📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে ইয়াহুদী খৃস্টানদের ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন

📄 হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে ইয়াহুদী খৃস্টানদের ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন


ইয়াহুদী ও ত্রিত্ববাদী খৃস্টানদের মতে, হযরত ঈসা (আ)-কে শূলে বিদ্ধ করা হয়। তবে পার্থক্য হইল, ইয়াহুদীদের মতে, বনী ইসরাঈলকে বিভ্রান্ত করার ও ইয়াহুদী ধর্ম ত্যাগ করার কারণে তাঁহাকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়। আর ত্রিত্ববাদী খৃস্টানদের মতে মানবতাকে পাপের অপরাধ হইতে মুক্ত করার জন্য প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ তিনি নিজেই তাঁহার বিরোধী শিবিরের হাতে ধরা দেন এবং নিজেই ক্রুশে বিদ্ধ হইয়া দেহত্যাগ করেন।

অপরদিকে একত্ববাদী খৃস্টান এবং মুসলমানদের দৃষ্টিতে হযরত ঈসা (আ)-কে শূলে চড়াইয়া হত্যা করা হয় নাই। আল্লাহ পাক স্বীয় কুদরতে ঈসা (আ)-কে শত্রুদের কবল হইতে মুক্ত করিয়া আকাশে উঠাইয়া নেন। উলামায়ে কেরাম এই বক্তব্যের সমর্থনে ইয়াহুদী খৃস্টানদের ধারণা খণ্ডনের নিমিত্ত বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করিয়াছেন:

প্রথমত, খৃস্টানরা যে মৌখিক বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিয়াছে, তাহা কতটুকু যথার্থ উহা সম্পর্কে সংশয় রহিয়াছে।

দ্বিতীয়ত, তাহারা যাহাকে শূলে চড়াইয়া হত্যা করিয়াছিল, তাহার সম্পর্কে সংশয়ে ছিল। ঐ শূলে বিদ্ধ ব্যক্তিটিই যে ঈসা এই ধরনের দৃঢ় বিশ্বাস লইয়া উক্ত ব্যক্তিটিকে হত্যা করিতে পারে নাই। তাহাদের মাঝে মতানৈক্য ছিল, কারণ ঈসা (আ)-কে গ্রেপ্তার করিবার জন্য তাঁহার অবস্থান স্থলের কামরাটিতে তাহারা যাহাকে পাঠাইয়াছিল পরবর্তীতে তাহাকে তাহারা খুঁজিয়া পায় নাই (প্রাগুক্ত, ৬খ, পৃ. ১১)।

ইবন জারীর তাবারী এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ করেন। সুদ্দীর এক বর্ণনায় দেখা যায়, আল্লাহ তা'আলা এই ক্ষেত্রে যে কৌশল অবলম্বন করিয়াছিলেন তাহা এই যে, হযরত ঈসা-এর অনুসারীদের একজনকে হযরত ঈসার আকৃতি দান করেন, যাহাকে তাহারা হযরত ঈসা বলিয়া ধারণা করিয়া হত্যা করিয়াছিল। অথচ ইহার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উঠাইয়া নিয়াছেন।

সুদ্দী হইতে অপর এক বর্ণনায় ইন জারীর তাবারী উল্লেখ করেন, ইসরাঈলীরা হযরত ঈসা (আ)-কে ও তাঁহার সঙ্গী উনিশজন হাওয়ারীকে একটি ঘরে অবরুদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিল। তিনি সঙ্গীদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিলেন, তোমাদের মধ্যে কে আছ, যে আমার আকৃতি ধারণ করিবে? তারপর তাহাকে হত্যা করা হইবে? আর তাহার জন্য থাকিবে জান্নাত। তাহাদের একজন হযরত ঈসা (আ)-এর আকৃতি গ্রহণ করিতে প্রস্তুত হয় এবং সে রূপান্তরিত হয়। অতঃপর হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উঠাইয়া লওয়া হয়। আর একথাই আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন এই আয়াতে:

وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ .
"আর তাহারা (ইয়াহূদীরা ঈসার বিরুদ্ধে) গোপন ষড়যন্ত্র করিল। আল্লাহও (ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে) গোপন ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করিলেন। আর আল্লাহ সর্বোৎকৃষ্ট গোপন ব্যবস্থাপনার অধিকারী” (৩ঃ ৫৪; আল্লামা সিওহারবী, ৪খ, পৃ. ৯৭-৯৮)।

আল্লামা মাজেদী উল্লেখ করেন যে, "আরবী মকর শব্দটি আবশ্যিকভাবে কোন দোষ বলে করে না। মকর শব্দটি প্রয়োগজনিত কারণে নিন্দনীয় ও প্রশংসনীয় উভয় অর্থে ব্যবহৃত হইতে পারে। মূল অর্থ, গোপন পরিকল্পনা, গভীর চক্রান্ত, ইংরেজী প্লান (Plan) বলিতে যাহা বুঝায় আরবী উর্দু 'তদবীর' বলিতে তাহাই বুঝায়" (তাফসীরে মাজেদী, ২খ, পৃষ্ঠা ৮৩০)।

সর্বশেষে সেই সময় আসিয়া উপস্থিত হইল যখন বানু ইসরাঈলের নেতৃবৃন্দ, মহাযাজক এবং ধর্মবেত্তাগণ হযরত ঈসা (আ)-কে একটি বদ্ধ ঘরের মধ্যে অবরোধ করিল। হযরত ঈসা (আ) এবং হাওয়ারীগণ ঘরের মধ্যে অবরুদ্ধ হইয়া পড়িলেন আর শত্রুরা চারিদিক হইতে বেষ্টনী রচনা করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিল, এমন কি পন্থা হইতে পারে যাহার ফলে শত্রুদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইবে এবং তাহারা হযরত ঈসা (আ)-এর কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না? আর কিভাবে আল্লাহ তা'আলার হেফাজতের ওয়াদা পূর্ণ হইতে পারে?

এই সম্পর্কে কুরআন মজীদের বক্তব্য এই যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা পূর্ণ হইয়াছে এবং তাঁহার পরিপক্ক ব্যবস্থাপনা হযরত ঈসা (আ)-কে দুশমনদের হাত হইতে সর্বপ্রকারে নিরাপদ রাখিয়াছে। এই নাযুক মুহূর্তে তাঁহার নিকট ওহী আসিল এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সুসংবাদ দিলেনঃ ঈসা! ভীত হইও না, তোমাকে পূর্ণরূপে সাহায্য করা হইবে (অর্থাৎ শত্রুরা তোমাকে হত্যা করিতে পারিবে না এবং তুমিও এখন মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িবে না)। আমি তোমাকে আমার নিকটে (উর্ধ্ব জগতে) তুলিয়া লইয়া আসিব এবং কাফিরদের যে কোন ষড়যন্ত্র হইতে তোমাকে রক্ষা করিব। এই ওয়াদা প্রসঙ্গে আল-কুরআনে বর্ণিত হইয়াছে:

إِذْ قَالَ اللَّهُ يعِيْسَى إِنِّي مُتَوَفِّيْكَ وَرَافِعُكَ إِلَى وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِيْنَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ثُمَّ إِلَى مَرْجِعُكُمْ فَاحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيْمَا كُنْتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ .
"স্মরণ কর যখন আল্লাহ বলিলেন, হে ঈসা! আমি তোমার কাল পূর্ণ করিতেছি এবং আমার নিকট তোমাকে তুলিয়া লইতেছি এবং যাহারা সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছে তাহাদের মধ্য হইতে তোমাকে মুক্ত করিতেছি। আর তোমার অনুসারিগণকে কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপর প্রাধান্য দিতেছি, অতঃপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতান্তর ঘটিতেছে আমি উহা মীমাংসা করিয়া দিব" (৩ঃ ৫৫)।

উল্লেখ্য যে, হাসান বসরী, কালবী ও ইবন জুরায়জ (র) বলিয়াছেন: আয়াতের মর্ম হইল, আমি তোমাকে মৃত্যু ছাড়াই গ্রহণ করিব এবং দুনিয়া হইতে আমার কাছে তুলিয়া লইব। বাগাবী (র) বলেন, ইহার দুইটি ব্যাখ্যা হইতে পারে: (১) আমি তোমাকে পুরোপুরি ভাবে আমার কাছে উঠাইয়া লইব। তাহারা তোমার কোন ক্ষতি সাধন করিতে পারিবে না। বলা হইয়া থাকে। توفیت کذا অর্থাৎ استوفیته মানে পরিপূর্ণভাবে উসূল করিয়াছি। (২) আমি তোমাকে স্বীয় আশ্রয়াধীন করিব। বলা হইয়া থাকে, توفیت منه كذا মানে تسلمته অর্থাৎ আমি তাহাকে স্বয়ং গ্রহণ করিয়াছি।

ইবন জারীর (র) ইব্‌ন আনাস হইতে বর্ণনা করেন التوفى দ্বারা নিদ্রা বুঝান হইয়াছে। ঈসা (আ)-কে যখন আসমানে তুলিয়া নেওয়া হয় তখন তিনি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। তখন আয়াতের অর্থ হইবে, আমি তোমাকে নিদ্রিত করিব, ইহার পর আমার কাছে তুলিয়া নিব। যেমন, আল্লাহ বলেন : وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّكُمْ بِاللَّيْلِ "তিনিই রাত্রে তোমাদের (নিদ্রারূপ) মৃত্যু ঘটান" (৬ঃ ৬০)।

কেহ কেহ বলেন, التوفى অর্থ মৃত্যু। আলী ইবন আবূ তালহা, ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন, আয়াতের অর্থ: আমি তোমার মৃত্যু ঘটাইব। ইহার ব্যাখ্যায় দাহ্হাক বলিয়াছেন, ইহার অর্থ, আমি তোমার মৃত্যু ঘটাইব এবং তাহা আকাশ হইতে দুনিয়ায় পুনরাগমনের পর। তখন আমি তোমাকে ইয়াহুদীদের হাত হইতে রক্ষা করিব এবং তোমার নির্দিষ্ট আয়ু পূর্ণ করিব। انی مُتَوَفِّيْكَ وَرَافِعُكَ -এর সংযোজক অব্যয় 'ওয়াও' শুধু সংযোগ সাধনের জন্যই, ধারাবহিকতা বুঝাইবার জন্য নহে। কিন্তু সূরা মাইদার আয়াতটি সামনে রাখিলে এই ব্যাখ্যা টিকে না।

সেখানে ঈসা (আ) বলিয়াছেন : فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ "যখন তুমি আমাকে তুলিয়া নিলে, তখন তুমিই তো ছিলে তাহাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক”। উহার দ্বারা বুঝা যায়, তাঁহার কওম তাঁহার توفی এর পরেই তাহারা নাসারা হইয়াছিল। সুতরাং توفی -এর অর্থ আকাশে উত্তোলন কিংবা ইহার আগে তাঁহার মৃত্যুবরণ (তাফসীরে মাযহারী, ২খ, পৃ. ৩০০-৩০৪)।

আল্লামা কাযী মুহাম্মাদ ছানাউল্লাহ পানীপথী (র) বলেন, আমার মতে التوفى অর্থ মৃত্যু ছাড়াই আকাশে উত্তোলন। একটু চিন্তা করিলেই একথা বুঝা যায়। কেননা এক আয়াতে বলা হইয়াছে, وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ "তাহারা তাহাকে হত্যাও করে নাই, শূলেও চড়ায় নাই"। যদি মৃত্যুই হইবে তাহা হইলে তাঁহাকে হত্যা করে নাই বলিবার সার্থকতা কি, যখন হত্যার উদ্দেশ্য মৃত্যুই হইয়া থাকে (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৪)?

মোটকথা, আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আ)-কে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন যে, তাঁহাকে শত্রুদের হাত হইতে পবিত্র রাখিবেন এবং তাহাদের কবল হইবে উদ্ধার করিবেন। তাই তিনি হযরত ঈসা (আ)-কে জীবিত অবস্থায়ই উদ্ধার করিয়াছিলেন এবং তাঁহাকে শত্রুদের ধরা-ছোঁয়ার বাহিরে রখিয়াই ফেরেশতাগণের মাধ্যমে জীবন্ত অবস্থায় সশরীরে আসমানে উঠাইয়া লইয়াছিলেন। শত্রুদের কবল হইতে রক্ষা পাওয়ার বিষয়টি হযরত ঈসা (আ)-এর প্রতি এক বিশেষ নেয়ামত ছিল। এই মর্মে আল-কুরআনে আরও বলা হইয়াছে:

وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ إِذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هُذَا إِلَّا سِحْرٌ مُّبِينٌ .
"আমি তোমা হইতে বানু ইসরাঈলকে নিবৃত্ত রাখিয়াছিলাম, তুমি যখন তাহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আনিয়াছিলে তখন তাহাদের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছিল তাহারা বলিয়াছিল, ইহা তো স্পষ্ট যাদু" (৫: ১১০)।

হযরত ঈসা (আ)-কে এই বলিয়া সান্ত্বনা দেওয়া হইল যে, এই দুর্ভেদ্য অবরোধ সত্ত্বেও শত্রুরা তোমাকে হত্যা করিতে পারিবে না এবং অদৃশ্য হাত তোমাকে ঊর্ধ্ব জগতে তুলিয়া নিয়া আসিবে, এমনিভাবে দুশমনের নাপাক হাতের স্পর্শ হইতে তোমাকে নিরাপদ রাখা হইবে (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ১০০)।

কুরআন মজীদ ইয়াহুদী-খৃস্টানদের মনগড়া কল্পকাহিনীর বিরুদ্ধে মসীহ ইবন মারয়াম (আ) সম্পর্কে এই বর্ণনা প্রদান করিয়াছে। এখন দুইটি বর্ণনাই আমাদের সামনে রহিয়াছে এবং ন্যায়-ইনসাফের নিক্তিও আমাদের হাতে রহিয়াছে। প্রথমে হযরত মসীহ্ (আ)-এর ব্যক্তিত্ব এবং তাঁহার দাওয়াত ও আন্দোলনের মিশনকে ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে উপলব্ধি করা দরকার। অতঃপর যে বিস্তারিত বর্ণনা একজন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ নবী, আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী রসূল এবং খৃস্টানদের ভ্রান্ত বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহর পুত্রকে তাহার ফয়সালার সামনে হতাশ, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, অসহায় এবং আল্লাহ্র নিকট অভিযোগকারী হিসাবে তুলিয়া ধরে তাঁহার উপর আরেকবার দৃষ্টিপাত করা হউক। সাথে সাথে এই বর্ণনার মধ্যে যে বৈপরীত্য রহিয়াছে সে সম্পর্কেও চিন্তা করা হউক। একদিকে বলা হইতেছে, হযরত মসীহ্ (আ) আল্লাহর পুত্র হইয়া এই উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে আসিয়াছিলেন যে, তিনি শূলাবিদ্ধ হইয়া দুনিয়ার সকল পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবেন (ইহাই হইতেছে, প্রায়শ্চিত্তের আকীদার একমাত্র ভিত্তি), অপরদিকে ক্রুশ এবং হত্যার কল্পিত কাহিনী এই ভিত্তির উপর দাঁড় করানো হইয়াছে যে, সেই নির্দিষ্ট সময় যখন আসিয়া গেল তখন আল্লাহ্ এই কল্পিত পুত্রকে নিজের মাহাত্ম্য এবং পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্বকে একেবারে ভুলিয়া গিয়া "প্রভো আমার, প্রভো আমার, কেন আমায় পরিত্যাগ করিলে' এই ধরনের হতাশাজনক বাক্য মুখ দিয়া বাহির করিতে এবং আল্লাহর ইচ্ছার উপর নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করিতে দেখা যায়। কোন ব্যক্তির এই প্রশ্ন উত্থাপন করার কি অধিকার নাই যে, খ্রীষ্টানদের বিবৃত কাহিনীর উভয় অংশ যদি সঠিক এবং নির্ভুল হইয়া থাকে তাহা হইলে এই বৈপরীত্য কেন এবং এই অসামঞ্জস্যতারই বা অর্থ কি (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ১০১)?

অতএব যদি কোন বাস্তববাদী এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি এই সমস্ত দিক সামনে রাখিয়া এবং ঘটনা ও পরিস্থিতির এই সার্বিক দিককে পরস্পর সংযুক্ত করিয়া বিষয়টি অধ্যয়ন করে তবে সে 'সত্যকে মানিয়া নেওয়ার তাগিদে নিঃসংকোচে এই সিদ্ধান্তে পৌছিবে যে, বাইবেলের এই কাহিনী পরস্পর বিরোধী এবং মনগড়া। আর কুরআন মজীদ ঐ প্রসংগে যে সিদ্ধান্ত দিয়াছে তাহাই সত্য।

ইতিহাস সাক্ষী যে, হযরত মসীহ (আ)-এর পর হইতে সেন্ট পলের পূর্ব পর্যন্ত খৃস্টান জগত ইয়াহুদীদের এই মনগড়া কাহিনীর সাথে সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেন্ট পল যখন "ত্রিত্ববাদ ও প্রায়শ্চিত্তের” ধারণার উপর আধুনিক খৃস্টবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন তখন প্রায়শ্চিত্তের ধারণাকে সুদৃঢ় করার জন্য ইয়াহুদীদের এই মনগড়া উপাখ্যানকেও ধর্মের অংশে পরিণত করিয়া নেওয়া হয়।

কুরআন মজীদ চৌদ্দ শত বৎসর ধরিয়া হযরত ঈসা (আ)-এর মহান মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমার কথা ঘোষণা করিয়া তাঁহার ঊর্ধ্ব জগতে উত্তোলিত হওয়ার রহস্যকে ইয়াহুদী-খৃস্টানদের মনগড়া কাহিনীর বিপরীতে নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ১০২)।

হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে ইয়াহুদী-খৃস্টানদের ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন

ইয়াহুদী ও ত্রিত্ববাদী খৃস্টানদের মতে, হযরত ঈসা (আ)-কে শূলে বিদ্ধ করা হয়। তবে পার্থক্য হইল, ইয়াহুদীদের মতে, বনী ইসরাঈলকে বিভ্রান্ত করার ও ইয়াহুদী ধর্ম ত্যাগ করার কারণে তাঁহাকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়। আর ত্রিত্ববাদী খৃস্টানদের মতে মানবতাকে পাপের অপরাধ হইতে মুক্ত করার জন্য প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ তিনি নিজেই তাঁহার বিরোধী শিবিরের হাতে ধরা দেন এবং নিজেই ক্রুশে বিদ্ধ হইয়া দেহত্যাগ করেন।

অপরদিকে একত্ববাদী খৃস্টান এবং মুসলমানদের দৃষ্টিতে হযরত ঈসা (আ)-কে শূলে চড়াইয়া হত্যা করা হয় নাই। আল্লাহ পাক স্বীয় কুদরতে ঈসা (আ)-কে শত্রুদের কবল হইতে মুক্ত করিয়া আকাশে উঠাইয়া নেন। উলামায়ে কেরাম এই বক্তব্যের সমর্থনে ইয়াহুদী খৃস্টানদের ধারণা খণ্ডনের নিমিত্ত বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করিয়াছেন:

প্রথমত, খৃস্টানরা যে মৌখিক বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিয়াছে, তাহা কতটুকু যথার্থ উহা সম্পর্কে সংশয় রহিয়াছে।

দ্বিতীয়ত, তাহারা যাহাকে শূলে চড়াইয়া হত্যা করিয়াছিল, তাহার সম্পর্কে সংশয়ে ছিল। ঐ শূলে বিদ্ধ ব্যক্তিটিই যে ঈসা এই ধরনের দৃঢ় বিশ্বাস লইয়া উক্ত ব্যক্তিটিকে হত্যা করিতে পারে নাই। তাহাদের মাঝে মতানৈক্য ছিল, কারণ ঈসা (আ)-কে গ্রেপ্তার করিবার জন্য তাঁহার অবস্থান স্থলের কামরাটিতে তাহারা যাহাকে পাঠাইয়াছিল পরবর্তীতে তাহাকে তাহারা খুঁজিয়া পায় নাই (প্রাগুক্ত, ৬খ, পৃ. ১১)।

ইবন জারীর তাবারী এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ করেন। সুদ্দীর এক বর্ণনায় দেখা যায়, আল্লাহ তা'আলা এই ক্ষেত্রে যে কৌশল অবলম্বন করিয়াছিলেন তাহা এই যে, হযরত ঈসা-এর অনুসারীদের একজনকে হযরত ঈসার আকৃতি দান করেন, যাহাকে তাহারা হযরত ঈসা বলিয়া ধারণা করিয়া হত্যা করিয়াছিল। অথচ ইহার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উঠাইয়া নিয়াছেন।

সুদ্দী হইতে অপর এক বর্ণনায় ইন জারীর তাবারী উল্লেখ করেন, ইসরাঈলীরা হযরত ঈসা (আ)-কে ও তাঁহার সঙ্গী উনিশজন হাওয়ারীকে একটি ঘরে অবরুদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিল। তিনি সঙ্গীদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিলেন, তোমাদের মধ্যে কে আছ, যে আমার আকৃতি ধারণ করিবে? তারপর তাহাকে হত্যা করা হইবে? আর তাহার জন্য থাকিবে জান্নাত। তাহাদের একজন হযরত ঈসা (আ)-এর আকৃতি গ্রহণ করিতে প্রস্তুত হয় এবং সে রূপান্তরিত হয়। অতঃপর হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উঠাইয়া লওয়া হয়। আর একথাই আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন এই আয়াতে:

وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ .
"তাহারা কৌশল অবলম্বন করিয়াছে, আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করিয়াছেন, আল্লাহই কৌশল অবলম্বনকারীদের মাঝে শ্রেষ্ঠ"।

তারপর যখন হাওয়ারীগণ ঘর হইতে বাহির হইলেন, দেখা গেল সংখ্যায় তাহারা উনিশজন। তখন তাহারা খবর দিলেন যে, হযরত ঈসা (আ)-কে আসমানে উঠাইয়া লওয়া হইয়াছে। শত্রুপক্ষ তাহাদেরকে গণনা করিতে লাগিল। তাহারা দেখিল যে, নির্দিষ্ট সংখ্যা হইতে একজন কম। তাহাদের মধ্যে একজনকে তাহারা হযরত ঈসা (আ)-এর আকৃতিতে দেখিতে পাইল। তাহার ব্যাপারে তাহারা সন্দিহান হইল। এই ভিত্তিতে তাহারা তাহাকে হযরত ঈসা (আ) মনে করিয়া শূলিতে চড়াইয়া দিয়াছিল (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, পৃ. ৪১৮-৪১৯)। এই ঘটনা প্রসঙ্গে মুফাসসিরীনে কিরাম একাধিক বর্ণনা দিয়াছেন।

(১) ইয়াহুদীগণ যখন জানিতে পারিল যে, ঈসা তাঁহার সাথীবর্গসহ অমুক বাড়িতে অবস্থান করিতেছেন, ইয়াহুদী নেতা ইয়াহুয়া তখন ঈসারই এক সাথী তিতায়ূসকে আদেশ করিল যে, সে যেন ঈসা (আ)-এর কামরায় প্রবেশ করে এবং তাঁহাকে বাহির করিয়া আনে যাহাতে তাঁহাকে হত্যা করা যায়। ঐ ব্যক্তি যখন ঈসা (আ)-এর ঘরে প্রবশে করিল, তখন আল্লাহ তা'আলা 'ঈসা (আ)-কে ঘরের ছাদ ভেদ করিয়া বাহির করিয়া আনিলেন। আর ঐ ব্যক্তির চেহারা-সুরতকে ঈসা (আ)-এর চেহারায় রূপান্তরিত করিলেন। অতঃপর তাহারা ধারণা করিল, ঐ ব্যক্তিই ঈসা এবং তাহাকে শূলে চড়াইয়া হত্যা করিল।

(২) ঈসা (আ)-এর ব্যাপারে তাহারা এমন এক ব্যক্তিকে নিয়োগ করিয়াছিল যে তাহাকে পাহারা দিত। আর ঈসা (আ) পাহাড়ে আরোহণ করিলেন এবং আসমানে উত্থিত হইলেন। আর আল্লাহ তা'আলা ঈসা (আ)-এর চেহারাকে ঐ পাহারাদারের উপর ঢালিয়া দিলেন। অতঃপর তাহারা তাহাকে হত্যা করিল, অথচ সে বলিতেছিল, আমি ত ঈসা নহি, আমি ত ঈসা নহি।

(৩) এক ব্যক্তি যে নিজেকে ঈসার (আ) সাথী বলিয়া দাবি করিত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে ছিল মুনাফিক। সে ইয়াহুদীদের কাছে গেল এবং ঈসা (আ)-কে গ্রেপ্তার করার নির্দেশদান করিল। সে যখন ইয়াহুদীদেরসহ ঈসা (আ)-এর আবাসস্থলে গেল আল্লাহ পাক তখন তাহার চেহারাকে ঈসা (আ)-এর চেহারায় রূপান্তর করিয়া দিলেন। অতঃপর সে শূলে নিহত হইল (রাযী, প্রাগুক্ত, ১১খ, পৃ. ১০০)। বাইবেলের বর্ণনা মতে ঐ ব্যক্তিটির নাম যিহুদা ইসখারায়ূতী।

উপরিউক্ত বর্ণনাগুলি পরস্পর বিরোধী। কেননা কোনটায় দেখা যায় ঈসার চেহারায় রূপান্তরিত ব্যক্তিটি ঈসার সাহায্যকারী হিসাবে আগাইয়া আসিয়াছিল। অপর বর্ণনামতে ঐ ব্যক্তিটি ছিল বিশ্বাসঘাতক। সে ঈসা (আ)-এর প্রতি শত্রুতাবশত তাঁহাকে ধরাইয়া দিতে চাহিয়াছিল। যাহা হউক, শেষোক্ত মতটি অধিক যুক্তিসংগত বলিয়া মনে হয়। কারণ ইহাই অধিক প্রসিদ্ধ এবং রূপান্তরিত হওয়ার শাস্তিতে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। বস্তুত উপরিউক্ত বর্ণনায় দেখা যায়, ইয়াহুদীরা হযরত ঈসা (আ)-কে শূলে চড়াইতে পারে নাই বরং তাঁহার চেহারায় রূপান্তরিত আরেক ব্যক্তিকে তাহারা শূলে চড়ায়।

এই পর্যন্ত যাহা কিছু আলোচনা করা হইল তাহার উপর আর একবার নযর বুলাইয়া নিচের বিষয়গুলি প্রণিধান করুন। (১) যেদিন মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয় সেদিন ছিল শুক্রবার। দিন শেষ হইয়া আসিতেছিল আর ইয়াহুদীরা সকল কাজ সারিয়া সন্ধ্যার আগে আগে ঘরে ফিরিয়া যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করিতেছিল। জুমুআর দিন সন্ধ্যা হইতেই তাহাদের শনিবার শুরু হইয়া যায়। আর শনিবারের সীমার মধ্যে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াও নিষিদ্ধ ছিল। আর ইয়াহুদীদের একটা বিশেষ উৎসবের অনুষ্ঠানও শুরু হইতেছিল। মোটকথা ইয়াহূদীদের বেশ তাড়া ছিল। যাহাতে এই প্রশ্ন হইতে পারে যে, ধৃত ব্যক্তিটি যদি ঈসা না হইবে তাহা হইলে সে তাহা বলিল না কেন যে, আমি ঈসা নহি? ইহার বিভিন্ন জওয়াব রহিয়াছে:

(১) আল্লাহ পাকই তাহার যবান বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন তাঁহার নবীকে রক্ষার জন্য। (২) সম্ভবত ঐ লোকটি ঈসা (আ)-এর-ই ভক্ত শিষ্য ছিল, যে ঈসার পরিবর্তে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করিয়াছিল শাহাদাৎ লাভের আকাংক্ষায় (আলুসী, প্রাগুক্ত)।

(৩) হয়ত সে ব্যক্তিটি ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল হইয়া গিয়াছিল, তাই সে নির্বাক হইয়া গিয়াছিল।

ঈসা (আ)-কে শূলে চড়ানো হয় নাই বা শূলে চড়ানো ব্যক্তি ঈসা ছিলেন না। ইহার পিছনে আরও কয়েকটি যুক্তি পেশ করা যায়। ঈসা (আ) ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মহান নবী, আল্লাহর সাহায্য ও ফয়সালা সম্পর্কে দৃঢ় আস্থাবান। তাই তিনি বিপদের মুহূর্তে নিরাশ হইতে পারেন না যাহার প্রমাণ এমনকি সুসমাচারসমূহেও রহিয়াছে। তাই দেখা যায় সৈনিকরা যখন তাঁহাকে গ্রেফতার করিতে ঘিরিয়া ফেলিয়াছিল তখন তিনি সিজদায় গিয়া মুনাজাত করিয়াছিলেন।

আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী উল্লেখ করেন যে, একজন প্রসিদ্ধ ইউরোপীয় পণ্ডিত "ডি বেনসন" (De Benson) বিগত শতাব্দীতে ইসলাম অথবা প্রকৃত খৃস্টবাদ (ISLAM OR TRUE CHRISTIANTY) নামক গবেষণাভিত্তিক তথ্যপূর্ণ পুস্তকের ১৪৩ পৃষ্ঠার টীকায় খৃস্টানদের বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মীয় ফেরকার নাম উল্লেখ করিয়া লিখিয়াছেন যে, ঐসব সম্প্রদায় হযরত ঈসা (আ)-কে সশরীরে আকাশে উঠাইয়া নেওয়ার আকীদায় বিশ্বাসী ছিল, কেহ বর্তমান খৃস্টানদের মত তাঁহার ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় বিশ্বাসী ছিল না, যে বিশ্বাস বিগত কয়েক শতাব্দী যারত তথাকথিত খৃষ্ট মতবাদের অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত রহিয়াছে। সেল নামক জনৈক পণ্ডিতও তাহার অনূদিত কুরআনের টীকায় প্রাচীন খৃস্টানদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নাম উল্লেখ করিয়া হযরত ঈসা (আ)-এর সশরীরে আকাশে উত্তোলিত হওয়ার আকীদা-বিশ্বাসের বর্ণনা দিয়াছেন (আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী, প্রাগুক্ত, ২খ, পৃ. ৮৭)।

ইহা ছাড়া শূলে চড়ানোর ঘটনাকে বার্ণাবাস অস্বীকার করিয়াছেন। বালম্যান স্ট্রাকের গ্রন্থ The four Gospels (New York, Macmillan 196- p. 5)-এর বরাতে মাওলানা তকী উসমানী উল্লেখ করেন, ঈসা (আ)-এর অনুসারী পিটারও বলিয়াছেন, ঈসা শূলে বিদ্ধ হন নাই, তাঁহাকে আকাশে উত্তোলিত করা হয় (তকী উসমানী, মাহেয়া আন-নাসরানিয়া, পৃ. ৭৩)।

ঈসা (আ)-এর আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে কাদিয়ানীদের বিভ্রান্তি

হিন্দুস্তানে নূতন ধর্মমত আহমাদীয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী নিজেকে "প্রতিশ্রুত মাসীহ” দাবি করার প্রেক্ষাপটে মত ব্যক্ত করে যে, হযরত ঈসা (আ)-এর মৃত্যু হইয়া গিয়াছে। তিনি তাঁহার কবর হইতে জীবিত হইয়া হিন্দুস্তানের কাশ্মীরে হিজরত করেন এবং সেখানে ১২০ বৎসর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তাঁহার কবর কাশ্মীরের শ্রীনগরে রহিয়াছে যাহা সর্বস্তরের জনগণের কাছে প্রসিদ্ধ। ইহাকে মানুষ যিয়ারত করিতে আসে এবং বরকত কামনা করে (গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, আর-রিসালাতুল আরাবিয়্যাহ, পরিশিষ্ট আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, ২য় সংস্করণ, জুলাই ১৯২৪, পৃ. ২২; আরও দ্র. আবুল হাসান আলী-নদভী, আল-কাদিয়ানী ওয়াল কাদিয়ানিয়‍্যাহ, জেদ্দা আদ-দারুস সাউদিয়‍্যাহ লিন্নাশরি, ৩খ সং, ১৩৮৭ হি,/ ১৯৬৭ খৃ, পৃ. ৬৩ ৬৬; আখতার-উল-আলম, শেষ নবী, পৃ. ১৭৮-১৮০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঈসা (আ)-এর আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে কাদিয়ানীদের বিভ্রান্তি

📄 ঈসা (আ)-এর আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে কাদিয়ানীদের বিভ্রান্তি


হিন্দুস্তানে নূতন ধর্মমত আহমাদীয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী নিজেকে "প্রতিশ্রুত মাসীহ” দাবি করার প্রেক্ষাপটে মত ব্যক্ত করে যে, হযরত ঈসা (আ)-এর মৃত্যু হইয়া গিয়াছে। তিনি তাঁহার কবর হইতে জীবিত হইয়া হিন্দুস্তানের কাশ্মীরে হিজরত করেন এবং সেখানে ১২০ বৎসর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তাঁহার কবর কাশ্মীরের শ্রীনগরে রহিয়াছে যাহা সর্বস্তরের জনগণের কাছে প্রসিদ্ধ। ইহাকে মানুষ যিয়ারত করিতে আসে এবং বরকত কামনা করে (গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, আর-রিসালাতুল আরাবিয়্যাহ, পরিশিষ্ট আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, ২য় সংস্করণ, জুলাই ১৯২৪, page ২২; আরও দ্র. আবুল হাসান আলী-নদভী, আল-কাদিয়ানী ওয়াল কাদিয়ানিয়‍্যাহ, জেদ্দা আদ-দারুস সাউদিয়‍্যাহ লিন্নাশরি, ৩খ সং, ১৩৮৭ হি,/ ১৯৬৭ খৃ, page ৬৩ ৬৬; আখতার-উল-আলম, শেষ নবী, page ১৭৮-১৮০)।
মির্যা কাদিয়ানী আরো উল্লেখ করে যে, শ্রীনগরের খান ইয়ার মহল্লায় রাজকুমার ইউস আসফের কবর নামে যাহা প্রসিদ্ধ, তাহাই ঈসা মাসীহের কবর, যিনি দুই হাজার বৎসর পূর্বে কাশ্মীরে হিজরত করেন এবং রাজকুমার নবী হিসাবে পরিচিত ছিলেন (গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, বারাহীনে আহমাদীয়া, ৪খ, page ২২৮)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 এই বিভ্রান্তি নিরসন

📄 এই বিভ্রান্তি নিরসন


আধুনিক যুগের পাশ্চাত্য ভাবধারায় প্রভাবিত উপরিউক্ত কয়েকজন আলিমের বক্তব্যের বিপরীতে গোটা মুসলিম উম্মাহ একমত যে, হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ পাক সশরীরে জীবন্ত অবস্থায় আসমানে উঠাইয়া নিয়াছেন। কুরআনের স্পষ্ট বর্ণনা অনুযায়ী ইয়াহুদীরা তাঁহাকে শূলেও চড়াইতে পারে নাই এবং হত্যাও করিতে পারে নাই। আল্লাহ পাকের মহা পরিকল্পনা ও কৌশলের সামনে তাহাদের ক্ষুদ্র পরিকল্পনা কুটার মত ভাসিয়া যায়। কাদিয়ানীসহ উপরিউক্ত চিন্তাবিদগণ ঈসা (আ)-এর মৃত্যু সম্পর্কে যে সকল ব্যাখ্যা উপস্থাপন করিয়াছেন অন্যান্য উলামায়ে কেরাম তাহার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়াছেন। নিম্নে ইহার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দিক উল্লেখ করা হইল। প্রথমত, আয়াতে উক্ত ওফাত শব্দটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলিয়া দাবি করা যথার্থ নহে। কারণ ওফাত শব্দটির প্রত্যক্ষ অর্থ হইল পূর্ণ করা। তবে পরোক্ষ বা রূপকভাবে কোন কোন সময় মৃত্যু অর্থেও ব্যবহৃত হয়। আর উপরিউক্ত আয়াতে ওফাত দ্বারা 'মৃত্যু' বুঝানো হইয়াছে এমন কোন প্রমাণ নাই।
আল্লামা সিওহারবী এই বিষয়টি বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করিয়াছেন। (১) জমহুর তাফসীরকারদের মতে توفی শব্দের অর্থ "নির্ধারিত সময় পূর্ণ করা"। আরবী অভিধানে توفی শব্দের মূল হচ্ছে ناء - يفى - وفي, তাহা পূর্ণ করা অর্থে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। আর তাহা যখন باب تفعل-এর ওজনে توفی হয় তখন ইহার অর্থ হয় "কোন জিনিসকে পূর্ণরূপে নেওয়া" অথবা কোন জিনিসকে অক্ষত ও নিরাপদ অবস্থায় আয়ত্তে নেওয়া। আর যেহেতু ইসলামী আকীদা অনুযায়ী রূহকে পূর্ণরূপে নিয়া নেওয়া হয়, এজন্য পরোক্ষভাবে توفی মৃত্যু অর্থেও ব্যবহৃত হইয়া থাকে, তবে সাধারণভাবে নহে। দৃষ্টান্তস্বরূপ নিম্নের আয়াত উল্লেখ করা যায়:
وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّكُمْ بِاللَّيْلِ وَيَعْلَمُ مَا جَرَحْتُمْ بِالنَّهَارِ . "তিনিই রাত্রিকালে তোমাদের ওফাত দেন এবং দিবসে তোমরা যাহা কর তাহা তিনি জানেন" (৬:৬০)।
এই আয়াতে توفی শব্দের অর্থ কোনক্রমেই “মৃত্যু” হইতে পারে না। অথচ توفی -এর কর্তা হইতেছেন আল্লাহ এবং কর্ম হইতেছে মানুষের রূহ। আরও একটি আয়াত:
حَتَّى إِذَا جَاءَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا "অবশেষে যখন তোমাদিগের কাহারও মৃত্যুকাল উপস্থিত হয় তখন আমার প্রেরিতরা তাহার মৃত্যু ঘটায়" (৬:৬১)।
এই আয়াতেও মৃত্যুর কথা বলা হইয়াছে, কিন্তু তারপরও توفته শব্দের মধ্যে توفی-র অর্থ "মৃত্যু" হইতে পারে না। অর্থাৎ احدكم الموت -এ যখন موت শব্দের উল্লেখ আছে তখন আবার توفته-র অর্থও যদি "মৃত্যু" গ্রহণ করা হয় তাহা হইলে আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় : "এমনকি যখন কাহারও মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, আমাদের প্রেরিত (ফেরেশতা) মৃত্যু নিয়া আসে।" আর ইহা সুস্পষ্ট যে, موت শব্দের পুনর্ব্যবহার নিরর্থক হইয়া দাঁড়ায় এবং বক্তব্যের মধ্যে বাগ্মিতা ও মু'জিযা- সুলভ ভাবধারা থাকা তো দূরের কথা, সাধারণ কথোপকথনের বিচারেও তাহা নিম্ন মানের হইয়া যায়। অবশ্য যদি توفی শব্দের প্রত্যক্ষ অর্থ "কোন জিনিস পূর্ণ মাত্রায় নিয়া নেওয়া" গ্রহণ করা হয়, তবে কুরআন মজীদের উদ্দেশ্য সঠিকভাবে পরিস্ফুট হইবে এবং মু'জিযাসুলভ বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ থাকিবে।
মোটকথা, موت এবং توفی সমার্থবোধক শব্দ নহে, বরং উভয়ের প্রকৃত ও প্রত্যক্ষ অর্থের মধ্যে পার্থক্য রহিয়াছে। আরও একটি আয়াত হইতে ইহা প্রমাণিত হয় :
فَأَمْسِكُوهُنَّ فِي الْبُيُوتِ حَتَّى يَتَوَقَّهُنَّ الْمَوْن . "তবে তাহাদিগকে গৃহে অবরুদ্ধ করিবে, যে পর্যন্ত না তাহাদের মৃত্যু হয়" (৪:১৫)।
এখানে موت শব্দকে توفی ক্রিয়ার কর্তা হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। আর কর্তা এবং ক্রিয়া এক হইতে পারে না (এই প্রসঙ্গে আরও দ্র. ২:২৮১ এবং ১৬:১১১)।
توفی (৪) এবং موت নিশ্চিতই সমার্থবোধক শব্দ নহে। ইহার আর একটি প্রমাণ হইল, গোটা কুরআন মজীদে মৃত্যু শব্দের কর্তা একমাত্র আল্লাহ্ বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। পক্ষান্তরে توفی শব্দের কর্তারূপে ফেরেশতাগণের উল্লেখ রহিয়াছে। যেমন ইরশাদ হইয়াছে :
إِنَّ الَّذِينَ تَوَقَّهُمُ الْمَلَائِكَةُ ظَالِمِي أَنْفُسَهُمْ قَالُوا فِيمَ كُنتُمْ .
"যাহারা নিজেদের উপর জুলুম করে তাহাদের প্রাণ গ্রহণের সময় ফেরেশতাগণ বলে, তোমরা কী অবস্থায় ছিলে" (৪:৯৭)? আরও বর্ণিত হইয়াছে تَوَفَّتْهُ رُسُلُنَا )যখন তোমাদিগের কাহারও মৃত্যুকাল উপস্থিত হয় তখন) "আমার প্রেরিতরা তাহারা মৃত্যু ঘটায়" (৬:৬১)। আরও উল্লিখিত হইয়াছে قُلْ يَتَوَقَّكُمْ مَلَكُ الْمَوْتِ "বল, তোমাদিগের জন্য নিযুক্ত মৃত্যুর ফেরেস্তা তোমাদিগের প্রাণ হরণ করিবে” (৩২:১১)।
ولو ترى إذ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا الْمَلَائِكَةُ.
"তুমি যদি দেখিতে পাইতে ফেরেশতাগণ কাফিরদিগের মুখমণ্ডলে ও পৃষ্ঠদেশে আঘাত করিয়া তাহাদিগের প্রাণ হরণ করিতেছে" (৮:৫০)।
(৫) কুরআন মজীদে موت এবং توفی শব্দের ব্যবহারের দৃষ্টিকোণ হইতে আর একটি বড় পার্থক্য এই যে, কুরআন মজীদের স্থানে স্থানে জীবন (حیات) এবং মৃত্যুকে (موت) পরস্পর বিপরীতার্থক শব্দ হিসাবে ব্যবহার করা হইয়াছে। কিন্তু توفی শব্দকে কোনও একটি স্থানেও حيات শব্দের বিপরীতার্থক শব্দরূপে ব্যবহার করা হয় নাই। যেমন বর্ণিত হইয়াছে: الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَوةَ . "যিনি সৃষ্টি করিয়াছেন মৃত্যু এবং জীবন" (৬৭:২)।
আরও আসিয়াছে, وَلَا يَمْلِكُونَ مَوْتًا وَلَا حَيو “তাহারা না মৃত্যুর মালিক আর না জীবনের" (সূরা ফুরকান, ৩)।
দ্বিতীয়ত, হযরত ঈসা (আ)-কে সশরীরে আসমানে উঠাইয়া নেওয়ার ব্যাপারে কুরআনুল কারীমে স্পষ্ট ইঙ্গিত রহিয়াছে : بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ "বরং আল্লাহ্ নিজের কাছে তাহাকে উঠাইয়া নিয়াছেন" (৪: ১৫৮)। অন্য আয়াত ও হাদীছ দ্বারা আরও সুস্পষ্ট হইয়া যায়। (১) আল্লাহ্ বাণী: وَإِن مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ إِلا لَيُؤْمِنَنَّ بِهِ قَبْلَ مَوْتِهِ وَيَوْمَ الْقِيمَةِ "কিতাবীদের মধ্যে প্রত্যেকে তাহার মৃত্যুর পূর্বে তাহাকে বিশ্বাস করিবেই এবং কিয়ামতের দিন সে তাহাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবে (৪: ১৫৯)।
এইখানে আহলে কিতাব কর্তৃক ঈমান আনার অর্থ হইল, ঈসা (আ) যখন পুন আগমন করিবেন তখন খৃস্টানরা জানিবে তিনি ইবনুল্লাহ ছিলেন না, মানুষ ছিলেন। ইয়াহুদী ও খৃস্টান উভয়ে জানিবে, তাঁহাকে শূলে চড়াইয়া হত্যা করা হয় নাই। কারণ তাহাদের এই ভ্রান্ত ধারণা দূর করিবার জন্য তিনি ক্রুশ ভাঙ্গিয়া ফেলিবেন আর ঘোষণা দিবেন। তিনি বিবাহ-শাদী করিবেন। এইভাবে তাহাদের ধারণার অপনোদন হইবে এবং সকলেই তখন একযোগে ঈসা (আ)-এর মৃত্যুর পূর্বেই তাঁহার উপর ঈমান আনিবে। আয়াতের ইহাই সঠিক ব্যাখ্যা। (২) আল্লাহ্ বাণী: وَإِنَّهُ لَعِلْمُ السَّاعَةِ فَلَا تَمْتَرُنَّ بِهَا وَاتَّبِعُونَ هَذَا صِرَاطٌ مُسْتَقِيمُ . "ঈসা তো কিয়ামতের নিদর্শন। সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করিও না এবং আমাকে অনুসরণ কর। ইহাই সরল পথ" (৪৩ঃ ৬১)।
এই আয়াত দ্বারা বুঝা যাইতেছে যে, হযরত ঈসা (আ) কিয়ামতের আলামতসমূহের অন্যতম। আর কিয়ামত যখন আসন্ন হইবে এবং উহার বিভিন্ন আলামতরূপে দাজ্জালের আগমন হইবে তখন তাহাকে হত্যা করার জন্য আল্লাহ্ পাকের কুদরতে হযরত ঈসা (আ) আসমান হইতে অবতরণ করিবেন। (৩) আল্লাহ্ বাণী: وَيُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلاً وَمِنَ الصَّلِحِينَ . "সে দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সহিত কথা বলিবে এবং সে হইবে পুণ্যবানদের একজন" (৩:৪৬)।
উক্ত আয়াতে كهلا শব্দের অর্থ পরিণত বয়সে। 'কাহলান' শব্দটি পৌঢ়ত্বের একটি বিশেষ স্তরকে বুঝায়। সাধারণত চল্লিশ বৎসর হইতে পঞ্চাশ বৎসর বয়স পর্যন্ত সময়কে কাহল বা পরিণত বয়স বলা হয় (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৯১; আলুসী, প্রাগুক্ত, তখ, page ১৬৩)।
ছানাউল্লাহ পানিপথী ও আলুসীসহ অনেক মুফাস্সির বলেন, এই আয়াতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ঈসা (আ) পূর্ণ বয়সে পৌঁছিবেন। ইহার আগে তাঁহার ইন্তিকাল হইবে না। হাসান ইব্‌ন ফাদল বলেন: كهلا দ্বারা বুঝা যায় যে, আসমান হইতে অবতরণের পর তিনি কথা বলিবেন। কেননা এই বয়সে পৌঁছার পূর্বেই তাঁহাকে আসমানে তুলিয়া নেওয়া হইয়াছে (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১৬৪; তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ২৯১)।
(৪) ইমাম আবু জাফর তাবারী (র) বলিয়াছেন, যদি আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আ)-কে একবার মৃত্যু দিয়া থাকেন, তাহা হইলে পুনরায় তাঁহাকে মৃত্যু দিবেন না। আল্লাহ্ বাণী: اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ ثُمَّ رَزَقَكُمْ ثُمَّ يُمِيتُكُمْ ثُمَّ يُحْيِيكُمْ هَلْ مِنْ شُرَكَاءَكُمْ مَنْ يُفْعَلُ مِنْ ذُلِكُمْ مِنْ شَيْئ. "আল্লাহই তোমাদের সৃষ্টি করিয়াছেন, তাহার পর তোমাদের রিযিক দিয়াছেন, তিনি তোমাদের মৃত্যু ঘটাইবেন ও পরে তোমাদেরকে জীবিত করিবেন। তোমাদের দেব-দেবীগুলির এমন কেহ আছে কি, যে এ সমস্ত কোন একটিও করিতে পারে" (৩০:৪০)? অর্থাৎ মানুষের মৃত্যু একবারই হয়।
সর্বোপরি যে আয়াতে বলা হইয়াছে, "তাহাকে উঠাইয়া লওয়া হইয়াছে" তাহা দ্বারা বুঝা যায় যে, হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ্ পাক সশরীরে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠাইয়া লইয়াছেন। কেননা স্বাভাবিক মৃত্যু হইলে এমনিতেই তাঁহার রূহকে উপরে উঠানো হইত যেমনিভাবে অন্যান্য নেককার লোকদের রূহ উপরে উঠানো হইয়া থাকে, আলাদাভাবে উঠাইবার কথা বলা হইত না।
দ্বিতীয়, তাফসীরে রূহুল বয়ানে উল্লেখ আছে যে, হযরত ঈসা (আ) উম্মাতে মুহাম্মাদীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার দু'আ করিয়াছিলেন (শায়খ ইসমাঈল হাক্কী, তাফসীরে রূহুল বয়ান, ৩খ, page ৪১)।
তৃতীয়, হযরত ঈসা (আ)-এর আসমান হইতে শেষ যমানায় পুন আগমন সম্পর্কে প্রচুর বিশুদ্ধ মারফু হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে। ইব্‌ন জারীর তাবারী, ইন্ন কাছীর প্রমুখ মুফাস্সিরীনে কিরাম ও মুহাদ্দিছীনে ইজাম সেইগুলিকে মুতাওয়াতির স্তরের বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। এই হাদীছগুলির বর্ণনায় কিছু শাব্দিক পার্থক্য থাকিলেও এই বিষয়ে সকলেই একমত যে, তিনি আসমান হইতে শেষ যমানায় আগমন করিবেন। অতএব হাদীছগুলি ভাবার্থের দিক হইতে মুতাওয়াতির। হযরত আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী (র) উপরিউক্ত হাদীছগুলি মুতাওয়াতির প্রমাণ করিয়াছেন।
চতুর্থ, যদি তর্কের খাতিরে ধরিয়া নেওয়া হয় যে, ঐ হাদীছগুলি খবরে ওয়াহেদ তাহা হইলেও ঐ হাদীছগুলির বিপরীতে কোন বিশুদ্ধ হাদীছ নাই।
পঞ্চম, হাদীছ শরীফে স্পষ্ট আসিয়াছে মহানবী (স) বলিয়াছেন- ان عيسى لم يمت وانه راجع اليكم قبل يوم القيامة . "নিশ্চয়ই ঈসা মৃত্যুবরণ করেন নাই। তিনি কিয়ামতের দিবসের পূর্বে তোমাদের কাছে প্রত্যাবর্তন করিবেন” (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ১৭৯)।
ষষ্ঠ, হযরত ঈসা (আ)-এর পুনঃ আগমনের বিষয়টি অস্বীকার করিলে কিয়ামত সংক্রান্ত হাদীছসমূহের এক বিরাট অংশ অস্বীকার করিতে হইবে। আর আকীদার বিষয় শুধু কুরআন কারীম দ্বারাই প্রমাণিত হয় না, অনেক আকীদা মহানবী (স) হইতে বর্ণিত হাদীছ দ্বারা ও প্রমাণিত হয়। যথা কিয়ামতের আলামত সংক্রান্ত বিষয়াদি।
সপ্তম, আল্লাহ্ কুদরতে ঈসা (আ)-কে আসমানে উত্তোলন করানো সম্ভব। হযরত মুহাম্মাদ (স)-কে মি'রাজের রাত্রে আল্লাহ্ তা'আলা যখন সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত উঠাইয়াছিলেন তখন হযরত ঈসা (আ)-কে আসমান পর্যন্ত উত্তোলন করা অসম্ভব হইবে কেন? উপরিউক্ত আলোচনায় আল-কুরআন ও হাদীছের আলোকে স্পষ্টতই প্রমাণিত যে, আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আ)-কে সশরীরে জীবন্ত অবস্থায় আসমানে উঠাইয়া নিয়াছেন।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 উত্তোলনের স্থান

📄 উত্তোলনের স্থান


বার্ণাবাসের বর্ণনা মতে, ছোট নদী সিদ্রনের পাশে নিকোকোমাসের বাগান বাড়িতে অবস্থানরত ঈসা (আ)-এর নিকট যখন জুদাসসহ সেনাবাহিনী পৌছিল তখন ঈসা (আ) বহু লোকের আগমনের ধ্বনি শুনিতে পাইলেন। ফলে আতঙ্কিত হইয়া তিনি ঘরের ভিতর আসিয়া ঢুকিলেন। এগারজন তখন নিদ্রাভিভূত। আল্লাহ তাঁহার বান্দার বিপদ দেখিয়া তখন তাঁহার দূতবৃন্দ জিবরাঈল, মীকাঈল, আযরাঈল ও ইসরাফীলকে হুকুম করিলেন, ঈসাকে দুনিয়ার মধ্য হইতে তুলিয়া নিয়া আসার জন্য। পবিত্র ফেরেশতাগণ আবির্ভূত হইয়া ঘরের দক্ষিণমুখী জানালা দিয়া ঈসা (আ)-কে বাহির করিয়া নিয়া চলিয়া গেলেন। তাঁহারা তাঁহাকে নিয়া তৃতীয় আসমানে ফেরেশতাদের মাঝে রাখিলেন যাহারা সারাক্ষণ আল্লাহ্ প্রশংসা ধ্বনি গাওয়ায় নিমগ্ন রহিয়াছেন।
ইবনুল জাওযী এক বর্ণনায় উল্লেখ করেন যে, তাঁহাকে বায়তুল মুকাদ্দাস হইতে উত্তোলন করা হয়। অপর এক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয় যে, তাঁহাকে যয়তুন পাহাড়ে হাওয়ারীদের সম্মুখ হইতে উত্তোলন করা হয় (ইবনুল জাওযী, যাদুল মাছীর, ১খ, page ৩৩৭)। আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00