📄 ৫. ভবিষ্যদ্বাণী
মথি সুসমাচারে আসিয়াছে, বনূ ইসরাঈলদের মাঝে এক ভাববাদী তথা নবী লিখিয়া গিয়াছেন যে, মাসীহ যিহুদার বেথেলহামে জন্মগ্রহণ করিবেন। তিনি নিম্নরূপ লিখিয়া গিয়াছিলেন : "আর তুমি। হে যিহুদা দেশের বৈৎলেহম, তুমি যিহূদার অধ্যক্ষদের মধ্যে কোনমতে ক্ষুদ্রতম নও, কারণ তোমা হইতে সেই অধ্যক্ষ উৎপন্ন হইবেন যিনি আমার প্রজা ইস্রায়েলকে পালন করিবেন" (মথি সুসমাচার, ২:৬)।
মথি সুসমাচারে আসিয়াছে, বনূ ইসরাঈলদের মাঝে এক ভাববাদী তথা নবী লিখিয়া গিয়াছেন যে, মাসীহ যিহুদার বেথেলহামে জন্মগ্রহণ করিবেন। তিনি নিম্নরূপ লিখিয়া গিয়াছিলেন : "আর তুমি। হে যিহুদা দেশের বৈৎলেহম, তুমি যিহূদার অধ্যক্ষদের মধ্যে কোনমতে ক্ষুদ্রতম নও, কারণ তোমা হইতে সেই অধ্যক্ষ উৎপন্ন হইবেন যিনি আমার প্রজা ইস্রায়েলকে পালন করিবেন" (মথি সুসমাচার, ২:৬)।
📄 ৬. হযরত ইয়াহইয়া (আ) কর্তৃক ঈসা-এর আগমন ঘোষণা
হযরত ইয়াহইয়া (আ) স্বীয় দাওয়াত প্রচারকাজে হযরত ঈসা (আ)-এর আগমনের বিশেষ ঘোষক ছিলেন, যাহা এমনকি আল-কুরআনেও বর্ণিত হইয়াছে। হযরত ইয়াহ্ইয়ার পিতা যাকারিয়্যা (আ)-কে যখন ইয়াহইয়ার জন্ম সম্পর্কে সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল তখন আল্লাহর কলেমার সমর্থক বলিয়া তাঁহার একটি বিশেষণ উল্লেখ করা হইয়াছিল। বলা হইয়াছে :
فَنَادَتْهُ الْمَلِئِكَةُ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلَّى فِي الْمِحْرَابِ أَنَّ اللهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيِي مُصَدِّقًا بِكَلِمَةٍ مِنَ اللَّهِ ۖ وَسَيِّدا وحَصُورًا وَنَبِيا مَنَ الصَّلِحِينَ
"যখন যাকারিয়্যা কক্ষে সালাতে দাঁড়াইয়াছিল তখন ফেরেশতাগণ তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিল, আল্লাহ তোমাকে ইয়াহ্ইয়ার সুসংবাদ দিতেছেন, সে হইবে আল্লাহ্ বাণীর সমর্থক, নেতা, স্ত্রী বিরাগী এবং পুণ্যবানদের মধ্যে একজন" (৩ঃ ৩৯)
বর্তমান খৃস্টান সমাজে প্রচলিত বাইবেলেও ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর সেই গুণের কথা বর্ণনা করা হইয়াছে। যেমন: আমার পশ্চাৎ যিনি আসিতেছেন তিনি আমা অপেক্ষা শক্তিমান। আমি তাঁহার পাদুকা বহিবারও যোগ্য নহি; তিনি তোমাদিগকে পবিত্র আত্মা ও অগ্নিতে বাপ্তাইজ করিবেন" (মথি, ৩ঃ ১১; লুক, ৩ঃ ১৬; মার্ক, ১:৭):
এমনিভাবে ঈসা (আ)-এর জন্মের পূর্বে হযরত মারয়াম (আ)-কে সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল যে, ঈসা (আ) বনূ ইসরাঈলের প্রতি রাসূল হিসাবে আগমন করিবেন। এই বিষয়টি আল-কুরআনেও স্পষ্ট বলা হইয়াছে:
وَيُعَلِّمُهُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَةَ وَالْإِنْجِيلَ وَرَسُولاً إِلى بَنِي إِسْرَائِيلَ .
"আর তিনি তাহাকে শিক্ষা দিবেন কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল এবং তাহাকে বনূ ইসরাঈলের জন্য রাসূল করিবেন" (৩: ৪৮-৪৯)।
হযরত ঈসা (আ) নবুওয়াত কখন কিভাবে লাভ করেন সেই ব্যাপারে আল-কুরআন স্পষ্টভাবে কিছু উল্লেখ নাই। আল-কুরআনে আসিয়াছে, মাতৃক্রোড়ে দোলনায় থাকাকালে তিনি ঘোষণা করেন : قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ أُثْنِيَ الْكِتٰبَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا . وَجَعَلَنِي مُبْرَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ وَأَوْصُنِي بِالصَّلَوةِ وَالزَّكُوةِ مَا دُمْتُ حَيًّا
"সে বলিল, আমি তো আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাকে কিতাব দিয়াছেন, আমাকে নবী করিয়াছেন। যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করিয়াছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন, যত দিন জীবিত থাকি তত দিন সালাত ও যাকাত আদায় করিতে” (১৯: ৩০-৩১)।
উক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, তিনি শিশুকালেই তাঁহাকে নবুওয়ত দেওয়া হইয়াছিল। এই ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। তন্মধ্যে দুইটি মত প্রধান:
(ক) এক মতে তিনি যখন দোলনায় কথা বলিয়াছেন তখনও তিনি নবী ছিলেন। যেইজন্য শিশু কালে কথা বলাটা ছিল তাঁহার জন্য একটি মু'জিযা। ইহাই হাসান বসরীর মত (তাফসীরুল মাওয়ারদী ৩খ, page ৩৭০)। শায়খ ইসমাঈল হাক্কী উল্লেখ করেন যে, জমহূরের মতে হযরত ঈসা (আ)-এর সেই শিশু কালেই আল্লাহ পাক তাঁহাকে ইঞ্জীল ও নবুওয়ত দান করিয়াছিলেন। তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের ন্যায় বুদ্ধিসম্পন্ন ছিলেন (ইসমাঈল হাক্কী, তাফসীর রূহুল বায়ান, ৫খ, page ৩৩১)। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীও উপরিউক্ত মত পোষণ করিতেন। তাঁহার বড় দলীল হইল, শিশু অবস্থায় তাঁহার উক্তি: আমাকে কিতাব দেওয়া হইয়াছে ও নবী বানানো হইয়াছে (দ্র. ১৯:৩০)। রাযীর মতে, তিনি শুধু নবীই ছিলেন না, বরং রাসূলও ছিলেন। কারণ তাঁহার মতে, রাসূল হইতে হইলে শরীয়ত থাকা প্রয়োজন। আর ঈসা (আ)-এর সেই উক্তিতে রহিয়াছে, "তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন সালাত ও যাকাতের ব্যাপারে আমরণ পর্যন্ত" (৩১; রাযী, আত-তাফসীরুল কাবীর, ১১খ, page ২১৪)।
(খ) অন্যদের মতে তাঁহাকে পরিণত বয়সে নবুওয়ত দান করা হয়। তাঁহার বয়স যখন ত্রিশ বৎসর, আল্লাহ পাক তাঁহার উপর ইঞ্জীল শরীফ নাযিল করেন। তখন হইতেই তিনি নবী। প্রখ্যাত তাবিঈ ইকরিমা হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, ঈসা (আ)-এর ত্রিশ বৎসর বয়সে আল্লাহ পাক তাঁহাকে নবী হিসাবে প্রেরণ করেন। আর "আমাকে নবী করিয়াছেন" ইহার ব্যাখ্যায় বলেন, ইহার অর্থ আল্লাহর দরবারে ফয়সালা হইয়া গিয়াছে যে, পরবর্তীতে তিনি আমাকে নবী হিসাবে প্রেরণ করিবেন। একথা বলার পর তিনি চুপ হইয়া যান এবং শিশু সুলভ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়া যান (প্রাগুক্ত, page ২১৩)। এই মতের স্বপক্ষে কয়েকটি যুক্তি প্রদর্শন করা হয়। (১) নবী হইতে হইলে সর্বাঙ্গীন পূর্ণাঙ্গতা থাকা দরকার। শিশু সৃষ্টিগত দিক দিয়া অপূর্ণ। এই অপূর্ণ অবস্থায় নবুওয়াতের দাবি উত্থাপিত হইলে লোকদের পক্ষ হইতে অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হইতে পারে। (২) তিনি যদি শিশু অবস্থায় নবী হইতেন তাহা হইলে অবশ্যই শরীআতের বিধিবিধান ব্যাখ্যা করিতেন, আর এইরূপ করিলে অবশ্যই তাহা প্রসিদ্ধি লাভ করিত। আর ইহা প্রমাণিত নহে (প্রাগুক্ত, page ২১৩)। শিশু অবস্থায় কথা বলিবার বিষয়টি নবুওয়াতের পূর্বাভাষ স্বরূপ ছিল (মাওয়ারদী, প্রাগুক্ত)। শায়খ ইসমাঈল হাক্কী বলেন, ভবিষ্যতে ঘটিবে এমন বিষয় অবহিত করিতে অতীত ক্রিয়ামূলক শব্দ ব্যবহার করা অসম্ভব কিছু নহে। তবে প্রসিদ্ধ কথা হইল, আল্লাহ পাক তাঁহাকে ওহী প্রেরণ করিয়াছিলেন ত্রিশ বৎসর পর। অতএব তাঁহার রিসালাত ছিল নবুওয়াতের পরে (ইসমাঈল হাক্কী, প্রাগুক্ত)।
সাইয়েদ সিদ্দীক হাসান কানুজী বলেন, ঈসা (আ)-এর এই উক্তির উদ্দেশ্য ছিল যে, সৃষ্টির আদিকালে তাঁহাকে কিতাব ও নবুওয়াত দেওয়ার বিষয়টি ফয়সালা করা হইয়াছে, যদিও শিশু অবস্থায় তাঁহার উপর ওহী অবতীর্ণ হয় নাই, আর তখন তিনি নবীও হইয়া যান নাই (নওয়াব সিদ্দীক হাসান কানুজী, ফাতহুল বায়ান ফী মাকাসিদিল কুরআন, ৪খ, page ২৮৮)। ইকরিমা (র) বলেন, উহার অর্থ ফয়সালা করা হইয়াছে যে, আমি এইরূপ হইব। আর এই কথাটি মহানবী (স)-এর ঐ বাণীর মত, যখন তিনি বলিয়াছিলেন:
كنت نبيا وادم بين الروح والجسد "আদম যখন তাঁহার আত্মা ও দেহের মধ্যবর্তী পর্যায়ে ছিলেন তখন হইতেই আমি নবী ছিলাম' (তিরমিযী, মানাকিব, অধ্যায় ১; মুসনাদে আহমাদ, ৪খ, page ৬৬, ৫খ, page ৫৯. ৩৭৯)।
মোটকথা শিশুকালে হযরত ঈসা (আ)-এর মাধ্যমে কিছু কিছু আশ্চর্যজনক ঘটনা প্রকাশিত হইয়াছে। ইবন জারীর তাবারীসহ অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে হযরত ঈসা (আ) তাঁহার ত্রিশ বৎসর বয়সেই নবুওয়াত লাভ করেন (প্রাগুক্ত, page ৭২)। বাইবেলসমূহেও উল্লেখ করা হয় যে, তিনি হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ) কতৃক বাপ্তিস্ম লাভ করিবার পর ত্রিশ বৎসর বয়সে নবুওয়াত লাভ করেন (লুক সুসমাচার, ৩ : ২৩)। এমনকি বার্ণাবাসের বাইবেলেও উল্লেখ করা হয় যে, তাঁহার বয়স যখন ত্রিশ বৎসর তখন জেরুসালেমের পার্শ্বে যয়তুন পাহাড়ে নবুওয়াত ও ইন্জীল লাভ করেন (বার্ণাবাসের বাইবেল, page ৮)।
হযরত ইয়াহইয়া (আ) স্বীয় দাওয়াত প্রচারকাজে হযরত ঈসা (আ)-এর আগমনের বিশেষ ঘোষক ছিলেন, যাহা এমনকি আল-কুরআনেও বর্ণিত হইয়াছে। হযরত ইয়াহ্ইয়ার পিতা যাকারিয়্যা (আ)-কে যখন ইয়াহইয়ার জন্ম সম্পর্কে সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল তখন আল্লাহর কলেমার সমর্থক বলিয়া তাঁহার একটি বিশেষণ উল্লেখ করা হইয়াছিল। বলা হইয়াছে :
فَنَادَتْهُ الْمَلِئِكَةُ وَهُوَ قَائِمٌ يُصَلَّى فِي الْمِحْرَابِ أَنَّ اللهَ يُبَشِّرُكَ بِيَحْيِي مُصَدِّقًا بِكَلِمَةٍ مِنَ اللَّهِ ۖ وَسَيِّدا وحَصُورًا وَنَبِيا مَنَ الصَّلِحِينَ
"যখন যাকারিয়্যা কক্ষে সালাতে দাঁড়াইয়াছিল তখন ফেরেশতাগণ তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিল, আল্লাহ তোমাকে ইয়াহ্ইয়ার সুসংবাদ দিতেছেন, সে হইবে আল্লাহ্ বাণীর সমর্থক, নেতা, স্ত্রী বিরাগী এবং পুণ্যবানদের মধ্যে একজন" (৩ঃ ৩৯)
বর্তমান খৃস্টান সমাজে প্রচলিত বাইবেলেও ইয়াহ্ইয়া (আ)-এর সেই গুণের কথা বর্ণনা করা হইয়াছে। যেমন: আমার পশ্চাৎ যিনি আসিতেছেন তিনি আমা অপেক্ষা শক্তিমান। আমি তাঁহার পাদুকা বহিবারও যোগ্য নহি; তিনি তোমাদিগকে পবিত্র আত্মা ও অগ্নিতে বাপ্তাইজ করিবেন" (মথি, ৩ঃ ১১; লুক, ৩ঃ ১৬; মার্ক, ১:৭):
এমনিভাবে ঈসা (আ)-এর জন্মের পূর্বে হযরত মারয়াম (আ)-কে সুসংবাদ দেওয়া হইয়াছিল যে, ঈসা (আ) বনূ ইসরাঈলের প্রতি রাসূল হিসাবে আগমন করিবেন। এই বিষয়টি আল-কুরআনেও স্পষ্ট বলা হইয়াছে:
وَيُعَلِّمُهُ الْكِتٰبَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَةَ وَالْإِنْجِيلَ وَرَسُولاً إِلى بَنِي إِسْرَائِيلَ .
"আর তিনি তাহাকে শিক্ষা দিবেন কিতাব, হিকমত, তাওরাত ও ইনজীল এবং তাহাকে বনূ ইসরাঈলের জন্য রাসূল করিবেন" (৩: ৪৮-৪৯)।
হযরত ঈসা (আ) নবুওয়াত কখন কিভাবে লাভ করেন সেই ব্যাপারে আল-কুরআন স্পষ্টভাবে কিছু উল্লেখ নাই। আল-কুরআনে আসিয়াছে, মাতৃক্রোড়ে দোলনায় থাকাকালে তিনি ঘোষণা করেন : قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ أُثْنِيَ الْكِتٰبَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا . وَجَعَلَنِي مُبْرَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ وَأَوْصُنِي بِالصَّلَوةِ وَالزَّكُوةِ مَا دُمْتُ حَيًّا
"সে বলিল, আমি তো আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাকে কিতাব দিয়াছেন, আমাকে নবী করিয়াছেন। যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করিয়াছেন। তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন, যত দিন জীবিত থাকি তত দিন সালাত ও যাকাত আদায় করিতে” (১৯: ৩০-৩১)।
উক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, তিনি শিশুকালেই তাঁহাকে নবুওয়ত দেওয়া হইয়াছিল। এই ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। তন্মধ্যে দুইটি মত প্রধান:
(ক) এক মতে তিনি যখন দোলনায় কথা বলিয়াছেন তখনও তিনি নবী ছিলেন। যেইজন্য শিশু কালে কথা বলাটা ছিল তাঁহার জন্য একটি মু'জিযা। ইহাই হাসান বসরীর মত (তাফসীরুল মাওয়ারদী ৩খ, page ৩৭০)। শায়খ ইসমাঈল হাক্কী উল্লেখ করেন যে, জমহূরের মতে হযরত ঈসা (আ)-এর সেই শিশু কালেই আল্লাহ পাক তাঁহাকে ইঞ্জীল ও নবুওয়ত দান করিয়াছিলেন। তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের ন্যায় বুদ্ধিসম্পন্ন ছিলেন (ইসমাঈল হাক্কী, তাফসীর রূহুল বায়ান, ৫খ, page ৩৩১)। ইমাম ফখরুদ্দীন রাযীও উপরিউক্ত মত পোষণ করিতেন। তাঁহার বড় দলীল হইল, শিশু অবস্থায় তাঁহার উক্তি: আমাকে কিতাব দেওয়া হইয়াছে ও নবী বানানো হইয়াছে (দ্র. ১৯:৩০)। রাযীর মতে, তিনি শুধু নবীই ছিলেন না, বরং রাসূলও ছিলেন। কারণ তাঁহার মতে, রাসূল হইতে হইলে শরীয়ত থাকা প্রয়োজন। আর ঈসা (আ)-এর সেই উক্তিতে রহিয়াছে, "তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়াছেন সালাত ও যাকাতের ব্যাপারে আমরণ পর্যন্ত" (৩১; রাযী, আত-তাফসীরুল কাবীর, ১১খ, page ২১৪)।
(খ) অন্যদের মতে তাঁহাকে পরিণত বয়সে নবুওয়ত দান করা হয়। তাঁহার বয়স যখন ত্রিশ বৎসর, আল্লাহ পাক তাঁহার উপর ইঞ্জীল শরীফ নাযিল করেন। তখন হইতেই তিনি নবী। প্রখ্যাত তাবিঈ ইকরিমা হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলিয়াছেন, ঈসা (আ)-এর ত্রিশ বৎসর বয়সে আল্লাহ পাক তাঁহাকে নবী হিসাবে প্রেরণ করেন। আর "আমাকে নবী করিয়াছেন" ইহার ব্যাখ্যায় বলেন, ইহার অর্থ আল্লাহর দরবারে ফয়সালা হইয়া গিয়াছে যে, পরবর্তীতে তিনি আমাকে নবী হিসাবে প্রেরণ করিবেন। একথা বলার পর তিনি চুপ হইয়া যান এবং শিশু সুলভ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়া যান (প্রাগুক্ত, page ২১৩)। এই মতের স্বপক্ষে কয়েকটি যুক্তি প্রদর্শন করা হয়। (১) নবী হইতে হইলে সর্বাঙ্গীন পূর্ণাঙ্গতা থাকা দরকার। শিশু সৃষ্টিগত দিক দিয়া অপূর্ণ। এই অপূর্ণ অবস্থায় নবুওয়াতের দাবি উত্থাপিত হইলে লোকদের পক্ষ হইতে অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হইতে পারে। (২) তিনি যদি শিশু অবস্থায় নবী হইতেন তাহা হইলে অবশ্যই শরীআতের বিধিবিধান ব্যাখ্যা করিতেন, আর এইরূপ করিলে অবশ্যই তাহা প্রসিদ্ধি লাভ করিত। আর ইহা প্রমাণিত নহে (প্রাগুক্ত, page ২১৩)। শিশু অবস্থায় কথা বলিবার বিষয়টি নবুওয়াতের পূর্বাভাষ স্বরূপ ছিল (মাওয়ারদী, প্রাগুক্ত)। শায়খ ইসমাঈল হাক্কী বলেন, ভবিষ্যতে ঘটিবে এমন বিষয় অবহিত করিতে অতীত ক্রিয়ামূলক শব্দ ব্যবহার করা অসম্ভব কিছু নহে। তবে প্রসিদ্ধ কথা হইল, আল্লাহ পাক তাঁহাকে ওহী প্রেরণ করিয়াছিলেন ত্রিশ বৎসর পর। অতএব তাঁহার রিসালাত ছিল নবুওয়াতের পরে (ইসমাঈল হাক্কী, প্রাগুক্ত)।
সাইয়েদ সিদ্দীক হাসান কানুজী বলেন, ঈসা (আ)-এর এই উক্তির উদ্দেশ্য ছিল যে, সৃষ্টির আদিকালে তাঁহাকে কিতাব ও নবুওয়াত দেওয়ার বিষয়টি ফয়সালা করা হইয়াছে, যদিও শিশু অবস্থায় তাঁহার উপর ওহী অবতীর্ণ হয় নাই, আর তখন তিনি নবীও হইয়া যান নাই (নওয়াব সিদ্দীক হাসান কানুজী, ফাতহুল বায়ান ফী মাকাসিদিল কুরআন, ৪খ, page ২৮৮)। ইকরিমা (র) বলেন, উহার অর্থ ফয়সালা করা হইয়াছে যে, আমি এইরূপ হইব। আর এই কথাটি মহানবী (স)-এর ঐ বাণীর মত, যখন তিনি বলিয়াছিলেন:
كنت نبيا وادم بين الروح والجسد "আদম যখন তাঁহার আত্মা ও দেহের মধ্যবর্তী পর্যায়ে ছিলেন তখন হইতেই আমি নবী ছিলাম' (তিরমিযী, মানাকিব, অধ্যায় ১; মুসনাদে আহমাদ, ৪খ, page ৬৬, ৫খ, page ৫৯. ৩৭৯)।
মোটকথা শিশুকালে হযরত ঈসা (আ)-এর মাধ্যমে কিছু কিছু আশ্চর্যজনক ঘটনা প্রকাশিত হইয়াছে। ইবন জারীর তাবারীসহ অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে হযরত ঈসা (আ) তাঁহার ত্রিশ বৎসর বয়সেই নবুওয়াত লাভ করেন (প্রাগুক্ত, page ৭২)। বাইবেলসমূহেও উল্লেখ করা হয় যে, তিনি হযরত ইয়াহ্ইয়া (আ) কতৃক বাপ্তিস্ম লাভ করিবার পর ত্রিশ বৎসর বয়সে নবুওয়াত লাভ করেন (লুক সুসমাচার, ৩ : ২৩)। এমনকি বার্ণাবাসের বাইবেলেও উল্লেখ করা হয় যে, তাঁহার বয়স যখন ত্রিশ বৎসর তখন জেরুসালেমের পার্শ্বে যয়তুন পাহাড়ে নবুওয়াত ও ইন্জীল লাভ করেন (বার্ণাবাসের বাইবেল, page ৮)।