📄 বর্তমানে ঈসা (আ)-এর অবস্থান ও অবস্থা
বর্তমানে হযরত ঈসা (আ) আসমানে অবস্থান করিতেছেন। কিন্তু কোন্ আসমানে সেই সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রহিয়াছে। বর্ণনায় আছে যে, হযরত ঈসা (আ) দ্বিতীয় আসমানে অবস্থান করিতেছেন। মি'রাজের রাত্রিতে হযরত মুহাম্মাদ (স) তাঁহার সহিত দ্বিতীয় আসমানে সাক্ষাত করেন (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৬খ, page ১২)। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, তিনি চতুর্থ আসমানে আছেন (প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৮২)। হযরত আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণিত আছে যে, তিনি দুনিয়ার আসমানে আছেন (প্রাগুক্ত)। তবে মি'রাজের হাদীছের বর্ণনাটি অধিক প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য।
উল্লেখ্য যে, তাঁহার অবস্থা সম্পর্কে আলুসী উল্লেখ করেন যে, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন যখন হযরত ঈসা (আ)-কে আসমানে উঠাইয়া নিলেন তখন তিনি তাঁহাকে পাখাযুক্ত করিয়া নূরের আবরণে আচ্ছাদিত করিলেন। এইভাবে তাঁহার পানাহারের চাহিদা প্রশমিত হইয়া যায়। অতঃপর তিনি ফেরেশতাদের সাথে উড়িতে লাগিলেন এবং তাঁহাদের সাথেই আরশের চতুষ্পার্শে চক্কর দিতে লাগিলেন। এইভাবে তিনি এমন মানুষ হইয়া গেলেন যাহার মধ্যে ফেরেশতাদের বৈশিষ্ট্যাবলী পরিলক্ষিত হয় (প্রাগুক্ত)।
📄 পৃথিবীতে হযরত ঈসা (আ)-এর পুনরাগমন ও কার্যক্রম
ইসলামী আকীদামতে যেহেতু ঈসা (আ) নিহতও হন নাই এবং স্বাভাবিক মৃত্যুবরণও করেন নাই, বরং জীবিতাবস্থায় তাঁহাকে আকাশে উঠাইয়া লওয়া হইয়াছে, তাই শেষ যমানায় পুনরায় তাঁহাকে দুনিয়াতে অবতরণ করান হইবে।
পূর্বেই আলোচনা করা হইয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ)-এর অবতরণ কিয়ামতের একটি আলামত। তিনি এই পৃথিবীতে পুনরাগমন করিবার পর দাজ্জালকে হত্যা করিবেন। তাহা ছাড়া তাঁহার পুনরাগমনের মাধ্যমে ইয়াহুদী-নাসারাদের অনেক বিভ্রান্তি দূর হইবে। আর তাহারা সকলে তাঁহার প্রতি ঈমান আনিবে। উহার পর কিয়ামত সংঘটিত হইবে। এই সব কয়টি কিয়ামতের আলামত। কেননা ঐ ঘটনাগুলি পরস্পরের সহিত সম্পর্কযুক্ত। সর্বশ্রেষ্ঠ সহীহ হাদীছ গ্রন্থ বুখারী ও মুসলিমসহ অনেক হাদীছ গ্রন্থে نزول عیسی তথা ঈসা (আ)-এর অবতরণ শিরোনামে অধ্যায় রহিয়াছে। নিম্নে সেইগুলির মধ্যে হইতে কয়েকটি হাদীছ উল্লেখ করা হইল:
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم والذي نفسي بيده ليوشكن أن ينزل فيكم ابن مريم حكما عدلا فيكسر الصليب ويقتل الخنزير ويضع الجزية ويفيض المال حتى لا يقبله أحداً و حتى تكون السجدة الواحدة خيرا له من الدنيا وما فيها ثم قال أبو هريرة إقرء واما شئتم وإن من اهل الكتاب إلا ليؤمنن به قبل موته ويوم القيامة يكون عليهم شهيدا " (بخاری کتاب احادیث الانبیاء باب نزول عيسى بن مريم مسلم باب بیان نزول عیسی ترمذی ابواب الفتن باب في نزول عیسی مسند احمد مرويات ابي هريرة
"রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন, সেই মহান সত্তার শপথ যাঁহার হাতে আমার প্রাণ! নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে ইবন মারয়াম (আ) পুনর্বার আগমন করিবেন ন্যায়বিচারক শাসকরূপে। অতঃপর তিনি ক্রুশ ভাঙ্গিয়া ফেলিবেন, শূকর হত্যা করিবেন ও জিযিয়া বিলোপ করিবেন। তখন ধন-সম্পদের এত প্রাচুর্য দেখা দিবে যে, তাহা গ্রহণ করার মত লোক পাওয়া যাইবে না। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছিবে যে, মানুষ আল্লাহ্ জন্য একটি সিজদা করিয়া নেওয়াকে দুনিয়া ও তাহার মধ্যেকার যাবতীয় বস্তুর চাইতে অধিক মূল্যবান মনে করিবে (অর্থাৎ সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে দান-খয়রাতের তুলনায় নফল ইবাদতের গুরুত্ব বাড়িয়া যাইবে)। অতঃপর আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, যদি তোমরা (কুরআন হইতে ইহার প্রমাণ) চাও তবে এই আয়াত পাঠ কর, "আহলে কিতাবের মধ্যে এমন কেউ অবশিষ্ট থাকিবে না, যে তাহার (ঈসা) মৃত্যুর পূর্বে তাঁহার প্রতি ঈমান আনিবে না। আর সে কিয়ামতের দিন তাহাদের (আহলে কিতাব) সম্পর্কে সাক্ষ্য দিবে” (৪: ১৫৯)।
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم كيف أنتم إذا نزل ابن مريم فيكم وإمامكم منكم .
"রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন: "তোমাদের অবস্থা কেমন হইবে যখন তোমাদের মাঝে ইন্ন মারয়াম নাযিল হইবেন এবং তোমাদের ইমাম তোমাদের নিজেদের মধ্য হইতেই নিযুক্ত হইবেন?" (বুখারী: কিতাবুল আম্বিয়া, বাব: নুযূলি ঈসা; মুসলিম, বায়ানু নুযূলি ঈসা; মুসনাদে আহমাদ: আবু হুরায়রা সূত্রে)।
হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বিভিন্ন সূত্রে আরও অনেক হাদীছ বুখারী, মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবন মাজা গ্রন্থে সংকলিত হইয়াছে যাহাতে একই মর্মের বক্তব্য রহিয়াছে। মুসনাদে আহমাদ্ গ্রন্থে আছে:
ان النبي صلى الله عليه وسلم قال الانبياء إخوة لعلات أمهاتهم شتى دينهم واحد وإني أولى الناس بعيسى بن مريم لأنه لم يكن نبي بيني وبينه وإنه نازل وإذا رأيتموه فأعرفوه رجل مربوع الى الحمرة والبياض عليه ثوبان ممصران كان رأسه يقطرو ان لم يصبه بلل فيدق الصليب ويقتل الخنزير ويضع الجزية ويدعو الناس إلى الاسلام ويهلك الله في زمانه المل كلها إلا الإسلام ويهلك الله في زمانه المسيح الدجال ثم تقع الأمانة على الأرض حتى ترتع الاسود مرع الإبل والنمار مع البقر والذئاب مع الغنم ويلعب الصبيان بالحيات لا تضرهم فيمكث اربعين سنة ثم يتوفى ويصلى عليه المسلمون .
"নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেন: সমস্ত নবী (দীনের মূল নীতিতে) পরস্পর বৈপিত্রেয় ভাইয়ের মত, যদিও তাঁহাদের মাতা বিভিন্ন জন। তাঁহাদের সকলের দীন মূলত একই। আমি অপরাপর নবীগণের তুলনায় ঈসা ইবন মারয়ামের অধিক নিকটবর্তী। কেননা তাঁহার ও আমার মধ্যবর্তী সময়ে কোন নবী আসেন নাই। নিঃসন্দেহে তিনি পুনর্বার পৃথিবীতে নাযিল হইবেন। তোমরা তাঁহার দেহের গঠন দেখিয়া চিনিয়া লইও। তিনি হইবেন মাঝারি ধরনের। তাঁহার দেহের বর্ণ লাল-সাদা মিশ্রিত হইবে এবং তাঁহার পরিধানে হলুদ রং-এর দুইটি কাপড় থাকিবে। তাঁহার মাথার চুল হইতে মনে হইবে এই বুঝি পানি টপকাইতেছে, অথচ তাহা মোটেই সিক্ত হইবে না। তিনি ক্রুশ ধ্বংস করিবেন, শূকর হত্যা করিবেন, জিযিয়া বিলুপ্ত করিবেন এবং লোকদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য আহবান করিবেন। তাঁহার যমানায় আল্লাহ্ তা'আলা সমস্ত ধর্ম নির্মূল করিবেন এবং কেবল ইসলামই বিজয়ীর বেশে টিকিয়া থাকিবে। তাঁহার যুগেই আল্লাহ্ তা'আলা মাসীহ দাজ্জালকে ধ্বংস করিবেন। অতঃপর দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইবে। এমনকি বাঘকে উটের সাথে, চিতা বাঘকে গরুর সাথে এবং নেকড়ে বাঘকে মেষপালের সাথে বিচরণ করিতে দেখা যাইবে। শিশুরা সাপের সাথে খেলাধুলা করিবে, কিন্তু সাপ তাহাদের কোন ক্ষতি করিবে না। তিনি দুনিয়ায় চল্লিশ বৎসর অবস্থান করিবেন। অতঃপর তাঁহার মৃত্যু হইবে এবং মুসলমানরা তাঁহার জানাযা পড়িবে”।
(৪) সহীহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিম্নোক্ত বাণীও উল্লিখিত হইয়াছে:
فإذا جاءوا الشام خرج فبينـاهم يعدون للقتال يسوون الصفوف إذ اقيمت الصلوة فينزل عيسى بن مريم فأمهم الخ "মুসলমানরা যখন সিরিয়া পৌঁছিবে তখন দাজ্জাল বাহির হইয়া আসিবে। তাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তাহারা প্রস্তুতি লইতে থাকিবে, তখন নামাযের কাতারসমূহ ঠিক করিবে এবং নামাযের ইকামত হইবে। এমন সময় ঈসা ইবন মারয়াম (আ) ঊর্ধ্ব জগত হইতে নাযিল হইবেন এবং তিনি মুসলমানদের ইমামতের দায়িত্ব পালন করিবেন।"
(৫) বিভিন্ন সূত্রে ইমাম আহমাদ ও ইমাম তিরমিযী বর্ণনা করেন, নবী করীম (স) বলিয়াছেন : يقتل ابن مريم الدجال بباب لد
ইমাম তিরমিযী এই হাদীছ উল্লেখ করার পর বলেন, هذا احديث صحيح ইহা সহীহ হাদীছ। অতঃপর তিনি সেইসব সাহাবীর নাম উল্লেখ করেন যাহাদের সূত্রে ঈসা ইবন মারয়াম (আ)-এর পুনরাগমন এবং তাঁহার হাতে দাজ্জালের নিহত হওয়া সম্পর্কিত হাদীসসমূহ বিভিন্ন হাদীছ গ্রন্থে উল্লেখ আছে। তিনি বলেন, এই অনুচ্ছেদে (বাব) হযরত ইমরান ইবন হুসায়ন, নাফি ইবন উয়ায়না, আবু বায়যা আসলামী, হুযায়ফা ইবন উসায়দ, আবু হুরায়রা, কায়সান, আবু উমামা আল-বাহিলী, আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ, আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমর ইবনিল আস, সামুরা ইবন জুনদুব, নাওয়াস ইব্ন সামআন, আমর ইব্ন আওফ, হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) হইতে হাদীছ বর্ণিত আছে (তিরমিযী, আবওয়াবুল ফিতান, বাব নুযুলি ঈসা ইবন মারয়াম)।
(৬) হযরত হুযায়ফা ইবন উসায়েদ আল-গিফারী (রা)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিম্নোক্ত হাদীছ বর্ণিত আছেঃ قال اشرف علينا رسول الله صلى الله عليه وسلم من غرفة ونحن نتزكر الساعة فقال لا تقوم الساعة حتى قمروا عشر آيات طلوع الشمس من مغربها والدخان والدابة وخروج يأجوج ومأجوج ونزول عيسى ابن مريم والدجال وثلثة خسوف حسف بالمشرق وخسف بالمغرب وخسف بجزيرة العرب ونار تخرج من قعر عدن تسوق وتحشر الناس تبيت معهم حيث باتوا وتقيل معهم حيث قالوا (مسلم) : كتاب الفتن واشراط الساعة ابود أود : كتاب الملاحم باب امارات الساعة) .
"হুযায়ফা (রা) বলেন, "আমরা এক মজলিসে বসিয়া কিয়ামত সম্পর্কে আলোচনা করিতেছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ (স) তাঁহার প্রকোষ্ঠ হইতে নিকট আসিয়া বলিলেন : তোমরা দশটি আলামত না দেখা পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হইবে না। পশ্চিম দিক হইতে সূর্যোদয়, ধোঁয়া, দাব্বাতুল আরদ, ইয়াজুজ-মাজুজের আত্মপ্রকাশ, ঈসা ইবন মারয়ামের অবতরণ, দাজ্জালের আবির্ভাব, তিনটি ভূমি ধ্বস-একটি প্রাচ্যে, একটি পাশ্চাত্যে এবং অপরটি আরব উপদ্বীপে এবং সর্বশেষে এডেনের গুহা হইতে একটি প্রকাণ্ড অগ্নিকাণ্ডের প্রকাশ যাহা লোকদিগকে হাঁকাইয়া লইয়া যাইবে। রাতের বেলা লোকেরা যখন আরাম করিবে, তখন তাহাও তাহাদের পার্শ্বে থামিয়া থাকিবে এবং দুপুরে যখন আরাম করিবে তখন তাহাও তাহাদের পার্শ্বে থামিয়া থাকিবে"।
(৭) অনুরূপভাবে ইব্ন আবী হাতিম এবং ইব্ন জারীর (র) নাজরানের খৃষ্টান প্রতিনিধি দলের সাথে সংশ্লিষ্ট সূরা নিসার আয়াতের ব্যাখ্যা করিতে গিয়া উত্তম সনদ সহকারে রুবাই ইব্ন আনাস (রা)-এর সূত্রে একটি দীর্ঘ হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। উহাতেও পরিষ্কারভাবে বলা হইয়াছে:
فقال لهم النبي صلى الله عليه وسلم الستم تعلمون أن ربنا حي لا يموت وإن عيسى يأتي عليه الفناء.
"নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, তোমরা কি জান না যে, আমাদের রব চিরঞ্জীব, তাঁহার কখনও মৃত্যু নাই, অথচ ঈসা (আ)-এর মৃত্যু অনিবার্য" (তাফসীরে ইবন জারীর, ৫ম খণ্ড)। নবী (স) এখানে ভবিষ্যত সূচক (یاتی )আসিবে) শব্দ বলিয়াছেন।
(৮) ইমাম বায়হাকী তাঁহার 'কিতাবুল আসমা ওয়াস্-সিফাত" গ্রন্থে (page ৩০১) এবং মুহাদ্দিছ আলী মুত্তাকী তাঁহার কানযুল উম্মাল গ্রন্থে (৭ম খণ্ড, page ২৬৮) হাসান এবং সহীহ সনদ সূত্রে এই সম্পর্কে যে রিওয়ায়াত বর্ণনা করিয়াছেন তাহাতে ঈসা (আ)-এর পুনরাগমনের কথা উল্লেখের সাথে সাথে من السماء (আসমান হইতে) শব্দ পরিষ্কারভাবে উল্লেখ আছে।
(৯) ইব্ন জাওযী তাঁহার কিতাবুল ওয়াফা গ্রন্থে আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমার (রা) হইতে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলিয়াছেন:
ينزل عيسى بن مريم إلى الأرض فيتزوج ويولد له ويمكث خمسا واربعين سنة ثم يموت فيدفن معنى في قبرى فاقوم أنا وعيسى بن مريم في قبر واحد بين أبي بكر وعمر .
"ঈসা ইবন মারয়াম পৃথিবীতে অবতরণ করিবেন, বিবাহ-শাদী করিবেন। তাঁহার সন্তান-সন্ততিও হইবে। তিনি এখানে ৪৫ বৎসর অবস্থান করিবেন। অতঃপর তাঁহার ইন্তিকাল হইবে। আমার সঙ্গে, আমারই কবরের পার্শ্বে তাঁহাকে দাফন করা হইবে, আবূ বকর ও উমরের মাঝখানে"।
(১০) জাবির (রা) হইতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (স) বলেনঃ
لا تزال طائفة من أمتى يقاتلون على الحق ظاهرين إلى يوم القيامة قال فينزل عيسى بن مريم فيقول أميرهم تعال صل لنا فقال لا ان بعضكم على بعض امراء تكرمة الله هذه الامة .
"আমার উম্মাতের একদল সত্য দীনের পক্ষে লড়াই করিতে থাকিবে, কিয়ামত পর্যন্ত তাহারা বিজয়ী থাকিবে ইহার পর 'ঈসা ইবন মারয়াম অবতরণ করিবেন। মুসলিম নেতা বলিবেন: আসুন, আমাদের ইমামতি করুন। তিনি বলিবেন: না, তোমরাই একে অন্যের আমীর। এ উম্মতের প্রতি আল্লাহ্ প্রদত্ত সম্মানের দিকে খেয়াল রাখিয়া তিনি এইরূপ বলিবেন" (সহীহ মুসলিম)।
মাওলানা সিওহারবী উল্লেখ করেন, বনী ইসরাঈলের পয়গাম্বর হযরত ঈসা (আ)-এর পুনরাবির্ভাব এবং এখনও তাঁহার জীবন্ত থাকা সম্পর্কে হাদীছ ও তাফসীরের গ্রন্থসমূহে বহু হাদীছ উল্লেখ আছে। সনদের বিচারে তাহা মুতাওয়াতির হাদীছের পর্যায়ের। ইমাম তিরমিযী, ইব্ন কাছীর, ইবন হাজার আসকালানী এবং হাদীছের অপরাপর ইমামদের বক্তব্য অনুয়ায়ী ষোলজন প্রসিদ্ধ সাহাবী এসব হাদীছ বর্ণনা করিয়াছেন। তাঁহাদের মধ্যে কতিপয় সাহাবীর দাবি হইতেছে, মহানবী (স) শত শত সাহাবীর সমাবেশে তাঁহার ভাষণে হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে এই বিস্তারিত তথ্য পেশ করিয়াছেন। সাহাবায়ে কিরাম খোলাফায়ে রাশেদার আমলে কোনরূপ সংশয়-সন্দেহ ছাড়াই জনসমাবেশে এইসব হাদীছ বর্ণনা করিতেন। অতএব এইসব বিশিষ্ট সাহাবীর নিকট হইতে যে হাজার হাজার ছাত্র এইসব হাদীছ শুনিয়াছেন তাহাদের মধ্যে এমন স্ব ব্যক্তিত্ব রহিয়াছেন, যাহারা হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে স্মৃতিশক্তি (حفظ وضبط), নির্ভরযোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার দৃষ্টিকোণ হইতে ইমামত ও নেতৃত্বের মর্যাদা রাখেন। যেমন সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব, ইব্ন শিহাব যুহরী, সুফয়ান ইবন উয়ায়না, আওযাঙ্গ প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
মোটকথা, সাহাবা, তাবিঈন, তাবিউ-তাবিঈন অর্থাৎ সর্বোত্তম যুগের লোকদের মধ্যে এসব রিওয়ায়াত ও সহীহ হাদিছসমূহ এতটা প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল এবং কোনরূপ প্রত্যাখ্যান ছাড়াই এতটা গৃহীত হইয়াছিল যে, হাদীছের ইমামদের কাছে ঈসা (আ)-এর জীবিত থাকা ও তাঁহার পুনরাগমন সম্পর্কিত এসব হাদীছ অর্থ ও ভাবের দিক হইতে মুতাওয়াতির পর্যায়ের। এই প্রসঙ্গে ইন্ন কাছীর মন্তব্য করিয়াছেন:
فهذه احادیث متواترة عن رسول الله صلى الله عليه وسلم من رواية ابى هريرة وابن مسعود وعثمان بن العاص وابي امامة والنواس بن سمعان وعبد الله بن عمرو بن العاص ومجمع بن حارثة وابى شريح وحذيفة بن أسيد رضى الله عنهم وفيها دلالة على صفة نزوله ومكانه الخ
"অতএব এই সকল হাদীছ যাহা রাসূলুল্লাহ্ (স)-এর নিকট হইতে মুতাওয়াতির পর্যায়ে বর্ণিত হইয়াছে (তাঁহার সাহাবী) আবু হুরায়রা, ইবন মাসউদ, উছমান ইবনুল আস, আবু উমামা, আন-নাওয়াস ইব্ন সাম'আন্, আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমর ইবনুল আস, মুজাম্মি ইব্ন হারিছা, আবু শুরায়হ্ এবং হুযায়ফা ইবন উসায়দ রাদিয়াল্লাহু আনহুম হইতে তাহা বর্ণিত। এসব হাদীছে ঈসা ইব্ মারয়াম (আ)-এর অবতরণ পদ্ধতি এবং অবতরণের স্থান সম্পর্কে নির্দেশনা রহিয়াছে (তাফসীর ইন্ন কাছীর, ১ম খ, ৫৭৮, ৫৮৩)।
অবস্থা এই যে, হযরত ঈসা (আ)-এর আসমানী জগতে উত্তোলন, বর্তমানেও তাঁহার জীবন্ত থাকা এবং ঊর্ধ্বলোক হইতে তাঁহার পুনরাগমনের উপর উম্মতের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। আকায়েদের প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ আকীদায়ে সাফারীনী )عقيدة سفاريني -তে বলা হইয়াছে:
ومنها اي من علامات الساعة العظمى العلامة الثالثة ان ينزل من السماء سيد (المسيح) عيسى ابن مريم (عليهما السلام) ونزوله ثابت بالكتاب والسنة واجماع الامة واما الإجماع فقد اجمعت الامة على نزوله ولم يخالف فيه أحد من احد الشريعة وإنما أنكر ذلك الفلاسفة والملاحدة مما لا يعتد بخلافه .
"কিয়ামতের নিদর্শনসমূহের মধ্যে তৃতীয় নিদর্শন হইল, হযরত (মসীহ) ঈসা ইবন মারয়াম (আ) আসমানী জগত হইতে নামিয়া আসিবেন। তাঁহার এই পুনরাগমনের ব্যাপারটি কিতাব (কুরআন), সুন্নাত (হাদীছ) এবং উম্মাতের ইজমা দ্বারা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত। নিঃসন্দেহে হযরত ঈসা (আ)-এর উর্ধ্ব জগত হইতে নাযিল হওয়ার ব্যাপারে উম্মতের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। এই বিষয়ে ইসলামী শরী'আতের অনুসারীদের মধ্যে কোন ভিন্নমত নাই। অবশ্য কতিপয় দার্শনিক ও ধর্মদ্রোহী তাঁহার পুনরাগমনের ব্যাপারটি অস্বীকার করিয়াছে। আর ইসলামের দৃষ্টিতে তাহাদের অস্বীকৃতির কোন মূল্য নাই" (মাওলানা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ১৪৪-১৪৮)।
📄 পুনরাগমনের পর ঈসা (আ)-এর ভূমিকা
(১) তাজদীদে শরী'আতে মুহাম্মাদী : তিনি হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর শরী'আতের বিলুপ্ত অংশ পুনরায় প্রতিষ্ঠা করিবার জন্য কাজ করিবেন। ইমাম কুরতুবী বলেন : "হযরত ঈসা (আ) নূতন শরী'আত নিয়া পুনরাগমন করিবেন না যাহার দ্বারা শরী'আতে মুহাম্মাদী মানসূখ হইয়া যায়, বরং এই শরী'আতের অনুসারীরা যাহা হারাইয়া ফেলিয়াছে তাহা নূতনভাবে প্রতিষ্ঠার জন্যই পুনরাগমন করিবেন" (তাফসীরে কুরতুবী, প্রগুক্ত, ৪খ, page ১০১)।
(২) দাজ্জাল হত্যা: হাদীছে বর্ণিত আছে যে, তিনি বাবে লুদের নিকট দাজ্জালকে হত্যা করিবেন। আর লুদ্দ (Lydda) ফিলিস্তীনের অন্তর্গত বর্তমান ইসরাঈল রাষ্ট্রের রাজধানী তেলআবীব হইতে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত। ইয়াহুদীরা এখানে একটি বিরাট বিমান বন্দর নির্মাণ করিয়াছে।
(৩) কাফির হত্যা: হাদীছে আরও বর্ণিত আছে যে, তাঁহার দৃষ্টি যতদূর যাইবে নিঃশ্বাসও ততদূর যাইবে এবং উহাতে কাফেরকুল নিধন হইয়া যাইবে (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৯০)।
(৪) ক্রুশ ভাঙ্গিয়া ফেলাঃ হাদীছে আরও বর্ণিত আছে যে, হযরত ঈসা (আ) খৃস্টানদের ক্রুশবিদ্ধ করার মনগড়া ঘটনার প্রতীক ক্রুশকে ভাঙ্গিয়া ফেলিবেন। এভাবে তিনি ইসলামের বিজয়ের ঘোষণা করিবেন।
(৫) তিনি শূকর হত্যা করিবেন। শূকরের মাংস ভক্ষণ প্রতিটি শরী'আতে হারাম (দ্র. লেবীয় পুস্তক, ১১ : ৭-৮)। অথচ খৃস্টানরা নিজেদের মনগড়া মত অনুযায়ী উহার মাংস ভক্ষণকে হালাল করিয়াছে। তাই হযরত ঈসা (আ) শূকর হত্যা করিয়া প্রকাশ করিবেন যে, ইহা খৃস্টানদের ভ্রান্ত নীতি।
(৬) আদল ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা: তিনি আদল ও ইনসাফের নীতি অনুযায়ী সমাজ শাসন করিবেন। তাঁহার সময়ে সমাজে শান্তি বিরাজ করিবে। প্রভাবশালী ও শক্তিশালীদের সাথে দুর্বলরা নির্বিঘ্নে জীবন যাপন করিবে। কেহ কাহারো অধিকারে হস্তক্ষেপ করিবে না। তাঁহার সময়ে সমাজে সুখ-সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পাইবে। সম্পদের কোন অভাব থাকিবে না।
(৭) তিনি এখনও বিবাহ করেন নাই। তাই পুনরাগমনের পর তিনি বিবাহ করিবেন এবং তাঁহার সন্তান-সন্তুতিও হইবে।
অবস্থান কাল: কোন কোন বর্ণনায় আসিয়াছে, তিনি পৃথিবীতে ৪০ বৎসর অবস্থান করিবেন। আবার কোন কোন বর্ণনায় আসিয়াছে, তিনি ৪৫ বৎসর অবস্থান করিবেন। আলুসীর এক বর্ণনায় দেখা যায় যে, তিনি ২৪ বৎসর থাকিবেন (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৬৪)। কিন্তু প্রথমোক্ত বর্ণনাটি অধিক প্রসিদ্ধ।
📄 ইনতিকাল ও দাফন
হযরত ঈসা (আ) দীর্ঘ ৪০ বৎসর জীবন যাপনের পর স্বাভাবিকভাবে ইনতিকাল করিবেন। পূর্বোক্ত হাদীছসমূহের বর্ণনায় দেখা যায়, তাঁহাকে হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর পার্শ্বে দাফন করা হইবে (মিশকাত শরীফ, ফাসলুছ ছালিছ, বাব নুযূলে ঈসা; কাদিয়ানী মতবাদ একটি ভ্রান্ত মতবাদ, page ১৫৭ হইতে উদ্ধৃত)।