📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ত্রিত্ববাদের ভ্রান্ত ধারণা ও ইহার খণ্ডন

📄 ত্রিত্ববাদের ভ্রান্ত ধারণা ও ইহার খণ্ডন


খৃস্টধর্মের সর্বাপেক্ষা বিতর্কিত, জটিলতম ও প্রধানতম আকীদা হইল ত্রিত্ববাদ নীতি (Trinitarian Doctrine)। ত্রিত্ববাদ শব্দটি ত্রিত্ব (Trinity) হইতে উদ্ভূত। ইহার উল্লেখ ইনজীল ও তৎসংশ্লিষ্ট গ্রন্থাবলীতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সর্বপ্রথম এই শব্দটি "প্রেরিতদের যুগে” পলের প্রভাবে ব্যবহৃত হয় (দ্র. আল-বুস্তানী, দা'ইরাতুল-মা'আরিফ, আরবী, ৬খ, ৩০৬, বৈরূত; তকী উছমানী, প্রাগুক্ত, page ১৩৬)।
এই আকীদা অনুযায়ী আল্লাহ তিন ব্যক্তিত্বের সমষ্টি। কিন্তু পরবর্তী কালে ইহার ব্যাখ্যায় অনেক মতপার্থক্য ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়। কোন কোন মতে, পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা গড (প্রভু)-এর তিন ব্যক্তিত্ব (Ency. Britannica, ২২খ., page ৪৭৯, Trinity শীর্ষক নিবন্ধ)। একশ্রেণী তৃতীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে পবিত্র আত্মার স্থলে "কুমারী মারয়াম"-কে মনে করে। অপর এক শ্রেণীর আকীদা ছিল, তাহাদের প্রত্যেকে পৃথক পৃথকভাবে এবং সমষ্টিগতভাবেও গড [প্রভু) (Ency. Britannica, ২২খ., ৪৭১, ১৯৫০ খৃ.)। অন্য আরেক দলের ধারণায় তাহারা পৃথক পৃথকভাবে গড (God) অপেক্ষা কিছুটা কম কিন্তু সমষ্টিগতভাবে পূর্ণাঙ্গ গড (প্রাগুক্ত)। মারকুলিয়া নামের প্রাচীন এক সম্প্রদায়ের ধারণা ছিল যে, তাহারা পৃথক পৃথকভাবে গড নহেন, বরং সমষ্টিগতভাবেই গড (আল-মাকরীযী, আল-খিতাত, ৩খ, ৪০৮)। এই আকীদা-এর ব্যাখ্যায় সমস্ত প্রাচীন ও আধুনিক খৃস্টান দার্শনিক অনেক উচ্চবাচ্য করিলেও আসলে ইহা এমন এক গোলকধাঁধাঁ যাহা বড় বড় খৃস্টান পণ্ডিতদের পক্ষেও অন্যদের বুঝানো তো দূরের কথা, নিজেরাও সঠিকভাবে উপলব্ধি করিতে সক্ষম হয় নাই (দ্র. তকী উছমানী, প্রাগুক্ত।)
"সেন্ট-পল"-এর প্রভাবেই খৃস্টধর্মে তৎকালীন রোমান পৌত্তলিকতার অনুপ্রবেশ ঘটে। হযরত ঈসা (আ)-এর একত্ববাদের পরিবর্তে পৌত্তলিকদের ত্রিত্ববাদ প্রচারিত হয়। দ্বিতীয় শতাব্দীতে সর্বপ্রথম পাদ্রী থিয়োফীলুস গ্রীক ভাষায় এই সম্পর্কে "ছরয়াস" (ثریاس) শব্দ ব্যবহার করেন। তাহার পর পাদ্রী তারতলিয়ানুছ ইহার প্রায় সমার্থক শব্দ তারনতিয়াস (تیر نتیاس) শব্দটি আবিষ্কার করেন। ইহারই সমার্থবোধক শব্দ হইতেছে বর্তমান তাছলীছ বা হাল্ছ (ত্রিত্ব)। কিন্তু সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করিলে দেখা যায় যে, এই মতবাদ খৃস্টধর্ম ও পৌত্তলিকতা সংমিশ্রিত একটি মতবাদ। বিশেষত মিসরীয় পৌত্তলিকতা যখন খৃস্টধর্ম গ্রহণ করিল তখন তাহারাই এই ত্রিত্ববাদকে অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রকাশ ও প্রচার শুরু করিল। বস্তুত ইহার মূল উদ্দেশ্য ছিল, তাহাদের পূর্বেকার পৌত্তলিকতার ধ্যান-ধারণা ও নূতন খৃস্টধর্মের মধ্যে একটা গোজামিল দেওয়া (সিওহারবী, ৪খ, page ২০০)।
মাওলানা আবুল কালাম আযাদ বলেন যে, আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌত্তলিক দার্শনিক মতবাদ ত্রিত্ববাদে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ 'সেরাফিজ' (Serafis) শব্দ হইতে ত্রিত্ববাদের উৎপত্তি এবং আইসিস (ISIS)-এর স্থানে মারয়াম ও হর্স (Hors)-র স্থলে যীশু খৃস্ট ব্যবহার করিয়া গ্রীক ও মিশরীয় দর্শনিক পৌত্তলিকতার সংযোগ স্থাপন করিয়া বর্তমান খৃষ্টবাদ আবিষ্কার করা হয়। ইহার পর হইতেই এই ভ্রান্ত মতবাদ নির্ভরযোগ্য বিশ্বাস ও আকীদা বলিয়া গীর্জায় স্থান পাইয়া যায়। তথাপি এই মতবাদের গ্রহণ ও বর্জন সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক চলিতে থাকে (মাও. আযাদ, তাফসীরে তরজমানুল কুরআন)।
ইহার পরিপ্রেক্ষিতে ৩২৫ খৃস্টাব্দে 'নেকিয়া কাউন্সিল' অনুষ্ঠিত হয়। ইহাতে খৃষ্ট জগতের সকল পাদ্রী সমবেত হইয়া একত্ববাদ ও ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে পরস্পর তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হয়। পরিশেষে উক্ত কাউন্সিল ত্রিত্ববাদকে খৃস্টধর্মের মূল আকীদা বলিয়া সমর্থন করিয়া নেয়। আর ইহার বিরোধী সকল মতবাদকে 'ইল্হাদ' (ধর্মদ্রোহিতা) বলিয়া ঘোষণা দেয়। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ পাদ্রীরা ইহাকে মানিয়া নিলে কতক ধর্মযাজক ভিন্ন মত প্রচার করিতে লাগিল। যেমন, আবইউনীরা যীশুখৃস্টকে কোনক্রমেই আল্লাহরূপে স্বীকার করে নাই, তাহাকে একমাত্র মানুষ বলিয়া স্বীকার করিত। আর একদল বলিত, মূলত 'গড' একই সত্তা। পিতা, পুত্র ও পবিত্র আত্মা তাঁহার ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা। অবস্থাভেদে একই সত্তার উপর বিভিন্ন নাম প্রয়োগ করা যাইতে পারে। আরইউছবির অনুসারীরা বলিত যে, তিনি যদিও গড-এর পুত্র, তিনি অনাদি নহেন, বরং আল্লাহ সৃষ্ট। মেসিডোনীয়দের মতে পিতা ও পুত্র মূলত গড-এর দুইটি অংশ, পবিত্র আত্মা কোন অংশ নহে (সিওহারবী, প্রাগুক্ত, page ২০১-২০২)।
এই বিরোধী দলগুলি ত্রিত্ববাদের বিরোধী হওয়ায় নিকিয়া কাউন্সিলের ঘোষণামতে তাহারা মুলহিদ অর্থাৎ ধর্মদ্রোহী ভ্রান্ত দল। কিন্তু 'আরইউছ' আলেকজান্দ্রিয়ার মধ্যে একজন খ্যাতনামা পাদ্রী ছিলেন এবং তিনি ত্রিত্ববাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। পরিশেষে ৩৮১ খৃস্টাব্দে 'নাইসা' শহরে রাজা কনস্টান্টাইন-এর উপস্থিতিতে এক বিতর্ক সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইহাতে 'আরইউস' অত্যন্ত স্পষ্ট ও জোরদারভাবে একত্ববাদের উপর বক্তব্য রাখেন। তবে অধিকাংশ পাদ্রীর মতে ত্রিত্ববাদই সমর্থিত হয়। আর সরকারীভাবে আইন প্রয়োগ করিয়া ঘোষণা করিয়া দেওয়া হয় যে, যাহারা ত্রিত্ববাদের বিরোধী হইবে তাহাদের সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হইবে এবং তাহাদেরকে দেশান্তরিত করা হইবে। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে অধিকাংশ লোক ত্রিত্ববাদকে গ্রহণ করিয়া নেয়। তবে ত্রিত্ববাদের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে তাহাদের পরস্পরে বিরাট মতবিরোধ থাকিয়া যায়। নিকিয়া কমিটি যীশু খৃস্টকে প্রভু বলিয়া স্বীকার করিলেও পুত্র ও পবিত্র আত্মা উভয়কে পিতা কর্তৃক অনাদি কাল হইতে সৃষ্ট বলিয়া বিশ্বাস করিত। ইহার পর ৫৮৯ খৃস্টাব্দে অনুষ্ঠিত 'তলিতলা' কাউন্সিলে এই সংশোধনী গৃহীত হয় যে, পবিত্র আত্মা শুধু পিতা কর্তৃক সৃষ্ট নয় বরং পিতা ও পুত্র উভয় কর্তৃক সৃষ্ট। এই সংশোধনী প্রস্তাব ল্যাটিন গীর্জার সমর্থন লাভ করিলেও গ্রীক গীর্জার পাদ্রীরা ইহাকে গ্রহণ করিল না। ইহার ফলে রোমান ক্যাথলিক ও গ্রীক পাদ্রীদের মধ্যে কোন প্রকার সমঝোতা সম্ভব হয় নাই (প্রাগুক্ত)।
অপরদিকে দেখা যায় যে, ৩২৫ খৃস্টাব্দে নিকিয়া কাউন্সিল যীশুখৃস্টকে আল্লাহর পুত্র বলিয়া ঘোষণা দিলেও কি অর্থে যীশু খৃস্টকে প্রভু বা আল্লাহর পুত্র বলা হইয়াছে হইতে মতভেদ সৃষ্টি হয়। পরিশেষে ৪৫১ খৃস্টাব্দে 'কালসিডেন' কাউন্সিল এই বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দেয়ঃ যীশুখৃস্ট দুইটি গুণের সমষ্টি; তাঁহার মধ্যে প্রভুত্ব ও মানবত্ব এই দুইটি গুণের একত্র সমাবেশ ঘটিয়াছে। ইহার পর ৬৮০ খৃস্টাব্দে আরেকটি কাউন্সিল বলে যে, যীশুখৃস্ট দুইটি গুণের সমষ্টি হওয়ার ফলে একই সময় দুই প্রকার শক্তি ও ইচ্ছা কার্যকর করিতে পারেন (ইনসাই. ব্রিটানিকা, ৫খ, চার্চ হিস্টোরী)।
এই ত্রিত্ববাদ মূলত 'সেন্ট পল' কর্তৃক সৃষ্ট মতবাদ। কিন্তু খৃস্টানরা ইহাকে মুক্তি ও পরিত্রানের একমাত্র উপায় বলিয়া বিশ্বাস করিয়া নিয়াছে। প্রোটেস্টান্ট ও রোমান ক্যাথলিকরা পরস্পর মতবিরোধ থাকার পরও ত্রিত্ববাদকে একবাক্যে মানিয়া নিয়াছে। তবে ইহাকে বোধগম্য করার জন্য তাহারা যতই চেষ্টা চালাইয়াছে ততই ইহা আরো জটিল ও দুর্বোধ্য হইয়াছে। তিনে এক এবং একে তিন হওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
এই ত্রিত্ববাদের শুরু হইতে আজ পর্যন্ত ইহার গোলকধাঁধাঁ হইতে খৃস্টান জগৎ মুক্তি লাভ করিতে পারে নাই। ফলে "তিনে এক এবং একে তিন" এই হেয়ালী এখনও দুর্বোধ্যই রহিয়া গিয়াছে। প্রফেসর মরিস বিলেটন তাঁহার Studies of chirstian doctrin গ্রন্থে ইহার বিস্তারিত আলোচনা করিয়াছেন (৬ খৃ,৭৬)। এই জন্যই খৃস্টানদের এবিউনী সম্প্রদায় শুরুতে আত্মসমর্পণ করিয়া বলিয়াছে, যাহাই বলুন না কেন, "হযরত মসীহ (আ)-কে খোদা মানিয়া নিয়া আমরা কিছুতেই তাওহীদ রক্ষা করিতে পারিব না"।
খৃস্টানদেরকে অনেকেই যেমন Paul Samasota এবং লুসিয়ান (Locian) প্রমুখ খৃস্টান পণ্ডিত বলিয়া দিয়াছেন, হযরত মসীহকে খোদা মানাই ভুল; তিনি শুধুই একজন মানুষ বই কিছুই নন" (Britannica, vol. 17, P. ও 97)।
বস্তুত তিন কখনও এক হইতে পারে না; তিন এবং এক দুইটি পরস্পর বিরুদ্ধ সংখ্যা বা সত্তা; আগুন ও পানির সম্পর্কের মতই উভয়ের সম্পর্ক। তবুও যদি খৃস্টানগণ উভয়ের একটিকে আসল এবং অন্যটিকে গৌণ বলিত তবুও না হয় ভাবিয়া দেখা যাইত। কিন্তু স্বয়ং খৃস্টানরাই এই পথ বন্ধ করিয়া দিয়াছে। তাহারা একত্বকেও মৌলিক এবং ত্রিত্ববাদকেও মৌলিক বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে। এই জন্যই প্রোটেস্টান্ট সম্প্রদায় তাহাদের অতীত মনীষীদের অভিমত পরিত্যাগ করত নীরবতাকেই নিজেদের নিরাপদ আশ্রয় বলিয়া গ্রহণ করিয়াছে।
অতীত উম্মতের কেহই ত্রিত্ববাদের প্রবক্তা ছিলেন না। হযরত আদম (আ) হইতে হযরত মূসা (আ) পর্যন্ত কেহই ত্রিত্ববাদের আকীদা গ্রহণ করেন নাই; বাইবেল হইতেও এই উক্তির সত্যতা প্রকাশ পায় (প্রাগুক্ত, page ৭)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ত্রিত্ববাদ খণ্ডনে আল-কুরআন

📄 ত্রিত্ববাদ খণ্ডনে আল-কুরআন


কুরআন মজীদ নাযিল হওয়ার যুগে অধিকাংশ খৃস্টান যেসব বড় বড় দলে বিভক্ত ছিল ত্রিত্ববাদ সম্পর্কে তাহাদের আকীদা ভিন্ন তিনটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। একদল বলিত যে, মসীহ-ই প্রকৃত খোদা এবং খোদাই মসীহ্-এর রূপ ধারণ করিয়া পৃথিবীতে অবতরণ করেন। দ্বিতীয় দল বলিত যে, মসীহ খোদার পুত্র। তৃতীয় দলটি বলিত যে, একত্বের রহস্য তিনের মধ্যে লুকাইয়া আছে, পিতা-পুত্র-মারয়াম। এই দলটি আবার দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। দ্বিতীয় দলের লোকেরা মারয়ামের পরিবর্তে পবিত্র আত্মাকে তৃতীয় আকনূম (আসল) বলিত। মোটকথা, তাহারা হযরত মসীহ (আ)-কে (ثالث ثلاثة) তিনের মধ্যে তৃতীয়) বলিত।
এজন্য কুরআন মজীদ এই তিন দলকে পৃথক পৃথকভাবে এবং একত্রেও উল্লেখ করিয়াছে। অতঃপর যুক্তি-প্রমাণের আলোকে খৃস্টান বিশ্বের সামনে একথাও বলিয়া দিয়াছে যে, এ সম্পর্কে সত্য পথ মাত্র একটি। আর তাহা হইল হযরত মসীহ (আ) মারয়ামের পেটে জন্মগ্রহণ করা মানুষ এবং আল্লাহর সত্য নবী ও রাসূল। আর ইহার পরিবর্তে যাহা বলা হইতেছে তাহা বাতিল। যেমন ইয়াহুদীদের আকীদা (নাউযুবিল্লাহ্) যে, তিনি ধোঁকাবাজ, প্রতারক এবং মিথ্যাবাদী ছিলেন (নাউযুবিল্লাহ্) অথবা খৃস্টানদের বিশ্বাস তিনি খোদা, খোদার পুত্র অথবা তিনজনের মধ্যে তৃতীয় (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ২১০-২১১)। আল-কুরআনে ত্রিত্ববাদের খণ্ডনে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ হইতে আলোচনা করা হইয়াছে। যেমনঃ (১) ত্রিত্ববাদকে কুফুরী ও শিরক আখ্যায়িত করিয়া বলা হইয়াছে:
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلَثَةٍ وَمَا مِنْ إِله إِلا اللَّهَ وَاحِدَةً وَإِنْ لَّمْ يَنْتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ. أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"যাহারা বলে, আল্লাহ্ তো তিনের মধ্যে একজন, তাহারা তো কুফরী করিয়াছেই, যদিও এক ইলাহ্ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নাই। তাহারা যাহা বলে তাহা হইতে নিবৃত্ত না হইলে তাহাদের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছে তাহদের উপর মর্মন্তুদ শাস্তি আপতিত হইবেই। তবে কি তাহারা আল্লাহ্ দিকে প্রত্যাবর্তন করিবে না ও তাঁহার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করিবে না? আল্লাহ্ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (৫ঃ ৭৩-৭৪)।
يَا أَهْلَ الْكِتٰبِ لَا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ وَلَا تَقُولُوا عَلَى اللهِ إِلَّا الحَقِّ إِنَّمَا الْمَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ رَسُولُ اللهِ وَكَلِمَتُهُ القُهَا إِلَى مَرْيَمَ وَرُوْحُ مِنْهُ فَامِنُوا بِاللهِ وَرُسُلِهِ وَلَا تَقُولُوا ثَلْثَةٌ إِنْتَهُوا خَيْرًا لَكُمْ إِنَّمَا اللَّهُ اللَّهُ واحِدٌ سُبْحْنَهُ أَنْ يَكُونَ لَهُ وَلَدٌ لَهُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَكَفَى بِاللَّهِ وَكِيلاً .
"হে কিতাবীগণ! তোমরা দীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করিও না ও আল্লাহ্ সম্বন্ধে সত্য ব্যতীত বলিও না। মারয়াম-তনয় 'ঈসা মসীহ আল্লাহ্র রাসূল এবং তাঁহার বাণী যাহা তিনি মারয়ামের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলেন ও তাঁহার আদেশ। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁহার রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং বলিও না, "তিন"। নিবৃত্ত হও, ইহা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হইবে। আল্লাহ্ তো একমাত্র ইলাহ্, তাঁহার সন্তান হইতে তিনি ইহার অনেক ঊর্ধ্বে। আসমান ও যমীনে যাহা কিছু আছে সব আল্লাহ্রই। কর্মবিধানে আল্লাহই যথেষ্ট" (৪: ১৭১; আরও দ্র. ৫:১৭, ৭২)।
(২) কখনও বলা হয়, হযরত ঈসা (আ) আল্লাহ্ আব্দ বা বান্দা। অন্যান্য মানুষের মত তাঁহারও মানবিক চাহিদা আছে, তাঁহার জীবন ও মৃত্যু আছে। যেমন আল্লাহ্র বাণী:
إِنْ هُوَ إِلَّا عَبْدُ أَنْعَمْنَا عَلَيْهِ وَجَعَلْتُهُ مَثَلًا لِبَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَوْ نَشَاءُ لَجَعَلْنَا مِنْكُمْ مَلَئِكَةٌ فِي الْأَرْضِ يَخْلُقُونَ ، وَإِنَّهُ لَعِلْمُ لِلسَّاعَةِ فَلَا تَمْتَرُنَّ بِهَا وَاتَّبِعُونِ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمٍ.
"সে তো ছিল আমারই এক বান্দা, যাহাকে আমি অনুগ্রহ করিয়াছিলাম এবং করিয়াছিলাম বানু ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করিলে তোমাদিগের মধ্য হইতে ফেরেস্তা সৃষ্টি করিতে পারিতাম, যাহারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হইত। ঈসা তো কিয়ামতের নিদর্শন। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করিও না এবং আমাকে অনুসরণ কর। ইহাই সরল পথ" (৪৩: ৫৯-৬১; আরও দ্র. ১৯: ৩০-৩৩; ৪ঃ ১৭২)।
(৩) এমনিভাবে যাহারা হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্র পুত্র বলে আল-কুরআনে তাহাদের বক্তব্য খণ্ডন করা হইয়াছে। যেমন আল্লাহ্র বাণী:
وَقَالَتِ الْيَهُودُ عُزَيْرُ ابْنُ اللَّهِ وَقَالَتِ النَّصْرَى الْمَسِيحُ ابْنُ اللهِ ذَلِكَ قَوْلُهُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ يُضَاهِؤُونَ قَوْلَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ قَبْلُ قَاتَلَهُمُ اللَّهُ أَنِّي يُؤْفَكُونَ .
"ইয়াহূদী বলে, উযায়র আল্লাহ্র পুত্র এবং খৃস্টানরা বলে, মসীহ আল্লাহ্ পুত্র।। উহা তাহাদিগের মুখের কথা। পূর্বে যাহারা কুফুরী করিয়াছিল উহারা তাহাদিগের মত কথা বলে। আল্লাহ্ উহাদিগকে ধ্বংস করুন। উহারা কেমন করিয়া সত্যবিমুখ হয়" (৯:৩০)।
(৪) কুরআন করীমে স্পটভাবে বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ্ পাকের কোন সন্তান নাই। তাই ঈসা (আ)-ও আল্লাহ্ পাকের সন্তান নহেন। বলা হইয়াছে:
وَقَالُوا اتَّخَذَ اللَّهُ وَلَدًا سُبْحْنَهُ بَل لَهُ مَا فِي السَّمواتِ وَالْأَرْضِ كُلٌّ لَهُ قَانِتُونَ .
"তাহারা বলে, আল্লাহ্ সন্তান গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি অতি পবিত্র; বরং আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে সব আল্লাহ্রই। সব কিছু তাঁহারই একান্ত অনুগত" (২: ১১৬; আরও দ্র. ৬: ১০১; ১১২ঃ ১-৪)।
আবার কোথায়ও বলা হইয়াছে, হযরত ঈসা (আ) মানব স্বভাবের অধিকারী রাসূলগণের অন্তর্গত, যাঁহারা যুগে যুগে মানুষের হিদায়াতের জন্য কাজ করিয়া গিয়াছেন। যেমন আল্লাহ্ বাণী:
مَا الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ إِلا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ كَانَا يَأْكُلْنِ الطَّعَامَ أَنْظُرْ كَيْفَ نُبَيِّنُ لَهُمُ الْآيَاتِ ثُمَّ انْظُرْ أَنِّي يُؤْفَكُونَ .
"মারয়াম-তনয় মসীহ তো কেবল একজন রাসূল, তাহার পূর্বে বহু রাসূল গত হইয়াছে এবং তাহার মাতা সত্যনিষ্ঠ ছিল। তাহারা উভয়ে খাদ্যাহার করিত। দেখ, উহাদের জন্য আয়াত কিরূপ বিশদভাবে বর্ণনা করি; আরও দেখ, উহারা কিভাবে সত্যবিমুখ হয়" (সূরা মায়িদা-৭৫)।
এইভাবে আল-কুরআনের বর্ণনা দ্বারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, হযরত ঈসা (আ) ছিলেন একজন মানুষ, আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। তিনি কোন ইলাহ ছিলেন না বা আল্লাহর পুত্রও ছিলেন না কিংবা আল্লাহর অংশও ছিলেন না। আর খৃষ্টানদের ত্রিত্ববাদের আকীদাটি স্পষ্ট কুফুরী ও শিরক যাহার সহিত আল্লাহর নবী ঈসা (আ) এর কোন সম্পর্ক নাই [যিশাইয় (৪৩-১১) (যাত্রা পুস্তক, ৪৬: ১১)। হে সদা প্রভু ঈশ্বর তুমি মহান, কারণ তোমার তুল্য কেহই নাই ও তুমি ব্যতীত কোন ঈশ্বর নাই (২য় শমুয়েল (৭:২২), ১ম রাজাবলী (৮:২৩), (যিশাইয় (৪০:২৮), তিরমিয় (১০:৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 একত্ববাদ সম্পর্কে খোদ বাইবেলে প্রাপ্ত তথ্য

📄 একত্ববাদ সম্পর্কে খোদ বাইবেলে প্রাপ্ত তথ্য


উল্লেখ্য, খৃস্টানগণ ত্রিত্ববাদের দাবিদার হইলেও তাহাদের কাছে স্বীকৃত বর্তমান বাইবেলেই এমন কিছু উক্তি লক্ষণীয় যেইগুলি তাওহীদের প্রমাণ বহন করে। উহার কতিপয় উক্তি উল্লেখ করা হইল। যেমন: “সদাপ্রভুই ঈশ্বর, তিনি ব্যতীত আর কেহ নাই। ইহা যেন তুমি জ্ঞাত হও (দ্বিতীয় বিবরণ, ৪ : ৫; আর দ্র. ৬:৪)। "কারণ তুমি মহান এবং আশ্চর্য কার্যকারী, তুমিই একমাত্র ঈশ্বর" (গীতসংহিতা, ৮৬: ১০; আরও দ্র. ১ম রাজাবলী, ৮ঃ ৬০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বাইবেল নূতন নিয়ম যেমন :

📄 বাইবেল নূতন নিয়ম যেমন :


(১) যোহন সুসমাচারে উক্ত হইয়াছে (২০: ১৭), "যিনি আমাদের পিতা ও তোমাদের পিতা এবং আমার ঈশ্বর ও তোমাদের ঈশ্বর, তাঁহার নিকটে আমি ঊর্ধ্বে যাই"। ইহাতে 'স্পষ্ট বুঝা যায় যে, যীশু খৃস্টসহ সকলের প্রভু একমাত্র আল্লাহ। যীশু প্রভু নহেন।
(২) মার্ক (১২: ২৯) বাক্যে আছে, "হে ইস্রায়েল শোন, আমাদের ঈশ্বর প্রভু একই প্রভু”। (আরও দ্র. মার্ক, ১২ঃ ৩২)।
(৩) মথি (২৩: ৮-৯) "আর পৃথিবীতে কাহাকেও পিতা বলিয়া সম্বোধন করিও না, কারণ তোমাদের পিতা একজন, তিনি সেই স্বর্গীয় (আসমানী)"।
(৪) লুক (৪: ৮) বাক্যে আছে, "তোমার ঈশ্বর প্রভুকেই প্রণাম করিবে। কেবল তাঁহারই আরাধনা করিবে”। ইহাতে বুঝা যায় যে, ইবাদত ও বন্দেগী পাওয়ার যোগ্য একমাত্র আল্লাহই, যীশু নহেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00