর তাহা হইল মসীহের প্রতি দেবত্ব আরোপ। উপরিউক্ত আলোচনা হইতে ইহা স্পষ্ট যে, এই ইনজীলটির লেখকও অজ্ঞাত। ইহার সংকলনের স্থান-কাল সম্পর্কেও মতভেদ রহিয়াছে। ইহাকে হযরত ঈসা (আ)-এর একজন সহচরের সাথে সম্পর্কিত করিয়া রচনা করিলেও লেখক দাবি করেন নাই যে, তিনি ঈসা (আ)-এর বিভিন্ন বাণী নিজ কানে শুনিয়াছেন বা ঘটনা সরাসরি প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। ইহা গ্রীক দর্শনের আলোকে সাজানো হইয়াছে।
খৃস্টীয় দ্বিতীয় শতাব্দীতেই এই সুসমাচারের বিরুদ্ধে খৃস্ট জগতে বিরাট ঝড় উঠে। খৃস্টানদের এক বৃহৎ গোষ্ঠী এই ইনজীলকে ইউহান্নার ইনজীল মানিয়া লইতে অস্বীকার করে এবং পরবর্তী যুগে এই সুসমাচার খৃস্ট জগতের পক্ষে এক নিদারুন দুরারোগ্য মাথাব্যথায় পরিণত হইয়া যায় (প্রাগুক্ত)।
বস্তুত এই চারটি ইনজীল বা সুসমাচার, যেইগুলিকে খৃস্ট সমাজ তাহাদের ধর্মের মূল উৎস হিসাবে ধারণ করিয়াছে, উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে সেইগুলি সম্পর্কে নিম্নরূপ মন্তব্য করা যায়ঃ (১) এইগুলি হযরত ঈসা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে লেখা নহে, এমনকি তাঁহার অনুসারীদের মাধ্যমেও লিখিত নহে। যাহারা লিখিয়াছেন তাহারা কাহার নিকট হইতে কখন কিভাবে শুনিয়া লিখিয়াছেন তাহা উল্লেখ করেন নাই। অতএব ঐগুলিতে ধারণকৃত ঈসা (আ)-এর বাণীগুলি নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত নহে, বরং সূত্র পরম্পরায় বিচ্ছিন্নতা ঘটিয়াছে।
(২) ইহার লেখকগণ এমন যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন না যাহারা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হইয়াছিলেন। কেননা তাহারা ছিলেন অজ্ঞাত। (৩) এইগুলি বিশেষ বিশেষ উদ্দেশ্যে রচিত বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে লিখিত। (৪) এইগুলির মূল পাণ্ডুলিপি বিলুপ্ত হইয়া যায়। পরবর্তীতে কাহারা সংকলন করেন বা কাহারা তাহা অনুবাদ করেন, তাহাও অজ্ঞাত।
(৫) অধিকাংশ ইনজীল গ্রীক ভাষায় লিখিত। একমাত্র মথি লিখিত সুসমাচারটি হিব্রু ভাষায় লিখিত বলিয়া অধিকাংশ গবেষক দাবি করিয়াছেন। তাহাও আবার হারাইয়া যায়। গ্রন্থটির একটি অজ্ঞাত অনুবাদের মাধ্যমে গ্রীক অনুবাদ প্রচলিত। অথচ হযরত ঈসা (আ) এবং তাঁহার সকল হাওয়ারীর ভাষা ছিল হিব্রু ও সুরিয়ানি।
(৬) ইনজীলগুলি লিপিবদ্ধ করার প্রচেষ্টা দ্বিতীয় খৃস্টীয় শতাব্দীর পূর্বে হয় নাই। ১৫০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত সাধারণ ধারণা এই ছিল যে, মৌখিক বর্ণনা লিখিত বর্ণনা হইতে অধিকতর উপযোগী। দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষভাগে লিপিবদ্ধ করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। কিন্তু এই সময়ের লিখিত জিনিস নির্ভরযোগ্য মনে করা হয় না। নিউ টেস্টামেন্টের প্রথম নির্ভরযোগ্য মূল বচন ৩৯৭ খৃস্টাব্দে অনুষ্ঠিত কার্থেজের কাউন্সিলে অনুমোদিত হয়।
(৭) বর্তমানে ইনজীলের সে সকল প্রাচীন সংস্করণ পাওয়া যায় তাহা চতুর্থ খৃষ্টীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের। দ্বিতীয় সংস্করণ পঞ্চম শতাব্দীর এবং তৃতীয় অপূর্ণ সংস্করণ যাহা রোমীয় পোপের লাইব্রেরীতে আছে তাহাও চতুর্থ শতাব্দীর অধিক পুরাতন নহে। অতএব বলা মুশকিল যে, প্রথম তিন শতাব্দীতে যেসব ইনজীল প্রচলিত ছিল তাহার সহিত বর্তমানের ইনজীলের কতটুকু সামঞ্জস্য রহিয়াছে।
(৮) কুরআনের ন্যায় ইনজীল গ্রন্থগুলি হিয্য করার কোন চেষ্টা করা হয় নাই। এই সবের প্রকাশনা অর্থগত বর্ণনার উপর নির্ভর করিত। স্মৃতিশক্তি ও বর্ণনাকারীদের ব্যক্তিগত চিন্তাধারার প্রভাব হইতে স্বাভাবিকভাবেই এইসব মুক্ত হইতে পারে না। পরে যখন লেখার কাজ শুরু হয় তখন তাহা নকলনবীশদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করিত। প্রত্যেকেই যাহা কিছু তাহার চিন্তাধারার পরিপন্থী মনে করিত তাহা সহজেই বাদ দিতে পারিত এবং তাহার মনঃপূত কোন কিছুর অভাব দেখিলে তাহা সংযোজন করিতে পারিত (প্রাগুক্ত, page ১৫৯)।
ঐ সকল সুসমাচারে মূল বক্তব্য ও বিষয়বস্তুর দিক দিয়াও বিভিন্ন রকম ভুল-ভ্রান্তি, বৈপরীত্য, বিকৃতি ও সংযোজন-বিয়োজনের ধারা অব্যাহত রহিয়াছে। সুতরাং সেইগুলি ঈসা (আ)-এর তত্ত্বাবধানে সংকলিত ইনজীল হওয়া তো দূরের কথা, সাধারণ লেখকের সংকলিত একটি বিশুদ্ধ গ্রন্থ হওয়ারও যোগ্যতা প্রশ্নের সম্মুখীন। আর এই কথা সকলেরই জানা যে, হযরত ঈসা (আ)-এর ইনজীল ছিল একটি, কিন্তু খৃষ্ট সমাজ গ্রহণ করিয়াছে চারটি। ইহাতে প্রমাণিত হয় যে, ঈসা (আ)-এর আসল ইনজীল তাহাদের হাতে নাই। তাঁহার ইনজীলের বিলুপ্তির ইহাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

এই ব্যাপারে সকলে একমত যে, লেখক বিশেষ একটি মতকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য গ্রন্থটি রচনা করেন। আর তাহা হইল মসীহের প্রতি দেবত্ব আরোপ। উপরিউক্ত আলোচনা হইতে ইহা স্পষ্ট যে, এই ইনজীলটির লেখকও অজ্ঞাত। ইহার সংকলনের স্থান-কাল সম্পর্কেও মতভেদ রহিয়াছে। ইহাকে হযরত ঈসা (আ)-এর একজন সহচরের সাথে সম্পর্কিত করিয়া রচনা করিলেও লেখক দাবি করেন নাই যে, তিনি ঈসা (আ)-এর বিভিন্ন বাণী নিজ কানে শুনিয়াছেন বা ঘটনা সরাসরি প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। ইহা গ্রীক দর্শনের আলোকে সাজানো হইয়াছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00