📄 ত্রিত্ববাদ খণ্ডনে আল-কুরআন
কুরআন মজীদ নাযিল হওয়ার যুগে অধিকাংশ খৃস্টান যেসব বড় বড় দলে বিভক্ত ছিল ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে তাহাদের আকীদা ভিন্ন তিনটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। একদল বলিত যে, মসীহ-ই প্রকৃত খোদা এবং খোদাই মসীহ্-এর রূপ ধারণ করিয়া পৃথিবীতে অবতরণ করেন। দ্বিতীয় দল বলিত যে, মসীহ খোদার পুত্র। তৃতীয় দলটি বলিত যে, একত্বের রহস্য তিনের মধ্যে লুকাইয়া আছে, পিতা-পুত্র-মারয়াম। এই দলটি আবার দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। দ্বিতীয় দলের লোকেরা মারয়ামের পরিবর্তে পবিত্র আত্মাকে তৃতীয় আকনূম (আসল) বলিত। মোটকথা, তাহারা হযরত মসীহ (আ)-কে (ثالث ثلاثة) তিনের মধ্যে তৃতীয়) বলিত।
এজন্য কুরআন মজীদ এই তিন দলকে পৃথক পৃথকভাবে এবং একত্রেও উল্লেখ করিয়াছে। অতঃপর যুক্তি-প্রমাণের আলোকে খৃস্টান বিশ্বের সামনে একথাও বলিয়া দিয়াছে যে, এ সম্পর্কে সত্য পথ মাত্র একটি। আর তাহা হইল হযরত মসীহ (আ) মারয়ামের পেটে জন্মগ্রহণ করা মানুষ এবং আল্লাহর সত্য নবী ও রাসূল। আর ইহার পরিবর্তে যাহা বলা হইতেছে তাহা বাতিল। যেমন ইয়াহুদীদের আকীদা (নাউযুবিল্লাহ্) যে, তিনি ধোঁকাবাজ, প্রতারক এবং মিথ্যাবাদী ছিলেন (নাউযুবিল্লাহ্) অথবা খৃস্টানদের বিশ্বাস তিনি খোদা, খোদার পুত্র অথবা তিনজনের মধ্যে তৃতীয় (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ২১০-২১১)। আল-কুরআনে ত্রিত্ববাদের খণ্ডনে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ হইতে আলোচনা করা হইয়াছে। যেমনঃ (১) ত্রিত্ববাদকে কুফুরী ও শিরক আখ্যায়িত করিয়া বলা হইয়াছে:
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلَثَةٍ وَمَا مِنْ إِله إِلا اللَّهَ وَاحِدَةً وَإِنْ لَّمْ يَنْتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ. أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"যাহারা বলে, আল্লাহ্ তো তিনের মধ্যে একজন, তাহারা তো কুফরী করিয়াছেই, যদিও এক ইলাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই। তাহারা যাহা বলে তাহা হইতে নিবৃত্ত না হইলে তাহাদের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছে তাহদের উপর মর্মন্তুদ শাস্তি আপতিত হইবেই। তবে কি তাহারা আল্লাহ্ দিকে প্রত্যাবর্তন করিবে না ও তাঁহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিবে না? আল্লাহ্ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৫ঃ ৭৩-৭৪)।
يَا أَهْلَ الْكِتٰبِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللهِ إِلَّا الحَقِّ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللهِ وَكَلِمَتُهُ القُهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوْحُ مِنْهُ فَامِنُوا بِاللهِ وَرُسُلِهِ وَلَا تَقُولُوا ثَلْثَةٌ إِنْتَهُوا خَيْرًا لَكُمْ إِنَّمَا اللَّهُ اللَّهُ واحِدٌ سُبْحْنَهُ أَنْ يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ لَهُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلاً .
"হে কিতাবীগণ! তোমরা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করিও না ও আল্লাহ্ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত বলিও না। মারয়াম-তনয় 'ঈসা মসীহ আল্লাহ্র রাসূল এবং তাঁহার বাণী যাহা তিনি মারয়ামের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন ও তাঁহার আদেশ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং বলিও না, "তিন"। নিবৃত্ত হও, ইহা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হইবে। আল্লাহ্ তো একমাত্র ইলাহ্, তাঁহার সন্তান হইতে তিনি ইহার অনেক ঊর্ধ্বে। আসমান ও যমীনে যাহা কিছু আছে সব আল্লাহ্রই। কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট" (৪: ১৭১; আরও দ্র. ৫:১৭, ৭২)।
(২) কখনও বলা হয়, হযরত ঈসা (আ) আল্লাহ্ আব্দ বা বান্দা। অন্যান্য মানুষের মত তাঁহারও মানবিক চাহিদা আছে, তাঁহার জীবন ও মৃত্যু আছে। যেমন আল্লাহ্র বাণী:
إِنْ هُوَ إِلَّا عَبْدُ أَنْعَمْنَا عَلَيْهِ وَجَعَلْتُهُ مَثَلًا لِبَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَوْ نَشَاءُ لَجَعَلْنَا مِنْكُمْ مَلَئِكَةٌ فِي الْأَرْضِ يَخْلُقُونَ ، وَإِنَّهُ لَعِلْمُ لِلسَّاعَةِ فَلَا تَمْتَرُنَّ بِهَا وَاتَّبِعُونِ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٍ.
"সে তো ছিল আমারই এক বান্দা, যাহাকে আমি অনুগ্রহ করিয়াছিলাম এবং করিয়াছিলাম বানু ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করিলে তোমাদিগের মধ্য হইতে ফেরেস্তা সৃষ্টি করিতে পারিতাম, যাহারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হইত। ঈসা তো কিয়ামতের নিদর্শন। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করিও না এবং আমাকে অনুসরণ কর। ইহাই সরল পথ" (৪৩: ৫৯-৬১; আরও দ্র. ১৯: ৩০-৩৩; ৪ঃ ১৭২)।
(৩) এমনিভাবে যাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র বলে আল-কুরআনে তাহাদের বক্তব্য খণ্ডন করা হইয়াছে। যেমন আল্লাহ্র বাণী:
وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرُ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصْرَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِؤُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنِّي يُؤْفَكُونَ .
"ইয়াহূদী বলে, উযায়র আল্লাহ্র পুত্র এবং খৃস্টানরা বলে, মসীহ আল্লাহ্ পুত্র।। উহা তাহাদিগের মুখের কথা। পূর্বে যাহারা কুফুরী করিয়াছিল উহারা তাহাদিগের মত কথা বলে। আল্লাহ্ উহাদিগকে ধ্বংস করুন। উহারা কেমন করিয়া সত্যবিমুখ হয়" (৯:৩০)।
(৪) কুরআন করীমে স্পটভাবে বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ্ পাকের কোন সন্তান নাই। তাই ঈসা (আ)-ও আল্লাহ্ পাকের সন্তান নহেন। বলা হইয়াছে:
وَقَالُوا اتَّخَذَ اللَّهُ وَلَدًا سُبْحْنَهُ بَل لَهُ مَا فِي السَّمواتِ وَالْأَرْضِ كُلٌّ لَهُ قَانِتُونَ .
"তাহারা বলে, আল্লাহ্ সন্তান গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি অতি পবিত্র; বরং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে সব আল্লাহ্রই। সব কিছু তাঁহারই একান্ত অনুগত" (২: ১১৬; আরও দ্র. ৬: ১০১; ১১২ঃ ১-৪)।
আবার কোথায়ও বলা হইয়াছে, হযরত ঈসা (আ) মানব স্বভাবের অধিকারী রাসূলগণের অন্তর্গত, যাঁহারা যুগে যুগে মানুষের হিদায়াতের জন্য কাজ করিয়া গিয়াছেন। যেমন আল্লাহ্ বাণী:
مَا الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ إِلا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ كَانَا يَأْكُلْنِ الطَّعَامَ أَنْظُرْ كَيْفَ نُبَيِّنُ لَهُمُ الْآيَاتِ ثُمَّ انْظُرْ أَنِّي يُؤْفَكُونَ .
"মারয়াম-তনয় মসীহ তো কেবল একজন রাসূল, তাহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছে এবং তাহার মাতা সত্যনিষ্ঠ ছিল। তাহারা উভয়ে খাদ্যাহার করিত। দেখ, উহাদের জন্য আয়াত কিরূপ বিশদভাবে বর্ণনা করি; আরও দেখ, উহারা কিভাবে সত্যবিমুখ হয়" (সূরা মায়িদা-৭৫)।
এইভাবে আল-কুরআনের বর্ণনা দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, হযরত ঈসা (আ) ছিলেন একজন মানুষ, আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তিনি কোন ইলাহ ছিলেন না বা আল্লাহর পুত্রও ছিলেন না কিংবা আল্লাহর অংশও ছিলেন না। আর খৃষ্টানদের ত্রিত্ববাদের আকীদাটি স্পষ্ট কুফুরী ও শিরক যাহার সহিত আল্লাহর নবী ঈসা (আ) এর কোন সম্পর্ক নাই [যিশাইয় (৪৩-১১) (যাত্রা পুস্তক, ৪৬: ১১)। হে সদা প্রভু ঈশ্বর তুমি মহান, কারণ তোমার তুল্য কেহই নাই ও তুমি ব্যতীত কোন ঈশ্বর নাই (২য় শমুয়েল (৭:২২), ১ম রাজাবলী (৮:২৩), (যিশাইয় (৪০:২৮), তিরমিয় (১০:৬)।
📄 একত্ববাদ সম্পর্কে খোদ বাইবেলে প্রাপ্ত তথ্য
উল্লেখ্য, খৃস্টানগণ ত্রিত্ববাদের দাবিদার হইলেও তাহাদের কাছে স্বীকৃত বর্তমান বাইবেলেই এমন কিছু উক্তি লক্ষণীয় যেইগুলি তাওহীদের প্রমাণ বহন করে। উহার কতিপয় উক্তি উল্লেখ করা হইল। যেমন: “সদাপ্রভুই ঈশ্বর, তিনি ব্যতীত আর কেহ নাই। ইহা যেন তুমি জ্ঞাত হও (দ্বিতীয় বিবরণ, ৪ : ৫; আর দ্র. ৬:৪)। "কারণ তুমি মহান এবং আশ্চর্য কার্যকারী, তুমিই একমাত্র ঈশ্বর" (গীতসংহিতা, ৮৬: ১০; আরও দ্র. ১ম রাজাবলী, ৮ঃ ৬০)।
📄 বাইবেল নূতন নিয়ম যেমন :
(১) যোহন সুসমাচারে উক্ত হইয়াছে (২০: ১৭), "যিনি আমাদের পিতা ও তোমাদের পিতা এবং আমার ঈশ্বর ও তোমাদের ঈশ্বর, তাঁহার নিকটে আমি ঊর্ধ্বে যাই"। ইহাতে 'স্পষ্ট বুঝা যায় যে, যীশু খৃস্টসহ সকলের প্রভু একমাত্র আল্লাহ। যীশু প্রভু নহেন।
(২) মার্ক (১২: ২৯) বাক্যে আছে, "হে ইস্রায়েল শোন, আমাদের ঈশ্বর প্রভু একই প্রভু”। (আরও দ্র. মার্ক, ১২ঃ ৩২)।
(৩) মথি (২৩: ৮-৯) "আর পৃথিবীতে কাহাকেও পিতা বলিয়া সম্বোধন করিও না, কারণ তোমাদের পিতা একজন, তিনি সেই স্বর্গীয় (আসমানী)"।
(৪) লুক (৪: ৮) বাক্যে আছে, "তোমার ঈশ্বর প্রভুকেই প্রণাম করিবে। কেবল তাঁহারই আরাধনা করিবে”। ইহাতে বুঝা যায় যে, ইবাদত ও বন্দেগী পাওয়ার যোগ্য একমাত্র আল্লাহই, যীশু নহেন।
📄 ঈসা (আ) প্রভু বা ইলাহ না হওয়ার পক্ষে যুক্তি
হযরত ঈসা (আ) যে প্রভু কিংবা ইলাহ ছিলেন না উহার পক্ষে অসংখ্য যুক্তি রহিয়াছে। উহার কয়েকটি নিম্নরূপঃ (১) তিনি আল্লাহর প্রেরিত নবী। আল্লাহ তাঁহাকে রাসূলরূপে প্রেরণ করিয়াছেন।
(২) পূর্বের অনেক নবী যীশু নবী হিসাবেই পৃথিবীতে আগমন করিবেন বলিয়া সুসংবাদ দিয়েছেন।
(৩) তিনি মানবসন্তান মারয়ামের গর্ভে মানবরূপেই জন্মগ্রহণ করিয়াছেন।
(৪) অন্য মানুষের ন্যায় তিনিও আহার-বিহার করিতেন এবং সুখ-দুঃখ অনুভব করিতেন।
(৫) তিনি আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা ও তাঁহার ইবাদত করিয়াছেন।
এই সব বিষয়ের উপর সামান্য চিন্তা করিলেও পরিষ্কারভাবে প্রতিভাত হয় যে, তিনি কোনক্রমেই প্রভু ছিলেন না (মাওলানা ইমদাদুল হক, প্রাগুক্ত, page ৭৩)। হযরত ঈসা যদি প্রভু হইতেন, ত্রিত্ববাদ যদি সত্য হইত তবে হযরত মূসা (আ) এবং অন্যান্য পয়গাম্বর এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সম্বন্ধে নীরব না থাকিয়া বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করিয়া যাইতেন।
মোটকথা, ত্রিত্ববাদ এমন একটি মতবাদ যাহা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অবান্তর। খৃস্টানরা মানুষকে ইহাই বুঝাইতে চায় যে, ত্রিত্ববাদ কেবল বিশ্বাসের বিষয়, বোধগম্য হওয়ার বিষয় নহে। তাহাতে অন্তরে বিশ্বাস করিলেই পরিত্রাণ ও মুক্তি সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে তাহা অযৌক্তিক নহে। আল্লাহ প্রদত্ত একত্ববাদের ধর্মকে ধ্বংস করার জন্য মূলত ইহা একটি ষড়যন্ত্র। সেন্ট পলই ইহার আবিষ্কারক। ত্রিত্ববাদীরা বাইবেল হইতে ত্রিত্ববাদের সপক্ষে কোনও প্রকারের প্রমাণ না পাইয়া সেন্ট পলের পত্রাবলী হইতে উহার প্রমাণ পেশ করিয়াছে। আর সেন্ট পলের যুগ প্রেরিতদের যুগের পরের যুগ। তবে কিছু লোক চার ইনজীল হইতেও প্রমাণ পেশ করিবার ব্যর্থ চেষ্টা করিয়াছে। বাইবেল হইতে উদ্ধৃত ত্রিত্ববাদের প্রমাণাদি ও তাহার জবাব:
১ম প্রমাণ: যোহন সুসমাচার ২০: ২৮ বাক্যে বলা হইয়াছে যে, থোমা উত্তর করিয়া তাহাকে কহিলেন, প্রভু আমার ঈশ্বর! আমার এইখানে যীশুর সামনে তাহাকে প্রভু ও ঈশ্বর ব্যক্ত করিয়া ডাক দেওয়া হইয়াছে এবং তিনি তাহাকে নিষেধ করেন নাই। অতএব যদি তিনি প্রভু না হইতেন তাহা হইলে নিশ্চয়ই তিনি নিষেধ করিতেন।
জবাবঃ (১) থোমা যে যীশু খৃস্টকে প্রভু বলিয়া সম্বোধন করিয়াছিলেন উহার সত্যতা সংশয়যুক্ত। কেননা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, বাইবেলে বহু বিকৃতি ঘটিয়াছে। বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে "ঈশ্বর" ও "প্রভু” শব্দ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে।
যেমন: (ক) 'প্রভু' অর্থ প্রদর্শক ও দিশারী। যথা- যাত্রা পুস্তক ৭: ১ বাক্যে বলা হইয়াছে, "তখন সদাপ্রভু মোশিকে কহিলেন, দেখ আমি ফরৌণের কাছে তোমাকে ঈশ্বর স্বরূপ করিয়া নিযুক্ত করিলাম"। এইখানে পথপ্রদর্শক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, নিশ্চয়ই প্রভু হিসাবে নয়। খৃস্টানরাও মূসা (আ)-কে প্রভু হিসাবে বিশ্বাস করে না।
(খ) স্বর্গীয় দূত ও ফেরেশতা বুঝাইতেও ঈশ্বর শব্দ ব্যবহার করা হইয়াছে। আদিপুস্তকের ১৭: ২২ বাক্যে আছে যে, "পরে কথোপকথন সাঙ্গ করিয়া ঈশ্বর আব্রামের নিকট হইতে উর্দ্ধগমন করিলেন"। এইখানে ঈশ্বর ফেরেশতার অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। কেননা ইসহাক (আ)-এর জন্মের সুসংবাদ দেওয়ার জন্য ফেরেশতাকে প্রেরণ করা হইয়াছিল।
(গ) সৎলোক, নেতা ও মুরুব্বী অর্থেও ঈশ্বর শব্দ ব্যবহার করা হইয়াছে। যথা গীতসংহিতা, ৮২ঃ ৬ বাক্যে আছে, "আমিই বলিয়াছি, তোমরা ঈশ্বর, তোমরা সকলে পরাৎপরের সন্তান", এবং যোহন ১০ : ৩৪ বাক্যে আছে, "যীশু তাহাদিগকে উত্তর করিলেন, তোমাদের ব্যবস্থায় কি লিখিত নাই, আমি বলিলাম তোমরা ঈশ্বর"। এই সকল স্থানে 'ঈশ্বর' দ্বারা সৎলোককে বুঝানো হইয়াছে।
২য় প্রমাণ: মথি ৩: ১৭ বাক্যে আছে, "আর দেখ, স্বর্গ হইতে এই বাণী হইল, 'ইনিই আমার প্রিয় পুত্র, ইহাতেই আমি প্রীত"। এইখানে যীশু খৃস্ট আল্লাহর পুত্র বলে পরিষ্কার উল্লেখ পাওয়া যায়। ইহা ছাড়াও আরও বিভিন্ন স্থানে তাঁহাকে আল্লাহর পুত্র বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।
জবাবঃ বাইবেলের বিভিন্ন স্থানে পুত্র শব্দ বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হইয়াছে। সাধারণ মানুষকেও আল্লাহর বান্দা হিসাবে পুত্র বলা হইয়াছে। যেমন যাত্রাপুস্তক ৪: ২২ বাক্যে আছে”। সদা প্রভু এই কথা কহেন "ইস্রায়েল আমার পুত্র আমার প্রথম জাত"।
৩য় প্রমাণ: যোহন ১০: ৩০ বাক্যে আছে, "আমি ও পিতা আমরা এক"। ইহা হইতে পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, যীশু খৃস্ট আল্লাহর ন্যায় আল্লাহ।
জবাব: এইরূপ বাক্য যীশু প্রেরিতদের সম্পর্কেও বলিয়াছেন। যেমন: যোহন ১৭: ২১ বাক্যে আছে, "পিতা: যেমন তুমি আমাতে ও আমি তোমাতে, তেমনি তাহারাও যেন আমাদিগতে থাকে।
১ম বংশবলী ২৮: ৬ বাক্যে আছে, "কেননা আমি তাহাকেই (শলোমনকে) আমার পুত্র বলিয়া মনোনীত করিয়াছি। আমিই তাহার পিতা হইব" (আরও দ্র. ২২: ১০) গীতসংহিতা, ৬৮: ৫ বাক্যে আছে, "ঈশ্বর আপন পবিত্র বাসস্থানে পিতৃহীনদের পিতা ও বিবাদের বিচারকর্তা"। লুক, ৩:৩৮ বাক্যে আছে, "ইনি আদমের পুত্র, ইনিই ঈশ্বরের পুত্র"। ইত্যাকার বাক্যসমূহে পুত্র শব্দ আদম, ইস্রায়েল, মূসা, সুলায়মান (আ) প্রমুখ নবীগণের জন্য ব্যবহার করা হইয়াছে। অথচ কাহারও মতেই তাহারা না আল্লাহ ছিলেন এবং না আল্লাহর পুত্র ছিলেন। অতএব যীশু খৃস্টকে পুত্র বলা হইলেও সেই একই অর্থ বুঝানো হইয়াছে। এইসব বাক্যে বিশেষ সম্পর্ক বুঝানো হইয়াছে। যদি "আল্লাহ" অর্থ নেওয়া হয় তাহা হইলে প্রেরিতদেরকেও আল্লাহ বলিতে হইবে।
৪র্থ প্রমাণ: সুসমাচারসমূহে খৃস্ট কর্তৃক মৃতদিগকে জীবিত করার বিভিন্ন ঘটনা উল্লিখিত হইয়াছে। যেমন: মার্ক, ৫:৪১, মথি, ৯: ২৫, লুক, ৮ঃ ৫৫ এবং যোহন, ১১: ৪৩। যেহেতু মৃতকে জীবনদান একমাত্র আল্লাহর বিশেষ গুণ, কোন মানুষের পক্ষে এই কাজ সম্ভব নয়। অতএব যীশু খৃস্টই আল্লাহ।
জবাব: আল্লাহ্ চিরন্তন বিধান এই যে, যাহাকে তিনি নবী হিসাবে প্রেরণ করেন, তাঁহাকে এমন কিছু প্রর্দশনের ক্ষমতা দান করেন যাহা সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভবপর নয়। নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রমাণস্বরূপ আলৌকিক কিছু কার্যাবলী প্রকাশিত হয়। এই স্থলে মূলত কার্য আল্লাহরই হইয়া থাকে, যদিও নবীর হাতে তাহা প্রকাশ পায়। এইজন্য নবী এই সকল কাজে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করেন। আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করাই প্রমাণ করে যে, তিনি আল্লাহ নন। যেমন যোহন; ১১:৪১ বাক্যে আছে, “পরে যীশু উপরের দিকে চক্ষু তুলিয়া বলিলেন, পিত! তোমার ধন্যবাদ করি যে, তুমি আমার কথা শুনিয়াছ"।
এইসব বাক্য দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, তিনি আল্লাহর প্রেরিত নবী ছিলেন, আল্লাহ ছিলেন না। মৃতকে জীবন দান করা যদি আল্লাহ হওয়ার প্রমাণ বহন করে তাহা হইলে যীশু খৃস্ট ছাড়া অন্যান্য যে সকল নবীর মাধ্যমে উক্ত ঘটনা সংঘটিত হইয়াছে তাহাদেরকেও আল্লাহ বলিতে হইবে। যেমন যিহিঙ্কেল, ৩৭:১০ বাক্যে আছে, "তাহাতে আত্মা তাহাদের মধ্যে প্রবেশ করিল এবং তাহারা জীবিত হইল" (আরও দ্র. রাজাবলী, ১৭:২১-২২; রাজাবলী ৪: ৩২-৩৩-৪৪-৪৫ বাক্যও আছে।
মোটকথার খৃস্টানগণ ঈসা (আ)-কে আল্লাহ বা তাঁহার পুত্র প্রমাণ করিতে যে সকল যুক্তি-প্রমাণ উপস্থাপন করিয়াছে তাহা সম্পূর্ণরূপে অসার ও ভ্রান্ত। তিনি ছিলেন আল্লাহ্র বান্দা ও রাসূল।