📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঈসা (আ)-এর আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে কাদিয়ানীদের বিভ্রান্তি

📄 ঈসা (আ)-এর আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে কাদিয়ানীদের বিভ্রান্তি


হিন্দুস্তানে নূতন ধর্মমত আহমাদীয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী নিজেকে "প্রতিশ্রুত মাসীহ” দাবি করার প্রেক্ষাপটে মত ব্যক্ত করে যে, হযরত ঈসা (আ)-এর মৃত্যু হইয়া গিয়াছে। তিনি তাঁহার কবর হইতে জীবিত হইয়া হিন্দুস্তানের কাশ্মীরে হিজরত করেন এবং সেখানে ১২০ বৎসর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তাঁহার কবর কাশ্মীরের শ্রীনগরে রহিয়াছে যাহা সর্বস্তরের জনগণের কাছে প্রসিদ্ধ। ইহাকে মানুষ যিয়ারত করিতে আসে এবং বরকত কামনা করে (গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, আর-রিসালাতুল আরাবিয়্যাহ, পরিশিষ্ট আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, ২য় সংস্করণ, জুলাই ১৯২৪, page ২২; আরও দ্র. আবুল হাসান আলী-নদভী, আল-কাদিয়ানী ওয়াল কাদিয়ানিয়‍্যাহ, জেদ্দা আদ-দারুস সাউদিয়‍্যাহ লিন্নাশরি, ৩খ সং, ১৩৮৭ হি,/ ১৯৬৭ খৃ, page ৬৩ ৬৬; আখতার-উল-আলম, শেষ নবী, page ১৭৮-১৮০)।
মির্যা কাদিয়ানী আরো উল্লেখ করে যে, শ্রীনগরের খান ইয়ার মহল্লায় রাজকুমার ইউস আসফের কবর নামে যাহা প্রসিদ্ধ, তাহাই ঈসা মাসীহের কবর, যিনি দুই হাজার বৎসর পূর্বে কাশ্মীরে হিজরত করেন এবং রাজকুমার নবী হিসাবে পরিচিত ছিলেন (গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, বারাহীনে আহমাদীয়া, ৪খ, page ২২৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 এই বিভ্রান্তি নিরসন

📄 এই বিভ্রান্তি নিরসন


আধুনিক যুগের পাশ্চাত্য ভাবধারায় প্রভাবিত উপরিউক্ত কয়েকজন আলিমের বক্তব্যের বিপরীতে গোটা মুসলিম উম্মাহ একমত যে, হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ পাক সশরীরে জীবন্ত অবস্থায় আসমানে উঠাইয়া নিয়াছেন। কুরআনের স্পষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী ইয়াহুদীরা তাঁহাকে শূলেও চড়াইতে পারে নাই এবং হত্যাও করিতে পারে নাই। আল্লাহ পাকের মহা পরিকল্পনা ও কৌশলের সামনে তাহাদের ক্ষুদ্র পরিকল্পনা কুটার মত ভাসিয়া যায়। কাদিয়ানীসহ উপরিউক্ত চিন্তাবিদগণ ঈসা (আ)-এর মৃত্যু সম্পর্কে যে সকল ব্যাখ্যা উপস্থাপন করিয়াছেন অন্যান্য উলামায়ে কেরাম তাহার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়াছেন। নিম্নে ইহার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক উল্লেখ করা হইল। প্রথমত, আয়াতে উক্ত ওফাত শব্দটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলিয়া দাবি করা যথার্থ নহে। কারণ ওফাত শব্দটির প্রত্যক্ষ অর্থ হইল পূর্ণ করা। তবে পরোক্ষ বা রূপকভাবে কোন কোন সময় মৃত্যু অর্থেও ব্যবহৃত হয়। আর উপরিউক্ত আয়াতে ওফাত দ্বারা 'মৃত্যু' বুঝানো হইয়াছে এমন কোন প্রমাণ নাই।
আল্লামা সিওহারবী এই বিষয়টি বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। (১) জমহুর তাফসীরকারদের মতে توفی শব্দের অর্থ "নির্ধারিত সময় পূর্ণ করা"। আরবী অভিধানে توفی শব্দের মূল হচ্ছে ناء - يفى - وفي, তাহা পূর্ণ করা অর্থে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। আর তাহা যখন باب تفعل-এর ওজনে توفی হয় তখন ইহার অর্থ হয় "কোন জিনিসকে পূর্ণরূপে নেওয়া" অথবা কোন জিনিসকে অক্ষত ও নিরাপদ অবস্থায় আয়ত্তে নেওয়া। আর যেহেতু ইসলামী আকীদা অনুযায়ী রূহকে পূর্ণরূপে নিয়া নেওয়া হয়, এজন্য পরোক্ষভাবে توفی মৃত্যু অর্থেও ব্যবহৃত হইয়া থাকে, তবে সাধারণভাবে নহে। দৃষ্টান্তস্বরূপ নিম্নের আয়াত উল্লেখ করা যায়:
وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّكُمْ بِاللَّيْلِ وَيَعْلَمُ مَا جَرَحْتُمْ بِالنَّهَارِ . "তিনিই রাত্রিকালে তোমাদের ওফাত দেন এবং দিবসে তোমরা যাহা কর তাহা তিনি জানেন" (৬:৬০)।
এই আয়াতে توفی শব্দের অর্থ কোনক্রমেই “মৃত্যু” হইতে পারে না। অথচ توفی -এর কর্তা হইতেছেন আল্লাহ এবং কর্ম হইতেছে মানুষের রূহ। আরও একটি আয়াত:
حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا "অবশেষে যখন তোমাদিগের কাহারও মৃত্যুকাল উপস্থিত হয় তখন আমার প্রেরিতরা তাহার মৃত্যু ঘটায়" (৬:৬১)।
এই আয়াতেও মৃত্যুর কথা বলা হইয়াছে, কিন্তু তারপরও توفته শব্দের মধ্যে توفی-র অর্থ "মৃত্যু" হইতে পারে না। অর্থাৎ احدكم الموت -এ যখন موت শব্দের উল্লেখ আছে তখন আবার توفته-র অর্থও যদি "মৃত্যু" গ্রহণ করা হয় তাহা হইলে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় : "এমনকি যখন কাহারও মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, আমাদের প্রেরিত (ফেরেশতা) মৃত্যু নিয়া আসে।" আর ইহা সুস্পষ্ট যে, موت শব্দের পুনর্ব্যবহার নিরর্থক হইয়া দাঁড়ায় এবং বক্তব্যের মধ্যে বাগ্মিতা ও মু'জিযা- সুলভ ভাবধারা থাকা তো দূরের কথা, সাধারণ কথোপকথনের বিচারেও তাহা নিম্ন মানের হইয়া যায়। অবশ্য যদি توفی শব্দের প্রত্যক্ষ অর্থ "কোন জিনিস পূর্ণ মাত্রায় নিয়া নেওয়া" গ্রহণ করা হয়, তবে কুরআন মজীদের উদ্দেশ্য সঠিকভাবে পরিস্ফুট হইবে এবং মু'জিযাসুলভ বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ থাকিবে।
মোটকথা, موت এবং توفی সমার্থবোধক শব্দ নহে, বরং উভয়ের প্রকৃত ও প্রত্যক্ষ অর্থের মধ্যে পার্থক্য রহিয়াছে। আরও একটি আয়াত হইতে ইহা প্রমাণিত হয় :
فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَقَّهُنَّ الْمَوْن . "তবে তাহাদিগকে গৃহে অবরুদ্ধ করিবে, যে পর্যন্ত না তাহাদের মৃত্যু হয়" (৪:১৫)।
এখানে موت শব্দকে توفی ক্রিয়ার কর্তা হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। আর কর্তা এবং ক্রিয়া এক হইতে পারে না (এই প্রসঙ্গে আরও দ্র. ২:২৮১ এবং ১৬:১১১)।
توفی (৪) এবং موت নিশ্চিতই সমার্থবোধক শব্দ নহে। ইহার আর একটি প্রমাণ হইল, গোটা কুরআন মজীদে মৃত্যু শব্দের কর্তা একমাত্র আল্লাহ্ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। পক্ষান্তরে توفی শব্দের কর্তারূপে ফেরেশতাগণের উল্লেখ রহিয়াছে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে :
إِنَّ الَّذِينَ تَوَقَّهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسَهُمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ .
"যাহারা নিজেদের উপর জুলুম করে তাহাদের প্রাণ গ্রহণের সময় ফেরেশতাগণ বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে" (৪:৯৭)? আরও বর্ণিত হইয়াছে تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا )যখন তোমাদিগের কাহারও মৃত্যুকাল উপস্থিত হয় তখন) "আমার প্রেরিতরা তাহারা মৃত্যু ঘটায়" (৬:৬১)। আরও উল্লিখিত হইয়াছে قُلْ يَتَوَقَّكُمْ مَلَكُ الْمَوْتِ "বল, তোমাদিগের জন্য নিযুক্ত মৃত্যুর ফেরেস্তা তোমাদিগের প্রাণ হরণ করিবে” (৩২:১১)।
ولو ترى إذ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلَائِكَةُ.
"তুমি যদি দেখিতে পাইতে ফেরেশতাগণ কাফিরদিগের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করিয়া তাহাদিগের প্রাণ হরণ করিতেছে" (৮:৫০)।
(৫) কুরআন মজীদে موت এবং توفی শব্দের ব্যবহারের দৃষ্টিকোণ হইতে আর একটি বড় পার্থক্য এই যে, কুরআন মজীদের স্থানে স্থানে জীবন (حیات) এবং মৃত্যুকে (موت) পরস্পর বিপরীতার্থক শব্দ হিসাবে ব্যবহার করা হইয়াছে। কিন্তু توفی শব্দকে কোনও একটি স্থানেও حيات শব্দের বিপরীতার্থক শব্দরূপে ব্যবহার করা হয় নাই। যেমন বর্ণিত হইয়াছে: الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَوةَ . "যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন মৃত্যু এবং জীবন" (৬৭:২)।
আরও আসিয়াছে, وَلَا يَمْلِكُونَ مَوْتًا وَلَا حَيو “তাহারা না মৃত্যুর মালিক আর না জীবনের" (সূরা ফুরকান, ৩)।
দ্বিতীয়ত, হযরত ঈসা (আ)-কে সশরীরে আসমানে উঠাইয়া নেওয়ার ব্যাপারে কুরআনুল কারীমে স্পষ্ট ইঙ্গিত রহিয়াছে : بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ "বরং আল্লাহ্ নিজের কাছে তাহাকে উঠাইয়া নিয়াছেন" (৪: ১৫৮)। অন্য আয়াত ও হাদীছ দ্বারা আরও সুস্পষ্ট হইয়া যায়। (১) আল্লাহ্ বাণী: وَإِن مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيمَةِ "কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তাহার মৃত্যুর পূর্বে তাহাকে বিশ্বাস করিবেই এবং কিয়ামতের দিন সে তাহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে (৪: ১৫৯)।
এইখানে আহলে কিতাব কর্তৃক ঈমান আনার অর্থ হইল, ঈসা (আ) যখন পুন আগমন করিবেন তখন খৃস্টানরা জানিবে তিনি ইবনুল্লাহ ছিলেন না, মানুষ ছিলেন। ইয়াহুদী ও খৃস্টান উভয়ে জানিবে, তাঁহাকে শূলে চড়াইয়া হত্যা করা হয় নাই। কারণ তাহাদের এই ভ্রান্ত ধারণা দূর করিবার জন্য তিনি ক্রুশ ভাঙ্গিয়া ফেলিবেন আর ঘোষণা দিবেন। তিনি বিবাহ-শাদী করিবেন। এইভাবে তাহাদের ধারণার অপনোদন হইবে এবং সকলেই তখন একযোগে ঈসা (আ)-এর মৃত্যুর পূর্বেই তাঁহার উপর ঈমান আনিবে। আয়াতের ইহাই সঠিক ব্যাখ্যা। (২) আল্লাহ্ বাণী: وَإِنَّهُ لَعِلْمُ السَّاعَةِ فَلَا تَمْتَرُنَّ بِهَا وَاتَّبِعُونَ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمُ . "ঈসা তো কিয়ামতের নিদর্শন। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করিও না এবং আমাকে অনুসরণ কর। ইহাই সরল পথ" (৪৩ঃ ৬১)।
এই আয়াত দ্বারা বুঝা যাইতেছে যে, হযরত ঈসা (আ) কিয়ামতের আলামতসমূহের অন্যতম। আর কিয়ামত যখন আসন্ন হইবে এবং উহার বিভিন্ন আলামতরূপে দাজ্জালের আগমন হইবে তখন তাহাকে হত্যা করার জন্য আল্লাহ্ পাকের কুদরতে হযরত ঈসা (আ) আসমান হইতে অবতরণ করিবেন। (৩) আল্লাহ্ বাণী: وَيُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلاً وَمِنَ الصَّلِحِينَ . "সে দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সহিত কথা বলিবে এবং সে হইবে পুণ্যবানদের একজন" (৩:৪৬)।
উক্ত আয়াতে كهلا শব্দের অর্থ পরিণত বয়সে। 'কাহলান' শব্দটি পৌঢ়ত্বের একটি বিশেষ স্তরকে বুঝায়। সাধারণত চল্লিশ বৎসর হইতে পঞ্চাশ বৎসর বয়স পর্যন্ত সময়কে কাহল বা পরিণত বয়স বলা হয় (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৯১; আলুসী, প্রাগুক্ত, তখ, page ১৬৩)।
ছানাউল্লাহ পানিপথী ও আলুসীসহ অনেক মুফাস্সির বলেন, এই আয়াতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ঈসা (আ) পূর্ণ বয়সে পৌঁছিবেন। ইহার আগে তাঁহার ইন্তিকাল হইবে না। হাসান ইব্‌ন ফাদল বলেন: كهلا দ্বারা বুঝা যায় যে, আসমান হইতে অবতরণের পর তিনি কথা বলিবেন। কেননা এই বয়সে পৌঁছার পূর্বেই তাঁহাকে আসমানে তুলিয়া নেওয়া হইয়াছে (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১৬৪; তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ২৯১)।
(৪) ইমাম আবু জাফর তাবারী (র) বলিয়াছেন, যদি আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আ)-কে একবার মৃত্যু দিয়া থাকেন, তাহা হইলে পুনরায় তাঁহাকে মৃত্যু দিবেন না। আল্লাহ্ বাণী: اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ ثُمَّ رَزَقَكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ هَلْ مِنْ شُرَكَاءَكُمْ مَنْ يُفْعَلُ مِنْ ذُلِكُمْ مِنْ شَيْئ. "আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহার পর তোমাদের রিযিক দিয়াছেন, তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাইবেন ও পরে তোমাদেরকে জীবিত করিবেন। তোমাদের দেব-দেবীগুলির এমন কেহ আছে কি, যে এ সমস্ত কোন একটিও করিতে পারে" (৩০:৪০)? অর্থাৎ মানুষের মৃত্যু একবারই হয়।
সর্বোপরি যে আয়াতে বলা হইয়াছে, "তাহাকে উঠাইয়া লওয়া হইয়াছে" তাহা দ্বারা বুঝা যায় যে, হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্ পাক সশরীরে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠাইয়া লইয়াছেন। কেননা স্বাভাবিক মৃত্যু হইলে এমনিতেই তাঁহার রূহকে উপরে উঠানো হইত যেমনিভাবে অন্যান্য নেককার লোকদের রূহ উপরে উঠানো হইয়া থাকে, আলাদাভাবে উঠাইবার কথা বলা হইত না।
দ্বিতীয়, তাফসীরে রূহুল বয়ানে উল্লেখ আছে যে, হযরত ঈসা (আ) উম্মাতে মুহাম্মাদীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দু'আ করিয়াছিলেন (শায়খ ইসমাঈল হাক্কী, তাফসীরে রূহুল বয়ান, ৩খ, page ৪১)।
তৃতীয়, হযরত ঈসা (আ)-এর আসমান হইতে শেষ যমানায় পুন আগমন সম্পর্কে প্রচুর বিশুদ্ধ মারফু হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে। ইব্‌ন জারীর তাবারী, ইন্ন কাছীর প্রমুখ মুফাস্সিরীনে কিরাম ও মুহাদ্দিছীনে ইজাম সেইগুলিকে মুতাওয়াতির স্তরের বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এই হাদীছগুলির বর্ণনায় কিছু শাব্দিক পার্থক্য থাকিলেও এই বিষয়ে সকলেই একমত যে, তিনি আসমান হইতে শেষ যমানায় আগমন করিবেন। অতএব হাদীছগুলি ভাবার্থের দিক হইতে মুতাওয়াতির। হযরত আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (র) উপরিউক্ত হাদীছগুলি মুতাওয়াতির প্রমাণ করিয়াছেন।
চতুর্থ, যদি তর্কের খাতিরে ধরিয়া নেওয়া হয় যে, ঐ হাদীছগুলি খবরে ওয়াহেদ তাহা হইলেও ঐ হাদীছগুলির বিপরীতে কোন বিশুদ্ধ হাদীছ নাই।
পঞ্চম, হাদীছ শরীফে স্পষ্ট আসিয়াছে মহানবী (স) বলিয়াছেন- ان عيسى لم يمت وانه راجع اليكم قبل يوم القيامة . "নিশ্চয়ই ঈসা মৃত্যুবরণ করেন নাই। তিনি কিয়ামতের দিবসের পূর্বে তোমাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করিবেন” (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৭৯)।
ষষ্ঠ, হযরত ঈসা (আ)-এর পুনঃ আগমনের বিষয়টি অস্বীকার করিলে কিয়ামত সংক্রান্ত হাদীছসমূহের এক বিরাট অংশ অস্বীকার করিতে হইবে। আর আকীদার বিষয় শুধু কুরআন কারীম দ্বারাই প্রমাণিত হয় না, অনেক আকীদা মহানবী (স) হইতে বর্ণিত হাদীছ দ্বারা ও প্রমাণিত হয়। যথা কিয়ামতের আলামত সংক্রান্ত বিষয়াদি।
সপ্তম, আল্লাহ্ কুদরতে ঈসা (আ)-কে আসমানে উত্তোলন করানো সম্ভব। হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে মি'রাজের রাত্রে আল্লাহ্ তা'আলা যখন সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উঠাইয়াছিলেন তখন হযরত ঈসা (আ)-কে আসমান পর্যন্ত উত্তোলন করা অসম্ভব হইবে কেন? উপরিউক্ত আলোচনায় আল-কুরআন ও হাদীছের আলোকে স্পষ্টতই প্রমাণিত যে, আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আ)-কে সশরীরে জীবন্ত অবস্থায় আসমানে উঠাইয়া নিয়াছেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 উত্তোলনের স্থান

📄 উত্তোলনের স্থান


বার্ণাবাসের বর্ণনা মতে, ছোট নদী সিদ্রনের পাশে নিকোকোমাসের বাগান বাড়িতে অবস্থানরত ঈসা (আ)-এর নিকট যখন জুদাসসহ সেনাবাহিনী পৌছিল তখন ঈসা (আ) বহু লোকের আগমনের ধ্বনি শুনিতে পাইলেন। ফলে আতঙ্কিত হইয়া তিনি ঘরের ভিতর আসিয়া ঢুকিলেন। এগারজন তখন নিদ্রাভিভূত। আল্লাহ তাঁহার বান্দার বিপদ দেখিয়া তখন তাঁহার দূতবৃন্দ জিবরাঈল, মীকাঈল, আযরাঈল ও ইসরাফীলকে হুকুম করিলেন, ঈসাকে দুনিয়ার মধ্য হইতে তুলিয়া নিয়া আসার জন্য। পবিত্র ফেরেশতাগণ আবির্ভূত হইয়া ঘরের দক্ষিণমুখী জানালা দিয়া ঈসা (আ)-কে বাহির করিয়া নিয়া চলিয়া গেলেন। তাঁহারা তাঁহাকে নিয়া তৃতীয় আসমানে ফেরেশতাদের মাঝে রাখিলেন যাহারা সারাক্ষণ আল্লাহ্ প্রশংসা ধ্বনি গাওয়ায় নিমগ্ন রহিয়াছেন।
ইবনুল জাওযী এক বর্ণনায় উল্লেখ করেন যে, তাঁহাকে বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে উত্তোলন করা হয়। অপর এক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয় যে, তাঁহাকে যয়তুন পাহাড়ে হাওয়ারীদের সম্মুখ হইতে উত্তোলন করা হয় (ইবনুল জাওযী, যাদুল মাছীর, ১খ, page ৩৩৭)। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 উত্তোলনের সময়কাল

📄 উত্তোলনের সময়কাল


এক বর্ণনায় দেখা যায়, তাঁহাকে রমযান মাসের লায়লাতুল কদরে উত্তোলন করা হয় (প্রাগুক্ত)। অপর এক বর্ণনায় দেখা যায়, তাঁহাকে হিব্রু মাস নিসানের ১৩ তারিখ শুক্রবারে উত্তোলন করা হয় (আলুসী, প্রাগুক্ত, ১খ, page ৭৯)। আল্লাহ তা'আলাই অধিক জ্ঞাত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00