📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 বারজন হাওয়ারীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও কার্যকলাপ

📄 বারজন হাওয়ারীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও কার্যকলাপ


বারজন হাওয়ারীর সংক্ষিপ্ত পরিচয় ও কার্যকলাপ
(১) সায়মন (Simon) তিনি নিষ্ঠাবান হাওয়ারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এইজন্য তাহাকে Simon the Zealote-ও বলা হয়। তাঁহার জন্ম গ্রীসের এডসা নামক স্থানে। পশ্চিমাদের নিকট তাঁহার স্মরণ দিবস (Feast day) ২৮ অক্টোবর এবং প্রাচ্যদের নিকট ১৯ জুন। Gospels-এর Mark এবং Matthew পর্বে তাঁহার নাম Kananajos অথবা Cananaean পাওয়া যায়। Luke পর্বে তাঁহাকে The zealot বলা হইয়াছে।
তিনি সম্ভবত মিসরে ধর্ম প্রচার করেন। তারপর পারস্যে Saint judas-দের সাথে মিলিত হন (The new Encyclopaedia Britannica, vil. 10, Page 821)।
নিউ টেস্টামেন্টে উল্লেখ আছে যে, Simon এবং Juda পারস্যে ধর্ম প্রচার করিতে গিয়া শহীদ হন। Catholic church-এ ২৮ অক্টোবর এবং Orthodox church-এ ১০ মে তাঁহার ধর্মীয় উৎসব (Feast day) ধার্য করা হইয়াছে (The world book of Encyclopaedia. vol-17, page 567)।
(২) বার্থলময় (Bartholomew) : মথি, মার্ক ও লুকে শিষ্যদের তালিকায় তাঁহার নাম উল্লেখ করা হইয়াছে। John-এর Gospel-এ তাঁহাকে যীশুর অনুসারী হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। খৃস্টানদের পরবর্তী ঐতিহ্য অনুসারে বার্থলময় ইন্ডিয়া, ইথিওপিয়া, পারস্য, এশিয়া মাইনর এবং আর্মেনিয়ায় ধর্ম প্রচার করিয়াছিলেন। তিনি একটি Gospel লিখিয়াছেন। একটি তথ্য অনুযায়ী তিনি আর্মেনিয়ায় শহীদ হইয়াছিলেন (The world book of Encyclopaedia vol. 2, Page 120)।
Britannica-তে পাওয়া যায় যে, তিনি বর্তমান Dagestan-এর Derbent Albanoplis নামক স্থানে প্রথম খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পারস্য, এশিয়া মাইনর, মেসোপটেমিয়া, তুরস্ক ও আরমেনিয়ায় ধর্ম প্রচার করেন। Babylonian King Aslygcs-এর নির্দেশে চামড়া তুলিয়া তাঁহাকে শহীদ করা হয়। Latin church-এ তাঁহার Feast day ২৪ আগস্ট এবং Greek-দের নিকট ১২ জুন (The new Encyclopaedia Britannica, vol. 1, Page 844)।
(৩) আন্দ্রিয় (Andrew Saint): তাঁহার জন্ম সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় নাই, তবে মৃত্যু সম্পর্কে উল্লেখ আছে যে, বর্তমান গ্রীসের Patrai নামক স্থানে ৬০/৭০ খৃস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি রাশিয়া এবং স্কটল্যান্ডে নিযুক্ত Saint Peter-এর ভাই ছিলেন। মার্ক, ১৩: ৩-এ বলা হইয়াছে Peter, James, John এবং Andrew ঈসাকে পৃথিবীর শেষ প্রান্তের চিহ্ন রূপ Olives নামক পর্বতে নিয়া যান। তিনি কৃষ্ণ সাগরের নিকটবর্তী স্থানে ধর্ম প্রচার করেন (The new Encyclopaedia Britannica, vol. 1, Page 360)।
The world book of Encyclopaedia-তে আসিয়াছে, Andrew গালীল সাগরের উপকূলীয় গ্রাম Bethsaida-র একজন জেলে ছিলেন। ঈসার শিষ্যত্ব গ্রহণের পূর্বে তিনি Saint John- এর অনুসারী ছিলেন। এশিয়া মাইনর ও গ্রীসে তিনি ধর্ম প্রচার করেন (প্রাগুক্ত vol. 1, Page 457)। পরবর্তীতে তাহার কার্যাবলী কৃষ্ণসাগরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছায়। S.T. Jerame-এর বর্ণনামতে আন্দ্রিয়কে ৩৫৭ খৃ. কনস্টান্টিপোলের রাজার নির্দেশে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে পনের শতাব্দীতে ক্যাথলিক ধর্মগুরুরা তাহার নিদর্শন হিসাবে গ্রীসে একটি স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করেন।
(৪) জেমস (James): তিনি Zebedee-এর পুত্র ছিলেন। তিনি মহান জেমস নামে পরিচিত। তাঁহার জন্ম সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না, তবে তিনি ৪৪ খৃ. ফিলিস্তীনের গ্যালিলিকে সৃজারেরণ করেন। তিনি ঈসা (আ)-এর খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বারজন শিষ্যের মধ্যে একমাত্র তাঁহার শাহাদাতের ঘটনা বাইবেলে বর্ণিত হইয়েছে। Judaea-এর রাজা Herod Agrippa-এর নির্দেশে তাঁহার শিরশ্ছেদ করা হয়। তাঁহার স্মরণ দিবস (Feast day) ২৫ জুলাই (The new Encyclopaedia Britannica, vol. 6, Page 485)।
The world book of Encyclopaedia-তে বলা হইয়াছে, খৃস্টীয় ৪০-এর দশকে তাঁহাকে শহীদ করা হয়। পরবর্তী ঐতিহ্য অনুসারে James-এর হাড়গুলি ষ্টোনের Santiago de compostela তে লইয়া যাওয়া হয়। ফলে শহরটি মধ্যযুগে একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয় (প্রাগুক্ত, vol. 11, pages 27-28)।
(৫) জেমস (James): তিনি ছিলেন Alpeus-এর পুত্র। তাঁহাকে James of Less-ও বলা হয়। বাইবেলে অন্য এক Mary নামক মহিলার নাম উল্লেখ রহিয়াছে, তিনি James-এর মা ছিলেন। তিনি পারস্যে মৃত্যুবরণ করেন। পশ্চিমাদের নিকট তাঁহার স্মরণ দিবস ১ মে এবং প্রাচ্যদের নিকট ৯ অক্টোবর (The new Encyclopaedia Britannica, vol. 6, Page 485)।
তাঁহার পরিচয় বর্ণনায় আল-মাওআতুল বারীতানিয়্যাই, ৬ষ্ঠ খণ্ড, page ৪৮৫-তে উল্লেখ করা হইয়াছে, তিনি ছোট ইয়া'কূব, ইয়াহুদীরা তাঁহার বিষয়ে ষড়যন্ত্র করে এবং তাহাদের মজলিসে ডাকাইয়া নেয়। অতঃপর ৬৩ খৃ. প্রস্তর নিক্ষেপের মাধ্যমে তাঁহাকে হত্যা করা হয় (আলুসী, প্রাগুক্ত, page ১০৬)।
(৬) যোহন (John): প্রাচীন কালে তাঁহাকে Three letters, the Fourth Gospel and Revelation in the New testament-এর লেখক মনে করা হইত। তিনি Galilean fisherman zebedee-এর পুত্র ছিলেন। তিনি এবং তাঁহার ভাই James ঈসা (আ)-এর প্রথম শিষ্য ছিলেন। তাঁহার মা Salome যীশু খৃস্টের শিষ্যদের সেবা করিতেন। ২য় শতাব্দীতে Poly crates -এর Ephesus-এর বিশপ দাবি করেন যে, John -এর সমাধিস্থান Ephesus-এ (Ency Britannica, প্রাগুক্ত, vol. 1, Page 241) 1
(৭) মথি (Mathew): মথি যিশুর ১২ জন শিষ্যের অন্যতম। Gospel-এর বর্ণনা মতে মথিকে যখন যীশুর অনুসরণের জন্য ডাকা হয় 'তখন তিনি একজন কর আদায়কারী ছিলেন। মার্ক এবং লুকে বর্ণিত আছে যে, কর আদায়কারীর নাম ছিল Levi. ঐতিহ্যগতভাবে মথিকে প্রথম Gospel-এর লেখক ধরা হয়, যাহা হিব্রু ভাষায় লিখিত ছিল। অনেক আধুনিক পণ্ডিতের মতে এই Gospel-এর লেখক মথি ছিলেন না এবং তাহা গ্রীক ভাষায় লিখা ছিল। তিনি আফ্রিকা এবং পারস্যে ধর্ম প্রচার করেন। রোমান ক্যাথলিক গীর্জায় মথির স্মরণ দিবস ২১ সেপ্টেম্বর এবং প্রাচ্যের অথোর্ডক্স গীর্জায় ১৬ নভেম্বর (প্রাগুক্ত, Encyclopaedia, vol. 13, Page 312)।
(৮)-ফিলিপ (Philip): জেরুসালেমে শীর্ষ খৃস্টান গীর্জায় বাস্তব কার্যাবলী সম্পাদনে সহায়তা করার জন্য তাঁহাকে সাতজন উপ-পুরোহিতের তালিকাভুক্ত করা হয়। ঐতিহ্য অনুসারে তিনি জাদিয়া ও সামিরায় দাওয়াতী কাজ করিয়াছিলেন। পরবর্তীতে তিনি তুরস্কের ট্রার্লস গীর্জার বিশপ ছিলেন। পশ্চিমা দেশগুলিতে ফিলিপের স্মরণ দিবস ৬ জুন এবং প্রাচ্যের দেশগুলিতে ১১ অক্টোবর (প্রাগুক্ত, Encyclopaedia, vol. 15, Page 371) ।
(৯) থমাস (Thomas): তিনি ১২ জনের অন্যতম। তাঁহাকে প্রায়ই John- এর বেদবাক্যতে উল্লেখ করা হয়। উৎপীড়নের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও থমাস ধর্মদূতদেরকে ঈসার সাথে Judea-তে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করিয়াছিলেন। ঐতিহ্য অনুযায়ী থমাস পার্থিয়া ও ভারতে ধর্ম প্রচার করেন। তাঁহাকে ভারতে শহীদ করা হয়। রোমান Catholic Church অনুযায়ী তাঁহার স্মরণীয় দিন ৩ জুলাই এবং প্রাচ্যের গীর্জা অনুযায়ী ২১ মার্চের প্রথম রবিবার (প্রাগুক্ত, Encyclopaedia, vol. 18, Page 729)।
(১০) যিহুদা (Judas) : ৩০ খৃস্টাব্দে তাহার মৃত্যু হয়। প্রথম যুগে তিনি ঈসা (আ)-এর বিরোধিতার কারণে কুখ্যাত ছিলেন। Judas নামটি সম্ভবত লেটিন Sicarius হইতে আসিয়াছে যাহার অর্থ হত্যাকারী। তাহার পরিবার সন্ত্রাসী ইয়াহুদীদের অন্তর্ভুক্ত। সর্বদাই তিনি ছিলেন ১২ জন হাওয়ারীর অন্যতম। তিনি কোষাধ্যক্ষ ছিলেন (প্রাগুক্ত, Britannica, vol. 6, Page 639) 1
(১১) পিটার (Peter): যীশুর ১২জন শিষ্যের মধ্যে পিটার ছিলেন শীর্ষস্থানীয়। তিনি জেরুসালেমের খৃস্টান সম্প্রদায়ের নেতা ছিলেন। তাঁহার প্রকৃত নাম Simon, যীশু তাঁহার নাম রাখেন পিটার। তিনি ফিলিস্তীনের Bethsaida নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। ঐ স্থানটি জর্ডান নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। পিটার গ্যালিলি শহরের নিকটবর্তী শহর কাফার নাউম (Caper naum) চলিয়া যান। সেখানে তিনি মৎস শিকার পেশা গ্রহণ করেন। New testament-এর বর্ণনানুযায়ী পিটার খৃস্টান সম্প্রদায়ের নিকট যীশুর একান্ত বন্ধু এবং অনুসারী হিসাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। খৃস্টানদের ঐতিহ্য অনুসারে পিটার সর্বপ্রথম সিরিয়ায় এবং রোমে বিশপ ছিলেন। সুম্ভবত তিনি রোমে ৬৪ থেকে ৬৮ খৃস্টাব্দের মধ্যে শাহাদত বরণ করেন (প্রাগুক্ত, Encyclopaedia, vol-15)।
(১২) বার্ণাবাস:

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উত্তোলন

📄 হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উত্তোলন


হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উত্তোলন
হযরত ঈসা (আ)-এর চরম কণ্টকাকীর্ণ পরিস্থিতিতে আল্লাহ পাক তাঁহাকে আকাশে উঠাইয়া নেন। হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতের মুকাবিলায় বিভিন্ন প্রতিরোধ গড়িয়া তোলার পরেও যখন সেই দাওয়াতকে ইয়াহুদী সম্প্রদায় স্তব্ধ করিতে পারিল না, তখন হযরত ঈসা (আ)-এর জীবননাশ করিবার জন্যই তাহারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাহারা এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করিবার জন্য ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের পথ অবলম্বন করে। এই লক্ষ্যে সর্বপ্রথম ধর্মীয় আদালতে তাঁহার বিরুদ্ধে ধর্মদ্রোহিতা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার ভূয়া অভিযোগ উত্থাপন করিয়া হত্যাযোগ্য অপরাধী বলিয়া ঘোষণা করা হয়। সেই সময়ে ফিলিস্তীন ও সিরিয়া অঞ্চল রোমান সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাই ইয়াহুদীরা রোমানদেরকে উত্তেজিত করিয়া ঈসা (আ)-এর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরওয়ানা জারী করার। ইয়াহুদীরা যদিও এই পৌত্তলিক বাদশাহর কর্তৃত্বকে নিজেদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক মনে করিত। কিন্তু হযরত ঈসা মসীহ (আ)-এর বিরুদ্ধে তাহাদের অন্তরে হিংসার আগুন এবং শত শত বৎসরের গোলামীর ফলে সৃষ্ট নীচ মানসিকতা তাহাদিগকে এতটা অন্ধ করিয়াছিল যে, পরিণাম চিন্তা করিয়া পিলাতের দরবারে গিয়া উপস্থিত হইল এবং আরয করিল, “হে রাজন! এই ব্যক্তি কেবল আমাদের জন্যই নহে, বরং রাষ্ট্রের জন্যও একটি বিপদ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করিতে যাইতেছে। যদি অবিলম্বে তাহার মূলোচ্ছেদ না করা হয়, তাহা হইলে আমাদের ধর্মও সঠিক অবস্থায় টিকিয়া থাকিতে পারিবে না এবং আপনার হাত হইতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব চলিয়া যাওয়ারও আশংকা রহিয়াছে। কেননা সে আশ্চর্যজনক ভোজবাজি দেখাইয়া লোকদেরকে নিজের অনুসারী বানাইয়া লইতেছে। জনগণের এই সম্মিলিত শক্তির উপর নির্ভর করিয়া সে কাইজার এবং আপনাকে ক্ষমতাচ্যুত করিয়া নিজে বানু ইসরাঈলের রাজা বনিয়া যাওয়ার জন্য ওঁৎ পাতিয়া আছে। এই ব্যক্তি জনগণকে কেবল বস্তুগত দিক হইতেই পথভ্রষ্ট করে নাই, বরং আমাদের ধর্মকেও পরিবর্তন করিয়া দিয়াছে। অতএব যত দ্রুত সম্ভব এই ফিতনার মূলোচ্ছেদ করিতে হইবে।
দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর পিলাত হযরত ঈসা (আ)-কে গ্রেফতার করিয়া অপরাধী হিসাবে দরবারে হাযির করিবার জন্য তাহাদের অনুমতি প্রদান করে। বানু ইসরাঈলের নেতৃবৃন্দ, আলেম ও যাদুকররা এই ফরমান লাভ করিতে পারিয়া যারপরনাই আনন্দিত হয়। তাহারা বলিতে লাগিল, এখন সুযোগের অপেক্ষায় থাকিতে হইবে এবং তাহাকে একাকী ও নিঃসংগ অবস্থায় গ্রেফতার করিতে হইবে যাহাতে জনগণের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হইতে না পারে। যোহন ও মার্ক সুসমাচারে এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত বর্ণনা রহিয়াছে (যোহন, ১১ : ৪৭-৫১)। এমনিভাবে মথি ও লুক সুসমাচারেও উক্ত বিষয়টি বর্ণিত হইয়াছে (মথি, ২৬: ২-৫; লুক, ২২: ১-২)। হযরত ঈসা (আ) ও তাঁহার হাওয়ারীদের মধ্যে সেই সময়ে যে কথোপকথন অনুষ্ঠিত হইয়াছিল তাহা আল-কুরআনেও উক্ত হইয়াছে:
ফَلَمَّا أَحَسٌ عِيسَى مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنْصَارِى إِلَى اللهِ قَالَ الحَوَارِيُّوْنَ نَحْنُ أَنْصَارُ اللَّهِ اُمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ .
"যখন ঈসা তাহাদের অবিশ্বাস উপলব্ধি করিল তখন সে বলিল, আল্লাহর পথে কাহারা আমার সাহায্যকারী? শিষ্যগণ বলিল, আমরাই আল্লাহ্ পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহে ঈমান আনিয়াছি। আমরা আত্মসমর্পণকারী, তুমি ইহার সাক্ষী থাক। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি যাহা অবতীর্ণ করিয়াছ তাহাতে আমরা ঈমান আনিয়াছি এবং আমরা এই রাসূলের অনুসরণ করিয়াছি। সুতরাং আমাদিগকে সাক্ষ্য বহনকারীদের তালিকাভুক্ত কর" (৩ঃ ৫২-৫৩)।
মাওলানা সিওহারবী উল্লেখ করেন, হযরত ঈসা (আ) এবং তাঁহার দাওয়াত ও তাবলীগের বিরুদ্ধে ইয়াহুদীদের হঠকারী তৎপরতা সম্পর্কে বর্ণনার মধ্যে নীতিগতভাবে কোন মতবিরোধ নাই। কিন্তু উহার পরের সমস্ত ঘটনার বিবরণে কুরআন ও বাইবেল সম্পূর্ণরূপে দুই স্বতন্ত্র পথে অগ্রসর হইয়াছে। অবশ্য ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের বর্ণনা একই ধারায় প্রবাহিত হইয়াছে। শুধু পার্থক্য এতটুকু যে, ইয়াহুদীরা এই ঘটনাকে নিজেদের কীর্তি এবং গৌরবের কারণ মনে করে। আর খৃস্টানরা উহাকে ইয়াহুদীদের একটি ঘৃণ্য ও অভিসম্পাতযোগ্য তৎপরতা বলিয়া বিশ্বাস করিয়া থাকে (সিওহারবী, প্রাগুক্ত)।
ইয়াহুদী-খৃস্টান উভয়ের অভিন্ন বর্ণনা এই যে, ইয়াহুদী নেতৃবৃন্দ ও গণৎকাররা জানিতে পারিল যে, এখন যীশুখৃস্ট লোকদের ভীড় হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া নিজের সঙ্গিগণকে লইয়া একটি নির্জন বদ্ধ ঘরে অবস্থান করিতেছেন। আর উহাই উপযুক্ত সময়। অনতিবিলম্বে ইয়াহুদীরা আস্তানায় পৌঁছিয়া গেল। তাহারা চতুর্দিক হইতে ঘরটি অবরোধ করিল। ইহার পর কুরআন ও বাইবেলের বর্ণনার সাথে বৈপরীত্য দেখা দেয়। আল-কুরআনের ভাষ্যমতে তখন হযরত ঈসা (আ)-কে আল্লাহ পাক আকাশে উঠাইয়া নেন। বাইবেলের বর্ণনামতে ইয়াহুদীরা যীশুকে গ্রেফতার করিল এবং অপমান ও তিরস্কার করিতে করিতে রোমান শাসক পিলাতের দরবারে নিয়া হাযির করিল, যাহাতে সে তাহাকে শূলিতে চড়াইতে পারে। পিলাত যদিও তাহাকে নিরপরাধী মনে করিয়া ছাড়িয়া দিতে চাহিয়াছিল, কিন্তু ইয়াহুদীগের উত্তেজনা ও চাপের মুখে তাহাকে সেনাবাহিনীর লোকদের হাতে সোপর্দ করিতে বাধ্য হইল। সিপাহীরা তাহাকে কণ্টকের টুপি পরিধান করাইল, মুখে থুথু নিক্ষেপ করিল, বেত্রাঘাত করিল এবং যাবতীয় উপায়ে তিরস্কার ও অপমান করিল। অতঃপর অপরাধীদের মত শূলীতে লটকাইয়া দিল, উভয় হাতে পেরেক মারিয়া দিল, বর্শার তীক্ষ্ণাগ্র বুকের মধ্যে বিদ্ধ করিল। এই নিরূপায় অবস্থায় তিনি এই বলিতে বলিতে জীবন দিলেন: "এলী এলী লামা সাবাক্তানী" "(ঈশ্বর আমার, ঈশ্বর আমার: তুমি কেন আমায় পরিত্যাগ করিয়াছ)" (মথি, ২৭ঃ ৪৬)। এইরূপ বর্ণনা মার্ক সুসমাচারেও পেশ করা হইয়াছে (মার্ক, ১৫: ৩৪)।
মাওলানা সিওহারবী বলেন, কম বেশী সামান্য পার্থক্য সহকারে নূতন নিয়মের অবশিষ্ট তিনটি গ্রন্থেও (মার্ক, লুক, যোহন) এই কল্পিত কাহিনী একইভাবেই বর্ণিত হইয়াছে। নূতন নিয়মের চারটি বাইবেলের সম্মিলিতভাবে বর্ণিত এই কল্পিত কাহিনী অধ্যয়ন করার পর তাহা মানসপটে স্বাভাবিকভাবেই এই চিত্র অংকন করে যে, চরম অসহায় অবস্থায় এবং নির্মম পন্থায় হযরত ঈসা (আ)-এর মৃত্যু হইয়াছে। যদিও ইহা আল্লাহ্র প্রিয় এবং পবিত্র বান্দাদের ক্ষেত্রে কোনও আশ্চর্যজনক ব্যাপার ছিল না, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বান্দাদের জন্য অধিকাংশ সময় এই প্রকারের কঠিন পরীক্ষা হইয়া থাকে। কিন্তু ঘটনার আর একটি দিক বাইবেলের বর্ণনাকে দিবালোকের মত কল্পিত এবং মনগড়া বলিয়া প্রমাণ করিয়াছে। তাহা এই যে, হযরত ঈসা (আ) সম্পর্কে যে হতাশা ও অভিযোগের চিত্র ফুটিয়া উঠে তাহা তাঁহার মহান ব্যক্তিত্বের পক্ষে শোভনীয় হইতে পারে না। উপরন্তু ঘটনার আরেকটি দিকও কম আশ্চর্যজনক নহে। তাহা এই যে, নূতন নিয়মের বর্ণনা অনুযারী এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পূর্বে হযরত ঈসা (আ) আল্লাহ তা'আলার কাছে আবেদন করেন, "হে পিত! যদি সম্ভব হয় তাহা হইলে এই (মৃত্যুর) পিয়ালা আমা হইতে সরাইয়া দেওয়া হউক। যখন এই দোআ কোনক্রমেই কবুল হইল না, তখন নিরাশ হইয়া তিনি বলিতে লাগিলেন, যদি উহা পান করা ছাড়া কোন গত্যন্তর না থাকে তাহা হইলে তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হউক" (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃষ্ঠা ৯৩)।
আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে, "প্রায়শ্চিত্ত” করার আকীদা অনুযায়ী যখন হযরত ঈসা (আ)-এর এই ঘটনা আল্লাহ এবং তাঁহার পুত্রের (নাউযুবিল্লাহ) মধ্যে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত ছিল, তখন তাঁহার কাছে আবার নিবেদন করার কি অর্থ হইতে পারে? যদি তাহা সাধারণ প্রকৃতির উপাদানগত কারণে হইয়া থাকে তবে আল্লাহ্র ইচ্ছা সম্পর্কে অবগত হওয়ার পর এবং তাহাতে তুষ্ট হওয়ার পরও অধৈর্য ও হতাশ লোকের মত জীবন দেওয়ারই বা কী কারণ থাকিতে পারে (প্রাগুক্ত)?
খৃস্টানরা যেহেতু ইয়াহুদীদের এই মনগড়া উপাখ্যান গ্রহণ করিয়া লইয়াছে, তাই ইয়াহুদীরা যারপরনাই খুশি হইয়া বলে, যীশুখৃস্ট যদি "প্রতিশ্রুত মসীহ” হইতেন, তাহা হইলে আল্লাহ তাহাকে অসহায় অবস্থায় আমাদের হাতে তুলিয়া দিতেন না। মোটকথা, খৃস্টানদের হাতে যখন এই মনগড়া অভিযোগের কোন জবাব ছিল না এবং কাহিনীর এই বর্ণনা মানিয়া নেওয়ার পর "প্রায়শ্চিত" করার আকীদারও কোন মূল্য অবশিষ্ট থাকিল না, তখন তাহারা আরও একটি অংশ যুক্ত করিয়া দিল। যাহাতে ঈসা (আ)-এর মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হওয়া এবং আকাশে উত্তোলিত হওয়ার বর্ণনা রহিয়াছে (দ্র. যোহন, ২০: ১২-২২)।
"সপ্তাহের প্রথম দিন প্রত্যূষে অন্ধকার থাকিতে থাকিতে মন্দলীনী মরিয়ম কবরের নিকটে যান, আর দেখেন, কবর হইতে পাথরখানা সরান হইয়াছে। তখন তিনি দৌঁড়িয়া শিমোন পিতরের নিকট এবং যীশু যাঁহাকে ভালবাসিতেন, সেই অন্য শিষ্যের নিকটে আসিলেন, আর তাঁহাদিগকে বলিলেন, লোকে প্রভুকে কবর হইতে তুলিয়া লইয়া গিয়াছে। তাঁহাকে কোথায় রাখিয়াছে আমরা জানি না'। অতএব পিতর ও সেই অন্য শিষ্য বাহির হইয়া কবরের নিকট যাইতে লাগিলেন। তাঁহারা দুইজন একসঙ্গে দৌঁড়িলেন, আর সেই অন্য শিষ্য পিতরকে পশ্চাৎ ফেলিয়া অগ্রে কবরের নিকট উপস্থিত হইলেন এবং হেঁট হইয়া ভিতরে চাহিয়া দেখিলেন, কাপড়গুলি পড়িয়া রহিয়াছে, তথাপি ভিতরে প্রবেশ করিলেন না। শিমোন পিতরও তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ আসিলেন, আর তিনি কবরে প্রবেশ করিলেন এবং দেখিলেন, কাপড়গুলি পড়িয়া রহিয়াছে, আর যে রুমালখানি তাঁহার মস্তকের উপরে ছিল তাহা সেই কাপড়ের সহিত নাই, স্বতন্ত্র এক স্থানে গুটাইয়া রাখা হইয়াছে। পরে সেই অন্য শিষ্য, যিনি কবরের নিকটে প্রথমে আসিয়াছিলেন তিনিও ভিতরে প্রবেশ করিলেন এবং দেখিলেন ও বিশ্বাস করিলেন"।
প্রতিটি ব্যক্তি সামান্য চিন্তা-ভাবনা করিলেই সহজে বুঝিতে পারিবে যে, এই বর্ণনা পূর্ববর্তী বর্ণনার সহিত অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং একেবারেই সম্পর্কহীন। কেননা বর্ণনার প্রথমাংশ এমন এক ব্যক্তির অভিব্যক্তি যাহাকে অসহায়, নিরুপায় ও হতাশ এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী হিসাবে দেখা যাইতেছে। আর দ্বিতীয় অংশের বর্ণনায় এমন এক মহান ব্যক্তির সমুজ্জল চেহারা তুলিয়া ধরা হইয়াছে যাহা আল্লাহ্ প্রদত্ত গুণাবলী মণ্ডিত, মহামহিম প্রভুর নৈকট্য লাভকারী এবং আগত ঘটনাবলী সম্পর্কে সম্পূর্ণ শান্ত ও আশ্বস্ত (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃষ্ট, ৯৬)।
উল্লেখ্য যে, উপরিউক্ত বর্ণনার দ্বারা বুঝা যায় যে, খৃস্টানদের মতে হযরত ঈসা (আ)-কে ইয়াহুদীরা গ্রেপ্তার করে এবং শূলে চড়াইয়া হত্যা করে। আর ঈসা (আ) শত্রুর কবল হইতে মুক্ত না হইতে পারিয়া নিরাশ হইয়া প্রাণত্যাগ করেন। কিন্তু একই সূত্রের বর্ণায় আরও দেখা যায় যে, তিনি পরবর্তীতে আবার জীবিত হইয়া উঠেন এবং সাথীদেরকে সাক্ষাৎ দেন। এমনকি মার্ক ও লুক সুসমাচারে বলা হইয়াছে যে, তাঁহার সাথীদের সাক্ষাতের পর তিনি স্বর্গারোহণ করেন। যেমন: মার্ক সুসমাচারে বর্ণিত হইয়াছে, “প্রভু যীশু ঊর্ধ্বে স্বর্গে গৃহীত হইলেন এবং ঈশ্বরের দক্ষিণে বসিলেন" (মার্ক, ১৬: ১৯)। লুক সুসমাচারে বর্ণিত হইয়াছে, পরে এইরূপ হইল, তিনি আশীর্ব্বাদ করিতে করিতে তাঁহাদের হইতে পৃথক হইলেন, এবং ঊর্ধ্বে স্বর্গে নীত হইতে লাগিলেন (লুক, ২৪ : ৫১)।
উপরিউক্ত বর্ণনায় দেখা যায় যে, ঈসা (আ)-কে জীবন্ত অবস্থায় ঊর্ধ্বে উঠাইয়া নেওয়া হয়। এই ক্ষেত্রে ইসলামও তাহা সমর্থন করে। তবে তাঁহাকে শূলে চড়াইয়া হত্যা করার পর জীবিত করিয়া উত্তোলনের বিষয়টি ইসলাম সমর্থন করে না। আল-কুরআনে স্পষ্টভাবেই বলা হইয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ)-কে ইয়াহুদীরা শূলে চড়াইতেও পারে নাই এবং হত্যাও করিতে পারে নাই বরং আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে উঠাইয়া লইয়াছেন এবং যাহারা ফাঁসী দেওয়ার দাবি করে, তাহাদের এই দাবিকে আল-কুরআন মিথ্যা ও কল্পনাপ্রসূত বলিয়া আখ্যা দেয়। এই মর্মে বলা হইয়াছে:
وَقَوْلِهِمْ إِنَّا قَتَلْنَا الْمَسِيحَ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ رَسُولَ اللهِ وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَكِنْ شُبِّهَ لَهُمْ وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيْهِ لَفِي شَكٍّ مِنْهُ مَا لَهُمْ بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنَّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينَا بَلْ رَفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ وَكَانَ اللَّهُ عزيزاً حَكِيمًا .
"আর আমরা আল্লাহ্র রাসূল মারয়াম তনয় ঈসা মসীহকে হত্যা করিয়াছি, তাহাদের এই উক্তির জন্য (তাহারা অভিশপ্ত)। অথচ তাহারা তাহাকে হত্যা করে নাই, ক্রুশবিদ্ধও করে নাই, কিন্তু তাহাদের এইরূপ বিভ্রম হইয়াছিল। যাহারা তাহার সম্বন্ধে মতভেদ করিয়াছিল, তাহারা নিশ্চয় এই সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল; এই সম্পর্কে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাহাদের কোন জ্ঞানই ছিল না। ইহা নিশ্চিত যে, তাহারা তাহাকে হত্যা করে নাই, শূলেও চড়ায় নাই, বরং আল্লাহ তাহাকে তাঁহার নিকট তুলিয়া লইয়াছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময়” (৪ : ১৫৭-১৫৮)।
আল-কুরআনের বর্ণনামতে বানু ইসরাঈল আল্লাহ্র রাসূল হযরত ঈসা (আ)-এর বিরুদ্ধে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। কিন্তু মহান আল্লাহর অমোঘ বিধান ছিল এই যে, কোন বিরোধী শক্তিই হযরত ঈসা (আ)-এর নাগাল পাইবে না এবং তিনি তাঁহাকে শত্রুদের যে কোন ষড়যন্ত্র হইতে নিরাপদ রাখিবেন। ফল হইল এই যে, বানু ইসরাঈল যখন তাঁহাকে অবরোধ করিল তখন তাহারা আল্লাহ্র রাসূল হযরত ঈসা (আ)-কে ধরিতে পারিল না এবং পূর্ণ নিরাপত্তা সহকারে তাঁহাকে আসমানে উঠাইয়া লওয়া হইল। অতঃপর বানু ইসরাঈলরা যখন ঘরের ভিতরে প্রবেশ করিল তখন পরিস্থিতি তাহাদের কাছে সন্দেহজনক হইয়া দাঁড়াইল। তাহারা নিজেদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করিতে চরমভাবে ব্যর্থ হইল। আর আল্লাহ তা'আলা এইভাবে নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিলেন, যা হযরত ঈসা (আ)-কে রক্ষার জন্য করিয়াছিলেন।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই যে, হযরত ঈসা (আ) যখন অনুভব করিলেন, বানু ইসরাঈলের শত্রুতার মাত্রা এতটা বেশি হইয়া গিয়াছে যে, তাহারা তাঁহাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়াছে, তখন তিনি বিশেষভাবে একটি ঘরে নিজের হাওয়ারীগণকে একত্র করিলেন এবং তাহাদের সামনে পরিস্থিতির চিত্র তুলিয়া ধরিয়া বলিলেন, পরীক্ষার কঠিন মুহূর্ত সমাগত। সময় আসিয়া গিয়াছে, সত্যকে বিলীন করিয়া দেওয়ার ষড়যন্ত্র পূর্ণ শক্তি লাভ করিয়াছে। এখন আমি তোমাদের মধ্যে আর বেশীক্ষণ থাকিব না। এইজন্য আমার পরে সত্য দীনের উপর অবিচল থাকা ও তাহার প্রচার-প্রসার ও সাহায্য-সহযোগিতার ব্যাপারটি কেবল তোমাদের সাথে সংশ্লিষ্ট হইতে যাইতেছে। অতএব আমাকে বল, কে কে আল্লাহ্র রাস্তায় সত্যিকার সাহায্যকারী হইত প্রস্তুত আছ? হাওয়ারীগণ এই আহবান শোনার পর বলিলেন, আমরা সবাই আল্লাহ্ দীনের সাহায্যকারী, আমরা সত্যিকারভাবে মনে-প্রাণে আল্লাহর উপর ঈমান আনিয়াছি এবং আমাদের ঈমানের সত্যতার পক্ষে আপনাকে সাক্ষী রাখিলাম। তাঁহারা এই কথা বলিবার পর মানবিক দুর্বলতার দিকে লক্ষ্য রখিয়া নিজেদের দাবির উপরই বক্তব্য শেষ করেন নাই, বরং আল্লাহ্র দরবারে হাত তুলিয়া মুনাজাত করিলেন, হে আল্লাহ! আমরা যাহা কিছু বলিলাম তাহার উপর অবিচল থাকার শক্তি দান কর এবং আমাদেরকে তোমার দীনের সাহায্যকারীদের তালিকাভুক্ত করিয়া নাও।
এইদিক হইতে হযরত ঈসা (আ) নিশ্চিত হইয়া নিজের দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করার সাথে সাথে অপেক্ষা করিতে থাকিলেন যে, দেখা যাক আল্লাহ্ দীনের শত্রুদের তৎপরতা কোন দিকে মোড় নেয় এবং আল্লাহ্ কি ফয়সালা প্রকাশ পায়? এই প্রসংগে আল্লাহ তা'আলা কুরআন মজীদের মাধ্যমে ইয়াহুদী-খৃস্টানদের ভ্রান্ত ধারণার বিপরীতে "নির্ভুল জ্ঞানের আলো" দান করিয়া বলিলেন যে, শত্রুরা যখন নিজেদের গোপন ষড়যন্ত্রে তৎপর ছিল, সেই সময় আমরাও আমাদের পরিপূর্ণ কুদরতের অদৃশ্য পরিকল্পনার সাহায্যে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিলাম যে, হযরত ঈসা (আ)-এর বিরুদ্ধে শত্রুদের কোন ষড়যন্ত্রই সফল হইতে দেওয়া হইবে না, আর নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলার পরিপূর্ণ কুদরতে গোপন কার্যক্রমের মুকাবিলায় কাহারও পরিকল্পনা সফল হইতে পারে না। কেননা তাঁহার পরিকল্পনার তুলনায় উত্তম কাহারও পরিকল্পনা হইতে পারে না। বলা হইয়াছে:
وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ .
"আর তাহারা (ইয়াহূদীরা ঈসার বিরুদ্ধে) গোপন ষড়যন্ত্র করিল। আল্লাহও (ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে) গোপন ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করিলেন। আর আল্লাহ সর্বোৎকৃষ্ট গোপন ব্যবস্থাপনার অধিকারী” (৩ঃ ৫৪; আল্লামা সিওহারবী, ৪খ, page ৯৭-৯৮)।
আল্লামা মাজেদী উল্লেখ করেন যে, "আরবী মকর শব্দটি আবশ্যিকভাবে কোন দোষ বলে করে না। মকর শব্দটি প্রয়োগজনিত কারণে নিন্দনীয় ও প্রশংসনীয় উভয় অর্থে ব্যবহৃত হইতে পারে। মূল অর্থ, গোপন পরিকল্পনা, গভীর চক্রান্ত, ইংরেজী প্লান (Plan) বলিতে যাহা বুঝায় আরবী উর্দু 'তদবীর' বলিতে তাহাই বুঝায়" (তাফসীরে মাজেদী, ২খ, পৃষ্ঠা ৮৩০)।
সর্বশেষে সেই সময় আসিয়া উপস্থিত হইল যখন বানু ইসরাঈলের নেতৃবৃন্দ, মহাযাজক এবং ধর্মবেত্তাগণ হযরত ঈসা (আ)-কে একটি বদ্ধ ঘরের মধ্যে অবরোধ করিল। হযরত ঈসা (আ) এবং হাওয়ারীগণ ঘরের মধ্যে অবরুদ্ধ হইয়া পড়িলেন আর শত্রুরা চারিদিক হইতে বেষ্টনী রচনা করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিল, এমন কি পন্থা হইতে পারে যাহার ফলে শত্রুদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইবে এবং তাহারা হযরত ঈসা (আ)-এর কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না? আর কিভাবে আল্লাহ তা'আলার হেফাজতের ওয়াদা পূর্ণ হইতে পারে?
এই সম্পর্কে কুরআন মজীদের বক্তব্য এই যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা পূর্ণ হইয়াছে এবং তাঁহার পরিপক্ক ব্যবস্থাপনা হযরত ঈসা (আ)-কে দুশমনদের হাত হইতে সর্বপ্রকারে নিরাপদ রাখিয়াছে। এই নাযুক মুহূর্তে তাঁহার নিকট ওহী আসিল এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সুসংবাদ দিলেনঃ ঈসা! ভীত হইও না, তোমাকে পূর্ণরূপে সাহায্য করা হইবে (অর্থাৎ শত্রুরা তোমাকে হত্যা করিতে পারিবে না এবং তুমিও এখন মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িবে না)। আমি তোমাকে আমার নিকটে (উর্ধ্ব জগতে) তুলিয়া লইয়া আসিব এবং কাফিরদের যে কোন ষড়যন্ত্র হইতে তোমাকে রক্ষা করিব। এই ওয়াদা প্রসঙ্গে আল-কুরআনে বর্ণিত হইয়াছে:
إِذْ قَالَ اللَّهُ يُعِيسَى إِنِّي مُتَوَفِّيْكَ وَرَافِعُكَ إِلَى وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِيْنَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ثُمَّ إِلَى مَرْجِعُكُمْ فَاحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيْمَا كُنْتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ .
"স্মরণ কর যখন আল্লাহ বলিলেন, হে ঈসা! আমি তোমার কাল পূর্ণ করিতেছি এবং আমার নিকট তোমাকে তুলিয়া লইতেছি এবং যাহারা সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছে তাহাদের মধ্য হইতে তোমাকে মুক্ত করিতেছি। আর তোমার অনুসারিগণকে কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপর প্রাধান্য দিতেছি, অতঃপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতান্তর ঘটিতেছে আমি উহা মীমাংসা করিয়া দিব" (৩ঃ ৫৫)।
উল্লেখ্য যে, হাসান বসরী, কালবী ও ইবন জুরায়জ (র) বলিয়াছেন: আয়াতের মর্ম হইল, আমি তোমাকে মৃত্যু ছাড়াই গ্রহণ করিব এবং দুনিয়া হইতে আমার কাছে তুলিয়া লইব। বাগাবী (র) বলেন, ইহার দুইটি ব্যাখ্যা হইতে পারে: (১) আমি তোমাকে পুরোপুরি ভাবে আমার কাছে উঠাইয়া লইব। তাহারা তোমার কোন ক্ষতি সাধন করিতে পারিবে না। বলা হইয়া থাকে। توفیت کذا অর্থাৎ استوفیته মানে পরিপূর্ণভাবে উসূল করিয়াছি। (২) আমি তোমাকে স্বীয় আশ্রয়াধীন করিব। বলা হইয়া থাকে, توفیت منه كذا মানে تسلمته অর্থাৎ আমি তাহাকে স্বয়ং গ্রহণ করিয়াছি।
ইবন জারীর (র) ইব্‌ন আনাস হইতে বর্ণনা করেন التوفى দ্বারা নিদ্রা বুঝান হইয়াছে। ঈসা (আ)-কে যখন আসমানে তুলিয়া নেওয়া হয় তখন তিনি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। তখন আয়াতের অর্থ হইবে, আমি তোমাকে নিদ্রিত করিব, ইহার পর আমার কাছে তুলিয়া নিব। যেমন, আল্লাহ বলেন : وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّكُمْ بِاللَّيْلِ "তিনিই রাত্রে তোমাদের (নিদ্রারূপ) মৃত্যু ঘটান" (৬ঃ ৬০)।
কেহ কেহ বলেন, التوفى অর্থ মৃত্যু। আলী ইবন আবূ তালহা, ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন, আয়াতের অর্থ: আমি তোমার মৃত্যু ঘটাইব। ইহার ব্যাখ্যায় দাহ্হাক বলিয়াছেন, ইহার অর্থ, আমি তোমার মৃত্যু ঘটাইব এবং তাহা আকাশ হইতে দুনিয়ায় পুনরাগমনের পর। তখন আমি তোমাকে ইয়াহুদীদের হাত হইতে রক্ষা করিব এবং তোমার নির্দিষ্ট আয়ু পূর্ণ করিব। انی مُتَوَفِّيْكَ وَرَافِعُكَ -এর সংযোজক অব্যয় 'ওয়াও' শুধু সংযোগ সাধনের জন্যই, ধারাবহিকতা বুঝাইবার জন্য নহে। কিন্তু সূরা মাইদার আয়াতটি সামনে রাখিলে এই ব্যাখ্যা টিকে না।
সেখানে ঈসা (আ) বলিয়াছেন : فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ "যখন তুমি আমাকে তুলিয়া নিলে, তখন তুমিই তো ছিলে তাহাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক”। উহার দ্বারা বুঝা যায়, তাঁহার কওম তাঁহার توفی এর পরেই তাহারা নাসারা হইয়াছিল। সুতরাং توفی -এর অর্থ আকাশে উত্তোলন কিংবা ইহার আগে তাঁহার মৃত্যুবরণ (তাফসীরে মাযহারী, ২খ, page ৩০০-৩০৪)।
আল্লামা কাযী মুহাম্মাদ ছানাউল্লাহ পানীপথী (র) বলেন, আমার মতে التوفى অর্থ মৃত্যু ছাড়াই আকাশে উত্তোলন। একটু চিন্তা করিলেই একথা বুঝা যায়। কেননা এক আয়াতে বলা হইয়াছে, وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ "তাহারা তাহাকে হত্যাও করে নাই, শূলেও চড়ায় নাই"। যদি মৃত্যুই হইবে তাহা হইলে তাঁহাকে হত্যা করে নাই বলিবার সার্থকতা কি, যখন হত্যার উদ্দেশ্য মৃত্যুই হইয়া থাকে (প্রাগুক্ত, page ৩০৪)?
মোটকথা, আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আ)-কে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন যে, তাঁহাকে শত্রুদের হাত হইতে পবিত্র রাখিবেন এবং তাহাদের কবল হইবে উদ্ধার করিবেন। তাই তিনি হযরত ঈসা (আ)-কে জীবিত অবস্থায়ই উদ্ধার করিয়াছিলেন এবং তাঁহাকে শত্রুদের ধরা-ছোঁয়ার বাহিরে রখিয়াই ফেরেশতাগণের মাধ্যমে জীবন্ত অবস্থায় সশরীরে আসমানে উঠাইয়া লইয়াছিলেন। শত্রুদের কবল হইতে রক্ষা পাওয়ার বিষয়টি হযরত ঈসা (আ)-এর প্রতি এক বিশেষ নেয়ামত ছিল। এই মর্মে আল-কুরআনে আরও বলা হইয়াছে:
وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ إِذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هُذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ .
"আমি তোমা হইতে বানু ইসরাঈলকে নিবৃত্ত রাখিয়াছিলাম, তুমি যখন তাহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আনিয়াছিলে তখন তাহাদের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছিল তাহারা বলিয়াছিল, ইহা তো স্পষ্ট যাদু” (৫: ১১০)।
হযরত ঈসা (আ)-কে এই বলিয়া সান্ত্বনা দেওয়া হইল যে, এই দুর্ভেদ্য অবরোধ সত্ত্বেও শত্রুরা তোমাকে হত্যা করিতে পারিবে না এবং অদৃশ্য হাত তোমাকে ঊর্ধ্ব জগতে তুলিয়া নিয়া আসিবে, এমনিভাবে দুশমনের নাপাক হাতের স্পর্শ হইতে তোমাকে নিরাপদ রাখা হইবে (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ১০০)।
কুরআন মজীদ ইয়াহুদী-খৃস্টানদের মনগড়া কল্পকাহিনীর বিরুদ্ধে মসীহ ইবন মারয়াম (আ) সম্পর্কে এই বর্ণনা প্রদান করিয়াছে। এখন দুইটি বর্ণনাই আমাদের সামনে রহিয়াছে এবং ন্যায়-ইনসাফের নিক্তিও আমাদের হাতে রহিয়াছে। প্রথমে হযরত মসীহ্ (আ)-এর ব্যক্তিত্ব এবং তাঁহার দাওয়াত ও আন্দোলনের মিশনকে ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে উপলব্ধি করা দরকার। অতঃপর যে বিস্তারিত বর্ণনা একজন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ নবী, আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী রসূল এবং খৃস্টানদের ভ্রান্ত বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহর পুত্রকে তাহার ফয়সালার সামনে হতাশ, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, অসহায় এবং আল্লাহ্র নিকট অভিযোগকারী হিসাবে তুলিয়া ধরে তাঁহার উপর আরেকবার দৃষ্টিপাত করা হউক। সাথে সাথে এই বর্ণনার মধ্যে যে বৈপরীত্য রহিয়াছে সে সম্পর্কেও চিন্তা করা হউক। একদিকে বলা হইতেছে, হযরত মসীহ্ (আ) আল্লাহর পুত্র হইয়া এই উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে আসিয়াছিলেন যে, তিনি শূলাবিদ্ধ হইয়া দুনিয়ার সকল পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবেন (ইহাই হইতেছে, প্রায়শ্চিত্তের আকীদার একমাত্র ভিত্তি), অপরদিকে ক্রুশ এবং হত্যার কল্পিত কাহিনী এই ভিত্তির উপর দাঁড়ানো হইয়াছে যে, সেই নির্দিষ্ট সময় যখন আসিয়া গেল তখন আল্লাহ্ এই কল্পিত পুত্রকে নিজের মাহাত্ম্য এবং পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্বকে একেবারে ভুলিয়া গিয়া "প্রভো আমার, প্রভো আমার, কেন আমায় পরিত্যাগ করিলে' এই ধরনের হতাশাজনক বাক্য মুখ দিয়া বাহির করিতে এবং আল্লাহর ইচ্ছার উপর নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করিতে দেখা যায়। কোন ব্যক্তির এই প্রশ্ন উত্থাপন করার কি অধিকার নাই যে, খ্রীষ্টানদের বিবৃত কাহিনীর উভয় অংশ যদি সঠিক এবং নির্ভুল হইয়া থাকে তাহা হইলে এই বৈপরীত্য কেন এবং এই অসামঞ্জস্যতারই বা অর্থ কি (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ১০১)?
অতএব যদি কোন বাস্তববাদী এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি এই সমস্ত দিক সামনে রাখিয়া এবং ঘটনা ও পরিস্থিতির এই সার্বিক দিককে পরস্পর সংযুক্ত করিয়া বিষয়টি অধ্যয়ন করে তবে সে 'সত্যকে মানিয়া নেওয়ার তাগিদে নিঃসংকোচে এই সিদ্ধান্তে পৌছিবে যে, বাইবেলের এই কাহিনী পরস্পর বিরোধী এবং মনগড়া। আর কুরআন মজীদ ঐ প্রসংগে যে সিদ্ধান্ত দিয়াছে তাহাই সত্য।
ইতিহাস সাক্ষী যে, হযরত মসীহ (আ)-এর পর হইতে সেন্ট পলের পূর্ব পর্যন্ত খৃস্টান জগত ইয়াহুদীদের এই মনগড়া কাহিনীর সাথে সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেন্ট পল যখন "ত্রিত্ববাদ ও প্রায়শ্চিত্তের” ধারণার উপর আধুনিক খৃস্টবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন তখন প্রায়শ্চিত্তের ধারণাকে সুদৃঢ় করার জন্য ইয়াহুদীদের এই মনগড়া উপাখ্যানকেও ধর্মের অংশে পরিণত করিয়া নেওয়া হয়।
কুরআন মজীদ চৌদ্দ শত বৎসর ধরিয়া হযরত ঈসা (আ)-এর মহান মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমার কথা ঘোষণা করিয়া তাঁহার ঊর্ধ্ব জগতে উত্তোলিত হওয়ার রহস্যকে ইয়াহুদী-খৃস্টানদের মনগড়া কাহিনীর বিপরীতে নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ১০২)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে ইয়াহুদী খৃস্টানদের ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন

📄 হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে ইয়াহুদী খৃস্টানদের ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন


ইয়াহুদী ও ত্রিত্ববাদী খৃস্টানদের মতে, হযরত ঈসা (আ)-কে শূলে বিদ্ধ করা হয়। তবে পার্থক্য হইল, ইয়াহুদীদের মতে, বনী ইসরাঈলকে বিভ্রান্ত করার ও ইয়াহুদী ধর্ম ত্যাগ করার কারণে তাঁহাকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়। আর ত্রিত্ববাদী খৃস্টানদের মতে মানবতাকে পাপের অপরাধ হইতে মুক্ত করার জন্য প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ তিনি নিজেই তাঁহার বিরোধী শিবিরের হাতে ধরা দেন এবং নিজেই ক্রুশে বিদ্ধ হইয়া দেহত্যাগ করেন।

অপরদিকে একত্ববাদী খৃস্টান এবং মুসলমানদের দৃষ্টিতে হযরত ঈসা (আ)-কে শূলে চড়াইয়া হত্যা করা হয় নাই। আল্লাহ পাক স্বীয় কুদরতে ঈসা (আ)-কে শত্রুদের কবল হইতে মুক্ত করিয়া আকাশে উঠাইয়া নেন। উলামায়ে কেরাম এই বক্তব্যের সমর্থনে ইয়াহুদী খৃস্টানদের ধারণা খণ্ডনের নিমিত্ত বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করিয়াছেন:

প্রথমত, খৃস্টানরা যে মৌখিক বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিয়াছে, তাহা কতটুকু যথার্থ উহা সম্পর্কে সংশয় রহিয়াছে।

দ্বিতীয়ত, তাহারা যাহাকে শূলে চড়াইয়া হত্যা করিয়াছিল, তাহার সম্পর্কে সংশয়ে ছিল। ঐ শূলে বিদ্ধ ব্যক্তিটিই যে ঈসা এই ধরনের দৃঢ় বিশ্বাস লইয়া উক্ত ব্যক্তিটিকে হত্যা করিতে পারে নাই। তাহাদের মাঝে মতানৈক্য ছিল, কারণ ঈসা (আ)-কে গ্রেপ্তার করিবার জন্য তাঁহার অবস্থান স্থলের কামরাটিতে তাহারা যাহাকে পাঠাইয়াছিল পরবর্তীতে তাহাকে তাহারা খুঁজিয়া পায় নাই (প্রাগুক্ত, ৬খ, পৃ. ১১)।

ইবন জারীর তাবারী এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ করেন। সুদ্দীর এক বর্ণনায় দেখা যায়, আল্লাহ তা'আলা এই ক্ষেত্রে যে কৌশল অবলম্বন করিয়াছিলেন তাহা এই যে, হযরত ঈসা-এর অনুসারীদের একজনকে হযরত ঈসার আকৃতি দান করেন, যাহাকে তাহারা হযরত ঈসা বলিয়া ধারণা করিয়া হত্যা করিয়াছিল। অথচ ইহার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উঠাইয়া নিয়াছেন।

সুদ্দী হইতে অপর এক বর্ণনায় ইন জারীর তাবারী উল্লেখ করেন, ইসরাঈলীরা হযরত ঈসা (আ)-কে ও তাঁহার সঙ্গী উনিশজন হাওয়ারীকে একটি ঘরে অবরুদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিল। তিনি সঙ্গীদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিলেন, তোমাদের মধ্যে কে আছ, যে আমার আকৃতি ধারণ করিবে? তারপর তাহাকে হত্যা করা হইবে? আর তাহার জন্য থাকিবে জান্নাত। তাহাদের একজন হযরত ঈসা (আ)-এর আকৃতি গ্রহণ করিতে প্রস্তুত হয় এবং সে রূপান্তরিত হয়। অতঃপর হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উঠাইয়া লওয়া হয়। আর একথাই আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন এই আয়াতে:

وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ .
"আর তাহারা (ইয়াহূদীরা ঈসার বিরুদ্ধে) গোপন ষড়যন্ত্র করিল। আল্লাহও (ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে) গোপন ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন করিলেন। আর আল্লাহ সর্বোৎকৃষ্ট গোপন ব্যবস্থাপনার অধিকারী” (৩ঃ ৫৪; আল্লামা সিওহারবী, ৪খ, পৃ. ৯৭-৯৮)।

আল্লামা মাজেদী উল্লেখ করেন যে, "আরবী মকর শব্দটি আবশ্যিকভাবে কোন দোষ বলে করে না। মকর শব্দটি প্রয়োগজনিত কারণে নিন্দনীয় ও প্রশংসনীয় উভয় অর্থে ব্যবহৃত হইতে পারে। মূল অর্থ, গোপন পরিকল্পনা, গভীর চক্রান্ত, ইংরেজী প্লান (Plan) বলিতে যাহা বুঝায় আরবী উর্দু 'তদবীর' বলিতে তাহাই বুঝায়" (তাফসীরে মাজেদী, ২খ, পৃষ্ঠা ৮৩০)।

সর্বশেষে সেই সময় আসিয়া উপস্থিত হইল যখন বানু ইসরাঈলের নেতৃবৃন্দ, মহাযাজক এবং ধর্মবেত্তাগণ হযরত ঈসা (আ)-কে একটি বদ্ধ ঘরের মধ্যে অবরোধ করিল। হযরত ঈসা (আ) এবং হাওয়ারীগণ ঘরের মধ্যে অবরুদ্ধ হইয়া পড়িলেন আর শত্রুরা চারিদিক হইতে বেষ্টনী রচনা করিয়া দাঁড়াইয়া আছে। এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিল, এমন কি পন্থা হইতে পারে যাহার ফলে শত্রুদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইবে এবং তাহারা হযরত ঈসা (আ)-এর কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না? আর কিভাবে আল্লাহ তা'আলার হেফাজতের ওয়াদা পূর্ণ হইতে পারে?

এই সম্পর্কে কুরআন মজীদের বক্তব্য এই যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলার ওয়াদা পূর্ণ হইয়াছে এবং তাঁহার পরিপক্ক ব্যবস্থাপনা হযরত ঈসা (আ)-কে দুশমনদের হাত হইতে সর্বপ্রকারে নিরাপদ রাখিয়াছে। এই নাযুক মুহূর্তে তাঁহার নিকট ওহী আসিল এবং আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে সুসংবাদ দিলেনঃ ঈসা! ভীত হইও না, তোমাকে পূর্ণরূপে সাহায্য করা হইবে (অর্থাৎ শত্রুরা তোমাকে হত্যা করিতে পারিবে না এবং তুমিও এখন মৃত্যুর কোলে ঢলিয়া পড়িবে না)। আমি তোমাকে আমার নিকটে (উর্ধ্ব জগতে) তুলিয়া লইয়া আসিব এবং কাফিরদের যে কোন ষড়যন্ত্র হইতে তোমাকে রক্ষা করিব। এই ওয়াদা প্রসঙ্গে আল-কুরআনে বর্ণিত হইয়াছে:

إِذْ قَالَ اللَّهُ يعِيْسَى إِنِّي مُتَوَفِّيْكَ وَرَافِعُكَ إِلَى وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِيْنَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِيْنَ كَفَرُوا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ ثُمَّ إِلَى مَرْجِعُكُمْ فَاحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيْمَا كُنْتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ .
"স্মরণ কর যখন আল্লাহ বলিলেন, হে ঈসা! আমি তোমার কাল পূর্ণ করিতেছি এবং আমার নিকট তোমাকে তুলিয়া লইতেছি এবং যাহারা সত্য প্রত্যাখ্যান করিয়াছে তাহাদের মধ্য হইতে তোমাকে মুক্ত করিতেছি। আর তোমার অনুসারিগণকে কিয়ামত পর্যন্ত কাফিরদের উপর প্রাধান্য দিতেছি, অতঃপর আমার কাছে তোমাদের প্রত্যাবর্তন। তারপর যে বিষয়ে তোমাদের মতান্তর ঘটিতেছে আমি উহা মীমাংসা করিয়া দিব" (৩ঃ ৫৫)।

উল্লেখ্য যে, হাসান বসরী, কালবী ও ইবন জুরায়জ (র) বলিয়াছেন: আয়াতের মর্ম হইল, আমি তোমাকে মৃত্যু ছাড়াই গ্রহণ করিব এবং দুনিয়া হইতে আমার কাছে তুলিয়া লইব। বাগাবী (র) বলেন, ইহার দুইটি ব্যাখ্যা হইতে পারে: (১) আমি তোমাকে পুরোপুরি ভাবে আমার কাছে উঠাইয়া লইব। তাহারা তোমার কোন ক্ষতি সাধন করিতে পারিবে না। বলা হইয়া থাকে। توفیت کذا অর্থাৎ استوفیته মানে পরিপূর্ণভাবে উসূল করিয়াছি। (২) আমি তোমাকে স্বীয় আশ্রয়াধীন করিব। বলা হইয়া থাকে, توفیت منه كذا মানে تسلمته অর্থাৎ আমি তাহাকে স্বয়ং গ্রহণ করিয়াছি।

ইবন জারীর (র) ইব্‌ন আনাস হইতে বর্ণনা করেন التوفى দ্বারা নিদ্রা বুঝান হইয়াছে। ঈসা (আ)-কে যখন আসমানে তুলিয়া নেওয়া হয় তখন তিনি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন। তখন আয়াতের অর্থ হইবে, আমি তোমাকে নিদ্রিত করিব, ইহার পর আমার কাছে তুলিয়া নিব। যেমন, আল্লাহ বলেন : وَهُوَ الَّذِي يَتَوَفَّكُمْ بِاللَّيْلِ "তিনিই রাত্রে তোমাদের (নিদ্রারূপ) মৃত্যু ঘটান" (৬ঃ ৬০)।

কেহ কেহ বলেন, التوفى অর্থ মৃত্যু। আলী ইবন আবূ তালহা, ইব্‌ন আব্বাস (রা) হইতে বর্ণনা করেন, আয়াতের অর্থ: আমি তোমার মৃত্যু ঘটাইব। ইহার ব্যাখ্যায় দাহ্হাক বলিয়াছেন, ইহার অর্থ, আমি তোমার মৃত্যু ঘটাইব এবং তাহা আকাশ হইতে দুনিয়ায় পুনরাগমনের পর। তখন আমি তোমাকে ইয়াহুদীদের হাত হইতে রক্ষা করিব এবং তোমার নির্দিষ্ট আয়ু পূর্ণ করিব। انی مُتَوَفِّيْكَ وَرَافِعُكَ -এর সংযোজক অব্যয় 'ওয়াও' শুধু সংযোগ সাধনের জন্যই, ধারাবহিকতা বুঝাইবার জন্য নহে। কিন্তু সূরা মাইদার আয়াতটি সামনে রাখিলে এই ব্যাখ্যা টিকে না।

সেখানে ঈসা (আ) বলিয়াছেন : فَلَمَّا تَوَفَّيْتَنِي كُنْتَ أَنْتَ الرَّقِيبَ عَلَيْهِمْ "যখন তুমি আমাকে তুলিয়া নিলে, তখন তুমিই তো ছিলে তাহাদের কার্যকলাপের তত্ত্বাবধায়ক”। উহার দ্বারা বুঝা যায়, তাঁহার কওম তাঁহার توفی এর পরেই তাহারা নাসারা হইয়াছিল। সুতরাং توفی -এর অর্থ আকাশে উত্তোলন কিংবা ইহার আগে তাঁহার মৃত্যুবরণ (তাফসীরে মাযহারী, ২খ, পৃ. ৩০০-৩০৪)।

আল্লামা কাযী মুহাম্মাদ ছানাউল্লাহ পানীপথী (র) বলেন, আমার মতে التوفى অর্থ মৃত্যু ছাড়াই আকাশে উত্তোলন। একটু চিন্তা করিলেই একথা বুঝা যায়। কেননা এক আয়াতে বলা হইয়াছে, وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ "তাহারা তাহাকে হত্যাও করে নাই, শূলেও চড়ায় নাই"। যদি মৃত্যুই হইবে তাহা হইলে তাঁহাকে হত্যা করে নাই বলিবার সার্থকতা কি, যখন হত্যার উদ্দেশ্য মৃত্যুই হইয়া থাকে (প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০৪)?

মোটকথা, আল্লাহ পাক হযরত ঈসা (আ)-কে প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন যে, তাঁহাকে শত্রুদের হাত হইতে পবিত্র রাখিবেন এবং তাহাদের কবল হইবে উদ্ধার করিবেন। তাই তিনি হযরত ঈসা (আ)-কে জীবিত অবস্থায়ই উদ্ধার করিয়াছিলেন এবং তাঁহাকে শত্রুদের ধরা-ছোঁয়ার বাহিরে রখিয়াই ফেরেশতাগণের মাধ্যমে জীবন্ত অবস্থায় সশরীরে আসমানে উঠাইয়া লইয়াছিলেন। শত্রুদের কবল হইতে রক্ষা পাওয়ার বিষয়টি হযরত ঈসা (আ)-এর প্রতি এক বিশেষ নেয়ামত ছিল। এই মর্মে আল-কুরআনে আরও বলা হইয়াছে:

وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنْكَ إِذْ جِئْتَهُمْ بِالْبَيِّنَتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هُذَا إِلَّا سِحْرٌ مُّبِينٌ .
"আমি তোমা হইতে বানু ইসরাঈলকে নিবৃত্ত রাখিয়াছিলাম, তুমি যখন তাহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শন আনিয়াছিলে তখন তাহাদের মধ্যে যাহারা কুফরী করিয়াছিল তাহারা বলিয়াছিল, ইহা তো স্পষ্ট যাদু" (৫: ১১০)।

হযরত ঈসা (আ)-কে এই বলিয়া সান্ত্বনা দেওয়া হইল যে, এই দুর্ভেদ্য অবরোধ সত্ত্বেও শত্রুরা তোমাকে হত্যা করিতে পারিবে না এবং অদৃশ্য হাত তোমাকে ঊর্ধ্ব জগতে তুলিয়া নিয়া আসিবে, এমনিভাবে দুশমনের নাপাক হাতের স্পর্শ হইতে তোমাকে নিরাপদ রাখা হইবে (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ১০০)।

কুরআন মজীদ ইয়াহুদী-খৃস্টানদের মনগড়া কল্পকাহিনীর বিরুদ্ধে মসীহ ইবন মারয়াম (আ) সম্পর্কে এই বর্ণনা প্রদান করিয়াছে। এখন দুইটি বর্ণনাই আমাদের সামনে রহিয়াছে এবং ন্যায়-ইনসাফের নিক্তিও আমাদের হাতে রহিয়াছে। প্রথমে হযরত মসীহ্ (আ)-এর ব্যক্তিত্ব এবং তাঁহার দাওয়াত ও আন্দোলনের মিশনকে ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে উপলব্ধি করা দরকার। অতঃপর যে বিস্তারিত বর্ণনা একজন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ নবী, আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী রসূল এবং খৃস্টানদের ভ্রান্ত বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহর পুত্রকে তাহার ফয়সালার সামনে হতাশ, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, অসহায় এবং আল্লাহ্র নিকট অভিযোগকারী হিসাবে তুলিয়া ধরে তাঁহার উপর আরেকবার দৃষ্টিপাত করা হউক। সাথে সাথে এই বর্ণনার মধ্যে যে বৈপরীত্য রহিয়াছে সে সম্পর্কেও চিন্তা করা হউক। একদিকে বলা হইতেছে, হযরত মসীহ্ (আ) আল্লাহর পুত্র হইয়া এই উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে আসিয়াছিলেন যে, তিনি শূলাবিদ্ধ হইয়া দুনিয়ার সকল পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিবেন (ইহাই হইতেছে, প্রায়শ্চিত্তের আকীদার একমাত্র ভিত্তি), অপরদিকে ক্রুশ এবং হত্যার কল্পিত কাহিনী এই ভিত্তির উপর দাঁড় করানো হইয়াছে যে, সেই নির্দিষ্ট সময় যখন আসিয়া গেল তখন আল্লাহ্ এই কল্পিত পুত্রকে নিজের মাহাত্ম্য এবং পৃথিবীতে নিজের অস্তিত্বকে একেবারে ভুলিয়া গিয়া "প্রভো আমার, প্রভো আমার, কেন আমায় পরিত্যাগ করিলে' এই ধরনের হতাশাজনক বাক্য মুখ দিয়া বাহির করিতে এবং আল্লাহর ইচ্ছার উপর নিজের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করিতে দেখা যায়। কোন ব্যক্তির এই প্রশ্ন উত্থাপন করার কি অধিকার নাই যে, খ্রীষ্টানদের বিবৃত কাহিনীর উভয় অংশ যদি সঠিক এবং নির্ভুল হইয়া থাকে তাহা হইলে এই বৈপরীত্য কেন এবং এই অসামঞ্জস্যতারই বা অর্থ কি (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ১০১)?

অতএব যদি কোন বাস্তববাদী এবং দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি এই সমস্ত দিক সামনে রাখিয়া এবং ঘটনা ও পরিস্থিতির এই সার্বিক দিককে পরস্পর সংযুক্ত করিয়া বিষয়টি অধ্যয়ন করে তবে সে 'সত্যকে মানিয়া নেওয়ার তাগিদে নিঃসংকোচে এই সিদ্ধান্তে পৌছিবে যে, বাইবেলের এই কাহিনী পরস্পর বিরোধী এবং মনগড়া। আর কুরআন মজীদ ঐ প্রসংগে যে সিদ্ধান্ত দিয়াছে তাহাই সত্য।

ইতিহাস সাক্ষী যে, হযরত মসীহ (আ)-এর পর হইতে সেন্ট পলের পূর্ব পর্যন্ত খৃস্টান জগত ইয়াহুদীদের এই মনগড়া কাহিনীর সাথে সম্পূর্ণ নিঃসম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেন্ট পল যখন "ত্রিত্ববাদ ও প্রায়শ্চিত্তের” ধারণার উপর আধুনিক খৃস্টবাদের ভিত্তি স্থাপন করেন তখন প্রায়শ্চিত্তের ধারণাকে সুদৃঢ় করার জন্য ইয়াহুদীদের এই মনগড়া উপাখ্যানকেও ধর্মের অংশে পরিণত করিয়া নেওয়া হয়।

কুরআন মজীদ চৌদ্দ শত বৎসর ধরিয়া হযরত ঈসা (আ)-এর মহান মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমার কথা ঘোষণা করিয়া তাঁহার ঊর্ধ্ব জগতে উত্তোলিত হওয়ার রহস্যকে ইয়াহুদী-খৃস্টানদের মনগড়া কাহিনীর বিপরীতে নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে (আল্লামা সিওহারবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, পৃ. ১০২)।

হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে ইয়াহুদী-খৃস্টানদের ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন

ইয়াহুদী ও ত্রিত্ববাদী খৃস্টানদের মতে, হযরত ঈসা (আ)-কে শূলে বিদ্ধ করা হয়। তবে পার্থক্য হইল, ইয়াহুদীদের মতে, বনী ইসরাঈলকে বিভ্রান্ত করার ও ইয়াহুদী ধর্ম ত্যাগ করার কারণে তাঁহাকে ক্রুশে বিদ্ধ করা হয়। আর ত্রিত্ববাদী খৃস্টানদের মতে মানবতাকে পাপের অপরাধ হইতে মুক্ত করার জন্য প্রায়শ্চিত্তস্বরূপ তিনি নিজেই তাঁহার বিরোধী শিবিরের হাতে ধরা দেন এবং নিজেই ক্রুশে বিদ্ধ হইয়া দেহত্যাগ করেন।

অপরদিকে একত্ববাদী খৃস্টান এবং মুসলমানদের দৃষ্টিতে হযরত ঈসা (আ)-কে শূলে চড়াইয়া হত্যা করা হয় নাই। আল্লাহ পাক স্বীয় কুদরতে ঈসা (আ)-কে শত্রুদের কবল হইতে মুক্ত করিয়া আকাশে উঠাইয়া নেন। উলামায়ে কেরাম এই বক্তব্যের সমর্থনে ইয়াহুদী খৃস্টানদের ধারণা খণ্ডনের নিমিত্ত বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করিয়াছেন:

প্রথমত, খৃস্টানরা যে মৌখিক বর্ণনা লিপিবদ্ধ করিয়াছে, তাহা কতটুকু যথার্থ উহা সম্পর্কে সংশয় রহিয়াছে।

দ্বিতীয়ত, তাহারা যাহাকে শূলে চড়াইয়া হত্যা করিয়াছিল, তাহার সম্পর্কে সংশয়ে ছিল। ঐ শূলে বিদ্ধ ব্যক্তিটিই যে ঈসা এই ধরনের দৃঢ় বিশ্বাস লইয়া উক্ত ব্যক্তিটিকে হত্যা করিতে পারে নাই। তাহাদের মাঝে মতানৈক্য ছিল, কারণ ঈসা (আ)-কে গ্রেপ্তার করিবার জন্য তাঁহার অবস্থান স্থলের কামরাটিতে তাহারা যাহাকে পাঠাইয়াছিল পরবর্তীতে তাহাকে তাহারা খুঁজিয়া পায় নাই (প্রাগুক্ত, ৬খ, পৃ. ১১)।

ইবন জারীর তাবারী এই ক্ষেত্রে বিভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ করেন। সুদ্দীর এক বর্ণনায় দেখা যায়, আল্লাহ তা'আলা এই ক্ষেত্রে যে কৌশল অবলম্বন করিয়াছিলেন তাহা এই যে, হযরত ঈসা-এর অনুসারীদের একজনকে হযরত ঈসার আকৃতি দান করেন, যাহাকে তাহারা হযরত ঈসা বলিয়া ধারণা করিয়া হত্যা করিয়াছিল। অথচ ইহার পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উঠাইয়া নিয়াছেন।

সুদ্দী হইতে অপর এক বর্ণনায় ইন জারীর তাবারী উল্লেখ করেন, ইসরাঈলীরা হযরত ঈসা (আ)-কে ও তাঁহার সঙ্গী উনিশজন হাওয়ারীকে একটি ঘরে অবরুদ্ধ করিয়া রাখিয়াছিল। তিনি সঙ্গীদিগকে লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছিলেন, তোমাদের মধ্যে কে আছ, যে আমার আকৃতি ধারণ করিবে? তারপর তাহাকে হত্যা করা হইবে? আর তাহার জন্য থাকিবে জান্নাত। তাহাদের একজন হযরত ঈসা (আ)-এর আকৃতি গ্রহণ করিতে প্রস্তুত হয় এবং সে রূপান্তরিত হয়। অতঃপর হযরত ঈসা (আ)-কে আকাশে উঠাইয়া লওয়া হয়। আর একথাই আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করিয়াছেন এই আয়াতে:

وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ .
"তাহারা কৌশল অবলম্বন করিয়াছে, আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করিয়াছেন, আল্লাহই কৌশল অবলম্বনকারীদের মাঝে শ্রেষ্ঠ"।

তারপর যখন হাওয়ারীগণ ঘর হইতে বাহির হইলেন, দেখা গেল সংখ্যায় তাহারা উনিশজন। তখন তাহারা খবর দিলেন যে, হযরত ঈসা (আ)-কে আসমানে উঠাইয়া লওয়া হইয়াছে। শত্রুপক্ষ তাহাদেরকে গণনা করিতে লাগিল। তাহারা দেখিল যে, নির্দিষ্ট সংখ্যা হইতে একজন কম। তাহাদের মধ্যে একজনকে তাহারা হযরত ঈসা (আ)-এর আকৃতিতে দেখিতে পাইল। তাহার ব্যাপারে তাহারা সন্দিহান হইল। এই ভিত্তিতে তাহারা তাহাকে হযরত ঈসা (আ) মনে করিয়া শূলিতে চড়াইয়া দিয়াছিল (তাফসীরে তাবারী, ৫খ, পৃ. ৪১৮-৪১৯)। এই ঘটনা প্রসঙ্গে মুফাসসিরীনে কিরাম একাধিক বর্ণনা দিয়াছেন।

(১) ইয়াহুদীগণ যখন জানিতে পারিল যে, ঈসা তাঁহার সাথীবর্গসহ অমুক বাড়িতে অবস্থান করিতেছেন, ইয়াহুদী নেতা ইয়াহুয়া তখন ঈসারই এক সাথী তিতায়ূসকে আদেশ করিল যে, সে যেন ঈসা (আ)-এর কামরায় প্রবেশ করে এবং তাঁহাকে বাহির করিয়া আনে যাহাতে তাঁহাকে হত্যা করা যায়। ঐ ব্যক্তি যখন ঈসা (আ)-এর ঘরে প্রবশে করিল, তখন আল্লাহ তা'আলা 'ঈসা (আ)-কে ঘরের ছাদ ভেদ করিয়া বাহির করিয়া আনিলেন। আর ঐ ব্যক্তির চেহারা-সুরতকে ঈসা (আ)-এর চেহারায় রূপান্তরিত করিলেন। অতঃপর তাহারা ধারণা করিল, ঐ ব্যক্তিই ঈসা এবং তাহাকে শূলে চড়াইয়া হত্যা করিল।

(২) ঈসা (আ)-এর ব্যাপারে তাহারা এমন এক ব্যক্তিকে নিয়োগ করিয়াছিল যে তাহাকে পাহারা দিত। আর ঈসা (আ) পাহাড়ে আরোহণ করিলেন এবং আসমানে উত্থিত হইলেন। আর আল্লাহ তা'আলা ঈসা (আ)-এর চেহারাকে ঐ পাহারাদারের উপর ঢালিয়া দিলেন। অতঃপর তাহারা তাহাকে হত্যা করিল, অথচ সে বলিতেছিল, আমি ত ঈসা নহি, আমি ত ঈসা নহি।

(৩) এক ব্যক্তি যে নিজেকে ঈসার (আ) সাথী বলিয়া দাবি করিত, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে ছিল মুনাফিক। সে ইয়াহুদীদের কাছে গেল এবং ঈসা (আ)-কে গ্রেপ্তার করার নির্দেশদান করিল। সে যখন ইয়াহুদীদেরসহ ঈসা (আ)-এর আবাসস্থলে গেল আল্লাহ পাক তখন তাহার চেহারাকে ঈসা (আ)-এর চেহারায় রূপান্তর করিয়া দিলেন। অতঃপর সে শূলে নিহত হইল (রাযী, প্রাগুক্ত, ১১খ, পৃ. ১০০)। বাইবেলের বর্ণনা মতে ঐ ব্যক্তিটির নাম যিহুদা ইসখারায়ূতী।

উপরিউক্ত বর্ণনাগুলি পরস্পর বিরোধী। কেননা কোনটায় দেখা যায় ঈসার চেহারায় রূপান্তরিত ব্যক্তিটি ঈসার সাহায্যকারী হিসাবে আগাইয়া আসিয়াছিল। অপর বর্ণনামতে ঐ ব্যক্তিটি ছিল বিশ্বাসঘাতক। সে ঈসা (আ)-এর প্রতি শত্রুতাবশত তাঁহাকে ধরাইয়া দিতে চাহিয়াছিল। যাহা হউক, শেষোক্ত মতটি অধিক যুক্তিসংগত বলিয়া মনে হয়। কারণ ইহাই অধিক প্রসিদ্ধ এবং রূপান্তরিত হওয়ার শাস্তিতে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। বস্তুত উপরিউক্ত বর্ণনায় দেখা যায়, ইয়াহুদীরা হযরত ঈসা (আ)-কে শূলে চড়াইতে পারে নাই বরং তাঁহার চেহারায় রূপান্তরিত আরেক ব্যক্তিকে তাহারা শূলে চড়ায়।

এই পর্যন্ত যাহা কিছু আলোচনা করা হইল তাহার উপর আর একবার নযর বুলাইয়া নিচের বিষয়গুলি প্রণিধান করুন। (১) যেদিন মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয় সেদিন ছিল শুক্রবার। দিন শেষ হইয়া আসিতেছিল আর ইয়াহুদীরা সকল কাজ সারিয়া সন্ধ্যার আগে আগে ঘরে ফিরিয়া যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করিতেছিল। জুমুআর দিন সন্ধ্যা হইতেই তাহাদের শনিবার শুরু হইয়া যায়। আর শনিবারের সীমার মধ্যে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়াও নিষিদ্ধ ছিল। আর ইয়াহুদীদের একটা বিশেষ উৎসবের অনুষ্ঠানও শুরু হইতেছিল। মোটকথা ইয়াহূদীদের বেশ তাড়া ছিল। যাহাতে এই প্রশ্ন হইতে পারে যে, ধৃত ব্যক্তিটি যদি ঈসা না হইবে তাহা হইলে সে তাহা বলিল না কেন যে, আমি ঈসা নহি? ইহার বিভিন্ন জওয়াব রহিয়াছে:

(১) আল্লাহ পাকই তাহার যবান বন্ধ করিয়া দিয়াছিলেন তাঁহার নবীকে রক্ষার জন্য। (২) সম্ভবত ঐ লোকটি ঈসা (আ)-এর-ই ভক্ত শিষ্য ছিল, যে ঈসার পরিবর্তে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করিয়াছিল শাহাদাৎ লাভের আকাংক্ষায় (আলুসী, প্রাগুক্ত)।

(৩) হয়ত সে ব্যক্তিটি ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল হইয়া গিয়াছিল, তাই সে নির্বাক হইয়া গিয়াছিল।

ঈসা (আ)-কে শূলে চড়ানো হয় নাই বা শূলে চড়ানো ব্যক্তি ঈসা ছিলেন না। ইহার পিছনে আরও কয়েকটি যুক্তি পেশ করা যায়। ঈসা (আ) ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মহান নবী, আল্লাহর সাহায্য ও ফয়সালা সম্পর্কে দৃঢ় আস্থাবান। তাই তিনি বিপদের মুহূর্তে নিরাশ হইতে পারেন না যাহার প্রমাণ এমনকি সুসমাচারসমূহেও রহিয়াছে। তাই দেখা যায় সৈনিকরা যখন তাঁহাকে গ্রেফতার করিতে ঘিরিয়া ফেলিয়াছিল তখন তিনি সিজদায় গিয়া মুনাজাত করিয়াছিলেন।

আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী উল্লেখ করেন যে, একজন প্রসিদ্ধ ইউরোপীয় পণ্ডিত "ডি বেনসন" (De Benson) বিগত শতাব্দীতে ইসলাম অথবা প্রকৃত খৃস্টবাদ (ISLAM OR TRUE CHRISTIANTY) নামক গবেষণাভিত্তিক তথ্যপূর্ণ পুস্তকের ১৪৩ পৃষ্ঠার টীকায় খৃস্টানদের বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মীয় ফেরকার নাম উল্লেখ করিয়া লিখিয়াছেন যে, ঐসব সম্প্রদায় হযরত ঈসা (আ)-কে সশরীরে আকাশে উঠাইয়া নেওয়ার আকীদায় বিশ্বাসী ছিল, কেহ বর্তমান খৃস্টানদের মত তাঁহার ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় বিশ্বাসী ছিল না, যে বিশ্বাস বিগত কয়েক শতাব্দী যারত তথাকথিত খৃষ্ট মতবাদের অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত রহিয়াছে। সেল নামক জনৈক পণ্ডিতও তাহার অনূদিত কুরআনের টীকায় প্রাচীন খৃস্টানদের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নাম উল্লেখ করিয়া হযরত ঈসা (আ)-এর সশরীরে আকাশে উত্তোলিত হওয়ার আকীদা-বিশ্বাসের বর্ণনা দিয়াছেন (আবদুল মাজেদ দরিয়াবাদী, প্রাগুক্ত, ২খ, পৃ. ৮৭)।

ইহা ছাড়া শূলে চড়ানোর ঘটনাকে বার্ণাবাস অস্বীকার করিয়াছেন। বালম্যান স্ট্রাকের গ্রন্থ The four Gospels (New York, Macmillan 196- p. 5)-এর বরাতে মাওলানা তকী উসমানী উল্লেখ করেন, ঈসা (আ)-এর অনুসারী পিটারও বলিয়াছেন, ঈসা শূলে বিদ্ধ হন নাই, তাঁহাকে আকাশে উত্তোলিত করা হয় (তকী উসমানী, মাহেয়া আন-নাসরানিয়া, পৃ. ৭৩)।

ঈসা (আ)-এর আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে কাদিয়ানীদের বিভ্রান্তি

হিন্দুস্তানে নূতন ধর্মমত আহমাদীয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী নিজেকে "প্রতিশ্রুত মাসীহ” দাবি করার প্রেক্ষাপটে মত ব্যক্ত করে যে, হযরত ঈসা (আ)-এর মৃত্যু হইয়া গিয়াছে। তিনি তাঁহার কবর হইতে জীবিত হইয়া হিন্দুস্তানের কাশ্মীরে হিজরত করেন এবং সেখানে ১২০ বৎসর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তাঁহার কবর কাশ্মীরের শ্রীনগরে রহিয়াছে যাহা সর্বস্তরের জনগণের কাছে প্রসিদ্ধ। ইহাকে মানুষ যিয়ারত করিতে আসে এবং বরকত কামনা করে (গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, আর-রিসালাতুল আরাবিয়্যাহ, পরিশিষ্ট আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, ২য় সংস্করণ, জুলাই ১৯২৪, পৃ. ২২; আরও দ্র. আবুল হাসান আলী-নদভী, আল-কাদিয়ানী ওয়াল কাদিয়ানিয়‍্যাহ, জেদ্দা আদ-দারুস সাউদিয়‍্যাহ লিন্নাশরি, ৩খ সং, ১৩৮৭ হি,/ ১৯৬৭ খৃ, পৃ. ৬৩ ৬৬; আখতার-উল-আলম, শেষ নবী, পৃ. ১৭৮-১৮০)।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 ঈসা (আ)-এর আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে কাদিয়ানীদের বিভ্রান্তি

📄 ঈসা (আ)-এর আকাশে উত্তোলন প্রসঙ্গে কাদিয়ানীদের বিভ্রান্তি


হিন্দুস্তানে নূতন ধর্মমত আহমাদীয়া জামাতের প্রতিষ্ঠাতা মির্যা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী নিজেকে "প্রতিশ্রুত মাসীহ” দাবি করার প্রেক্ষাপটে মত ব্যক্ত করে যে, হযরত ঈসা (আ)-এর মৃত্যু হইয়া গিয়াছে। তিনি তাঁহার কবর হইতে জীবিত হইয়া হিন্দুস্তানের কাশ্মীরে হিজরত করেন এবং সেখানে ১২০ বৎসর বয়সে ইন্তিকাল করেন। তাঁহার কবর কাশ্মীরের শ্রীনগরে রহিয়াছে যাহা সর্বস্তরের জনগণের কাছে প্রসিদ্ধ। ইহাকে মানুষ যিয়ারত করিতে আসে এবং বরকত কামনা করে (গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, আর-রিসালাতুল আরাবিয়্যাহ, পরিশিষ্ট আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, ২য় সংস্করণ, জুলাই ১৯২৪, page ২২; আরও দ্র. আবুল হাসান আলী-নদভী, আল-কাদিয়ানী ওয়াল কাদিয়ানিয়‍্যাহ, জেদ্দা আদ-দারুস সাউদিয়‍্যাহ লিন্নাশরি, ৩খ সং, ১৩৮৭ হি,/ ১৯৬৭ খৃ, page ৬৩ ৬৬; আখতার-উল-আলম, শেষ নবী, page ১৭৮-১৮০)।
মির্যা কাদিয়ানী আরো উল্লেখ করে যে, শ্রীনগরের খান ইয়ার মহল্লায় রাজকুমার ইউস আসফের কবর নামে যাহা প্রসিদ্ধ, তাহাই ঈসা মাসীহের কবর, যিনি দুই হাজার বৎসর পূর্বে কাশ্মীরে হিজরত করেন এবং রাজকুমার নবী হিসাবে পরিচিত ছিলেন (গোলাম আহমদ কাদিয়ানী, বারাহীনে আহমাদীয়া, ৪খ, page ২২৮)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00