📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ঈসা (আ)-এর স্বভাব-চরিত্র ও গুণাবলী

📄 হযরত ঈসা (আ)-এর স্বভাব-চরিত্র ও গুণাবলী


বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আ) যাযাবর জীবন যাপন করিতেন। ইসরাঈলী সমাজে দাওয়াতী কাজ করিতে গিয়া যেখানেই রাত্র হইত সেখানেই তিনি রাত্রি যাপন করিতেন। তবে অধিকাংশ সময় নিরাপত্তার জন্য রাত্রিতে পাহাড়, জঙ্গল ও বাগবাগিচায় অবস্থান করাকেই প্রাধান্য দিতেন। তাঁহার নির্দিষ্ট কোন ঘরবাড়ি ছিল না। তিনি নগ্নপদে চলাফেরা করিতেন। তিনি নিজের জন্য কোন সম্পদ সঞ্চয় করিতেন না। পানাহারে দৈনিক ব্যবস্থাকেই যথেষ্ট মনে করিতেন। মানবতার দুঃখ-দুর্দশায় তাঁহার অন্তর ছিল সদা বিগলিত। তিনি যেখানেই যাইতেন মনে হইত যেন স্বস্তি ও শান্তির সুবাতাস বহিতেছে। আল-কুরআনে হযরত ঈসা (আ)-এর স্বভাব-চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের কয়েকটি দিক তুলিয়া ধরা হইয়াছে:
إِذْ قَالَتِ الْمَلَئِكَةُ يُريمُ إِنَّ اللهَ يُبَشِّرُكَ بِكَلِمَةٍ مِنْهُ اسْمُهُ المَسِيحُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ وَجِيْهَا فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَمِنَ الْمُقَرَّبِينَ وَيُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلاً وَمِنَ الصَّلِحِينَ.
"স্মরণ কর যখন ফেরেশতাগণ বলিল, হে মারয়াম! আল্লাহ্ তোমাকে তাঁহার পক্ষ হইতে একটি কলেমার সুসংবাদ দিতেছেন। তাহার নাম মসীহ, মারয়াম তনয় ঈসা। সে ইহলোক ও পরলোকে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম হইবে। সে দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সহিত কথা বলিবে এবং সে হইবে পুণ্যবানদের একজন" (৩:৪৫)।
উপরিউক্ত আয়াত পর্যালোচনায় দেখা যায়, হযরত ঈসা (আ)-এর নিম্নবর্ণিত গুণ ও বৈশিষ্ট্য ছিল: (১) পিতাবিহীন জন্মলাভকারী মানুষ, যেই জন্য আল-কুরআনের একাধিক স্থানে ইবন মারয়াম বলা হইয়াছে। জগতে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যাহাকে মায়ের নামের সাথে যুক্ত করিয়া এইভাবে ডাকা হয়।
(২) মাতৃক্রোড়ে কথোপকথনকারী শিশু, এমনকি বর্ণিত আছে যে, মায়ের গর্ভে থাকাকালীন মায়ের সঙ্গে কথা বলিয়াছেন (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ২খ., page ৬০)।
(৩) যুক্তিতর্কে পারদর্শী: শৈশব অবস্থা হইতেই তিনি বড় বড় পণ্ডিতদের সাথে যুক্তিতর্কে বিজয় লাভ করিতেন। তখন হইতেই তাঁহার জ্ঞানদীপ্ত প্রতিভার যশ ও খ্যাতি বুদ্ধিজীবী মহলে ছড়াইয়া গিয়াছিল।
(৪) তিনি কালিমাতুল্লাহ, কেননা কোন পুরুষের সংগ ও স্পর্শ ব্যতীত বিনা বাপে একমাত্র আল্লাহ্র নির্দেশে তিনি মাতৃগর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তাই তিনি কালিমাতুল্লাহ উপাধিতে ভূষিত হন।
(৫) তিনি ছিলেন মসীহ তথা ত্রাণকর্তা: কারণ ইয়াহুদী ধর্ম ব্যবসায়ী ও রোমান শাসকদের তল্পীবাহকদের নিষ্পেষণ হইতে ইসরাঈলী জাতিকে মুক্তির বাণী শুনাইয়াছিলেন। সেই সমাজের সাধারণ জনগোষ্ঠীকে ধ্বংসোন্মুখ অবস্থা হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন।
(৬) দুনিয়া ও আখেরাতে মহাসম্মানিত ব্যক্তিত্ব, আল-কুরআনের ভাষায় ওয়াজীহ (وجيه)।
(৭) সালিহ্ তথা নেককার: তিনি সদা সৎ ও নেক কাজ করিতেন। যাহা কল্যাণকর তাহাই তাঁহার দ্বারা সম্পাদিত হইত। মানবতার কল্যাণে তিনি ছিলেন নিবেদিত।
(৮) মুকাররিব তথা সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম ছিলেন (তাফসীরে মাযহারী, প্রাগুক্ত, page ১৯১)। সূরা মারয়ামের অন্য এক আয়াতে হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে আরও কয়েকটি কথা উল্লেখ করা হয়। ইরশাদ হইয়াছে:
قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ اتْنِي الْكِتٰبَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا وَجَعَلَنِي مُبْرَكًا أَيْنَ مَا كُنْتُ وَأَوْضُنِي بِالصَّلوَاةِ وَالزَّكوة مَا دُمْتُ حَيًّا ، وَبَرَأَ بِوَالِدَتِي وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا شَقِيًّا. وَالسَّلِّمُ عَلَى يَوْمَ وُلِدْتُ وَيَوْمَ أَمُوتُ وَيَوْمَ أَبْعَثُ حيا .
"তিনি বলিলেন, "আমি তো আল্লাহর বান্দা, তিনি আমাকে কিতাব দিয়াছেন এবং আমাকে নবী করিয়াছেন। যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করিয়াছেন। তিনি আমাকে নির্দেশনা দিয়াছেন যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করিতে। আর আমাকে আমার মাতার প্রতি অনুগত করিয়াছেন এবং তিনি আমাকে করেন নাই উদ্ধত ও হতভাগ্য। আমার প্রতি শান্তি যেদিন আমি জন্মলাভ করিয়াছি, যেদিন আমার মৃত্যু হইবে এবং যেদিন জীবিত অবস্থায় আমি পুনরুত্থিত হইব” (১৯:৩০-৩৩)।
উপরিউক্ত আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, (১) তিনি আবদুল্লাহ তথা আল্লাহ্র বান্দা। আল্লাহ্র ইবাদতেই তিনি তৃপ্তি লাভ করিতেন। তিনি কোন ইলাহ বা প্রভু নহেন। এই পরিচয় দিতেই তিনি গর্ববোধ করিতেন। আল-কুরআনে এই ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়:
لَنْ يَسْتَنْكِفَ الْمَسِيحُ أَنْ يَكُونَ عَبْدًا لِلَّهِ وَلَا المَلْئِكَةُ المُقَرِّبُونَ. وَمَنْ يَسْتَنْكِفْ عَنْ عِبَادَتِهِ وَيَسْتَكْبِرْ فَسَيَحْشُرُهُمْ إِلَيْهِ جَمِيعًا .
"মসীহ আল্লাহ্র বান্দা হওয়াকে হেয় জ্ঞান করে না এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতাগণও নহে এবং কেহ তাঁহার বান্দা হওয়াকে হেয় জ্ঞান করিলে এবং অহংকার করিলে তিনি তাহাদের সকলকে তাঁহার নিকট একত্র করিবেন" (৪: ১৭২)।
(২) তিনি ছিলেন আল্লাহর নবী, যাহাকে আল্লাহ্ পাক একক আসমানী কিতাব দিয়াছেন তাহা হইল ইনজীল শরীফ।
(৩) তিনি ছিলেন বরকতময়। যেখানেই তিনি যাইতেন আর্তমানবতার সেবা করিতেন। সেখানে আল্লাহ পাক বরকত নাযিল করিতেন। মানুষ সুখ সমৃদ্ধি লাভ করিত।
(৪) তিনি ছিলেন মায়ের প্রতি সদাচারী। তিনি মায়ের আদেশ-নিষেধ ও আশা-আকাংক্ষার প্রতি ছিলেন শ্রদ্ধাশীল ও সদানুগত। মায়ের শোক-দুঃখ ও ইজ্জত-সম্মান রক্ষায় তিনি ছিলেন সদা সচেষ্ট। এই হইল আল-কুরআনে হযরত ঈসা (আ)-এর মায়ের প্রতি আচার-আচরণের বিবরণ। পক্ষান্তরে খৃস্টানদের লিখিত সুসমাচারে দেখা যায়, তিনি মায়ের প্রতি কোন এক সময় যথাযথ শ্রদ্ধা দেখান নাই (দ্র. লুক, ৮: ১৯-২১)।
(৪) তিনি ছিলেন বিনয়ী (আলুসী, ১৬খ, page ৯০) ও সৌভাগ্যবান। তিনি উদ্ধত স্বভাবের লোক ছিলেন না এবং দম্ভভরে চলিতেন না। আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য ও সম্মান দান করিয়াছেন। তাই সকল দিক দিয়া তিনি একজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি।
(৫) তিনি ছিলেন শান্তির বার্তাবাহক: তাঁহার জন্ম মৃত্যু জীবন সকল অবস্থায় শান্তির প্রতীক হিসাবে গণ্য হইয়াছে। আল-কুরআনের অন্য কয়েকটি আয়াতে তাঁহাকে আরও অনেকগুলি গুণে গুণান্বিত ও বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত বলিয়া উল্লেখ করা হয়। যেমন:
১) তিনি ছিলেন রূহুল কুদ্দুস (روح القدس) তথা পবিত্র আত্মার দ্বারা সাহায্যপ্রাপ্ত। পবিত্র আত্মা বলিতে জিবরাঈল আমীনকে বুঝানো হইয়াছে (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২খ, page ৭৪-৭৫, ৭৭)। আল্লাহর বাণী:
তِلْكَ الرُّسُلُ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ مِنْهُمْ مَنْ كَلَّمَ اللهُ وَرَفَعَ بَعْضَهُمْ دَرَجَتٍ وَآتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَتِ وَأَيَّدْنُهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ.
"এই রাসূলগণ! তাহাদের মধ্যে কাহাকেও কাহারও উপর শেষ্ঠত্ব দিয়াছি। তাহাদের মধ্যে এমন কেহ রহিয়াছে যাহার সহিত আল্লাহ্ কথা বলিয়াছেন। আবার কাহাকেও উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করিয়াছেন। মারয়াম তনয় ঈসাকে স্পষ্ট প্রমাণ প্রদান করিয়াছি ও পবিত্র আত্মা তাহাকে শক্তিশালী করিয়াছি” (২: ২৫৩)।
(২) তিনি ছিলেন ফায়সাল তথা মানুষের মাঝে বিভিন্ন মতানৈক্য ও বিবাদ মীমাংসাকারী। যেমন, আল-কুরআনে আসিয়াছে :
قَدْ جِئْتُكَ بِالْحِكْمَةِ وَلِأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ .
"আমি তো তোমাদের নিকট আসিয়াছি প্রজ্ঞাসহ এবং তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করিতেছ তাহা স্পষ্ট করিয়া দিবার জন্য" (৪৩ঃ ৬৩)।
(৩) তিনি ছিলেন মানব দরদী ও নরম হৃদয়ের অধিকারী (ইবন কাছীর, প্রাগুক্ত, ২খ, page ৭৩)। আল-কুরআনে তাঁহার অনুসারীদের সম্পর্কে বলা হয়ঃ
وَجَعَلْنَا فِي قُلُوبِ الَّذِينَ اتَّبَعُوهُ رَأْفَةً وَرَحْمَةً .
"আর আমি তাহার অনুসারীদের অন্তরে দিয়াছিলাম করুনা ও দয়া” (৫৭ঃ ২৭)।
অতএব এই আয়াত দ্বারা বুঝা যাইতেছে তিনি যেইরূপ হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন, তাঁহার অনুসারিগণকেও সেইভাবেই তৈরি করিয়াছিলেন।
(৪) সর্বোপরি তিনি ছিলেন উলুল আযম (দৃঢ় প্রতিজ্ঞ) রাসূলগণের অন্তর্ভুক্ত। এই মর্মে ইরশাদ হইয়াছে :
وَإِذْ أَخَذْنَا مِنَ النَّبِيِّينَ مِيثَاقَهُمْ وَمِنْكَ وَمِنْ نُوحٍ وَأَبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ .
"স্মরণ কর যখন আমি নবীদিগের নিকট হইতে অংগীকার গ্রহণ করিয়াছিলাম এবং তোমার নিকট হইতেও এবং নূহ, ইবরাহীম, মূসা, মারয়াম তনয় ‘ঈসার নিকট হইতেও। তাহাদের নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছিলাম দৃঢ় অংগীকার" (সূরা আহযাবঃ ৭)।
হযরত ঈসা (আ) বৈষয়িক কোন স্বার্থ বা ভোগ-বিলাসে মত্ত ছিলেন না, বরং এই সবের প্রতি তাঁহার কোন আগ্রহ ছিলনা। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধা জীবন যাপন করিতেন। আল্লাহর একজন মহান রাসূল হিসাবে দাওয়াতী কাজেই তাঁহার সকল চিন্তা-চেতনা ও কাজকর্ম নিষ্ঠার সাথে নিয়োগ করিয়াছিলেন। আল্লাহর রাসূল হিসাবে যাহাদের প্রতি তিনি প্রেরিত হইয়াছিলেন সেই ইসরাঈল জাতির মধ্যে থাকিয়াই গ্রামে গঞ্জে ভ্রমণ করিয়া তাঁহার রিসালাতের দায়িত্ব পালন করিয়া গিয়াছেন। তিনি সমাজমুখী দাঈগণের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে বর্তমান খৃষ্টবাদ

📄 হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে বর্তমান খৃষ্টবাদ


উল্লেখ্য, হযরত ঈসা (আ) ছিলেন যুগে যুগে আসা নবীগণের অন্যতম। তাঁহার দাওয়াতের মূল কথা ছিল, জীবনবিধান হিসাবে আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধিবিধান মানিয়া লওয়া। তাঁহার একনিষ্ঠ ও সার্বক্ষণিক সহচর হাওয়ারীগণ আল-কুরআনের বর্ণনামতে নিজেদেরকে মুসলিম বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছিলেন। ইরশাদ হইয়াছে : قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللَّهُ (৩:৫২)। তবে তাহারা পরবর্তী সময়ে নিজদিগকে নাসারা বলিয়া পরিচয় দিত। আল-কুরআনে ইরশাদ হইয়াছে : وَمِنَ الَّذِينَ قَالُوا اِنَّا نصاری (৫:১৪)। বাইবেলে উক্ত হইয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসারীদিগকে নাসরাতী বলা হইত। নাসরাত সেই গ্রামের নাম যেখানে হযরত ঈসা (আ) তাঁহার শৈশবের কিছুদিন অতিবাহিত করিয়াছিলেন (দ্র. মথি, ২: ২৩, ৪: ১৩)। সম্ভবত এই সম্পর্কের কারণেই ঈসাকেও মাসীহ নাসিরী (Jesus of Nazareth) এবং তাঁহার অনুসারিগণকে নাসারা (Nazarasenes) নামে অভিহিত করা হয় (দ্র. মূল ধাতু, Encyclopaedia of Religion and Ethics, Christian শীর্ষক প্রবন্ধ)।
আল-কুরআনে খৃস্টান সম্প্রদায় বুঝাইতে নাসারা (نصاری) শব্দ ব্যবহার করা হইয়াছে। আর তাহাদের মতবাদকে আরবীতে বলা হয় نصرانی নাসানিয়‍্যাহ (نصرانية)। কিন্তু আল-কুরআনে কখনও হযরত ঈসার অনুসারিগণকে মাসীহী (مسيحی) কিংবা তাহাদের মতবাদকে মাসীহিয়্যাত (مسيحية) তথা খৃষ্টবাদ বলিয়া অভিহিত করা হয় নাই। হযরত ঈসা (আ) কোন মতবাদকে খৃষ্টবাদ বলিয়া প্রচার করিয়াছেন- এই ধরনের কোন প্রমাণ নাই। ইহা হইতেই বুঝা যায় উক্ত শব্দটি তাহাদের দ্বারা পরবর্তীতে উদ্ভাবিত হইয়াছে। যাহা হউক, এই খৃষ্টবাদের অনুসারীরা হযরত ঈসা (আ)-এর অনুসারী বলিয়া দাবি করে। হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে তাহারা বিভিন্ন রকম আকীদা পোষণ করিয়া থাকে, তাঁহাকে কেন্দ্র করিয়া বিভিন্ন ধরনের আচার অনুষ্ঠান প্রতিপালন করে ও বিধিবদ্ধ আইন রচনা করে। আর এইসব আকীদা-বিশ্বাস, উৎসব, বিধিবিধান একদিনে গড়িয়া উঠে নাই। বরং দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সেইগুলি জন্ম ও বিকাশ লাভ করে। নিম্নে সংক্ষেপে কিছু বিবরণ পেশ করা হইল:

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খৃষ্টবাদ ও খৃষ্ট সমাজের ইতিহাস

📄 খৃষ্টবাদ ও খৃষ্ট সমাজের ইতিহাস


খৃষ্টবাদ ও খৃস্টসমাজের ইতিহাস হযরত ঈসা (আ)-এর যুগ হইতে আধুনিক যুগ পর্যন্ত খৃস্টবাদের ইতিহাসকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়। (ক) হাওয়ারীগণের যুগ; (খ) বিশ্বব্যাপী খৃস্টধর্ম প্রচারের যুগ; (গ) কাউন্সিল যুগ; (ঘ) অন্ধকার যুগ; (ঙ) মধ্যযুগ; (চ) সংস্কার যুগ বা আধুনিক যুগ।
(ক) হাওয়ারীগণের যুগ: হযরত ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্ব গমনের পরে হাওয়ারীদের যুগ শুরু হয়। এই সময়ের ঘটনাবলীর ইতিহাস অনেকটা অজ্ঞাত। এক বর্ণনায় দেখা যায় যে, হযরত ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বারোহণের সময় তাঁহার অনুসারীদের সংখ্যা ছিল ১২০ জন (প্রেরিতদের কার্যবিবরণী, ১: ১৪)। তন্মধ্যে এগারজন শাগরিদ এমন ছিলেন যাহারা হযরত ঈসা (আ)-এর সহিত অপেক্ষাকৃত বেশি সময় অতিবাহিত করিয়াছিলেন। এই এগারজন শাগরিদ ও তাহাদের কর্ম প্রচেষ্টার উপরই খৃষ্ট ধর্মের ভবিষ্যৎ নির্ভশীল ছিল।
ঈসা (আ)-এর ধর্ম প্রচারে ভীত হইয়া তাহার বিরোধীরা যে অত্যাচার ও নির্যাতনের সূচনা করিয়াছিল তাহা ঈসা (আ)-কে উঠাইয়া লইবার পরও অব্যাহত থাকে। ঈসা (আ)-এর পর তাঁহার শাগরিদগণকে ক্রুশবিদ্ধ হইতে হইয়াছিল (দ্র. প্রেরিতদের কার্যবিবরণী, ইবন হাযম, প্রাগুক্ত, page ২৫৩)। হযরত ঈসা (আ)-এর পরও তাঁহার অনুসারীদের প্রতি অত্যাচার ও নিপীড়নের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তাহাদের ধর্ম প্রচারের পক্ষে অনুকূল জনমত সৃষ্টি হয়। ফলে তাহাদের ধর্মের উত্তরোত্তর প্রসার হইতে থাকে। তখন শাউল (Saul) নামক এক ইয়াহুদী পণ্ডিত তাহাদের ধর্ম গ্রহণ করে। এই ব্যক্তি প্রথম খৃস্টধর্মের ঘোর বিরোধী ছিল এবং ঈসা (আ)-এর অনুসারীদের উপর নির্যাতনও চালাইয়াছিল (প্রেরিত, ১৩:২)।
বার্ণাবাসের সুপারিশক্রমে অন্য এগারজন হাওয়ারীও তাহাকে তাহাদের সহযোগী বলিয়া গ্রহণ করিয়া নিলেন। তাহার পূর্বনাম পরিবর্তন করিয়া "পৌলস” নামকরণ করিলেন। তাহার পর হইতে পৌলস এবং হাওয়ারীগণ মিলিয়া খৃস্ট ধর্মের প্রচার প্রসার-এর কাজ চালাইয়া যাইতে লাগিলেন। তাহাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে খৃস্ট ধর্ম এতটুকু সফলতা লাভ করিল যে, ইয়াহুদী সম্প্রদায় ছাড়া বাকী প্রায় সকলেই খৃস্টধর্মে দীক্ষিত হইল। এই মহান দাওয়াতের অন্তরালে পৌল অত্যন্ত সুকৌশলে খৃস্ট সমাজে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি সুপ্রতিষ্ঠিত করিলেন। এমনকি তিনি ক্রমান্বয়ে খৃস্ট সমাজে “যীশুর মহান আত্মত্যাগ" এবং "খোদার পুত্র যীশুর মানবরূপে আগমন" ইত্যাদি ভ্রান্ত ধারণা কৌশলে প্রচার করা শুরু করিলেন।
যাহাই হউক, হযরত ঈসা (আ)-এর ধর্ম গ্রহণের পর পৌল বা 'পল' আরব (দামিশকের দক্ষিণাঞ্চলে) পরিভ্রমণে বাহির হন। এইখানে তিনি তিন বৎসর যাবত নিজের নূতন বিশ্বাসের উপর চিন্তাভাবনা করিতে থাকেন (Mackinon Yames, From Christ to Constantine, লন্ডন ১৯৩৬ খৃ., page ৯১) অথবা নিজ পদমর্যাদার সুযোগ গ্রহণ করিয়া নূতন অভিজ্ঞতার আলোকে ধর্মের নূতন ব্যাখ্যা দানের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনার মধ্যে সময় অতিবাহিত করেন (দ্র. Ency. Britannica, ১৭খ, ৩৮৯, Paul শীর্ষক প্রবন্ধ)। ইহা খৃস্ট ধর্মের ভবিষ্যতের জন্য নূতন কর্মপন্থা গ্রহণের প্রস্তুতি পর্ব ছিল। এইজন্যই প্রায় সকল প্রাচীন ও আধুনিক বিশেষজ্ঞ এই ব্যাপারে একমত যে, "পল” ঈসা (আ)-এর খৃস্টধর্মের স্থলে স্বীয় "মাসীহিয়াত" সৃষ্টি করিয়া ঈসা (আ)-এর ধর্মে ইহার অনুপ্রবেশ ঘটান। এইভাবে ঈসা (আ)-এর পরিবর্তে পল-ই হইলেন খৃস্টধর্মের প্রবর্তক (বিস্তারিত বিবরণের জন্যে দ্র. ইবন তায়মিয়া, আল-জাওয়াবুস সাহীহ লিমান রাদদালা দীনা'ল-মাসীহ (الجواب الصحيح لمن بدل دين المسيح) কায়রো ১৩২২-২৩ হি.; Ency. Britannica, Christianity Paul: (খ. ৪) ও Paul (খ. ১৭) প্রবন্ধ দুইটি; Loewnich, his life and works, অনু. G. H. Herir, The wazarene Gospel Restored, Cassal ১৯৫ ম, ১৯: ২১; তাকী উসমানী, ঈসা'ইয়াত কা বানী কেনি হায়? 'বাইবেল সে কুরআন তক' গ্রন্থের ভূমিকায়, page ১৩০-১৭৭)।
ঈসা (আ)-এর শাগরিদগণ প্রথমে সরল বিশ্বাসে পৌল-এর প্রতি সমর্থন দীন করেন। কিন্তু পরে যখন তাহার আসল রূপ বুঝিতে পারেন, তখন তাহারা তাহার বিরুদ্ধাচরণ করিতে থাকেন (বাইবেল সে কুরআন তক, page ১৪০-১৭৪)।
তাহার প্রভাব খাটাইয়া "জেরুসালেম কাউন্সিলের মাধ্যমে ঈসা (আ)-এর অনুশাসনের বিপরীতে। অন্য সম্প্রদায়ের ঈসাঈগণকে ইয়াহুদী শরীআত ও খতনা অনুশাসনের পাবন্দী হইতে মুক্ত করিয়া দেন। জেরুসালেমের কাউন্সিলের এই সিদ্ধান্ত পরবর্তী কাউন্সিলসমূহের জন্য নজীর হইয়া রহিল। আর এইভাবে পৌলের মতবাদ কাউন্সিলসমূহের মাধ্যমে ঈসা (আ)-এর ধর্মের উপর প্রভাব বিস্তার করিতে থাকে। এই শতাব্দীতে মোটের উপর খৃষ্ট ধর্মের যথেষ্ট উন্নতি ও সাফল্য অর্জিত হয়। এই সময়ই ইনজীল চতুষ্টয় এবং অন্য কয়েকটি ইনজীলও (দ্র. ইনজীল) লিখিত হয়।
(খ) বিশ্বব্যাপী খৃস্ট ধর্ম প্রচারের যুগ: ঈসা (স)-এর হাওয়ারীগণ-যেখানে খৃষ্টধর্মকে শুধু বান্ ইসরাঈলের মধ্যে প্রচার করিতেছিলেন সেখানে পল এই ধর্ম গ্রহণ করিয়া তাহা বানু ইসরাঈলের বাহিরেও প্রচারের চেষ্টা চালায়। তাহার অনুসারীদের মাধ্যমে তখন এই ধর্ম রোমান সাম্রাজ্যে ছড়াইয়া যায় এবং আফ্রিকা, আরব ও গ্রীকবাসিগণ এই ধর্মে প্রবেশ করিতে থাকে।
কাউন্সিল যুগ (১০১-৫৯০): খৃস্টধর্ম বিস্তারের এই যুগটিও অত্যন্ত গুরুত্বের অধিকারী। এই যুগে খৃষ্টধর্ম রোম সাম্রাজ্যে, বিশেষত ফিলিস্তীন ও এশিয়া মাইনরে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে পৌল মতবাদের খোলামেলা নীতির ফলে এই যুগে প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক চিন্তাধারা এবং আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচ্য-আধ্যাত্মিক প্রভাব খৃস্টধর্মে অনুপ্রবেশ করে এবং এইভাবে সহজ সরল খৃস্টধর্মকে দার্শনিক তত্ত্বের পোশাক পরিধান করাইয়া ত্রিত্ববাদের ঘূর্ণায়মান আবর্তে চিরদিনের জন্যে নিক্ষেপ করে (Ency. Religion and Ethics, Christianity শীর্ষক প্রবন্ধ, ৩খ, ৮৮৯)।
অতঃপর কনস্টানন্টাইন (৩০৬-৩৩৭) কর্তৃক খৃস্টধর্মকে রাষ্ট্রীয় ধর্মরূপে স্বীকৃতি প্রদান সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পূর্বে খৃস্টানদের উপর অত্যাচার নিপীড়ন চলিত, কিন্তু ইহার পর অবস্থার সম্পূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। এই যুগে খৃষ্টধর্ম অনেক দেশে প্রসার লাভ করে (Ency. Britannica, ৪খ, page ৪৬০)। কনসটানটাইন কনসটান্টিনোপলের ভিত্তি স্থাপন করেন যাহা পরবর্তী কালে প্রাচ্য গির্জার সদর দফতর-এ পরিণত হয় এবং কনসটান্টিনোপল সূ'র, বায়তুল মুকাদ্দাস, রোম প্রভৃতি স্থানে গির্জা নির্মাণ করে এবং খৃস্টান ধর্মযাজকদের বড় বড় সম্মান ও বৃত্তি প্রদান করিয়া তাহাদিগকে ধর্মের সেবায় নিয়োজিত করে।
কন্সটান্টাইনের সময় হইতে এক নূতন প্রথার সৃষ্টি হয়। ধর্মীয় বিষয়ে ব্যাখ্যা দানের জন্য কাউন্সিল বা অনুষ্ঠানের প্রথা তখন হইতে শুরু হয়। এইজন্য এই যুগকে পর্ষদ যুগ (age of councils) বলা হইয়া থাকে। কন্সটান্টাইনের আমলে সর্বপ্রথম কাউন্সিল ৩২৫ খৃস্টাব্দে নেকিয়া (Necaea) নামক স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। এই কাউন্সিলেই প্রথমবাবের মত ত্রিত্ববাদকে ধর্মের মূল বিশ্বাসরূপে স্বীকার করিয়া লওয়া হয় এবং উহার বিরোধীকে (যথা আরিয়ূস-Arius প্রমুখকে) ধর্মচ্যুত বলিয়া আখ্যায়িত করা হয়। এই উপলক্ষেই প্রথমবারের মত খৃস্টীয় ধর্মবিশ্বাস ও চিন্তাধারা সংকলিত হয়, যাহা "আথানসীয় বিশ্বাস" (Athanasiwn Creed) নামে খ্যাত। এই বিশ্বাসসমূহ এত অস্পষ্ট ও জটিল ছিল যে, ইহা আরও অধিক মতবিরোধ ও বিবাদের সৃষ্টি করে যাহার মীমাংসার জন্য আরও বহু কাউন্সিলের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় (দ্র. Ency. Britannica, From Christ to Constantine)। এইভাবে খৃস্ট ধর্মে ঈসা (আ)-এর শিক্ষা ও ইনজীলের বাণীর প্রাধান্য বিলুপ্ত হয় এবং এতদস্থলে পৌলীয় চেতনা বা প্রভাবশালী শ্রেণীর আধিপত্য চিরদিনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কারণেই কুরআন মাজীদে তাহাদিগকে নিজেদের "ধর্মগুরুদের” (أخبار ورهبان) প্রভুত্বের প্রবক্তা হইবার জন্য বারবার অভিযুক্ত করা হইয়াছে (দ্র. ৯:৩১)।
এই যুগের অপর বৈশিষ্ট্য ছিল বৈরাগ্যবাদ। বৈরাগ্যবাদের প্রকৃতি এই ছিল যে, দুনিয়ার জীবনের যাবতীয় কাজকর্ম বাদ দিয়াই শুধু আল্লাহ্র সন্তুষ্টি সম্ভব। আত্মাকে যত বেশী কষ্ট দেওয়া হইবে, তত বেশী আল্লাহ্র নিকটবর্তী হওয়া সম্ভব হইবে। বৈরাগ্যবাদের এই প্রবণতা চতুর্থ শতাব্দীতে শুরু হইলেও বৃটেন এবং ফ্রান্সে পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দীতে ইহার বিস্তৃতি ঘটে এবং সংসার বিরাগীদের অনেকগুলি ধর্মীয় আস্তানা গড়িয়া উঠে। চতুর্থ শতাব্দীর 'পাকাম মিশরী' ইয়াকম, বাসিলিয়ূস ও জেরোমি (gerome) এই পদ্ধতির বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। কিন্তু শীঘ্রই সন্ন্যাসব্রত পার্থিব উদ্দেশ্য ও লোভ-লালসা চরিতার্থের মাধ্যমে পরিণত হয় (দ্র. ৫: ২৬)।
রাষ্ট্র ও গির্জার মধ্যকার প্রাথমিক বিরোধের সূচনাও এই সময়ই ঘটে। তবুও মোটের উপর এই সময় তদানীন্তন রাষ্ট্রক্ষমতার প্রভাব ও প্রতিপত্তি ধর্মীয় সম্প্রদায় ও তাহাদের জীবনের উপর অক্ষুণ্ণ ছিল। পরবর্তী যুগে এই বিরোধ আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
(ঘ) অন্ধকার যুগঃ ৫৯০ খৃস্টাব্দে গ্রেগরী পোপ-এর মার্যদায় অভিষিক্ত হন। গ্রেগরী (Gregory) হইতে শার্লামেন (Charlamagne) পর্যন্ত (৮০০ খৃস্টাব্দ / ১৮৪ হিজরী) এই দীর্ঘ সময়কালকে খৃস্টীয় ঐতিহাসিকগণ অন্ধকার যুগ (Dark age) নামে আখ্যায়িত করিয়া থাকেন। এক কথায় বলিতে গেলে খৃস্টধর্মের ইতিহাসে এই সময়টি ছিল সার্বিক দেউলিয়াত্বের যুগ। কারণ রাজনৈতিক সামাজিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ধর্মীয় ক্ষেত্রসহ সকল দিক ও বিভাগে অধঃপতন ঘটে এবং তাহারা পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত ছিল। এই আমলে প্রাচ্য জগত মুসলমানদের অধীনে জ্ঞান-বিজ্ঞানের পীঠস্থানে পরিণত হইয়াছিল। কিন্তু পাশ্চাত্য জগত খৃষ্ট ধর্মের প্রভাবাধীন জ্ঞান-বিজ্ঞান বর্জিত গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল।
এই যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, খৃস্টানগণ পাশ্চাত্যে উহার প্রচার ও প্রসারে এক বিস্তারিত কর্মসূচী গ্রহণ করে এবং ইউরোপের শহর, নগর ও পল্লীসমূহে খৃস্টধর্মের ব্যাপক প্রচারের সূচনা করে। এই আন্দোলনের ফলে প্রথম বারের মত জার্মানী, বৃটেন ইত্যাদি দেশগুলিতে রোমক খৃস্টানদের সাফল্য সূচিত হয় এবং সর্বপ্রথম খৃষ্টধর্ম প্রভাবশালী হয়। চতুর্থ শতাব্দীর অন্তর্দ্বন্দ্ব ও পারস্পরিক শত্রুতার ধারাবাহিকতা সত্ত্বেও চার শতাব্দীর অবিরাম প্রচেষ্টার ফলে সমগ্র ইউরোপ খৃস্টধর্ম গ্রহণ করে।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে, এই যুগে খৃস্ট ধর্মকে প্রাচ্যে এক শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দী 'ইসলাম'-এর সহিত মুকাবিলা করিতে হয়। এই সময় ইসলামের জ্যোতি দেখিতে দেখিতে প্রায় অর্ধ পৃথিবীতে ছড়াইয়া পড়ে। খৃস্টান জনসাধারণ খৃস্টান শাসক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের অত্যাচারে নিষ্পেষিত ছিল। এই কারণে এতদঞ্চলে ইসলাম অত্যন্ত বিস্ময়কর দ্রুততার সহিত বিস্তৃত হইতে থাকে এবং শীঘ্রই ইসলাম আরব উপদ্বীপ হইতে মিসর, সিরিয়া, ফিলিস্তীন, পশ্চিম আফ্রিকা, স্পেন ও যুগোশ্লাভিয়া পর্যন্ত বিস্তার লাভ করিলে ইসলামী আদর্শের প্রবল দৃঢ়তা ও প্রতিপত্তির মুকাবিলায় পূর্বাঞ্চলীয় রাষ্ট্রে খৃষ্ট ধর্মের কর্তৃত্বে ভাঙ্গনের সূচনা হয় (Enc. of Relg. and Ethics. ৩খ, ৫৮৯)।
(ঙ) মধ্যযুগ : ৮০০ খৃস্টাব্দ হইতে ১৫১৭ খৃস্টাব্দ (হিজরী ১৮৪-৯২৩) পর্যন্ত সময়কে খৃস্টধর্মের ইতিহাসে মধ্যযুগ (Mediaeval era) বলিয়া অভিহিত করা হয়। এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হইল, সম্রাট বনাম পোপের বিরোধ গৃহযুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করে। আলফ্রেড এ গাওয়ার এই যুগকে তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করিয়াছেন :
(১) শার্লামেন (Charlemagne) হইতে সপ্তম গ্রেগরী (Gregory) পর্যন্ত সময় (৮০০ খৃ/ ১৮৪ হি. থেকে ১০৭৩ খৃ./ ৪৬৬ হি.) : এই সময় পোপতন্ত্রের উন্নতি সাধিত হয় এবং তাহার বিপরীতে রাষ্ট্র দুর্বল হইয়া পড়ে।
(২) সপ্তম গ্রেগরী হইতে অষ্টম বনিফেস (Boniface)-এর সময়কাল পর্যন্ত (১০৭৩ খৃ./৪৬৬ হি. হইতে ১২৭৪ খৃ./ ৬৯৩ হি.)ঃ এই যুগে পশ্চিম ইউরোপে পোপের পূর্ণ আধিপত্য বিস্তারিত হয়।
(৩) অষ্টম বনিফেস হইতে সংস্কার যুগ পর্যন্ত সময় (১২৯৪ খৃ. ৬৩৯ হি./ হইতে ১৫১৭ খৃ./ ৯২৩ হি.)ঃ এই সময় পোপতন্ত্রের পতন হয় এবং উহার বিরুদ্ধে সংস্কার আন্দোলন শুরু হয় (Encyclopaedia of Religion and Ethics, Cristianity, vol. 3, Page 589-596)।
(ক) প্রচণ্ড মতবিরোধের (Great Schism) যুগঃ Great Schism খৃস্ট সংস্কৃতির এক ঐতিহাসিক পরিভাষা। পূর্ব এবং পশিমের গির্জা সংস্থাসমূহের মধ্যকার প্রচণ্ড মতবিরোধকে বুঝানোর জন্য শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ঐ মতবিরোধকে কেন্দ্র করিয়া গিয়া সংস্থাসমূহ সর্বকালের জন্য রোমান ক্যাথলিক চার্চ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়। এমনকি তাহা নিজেদের জন্য পৃথকভাবে (The holy orthodox Church) "সনাতন গির্জা" নামও নির্ধারণ করিয়া নেয়। কন্সটানটিনোপলে ইহার কেন্দ্র স্থাপিত হয় এবং ইহার প্রধানকে প্যাট্রিয়াক (Patriach) বলিয়া আখ্যায়িত করা হয়। অন্যদিকে রোমে (ইটালি) স্থাপিত হয় পাশ্চাত্য গির্জার সদর দত্তর এবং উহার প্রধান "পোপ" (Pope) নামে অভিহিত হন। এই বিভেদ শুধু আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ইহা হইতে ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভাবধারাতেও অনেক বিরোধের সৃষ্টি হয় (নিম্নে দ্র.) মুসলমানদের কস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর প্রাচ্য গির্জার পতন ঘটে। (Adenry : The Greek and Eastern Churches, page 241, as quoted by the Ency. of Religion and Ethics, vol. ও Page 590)।
(খ) ধর্মযুদ্ধ (Crusade ক্রুসেড) : খৃস্টধর্মের ইতিহাসের মধ্যবর্তী যুগের অন্যতম ঘটনা ছিল ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ। খৃস্টান ইতিহাসবেত্তাগণ ধর্মযুদ্ধসমূহকে গুরুত্বের সহিত স্মরণ করিয়া থাকেন। হযরত ওমর (রা)-এর সময় বায়তুল মুকাদ্দাস, সিরিয়া, মিসর প্রভৃতি অঞ্চল ইসলামের অধিকারে আসে। এই সময় খৃস্টান দুনিয়া অস্তিত্বের সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। পরবর্তীতে মুসলমানদের শক্তি ও ইসলামের বিস্তৃতিতে কিঞ্চিৎ ভাটা পড়িলে এবং মুসলমানদের ঐক্যে বিছুটা দুর্বলতা পরিলক্ষিত হইলে খৃষ্টান নৃপতিবর্গ ধর্মীয় নেতাদের উস্কানিতে পুনরায় বায়তুল মুকাদ্দাস দখলে অগ্রসর হয়। পোপ 'আরবান দ্বিতীয়' কেলমোন্টে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে স্পষ্ট ঘোষণা করিলেন যে, “এই যুদ্ধ ধর্মযুদ্ধ”। সি. পি. এইচ. কেলক তাঁহার লিখিত গির্জার ইতিহাসে বলেন, "সাধারণ খৃস্টানদের উস্কাইয়া দেওয়ার জন্য আরবান ঘোষণা দিলেন যে, এই যুদ্ধে যাহারা অংশগ্রহণ করিবে তাহারা কোন বাধা-বিপত্তি ব্যতিরেকে জান্নাতে প্রবেশ করিবে”।
এইভাবে খৃস্টানরা একে একে সাতটি ক্রুসেডে লিপ্ত হয়। শেষ পর্যন্ত মুসলিম সেনাপতি সালাহুদ্দীন আইয়ূবীর হাতে খৃস্টান সাম্রাজ্যের শোচনীয় পরাজয় ঘটে (মুহাম্মাদ আকবর খাঁন, ক্রুসেড ওর জিহাদ, একাডেমী সিনদ সাগর, লাহোর ১৯৬১ খৃ.; মুহাম্মদ তকী উসমানী, প্রাগুক্ত)।
(গ) ধর্মীয় নেতাদের অনৈতিক আচরণ: ক্রুসেডসমূহে গ্লানির পরাজয়ের পর পোপের কর্তৃত্বে ধ্বস নামে। পবিত্র পদমর্যাদাকে রাজনৈতিক ও সামাজিক সুবিধা হাসিলের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার শুরু হয়।
(ঘ) মীমাংসার ব্যর্থ প্রয়াস: পোপদের এসব ধর্মবিরোধী কার্যকলাপ সংশোধনের মানসে অনেক মনীষী আগাইয়া আসেন। তাহাদের মধ্যে উয়াই ক্লিফ (Wye klife-মৃত্যু ১৩৮৪ খৃ. ৭৮৬ হি.)-এর নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি সৎ ও খোদাভীরু পোপ মনোনয়নের দাবি জানান এবং তিনিই সর্বপ্রথম ইংরেজী ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ করেন, যাহা ১৩৮৫ খৃ. (৭৮৭ হি.) প্রকাশিত হইয়াছিল। ইতোপূর্বে অন্য ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ অমার্জনীয় অপরাধ বলিয়া গণ্য হইত। পরবর্তীতে জন হার্স (John hurse) এবং যেরন (Geromn) এইসব বিরোধ মীমাংসার জন্য আগাইয়া আসেন। কিন্তু বেদনাদায়ক হইলেও সত্যি যে, খৃস্ট সমাজ মনীষীবর্গের মূল্যায়ন করিতে প্রস্তুত ছিল না। এই দ্বন্দ্ব নিরসনের উদ্দেশ্যে ১৪০৯ সালে (৮১২ হিজরী) কাউন্সিল অব পীসা (Council of Pisa)-এর আয়োজন করা হয়। কিন্তু কুসংস্কার পূর্বাবস্থায় বহাল থাকিয়া গেল।
(চ) সংস্কার যুগ বা আধুনিক যুগ (১৫১৮ খৃস্টাব্দ হইতে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত): জার্মানীতে মার্টিন লুথার (Martin Luther ১৪৮৩ খৃ. /৮৮৮ হি. হইতে ১৫৫৩ খৃ./ ৯৫০ হি.) উহার নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। লুথার পোপদের আধিপত্য, অনৈতিক অবক্ষয় ও ধর্মীয় অনাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। ক্রমে তাঁহার সংস্কার আন্দোলন সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। সংস্কারপন্থীরা প্রোটেস্ট্যান্ট (Protestants) নামে অভিহিত হয়। অন্যদিকে ফরাসী সুইজারল্যান্ডে ১৫৪৬ খৃ. এই আন্দোলন শুরু হয় এবং জন ক্যালভিনের (John Calvin; ১৫০৯ খৃ. হইতে ১৫৬০ খৃ.) জেনেভা পৌঁছানোর (১৫৩৬ খৃ.) সঙ্গে সঙ্গে উহার শক্তি বৃদ্ধি পায়। শীঘ্রই ইহাদের সমর্থনে ফ্রান্স, ইটালী ও ইউরোপের অন্যান্য স্থানে আন্দোলন দানা বাঁধিয়া উঠে। বৃটেনের রাজা অষ্টম হেনরী ও চতুর্থ এডওয়ার্ড ইহাতে প্রভাবিত হইয়া পড়েন। এইভাবে প্রটেস্ট্যান্ট সম্প্রদায় ক্যাথলিক গির্জার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী জোট গঠনে সাফল্য অর্জন করে (ইসলামী বিশ্বকোষ, নাসারা, ১৪শ খ, page ৪৬)।
যুক্তির (Rationalism) যুগ: প্রথম দিকে খৃষ্ট ধর্মের সংস্কারকগণ কেবল পোপতন্ত্রের ক্ষমতা ও তৎকর্তৃক প্রবর্তিত অবৈধ নিয়ম-কানুনকেই আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করিয়াছিলেন। কিন্তু আন্দোলনে ক্রমে ক্রমে যেই গতি সঞ্চারিত হইতে থাকে অমনি উহার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যেও পরিবর্তন সূচিত হয়। এই সময়ে ইউরোপ পূর্ণ মাত্রায় রাজনৈতিক ও জ্ঞান-বিজ্ঞান সচেতনতার স্তরে পৌঁছায়। সুতরাং মানুষের মনে খৃষ্ট ধর্মের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ সম্পর্কে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। এখন জনগণ দাবি করিতে থাকে, যাহা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের নীতিমালার আলোকে উত্তীর্ণ হইবে না তাহা আমরা মানিব না। এই আন্দোলনকে যুক্তির (Rationalism) আন্দোলন এবং আন্দোলনকারীদের যুক্তিবাদী (Rationalist) নামে অভিহিত করা হয়। যুক্তির এই আন্দোলন বৃটেন ও আমেরিকাতে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক ধর্মীয় শ্রেণী ব্যতীত ইউরোপের অধিকাংশ খৃস্টানই নামে মাত্র খৃস্টান।
পুনর্জাগরণ: যুক্তিবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ প্রয়াস ধর্মীয় শ্রেণীর তরফ হইতে আসে। তাহারা উক্ত আন্দোলনের জওয়াবে প্রাচীন ক্যাথলিক ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনরুজ্জীবন আন্দোলন (Catholic Revival Movement) শুরু করে। পুনরুজ্জীবনের এই আন্দোলন সামগ্রিকভাবে বড় রকমের কোন প্রভাব বিস্তারে সাফল্য অর্জন করিতে পারে নাই।
খৃ. ১৮শ, ১৯শ ও ২০শ শতাব্দীতে ক্যাথলিক ও প্রটেস্টট্যান্ট উভয় সম্প্রদায় ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহিত মিলিত হইয়া যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। এই কারণে Encyclopaedia Britannica-তে উক্ত শতাব্দীগুলিকে খৃস্টধর্ম প্রচারের শতাব্দীরূপে আখ্যায়িত করা হইয়াছে। বর্তমানে খৃস্টানগণ নিজেদের সম্পদ ও সমৃদ্ধির সহায়তায় উন্নয়নশীল তৃতীয় বিশ্বকে নিজেদের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে পরিণত করিয়াছে এবং সেইখানে মিশনারী স্কুল ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানসমূহের জাল বিস্তার করিয়া রাখিয়াছে। এই সকল দেশে অসংখ্য মিশনারী প্রতিষ্ঠান তাহাদের কর্মকাণ্ড চালাইয়া যাইতেছে (ইসলামী বিশ্বকোষ, নাসারা, ১৪খ., page ৪৬)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 খৃষ্টবাদের উৎস

📄 খৃষ্টবাদের উৎস


উৎপত্তিমূলে খৃষ্টবাদের উৎসকে তিন ভাগে বিভক্ত করা য়ায়: (১) বাইবেল; (২) চার্চের রায় ও (৩) ধর্মীয় সম্মেলনের সিদ্ধান্ত। (ক) বাইবেল (Bible): পুরাতন নিয়ম (খ) বাইবেল (Bible): নূতন নিয়ম
(২) চার্চের রায়: খৃস্ট সমাজের প্রাথমিক যুগ হইতে বর্তমান যুগ পর্যন্ত তাহাদের প্রতিষ্ঠিত চার্চের মতামতকে তাহাদের ধর্মীয় মতামত হিসাবেই গ্রহণ করিয়া আসিতেছে। যেমন: হযরত ঈসা (আ)-এর প্রচারকার্য বানু ইসরাঈল সমাজে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেন্ট পৌলের প্রভাবাধীন চার্চের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে খৃস্ট ধর্ম ইসরাঈলী সমাজেও প্রচার করা হয়। বর্তমান কালে খৃস্ট সমাজে পোপের মতামতকেও ধর্মীয় মতামত হিসাবে গণ্য করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00