📄 ঈসা (আ) প্রভু বা ইলাহ না হওয়ার পক্ষে যুক্তি
হযরত ঈসা (আ) যে প্রভু কিংবা ইলাহ ছিলেন না উহার পক্ষে অসংখ্য যুক্তি রহিয়াছে। উহার কয়েকটি নিম্নরূপঃ (১) তিনি আল্লাহর প্রেরিত নবী। আল্লাহ তাঁহাকে রাসূলরূপে প্রেরণ করিয়াছেন।
(২) পূর্বের অনেক নবী যীশু নবী হিসাবেই পৃথিবীতে আগমন করিবেন বলিয়া সুসংবাদ দিয়েছেন।
(৩) তিনি মানবসন্তান মারয়ামের গর্ভে মানবরূপেই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন।
(৪) অন্য মানুষের ন্যায় তিনিও আহার-বিহার করিতেন এবং সুখ-দুঃখ অনুভব করিতেন।
(৫) তিনি আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা ও তাঁহার ইবাদত করিয়াছেন।
এই সব বিষয়ের উপর সামান্য চিন্তা করিলেও পরিষ্কারভাবে প্রতিভাত হয় যে, তিনি কোনক্রমেই প্রভু ছিলেন না (মাওলানা ইমদাদুল হক, প্রাগুক্ত, page ৭৩)। হযরত ঈসা যদি প্রভু হইতেন, ত্রিত্ববাদ যদি সত্য হইত তবে হযরত মূসা (আ) এবং অন্যান্য পয়গাম্বর এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সম্বন্ধে নীরব না থাকিয়া বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করিয়া যাইতেন।
মোটকথা, ত্রিত্ববাদ এমন একটি মতবাদ যাহা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অবান্তর। খৃস্টানরা মানুষকে ইহাই বুঝাইতে চায় যে, ত্রিত্ববাদ কেবল বিশ্বাসের বিষয়, বোধগম্য হওয়ার বিষয় নহে। তাহাতে অন্তরে বিশ্বাস করিলেই পরিত্রাণ ও মুক্তি সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে তাহা অযৌক্তিক নহে। আল্লাহ প্রদত্ত একত্ববাদের ধর্মকে ধ্বংস করার জন্য মূলত ইহা একটি ষড়যন্ত্র। সেন্ট পলই ইহার আবিষ্কারক। ত্রিত্ববাদীরা বাইবেল হইতে ত্রিত্ববাদের সপক্ষে কোনও প্রকারের প্রমাণ না পাইয়া সেন্ট পলের পত্রাবলী হইতে উহার প্রমাণ পেশ করিয়াছে। আর সেন্ট পলের যুগ প্রেরিতদের যুগের পরের যুগ। তবে কিছু লোক চার ইনজীল হইতেও প্রমাণ পেশ করিবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়াছে। বাইবেল হইতে উদ্ধৃত ত্রিত্ববাদের প্রমাণাদি ও তাহার জবাব:
১ম প্রমাণ: যোহন সুসমাচার ২০: ২৮ বাক্যে বলা হইয়াছে যে, থোমা উত্তর করিয়া তাহাকে কহিলেন, প্রভু আমার ঈশ্বর! আমার এইখানে যীশুর সামনে তাহাকে প্রভু ও ঈশ্বর ব্যক্ত করিয়া ডাক দেওয়া হইয়াছে এবং তিনি তাহাকে নিষেধ করেন নাই। অতএব যদি তিনি প্রভু না হইতেন তাহা হইলে নিশ্চয়ই তিনি নিষেধ করিতেন।
জবাবঃ (১) থোমা যে যীশু খৃস্টকে প্রভু বলিয়া সম্বোধন করিয়াছিলেন উহার সত্যতা সংশয়যুক্ত। কেননা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, বাইবেলে বহু বিকৃতি ঘটিয়াছে। বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে "ঈশ্বর" ও "প্রভু” শব্দ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে।
যেমন: (ক) 'প্রভু' অর্থ প্রদর্শক ও দিশারী। যথা- যাত্রা পুস্তক ৭: ১ বাক্যে বলা হইয়াছে, "তখন সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, দেখ আমি ফরৌণের কাছে তোমাকে ঈশ্বর স্বরূপ করিয়া নিযুক্ত করিলাম"। এইখানে পথপ্রদর্শক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, নিশ্চয়ই প্রভু হিসাবে নয়। খৃস্টানরাও মূসা (আ)-কে প্রভু হিসাবে বিশ্বাস করে না।
(খ) স্বর্গীয় দূত ও ফেরেশতা বুঝাইতেও ঈশ্বর শব্দ ব্যবহার করা হইয়াছে। আদিপুস্তকের ১৭: ২২ বাক্যে আছে যে, "পরে কথোপকথন সাঙ্গ করিয়া ঈশ্বর আব্রামের নিকট হইতে উর্দ্ধগমন করিলেন"। এইখানে ঈশ্বর ফেরেশতার অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। কেননা ইসহাক (আ)-এর জন্মের সুসংবাদ দেওয়ার জন্য ফেরেশতাকে প্রেরণ করা হইয়াছিল।
(গ) সৎলোক, নেতা ও মুরুব্বী অর্থেও ঈশ্বর শব্দ ব্যবহার করা হইয়াছে। যথা গীতসংহিতা, ৮২ঃ ৬ বাক্যে আছে, "আমিই বলিয়াছি, তোমরা ঈশ্বর, তোমরা সকলে পরাৎপরের সন্তান", এবং যোহন ১০ : ৩৪ বাক্যে আছে, "যীশু তাহাদিগকে উত্তর করিলেন, তোমাদের ব্যবস্থায় কি লিখিত নাই, আমি বলিলাম তোমরা ঈশ্বর"। এই সকল স্থানে 'ঈশ্বর' দ্বারা সৎলোককে বুঝানো হইয়াছে।
২য় প্রমাণ: মথি ৩: ১৭ বাক্যে আছে, "আর দেখ, স্বর্গ হইতে এই বাণী হইল, 'ইনিই আমার প্রিয় পুত্র, ইহাতেই আমি প্রীত"। এইখানে যীশু খৃস্ট আল্লাহর পুত্র বলে পরিষ্কার উল্লেখ পাওয়া যায়। ইহা ছাড়াও আরও বিভিন্ন স্থানে তাঁহাকে আল্লাহর পুত্র বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।
জবাবঃ বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে পুত্র শব্দ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হইয়াছে। সাধারণ মানুষকেও আল্লাহর বান্দা হিসাবে পুত্র বলা হইয়াছে। যেমন যাত্রাপুস্তক ৪: ২২ বাক্যে আছে”। সদা প্রভু এই কথা কহেন "ইস্রায়েল আমার পুত্র আমার প্রথম জাত"।
৩য় প্রমাণ: যোহন ১০: ৩০ বাক্যে আছে, "আমি ও পিতা আমরা এক"। ইহা হইতে পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, যীশু খৃস্ট আল্লাহর ন্যায় আল্লাহ।
জবাব: এইরূপ বাক্য যীশু প্রেরিতদের সম্পর্কেও বলিয়াছেন। যেমন: যোহন ১৭: ২১ বাক্যে আছে, "পিতা: যেমন তুমি আমাতে ও আমি তোমাতে, তেমনি তাহারাও যেন আমাদিগতে থাকে।
১ম বংশবলী ২৮: ৬ বাক্যে আছে, "কেননা আমি তাহাকেই (শলোমনকে) আমার পুত্র বলিয়া মনোনীত করিয়াছি। আমিই তাহার পিতা হইব" (আরও দ্র. ২২: ১০) গীতসংহিতা, ৬৮: ৫ বাক্যে আছে, "ঈশ্বর আপন পবিত্র বাসস্থানে পিতৃহীনদের পিতা ও বিবাদের বিচারকর্তা"। লুক, ৩:৩৮ বাক্যে আছে, "ইনি আদমের পুত্র, ইনিই ঈশ্বরের পুত্র"। ইত্যাকার বাক্যসমূহে পুত্র শব্দ আদম, ইস্রায়েল, মূসা, সুলায়মান (আ) প্রমুখ নবীগণের জন্য ব্যবহার করা হইয়াছে। অথচ কাহারও মতেই তাহারা না আল্লাহ ছিলেন এবং না আল্লাহর পুত্র ছিলেন। অতএব যীশু খৃস্টকে পুত্র বলা হইলেও সেই একই অর্থ বুঝানো হইয়াছে। এইসব বাক্যে বিশেষ সম্পর্ক বুঝানো হইয়াছে। যদি "আল্লাহ" অর্থ নেওয়া হয় তাহা হইলে প্রেরিতদেরকেও আল্লাহ বলিতে হইবে।
৪র্থ প্রমাণ: সুসমাচারসমূহে খৃস্ট কর্তৃক মৃতদিগকে জীবিত করার বিভিন্ন ঘটনা উল্লিখিত হইয়াছে। যেমন: মার্ক, ৫:৪১, মথি, ৯: ২৫, লুক, ৮ঃ ৫৫ এবং যোহন, ১১: ৪৩। যেহেতু মৃতকে জীবনদান একমাত্র আল্লাহর বিশেষ গুণ, কোন মানুষের পক্ষে এই কাজ সম্ভব নয়। অতএব যীশু খৃস্টই আল্লাহ।
জবাব: আল্লাহ্ চিরন্তন বিধান এই যে, যাহাকে তিনি নবী হিসাবে প্রেরণ করেন, তাঁহাকে এমন কিছু প্রর্দশনের ক্ষমতা দান করেন যাহা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভবপর নয়। নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রমাণস্বরূপ আলৌকিক কিছু কার্যাবলী প্রকাশিত হয়। এই স্থলে মূলত কার্য আল্লাহরই হইয়া থাকে, যদিও নবীর হাতে তাহা প্রকাশ পায়। এইজন্য নবী এই সকল কাজে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করেন। আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করাই প্রমাণ করে যে, তিনি আল্লাহ নন। যেমন যোহন; ১১:৪১ বাক্যে আছে, “পরে যীশু উপরের দিকে চক্ষু তুলিয়া বলিলেন, পিত! তোমার ধন্যবাদ করি যে, তুমি আমার কথা শুনিয়াছ"।
এইসব বাক্য দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তিনি আল্লাহর প্রেরিত নবী ছিলেন, আল্লাহ ছিলেন না। মৃতকে জীবন দান করা যদি আল্লাহ হওয়ার প্রমাণ বহন করে তাহা হইলে যীশু খৃস্ট ছাড়া অন্যান্য যে সকল নবীর মাধ্যমে উক্ত ঘটনা সংঘটিত হইয়াছে তাহাদেরকেও আল্লাহ বলিতে হইবে। যেমন যিহিঙ্কেল, ৩৭:১০ বাক্যে আছে, "তাহাতে আত্মা তাহাদের মধ্যে প্রবেশ করিল এবং তাহারা জীবিত হইল" (আরও দ্র. রাজাবলী, ১৭:২১-২২; রাজাবলী ৪: ৩২-৩৩-৪৪-৪৫ বাক্যও আছে।
মোটকথার খৃস্টানগণ ঈসা (আ)-কে আল্লাহ বা তাঁহার পুত্র প্রমাণ করিতে যে সকল যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করিয়াছে তাহা সম্পূর্ণরূপে অসার ও ভ্রান্ত। তিনি ছিলেন আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল।
📄 (খ) প্রায়শ্চিত্তের আকীদা
"পাপ মোচন-এর বিশ্বাস" খৃষ্ট ধর্মে মৌলিক আকীদা হিসাবে গণ্য। ইহার অর্থ হইল, পাপ হইতে মানবজাতির মুক্তি ও পরিত্রাণের জন্য যীশু খৃস্ট ক্রুশবিদ্ধ হইয়া মৃত্যু বরণ করিয়াছেন। তাহাদের মতে হযরত আদম (আ) পাপ করিয়াছিলেন এবং বংশানুক্রমে তাহা সমগ্র মানবজাতির মধ্যে চলিয়া আসে। তাই সকল মানবজাতিই পাপী। প্রভু আপন পুত্র যীশু খৃস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করিয়া জগতবাসীকে ক্ষমা করিয়াছেন। অতএব যীশু খৃস্টকে বিশ্বাস করিলেই পাপমোচন হয়, ইহা ছাড়া কোন বিকল্প ব্যবস্থা নাই। বর্তমান খৃস্ট জগতে পাপ মোচন বিশ্বোসকে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হইয়া থাকে। খৃষ্ট ধর্মে এই বিশ্বাস অনুপ্রবেশ ঘটিবার ঐতিহাসিক পটভূমি ইহা ভ্রান্ত হওয়ার প্রমাণ বহন করে।
(১) যেই সময়ে খৃস্ট ধর্মে ত্রিত্ববাদ প্রবেশ করিয়াছে তখন হইতে এই বিশ্বাসও প্রবেশ করিয়াছে। ইহা সেন্ট পলের ষড়যন্ত্রের ফসল। সেন্ট পল নূতনভাবে প্রচার করেন যে, মানবজাতির পাপের কাফফারা হিসাবে যীশু ক্রুশবিদ্ধ হইয়াছেন। ত্রিত্ববাদকে সুদৃঢ় করিবার জন্য পাপ মোচন বিশ্বাসকে গুরুত্ব সহকারে প্রচার করিতে লাগিলেন। সেন্টপলই কেবল এই আকীদার প্রবক্তা। হযরত ঈসা (আ) নিজে কোন দিন এই কথা বলেন নাই, বরং তাঁহার সমাজে এই কথা কেহ শুনে নাই। তাই এই বিশ্বাস যীশু খৃস্টের ধর্মভুক্ত হইতে পারে না।
(২) এই বিশ্বাস বাইবেলের শিক্ষার পরিপন্থী। যিহিঙ্কেল, ১৮: ২০ বাক্যে আছে, "পিতার অপরাধ পুত্র বহন করিবে না ও পুত্রের অপরাধ পিতা বহন করিবে না" (আরও দ্র. হিতোপদেশ, ২৮:১৩)।
ইহা হইতে প্রমাণিত হয় যে, পাপী ও দুষ্টদের গুনাহের বদলে অন্যকে শান্তি দেওয়া যায় না। একজনের পাপে অন্যকে প্রাণদণ্ড দেয়া যায় না। অতএব মানবজাতির পাপের জন্য যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়াকে 'পাপের প্রায়শ্চিত্ত হওয়ার বিশ্বাস গ্রহণযোগ্য নহে।
(৩), এই বিশ্বাস ন্যায় ও ইনসাফের সম্পূর্ণ বিরোধী। কেননা ধারণা জন্মায় যে, আল্লাহর জন্য পাপীকে ক্ষমা করা ন্যায় ও ইনসাফের পরিপন্থী এবং নির্দোষ ও নিষ্পাপ ব্যক্তিকে ক্রুশবিদ্ধ করা ন্যায় ও ইনসাফের পরিপন্থী নহে। অথচ বাইবেলের শিক্ষা এই যে, আল্লাহ ক্ষমাশীল ও দয়ালু। গীতসংহিতা, ১০৩ঃ ৩, অন্যত্র ১০৩ঃ ৮, লুক ৬: ৩৬, অনুরূপ মথি ৬৪ ১৪ ও ১৮ পরিচ্ছেদ হইতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ ক্ষমা করেন এবং ক্ষমা ভালবাসেন।
সুতরাং আদম (আ) হইতে যীশুখৃস্ট পর্যন্ত কোন মানব সন্তানকে আল্লাহ ক্ষমা করেন নাই এমনকি কোন নবীকেও না। ইহা কত বড় ধৃষ্টতা! অতএব এরূপ বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ কোন পাপীকে ক্ষমা করেন না, আর নির্দোষ ও নিষ্পাপ যীশু খৃস্টকে অকারণে শাস্তি দিয়াছেন, ইহা খুবই অন্যায় ও অযৌক্তিক..
(৪) তাহাদের পাপ মোচন বিশ্বাস যদি সকলের হইত তাহা হইলে তাহাদের এই পৃথিবীতে কোন উপাসনা করার প্রায়াজন ছিল না। অথচ দেখা যায়, তাহারা প্রতি রবিবার গীর্জায় গমন করে। অপর দিকে গালাতীয়, ৩: ১৩ বাক্যে আছে, "খৃষ্টই মূল্য দিয়া আমাদিগকে ব্যবস্থার শাপ হইতে মুক্ত করিয়াছেন"। ইহাতে দেখা যায় যে, ব্যবস্থা (শরীয়াত)-কে শাপস্বরূপ বলা হইয়াছে এবং এই শাপ হইতেই তিনি মুক্তি দিলেন। তাহা হইলে যীশু খৃস্ট সারা জীবন কি অভিসম্পাতের শিক্ষা দিয়াছেন? ইহা কত বড় জঘন্য অপবাদ।
(৫) তাহারা বলে, যীশু খৃস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করিয়া পাপ মোচন করা হইয়াছে। এই বিশ্বাস সম্পর্কে প্রশ্ন করা যাইতে পারেঃ যখন তিনি তাহাদের মতে প্রভু ছিলেন তাহা হইলে কি প্রভুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হইল? মানুষের কাছে তাহার অক্ষমতা প্রমাণিত হইল? এইসব প্রশ্নের কোন উত্তর নাই। আর যদি তাহারা মনে করে, তিনি মানব সন্তান হিসাবে ক্রুশবিদ্ধ হইয়াছেন তাহা হইলে প্রশ্ন হইবে যে, তিনি মানব সন্তান হিসাবে নিজেও পাপী। তাহা হইলে তিনি কাফফারা হইবেন কি করিয়া!
• (৬) পাপ মোচনের জন্য শুধুমাত্র যীশু খৃস্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়াই কি যথেষ্ট, না ইহার সাথে পাপীরও তওবা করার প্রয়োজন আছে? যদি তাহারা বলে যে, ক্রুশবিদ্ধই যথেষ্ট তাহা হইলে সমস্ত কাফিরের পাপ মোচন হইয়াছে বিশ্বাস করিতে হইবে। অথচ তাহারা কাফির ও ইয়াহুদীদের ক্ষমার কথা স্বীকার করে না। আর যদি তাহারা বলে, তওবার প্রয়োজন আছে তাহা হইলে বুঝা গেল যে, পাপীদের ক্ষমার জন্য তওবা করিতে হইবে। অতএব প্রায়শ্চিত্তের আকীদা ঠিক নহে। মার্ক, ১৬: ১৬ বাক্যে আছে, “যে বিশ্বাস করে ও বাপ্তাইজ হয়, সে পরিত্রাণ পাইবে; কিন্তু যে অবিশ্বাস করে তাহার দণ্ডাজ্ঞা করা যাইবে"। তাহা হইলে শুধু যীশু খৃস্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার উপর যুক্তি নির্ভর করে না।
(৭) আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে বহু নবী ও রাসূল প্রেরণ করিয়াছেন। তাঁহারা মানবজাতিকে ঈমান ও হিদায়াতের শিক্ষা দান করিয়াছেন যাহাতে মানুষ শাস্তি হইতে মুক্তি পায়। সুতরাং যদি যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়াই সকলের মুক্তির জন্য যথেষ্ট হইত, তবে হাজার হাজার নবী ও রাসূল প্রেরণ করার প্রয়োজন ছিল না।
(৮) যীশু খৃষ্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়া যদি আল্লাহর অনুগ্রহ হইয়া থাকে তাহা হইলে তাহাদের উচিত, ইয়াহুদীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং যেভাবে তাহারা শূলিকাষ্ঠকে চুম্বন করিয়া থাকে, তাহাদের জন্য ইয়াহুদীদের হাতকেও সেভাবে চুম্বন করা উচিত। কেননা তাহাদের দ্বারাই তাহারা পাপ থেকে মুক্তি পাইয়াছে।
(৯) যীশু খৃস্টের পূর্বে যাহারা পৃথিবী হইতে বিদায় নিয়াছেন তাহারা কি মুমিন ও নাজাতপ্রাপ্ত ছিলেন, না তাহারা কাফির ও শাপগ্রস্ত! যদি তাহারা নাজাতপ্রাপ্ত হইয়া থাকে তাহা হইলে তাহারা ঈমানের কারণে মুক্তি পাইয়াছেন, যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার কারণে নহে।
(১০) আল্লাহ তা'আলা ইবরাহীম (আ)-এর পুত্র ইসমাঈল (আ)-কে কুরবানী করা হইতে রক্ষা করিয়া ইহার পরিবর্তে একটি প্রাণী কুরবানী করাইলেন। তেমনি তাহাদের ধারণামত নিজ পুত্র যীশুকে রক্ষা করিলেন না কেন? অন্যের পুত্রকে বাঁচাইলেন আর নিজের পুত্রকে শূলে চড়াইলেন, তাহা কোনক্রমেই যুক্তিসংগত নহে। শত্রুর হাতে সৎকর্মশীল পুত্রকে লাঞ্ছিত করা কি পিতার কাজ?
(১১) আল্লাহ প্রত্যেক নবীকে সাহায্য করিয়াছেন, তাহাদের শত্রুদেরকে ধ্বংস করিয়াছেন। যেমন নূহ (আ)-এর শত্রু তাঁহার সম্প্রদায়কে, ইবরাহীম (আ)-এর শত্রু নমরূদকে, মুসা (আ)-এর শত্রু ফিরআওনকে ধ্বংস করিয়াছেন। কিন্তু তিনি ঈসা (আ)-কে তাহাদের ধারণামতে ইয়াহুদী শত্রুর হাত হইতে রক্ষা করিলেন না কেন?
(১২) যীশু খৃস্ট শিষ্যদেরকে নির্দেশ দিলেন, "তোমরা কতজন আমার পশ্চাদগামী হইয়াছ। পূনঃ সৃষ্টিকালে যখন মনুষ্য পুত্র আপন প্রতাপে সিংহাসনে বসিবেন তখন তোমরাও দ্বাদশ সিংহাসনে বসিয়া ইস্রায়েলের দ্বাদশ বংশের বিচার করিবে” (মথি ১৯: ২৮)। যদি যীশু খৃস্টের ক্রুশবিদ্ধ হওয়ায় সমস্ত পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইয়া গিয়া থাকে তবে বানু ইসরাঈলের দ্বাদশ বংশের মধ্যে বিচার করার কোন কারণ থাকিতে পারে না। কেননা তাহাদের সমস্ত পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইয়া গিয়াছে। বিচার তো পাপীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে। ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, যীশু খৃস্ট সকল পাপীকে পরিত্রাণ করেন নাই।
পূর্বেই প্রমাণ করা হইয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ)-কে ইয়াহুদীগণ ক্রুশবিদ্ধ করিতে সক্ষম হয় নাই। অতএব ক্রুশে বিদ্ধ হইয়া প্রায়শ্চিত্ত করার প্রসংগটি অবান্তর, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন (তাকী উসমানী, প্রাগুক্ত, page ৭৬-৮৮; ইমদাদুল হক, প্রাগুক্ত, page ৯১-৯৬)।
মোটকথা, প্রায়শ্চিত্ত তথ্যটি অমানবিক ও মানব সভ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ। কারণ ইহার দ্বারা পাপীকে কোন শাস্তি ছাড়াই মুক্ত করিয়া দেওয়া হয় একমাত্র ঈসাকে মৌখিক স্বীকৃতি দ্বারা। ঐ মতবাদের দৃষ্টিতে পাপ করিবে গোটা মানবজাতি, আর তাহার শাস্তি ভোগ করিলেন একমাত্র ঈসা মসীহ (আ) (নাউযুবিল্লাহ)। উহা অবশ্যই একটি মারাত্মক জুলুম। অথচ যুগে যুগে আসা আল্লাহর বিধানের ঘোষণা ছিল প্রত্যেক ব্যক্তি তাহার নিজের পাপের জন্য নিজেই দায়ী। আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে:
أَمْ لَمْ يُنَبِّأْ بِمَا فِي صُحُفِ مُوسَى وَإِبْرَاهِيمَ الَّذِي وَفَّى - اَلا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ، وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى وَأَنَّ سَعْيَة سَوْفَ يُرى. ثُمَّ يُجْزَهُ الْجَزَاء الْأَوْفَى. وَإِنَّ إِلَى رَبِّكَ الْمُنْتَهى .
"তাহাকে কি অবগত করা হয় নাই যাহা আছে মূসার কিতাবে এবং ইবরাহীমের কিতাবে, যে পালন করিয়াছে তাহার দায়িত্ব? উহা এই যে, কোন বহনকারী অপরের বোঝা বহন করিবে না।। আর এই যে, মানুষ তাহাই পায় যাহা সে করে, আরও এই যে, তাহার কর্ম অচিরেই দেখান হইবে, অতঃপর তাহাকে দেওয়া হইবে পূর্ণ প্রতিদান। আরও এই যে, সমস্ত কিছুর সমাপ্তি তো তোমার' প্রতিপালকের নিকট" (৫৩: ৩৬-৪২)।
উল্লেখ্য, খৃস্টানদের ত্রিত্ববাদ ও প্রায়শ্চিত্তের আকীদাকে কেন্দ্র করিয়া আরও কয়েকটি আকীদার উদ্ভব ঘটিয়াছে যাহা নিম্নরূপ:
এই আকীদার মর্মার্থ আল্লাহর বাণী বিষয়ক গুণ ঈসা (আ)-এর দেহ-এর রূপ ধারণ করিয়াছে। এই কারণেই ঈসা (আ) একই সময়ে আল্লাহও ছিলেন এবং মানুষও। ইহা একটি অবাস্তব ও হেয়ালীপূর্ণ ধারণা (Encyclopaedia of Religion and Ethics, ৩খ, ৫৮৬)। কিন্তু প্রশ্ন হইল একই ব্যক্তি আল্লাহ ও বান্দা এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টি, ইহা কি করিয়া সম্ভব? এই কারণেই কুরআন মাজীদে এই আকীদাকে সরাসরি কুফর ও শিরকরূপে বর্ণনা করা হইয়াছে (৫:৫৬; ৪: ১৭১; দ্র. ১৪-১৭, ৪৭, ৭১)।
পুনরুজ্জীবন (Resurrection) আকীদা: ঈসা (আ) সম্পর্কে নাসারাদের বিশ্বাস এই যে, ঈসা (আ) তিনবার জীবন লাভ করিয়াছেন (বিস্তারিত দ্র. Encyclopaedia of Religion and Ethics, সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ)। খৃস্টানদের এই বিশ্বাস, ভ্রান্ত ধারণা ও কুটতর্কের ফসল স্বরূপ। প্রকৃত অবস্থা এই যে, ঈসা (আ)-কে গ্রেফতার বা ক্রুশবিদ্ধ হইবার পূর্বেই ঊর্দ্ধ জগতে উঠইয়া লওয়া হইয়াছিল (দ্র. ৪: ১৫৭-৮)।
📄 খৃষ্টবাদের ধর্মীয় বিধি-বিধান
আল-কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ) নতুন কোন শরীআত বা ধর্মীয় বিধানের প্রবর্তক ছিলেন না, বরং তিনি তাওরাতেরই পূর্বতন বিধানের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী কালে পরিবর্তনের কারণে এই পদ্ধতি ও পাবন্দীকেও উঠাইয়া দেওয়া হয়। সর্বপ্রথম পল-এর আন্দোলনের কারণে "জেরুসালেম কাউন্সিল” এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, "অন্য জাতির খৃস্টানদের জন্য তাওরাতের বিধান (Law) আবশ্যকীয় নহে”। পরবর্তী কালে খৃস্টানরা শুধু ইয়াহূদীদের প্রথম নিজস্ব ধর্মীয় আইনই উপেক্ষা করে নাই, বরং ইয়াহুদী ধর্মমতকেও নিন্দা করিতে শুরু করে এবং বলিতে থাকে যে, আসলে ইয়াহুদীদের কোন ধর্মই নাই (দ্র. ২ঃ১১৩)।
সূরা মারয়াম (১৯: ২১) হইতে জানা যায় যে, খৃস্টীয় ধর্মীয় বিধানে বিশেষ করিয়া সালাত ও যাকাত আদায়ের নির্দেশ অবতীর্ণ হইয়াছিল। কিন্তু এই সম্পর্কিত বিস্তারিত কোন বিবরণ পাওয়া যায় না। দৈনন্দিন বিধিনিষেধ ও পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঈসা (আ) পূর্ববর্তী নবীগণের ধর্মীয় বিধানের উল্লেখ করিতেন এবং নিজে উহা পালন করিতেন (ইসলামী বিশ্বকোষ, ১৪খ, page ৪৯)।
পৌলের মাধ্যমেই হযরত ঈসা (আ)-এর ধর্মের অনেক বিধিবিধান পরিবর্তন করা হয়। যেমনঃ (১) বাইবেলের পুরাতন নিয়মে খৎনা করার নিয়মকে চিরকালের নিয়ম বলিয়া আখ্যায়িত করা হয় (আদিপুস্তক ১৭: ৭, ১০: ১৪), এমনকি হযরত ঈসা (আ)-এরও খৎনা করানো হয় (লুক, ২ঃ ২১)। কিন্তু পৌল খৎনা করিবার চিরাচরিত নিয়ম ভঙ্গ করিলেন। তাহার গালাতীয় পত্রে উল্লেখ করেন, "আমি পৌল তোমাদিগকে কহিতেছি, যদি তোমরা ত্বকচ্ছেদ প্রাপ্ত হও, তবে খৃষ্ট হইতে তোমাদের কিছুই লাভ হইবে না" (গালাতীয় পত্র, ৪: ২)। এইভাবে তিনি হযরত মূসা (আ)-এর শরীআত বাতিল করিয়া নূতন ধর্মীয় বিধান চালু করার চেষ্টা করেন।
খৃস্টানরা নিজেদের জন্য শূকরের গোশত ভক্ষণ করা হালাল করে। অথচ বাইবেলে এমন কোন প্রমাণ নাই যে, হযরত ঈসা (আ) তাঁহার অনুসারীদেরকে শূকরের গোশত ভক্ষণ করিতে অনুমতি দিয়াছিলেন।
অথচ লেবীয় ও দ্বিতীয় বিবরণীতে শূকরের গোশত ভক্ষণ হারাম ঘোষণা করা হইয়াছে। যেমন লেবীয়তে বলা হয়, "আর শূকর তোমাদের পক্ষে অশুচি" (লেবীয় ১১ঃ ৭-৮)।
📄 খৃস্টানবাদের ইবাদত পদ্ধতি ও উৎসবাদি
হযরত ঈসা (আ)-কে কেন্দ্র করিয়া বর্তমান খৃস্টান সমাজ নিজেদের জন্য বিভিন্ন ধরনের ইবাদত তথা প্রার্থনা রীতি ও উৎসবের উদ্ভব ঘটাইয়াছে। যেমনঃ (১) ব্যাপটিজম (Baptism) ইহা খৃষ্ট ধর্মের প্রাচীনতম রীতির অন্যতম। ইহা এক প্রকার আনুষ্ঠানিক গোসল যাহা খৃস্ট 'ধর্মে' প্রবেশকারী ব্যক্তিকে করান হয় (দ্র. Encyclopaedia Britannica, Baptism শীর্ষক প্রবন্ধ, ৩খ, ৮৩; The Christian Religion, ৩খ, ১০০, ১৫২)।